হোম নির্বাচিত ‘দূরের হাওয়া’ নিয়ে

‘দূরের হাওয়া’ নিয়ে

‘দূরের হাওয়া’ নিয়ে
491
0

আজ থেকে তিন দশক আগে ১৯৮২/৮৩ সালে ইংরেজি কবিতা পড়ে সেসবকে বাংলাভাষায় গ্রেপ্তার করবার বাসনা জেগেছিল মনে। তখন ভালোমতো না জানতাম ইংরেজি, না জানতাম বাংলা (এখনও সেভাবে জানি না)। তাঁতির ফার্সি পড়ার খায়েস তবু তাতে কমে নি; দিনে দিনে তা বেড়েছে কেবল। ‘মোগল-পাঠান হদ্দ’ হলেও অনুবাদ নামের কাণ্ড-অকাণ্ড চলছেই। পঙ্গুর গিরিলঙ্ঘনের ইচ্ছা হলে কে তাকে থামায়! নিষেধাজ্ঞা যেহেতু নেই, সে-সুবাদে এরই মধ্যে নানান দেশ-মহাদেশের আর নানান ভাষার বহুল কবিতা অনুবাদ করে ফেলেছি। অনুমান করি সংখ্যাটা চারশো সাড়ে চারশোর কম হবে না।

মনে পড়ে কবিতা অনুবাদে হাত দিয়েছিলাম কাঁচা বয়সে। যে কবিতা দিয়ে শুরু তা ছিল  Ralph Hodgson—‘Time, You Old Gypsy Man’। কবিতাটির প্রথম চারটি চরণ মনে দাগ কেটেছিল খুব:

‘Time, You Old Gypsy Man
Will you not stay,
Put up your caravan
Just for one day?’

আনকোরা সেই অনুবাদ লজ্জায় কাউকে দেখাইও নি। এমনকি বন্ধুদেরও—পাছে ওরা কেউ মুখ টিপে হাসে!

এই কবিতা অনুবাদ করার পেছনে অন্তত তিনটে কারণ ছিল। এক. কবিতার অন্তর্নিহিত ভাবটা বুঝতে খুব একটা বেগ পেতে হয় নি। দুই. ইংরেজিটাও ছিল আমার্ ইংরেজি-জ্ঞানের দৌড়ের সীমার মধ্যেই। তিন. আমার জীবনের সঙ্গে জিপসিদের, সদা-ভ্রমণশীল আর ভবঘুরে মানুষদের জীবনের কত না আশ্চর্য মিল!

সত্তুর দশকের মাঝামাঝিতে বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিলাম। কখনো আর সেভাবে বাড়িফেরা হয় নি। স্টেশনে স্টেশনে ঘুরে, প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চিতে ঘুমিয়ে, আজ এর কাল ওর বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে, কখনো লজিং থেকে, তারপর আবারও দূরের কোনো গ্রামে-শহরে ‘আজনবি’ হ’য়ে হাজির হওয়াটা ছিল অভ্যাস; সেইসঙ্গে ললাটলিখনও। এরই মধ্যে ১৯৮২ সালে মৌলভীবাজার সরকারি কলেজে ভর্তি হবার পর বলা-যাবে-না-এমন এক কারণে আমি আর সহপাঠী আবদুল ওয়াহিদ (যে এখন নিজ এলাকার এক স্কুলের হেডমাস্টার মশাই) শহর থেকে মাইল পাঁচেক দূরের গা-ছমছম কালেঙ্গা পাহাড়ের দুর্গম গভীরে ঠাঁই গেড়েছিলাম। শহরে যেতাম দীর্ঘ পথ হেঁটে সকালে। ফিরতাম রাতে, কখনো-কখনো অনেক রাতে; কখনো বৃষ্টির অত্যাচার সয়ে বা চাঁদকে মাথায় করে গভীর অরণ্যের ভেতর দিয়ে আমাদের বন্য ডেরায়।

কলেজে অন্যসব শান্ত-সুশীল ছেলে-মেয়েরা যখন ক্লাসে মগ্ন, আমি তখন ছুটির ঘণ্টা বাজার আগ পর্যন্ত কলেজের সমৃদ্ধ পাঠাগারে বইয়ে নাক ডুবিয়ে (তিনবেলা খাবার না জটলেও কপালে বই ঠিকই জুটতো!)। কলেজ ছুটির পর বিকেলে পাবলিক লাইব্রেরিতে গিয়ে আবারও বইয়ের পাতায় ডুব। কত বিচিত্র সেসব বই। বেশিরভাই পুরনো দিনের। আর সেসবের বেশিরভাগই ক্লাসিক। বুঝে না বুঝে যা যা পড়তাম সেসবের মধ্যে ইংরেজি বইয়ের সংখ্যাও নেহায়েত কম ছিল না। বই পড়ার পাশাপশি পাবলিক লাইব্রেরির শান বাঁধানো ঘাটে ইয়ার বন্ধুদের সঙ্গে চলত আড্ডা। আড্ডাসঙ্গীদের মধ্যে ছিল আমার নিত্যসঙ্গী আবদুল ওয়াহিদ ছাড়াও কবি-গল্পকার আকমল হোসেন নিপু, ছড়াকার আবদুল হামিদ মাহবুব, লাইব্রেরিয়ান কাম সবার কমন বন্ধু সজলসহ অনেকে; কালেভদ্রে রাজনগরের বাসিন্দা কবি মহসীন বখতসহ অনেকেই যোগ দিত সে আড্ডায়। এভাবেই তলে-তলে মনে-মনে ‘পাগলের সুখ’ নিতে নিতে অনেক দূর।

ঢাকায় আসার পর ৯০ দশকের গোড়ায় হাত খুলে অনুবাদ করেছি বিভিন্ন দৈনিকে, সাময়িকীতে ও লিটল ম্যাগে। সেসবের সিংহভাগই আজ লাপাত্তা। আগের করা অনুবাদের মধ্যে খুঁজে পাওয়া গেছে মাত্র গোটা সত্তরটি। ২০১৬-র বইমেলার মাস তিন/চার আগে চৈতন্য প্রকাশনের কর্ণধার রাজীব চৌধুরীর সঙ্গে অনুবাদ কবিতার একটি মোটামুটি ঢাউস বই করবার পরিকল্পনা হলো; তখনও নিশ্চিত ছিলাম না কী করব কিভাবে করব। হাতে সময় এত কম! একটু-একটু করে কাজ চলছিল। পরে দেখা গেল সংখ্যাটা আড়াইশ ছাড়িয়ে গেছে। তখন রাশ টানতে হলো। কারণ, প্রত্যেক কবির পরিচিতি ও ভূমিকা যোগ করলে কলেবর যা দাঁড়াবে, তা রীতিমতো থান ইট। অগত্যা ৫০টার বেশি কবিতা বাদ। রাখা হলো ২০০ কবিতা। বিভিন্ন ভাষা ও ভূগোলের, বিভিন্ন সময়ের ৫৩ জন কবির।

এই ৫৩ জন প্রাচীনকাল থেকে আধুনিক কালপরিসরের। প্রাচীন ও আধুনিক গ্রেকো-রোমান কবিতা যেমন আছে এতে, তেম্নি আছে বিভিন্ন সময়কালের ফরাসি, জার্মান, স্প্যানিশ, রুশ, ইংরেজি, সুইডিশ, আরবি, স্লোভাক ও পোলিশ কবিতা। এই ৫৩ জনের মধ্যে সাফো, ওভিদ, প্রপারতিয়াস, কাভাফি, এলিয়ট, ইয়েটস, হাইনে, বোর্হেস, লোরকা, নেরুদা, ফ্রস্ট, আরনল্ড, কঁকতো, এলুয়ার, ট্রান্সট্রোমার, আদুনিস, কাব্বানি, গ্রাস, পাস, প্লাথ, আখ্‌মাতোভা, হিউজ, ব্লেইক, পাউন্ডসহ যাদের কবিতা নেওয়া হয়েছে, তাঁরা একেকজন বিশ্বকবিতার দিকপাল।

