হোম নির্বাচিত জাকির জাফরানের কবিতা : প্রেম ও প্রকৃতি-বীক্ষণের মাঝে জীবনের নব রূপায়ণ

জাকির জাফরানের কবিতা : প্রেম ও প্রকৃতি-বীক্ষণের মাঝে জীবনের নব রূপায়ণ

জাকির জাফরানের কবিতা : প্রেম ও প্রকৃতি-বীক্ষণের মাঝে জীবনের নব রূপায়ণ
726
0
৭ আগস্ট ২০১৫ শুক্রবার, কবি রমজান বিন মোজাম্মেল সম্পাদিত পত্রিকা ‘পুরাতন পাতা’ একক কবিতাসন্ধ্যার আয়োজন করে নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদ মিলনায়তনে। নির্বাচিত কবিকে নিয়ে এমনি আয়োজন ধারাবাহিকভাবে চলবে বলে জানিয়েছেন পত্রিকা-সম্পাদক। প্রথম অনুষ্ঠানটি ছিল প্রথম দশকের কবি জাকির জাফরানকে নিয়ে। এতে আলোচক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন তিন অগ্রজ কবি—শহীদুজ্জামান ফিরোজ, শেখ ফিরোজ আহমদ ও রহমান হেনরী। কবি শেখ ফিরোজ আহমদের বক্তৃতাটি এখানে মুদ্রিত হলো পরস্পরের পাঠকদের জন্য…

 

জাকির জাফরানের একক কবিতাসন্ধ্যায় আজ যারা তার পূর্বঘনিষ্ঠ এখানে উপস্থিত আছেন, আপনারা আপনাদের স্মৃতিটা একটু মিলিয়ে নিন এবং একটু স্মরণ করুন। কিন্তু কী কিভাবে স্মরণ করবেন?

–   প্রথমে ‘সমুদ্রপৃষ্ঠা’র নাম নিন।
–   তারপর?
–   ‘নদী এক জন্মান্ধ আয়না’র নাম।
–   তারপর?
–   ‘অপহৃত সূর্যাস্তমন্ডলী’।

এইগুলো জাকির জাফরানের কবিতার বই। প্রথমটির নাম ‘সমুদ্রপৃষ্ঠা’ (২০০৭)। দ্বিতীয়টির নাম ‘নদী এক জন্মান্ধ আয়না’ (২০১৪)। আর তৃতীয়টির নাম ‘অপহৃত সূর্যাস্তমন্ডলী’ (২০১৫)। প্রথম দুটো বই-এর নাম থেকে বোঝা যায় কবি নদী ও সমুদ্রের ব্যঞ্জনায় হাবুডুবু খাচ্ছেন। আর শেষ বইয়ে কবি হারিয়ে যাওয়া সূর্যাস্তমন্ডলীর নামে অনুভবের দৃশ্যকল্পগুলোয় নিমজ্জমান থাকলেন। কবি যদি প্রেমে পড়ে হাবুডুবু খান তবে আমরাও ব্যবসায়ীদের মতো তাতে নগদ লাভ পাই। নগদ লাভ মানে কিছু দারুণ কবিতাপ্রাপ্তি। ২০১৪ সালের একুশে বইমেলায় যখন ‘নদী এক জন্মান্ধ আয়না’ এল, আমরা হাতে নিলাম—শুরুতেই ‘উৎসর্জন’ নামের উৎসর্গ-চমক। আমরা আটকে গেলাম পাখি ধরা ফাঁদে—কী রকম সেই ফাঁদ?
ওখানে লেখা আছে :

নাসরীন ফেরদৌস চৌধুরী
বউ ও পাখির মধ্যে কে বেশি সুন্দর—
এ কথাটি বলতেই দেখি
বউয়ের হাসি থেকে তৈরি হচ্ছে পাখিপাড়া…

