হোম বই নিয়ে চিন্তামণির মুখ

চিন্তামণির মুখ

চিন্তামণির মুখ
473
0

মুক্তি মণ্ডল ওনার কবিতা লিখে যাচ্ছেন! অনেক কবিতা। কবিতার ভিতর কবিতা। আজব লাগে ভাবলে, এত কাব্যভাষ ওনার মাথায় আসে কোত্থেকে?

ঘটমান তো ঘটমান না। ইতিহাস ইতিহাস না। ইতিহাস হলো ঘটমানে তার চিহ্ন। ঘটমান হলো ইতিহাসে তার চিহ্ন। এই আবহমানতা কি মুক্তির মনে ধরা দেয় এমন কোনো সরাসরি জটিলতায়, যা সরাসরি প্রতীকে প্রকাশ করা সম্ভব না?

ইঙ্গিতপ্রিয় ভাষা। রূপকের নান্দনিক খেলা, শেকড়সন্ধানী। কিন্তু পশ্চিমা অর্থে ‘পিওরিস্ট’ না। বরং দেশজ মাটির দিকে, আদি ধূলার দিকে এলায়িত এক দোদুল্যমান নাগরিকতা। যেন কোনো তান্ত্রিক জ্ঞান। লেখক ঠিক খুলে বলতে চান না (যেন বলে দিলে মানুষ ভুল বুঝবে)! বরং কাব্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকেন।

মায়ামুকুরে চাকু বসিয়ে পুরনো নথের বাজার থেকে একে একে বাড়ি ফিরছে মেঘশিকারের দল। চুপ করে আছে শুকনো বটপাতার লেঠেল বাহিনী। গভীর রাতে পদ্মপাতায় জেগে উঠছে শ্রীশুদ্ধতমা, হৃদপিণ্ডের খোলা খাম

                               (সমুদ্র দৃশ্যের নর্তকী- ৩)

মুক্তির কাব্যচিন্তার একটা বড় অংশ জুড়ে আছে বাউলতত্ত্ব

মুক্তির প্রতীক ঘোরানো প্যাঁচানো। প্রায় প্রায় একটা গুরু-প্রতীক আসে আরেকটা গুরু-প্রতীকের উছিলায়। অনেক বাক্যেই উপমান উপমিত দুইই, যাকে বলে ‘open to interpretation’। ফলে, হোলসেল রেটে বিমূর্তায়ন চলছে।

v●   ●   ●

প্রকাশক : এন্টিভাইরাস পাবলিকেশন
প্রচ্ছদ : নির্ঝর নৈঃশব্দ্য
মূল্য : ১৫০ টাকা

●   ●   ●

আরেকটু সরল, স্বাভাবিক ভাষায় কি কবিতা সম্ভব ছিল না?

ছিল নিশ্চয়ই। তবে ভাষাকে স্বাভাবিক করার দিকে না যাওয়াটা মুক্তি মণ্ডলের সিদ্ধান্ত। আমার ধারণা, এর কারণ হলো মুক্তির কাব্যচিন্তার একটা বড় অংশ জুড়ে আছে বাউলতত্ত্ব।

এক একটা ঝিঁ ঝিঁ পোকার জীবন এক একটা মানুষের জীবন থেকে পৃথক হতে পারে না—এ রকম ভাবনা থেকেই গড়ে ওঠে চিন্তামণির মুখ।

                                                   (সত্যকথকের হাড়-২)