আবার, যেসব কবিতা বাছাই করা হয়েছে সেসবের একটা বড় অংশ কালোত্তীর্ণ; সেইসঙ্গে নানা কারণে বহুল পঠিত-আলোচিত ও দুনিয়ার প্রায় সকল ভাষায় অনূদিত। ধরা যাক, ম্যাথু আরনল্ডের (Mathew Arnold) ‘ডোভার বিচ’ (Dover Beach) কবিতাটির কথা। প্রায় আড়াই শ বছর ধরে আলোচিত এই কবিতা, আলোচক-সমালোচকেরা কোটি কোটি পৃষ্ঠা ব্যয় করেছেন এর পেছনে। আবার ধরুন, এলিয়টের (T. S. Eliot) ‘জে. আলফ্রেড প্রুফ্রকের প্রেমগান’ (Love Song of J. Alfred Prufrock)  কবিতাটির কথা (কবিতা হিসেবে যা ঢের বেশি পঠিত-আলোচিত ‘প’ড়ো জমি’ কবিতাটির চেয়ে কাব্যগুণে শ্রেয়তর); বা, ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার (Federico Garcia Lorca)  ‘ইগনাসিও সানচেস মেহিয়াসের জন্য বিলাপ’ ( Lament for Ignacio Sanchez Mejias) নামের কবিতাটির কথা। যতদূর জানি, স্প্যানিশ ভাষার দীর্ঘতম কবিতা বলে গণ্য করা হয় একে। উল্লেখযোগ্য তালিকায় এরকম আরো কয়েক ডজন কবিতা আছে এই বইতে; সেসব কবিতা বিশ্বকবিতার রথকে এগিয়ে দিয়েছে অনেকখানি সামনের দিকে।

এই বইয়ের ২০০ কবিতা নানা যুগের, নানা ভাষার বিকাশের চিহ্ন ও অভিজ্ঞান যেমন বহন করছে, তেম্নি নানা ভঙ্গি, ঘরানা, জেনর, আন্দোলনের স্বর, নিশ্বাস ও উত্তাপ লেগে আছে এদের দেহে আত্মায়। কত যে বিচিত্র এরা ভাবে ও ভঙ্গিতে! কত না রঙ-রূপ-গন্ধ ও গরিমা!

এবার আসি কবিতার অনুবাদের সমস্যা প্রসঙ্গে। একটা ধারণা বেশ জোরালো, কবিতার অনুবাদ আসলে হয় না। মার্কিন কবি-সমালোচক রবার্ট ফ্রস্ট বলেছিলেন কথাটা: ‘অনুবাদে যা হারিয়ে যায় সেটাই কবিতা’ (“Poetry is what gets lost in translation”) । মানেটা দাঁড়ায়, কবিতার অনুবাদ করার পর টিকে থাকে কেবল দেহ ও আত্মার ছাইভস্ম বা নিরেট কঙ্কালটুকু। কারণটাও স্পষ্ট। ভাষার সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি অনুবাদকের সীমাবদ্ধতা, ক্ষেত্রবিশেষে অনুবাদ্য কবিতাটির অনূদিত হবার পথে অসম্ভাব্যতা, যে ভাষায় অনূদিত হবে সে ভাষার দূরত্ব ও শব্দভাণ্ডারের ঊনতা।

আর ফ্রস্ট যা বলেছেন তা অন্যভাবে অনেক আগে বলে গেছে ইতালীয়রা: ‘‘অনুবাদক বিশ্বাসঘাতক’’ –‘‘Traduttore, traditore: Translator, traitor.’’

কথাটা তারা সংক্ষোভে বলেছিল ফরাসিদের লক্ষ্য করে। এর কারণও ছিল। অনেক ফরাসি অনুবাদক দান্তের (Dante)  ‘দিভিনা  কোম্মেদিয়া’ (la divina commedia বা Divine comedy) অনুবাদ করতে গিয়ে দান্তের কবিতার সৌন্দর্য, গীতলতা, ওজস্বিতা ও এর ছন্দ ও আঙ্গিক কাঠামোর হানি করেছিলেন। পাশাপাশি অর্থ থেকেও সরে গিয়েছিলেন অনেক দূর।

তাহলে কি ব্যাপারটা এমন যে, কবিতার অনুবাদ এক অলীক বস্তু? এজন্যই ফ্রস্টের মতো আরো অনেকেই সংক্ষুব্ধ ইতালীয়দের মতোই বলতে চান: “Everything is translatable except poetry, because it is the very form, the very phonetic quality of a poem in a language which makes a poem.”

হ্যাঁ, অনুবাদে, বিশেষত কবিতার অনুবাদে, অনেক কিছুই হারায়; হারায় ভাষিক, ভৌগোলিক, নান্দনিক, সাংস্কৃতিক আর সাঙ্গিতিক বৈশিষ্ট্য ও উপাদান। হারাধনের দশটি ছেলের মধ্যে যে কয়টি টিকে থাকে, সেটাই তাহলে অনুবাদ? বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হয়তো তা-ই। কিন্তু তাই বলে তো অনুবাদ থেমে থাকে নি বা থাকবে না। যদি তা-ই হতো তাহলে বিভিন্ন ভাষার মধ্যে বিয়ে দেবার, ঘটকালি করবার কাজটাও আর হতো না। আমাদের তখন দান্তের ভাষা জেনেই দান্তে পড়তে হতো, অথবা গ্রিক জেনে সা’ফো বা এস্কাইলাস বা হোমার; স্প্যানিশ জেনে লোরকা-নেরুদা-বোর্হেস। আর, ফরাসি ভাষা ভালো মতন শিখে তবেই বোদলেয়ার, মালার্মে বা র্র্যাঁবো।

বোধ করি, অনুবাদকমাত্রই ঘটক। ঘটকালি যে করে তার বিপদ ত্রিমুখী। বরপক্ষ আর কনেপক্ষ দুই তরফ থেকেই তার কপালে জোটে তিরস্কার। আর নিজের কাছেও নিজেকে তার অসফলতার জন্য কৈফিয়ত দিতে হয়। ধারণা করি, দায়িত্বশীল অনুবাদকমাত্রই নিজেকে বারবার আপন কাঠগড়ায় দাঁড় করান। অন্যদের বেলায় তা যদি না-ও হয়, আমার নিজের বেলায় তা একশো ভাগ সত্যি।

দু’কুল সামাল দিতে গিয়ে তাকে অনেক সাত-পাঁচের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। পান আর চুন দুটোকেই অনেকখানি খসিয়ে তবেই তাকে সানাই বাজানোর ব্যবস্থা করতে হয় (সোনায় কিছুটা খাদ না মেশালে নাকি অলঙ্কার হয় না!)। এরপর তার কথা, তার দৌড়ঝাঁপের কথা আর কারোরই মনে থাকে না। থাকলেও ‘ঘটকের ব্যাটা ঘটক’-এর বেশি কিছু তার কপালে জোটে না। ব্যতিক্রমও আছে; তবে তা অঙ্গুলিমেয়।


‘Translation is not only possible but also essential to the understanding of literature…’


বিশ্বস্ত ও গুণী অনুবাদকের মনে সব সময়ই একটা খুঁত-খুঁতানি থাকেই। কিন্তু অনুবাদে কোনো টেক্সটের প্রতি—কবিতার তো বটেই, এমনকি গদ্যেরও—পুরোপুরি বিশ্বস্ত থাকা কি সম্ভব? কবিতার অনুবাদ যে সম্ভব নয়, এমন বিশ্বাসই ছিল তিরিশের দিকপাল কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তেরও। অনূদিত কবিতার সংকলন ‘প্রতিধ্বনি’-র ভূমিকায় তিনি বলেছিলেন: ‘আমার মতে কাব্য যেহেতু উক্তি ও উপলব্ধির অদ্বৈত, তাই আমি এও মানতে বাধ্য যে তার রূপান্তর অসম্ভব;…।’  তবুও তিনি ক্ষান্ত হননি অনুবাদে। তাঁর অনুবাদের ভাণ্ডারও বেশ বড়সড়ই বটে!

আর নিজের  করা অনুবাদ কবিতার সঙ্কলন ‘বহুল দেবতা বহু স্বর’-এ শঙ্খ ঘোষ বলেছেন:

‘অনেকের মতো আমিও একথা জানি যে কবিতার ঠিক-ঠিক অনুবাদ হয় না কিছুতেই, তবু করতেও চাই অনুবাদ, ভালোলাগার টানে।’ এ প্রসঙ্গে নিজের কাছেই তার প্রশ্ন: ‘এসব লেখাকে অনুবাদ না বলে অনুসর্জন বলাই কি তাই সংগত? কেননা সৃজনের আনন্দও যদি কিছুটা না লেগে থাকে এর গায়ে, তবে কেনই-বা এত আয়োজন!’