এই হলো প্রেম—আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা ‘নদী এক জন্মান্ধ আয়নায়’ ছড়িয়ে থাকল, পরতে পরতে মিশে থাকল। মিশিয়ে নিল রাজনীতির অনুভবকে। কবির চোখে দেখা মিললো—দয়িতা, দেশ, সমাজ, রাষ্ট্র, সভ্যতা, মানুষ ও প্রকৃতির। শুরু হয় অবগাহন—এই অবগাহন কার সাথে হবে, কোথায় হবে, কেন এবং কিভাবে হবে? এই ভাবনাগুলোর উত্তর জানা দরকার। তাহলে উপায়? উপায় একটাই, তার কাছেই যাওয়া যাক, যিনি আজকের একক কবিতাসন্ধ্যার মধ্যমণি—কবি জাকির জাফরান। শূন্য দশকের অন্যতম মেধাবী কবি। তার সৃষ্টির মধ্যে তিনি কিভাবে প্রশ্নগুলোর দার্শনিক ব্যাখ্যা খুঁজেছেন এগুলো পাওয়া যাবে তার রচিত কবিতায়। যেমন, একটা কবিতায় তিনি প্রকৃতিকে সঙ্গে করে সবাইকে জানিয়ে দিলেন—

ছায়াপথ  পেরিয়ে
গ্রহ নক্ষত্র পেরিয়ে
পৃথিবীর কাছাকাছি এসে
থমকে দাঁড়ালো আলো…
একটি সবুজ পাতা ফ্রক বদলাচ্ছে।
(একটি সবুজ পাতা, পৃ : ২১)

আশ্চর্য সুন্দর এক থমকে যাওয়া অনুভূতির গল্প তৈরি হলো এই মাত্র কয়েকটা পঙ্‌ক্তিতে। একটা আবেশ থেকে যায়—ভাবতে অবাক লাগে বিজ্ঞান ব্যাখ্যা করে কী করে একটা রোমান্টিকতা ফেঁদে বসলেন তিনি। এভাবেই সর্বপ্রাণবাদের আকরে কবি জাকির জাফরান সবকিছুতেই জীবনের সম্পর্কসূত্র নির্মাণ বা প্রকৃতিমুখী নবরূপায়ণ ঘটাতে প্রস্তুত হলেন। কোন ঘোরপ্যাঁচ নেই, সহজসিধা ভঙ্গি—জীবনকে মুহুর্মুহু নানা ভঙ্গিমায় আবিষ্কাকারের অদম্য বাসনাতাড়িত এই কবি—জাকির জাফরান।

তাকে কবিতা-লেখক বলা যাবে না। তিনি আপাদমস্তক গুণী কবি। আমাদের চারপাশে যখন প্রচুর সংখ্যক কবি-অকবি একই সাথে বাংলা কবিতার সবলতা এবং দুর্বলতাকে আড়ম্বরের সাথে উপস্থাপন করছে তখন আমি আমাদের আশার গন্তব্য খুঁজে পাই তরুণ কবি জাকির জাফরানের মাঝে। এটা নিশ্চিত যে, তার কবিতা পাঠকের অভ্যস্ততাকে আহত করে না, বরং আস্বাদনের আনন্দ দিতে চায়। তার ‘নদী এক জন্মান্ধ আয়না’ নামের কবিতার বইটি আমার এই বক্তব্যের সপক্ষে একটি সর্বোৎকৃষ্ট বিজ্ঞাপন হতে পারে। কবি জাকর জাফরান দশক বিভাজনের রীতিতে প্রথম দশকের অন্তর্ভুক্ত। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। বর্তমানে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। আমি কথা বলছি মূলত তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘নদী এক জন্মান্ধ আয়না’-কে সামনে রেখে।

