হোম বই নিয়ে নতুন কবিতা

নতুন কবিতা

নতুন কবিতা
1.29K
0
১৯৬৭ সালে আবদুল মান্নান সৈয়দের প্রথম কাব্য জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ প্রকাশের ঠিক পরের বছর, ১৯৬৮ সালে, বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমান সে বইটির একটি রিভিউ লেখেন। আমাদের জানা মতে, লিখিতভাবে এটিই মান্নান সৈয়দের ওপর প্রথম আলোচনা। এটি সংগৃহীত হয়েছে কবি-সম্পাদিত কবিতার বই থেকে। অ্যাডর্ন পাবলিকেশন বইটি প্রকাশ করে ২০০৬ সালে।
সম্পাদক

If you shut yourself up in a vacuum and depict for the reader the hopeless story of a monster, a madman or a diseased wretch, you will only succeed in putting him off… The true artist must possess wide knowledge and superior attitude, which will help him to see the overall pattern. The writers of today specialize too much, shut themselves off from the world and concern themselves with microscopic examination of individual parts instead of fixing eye upon the whole nation of individual instead of fixing their eye upon the whole.

–   H. Taine : এমিল জোলা’কে লিখিত পত্র

Detailed investigation of the reality of today must be followed by a glance at the development of tomorrow.

–   এমিল জোলা

আবদুল মান্নান সৈয়দ যতখানি স্বভাব-কবি, তার চেয়ে ঢের বেশি অস্বাভাবিক কবি। সাম্প্রতিকদের নটগুরু আলী আহসান, আরেক সৈয়দের কাছে এই কবি কিছুটা ধাঁধা ঠেকতে পারে। রোমান্টিক বিষণ্নতার নাগরিক জের-বাহী শামসুর রাহমান মূলত আধুনিক ঐতিহ্যের উপকণ্ঠবাসী; এমনকি, হৃৎ-লুণ্ঠিত-রিক্ত গ্রাম এবং যান্ত্রিক সভ্যতার কুৎসিত ড্রেজার-মথিত তটরেখায় খাড়া, মানবিকতার জেওর-সন্ধানী আল মাহমুদকে কেউ দুর্বোধ্যতার বদনাম দিতে পারবে না। সেই দিক থেকে শ্রীযুক্ত মান্নান দলছুট। দেহাতি ভাষায়: ওড়ের বিগ্আ। তাই আপাত-প্রতীয়মান অস্বাভাবিক।


আবদুল মান্নানের দুঃসাহস তাই অভিনন্দনযোগ্য। শিল্পের ক্ষেত্রে ভ্যাঁজর ভ্যাঁজর পুনরাবৃত্তির চেয়ে অসফল প্রচেষ্টাও ঢের বেশি কাম্য।


অস্বাভাবিকতা কোনো পরিবাদ নয়। সিরিয়াস শিল্পীর পক্ষে নিছক শিল্পের খাতিরে পরিচিত সড়ক ছেড়ে কিছু এদিক-ওদিক পা ফেলতে হয়। সত্তার রূপ-উদ্ঘাটন-ব্রতী শিল্পী কলঙ্কের শিরোপা বহনে প্রস্তুত থাকেন। ভাষাই কাব্যের বাহন। সিরিয়াস শিল্পীর প্রথমে সেখানেই মোকাবেলা শুরু হয়। ইবনে খল্‌দুনের মন্তব্য, ‘….the art of discourse, whether in verse or prose, lies only in words, not in ideas… ideas are common to all, and are the disposal of every understanding to employ as it will, needing no art’. খল্‌দুনের সঙ্গে অতদূর অগ্রসর না হলেও কিছ পথ হাঁটা ছাড়া উপায় থাকে না। কারণ, শরীরের অনাবৃত অংশ যেমন সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলে, শব্দও তেমন পুনঃপুন ব্যবহারে ম্লান, সত্তার আবিষ্কারে পঙ্গু হয়ে পড়ে। তখন নতুন আবিষ্কার ছাড়া শিল্পী নিরুপায়। অবিশ্যি এ দেশে এখনও কিছু আদিম কবি আছে, যারা এই সাধারণ জ্ঞান-বঞ্চিত। যুগধৃত অনুভূতির গায়ের কতটুকু আঁচড় দিতে কত কাঠখড় লাগে, তা এরা জানে না। এমনকি বহুদিনের পাদ্যিক অভ্যাস এবং মূর্খতার খাউজানির চোটে এই যুগে এপিক পর্যন্ত লিখে বসে; মহাকাব্যের সামাজিক পটভূমি এবং মানস-আকাশের সঙ্গে পরিচয় ছাড়াই। এক যুগের বাসনা-কামনার রূপকে শব্দ-অবয়ব দিতে কী সমিধ প্রয়োজন, এই আদমগোষ্ঠী, না—বরং আদিমগোষ্ঠী, তার কোনো খোঁজই রাখে না। আবদুল মান্নানের দুঃসাহস তাই অভিনন্দনযোগ্য। শিল্পের ক্ষেত্রে ভ্যাঁজর ভ্যাঁজর পুনরাবৃত্তির চেয়ে অসফল প্রচেষ্টাও ঢের বেশি কাম্য।