এ ব্যাপারে সাবধানবাণীও শুনিয়েছেন তিনি: ‘সৃজন কথাটার মানে অবশ্য এ নয় যে তার নেশায় ইচ্ছেমতো সরে যাব দূরে, তৈরি করে তুলব একেবারেই নিজের মতো ছন্দ-শব্দ ছবি নিয়ে খেলা,…’

শঙ্খ ঘোষের এই কথাকটি অনুবাদকের মনে রাখা জরুরি বলেই মনে করি। অনুবাদক যদি কবি-যা-বলেন নি, তা জুড়ে দেন খেয়ালখুশিমতো, তাহলে তা ‘খোদার ওপর খোদকারি’ করারই নামান্তর বটে! সেক্ষেত্রে অতি-স্বাধীনতার তোড়ে অনুবাদের ডিঙি উল্টে কবিতার সলিলসমাধি বা পঞ্চত্বপ্রাপ্তিই ঘটে। শিব গড়তে গিয়ে বাঁদর গড়াটাই হয়। আর অনুবাদটি নিয়ত পাঠকের চোখে চোখ রেখে কেবলই ভেংচি কেটে যায়। ‘স্থানে স্থানে প্রকাশিত নিজ মন উক্তি’ বসানোর বাতিক যদি অনুবাদককে, বিশেষ করে অক্ষম অনুবাদককে, পেয়ে বসে (আলাওল যখন ‘পদুমাবৎ’ অনুবাদ প্রসঙ্গে কথাটি বলেন, তখন তা তাঁর নিজের বেলায় সুপ্রযুক্ত হলেও বিপুল অধিকাংশের বেলায় তা খাটে না), তখন অনুবাদ্য কবিতাটির জন্য সমূহ বিপদই বয়ে আনে।

একজনের লেখায় পড়েছিলাম, জনৈক হিন্দিভাষী পণ্ডিত নাকি রবীন্দ্রনাথের গানের হিন্দিরূপ দিতে গিয়ে তেমনই এক মহাকাণ্ড করেছিলেন। অনুবাদক মহোদয় ‘বজ্র’কে করেছিলেন ‘ব্রজে’। তাঁর হয়তো ধারণা হয়েছিল বাঁশি তো ব্রজবৃন্দাবনেই বাজবার কথা, বজ্রে তা কী করে বাজবে! তাই তিনি ‘বজ্রে তোমার বাজে বাঁশি’র হিন্দিরূপ দিয়েছিলেন:‘ব্রজমে তেরি বজে বংশী’।

রবীন্দ্রনাথ অনুবাদ বলতে বোধ করি অনুসর্জনকেই (transliteration) বুঝিয়েছিলেন। আর তা নিছক ‘ভাষান্তর নয়, বরং আন্তরভাষ্য’। যদিও সেই আন্তরভাষ্যের হদিস সবাই পায় না; পাওয়ার কথাও নয়।

কবিতা যেহেতু উক্তি ও উপলব্ধির দ্বৈরথ, সেহেতু অনুবাদকের কাজটাও জগতের দুরূহতম কাজগুলোরই একটি বটে। এ-দুইকে একতারে মেলানোর কাজটা তাকে তাই কঠিন সাধনা দিয়েই করতে হয়। সেজন্য লাগে নানান গুণপনা। একথা অনস্বীকার্য যে, এই গুণপনা সব দেশে সব যুগেই বিরল। তার জন্য চাই বিপুল প্রস্তুতি, নিবেদন আর অবশ্যই সৃজনপ্রতিভা। গ্রেগরি রাবাসার করা মার্কেসের গদ্যের অনুবাদ এতই উত্তম যে, স্বয়ং মার্কেসও কবুল করেছেন এর চেয়ে ভালো কিছু আর হতে পারত না। বা ফিটজেরাল্ডের অনুবাদে ওমর খৈয়াম। বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদে বাংলায় বোদলেয়ারের কবিতা। শঙ্খ ঘোষ বা অলোকরঞ্জনের হাতে নানান ভাষার কবিতা। বা লোকনাথের অনুবাদে র্র্যাঁবোর কবিতা। আর আমার নিজের দেশে সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ বা সাজ্জাদ শরিফের অনুবাদে বিদেশি ভাষার কবিতা যে প্রাণস্ফূর্তি লাভ করেছে তাতে লাভের পাল্লাই ভারী। অন্য ভাষায় এসে অনুবাদ্য কবিতার যা-যা হারিয়ে গেছে তা হারাতই। নতুন ভাষায় এসে বিদেশি ভাষার কবিতা যে চেহারাটা নেয়, যে-স্বরের প্রতিধ্বনি তোলে তা চোখ, কান, স্নায়ু ও বোধের জন্য প্রীতিকর হলো কিনা সেটাই বিবেচ্য।

অনুবাদ করা যাবে না বা অনুবাদ আসলে করার জিনিস নয় বলে যে কট্টর মত, তাকে উড়িয়ে দেন শতাব্দীর সেরা কবি-লেখকদের একজন হোর্হে লুইস বোর্হেস। অনুবাদকে তিনি সাহিত্যের জন্য অপরিহার্য এক কাজ বলে মনে করতেন। আর অনুবাদ করাটা তিনি কোনো অসম্ভব কাজ বলেও মনে করতেন না। তার বক্তব্য: ‘Translation is not only possible but also essential to the understanding of literature…’

এখানেই শেষ নয়, অনুবাদকে উচ্চাসন দিতে বোর্হেস এমন কৌতূহলোদ্দীপক কথাও বলতে ছাড়েন নি: “The original is unfaithful to the translation.”

বোর্হেস অনুবাদক নেস্তর ইবার্‌রার (Nestor Ibarra) প্রশংসা করেছিলেন এক প্রবন্ধে। ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত তাঁর নিজের কবিতার ইবার্‌রাকৃত ফরাসি অনুবাদের প্রশংসা করতে গিয়ে বোর্হেস বলেছিলেন:

Ibarra does not misinterpret the connotations of irony, tenderness and nostalgia that nuance each word in my poems…he understands the affinities and differences of the two poetic languages.

বলাবাহুল্য, ফরাসি থেকে স্প্যানিশে পল ভালেরির (Paul Valéry) অসামান্য অনুবাদ করেছিলেন এই ইবার্‌রা।


এলিয়টের  Gerontion কবিতার অনুবাদ করতে গিয়ে এই মহাজন বাঙালি কবি অনূদিত কবিতাটিতে ‘পচা ভাদ্রে কচু শাক’ পর্যন্ত যোগ করেছিলেন। তাতে করে এটি না থেকেছে এলিয়টের কবিতা, না হয়েছে বাংলা কবিতা।


ছন্দের জাদুকর বলে খ্যাত আর রবীন্দ্রস্নেহধন্য, ‘অথচ মেজাজ ও কাব্য-নির্মাণ-কৌশলে রবীন্দ্রপ্রভাবমুক্ত, স্বকীয় কাব্যবৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল, বাংলাকাব্যে আরবি-ফারসি শব্দের সার্থক প্রয়োগকারী’ সত্যেন্দ্রনাথ দত্তর করা অনুবাদ কবিতার বই ‘তীর্থরেণু’।  এই বইটি পড়ে রবীন্দ্রনাথ চিঠি লিখে বাহবা জানিয়ে বলেছিলেন: ‘এই অনুবাদগুলি যেন জন্মান্তরপ্রাপ্তি। আত্মা এক দেহ হইতে অন্য দেহে সঞ্চারিত হইয়াছে। ইহা শিল্পকার্য নহে, ইহা সৃষ্টিকার্য।’

আর কান্তিচন্দ্র ঘোষের অনুবাদে ওমর খৈয়াম পড়ে রবীন্দ্রনাথের সপ্রশংস মন্তব্য: ‘কবিতা লাজুক বধূর মত এক ভাষার অন্তঃপুর থেকে অন্য ভাষার অন্তঃপুরে আসতে গেলে আড়ষ্ট হয়ে যায়। তোমার তর্জমায় তুমি তার লজ্জা ভেঙেচ, তার ঘোমটার ভিতর থেকে হাসি দেখা যাচ্ছে।’

এবার আসা যাক কবিতা-সংহারক অনুবাদের প্রসঙ্গে। আপন মনের মাধুরী কেবল নয়, মূল কবিতার অভিমুখ ঘুরিয়ে দিয়ে, কবিতার পরিপ্রেক্ষিতটিকে সরিয়ে তাতে অন্য পরিপ্রেক্ষিত চাপিয়ে দিয়ে সে ভূমিকাটাই পালন করেছিলেন তিরিশের পঞ্চকবির একজন বিষ্ণু দে। এলিয়টের  Gerontion কবিতার অনুবাদ করতে গিয়ে এই মহাজন বাঙালি কবি অনূদিত কবিতাটিতে ‘পচা ভাদ্রে কচু শাক’ পর্যন্ত যোগ করেছিলেন। তাতে করে এটি না থেকেছে এলিয়টের কবিতা, না হয়েছে বাংলা কবিতা। খ্রিস্টিয় মিথকে ও পশ্চিমা দেশের প্রাকৃতিক আবহকে ভারতীয় মিথ ও আবহের ভেতর স্থাপন করতে গিয়ে তিনি এই কাণ্ড করেন। পরে তাঁরই উত্তরসূরি কবি শঙ্খ ঘোষ তাঁর ‘ঐতিহ্যের বিস্তার’ নামের প্রবন্ধের বইতে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন এসব। বিষ্ণু দে বেঁচে থাকলে শঙ্খ ঘোষের প্রশ্নের কী জবাব দিতেন সেটা জানবার সুযোগ আর নেই। অথচ বিষ্ণু দে তাঁর অনূদিত কবিতার সংকলন ‘হে বিদেশি ফুল’-এর মুখবন্ধে কবিতার মেজাজ রক্ষা করার চেষ্টার কথা লিখেছেন:  ‘যথাসম্ভব চেষ্টা করেছি মূল কবিতার বিন্যাস, ছন্দ বা নিদেনপক্ষে মেজাজ অনুবাদের আভাসে রক্ষা করা’। এই যদি হয় মেজাজ রক্ষার নমুনা তাহলে ‘অনুবাদক বিশ্বাসঘাতক’ বলে ইতালীয়রা খুব একটা ভুল করেছে বলে মনে হয় না।