আমাদের এখানে কবিদের আবির্ভাবকালকে চিহ্নিত করার সুবিধার্থে দশক বিভাজনের রেওয়াজ রয়েছে। সেই হিসেবে শূন্য বা প্রথম দশকের কবিরা বাংলা কবিতার জন্য কতটুকু অপরিহার্য বা আদৌ অপরিহার্য কিনা এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আজকের আলোচনা থেকে আসবে না। তবে আস্থার দিক হলো এই দশকে আবির্ভূত কবিরা অবশ্যই দীর্ঘদিন বাংলা কবিতায় ভূমিকা রাখতে সামর্থ্যবান হবেন। কবি জাকির জাফরানের দশকভিত্তিক সহযাত্রী হিসেবে এই দশকে আরো অনেক তরুণ কবিই লিখছেন। তাদের কেউ কেউ মেধা ও সৃষ্টিশীলতায় নজর কাড়ছেন। অমিত সম্ভাবনাময় এই তরুণ কবিদের সকলের জন্যই আমার শুভ কামনা। তবে এদের মধ্যে আমি ব্যক্তিগত আগ্রহের সূত্রে কয়েকজনকে তাদের কবিতাসহ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করি। এই ছোট্ট তালিকায় আছেন সোহেল হাসান গালিব, অনন্ত সুজন, সজল সমুদ্র, তারিক টুকু, জাহানারা পারভীন, রাশেদুজ্জামান, এমরান কবির, শুভাশিস সিনহা, বিজয় আহমেদ, মাজুল হাসান, জুয়েল  মোস্তাফিজ, আসমা বীথি, মাহমুদ শাওন, ফেরদৌস মাহমুদ, শাহিন লতিফ। কবি জাকির জাফরান এই তালিকাকে আরো সমৃদ্ধ করেছেন। তিনিও আমার প্রিয় কবি।

DSC_5135
‘পুরাতন পাতা’ আয়োজিত একক কবিতাসন্ধ্যা

বাংলাদেশ কবিতার দেশ। এখানে কবিদের ভিড় থাকে সব সময়। আজ এই বর্তমান ভিড়ের ক্ষণে বাংলা কবিতার সেরা পুরুষ জীবনানন্দ দাশের ‘কবিতার কথা’ প্রবন্ধের একটি বক্তব্য আমার বেশ মনে পড়ছে। তিনি বলছেন—‘‘সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি; কবি—কেননা তাদের হৃদয়ে কল্পনার এবং কল্পনার ভিতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার স্বতন্ত্র সারবত্তা রয়েছে এবং তাদের পশ্চাতে অনেক বিগত শতাব্দী ধরে এবং তাদের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক জগতের নব নব কাব্য-বিকিরণ তাদের সাহায্য করছে। সাহায্য করছে; কিন্তু সকলকে সাহায্য করতে পারে না; যাদের হৃদয়ে কল্পনা এবং কল্পনার ভিতরে অভিজ্ঞতা ও চিন্তার সারবত্তা রয়েছে তারাই সাহায্যপ্রাপ্ত হয়; নানারকম চরাচরের সংস্পর্শে এসে তারা কবিতা সৃষ্টি করবার অবসর পায়।’’

কবি জাকির জাফরান জীবনের সদর্থক প্রতিনিধি। তার কবিসত্তার অভিপ্রায় শক্তিশালী গন্তব্যের দিকে—তার হাতে বাংলা কবিতার নতুন কর্ষণ অনিবার্য বলে মনে হয়। তার কবি সত্তা আছে, আছে চিন্তা ও কল্পনার একটা সারবত্তা, আছে দৃষ্টিভঙ্গি, আছে ইমাজিনেশন, আছে সমৃদ্ধ শব্দভাণ্ডার। তার কবিতার বই ‘সমুদ্র পৃষ্ঠা’, ‘নদী এক জন্মান্ধ আয়না’ এবং ‘অপহৃত সূর্যাস্তমন্ডলী’ সেই প্রমাণ নিয়ে পাঠকের কাছে সমুপস্থিত রয়েছে।