মান্নান আঙ্গিকের দিক থেকে পুরোপুরি পরাবাস্তবতাবাদী বা সুররিয়ালিষ্ট। চিত্রকল্পের মাধ্যমেই তার ভাবজগৎ নির্মিত। মান্নানকে ভুল বোঝাবুঝির তাই যথেষ্ট অবকাশ আছে। কিন্তু ইউরোপীয় কাব্যধারার সঙ্গে পরিচয় থাকলে, এমন হোঁচট খাওয়ার সম্ভাবনা কম। সংকুচিত পৃথিবীতে শিল্পের ভাববস্তু (content) হোক জাতীয়, আকার-প্রকার বা গড়ন (form) হোক আন্তর্জাতিক। গ্রাম্যতা সর্বতোভাবে বজর্নীয়। নতুন টেকনিক আমদানি কোনো অপরাধ নয়। শুধু প্রশ্ন, তার সাফল্য দেশি ঐতিহ্যে কতটুকু সুসঙ্গতি লাভ করেছে। মান্নান এই ক্ষেত্রে আশ্চর্য রকমে অনেকখানি সফল।

পূর্বে উল্লেখিত, চিত্রকল্প বা ইমেজই এই কবির মূল উপাদান। এজরা পাউন্ডের সংজ্ঞায় ফিরে আসা যাক : ‘An image is that which present an intellectual and emotional complex in an instant of time… It is vortex or cluster of fused ideas and is endowed with energy.’ কবিদের এই পন্থায় আশ্রয় নিতে হয়েছে যুগবোধের তাগিদে। আধুনিক কাব্য তথা এলিয়টের প্রপিতামহ র‌্যাঁবো এই ধারার প্রথম পথিকৃৎ। মহৎ শিল্পীর মতো তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, প্রাচীন কায়দার নতুন জগতের সম্মুখীন হওয়া যায় না। আধুনিক মানুষ আর-এক স্বতন্ত্র মানুষ। সে individual, ব্যক্তি। ব্যক্তিতান্ত্রিকতার প্রারম্ভ যদিও রেনেসাঁসের কালে, চারশো বছর ধরে তার চক্রাবর্তন শেষ হয়েছে। এই মানুষ বিশেষভাবে উত্তম পুরুষ। বিষয়ীগত বা মন্ময়ভাবে (Subjectively) অহঙ্কারী, অহং-পূজারী, নিঃসঙ্গ। বিষয়গতভাবে (objectively) বস্তু-বিশ্বের তরঙ্গে তরঙ্গে কভু ভাসমান, কভু নিমজ্জমান। চরম শ্রমবিভাগের ফলে বস্তুজগতের হদিস ঠাহর তার পক্ষে সম্ভব নয়। বস্তুর পরিমাপই মানুষের পরিমাপ। সম্পত্তি-দাঁড়িপাল্লায় ওজন হয় মানুষ। মধ্যযুগে তবু ব্যক্তির পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল। আজ তা-ও নিঃশেষ। জীবনধারার ছাপ তাদের ব্যক্তিত্ব-খোয়া (depersonalized) করে তোলে। ফলে অপর মানুষকেও সে আর মানুষ রূপে চেনে না। চেনে বস্তুরূপে। তার পরিণতি, সে নিজেকেও আর চেনে না। এমনকি নিজের চেতনার উপর সে আস্থাহীন। র‌্যাঁবোর জাগর চোখ এড়ায় নি। তিনি লিখেছেন, ‘My superiority is that I have no heart’ আবার অন্যত্র, ‘It is wrong to say to say I think, one ought to say I am being thought’। তখন অচেতন মনোরাজ্য শেষ আশ্রয়। ফ্রয়েড পরে এই পথ আরো প্রশস্ত করেন। লেভি ব্রুহলের মতো সমাজতান্ত্রিক ধুয়ো ধরেন: ন্যায়িক চিন্তা অপেক্ষা প্রাক-ন্যায়িক চিন্তা Prelogical ঢের বেশি শ্রেয়। কারণ, শেষোক্ত চিন্তা গভীর এবং অনেক ‘দূরাগত’। এই নৈরাজ্য বাইরের জগতেও কম প্রসারিত নয়।