যদিও আমি এটা দৃঢ়ভাবেই বিশ্বাস করি যে, গদ্যের অনুবাদ যে কেউ করতে পারলেও, কবিতার অনুবাদ হতে পারে কেবল কবির হাতেই। কারণ গদ্য মূলত তথ্যটাই দেয়। কিন্তু একটা কবিতায় ছড়িয়ে থাকে যে ছন্দস্পন্দ, সঙ্গীত, উপমা, চিত্রকল্পের উদ্ভাস ও ব্যঞ্জনা এবং সেই সঙ্গে যে বিবিধ লাবণ্য, সেসবকে শিকার করতে পারেন কেবল কবি। কবি নন যাঁরা, তাঁরা য্তই পণ্ডিত হোন, কবিতার অন্তঃপুরে প্রবেশের এক্তিয়ার তাঁদের খুব একটা থাকে বলে মনে হয় না। যে কবি পরম্পরাবাহিত হয়ে কবিতা লিখতে এসেছেন, যিনি নিজের ভাষার সমৃদ্ধ ইতিহাসের ভেতর দিয়ে পথ চলে তবেই নিজের জন্য পথরচনায় ব্রতী হয়েছেন, যিনি কবিতার করণকৌশল ইত্যাদি ভালোভাবে রপ্ত করেছেন এবং সবোর্পরি অন্যান্য ভাষায় যার ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞা ও কাণ্ডজ্ঞান রয়েছে, কবিতার অনুবাদক হওয়া কেবল তাকেই মানায়। অবশ্য অনুবাদের সময় যদি তিনি দায়িত্বশীল থাকেন, মূল কবিতার ওপর খোদকারি যদি না করেন। কিন্তু অনেক ভালো কবিও অনুবাদের সময় এই যত্নটুকু নেন না। অনুবাদ্য কবিতায় নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে ফেলেন। এলিয়টের কবিতায় যেমনটা করেছিলেন বিষ্ণু দে।

এবার নিজের করা অনুবাদ প্রসঙ্গে আসি। আমি নিজেকে কবি দাবি করতে পারি না। কবিতা লেখার চেষ্টা করি কেবল। শিল্পের ও মানবমননের বিস্তৃত সমুদ্রে অবগাহন তো দূরের কথা, তাতে পা-ভেজানোর সাধ্যও আমার নেই। আমার সম্বল কেবল কবিতার প্রতি দুর্মর এক আশৈশব ভালোবাসা। সেই ভালোবাসার টানেই অনুবাদে অপর ভাষার কবিতার গায়ে নিজের ভাষার পোশাক পরানোর চেষ্টা। আর যেটা আমি করেছি, তা হচ্ছে মূল কবিতা বা যে ভার্সনটি থেকে অনুবাদ করছি, সেটির প্রতি বিশ্বস্ত থাকা। সেটাও যে সব সময় সম্ভব হয়েছে সে দাবি আমি করি না। শুধু এটুকু বলতে পারি, পারতপক্ষে স্বাধীনতা নিতে চাই নি। যখন দেখেছি বাংলায় এটিকে শিকার করতে হলে কিছুটা স্বাধীনতা নিতেই হবে, তখনও স্বেচ্ছাচারিতার পথে যাই নি। ধরা যাক, বোর্হেসের ‘সেভেন নাইটস’ বক্তৃতামালার ‘থাউজ্যান্ড অ্যান্ড ওয়ান নাইটস’ বক্তৃতাটির কথা। এতে ‘প্যারাডাইস অব হেভেন’ কথাটির অনুবাদ কী হতে পারে? ‘স্বর্গের স্বর্গ’? নাহ, তাহলে তো ব্যঞ্জনাটি আর থাকে না। তাহলে? আমি তখন আমার ভারতীয় ঐতিহ্যের কাছে হাত পেতেছিলাম। আমি এর বাংলা করলাম ‘স্বর্গের অমরাবতী’।

এটা শুধু এই জন্য বলা যে, অন্যে প্রশংসা করলেও নিজেকে আমি সব সময়ই ভর্ৎসনার মধ্যে রাখি। অনুবাদ করে যেটুকু প্রশংসা জুটেছে কপালে, সেটুকুর যোগ্য যে আমি মোটেই নই সেকথা নিজেকে ক্রমাগত শোনাই আর চেষ্টা করে চলি আমার ক্ষমতার শেষটুকু দিতে, বিশ্বস্ত প্রেমিকের মতো।

যে ২০০টি কবিতা এই বইয়ে রেখেছি সেগুলো বিভিন্ন সময়ে করা; নিজের ভালো লাগার কারণে এবং নানা প্রণোদনায়। প্রাচীন আধুনিক মধ্যযুগ সব দিকেই হাত বাড়িয়েছি। তারই স্মারক সা’ফো, ওভিদ আর প্রপারতিয়াসের কবিতা। কোনো নির্দিষ্ট ঘরানা, দেশকালে নিজের কবিতারুচিকে বাঁধতে চাই নি কখনো। সবখানেই আমি পেয়েছি অনেক। দেখতে চেয়েছি কয়েক হাজার বছর আগে লেখা একটি কবিতা অনেক দূরবর্তী কালে অন্য একটি ভাষায় তুলে আনলে কেমন লাগে, কেমন শোনায় তা। প্রাচীন এই তিন কবি আমাকে ভেতর থেকে রোমাঞ্চিত করেছেন বলেই তাদেরও চেয়েছি তুলে আনতে আজকের পাঠকের কাছ বরাবর—নিজের ভাষায়।


গত প্রায় আড়াইশ বছর ধরে এই কবিতাটি নিয়ে কোটি কোটি পৃষ্ঠা ব্যয় করেছেন আলোচকেরা। কিন্তু বঙ্গীয় সাহিত্যমহলে এই কবিতাটি নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা আমার চোখে পড়েছে বলে মনে হয় না।


কিন্তু কাকে ছেড়ে কাকে রাখি—ইহধামে পাঁচ সহস্রবার জন্ম নিলেও কবিতার বিশাল সমুদ্র থেকে কয়টাইবা কবিতা আমি নিজের ভাষায় তুলে আনতে পারতাম! আর এই স্বল্পায়ু জীবনে তো বিপুল-বিরাট কবিতাবিশ্বের এক কণাও তুলে আনার সাধ্য আমার নেই। অগত্যা নানা সময়ে অন্য ভাষার কবিতা পড়ে যখন আলোড়িত হয়েছি তখন সেই ভালোলাগাকে অনুবাদে রূপ দিতে চেয়েছি। ফলে পূর্ব পরিকল্পনার চেয়ে আমার নানা সময়ের ইচ্ছা ও ব্যক্তিগত অভীপ্সাই কবিতা অনুবাদের ক্ষেত্রে নিয়ামক হয়েছে। এই পক্রিয়ায় অগ্রসর হতে গিয়ে অনেক আলোচিত-পঠিত বিশ্বকবিতার অনুবাদে যেমন হাত দিয়েছি, তেম্নি প্রায়-অনালোচিত অথচ আলোচনার দাবি রাখে, এমন অনেক কবিতার সুরভি-উজ্জ্বলতা ও গরিমাকেও বাংলায় ধরতে চেয়েছি। জার্মান কবি হিল্ডে ডোমিন বা আইখেনডর্ফের কবিতা সেসবেরই উদাহরণ। আবার বাংলা মুলুকে কম আলোচিত-পঠিত-অনূদিত গ্রিক কবি কাভাফির মতো কবির কবিতা বা স্প্যানিশ ভাষার কবি রুবেন দারিও বা হোসে তাবালদার কবিতার দিকেও হাত বাড়িয়েছি পরম উৎসাহে।