সংস্কৃত অর্থে কবিকে ‘দ্রষ্টা’ অর্থাৎ জ্ঞানী ভাবা হয়। কবি জাকির জাফরান একজন স্বপ্নদ্রষ্টা বটে। তিনি প্রতিমুহূর্তেই জীবন-সমাজ-রাষ্ট্র-সভ্যতা-রাজনীতির বদলে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন এবং ব্যাখ্যাসূত্র ভেবে ভেবে বের করছেন। কবিতায় অথবা জীবনের বালুকাবেলায় সমুদ্রের ক্রমাগত ঢেউয়ের মতন একের পর এক বোধ নিয়ে আসছেন। তার কবিতা পড়তে পড়তে আবারও আমার মোটা দাগে বেশ কিছু পুরনো প্রশ্ন মনে পড়লো—কবিতা কী, কবিতার কী কাজ এবং মানুষ কবিতা পড়বে কেন? কিংবা কবি জাকির জাফরানের কবিতাই বা বাংলা সাহিত্যের কী উপকার করবে? প্রতিটি প্রশ্নই একটি আরেকটির সাথে সম্পর্কিত। এসবের উত্তর বের করা গবেষকদের কাজ। এই আলোচনা সভায় আজ যারা আছেন, আমি শুধু তাদের ভাবনার মধ্যে একটি গতি আনার উদ্দেশ্যে এই প্রশ্নগুলো তুলেছি। কবিতা যে অনুৎপাদনশীল কোনো বিষয় নয় এবং খুবই দরকারি, এই জায়গাটায় সবার মনোযোগ আমি কেন্দ্রীভূত করতে চাই।

মানুষ, সমাজ, সভ্যতা, রাষ্ট্র, রাজনীতি, ইতিহাস, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো কখন কী রকম আচরণ করবে তার প্রতিফলন পাওয়া যাবে কবিতায়, সঙ্গীতে, নাটকে এবং শিল্পসৃষ্টিতে। আলোড়িত হবে মানুষের মনোজগৎ। সোজা কথায় কবিতা মানুষকে মানুষ করে তোলে। সংবেদনশীলতা, দৃঢ়তা, স্নেহ-বাৎসল্য, ন্যায়পরায়ণতা, উৎসর্গ-প্রবণতা প্রভৃতির মাধ্যমে তার অনুভূতিকে কোমল, দ্রবীভূত, মানবিক করে গড়ে তোলে। কবিতার কাছে এটাই মানুষের ঋণ, কবিতার কাছে এটাই সভ্যতার ঋণ, কবিতার কাছে এটাই ইতিহাসের দায়মোচনের অঙ্গীকার। হিটলারের প্রচার সচিব গোয়েবলস্-এর নামে জনশ্রুতি আছে তার একটি উক্তি নিয়ে : ‘সংস্কৃতির কথা শুনলে আমার হাত চলে যায় পিস্তলের বাটে।’ কী আশ্চর্য, কী অবাক কাণ্ড, এই বর্বরের উত্তরসূরি এখন বাংলাদেশে শিশু রাজনকে পিটিয়ে হত্যা করে, খুলনায় পায়ুপথে হাওয়া চার্জ করে শিশু হত্যা করে! এই ঘাতকরা নিশ্চয় কবিতা পড়ে নি, নিশ্চয় এরা কি প্রেমের গান কি দেশের গান বা সন্তানকে ভালবাসার গান শোনে নি; এরা নিশ্চয় একাত্তরে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তৈরি ‘আগুনের পরশমণি’ ছবিটি দেখে নি। যদি এই ঘাতকেরা কবিতা পড়ত, যদি গান শুনত, যদি ছবি দেখে থাকত তাহলে তাদের মনে এই বর্বরতা, এই বিকৃতি, এই নির্মমতা, এই পৈশাচিকতা আসবার কথা ছিল না। শিল্পের শক্তি তার মানবিক অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণ করত। তার মনকে নরম রাখত—স্নেহ-বাৎসল্য, মায়া-মমতার জন্ম হতো। মানুষকে ভালোবাসতে শিখত, তাতে সভ্যতার উপকার হতো। তাহলে এখানে কবিতার কাজ কী? এর উত্তরটা হবে সহজ— কবিতা মানুষকে ভালোবাসতে শিখায়, কবিতা মানুষের অন্তর্দৃষ্টি সমৃদ্ধ করে, কবিতা মানুষকে অধিকার রক্ষায় সাহস যোগায়, কবিতা মূল্যবোধ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। এই লক্ষ্য অর্জনে কবি জাকির জাফরানের কবিতা নিঃসন্দেহে আমাদের সাহিত্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ চর্চা হিশেবে জায়গা করে নিবে।