ব্যক্তি থেকে উপজ্ঞার (instinct) দিকে ছোটো। যেহেতু ব্যক্তির মৃত্যু ঘটেছে। ‘আমি’ থেকে ব্যক্তি আমিত্বের ভাঙা ভাঙা টুকরোয় পরিণত। যেমন, প্রশাসকের কাছেও মানুষ আর মানুষ না। ফাইল। অথবা বড় জোর…. কেস। ঊনিশ শতকেই ইস্প্রেশনিষ্ট চিত্রশিল্পীদের কাছে মানুষ হয়ে পড়েছিল আলো আর রঙের ধ্যাবড়া দাগবিশেষ—যা অন্যান্য বস্তু থেকে স্বতন্ত্র কিছু নয়। কিউবিস্টদের বিন্যাস তো মানুষের চূর্ণচূর্ণ দশমিকায়িত রূপের প্রতিভাস। অন্যপক্ষ, আধুনিক রাষ্ট্র অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত। তার শক্তি পরিচালনার পন্থা এমন অপরোক্ষ, গোপন, নির্দয় অথবা বর্বর যে সাধারণ ব্যক্তিমানব সেখানে অসহায়। তার শরিকানা বা কণ্ঠ অতদূর পৌঁছায় না। হাজার সচেতনতা সত্ত্বেও সে অসহায় এই যন্ত্রদানবের সম্মুখে। এই দ্বৈততার চাপ চেতনার উপর ভয়াবহ। বর্তমান মানুষ যেন স্বর্গীয় সতীনাথ ভাদুড়ীর আশ্চর্য সৃষ্টি অর্ধ-মানব সেই ঢোঁড়াই—যার মগজে দৈনন্দিনতার প্রবাহ টুকরো টুকরো চিত্রকল্পের আকারে জায়গা পায়; তা অনুকরণের চেষ্টাও থাকে, কিন্তু ওই জীবনপ্রবাহের শরিক নয় সে। আধুনিক মানুষ স্বতন্ত্র জীব। কত জটিল, বিরোধময় সংবেদন-ছাপ না ডান্ডা—মার্কিন প্রেসিডেন্টের মুখে থুথু, এলিজাবেথের বিয়োনো ছা, ময়মনসিংহে শুয়োরের উৎপাত—এক সংবাদপত্র মারফতই কত টুকরো এসে ছিটকে পড়ে, যার প্যাটার্ন-সন্ধান অসম্ভব। নব্য মানুষের জগতও তাই ভগ্নাংশ। এই জীবনপ্রবাহের রূপদানে প্রাচীন রীতি অক্ষম। ব্যক্তিত্ব-খোয়া মানুষের ছবি কাফ্কার দুই উপন্যাস Trial এবং Castle আজও ভীতিপ্রদ দলিল। স্মারকলিপিতে তিনি যন্ত্রণার স্বাক্ষর রেখে গেছেন শিল্পমহিমার জয়গানসহ :  ‘Anyone who cannot come to terms, with his life while he is alive need one hand to ward off his despair over his fate- he has little success in this- but with his other hand he can note down what he sees among the ruins, for he his other hand he sees different ( and more) things than do others; after all, dead as is the real survivor. This assumes that he does not need both hands, or more hands than he has, in his struggle against despair.’ (Diary: page 394)


ছায়াচিত্রের কাছে আধুনিক কবি উমেদার। কারণ, তার ইমেজ চাই, চিত্রকল্প চাই।


আধুনিক ব্যক্তিমানবের রূপদানে র‌্যাঁবোর আঙ্গিক নতুন সম্ভাবনা এবং অপূর্ব প্রকাশভঙ্গির পথ খুলে দেয়। সাম্প্রতিক পৃথিবীর কাব্যধারার বিবর্তন তারই পরিণতি। আধুনিক ব্যক্তিত্ব-চিত্রণে ব্যবহার-ম্লান ভাষা অক্ষম। ভাষা ছিল এতদিন প্রত্যেয়ের (concept) বাহন। কিন্তু তা আর প্রত্যয়ের কাছে পঞ্চ-ইন্দ্রিয়সহ নিয়ে যায় না। প্রত্যয়ের সৃষ্টি চিত্রকল্পের মাধ্যমে। সুতরাং সেই উৎপত্তি-স্থলে ফিরে যাও। প্রয়োগবাদীদের (Pragmatist) মধ্যমণি রাসেল যেন তার দার্শনিক তথ্য জোগান। জ্ঞান সংবেদনের অবরোহ বা deduction, তবে চিত্রকল্প মানসিক। আর ঘটনা—চিত্রকল্প যা ছাপ, তা জড়-জাগতিক ব্যাপার। উনিশ শতক থেকে বিশের তৃতীয় দশক পর্যন্ত চিত্রশিল্পীরা বিষয়বস্তুর জন্য কবিদের শরণাপন্ন হতো। ওমর খৈয়ামকে কতজন না এঁকেছে। রবীন্দ্রনাথকে নন্দলাল, রমেন চক্রবর্তী, অসিত হালদার প্রমুখ কেউ বাদ দিয়েছে বলে জানা যায় না। কিন্তু আধুনিক যুগে স্রোত ফিরে গেছে। আজ কবিরা চিত্রশিল্পীদের দ্বারস্থ। শুধু চিত্রশিল্পী নয়, ছায়াচিত্রের কাছে আধুনিক কবি উমেদার। কারণ, তার ইমেজ চাই, চিত্রকল্প চাই। আদিম মানুষ ভাষা-গঠনের আগে ছবি আঁকত। তার বহু পরে আসে লিখন-পদ্ধতি। আধুনিক কবি উৎপত্তি-স্থলে তার আঙ্গিকের প্রেরণা পায়। মনে হতে পারে, সভ্যতার ক্ষেত্রে এ এক পশ্চাৎ-অপসরণ। মোটেই না। অতীতের ভাণ্ডার মানবসভ্যতার অনাত্মীয় নয়। প্রকাশের তাগিদেই কবি সেই পথ-অভিমুখী।