একই কথা খাটে ইংরেজভাষী কবি ম্যাথু আরনল্ড বা অস্কার ওয়াইল্ড-এর বেলায়। ওয়াইল্ডকে কবি হিসেবে জানে কয়জন? বা ম্যাথু আরনল্ডকে? অথচ কবি হিসেবেও এরা ছিলেন উত্তমর্ণ। বিশেষ করে ম্যাথু আরনল্ডের কথা এখানে বলতেই হয়। ক্লাসিক আর রোম্যান্টিক দুরকম স্বাদই পাওয়া যায় তাঁর কবিতায়। তাঁর রচিত ‘ডোভার বিচ’ কবিতাটিকে বিশ্বকবিতার এক হীরকখণ্ড বলে মনে হয়েছে আমার। গত প্রায় আড়াইশ বছর ধরে এই কবিতাটি নিয়ে কোটি কোটি পৃষ্ঠা ব্যয় করেছেন আলোচকেরা। কিন্তু বঙ্গীয় সাহিত্যমহলে এই কবিতাটি নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা আমার চোখে পড়েছে বলে মনে হয় না। এর কাঠামো ও আঙ্গিকের প্রতি বিশ্বস্ত থেকেই বাংলায় একে তুলে আনার চেষ্টা করেছি। আমার জানা মতে আরও দু’জন এটি অনুবাদ করেছেন। এই দু’জনের একজন আমারই কবিবন্ধু সৈয়দ তারিক। একটি ভালো ও অসামান্য কবিতার একাধিক অনুবাদ হওয়া জরুরি বলে মনে করি আমি। সে হিসাবেই অন্য দুটি ভালো অনুবাদ থাকা সত্ত্বেও আমি এর অনুবাদে হাত দিয়েছি। আমার চেয়ে উত্তমর্ণ কবি-অনুবাদক যাঁরা আছেন, তারাও এটি অনুবাদে হাত দিতে পারেন। তাতে দিনশেষে কবিতারই লাভ।

লোরকা-নেরুদা-বোর্হেস-পাস-আলবের্তিরা স্প্যানিশ ভাষার শুধু নন, বিশ্বকবিতারও গর্ব। বিশেষ করে লোরকা-নেরুদায় মজে নি অথচ বিশ্বকবিতাপাঠের অভিজ্ঞতা কমবেশি আছে এমন কবিতামোদী খুঁজে পাওয়াই ভার। বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অনেকেই লোরকা-নেরুদা-পাসের কবিতার সুচারু অনুবাদ করেছেন। আমিও করেছি নিজেকে বাজিয়ে দেখতে, নিজেকে আনন্দ দিতে।

লোরকার যেসব কবিতা এই বইতে রেখেছি সেসবের মধ্যে একটি কবিতা স্প্যানিশ ভাষার দীর্ঘতম শোকগাথা হিসেবে গণ্য। ইংরেজিতে এর নাম ‘Lament For Ignacio Sanchez Mejias’ ; আমার অনুবাদে এটির বাংলা নাম হয়েছে: ‘ইগনাসিও সানচেস মেহিয়াসের জন্য বিলাপ’। প্রথমে অবশ্য বাংলায় এর শিরোনাম করেছিলাম ‘ইগনাসিও সানচেস মেহিয়াসের মৃত্যু’। এটির অন্তত গোটা চারেক অনুবাদ আমার চোখে পড়েছে। চারটি অংশে বিভক্ত এই কবিতাটি চারটি চালে বা ছন্দ-কাঠামোতে রচিত। যাঁরা এর বাংলা করেছেন তারা ছন্দের কাঠামোটিকে বজায় না রেখে অনেকটাই গদ্যের ধাঁচে করেছেন। আমার সঙ্গে তাদের অনুবাদের বড় পার্থক্যটা হলো, আমি এর ছন্দ বা আঙ্গিককাঠামোটা অবিকল রাখতে চেয়েছি। এই অনুবাদটি করতে গিয়ে একই সঙ্গে আমার নাভিশ্বাস যেমন উঠেছে, তেমনি করে ফেলবার পর অসীম আনন্দও পেয়েছি। এই অনুবাদটি করতে গিয়ে আমার চেয়ে মননে-মেধায়-প্রতিভায় আর সুকীর্তিতে বহুগুণে এগিয়ে থাকা কবিবন্ধু সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের অমূল্য পরামর্শ ভোলার নয়। অনেক স্থানে তাঁর ‘মূল্যবান দ্বিমত’ আমাকে বিভিন্ন জায়গায় নতুন করে ভাবিয়েছে। অনুবাদটি সামান্যতম পাঠযোগ্যতাও যদি থেকে থাকে, সেজন্য সাধুবাদ আমার নয়, বরং ওরই প্রাপ্য। এটি ‘ইগনাসিও সানচেস মেহিয়াসের মৃত্যু’ নামে বিডিনিউজের আর্টস পাতায় ছেপেছিলেন আমাদের আরেক কবিবন্ধু ব্রাত্য রাইসু। তাঁর পরামর্শে এই কবিতা এবং লোরকার ওপর দীর্ঘ একটি ভূমিকাও লিখেছিলাম। লোরকার ওপর ভূমিকাটি কবি পরিচিতিতে আছে। আর কবিতাটির বিষয়ে লেখা ভূমিকাংশটি তুলে দিচ্ছি এখানে হুবহু:

‘‘ইগনাসিও সানচেস মেহিয়াসের মৃত্যু’’ প্রসঙ্গে

ইগনাসিও সানচেস মেহিয়াস লোরকার প্রিয় বন্ধুদের একজন। ছিলেন একাধারে সুদক্ষ মাতাদোর (ষাঁড়-লড়িয়ে), কবি ও নাট্যকার।…
একটি নাটকও আছে তার। মাতাদোর হিসেবে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে তখন গোটা স্পেনে। অবশ্য মাঝপথে ষাঁড়-লড়াইয়ে বেশ কিছুদিন ক্ষান্ত দিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন অন্যসব সৃষ্টির নেশায়। পরে আবার রক্তের টানে ফিরতে চেয়েছিলেন রিংয়ে। আর সেটাই শেষ। ষাঁড়-মানুষের লড়াইয়ে এ-যাত্রা জয়ী হয় ষাঁড়।

রিংয়ে প্রিয় বন্ধু ইগনাসিও মেহিয়াসের মৃত্যু তীব্রভাবে নাড়া দেয় লোরকাকে। বন্ধুর মৃত্যুকে উপজীব্য করে লোরকা ১৯৩৫ সালে যে দীর্ঘ কবিতাটি রচনা করেন অনেক সমালোচকের চোখে তা লোরকার সর্বোত্তম কবিতা। হিস্পানি ভাষার শ্রেষ্ঠ ৪টি শোকগাথার একটি হিসেবেও গণ্য করা হয় একে। কবিতাটি ৪টি ভাগে বিভক্ত। তবে এদের আলাদা আলাদা মোটিফগুলো আবার একসূত্রে গ্রথিত। এ কবিতায় নিজের প্রথম দিককার কবিতার গীতলতার সঙ্গে ব্যালাডের বর্ণনাত্মক রীতির মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন লোরকা। সেই সঙ্গে ট্রাজেডির গভীর আবহ সৃষ্টির জন্য তাতে যোগ করেছেন জিপসি বিলাপগাথার রিদম, ব্যবহার করেছেন নাট্য আঙ্গিক আর লোকগাথার উপাদান।

‘‘ত্রাদিত্তোরে ত্রাদুত্তুরে’’ — অনুবাদক বিশ্বাসঘাতক। এই বদনাম মাথায় নিয়েও ‘তোমাকে শিকার করে ফিরি যেন, যদ্যপি না পাই’ — ভিন্ন ভাষার মধুরতাকে আপন ভাষায় শিকার করার নাছোড়, দুর্মর চেষ্টাটি সতত চলমান। যেহেতু ‘অনুবাদ আসলে একটা চমৎকার ছল, নিজেকে আবিষ্কার করার বিনীত উপায়’ — যেমনটি বলেছেন শক্তিমান দুই কবি-অনুবাদক শঙ্খ ঘোষ আর অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত। তবে একথা মানছি, নিতান্ত আবেগ-সম্বল আমার মতো অক্ষম, বেলায়েক অনুবাদকের ‘স্থানে স্থানে প্রকাশিত নিজ মন উক্তি’ প্রায়শই মূল রচনার বারোটা বাজায়। বিশ্বাসহন্তাই শুধু নয়, বোধ করি অনুবাদক কখনো কখনো হয়ে ওঠে আততায়ী।

আবার অনুবাদ যদি রসোত্তীর্ণও হয় তবুও কি সবার মনপসন্দ হয় তা? মূলের আত্মা কি ধরা দেয় অপর ভাষায়? বিশেষত কবিতায়? দুটি ভাষার তীব্র চুম্বনের মাঝখানেও কি থেকে যায় না অদৃশ্য কাচের দেয়াল?

