হোম নির্বাচিত না বলা কথা প্রকাশের একটি শব্দঘর 

না বলা কথা প্রকাশের একটি শব্দঘর 

না বলা কথা প্রকাশের একটি শব্দঘর 
1.01K
0

কথা তো সবাই বলে, কিন্তু ঝরাপাতায় কান পেতে শব্দের মর্মার্থ খোঁজা হয়তো সবাই পারে না। জানাশোনা, কিংবা চেনা কথাটাকে অন্য কারো বলার ঢঙে নিজের বলে মধুর বিভ্রমে পড়া—এটা হয়তো কবিরাই করে দেন। নিরেট জ্যোছনাকে আলাপের ভাষায় চোখের সামনে মেলে ধরা, সেই কাজটি কবিরাই করেন। একান্ত ব্যক্তিগত কথা, একেবারে অন্তরালে গুমরে থাকা, যা কখনো ভাষা পেত না—হয়তো কোনো দীর্ঘশ্বাসে একদিন ফুরিয়ে যেত—কবিরা সেই দীর্ঘশ্বাসকে হাওয়ার ঠোঁটে ভাষা দেন।

অপূর্ব সোহাগের জলপদ্মরেখা—এরকম কবিতারই একগুচ্ছ নরম-তেজি বোধ-অনুভবের নির্যাস। কবিতাই বলে দেবে তার শরীর ভরা কতটা জল, কতটা আগুন—তার আগে প্রবেশ চাই জলপদ্মরেখায়।

জলপদ্মরেখায় অপূর্ব সোহাগ একেবারেই ছটফট করা এক তারুণ্য। জলপদ্মরেখা সিরিজ জুড়ে উপচে পড়ছে সেই আবেগময়তা। কাগজের নৌকায় আবেগের চারুনিবেদন, নানাকথায় চিঠিপ্রসঙ্গ, কোথাও বসে থাই স্যুপ পানের চুম্বক-ফিরিস্তি। এখানে-ওখানে দেখা হওয়া, জানালা ছুঁয়ে অলস রোদের বিদায়। কথাগুলো কি শুধু তরুণের, মনে হয় সবসময়ের সব আবেগকাতর নারী-পুরুষেরই। এখানে বিভ্রমের সুযোগেরও কমতি নেই। অপূর্ব সোহাগ কি কেবল তাঁর কোনো গন্তব্যে তির ছুঁড়ে মারতে শব্দালাপ, কাব্যালাপ করে এতটা কবিতা সাজিয়েছেন। বড়দিনে তাঁর শহরে আরও বড় হবার আহবান জানিয়েছেন কাউকে। কবি যেহেতু রক্তমাংসের আর দশজনের মতো একজন। এই উচাটন করা অভিব্যক্তি সেই কবিনামক ব্যক্তির হতেই পারে।

আবার সীমানাটা একটু বড় করে দেখলে হয়তো ব্যক্তির বৃত্তকে চূর্ণ করে অপূর্ব সোহাগ জলপদ্মরেখায় অনেকের কথাকে ধারণ করেছেন। লিপিবদ্ধ করেছেন। প্যাপিরাসে ফুটিয়েছেন চিরকালীন আবেগ-উচ্ছ্বাসের পরিমিত চঞ্চলতা। কথাগুলো হয়তো তখন আর তাঁর একার থাকে না। এটা হয়ে ওঠে অনেক মানুষের কথা। জলপদ্মরেখা সেই ভাঙচুর করা সময়েরই অনেকের না বলা কথা প্রকাশের একটি শব্দঘর। যার উনুনে অনেকের অস্থির-ভাবনাসমূহকে রান্নাবান্না করে পাতে তুলে দিয়েছেন অপূর্ব সোহাগ। ফিরে ফিরে দেখার জানালাটা খুলে দেওয়ার কাজটি করেছেন এই কবি। আছে মধুর-দীর্ঘশ্বাসের ঝাপটা। পিছন ফিরে দেখার রুপালিরেখা। মেঘ ছুঁয়ে যাওয়ার দিনলিপি। নির্বাসনে থাকা প্রজাপতিটাও কখনো ফিরে আসে।

অতীত-বর্তমানের দোলাচলের মধ্যে সময়ের কঠিন-মধুর দুপিঠকেই ছুঁয়ে যাওয়ার অনুভূতি আছে জলপদ্মরেখায়।

‘অনুভূতিহীন এই নগরে
আমি পতনের শব্দ শুনতে শুনতে ক্লান্ত
তাই দৃশ্যের দর্শক না হয়ে
অন্ধকারের মধ্যে মিশে
হয়ে গেছি রাতের চিত্রকল্প।

দ্যাখো তো আমাকে খুঁজে নিতে পারো কি না !’ (পতনের শব্দ)

কে কাকে খুঁজলো সেই তর্কে না গিয়েও ভাবতে ভালো লাগে জলপদ্মরেখা কাউকে না কাউকে তো খুঁজে পাবেই, ছুঁয়ে যাবেই।


জলপদ্মরেখা থেকে

অপূর্ব সোহাগ


জলপদ্মরেখা – ১৩

দরোজা ঘুমায়, জানলা ঘুমায়, বিছানা ঘুমায়, বালিশ ঘুমায়, বাড়িটা ঘুমাচ্ছে, ঘুমাচ্ছে গ্রাম। লেপের নিচে ঘুমিয়ে পড়েছে উষ্ণতা! পাহারাদারের বাঁশি ঘুমায়। পাশে রাখা বইয়ের ভেতর শব্দগুলো ঘুমায়। ঘুমও ঘুমাচ্ছে জলপদ্মরেখার চোখে! শুধু আমি জোনাকি হয়ে জ্বলছি তোমার শহরে, তোমার রাত্রিতে। তুমি ঘুমাও, মুখে নীল আগুন নিয়ে আমি পাহারা দিচ্ছি তোমার রাত্রি, তোমার ঘুমন্ত শহর…

 .

