হোম নির্বাচিত নির্মাণ আর আবিষ্কারের যুগলবন্দি

নির্মাণ আর আবিষ্কারের যুগলবন্দি

নির্মাণ আর আবিষ্কারের যুগলবন্দি
481
0

বাংলা ভাষার মেজাজ-মর্জি, ইতিহাস, সংকট এবং করণীয় বিষয়ে যার গভীর, বিস্তৃত এবং দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ নেই তার পক্ষে বাংলা ভাষার উপনিবেশায়ন ও রবীন্দ্রনাথ-এর মতো একটি গ্রন্থ রচনা করা অসম্ভব। ভাষার মধ্যে আছে রাজনীতি, তরবারির ঝনঝনানি, শক্তির জয়-পরাজয়, দমন-গ্রহণ, নিজ-অপর, টাকা-পয়সা, অভিজাত-অনভিজাত, শাসন-শোষণের ব্যাপার-স্যাপার। ভাষা সম্পর্কে এই গভীর জ্ঞান যার আছে, শুধু তার পক্ষেই বাংলা ভাষার উপনিবেশায়ন ও রবীন্দ্রনাথ-এর মতো একটি গবেষণাগ্রন্থ রচনা করা সম্ভব। মোহাম্মদ আজম এই দুরূহ কাজটিকে অনায়াসে কব্জা করে ফেলেছেন।

গ্রন্থ শিরোনামের প্রথমাংশে ‘বাংলা ভাষা’-র চেয়ে ‘উপনিবেশায়ন’ বিষয়টিতে বেশি মনোযোগ পড়ে। পরের অংশে ‘রবীন্দ্রনাথ’-ই সর্বেসর্বা । ইংরেজ উপনিবেশের আওতায় বাংলাভাষা কিভাবে আক্রান্ত, বিপন্ন, বিকৃত বা উপনিবেশিত হয়েছে তার এক নিবিড় আজমীয় পর্যবেক্ষণ রয়েছে গ্রন্থটির প্রথম দিককার ‘উপনিবেশায়ন-প্রক্রিয়া ও বাংলাভাষা’ এবং ‘উনিশ শতকে বাংলা গদ্য ও বাংলা ভাষাচর্চার ধারা’ শিরোনামের দুটি অধ্যায়ে। এখানে তিনি দেখিয়েছেন, ইংরেজ সাহেবদের প্রযোজনা ও চর্চায় বাংলা কিভাবে মূল স্বভাব থেকে সরে গিয়ে সংস্কৃতানুগ হয়েছে। প্রথাগত ইতিহাসে বাংলাভাষার সংস্কৃতায়নের জন্য ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিত-মুন্সিদের দায়ী করা হয়। এমনকি রবীন্দ্রনাথও তাই করেছেন। কিন্তু আজম দেখিয়েছেন, এ ব্যাপারে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে ইংরেজ সাহেবরা, তাদের উপনিবেশকসুলভ প্রভুত্ববোধ, আর তাদের কাছে বেয়াড়া মনে হওয়া বাংলা ভাষাকে সহজে বাগে আনার রাজনীতি। কারণ ভাষা বাগে আনা মানে খালি ভাষা বাগে আনা নয়, ভাষার সাথে সম্পর্কিত জ্ঞান, আইন-কানুন, ক্ষমতা সব কিছুই বাগে নিয়ে আসা। ফলে আজম ইংরেজের বাংলা অভিধান প্রণয়ন বা বাংলাচর্চাকে ভাব-গদগদ চিত্তে বাংলা ভাষা-প্রেম বলে দেখেন নি। তিনি ইংরেজের বাংলাচর্চাকে এবং বাংলাকে সংস্কৃতায়িত করাকে উপনিবেশায়নের আর দশটি প্রক্রিয়ার মতো একটি প্রক্রিয়া হিসেবেই দেখেছেন।