অবিশ্যি একথাও স্বীকার্য, সম্মুখে যখন অগ্রগতির সামাজিক বাধা থাকে, তখনই শুরু হয় কবির অন্তর-পরিব্রজনা। আধুনিক কবি অহরহ বহু দেওয়ালের সম্মুখীন। অপূর্ব সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে মান্নান সোচ্চার :

জ্যোৎস্না ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে দরোজায়, সব দরোজায়, আমার চারিদিকে যতোগুলি দরোজা আছে সময়ের নীলিমার পাতালের; জ্বলছে গাছসকল সবুজ মশাল; বাস একটি নক্ষত্র, পুলিশ একটি নক্ষত্র, দোকান একটি নক্ষত্র: আর সমস্তের উপর বরফ পড়ছে।—এ রকম দৃশ্যে আহত হয়ে আমি শুয়ে আছি পথের উপর, আমার পাপের দু চোখ চাঁদ ও সূর্যের মতো অন্ধ হয়ে গেল, আর যে-আমার জন্ম হলো তোমাদের করতলে মনোজ সে অশোক সে: জ্যোৎস্না তার কাছে ভূত কিন্তু একটি গানের উপর, দরোজা তার কাছে পুলিশ কিন্তু একটি জন্মের উপর, মৃত্যু তার কাছে দোজখ কিন্তু একটি ফুলের উপর ॥

[অশোক-কানন]

কাব্যের সূত্রপাত-বিন্দুতে কবির মন আর ফিরে আসে না। আরেক জগতে পৌঁছায়। তাই বলা হয় কাব্য পরিবশে-অতিক্রমণতার হাতিয়ার। মান্নানের আঙ্গিক লক্ষণীয়। প্রথমে সিনেমার মন্টেজের কায়দা। শেষে ক্যামেরার ট্রিপল এক্সপোজার এবং (Dissolve) ডিজল্‌ভি পদ্ধতি। অনেকের কাছে এই কবিতা দুর্বোধ্য মনে হতে পারে। হেতু, আঙ্গিক এবং এমন ভাষার সঙ্গে অপরিচয়। জ্যোৎস্না চিরাচরিত প্রতীক : শান্তির, শুভ্রতার, স্নিগ্ধতার। ভূতের রঙ শুধু কালো নয়, ভয়াবহ। দুই বিপরীত পাশাপাশি উপস্থাপনার পর দ্বান্দ্বিক পন্থায় কবি নিজের ব্যক্তব্যের পথ পরিষ্কার করে। শেষে যখন সমন্বয় ঘটে তখন জ্যোৎস্না, ভূত, রোজা, পুলিশ—সবই কেন্দ্রবিন্দু থেকে সরে অন্য রূপ পায়। পরিবেশ-দীর্ণ কবির আর্তনাদ জীবনের ষ্পর্শ লাভ করে। ডিলান টমাস একবার বলেছিলেন যে প্রথম ইমেজকে তিনি পরবর্তী ইমেজ বা চিত্রকল্প দিয়ে ধ্বংস করেন সমন্বয়ের জন্য। অবিশ্যি এখানে বাঁধা-ধরা কোনো নিয়ম নেই। আধুনিক কবি-সত্তার রূপ-উদ্‌ঘাটনে নানা শিল্পের টেকনিকের শরণাপন্ন হয়। শামসুর রাহমান সিনেমার ক্লোজ-আপ প্রয়োগে সিদ্ধহস্ত—তা সে ভিখিরি ছেলের জীবন-ট্র্যাজেডি কি বাবার প্রতিকৃতি যা-ই আঁকুক।