জাকির জাফরানের কবিতায় লিরিসিজম এবং সিলেট-সুনামগঞ্জ অঞ্চলের সুফি ঘরানার মিস্টিসিজম একটা মোলায়েম ও উপভোগ্য আবেশ তৈরি করে রেখেছে। কবিতায় নন্দনতত্ত্বকে কিভাবে রূপ দিতে হয়, কবিতায় কিভাবে গল্পের আবহ সঞ্চারিত করে একটা মুগ্ধতার আবেশ তৈরি করতে হয় তা কবি জাকির জাফরান ভালো জানেন।

জাকির জাফরানের কবিতায় রাজনীতির অনুষঙ্গও এসেছে। এ প্রসঙ্গে মাথায় কিছু প্রশ্ন এসেছে— কবিতা কি নিজ নিজ রাজনৈতিক মতের মুখপত্র, নাকি শিল্প হবে? কবিতার জন্য রাজনীতি ও ইতিহাস-চেতনা কতটুকু নিয়ামক ভূমিকা নেবে, কবিতা কি রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার ভিত্তিতে রচিত হবে, নাকি কবিতায় শিল্পের প্রয়োজনে যতটুকু সময়-লগ্নতা আসা দরকার ততটুকুই আসবে? কবিতায় যদি রাজনীতির স্থূল বক্তব্যই প্রধান অন্বিষ্ট হয় তাহলে পারপাজ সার্ভ হবে মাত্র, কিন্তু কবিতা মরে যাবে—কবিতা আর কবিতা থাকবে না। পোস্টারের চিৎকার-ভাষ্য, স্লোগান হয়ে উঠবে কবিতা। এ কবিতা দাবি-দাওয়ার ফিরিস্তির রূপ নেবে। এ কবিতা শিল্প হবে না, এ জীবনবোধ-জারিত কালোত্তীর্ণ রূপ পাবে না। জাকির জাফরানের কবিতায় এসব কিছু নেই, আছে রাজনীতি-ভাবনার শিল্পাশ্রয়ী দার্শনিক প্রতিক্রিয়া মাত্র। এও কম পাওয়া নয়। যেমন—

বিস্ফোরিত হলো বোমা
কিন্তু মানুষটি মারা গেল
গভীর নৈঃশব্দ্যে।    (বোধ / পৃ : ৫৫)

ককটেল ফাটে—
এই শব্দ গিলে খায় দোয়েলের শিস।

রাস্তায় টায়ার পোড়ে—
এই ধোঁয়া ছেয়ে ফেলে সুনীল আকাশ।

ছর্‌রা গুলি
মাতৃগভের নির্জনতাকেও খুন করে।

আমার শহরে আমি আগন্তুক, মাগো!
কার কাছে যাবো!!       (হরতাল/ পৃ : ৬৭)

শাসক ও শোষিতের ঠিক মধ্যখনে
যে-ফাঁকা, যে ফাঁদ,
সেইখানে বাঁকা হয়ে আছে রোদ।
সেইখানে বাস করে শুভঙ্কর—
গণ্ডমূর্খ, সাদাসিধে, আর তুলনাবিহীন।    (শুভঙ্কর/ পৃ : ৭১)