উল্টো পিঠেও কথা থাকে, এ ব্যবধানও ঘুচিয়ে দিতে পারেন কেউ কেউ, কঠিন নির্মোক ভেঙে এনে দেন মণি ও মুকুতা। করাঙ্গুলিগণনীয় তারা। আমার সময়ে, আমার প্রজন্মের কারো কারো মধ্যেও পেয়ে যাই এমন প্রায়-অলৌকিক গুণপনা। সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ নামের একজন আছেন; মিদাসের স্পর্শ নিয়ে হস্ত তার সতত ফলিয়ে যাচ্ছে সোনা। ওর অনুবাদে কোলরিজের ‘কুবলা খান’ বারবার পড়ি। অবাক হয়ে ভাবি, কী করে ‘সারাক্ষণ কলস্বর রণিত আবেশে!’ আমারও উড়িবার হয় সাধ।

আমা হেন তাঁতিরও ফার্সি পড়বার খায়েশ জাগে।

লোরকার এই দীর্ঘ ব্যঞ্জনামধুর, বিয়োগবেদনাদীপ্ত অসামান্য কবিতাটি অনুবাদ করতে গেছি ক্ষমতা নয়, শুধু প্রেম সম্বল করে। তাতে বালখিল্যতা আছে, আছে ভাবাবেগ আর নিজেকে পরখ, আবিষ্কার করে নেয়ার চেষ্টা। কবিতাটির আভা ও গরিমা বাংলায় আমার করা অনুবাদে কতটা ধরা পড়েছে সে বিচার সংবেদী পাঠকের। অনুবাদকর্মটির (কাণ্ডটির?) প্রথম পাঠক আমার দুই গুণী বন্ধু। প্রথম জন কবি শরিফ শাহরিয়ার, দ্বিতীয় জন কবি-অনুবাদক সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ। সুব্রতর বিস্তারিত মন্তব্য ও পরামর্শ আমার অনুবাদকর্মটির প্রয়োজনীয় সংশোধন ও পরিমার্জনে দারুণ কাজে লেগেছে। অবশ্য অনেক স্থানে ওর পরামর্শ মানা সম্ভব হয় নি। সেটা কিছুটা আমার ব্যক্তিরুচি আর বাকিটা আমার ক্ষমতার দৌড়ের সীমাবদ্ধতার কারণে। যেসব স্থানে ওর পরামর্শ মানা সম্ভব হয়েছে, বোধ করি, সেখানটায় এসে অনুবাদ যৎকিঞ্চিৎ উৎরে (?) গেছে। বন্ধু হয়ে ওকে স্রেফ ধন্যবাদ জানানোর মতো ছোটলোকি আমায় মানায় না। আমেন!!!’’

রুশ কবিতা নাকি অনুবাদযোগ্য নয়। এমন দাবি করে থাকেন রুশরা। তবুও রুশ কবিতারও অনুবাদ থেমে নেই। আমি মাত্র তিনজন কবির কবিতা অনুবাদ করবার দুঃসাহস দেখিয়েছি। এদের মধ্যে দু’জন নারী আর একজন পুরুষ। নারী দুজনের একজন হলেন আন্না আখ্‌মাতোভা। তিনি এক অসাধারণ কবি। রুশ ভাষার সর্বকালের সেরাদের একজন। কিন্তু সে তুলনায় বাংলা ভাষায় তাঁর নাম খুব কম লোকই জানে। এমন আঙ্গিকসচেতন কবির দেখা খুব কমই মেলে। নানা কারণে জীবৎকালে হয়ে উঠেছিলেন ‘কাল্ট ফিগার’। আখ্‌মাতোখভাকে তুলে ধরতে আমি বেশ কিছু কবিতা এই বইয়ে রেখেছি। তাঁর ‘অনুবাদ-অসম্ভব’ কবিতাগুলোর কী হাল আমি করেছি, সে বিচার পাঠকের।


‘বিয়োবার দেরি নাই’ এই চরণের ‘বিয়োবার’ কথাটা আক্ষরিক ইংরেজি হয়তো করা যায়, কিন্তু এর মর্মকে, এর আন্তর স্পন্দন ও এর অনাস্বাদিতপূর্ব করুণ লাবণ্যকে কি তুলে আনা সম্ভব অন্য ভাষায়?


এবার আসা যাক ডব্ল্যু বি ইয়েটস (W. B. Yeats) প্রসঙ্গে। তাঁর মতো মহাপ্রতিভা বহু শতাব্দীর ধন। ইয়েটস সম্বন্ধে বুদ্ধদেব বসু একটা মূল্যবান কথা বলেছেন: ‘একথাও স্মর্তব্য যে বিশ শতকের সন্ধিক্ষণে, যখন পর্যন্ত তিমিরলিপ্ত ইঙ্গ-দ্বীপতটে দুই মার্কিন ত্রাতা এসে পৌঁছননি, তখনই ইয়েটস ধীরে-ধীরে ইংরেজি ভাষায় আধুনিক কবিতা সম্ভব করে তুলছেন…;’’। অর্থাৎ ইংরেজি কবিতাকে আধুনিকতার বৃহৎ সরণিতে তুলে আনার মূল কাজটি এলিয়ট-পাউন্ড নামের দুই আমেরিকান (পরে ব্রিটেনের নাগরিক) কবি করলেও শুরুটা করেছিলেন ইয়েটসই। কিন্তু ইয়েটস-এর কবিতার অনুবাদ করা সবচেয়ে দুরূহ কাজগুলোর একটি। সম্ভবত ইয়েটস হচ্ছেন এমন এক কঠিন গ্রানিট-মহাপ্রাচীর যার সামনে গিয়ে অনুবাদককে ব্যর্থতার গ্লানি মেখে ফিরে আসতে হয় বারবার। তাই কোনো অনুবাদকই—এমনকি যাঁরা অনুবাদক হিসেবে নমস্য তাঁরাও—ইয়েটস-এর কবিতা অনুবাদ করার পথ সহজে মাড়াতে চান না। কারণ ইংরেজিতে ইয়েটসের কবিতা যতটা সাবলাইম, যতটা অত্যুচ্চ মহিমাময়, এর লাবণ্য যতটা মর্মপ্রসারী, ব্যঞ্জনায়-দ্যুতিতে যতটা অনুপম আর তুলনারহিত, বাংলা অনুবাদে তাকে ধরা ততটাই দুরূহ; ক্ষেত্রবিশেষে অসম্ভবও। ইংরেজি ভাষার বহুবর্ণিল হ্রদ থেকে কবিতা নামের উজ্জ্বল মাছটিকে নানা কসরতের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার ডাঙায় কোনো রকমে টেনে তোলা যায় হয়তো, কিন্তু এর প্রাণস্ফূর্তি আর থাকে না সেভাবে।

জীবনানন্দের কোনো কোনো কবিতা যেমন, কোনোভাবেই অন্য ভাষায় ধরা দেবে বলে মনে হয় না—যেন কেবল বাংলাভাষাতেই এর প্রাণ স্ফূর্তি পেতে পারে, আর কোনো ভাষায় তা সম্ভব নয়। এখানেই প্রতিটি ভিন্ন ভিন্ন ভাষার নিজস্বতা, সেইসঙ্গে সীমাবদ্ধতা বা স্বভাববৈশিষ্ট্যও বটে। বাংলা ক্রিয়াপদের এলায়িত যে ভঙ্গিটা জীবনানন্দের কবিতার বড় এক কুললক্ষণ তা আর কোনো ভাষায় অনূদিত হওয়া প্রায়-অসম্ভব এক ব্যাপার; এমনকি জীবনানন্দের কবিতার জন্য তা স্বাভাবিক আর অবধারিত হলেও অন্য কেউ ক্রিয়াপদের এমন ব্যবহার করলে তা মেকিই শোনাবে। ‘ছড়িয়ে’ না লিখে ‘ছড়ায়ে’, ‘এলিয়ে’ না লিখে ‘এলায়ে’ যখন লেখেন জীবনানন্দ, তখন এক অনাস্বাদিত ঘোরের আর নিশ্চেতনার, আধো-স্বপ্ন আর জাগরণের যে মোহাবেশ তৈরি হয়, যে অনিবার্যতার আঁচ পাওয়া যায় তা অনুবাদে কী করে ধরা সম্ভব? ‘বিয়োবার দেরি নাই’ এই চরণের ‘বিয়োবার’ কথাটা আক্ষরিক ইংরেজি হয়তো করা যায়, কিন্তু এর মর্মকে, এর আন্তর স্পন্দন ও এর অনাস্বাদিতপূর্ব করুণ লাবণ্যকে কি তুলে আনা সম্ভব অন্য ভাষায়? শামুক-গুগলি, ভাঁটফুল আর ফণিমনসার ঝোঁপ—এসব নামপদ বাংলায় উচ্চারিত হলে যে অলসমধুর সৌন্দর্য আর বিভা মনকে রাঙায়, অনুবাদে কি তা আর পাওয়া যায়? ইয়েটসের কবিতার বেলায়ও একথা খাটে বলেই জীবনানন্দের প্রসঙ্গ টানা। জীবনানন্দ যেমন পুরাণ-ইতিহাস-লোকগাথা আর বিবিধ কাহিনি ও পাঁচালির নানান উপাদানকে নিজের কবিতার রক্তে মিশিয়েছেন, আত্মার ভেতর দিয়ে তাকে প্রবাহিত করিয়েছেন, যেভাবে পুরাণ আর ইতিহাসের দূর-নিশ্বাসকে মিশিয়ে দিয়েছেন তার কবিতার অগোচর স্পন্দনের সঙ্গে, একই কাজ করেছেন ইয়েটসও।