এই ‘চিন্তামণি’ লোকায়ত দর্শনের পরম্পরাজাত। মুক্তির ভাষায় এমন বহু শব্দ, অভিব্যক্তি পাওয়া যায় যা অনার্য তান্ত্রিক মতবাদের দিকে ইঙ্গিত করে— ‘দেহভাণ্ড’ / ‘বাঞ্ছা’ / ‘অরি’ / ‘গণপতি’ (গণেশ) / ‘সতেরো গনেশ’ / ‘দোঁহা কোষ’। “এরা নির্দিষ্ট নৈশপালে সবাই মিলিত হয়, তাদের দেহতেই সহস্র স্ত্রীগণ ভোর হলেই স্নানে যায়…”—স্পষ্টতই লোকায়তিক কৃষ্টি থেকে উঠে আসা ভাবনা [১]। সাংখ্য, তন্ত্র ইত্যাদি আদি কৃষিজীবী মতবাদগুলির মাতৃপ্রাধান্যও মুক্তির শব্দব্যবহারে দুষ্প্রাপ্য না—’অন্নপূর্ণা’, ‘শস্যদেবী’, ‘কালি’, ‘শিবানী’ ঘুরে ফিরে আসে। এবং মুক্তি ওনার এই বাউলভাবনার ফিউশন ঘটান টিপিক্যাল নাগরিক অনুষঙ্গের সাথে। চলে আসে রাষ্ট্র, ‘হেফাজত’, সিকিউরিটি ব্যাঙ্ক, টাকশাল, বিউটিপার্লার, টকশো, গণতন্ত্র, কর্পোরেট টাই, পেট্রলবোমা। বিশ্ববাজারে কবির স্বভাবজ হতাশা। পুঁজিবাদের সমালোচনা। পুরুষতন্ত্রের গোড়া আবিষ্কারের ইঙ্গিত। লোভচক্র। লোকায়তিক ও পৌরাণিক উৎপ্রেক্ষা। সব মিলিয়ে বুদ্ধিবাদে আটক আধুনিক মধ্যবিত্তের আধ্যাত্মিক মুক্তির অনুসন্ধান।

তবে এই অনুসন্ধান মুক্তি চালাচ্ছেন কবি হিসাবেই, নবী হিসাবে না। মুক্তির সেটা অভিপ্রায়ও না বোধ করি।

ব্যক্তির অচেতন পাতায় ফুটে ওঠা ইশারাকে কি ধরা যায়?

মনে হয় হাতের মধ্যে আয়নার প্রতিচ্ছবি

ভেঙে পড়ছে

ভেঙে পড়ছে কুসুমের ছিন্ন হওয়া রাত নোলক

এটা সত্য নয়, ভেল্কি

পাতাঝরা শব্দের মধ্যে লুকিয়ে আছে সত্য

                              (ভেল্কিবাজের আনন্দধাম- ৯)

 *  *  *

হয়তো মুক্তি মণ্ডলের নিজস্ব লেন্স ওনার ভাষাকে নির্দিষ্ট করেছে

যিজেকের একটা বই পড়ছিলাম কয়দিন আগে। শুরুতে মজার কিছু কথা আছে। অনুবাদ করলে মোটামোটি এমন দাঁড়াবে— “দর্শন কি আসলেই একটা ছায়ার থিয়েটার মাত্র? একটা নকল-ঘটনা, যা নির্বীর্যের মতন সত্য ঘটনাকে অনুকরণ করছে? নাকি দর্শনের মূল শক্তিটাই এই সরাসরি না হওয়ার ভিতর লুকানো?  ব্যাপারটা কি এমন যে, ঘটনার অব্যবহিত বাস্তবতা হতে তার প্রাসাদোপম দূরত্বের ভিতর দিয়েই সে এই একই ঘটনাবলির অনেক বেশি অগাধ একটা মাত্রা দেখতে পায়, সুতরাং চারপাশের ঘটনার মালটিপ্লিসিটির সাথে আমাদের পরিচিত হবার একমাত্র উপায়ই হলো তাদেরকে দর্শনের লেন্সের ভিতর দিয়ে দেখা?” [২]

‘ভেল্কিবাজের আনন্দধাম’ পড়তে পড়তে কিছু প্রশ্ন তুলেছিলাম লেখার শুরুতে। যিজেকের কথাগুলি নিতান্তই দর্শন প্রসঙ্গে হলেও, দর্শনের জায়গায় ‘মুক্তির বিমূর্ততা’ বসিয়ে বসিয়ে পড়লে সেই প্রশ্নগুলির কেমন যেন কিছু উত্তরও দাঁড়িয়ে যায়! হয়তো মুক্তি মণ্ডলের নিজস্ব লেন্স ওনার ভাষাকে নির্দিষ্ট করেছে। ওনার কবিতার মূল জায়গাগুলি অন্য ভাষায় লেখা হয়তো আসলেই সম্ভব না!

কবিকে শুভেচ্ছা।

 

দোহাই:

[১] বাউলতত্ত্ব, আহমদ শরীফ, পৃষ্ঠা ১৮-৩৫

[২] Event – Philosophy in Transit, Slavoj Žižek, page 8

mesbah@gmail.com'
mesbah@gmail.com'

Latest posts by মেসবা আলম অর্ঘ্য (see all)