জাকির জাফরানের কবিতায় লিরিসিজম এবং সিলেট-সুনামগঞ্জ অঞ্চলের সুফি ঘরানার মিস্টিসিজম একটা মোলায়েম ও উপভোগ্য আবেশ তৈরি করে রেখেছে। কবিতায় নন্দনতত্ত্বকে কিভাবে রূপ দিতে হয়, কবিতায় কিভাবে গল্পের আবহ সঞ্চারিত করে একটা মুগ্ধতার আবেশ তৈরি করতে হয় তা কবি জাকির জাফরান ভালো জানেন। দীর্ঘকবিতায় গল্প-কাঠামোর এক্সপেরিমেন্ট বাংলা কবিতায় নতুন নয়। এমনকি চেখভ এবং মোপাসাঁর পাশাপাশি যাকে ছোটগল্পের আরেকজন আন্তর্জাতিক মাস্টার ভাবা হয় সেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তার পুনশ্চ  কাব্যের এক দুঃখী নায়িকার মুখ দিয়ে বলিয়েছিলেন আরেক কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র যেন তাকে নিয়ে গল্প লিখেন। রবীন্দ্রনাথের কী অসাধারণ এই প্রকাশভঙ্গি, কী দারুণ তৎপরতায় শিল্পের দাবি পূরণ করেছে,  তৈরি হয়েছে সংবেদনশীল মনোবেদনার এক অজেয় সৃষ্টি। কবি জাকির জাফরান এই মাপের উচ্চতায় যেতে পারবেন অথবা পারবেন না—এটা আমার কাছে মোটেও বিবেচ্য নয়। এই সময়ের একজন পাঠক হিসেবে জাকির জাফরানের কবিতা আমার ভালো লাগে। এটা অবশ্যই তার একটা ভালো রকমের কৃতিত্ব। তিনি প্রধানত গদ্যছন্দে লিখে থাকেন। তার কবিতায় শব্দের প্রচলিত অর্থমুক্তি অনিবার্য, চিত্রকল্পের ভিন্ন দ্যোতনা, শেষটায় ছোটগল্পের সংজ্ঞার মতো অতৃপ্তির অপেক্ষা প্রধানতম টেকনিক হিসেবে কাজ বরে। কখনো তিনি গিওম অ্যাপোলিনিয়ারের ক্যালিগ্রাফিক পোয়েট্রি তৈরি করেছেন। তার আরেকটি গল্পধর্মী কবিতা এ রকম—

‘আজ বাবা অঙ্ক শেখাচ্ছিলেন
বললেন, ধরো ডালে-বসা দুটি পাখি থেকে
শিকারীর গুলিতে একটি পাখি মরে গেল
তবে বেঁচে থাকলো কয়টি পাখি?
অঙ্কের বদলে এই মন চলে গেল
বেঁচে থাকা সেই নিঃসঙ্গ পাখিটির দিকে
আর মনে এলো তুমি আজ স্কুলেই আসোনি।   (চিঠি)

এখানে শেষ পঙ্‌ক্তিটি সাহিত্যপণ্ডিতদের তৈরি করা পরিভাষা অনুযায়ী ফ্রি অ্যাসোসিয়েশন বা মুক্ত অনুষঙ্গ। কবিতাটির বয়ন কৌশল হিসেবে দেখা যাচ্ছে প্রথম ৬ পংক্তিতে যখন জুটির একটি পাখির মৃত্যুর পর নিসঃঙ্গ অপর পাখিটিকে ঘিরে যখন বিষণ্নতা তৈরি হচ্ছিল ঠিক তখনই চলে এল একজন তুমি’র আজ স্কুলে না আসার প্রসঙ্গ, আরেকটি নিসঃঙ্গতার অনুভব। এই হচ্ছে কবি জাকির জাফরান, তার কবিতায় ভিন্নমাত্রিক স্বতন্ত্র স্বর তৈরি হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।

এই পরিক্রমায় কয়েকটি দিক নিয়ে ছোট ছোট পর্যবেক্ষণ :

১. জাকির জাফরানের কবিতায় পাওয়া যায় প্রচলিত ধরনের বাক্যবিন্যাস বা শব্দার্থকে সচেতনভাবে এড়ানোর প্রয়াস এবং নতুন ভঙ্গিতে উপস্থাপনকৌশল রপ্ত করার অবিরাম চেষ্টা। তিনি গদ্যছন্দের যথেচ্ছ ব্যবহারে সাবলীল। তবে মাত্রাবৃত্ত বা স্বরবৃত্তের মতো কিছু কিছু জায়গায় কাজের ক্ষেত্রে আরেকটু স্বাচ্ছন্দ্য তৈরি করতে পারেন। প্রেম-অনুভূতির ক্ষেত্রে মনের ভিতরের নানা পরিবর্তনের  কয়েকটি উদাহরণ—