azom——————–

প্রকাশক : আদর্শ

প্রচ্ছদ : মামুন হোসাইন

——————-

গ্রন্থটির শেষ দিককার ‘রবীন্দ্রনাথের ভাষাচিন্তা : বাংলাভাষা সম্পর্কিত ধারণা’, ‘রবীন্দ্রনাথের ভাষাচিন্তা : বাংলা ভাষা-বর্ণনার কিছু সূত্র ও প্রণালি-পদ্ধতি’, এবং ‘বাংলা ভাষাচর্চার ধারা ও রবীন্দ্রনাথ’ অধ্যায়ে আবিষ্কৃত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের ভাষাতাত্ত্বিক সত্তা, তাঁর বাংলাভাষা সম্পর্কিত ধ্যান-ধারণা আর বাংলাভাষাকে সংস্কৃতায়ন তথা উপনিবেশায়নের খপ্পর থেকে মুক্ত করার উপায় ও প্রচেষ্টা-সংগ্রামের কথা। এটিই আজমের লক্ষ হলেও এ জন্য তাঁকে নির্মাণ করতে হয়েছে একটি শক্তিশালী পাটাতন। গ্রন্থের পাটাতন-অধ্যায়টির নাম ‘বাংলায় উপনিবেশায়ন’। বাংলা অঞ্চল কিভাবে, কোন কোন দিক থেকে সর্বব্যাপী উপনিবেশায়নের শিকার হয়েছে, তার এক অনন্য দলিল এই দ্বিতীয় অধ্যায়টি। অধ্যায়টি তথ্য, তত্ত্ব আর ইতিহাস নির্মাণের আকাঙ্ক্ষার প্রশ্নে এত সমৃদ্ধ আর আটঘাট বাঁধা যে, এটি স্বতন্ত্র গ্রন্থের মর্যাদা দাবিদার। ঢাকায় এই প্রথম ঊনবিংশ শতাব্দীর ‘নবজাগরণ’, সাহিত্যিক নন্দনতত্ত্ব, ঔপনিবেশিক অর্থনীতি, শিক্ষা ও সামাজিক ‘উন্নতি’-র ধারণা পূর্ণাঙ্গভাবে আলোচিত হয়েছে এবং প্রবল প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এই অধ্যায়ে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়েছে ঔপনিবেশিক মন এবং মননপুষ্ট ইতিহাসের প্রায় দুইশ বছরের চর্চার ধারা। এই অধ্যায়টি পড়ার সময় লক্ষ করি ঢাকার ঔপনিবেশিক ইতিহাসচর্চার বাইরে এক নতুন ইতিহাসচর্চার ইশারা। আজমের আগে ঊনবিংশ শতাব্দী নিয়ে উত্তর-ঔপনিবেশিক পাঠ অনেকে দিলেও তা সীমাবদ্ধ সাংস্কৃতিক ও নন্দনতাত্ত্বিকতার মধ্যে। আজম ঢাকায় প্রথম পূর্ণাঙ্গভাবে একাডেমিক শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে ঊনবিংশ শতাব্দীর উত্তর-ঔপনিবেশিক পাঠটি দিলেন তাঁর গ্রন্থে। নতুন চিন্তা শুরুতে নানাজনের মধ্যে অসংগঠিতভাবে চালু থাকে। কোনো একজনের উছিলায় সেটি সুসংগঠিত রূপ পায়। আজম এই গ্রন্থটির মধ্য দিয়ে—অন্তত ঢাকায়—একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব সম্পন্ন করলেন।


তিনি রবীন্দ্রনাথের মূল্যায়নে আবেগে হামলে কেঁদে ওঠেন নি, দাঁত খিঁচিয়ে আক্রমণও করেন নি; সজাগ-সজ্ঞান থেকেছেন