বাংলায় ইয়েটস অনুবাদ বলতে গেলে হয়ই নি তেমন। যতটা হওয়া উচিত বা হওয়ার কথা ছিল। না বুদ্ধদেব বসু, না অলোকরঞ্জন, না শঙ্খ ঘোষ কেউই সেভাবে আলাদা ও ব্যাপক মনোনিবেশসহ ইয়েটসের কবিতার অনুবাদ করলেন না। তবে আমাদের সময়ে এসে সুব্রত সেকাজে হাত দিয়েছেন। সম্ভবত সুব্রতই ইয়েটসের সবচে বেশি সংখ্যক কবিতার অনুবাদক।কাঠামো ও আঙ্গিকের প্রতি অনেকটাই বিশ্বস্ত থেকে করা তাঁর সেইসব অনুবাদের মানও প্রশংসার্হ। আমি ইয়েটসের মাত্র তিনটি কবিতার অনুবাদ করেছি। এদের একটি ‘দ্য সেকেন্ড কামিং’ (The Second Coming) বা ‘দ্বিতীয়াগমন’। এই কবিতাটির একটি চরণ থেকে আফ্রিকার সেরা ঔপন্যাসিক চিনুয়া আচেবে (Chinua Achebe) ‘থিংস ফল অ্যাপার্ট’ (Things Fall Apart) নামে তাঁর উপন্যাসের নামকরণও করেছেন। নানা কারণে এই কবিতাটি বিশ্বসাহিত্যের সেরা কবিতাগুলোর একটি। এটি একটি স্ফটিক-কঠিন, ঘনবদ্ধ আর নির্মেদ কবিতা। কী উপমায়, কী চিত্রকল্পে, কী বাক-বিভূতি ও অর্থবাচকতায়—সব দিক থেকেই অনুপম এক সৃষ্টি এই কবিতা। সুব্রত অগাস্টিন গোমেজসহ আরো কেউ কেউ এর অনুবাদ করেছেন। শুনেছি হুমায়ুন আজাদও নাকি করেছিলেন এর অনুবাদ। সেটি দেখার সুযোগ হয় নি। সুব্রত এটি করেছেন অক্ষরবৃত্তে। আমি করেছি অন্য ছন্দে। পাঠকের সামনে সবক’টিই থাকল।

ইয়েটস যারা ইংরেজিতে পড়েছেন গভীরভাবে, বোধ করি তাঁরা জানেন যে, ইয়েটস কোনো কোনো কবিতা দুবার তিনবারও লিখেছেন। যেমন, এই বইয়ের ‘সলোমন ও ডাইনি’ (Solomon And The Witch) কবিতার অন্তত তিনটে রূপ আমার নিজের পড়া। কোন ভার্সনটা ছেড়ে কোনটা যে করব সে নিয়েও ছিল ধন্দ। যে ভার্সনটিকে আমি আমি বাংলারূপ দিয়েছি সেটি পাঠকের পড়া না থাকলে বোধকরি প্রভূত তিরস্কারই জুটবে কপালে।

এবার আসা যাক আধুনিক বিশ্বকবিতার সবচেয়ে আলোচিত কবি টি.এস.এলিয়ট প্রসঙ্গে। তাঁর ব্যাপারে কোনো গৌড়চন্দ্রিকা দেয়াই বাতুলতা। আধুনিক ইংরেজি কবিতার মোড়, বলতে গেলে, একাই ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন এলিয়ট। আমি তার ‘জে. আলফ্রেড প্রুফ্রকের প্রেমগান’ (Love Song  of J. Alfred Prufrock) কবিতাটির অনুবাদ করেছিলাম ১৯৯০ দশকের গোড়ায় কবি ও সাহিত্যপত্রিকা ‘মাটি’র তৎকালীন সম্পাদক মারুফ রায়হানের প্রণোদনায়। এই অনুবাদ আমায় বোদ্ধা কবি, অনুবাদক ও পাঠকদের তরফ থেকে যে সানুগ্রহ প্রশংসা এনে দিয়েছে, সেই বয়সে তা ছিল আমার জন্য এক পরম পাওয়া। কবি শামসুর রাহমান, সম্ভবত স্নেহবশে, অনুবাদটির প্রশংসা করেছিলেন। দেখা হলেই এর কথা বলতেন। আমার মতো অকৃতী-অধমের নানা বালখিল্য কাজকেও উৎসাহ যোগাতে কখনোই কুণ্ঠিত হন নি তিনি। এসবই আমার জীবনের হিরণ্ময় স্মৃতিসঞ্চয়। আমার দুঃখ-যাতনাময় দিনগুলোতে যখন পরিচিত অনেকেই গোপনে করাল নখদন্ত মেলে রেখেছিলেন, সেসময় তিনি দূর থেকে পরমাত্মীয়ের মতো বিছিয়ে রেখেছিলেন ছায়া। কেবল বড় কবিই ছিলেন না শামসুর রাহমান, মানুষ হিসেবেও তাঁর তুল্য কেউ আজ অব্দি আমার নজরে পড়ে নি—অন্তত ঢাকা শহরের শিল্প-সাহিত্যের চেনা চৌহদ্দিতে। তাঁকে এই বইটি উৎসর্গ করে তাঁর স্মৃতির প্রতি সামান্য প্রণতি জানালাম শুধু। তিনি যেখানেই থাকুন, আছেন আমার স্মৃতিতে এক সমুজ্জ্বল নায়ক হয়ে।

Love Song of J. Alfred Prufrock কবিতাটি আমার বিবেচনায় এলিয়টের সবচেয়ে সুচারু কবিতা। এর ছন্দ, অঙ্গকাঠামো ও রিদম পুরোপুরি বজায় রেখেই করেছিলাম অনুবাদটি। এটি আমারও নিজের কাছে সবচেয়ে প্রিয় অনুবাদকর্ম। এটির অনুবাদের নমুনা হিসেবে এখানে দু’টি চরণ তুলে ধরছি:

‘চেনা আছে ভোরগুলি অপরাহ্ন গোধূলির ক্ষণ
কফির চামচে আমি পরিমাপ করেছি জীবন:

(Have known the evenings, mornings, afternoons
I have measured out my life with coffee spoons;)

‘অহেতুক স্বাধীনতা নেব না; মূলের প্রতি শতভাগ বিশ্বস্ত থাকব’—এমন পণ করেই মাত্র দু’রাতে করেছিলাম অনুবাদটা। সে আনন্দ আজও আমার সঙ্গী।

দু’জন কবির কথা আমি এখানে আলাদাভাবে বলতে চাই। একজন সাহিত্যে নোবেলজয়ী সুইডিশ কবি টমাস ট্রান্সট্রোমার। অন্যজন আধুনিক আরবি কবিতার সবচেয়ে শক্তিমান প্রতিনিধি সিরীয় কবি আদুনিস (আসল নাম আলি আহমাদ সাইদ আল আসবার (Ali Ahmad Said Al  Esber)। আধুনিক আরবি কবিতার পথিকৃৎ তিনি।