বিশ শতকের মানুষের আবেগের আকার ফুটিয়ে তুলতে সম্প্রতি কবির শিরঃপীড়া এবং দায়িত্ব কোনোটা কম নয়। ভাববস্তুর বিরোধ মেটানো; ভাবকে অনুভূতিতে রূপান্তরণ, চলতি কথার ছন্দ এবং কাব্যছন্দের বিবাদ-মীমাংসা (এই ক্ষোভে শামসুর রাহমান অদ্বিতীয়), উচ্চ-তুচ্ছের ঘটকালি, প্রগাঢ়তার জন্য অসংলগ্ন স্বপ্ন-ছবির মতো বিভিন্ন চিত্রকল্পের বুনন, সজ্ঞান ও নির্জ্ঞান মনের দ্বন্দ্ব, যুগের ক্ষোভ, পাঠকের বাঙ্ময়-বিস্তার, ট্রাজেডির আভাস-প্রদান, নির্দ্বন্দ্ব প্রাণোচ্ছলতার মন্ত্রোচ্চারণ, পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন—এমন বহুতর সমস্যার সম্মুখীন আধুনিক কবি। সেজন্য ফর্মের সন্ধান যেমন অপরিহার্য, তেমনই ভাববস্তুর। কবির আঙ্গিকের যজ্ঞাশ্ব তাই দিগ্বিদিক হন্যে, দৌড়-উন্মাদ। স্বভাবকবি এবং অন্ধকারে তিরন্দাজির দিন খতম। কাব্য জীবনেরই আরেক রূপ। জীবন সমাজ-উদ্ভূত। তার মধ্যে রাজনীতি, অর্থনীতি, অতীত ও বর্তমানের ভাবজগৎ, ব্যক্তির নিজস্ব-নির্মাণ আশা আকাঙ্ক্ষা অভীপ্সা—সব ওতপ্রোত জড়িত। কাব্যবিচার তাই জীবনের বিচার। কাব্যসৃষ্টি প্রাণদাত্রী চেতনার সৃষ্টি। এর বিস্মৃতি শিল্পীর পক্ষে আত্মহত্যার সামিল। পরিবেশের সামগ্রিকতার প্রতি অচৈতন্য জড়ত্ব-প্রাপ্তির নামান্তর। আদিম মানুষের জগৎ ছিল বিষয়ীগত বা মন্ময়। তার নিজের পদ, চরণ তার গানের কাব্যেরও পদ বা চরণ। সভ্য মানুষ সে-নাম আজও বদলায় নি।


স্বাধীন অনুষঙ্গ আদৌ স্বাধীন নয়। নিউরোটিক নার্ভের ক্রীতদাস।


সুখের বিষয় আবদুল মান্নান অনেকখানি সচেতন কবি। সবখানি নয়। পূর্বোদ্ধৃত কবিতায় ‘মনোজ’ এবং ‘অশোক’ শব্দ লক্ষণীয়। সুররিয়ালিষ্টরা মনে করত নির্জ্ঞানের গাহনই প্রকৃত স্বাধীনতা। মান্নানের জ্ঞাতার্থেই বলা যায়, ফ্রয়েডীয় বিশ্লেষণের পর কেউ আর তা স্বীকার করে না। স্বাধীন অনুষঙ্গ আদৌ স্বাধীন নয়। নিউরোটিক নার্ভের ক্রীতদাস। এক ভাষ্যকারের ভাষায়: ‘They are subject to iron determinism of unconscious necessity. Distortion of instinctive derives called complexes inexorably force fantasy to follow a mean and narrow groove.’

শব্দের ক্ষেত্র ধরা যাক, পরাবাস্তবতাবাদীর কাছে বাচ্যার্থে আদৌ থাকে না। কারণ, বাস্তবের সংস্পর্শ-রহিত। ব্যঙ্গার্থ এখানে ধ্বনিতে পরিণত হয় না। কেবল উপজ্ঞার স্পর্শে নানা অনুষঙ্গে ভেসে বেড়ায়। উইন্টগেস্টাইনের কল্যাণে জানা গেছে, শব্দার্থের গতি একই সময়ে কেন্দ্রগ এবং কেন্দ্রাতিগ। এই দ্বন্দই ভাবমণ্ডলের আবহ রচনা করে। কিন্তু সুররিয়ালিষ্ট কাব্যার্থকে ছুটি দিয়ে শুধু অনুষঙ্গের পেছনে ঘুরে বেড়ায়। এই স্বাধীনতা আসলে দাসত্ব। পূর্বোক্ত মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তবু দক্ষ শিল্পীর কাছে এই দাসত্ব কখনো কখনো বেশ কার্যকরী।

মান্নান যেখানে সচেতন, তার কাজ জোনাকির মতো অন্ধকারে স্বতই প্রদীপ্ত। বর্তমান প্রতিযোগিতা-জর্জর, দুদ্দাড়, যান্ত্রিকতাময়, মানবিকতাশূন্য জীবনবোধহীন সমাজের রণন :