একদিন তুমি তরমুজ কেটে নিয়ে এলে
খেতে খেতে ভাবলাম—
তরমুজ কাটলে দু’ভাগ হয়ে পড়ে থাকে তার লাল আকাশ।
কিন্তু হৃদয় দু’ভাগ হলে মাথার উপরে কোনো আকাশ থাকে না।     (লাল আকাশ/ পৃ : ১২)

ঘর মানে শুধুই ঠিকানা নয়
নয় শুধু ধূসর খেয়াল।

ঘরের ভিতরেও নদী বয়

নারী ছাড়া নদী ছাড়া
ঘর মানে শুধুই দেয়াল।      (ঘর/  পৃ : ৩৯)

কেউ দেখেনি কেউ দেখেনি সোনা
নাভির নিচে জাগছে পান্থশালা
বকুল গাছের মান ভাঙানো রাতে
শরীর যেন বকুল ফুলের মালা।   (বকুল গাছের মান ভাঙানো/ পৃ : ১৪)

২. কবিতায় ব্যবহারের জন্য কবি প্রকৃতির কাছ থেকে অকৃপণভাবে অনুষঙ্গ, উপমা, চিত্রকল্প, তুলনা, দর্শন ঋণ নিয়ে খেয়ালখুশি মতো পঙ্‌ক্তির পর পঙ্‌ক্তি সাজিয়েছেন। ঋতু পরিবর্তনের সাথে কবির মনোজগতের পরিবর্তনকে একাত্ম করে চিত্রকল্প তৈরি ছিল কবির ক্ষেত্রে সাধারণ ঘটনা। শক্তিশালী লেখকদের পক্ষেই কেবল এই কাজটি করা সম্ভব। যেমন—

আমার গ্রীষ্মের স্পর্শগুলো
তোমাকে ভাসায় বৃষ্টিজলে, ঘাসের সমুদ্রে।
কেউ কি ভুলতে পারে বাদামি স্পর্শের ফুল?
তোমার বর্ষার জল
শুকনো পাতার মতো মচমচে করে ফেলে আমার হৃদয়   (তোমার বসন্ত দিন/ পৃ : ১১)

তুমি গায়ে দিয়েছ আকাশ ও পৃথিবী। আর, ঝিঁঝিঁ পোকার জানালা
দিয়ে দেখা গেল চন্দ্রালোক। শরতের বিজন রাত্রিতে
.. .. .. .. .. .. .. .. .. .. .. .. .. .. .. .. .. .. .. .. .. .. .. ..
এমন চন্দ্রকিরণের নিচেও , পাখি ছুঁতে পারে না তার পাখিনীর চুল   (নাসরিন/ পৃ : ২২)

একবার অঙ্কুরোদগমের শব্দে ঘুম ভেঙেছিল।
একদিন সমুদ্রের জলে কান পেতে শুনেছিলাম
মাছে ও ঝিনুকে কথোপকথন।        (বউ ও ভাতের গন্ধ/ পৃ : ১৫)

সূর্যাস্তেরই জামা গায়ে দিয়ে তুই
কীভাবে আনতে পারিস সবুজ ভোর?     (হৃদয়ওয়ালা/ পৃ : ৪৮)

৩. ক্ষেত্রবিশেষে, কবিতায় যখন শব্দসমবায় তৈরি করেন তখন এক ধরনের চমক সৃষ্টির অভিপ্রায় পাওয়া যায়। এই প্রকরণ-পদ্ধতির ক্ষেত্রে তার পারঙ্গমতা ঈর্ষণীয় রকমের। পরাবাস্তব কৌশলের এই নির্মাণ-কোলাজ খানিকটা ভিন্ন স্বাদ এনে দেয়। কখনো কখনো কবিতায় পাওয়া যায় পরিত্যক্ত নগরীর সুনসান নীরবতার ভৌতিক পরিবেশ। কয়েকটি উদাহরণ—