এতদিনেও আদুনিসের কবিতার বিস্তৃত পাঠ যে নিই নি, সেজন্য নিজেকে আমি ক্ষমা করব না। অগত্যা পাপস্খালনের জন্য এবার এই বইতে তাঁর দেড় ডজন কবিতা রেখেছি। তাঁর মানের কবি ট্রান্সট্রোমারের মৃত্যুর পর এ-মুহূর্তে গোটা দুনিয়ায় আর একজনও আছেন বলে আমার মনে হয় না। বলতে গেলে একাই আধুনিকতা ও আন্তর্জাতিকতার দিকে আরবি কবিতার অভিমুখ ঘুরিয়ে দিয়েছেন আদুনিস। ‘শৈশববন্দনা’ কবিতাটি দিয়ে তাঁর কবিতার অনুবাদের শুরু আমার। অনুবাদক হিসাবে সে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। তার ‘নয়া নূহ’ (The New Noah) কবিতাটি পড়ে বুঝেছি কী অসামান্য এক কবিতা সেটি। ধর্মীয় মিথকে গুঁড়িয়ে দিয়ে নতুন, প্রতিস্পর্ধী এক মিথ রচনা করেছেন আদুনিস এই কবিতায়। শীতের মধ্যরাত্রির কনকনে ঠান্ডার মধ্যে বসেও এই কবিতা পড়ে রোমাঞ্চিত-হরষিত আমি বসে গেলাম অনুবাদে। এবং একটানে কোথাও এতটুকু না থেমে আঙ্গিক-সৌষ্ঠবময়, ওজোগুণসম্পন্ন আর গভীর সংবেদন-ছড়ানো কবিতাটির অনুবাদ শেষ করলাম এক বসায়। এমন ঘটনা আমার অনুবাদকজীবনে খুব একটা ঘটে নি। অদ্ভুত এক ঘোর। ওই রাতেই আবেগের আতিশয্যে বোদ্ধা-বন্ধুদের মেইলে ও ফেসবুক-ইনবক্সে পাঠালাম এটি। তাদের চটজলদি প্রশংসায় বিগলিতও হলাম। নিজের পিঠ চাপড়ানো নয়, বরং একটি কবিতা একজন অন্যভাষী কবি-অনুবাদককে কিভাবে আমূল নাড়িয়ে দিয়ে নিজেকে অনুবাদ করিয়ে নেয়, সেটা বলবার জন্যই এই অবতারণা।

ভবিষ্যতে, যদি আয়ুতে কুলিয়ে ওঠা যায়, আদুনিসের কবিতা নিয়ে আলাদা একটি বই করার ইচ্ছা রাখি।

আর ট্রান্সট্রোমার! তিনি কত যে প্রিয় আমার! তাঁকে আমি বলি ‘ইউরোপের জীবনানন্দ’। এই বইয়ে ট্রান্সট্রোমার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা আছে ‘কবিপরিচিতি’ অংশে। এরই মধ্যে তাঁর ৮০টির মতো বাছাই করা কবিতা নিয়ে বছরকয় আগে কবিতার ট্রান্সট্রোমার নামে বিস্তৃত ভূমিকাসহ একটা বইও প্রকাশিত হয়েছে আমার ‘শুদ্ধস্বর’থেকে; আহমেদুর রশীদ টুটুলের প্রযোজনায় আর কবি পিয়াস মজিদের প্রণোদনায়। বইটির জন্য পাঠক ও লেখক-অনুবাদক বন্ধুদের তরফে যে সাড়া ও সাধুবাদ পেয়েছি, তাতে আমি অভিভূত।

এইভাবে দেখতে দেখতে একটা ঢাউস বইয়ের রূপ নিল আমার এসব অনুবাদ। এবার কিছু পাপমোচনের পালা। আমার দীর্ঘকালের বন্ধু ও জীবনসঙ্গী শিরিন সুলতানার কাছে আর আমার কিশোরপুত্র কাম ‘জিগরি দোস্ত’ অর্ক মাজহারের কাছে। তাঁরা এই ক’মাসে আমার সঙ্গবঞ্চিত থেকেছে বলতে গেলে। প্রাপ্য সঙ্গটুকু থেকে তাঁদের বঞ্চিত করে এই বইটাকেই দিয়েছি দীর্ঘ দিবস-রজনীর অখণ্ড মনোযোগ। তবু এ-দু’জন মানুষ সহাস্যে আমার সব পাপ ভুলে গিয়ে ক্রমাগত উৎসাহ দিয়ে গেছে। তাদের কাছে কেবল কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেই চলে না।

আর প্রকাশক রাজীব চৌধুরীকে ধন্যবাদ দিয়ে খাটো নাইবা করলাম। তাঁকে কতো যে টেনশনে রেখেছিলাম এতদিন, সে আর বলবার নয়। তাছাড়া তিনি যে আমার মতো ভাঙা এক ডালের ওপর বসবার ভরসা করেছেন, সেজন্য তার তারিফ না করলেই নয়।

আরেকজন আছেন সতত স্নেহচ্ছায়া বিছিয়ে। তিনি বাংলানিউজের এডিটর ইন চিফ আলমগীর হোসেন। এ বই তাঁর হাতে তুলে দিলে পারলে কী যে আনন্দ হবে আমার!

এবার আসি আরেকজনের কথায়। এই বইটিকে বিপন্ন জাহাজের মতো তীরে টেনে তুলেছেন এক তরুণ কবিবন্ধু। নাম তার তানভীর আকন্দ। পড়েন সিলেটে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। তানভীর বিশ্বকবিতার এক পাঁড় পাঠক। সেইসঙ্গে অনুবাদকও। যে অবস্থায় পাণ্ডুলিপি জমা দিয়েছিলাম তাতে ফন্টের সমস্যাসহ কত যে টেকনিক্যাল সমস্যা ছিল তার লেখাজোখা নেই। এসবের মূল কারণ আমার টেকনো-আনাড়িপনা। তানভীর নিজের পড়াশোনা ও কাজ ফেলে রাতের পর রাত জেগে এসব ঠিকঠাক করেছেন। তাছাড়া যেহেতু এসব কবিতার বেশিরভাগেরই ইংরেজি ভার্সন তাঁর আগেই পড়া, সেজন্য পুরো কাজটি অন্যদের চেয়ে আরো সহজে হৃদয়ঙ্গম করার বাড়তি সুবিধাও তাঁর ছিল। তিনি আমার জন্য নিখরচায় যে ত্যাগ স্বীকার করলেন, এ যুগে স্বার্থময় পৃথিবীতে তা এক বিরল ঘটনা। জানি না কী দিয়ে তার ঋণশোধ করব। তাঁকে শুধু দূর থেকে একটা লম্বা স্যালুট।

আর পাঠকদের উদ্দেশ্যে কী আর বলব! তাঁরা যদি এই ‘থান ইটটি’কে সহ্য করতে পারেন, তবে আমি ধন্য। তাদের প্রশংসা শুধু নয়, তাদের ভর্ৎসনাও আমার জন্য বড় পুরস্কার। দিনশেষে তারা যদি ‘অনুবাদক বিশ্বাসঘাতক’ বলে ক্ষুব্ধ ইতালীয়দের মতো তেড়েফুঁড়েও আসেন, আমি গর্দান পেতে দিতে রাজি। অলমতি বিস্তরেণ!
.

খিলগাঁ, তালতলা, ঢাকা
৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

আরও পড়ুন : দূরের হাওয়া  বই থেকে কয়েকটি কবিতা 

জুয়েল মাজহার

জুয়েল মাজহার

জন্ম ১৯৬২ সালে; নেত্রকোণা। মার্কসবাদী। কোনো অলৌকিকে বা পরলোকে বিশ্বাস নেই। ঘৃণা করেন পৃথিবীকে খণ্ড-ক্ষুদ্র করে রাখা সীমান্ত নামের অমানবিক ‘খাটালের বেড়া’। লেখেন মূলত কবিতা, বিচিত্র বিষয়ে প্রচুর অনুবাদও করেন।

বর্তমান পেশা সাংবাদিকতা। কৈশোরে বাড়ি ছেড়ে নিরুদ্দেশযাত্রা। দীর্ঘ ভবঘুরে জীবন। পেটের দায়ে নানা কাজ। যৌবনের একটা বড় অংশ কেটেছে পাহাড়ে। সেভাবে বাড়ি ফেরা হয় নি আর।


কবিতার বই :
দর্জিঘরে একরাত [ফেব্রুয়ারি ২০০৩, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা]
মেগাস্থিনিসের হাসি [ফেব্রুয়ারি ২০০৯, বাঙলায়ন প্রকাশনী, ঢাকা]
দিওয়ানা জিকির [ফেব্রুয়ারি ২০১৩, শুদ্ধস্বর, ঢাকা]

অনুবাদগ্রন্থ :
কবিতার ট্রান্সট্রোমার (নোবেল সাহিত্যপুরস্কারজয়ী সুইডিশ কবি টোমাস ট্রান্সট্রোমারের বাছাই করা কবিতার অনুবাদ সংকলন) [শুদ্ধস্বর, ফেব্রুয়ারি ২০১২]
দূরের হাওয়া (বাংলা অনুবাদে ২০০ বিশ্বকবিতা) [চৈতন্য, ২০১৬]

ই-মেইল : jewel_mazhar@yahoo.com
জুয়েল মাজহার