জিরাফের বঙ্কিম পদ্ধতি এই রক্তগোলাপের দৃশ্যাবলিকে অক্লম তরুর ভিতর সীতার মতো হরণ করে নিয়ে যেতে থাকে : যখন এই অগ্নির শহরে দুষ্ট পানির মতো বাণিজ্য করে আত্মা, মাংসাশী এই সময়ে ছড়ানো-ছিটানো ইতস্তত সুন্দর কবিতার লাইনের মতো দিকে দিকে ফলে ওঠে কনুইপাশে মানুষটিকে ঠেকিয়ে;—হায়, সবাই কেবল নিজের পাশের মানুষটিকে ঠেলে দিতে হয়ে ওঠে তাপের শীর্ষদেশ, আত্মার দোকানদার, স্বভাবের কুচকাওয়াজ। আমরা প্রত্যেকে পাশের প্রতিভাবান পাগলটিকে হটিয়ে দিচ্ছি পিছনে; আমরা একজন আরেকজনের পিঠে চড়ে বসে আসন্ন কিন্তু চির-অনাগত এক সার্কাসের ভোজে খাচ্ছি সূর্যদেবতাকে—চেটে, চুষে, আঁচড়ে, কামড়ে, কাৎকরে, সংকেতে, শক্তিতে, ফাঁদ পেতে ॥

[টুকরো টুকরো মৃত্যু]

উদ্ধৃতি থেকে, মান্নান অনেকের কাছে উদ্ভট কবি মনে হতে পারে। তাই ঈষৎ টীকার প্রয়োজন। আজকাল সমাজে জাতে-ওঠার অক্লান্ত উদ্যম সচরাচর চোখে পড়ে। নিরাপত্তার মোহে বহু মানুষ আচ্ছন্ন। লেমার্কীয় বায়োলজির জের-সহ কবি জিরাফের গলার চিত্রকল্প টেনে আনে। জিরাফ গলা বাড়াচ্ছে। যেহেতু বৃক্ষের অবস্থান উচ্চে। এই প্রতিযোগিতায় সৌন্দর্য, যার প্রতীক রক্তগোলাপ, অদৃশ্য হতে থাকে। রামায়ণের অনুষঙ্গ টেনে কবি চৌর্যবৃত্তির আরেক মাত্রা বাড়িয়ে তোলে। প্রতিযোগিতা-ঊষর সমাজে চৌর্যবৃত্তিই সম্ভ্রান্ত ব্যাপার। মুনাফা-সুদ, খাজনা—একই বৃক্ষের বিকৃত শাখা। পরের চিত্রকল্পগুলো আরো নিটোল সজ্জা। ত্রস্ত শহর বা অগ্নিমূল্য শহর। যেকোনো অর্থে কবি সফল। এই সমাজের আর এই রূপ—কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ। এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের প্রাঙ্গণে তার ছবি স্পষ্ট। একজন চাকরি পেলে আরেকজন চাকরি পেতে পারে না। তোমার প্রতিযোগিতাকে কনুই দিয়ে অন্তত ঠেকাও, ব্যবসাক্ষেত্রে এই চেহারা। কবির ভাষায়, মানুষ তাপের শীর্ষদেশ। ব্লাডপ্রেশার, নির্দয়, রুক্ষ মেজাজ—সব কিছু এক শব্দে ঠাসা। স্বভাবের কুচকাওয়াজ বহু অভিধায় পূর্ণ। অরণ্যচারী জন্তু, প্রবৃত্তির দাস, নিউরোটিক—যেকোনো অর্থই পাঠক গ্রহণ করুক, অনুভূতি জানান দিতে কসুর করবে না। মানুষের পিঠে-চাপা মানুষ সার্কাসের মহড়াদাতা। শেষে এক বিরাট শেভিয়ান ব্যঙ্গের হাসি হেসে যায় কবি। সূর্য সকল তেজ বা এনার্জির উৎস। সেই তেজের উৎপত্তিস্থলই আমরা ধ্বংস করছি। নগরসভ্যতার প্রতি শ্লেষের এমন সুন্দর চিত্রকল্প রচনাশক্তির পরিচয়। সকলেই নিরাপত্তার পেছন-ধাওয়া। দায়িত্ব-গ্রহণের দিকে কারো লক্ষ্য নেই। অবক্ষয়ের বিকারের এমন সুষ্ঠু চিত্র-পরিবেশনের জন্য মান্নান বহু সাধুবাদের দাবিদার। অনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির জগতে অপচয়ের অন্ত নেই। সকল তেজের ভাণ্ডারি মান্নানের সূর্য তাই ‘কালো রেলগাড়ি টেনে নিয়ে যায়’। আরো ব্যঙ্গচিত্র আছে। পল্লীকবি কিন্তু নগরবাসী ‘যে পাড়াগাঁয়ে আমি স্বপ্নে ছাড়া আর-কখনো যাই নি।’ ‘নিজের ভেতরে জলে নেবে গিয়ে সাঁতার জানি না।’