জলপদ্মরেখা – ২১

সমুদ্র যত বিশাল হোক, অন্ধকারে তাকে দেখা যায় না
তুমি সমুদ্র নও, সমুদ্রের মতন বিশাল নও, তবু তুমি
দৃশ্য হয়ে থাকো অন্ধকারে!

অন্ধকারে সিগারেটের ধোঁয়া শোকচিহ্ন আঁকে,
তোমাকে আঁকে অন্ধকার নিরপক্ষ নয়, তোমার স্বরে কথা বলে
অথচ ভোরবেলা তুমি চলে যাও নিজের মত করে একা!

তুমি শোনোনি আমার শেষতম কথা
পৃথিবীর সকল ডাকঘর ঘুরে কথাগুলো ফিরে এল,
কোনো কথা তাই মেঘ হতে পারে নি তোমার আকাশে,
নিঃসঙ্গতার মতো করে জড়িয়ে থাকা অন্ধকারে
কথাগুলো বুকের ভেতর পায়চারি করে!
তখন একটি দীর্ঘশ্বাস, বিস্মৃতি অক্ষর
পড়ে থাকে গাছের নিচে!
তুমিই জানলে না, গাছ কী করে জানবে;
একটি দীর্ঘশ্বাসের মধ্যে অনেক না-বলা কথা থাকে!

 .

জলপদ্মরেখা – ২৫

খুব ইচ্ছে করছে চিঠি লিখি। চিঠিতে কোনো অক্ষর থাকবে না, শুধু নীল নীরবতা, বিষণ্নতা, দীর্ঘশ্বাস…। জমিয়ে রাখা অনেক কথা, যা কখনও বলা হয় নি কাউকে, যা পুষে রেখেছিলাম বলব বলে কোনো একদিন, কখনও…এইসব। তারপর হলুদ খামে বেদনার অক্ষর দিয়ে তোমার নাম লিখে পাঠিয়ে দিব তোমার ঠিকানায়। চিঠিটি অন্য কারো হাতে যাবে; কেউ কিছু বুঝবে না, সাদা পৃষ্ঠা ভেবে ফেলে দিবে; তারপর তুমি কিছু না ভেবেই চিঠিটি তুলে নিবে হাতে—অন্যরা যা পড়ার মতো কিছুই পায় নি কাগজটিতে; তুমি সব পেয়ে গেছ, তুমি পড়ে যাচ্ছ, পড়ছ আর ভাবছ, ভাবছ আর দেখছ, তোমার শরীরটা বেয়ে…তোমার মনটাকে ঘিরে অচেনা একটা কষ্ট, শ্বাসকষ্টের মতো হচ্ছে তোমার, অথচ তোমার কোনো শ্বাসকষ্ট নেই; তবু চিঠিটা ইনহেলারের মতো কাজ করছে! একটু একটু করে একটু পর তুমি নিজেই একটি চিঠি হয়ে গেলে; ডাকবাক্স ছাড়াই তুমি উড়লে, যেভাবে মেঘ ওড়ে…পাখি ওড়ে…উড়ে উড়ে সমস্ত আকাশকে জানিয়ে দিলে অথবা আকাশ জেনে গেল—আকাশ থেকে আকাশে ছড়িয়ে দিলে…। চিঠি হয়ে ওড়া তুমি, বিষাদ-অন্ধকারে পরী হয়ে নামলে ঘরে। তোমার কোমল শরীরে তখন চলছে শব্দের সন্তরণ…

 .

পতনের শব্দ

অনুভূতিহীন এই নগরে
আমি পতনের শব্দ শুনতে শুনতে ক্লান্ত
তাই দৃশ্যের দর্শক না হয়ে
অন্ধকাররে মধ্যে মিশে
হয়ে গেছি রাতের চিত্রকল্প।

দ্যাখো তো আমাকে খুঁজে নিতে পারো কি না!

আকমল হোসেন নিপু

আকমল হোসেন নিপু

জন্ম ১৫ মার্চ ১৯৬২, মৌলভীবাজার। পেশায় সাংবাদিক।

উল্লেখযোগ্য বই :
গল্প:
জলদাসের মৎস্যঘ্রাণ (১৯৯৮)
বুড়ি চাঁদ ডুবে যাবার পরে (২০০৩)
আমরা খুব খারাপ সময়ে বেঁচে আছি (২০০৬)
সাদা কাপড়ের শোক (২০১০)
রাতটা পূর্ণিমার ছিল (২০১৬)

কবিতা:
মেঘে যে তোমার বাড়ি (২০০৪)
দুঃখের কোন প্রতিবেশি নেই (২০১৬)

উপন্যাস:
হলুদ পাখির ডাক অথবা অন্ধকারের নদী (২০০৮)
ভূমিপুত্র অথবা হাওর পুরাণ (২০০৯)
হীরামতি ও তার রাঁধুনীকাল (২০১৬)

ই-মেইল : nipupalo@gmail.com
আকমল হোসেন নিপু

Latest posts by আকমল হোসেন নিপু (see all)