রবীন্দ্রনাথ যেমন ঔপনিবেশিক চেতনাপুষ্ট তেমনি ঐতিহ্যচেতনাঋদ্ধ। এ কারণে তাঁর সমগ্র সাহিত্য এবং চিন্তায় স্বদেশ-বিদেশের দোটান লক্ষ করা যায়। এ জন্য তাঁকে নিয়ে কথা বলতে গেলে সব সময় অতি সতর্ক থাকা জরুরি, যা অধিকাংশ রবীন্দ্র-গবেষণায় প্রায় অনুপস্থিত। ঢাকার অধিকাংশ রবীন্দ্রবিবেচনা একদেশদর্শী এবং ভাবালুতা-আক্রান্ত। কিন্তু আজম যুগপৎভাবে রবীন্দ্রনাথের সীমাবদ্ধতা এবং উপনিবেশ-সচেতনতার কথা বলেছেন। তিনি রবীন্দ্রনাথের মূল্যায়নে আবেগে হামলে কেঁদে ওঠেন নি, দাঁত খিঁচিয়ে আক্রমণও করেন নি; সজাগ-সজ্ঞান থেকেছেন। এই ‘নির্মোহতা’ এবং ‘নিরপেক্ষতা’ গ্রন্থটিকে গবেষকের ব্যক্তিত্বের স্মারকে পরিণত করেছে।

ভাষার উপনিবেশায়ন—ঢাকার চিন্তায়—নতুনই বটে। ভাষার উপনিবেশায়ন বলতে সাধারণভাবে বোঝায় উপনিবেশিতের ভাষাকে হটিয়ে উপনিবেশকের ভাষা চালু করা। অথবা উপনিবেশিতের ভাষার মধ্যে উপনিবেশকের ভাষার নানা খাসলত ঢুকে যাওয়া। আজম তাঁর গবেষণায় বাংলা ভাষার মধ্যে উপনিবেশক ইংরেজের ভাষা-বৈশিষ্ট্যের অনুপ্রবেশের বিষয়টি দেখিয়েছেন, যেটি তাঁর গবেষণায় মুখ্য নয়। বরং ইংরেজ ঔপনিবেশিক শক্তি তার সুবিধা এবং ইচ্ছানুযায়ী বাংলা লেখ্য ভাষার গতি-প্রকৃতি নির্ধারণে যে মোড়লি করেছে, বাংলাভাষার রূপরেখা নির্ধারণ করেছে, গদ্যের গঠনে তার শক্তি, বুদ্ধি এবং পরামর্শ খাটিয়েছে সেটিই দেখিয়েছেন। যতদূর জানি ঢাকায় বাংলাভাষার উপনিবেশায়ন সম্পর্কিত পূর্ণাঙ্গ গবেষণা আজমই প্রথম করলেন।

সৃজনশীল গবেষণায় বিষয়কে দেখার ভঙ্গি বলে দেয় গবেষকের জীবনচেতনার স্বরূপ। আজম গবেষণার পদ্ধতি হিসেবে গ্রন্থটিতে প্রয়োগ করেছেন মার্কসবাদী পদ্ধতি। সমগ্র ঊনবিংশ শতাব্দীর ঔপনিবেশিক কালপর্বকে, ভাষা এবং ভাষা-বিতর্ককে, রবীন্দ্রনাথের ভাষাচিন্তাকে তিনি দেখেছেন সমাজের অন্তঃকাঠামো এবং বহিঃকাঠামোর সঙ্গে মিলিয়ে। তিনি সব সময় বহু মানুষের ব্যবহৃত ভাষার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন এবং রবীন্দ্রনাথকেও সেভাবেই আবিষ্কার করেছেন। গ্রন্থের আদ্যোপান্ত প্রতিষ্ঠান, প্রতিষ্ঠা আর আধিপত্যের বিপরীতে লেখকের যুক্তিসঙ্গত অবস্থান যে কোনো পাঠকের চোখে পড়বে।

সব মিলিয়ে মোহাম্মদ আজম প্রণীত বাংলা ভাষার উপনিবেশায়ন ও রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থটি ঢাকায় গবেষণাগত ও জ্ঞানগত এক নতুন অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখা দেবে বলে আমাদের ধারণা।

Kudrat E-Hud

কুদরত-ই-হুদা

জন্ম ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৮, ফরিদপুৱ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশা : অধ্যাপনা।

প্রকাশিত বই :
শওকত ওসমান ও সত্যেন সেনের উপন্যাস : আঙ্গিক বিচাৱ [আদর্শ, ২০১৩]

ই-মেইল : kudratehuda@gmail.com
Kudrat E-Hud