বর্তমান সমাজ-জীবনের অপচয়, অর্থহীনতা (‘পাগল এই রাত্রিরা’), অস্থিরতা (‘সমস্ত ভাসান দিলাম সমস্ত উড়াল’), জ্বালা-যন্ত্রণা (‘টুকরো টুকরো মৃত্যু’), শ্রেয়োবোধের প্রতি অবজ্ঞা ও বিবমিষা মান্নানের কাব্যের উপজীব্য। জ্যোৎস্না বহু জায়গায় প্রতীকরূপে ব্যবহৃত। কিন্তু উধাও-মূল্য। জ্যোৎস্না : ‘জল্লাদের ডিমের মতো চুলহীন’। অনেকে অশ্বডিম্ব সহ্য করে নন্সেন্স অর্থে। কিন্তু এখানে হোঁচট খাবে। খাওয়া উচিত নয়। কবি-কৃতির সঙ্গে পরিচয় ছাড়া কাব্যের আস্বাদ পুরোপুরি মেলে কী? চিত্রকল্পের ব্যবহার সম্পর্কে পাঠকের সচেতনা প্রয়োজন। পুকুরে-বিলে জেলে-গৃহস্থ খড়ের মুরত দিয়ে ভোঁদর তাড়ায়। কারণ, ভোঁদড়েরর কাছেও ইমেজের মূল্য আছে।


চিত্রকল্প ব্যবহারে মান্নান বিপরীতের সমাবেশে বেশি উৎসাহী। কিন্তু সব সময় তার উদ্দেশ্য লক্ষ্য ভেদ করে না।


তাছাড়া, সঙ্গতিহীন, দুদ্দাড়-অস্থির, নানা সংগতিহীন আধুনিক জীবনকে কথাবন্দি করা অত সহজ নয়। র‌্যাঁবোর কথা পূর্বে উল্লেখিত। চিত্রকল্প প্রধানত চাক্ষুষ, অ-চাক্ষুষ। কবির ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল কোনো দিকে জোর বেশি দেওয়া উচিত। অনেকে দুয়ের মিশ্রণ ঘটান অনুপানসহ। অবিশ্যি সবই কবির চাহিদা অনুযায়ী। স্মৃতি থেকে কয়েকটা চিত্রকল্পের উদ্ধৃতি দেওয়া গেল :

১. পবর্ত চাহিল হতে বৈশাখের নিরুদ্দেশ মেঘ
–  রবীন্দ্রনাথ

২. হৃদয়ের নদী চাঁদ হয়ে বয়ে যায়।
–  আলী আহসান

৩। Dawn breaks behind the eyes
–  Dylan Thomas

৪। রোঁয়া-চটা কুকুরের সাহচর্যে গ্রীষ্মের গোধূলি
–  শামসুর রাহমান

লক্ষণীয় : ১—চিত্রকল্পে বিপরীতের সমাবেশ। কিন্তু জোর চোখের উপর নয়। ২—মিশ্রিত ইমেজ। আসমান-জমিনের মিতালি ঘটে। শেক্সপিয়ার শব্দে যা করতেন, ‘And in this underlie world draw they breath in pain, এখানে নিম্নরেখ শব্দ উচ্চারণ নিশ্বাসে-সুখসাধ্য নয়। ৩—ডিলান টমাসের ইমেজ কত সহজ। কিন্তু আদিমতা-জ্ঞাপক এমন ছবি শক্তিশালী কবি ছাড়া কারো পক্ষে গঠন কঠিন। পৃথিবীর প্রথম প্রত্যুষের সামনে যেন আমরা দাঁড়িয়ে। ৪—শামসুর রাহমানের চোখের উপর জোর বেশি। কিন্তু তার স্থায়িত্বকাল বেশি নয়। অতীতের সব অনুষঙ্গের বিপরীত সমাবেশে কবি ধ্বংস-প্রয়াসী। নতুন চেতনাই শুধু এমন নির্মাণক্ষম প্রজ্ঞার পরিচয়। বিস্তারিত আলোচনার পরিসর নেই এখানে। চিত্রকল্প ব্যবহারে মান্নান বিপরীতের সমাবেশে বেশি উৎসাহী। কিন্তু সব সময় তার উদ্দেশ্য লক্ষ্য ভেদ করে না। তখন সে স্বভাব-কবি। তার সুদীর্ঘ কবিতা তেমন সফল নয়। গুটিপোকার মতো, চিত্রকল্প বানানোর নেশায় নিজের জালে সে আটকা পড়ে যায়। বাক্য তখন হয় বিবক্ষা। ইমেজ তৈরি সহজ। কিন্তু ভাববস্তুর সঙ্গে সমমন্বয় না ঘটলে তা ব্যর্থ। আবার পাউন্ড স্মর্তব্য : ‘It is a vortex or cluster of fused ideas and is endowed with energy.’