নাকফুলে শিশিরের স্মৃতি, এখনও উজ্জ্বল।
শীত আমার মা। কুয়াশা তার চুল। তাকে, ধীরে ধীরে, অবয়ব দিলেন
প্রভু। বরফের চাকুতে বানানো হলো তার চোখ।  (শীত আমার মা/ পৃ; ১৩)

বহুদিন পর পুরনো শার্টের ভাঁজে পাওয়া গেল অমাবশ্যার গান, প্রথম
প্রেমের ছেঁড়া স্ক্রিপ্ট, বাদুড়ের ঠোঁটে ঝুলে থাকা চাঁদ, আর মৃত বন্ধুর
চিঠি। আমরা দু’ন ফিনফিনে সেই শার্টের ভেতর ঢুকে পড়লাম।
আমাদের প্রথম শীতের মধুচন্দ্রিমায়।   (পরিত্রাণের ঘাটে/ পৃ: ১৬)

দুটি প্রেমের উপমা—

ঘুমের ঘোরে সেই পাখিটি শিস দিয়েছে
তাতেই কিনা বালকটিরও ঘুম পেয়েছে।    (কাব্যর জন্য কবিতা/ পৃ : ২৪)

তোমাকে ঘুমন্ত দেখা
বহুদিন না দেখার মতোই গভীর।   (গভীর/ পৃ : ২৭)

উপসংহার :
কবি জাকির জাফরান তার মেধা, প্রজ্ঞা ও ভাবনায় তিলতিল করে নির্মাণ করেছেন ‘নদী এক জন্মান্ধ আয়না’। মূল বইটি ৩টি উপপর্বে বিভক্ত। যথা— লাবণ্যস্তম্ভের মতো, নদী এক জন্মান্ধ আয়না এবং রক্তমোচনের দেশে। এই তিনটি ক্রমিক পর্ব নিয়েই সমন্বিত রূপ পেয়েছে ‘নদী এক জন্মান্ধ আয়না’। অঞ্জলিময় প্রেমের ব্যাখ্যা উপস্থাপন ও প্রকৃতিবীক্ষণের মধ্যে দিয়ে জীবনের নবরূপায়ণ তৈরি করেছেন কবি। ‘নদী এক জন্মান্ধ আয়নায়’ প্রেম, ক্লেদাক্ত পঙ্কিল রাজনীতি, নৈরাজ্য, প্রকৃতির নিবিড় পাঠ ও প্রকৃতিবীক্ষণের অনবদ্য কিছু দার্শনিক উপলদ্ধি ও ব্যাখ্যা এই বইয়ের কবিতাগুলোয় পাওয়া যাবে। শেষ পর্যায়ের দুটি উদাহরণ—

নদীও কূটনীতি জানে,
কথা দিয়ে কোনোদিনও জল সে দেয় না,
কোনোদিনও সমুদ্রে মেশে না,
তৃষ্ণার্ত হোসেন হায়! নদী এক জন্মান্ধ আয়না।   (নদী এক জন্মান্ধ আয়না/ পৃ : ৫৩)

তোমার কবর কপোতাক্ষ নদের মতো।
সতত মনের ভাঁজে ভাঁজে স্রোতধারা বয়ে যায়।    (শোকগাথা/ পৃ : ৮০)

ধন্যবাদ সবাইকে।
৭ আগস্ট ২০১৫/ নারায়ণগঞ্জ

Firoz ahmad

শেখ ফিরোজ আহমদ

জন্ম ১ আগস্ট ১৯৬৩, চাঁদপুর।
অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা : উন্নয়নকর্মী।

প্রকাশিত বই :
পাতকীর ছায়া [কবিতা, অন্তরীপ প্রকাশনী, বগুড়া, ১৯৮৭]
কালের পৃষ্ঠায় [প্রবন্ধ, যুক্ত, ঢাকা, ২০০৮]
মাতরিশ্বা [কবিতা, ভাষাচিত্র, ঢাকা, ২০১০]

ই-মেইল : firozbangla@yahoo.com
Firoz ahmad