অনেকে কবির বক্তব্যে লজিক খুঁজতে পারেন। বলে রাখা ভালো, আধুনিক কবি স্মৃতির দাম দেয়, অচেতন মনোরাজ্যের মূল্যও সে ধুলোয় ছিটিয়ে দিতে পারে না। কাব্যের জটিল রসায়নে কিছুটা irrationality (অযৌক্তিকতা) বর্তমানে সমঝদার সমালোচকের কাছে স্বীকৃত ব্যাপার। শব্দতত্ত্ব গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ নিজের স্বভাবজ প্রজ্ঞার স্বাক্ষর রেখে যান, ‘ভাষার শব্দগুলো চলে অভিধানের আঁচল ধরে। এই গোলামি ঘটেছে কলিযুগে। সত্যযুগে শব্দগুলো আপনি উঠে পড়ত। সঙ্গে সঙ্গে মানে আনত টেনে।’ আধুনিক কবিরা সেই সত্যযুগে ফিরে যেতে চায়। মান্নান এই দলে পড়ে। ‘ছিঁড়ে ফ্যালো ব্যাকরণ।’ তাছাড়া কাব্যের জগৎ কিছুটা স্বপ্নের জগৎ, যেহেতু ইন্দ্রজালের সহোদর। স্বপ্নের ঘটনার মধ্যে সব সময় যুক্তি খোঁজা চলে না। ‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি অভিনন্দন’, এক কবিতায়, অর্ধশতাব্দী আগে অক্ষয়কুমার বড়াল লেখেন :

অর্ধ-নিদ্রা-জাগরণে ধরা স্বর্গচ্ছবি
জীবনে স্বপন-ভ্রম, ফুটে রবি-কবি।

কাব্যের জগতে স্বপ্নিলতার স্পর্শ আজ অনস্বীকার্য। মনোবীক্ষণবাদীরা স্মৃতি, অচেতন, অবচেতনের রাজ্য তুলে ধরে এই দিক আরো জোরদার করেছে। অভিজ্ঞানমশকুন্তলা-য় কালিদাস—

রম্যানি বীক্ষ্য মধুরাংশ্চ নিশ্যম শব্দান্
পর্যুৎসুকো ভবতি যৎ সুখিতোহপি জন্তুঃ।
তচ্চেতনা স্মরতি নূনবোধ পূর্বং
ভাবস্থিরানি জননান্তর সৌহৃদ্যানি।

রম্য দৃশ্য দেখিয়ে মধুর শব্দ শুনিয়ে সুখাবস্থিত প্রাণীর যে উৎকণ্ঠা হয়, তার কারণ নিশ্চয় অজ্ঞাতসারে তার চিত্তভাবে স্থিরপ্রাপ্ত গতজন্মের ভালোবাসা স্মরণ করতে থাকে।

ইয়ুং তো এখানে তাঁর Collective unconscious ‘কৌমী নির্জ্ঞানতা’র এক দলিল খুঁজে পাবেন। ভালো কবিতার আবেদন বোঝার আগেই মর্মে পৌঁছায়। এককালে এলিয়টের এই কথার বহু সমালোচনা হয়। আজ কেউ তা অস্বীকার করে না। আধুনিক কবিদের পড়ার জন্য কিছু মনেরও প্রস্তুতি প্রয়োজন।

জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ গ্রন্থে অনেক চিত্রকল্প আছে। সব সফল নয়। তবে কবি-কৃতির স্বাক্ষর, যদিও মান্নানের কাব্যের ডাঙায় উঠতে ঈষৎ দেরি থাকতে পারে। সব কবিতার সুর বড় নাটকীয়। সুরতাং বৈচিত্র্যের দিক থেকে খর্বতা আছে। রসের ক্ষেত্রে প্রান্তিক উপযোগ (মার্জিনাল ইউটিলিটি) তত্ত্ব সর্বৈব প্রযোজ্য। পুনরাবৃত্তি শিল্পের হনন-আয়োজন। অবিশ্যি নাটকীয়তার জন্য মান্নানের একটি প্রেমের কবিতা অপূর্ব। ‘বেগানা সেরেনাদ-২’। দুই হাঁসের চক্রাবর্তন মারফত এখানে বক্তব্য যেমন ষ্পষ্ট, তেমন জোরদার করেছে কবি।

কোথাও কোথাও পরিবেশসচেতন, অথচ সংবেদনশীলতায় বিত্তবান, সভ্যতার গ্লানিদীর্ণ স্রোতের হদিস-সন্ধানী, সত্যিকার কবিচিত্তের অধিকারী মান্নান এখানকার কাব্য-জগতে এক উজ্জ্বল উদয়। তার সাধনার বিবর্তন সাগ্রহে লক্ষ করব। কবি যখন সমাজ-সমুদ্রের তরঙ্গ-শীর্ষ সাঁতারু তখনই সে আকারসর্বস্বতার (formalism) খর্পর-মুক্ত এবং সর্বজন-সহচর।

[১৯৬৮]

সংশ্লিষ্ট পোস্ট : আবদুল মান্নান সৈয়দের বাছাই কবিতা