হোম নির্বাচিত কাঠঠোকরার ঘরদোর : পাঠপ্রতিক্রিয়া

কাঠঠোকরার ঘরদোর : পাঠপ্রতিক্রিয়া

কাঠঠোকরার ঘরদোর : পাঠপ্রতিক্রিয়া
283
0

ছন্দ, ঐকতান, স্বর ও সুরবিহার ইত্যাদির বাইরেও, কিংবা ইত্যাদির জননী হিসেবে কবি যা কিছু দেন তা দিয়েই আমি অন্তত কবিকে বুঝতে চাই। কবিরা সম্ভাবনা নিয়ে আসেন। কেউ কেউ ঐকতান বা এমন কিছুকে প্রোথিত করে দেবার মানসে কিছু সম্ভাবনা সুপ্ত রাখেন; পরে করবেন বলে ভাবেন নিশ্চয়। তা ওনার একান্ত অধ্যায়। আমার আগ্রহ—যা হাতে পেলাম তা বুঝে নিয়ে সম্ভাবনার দিকে আশা নিয়ে তাকিয়ে থাকাতে। আল ইমরান সিদ্দিকীর প্রথম কাব্যগ্রন্থ কাঠঠোকরার ঘরদোর পড়ছিলাম আর তার বইটি এসব কথা ভাবাচ্ছিল আমাকে। কিন্তু, অত কথা এখানে বলবও না, লোকে মন্দ বললে বলুক। বরং বইটি যেসব রঙ ও রঙ-আশ্রয়ী ও ক্ষণিক আলোর আভাসের ভাষা, সুপ্ত উল্লম্ফনে ভাষার পাশেই সহজ এক ভাষার ও মানসের প্রকাশ ঘটালো, তার দিকে দেখব।

বলে লোকে, কবিতা বস্তুত যাত্রার ইতিহাস। অনেকের মতে যাত্রার শেষটা দেখিয়ে দিলে তথা ফাইন্যালিটির জগৎটা নিয়ে বললে নাকি তেমন আর্কষণীয় হয় না বিষয়টা, কেননা বাস্তব সেখানে নির্বাণ পাওয়া সৌরঝড়ের পর প্রায় প্রস্তরের রূপ ও মৌনী। যাত্রার গাথা বরং শ্রেয়তর, ভাবেন অনেকেই। সেই যাত্রায় কিম্ভূত সব অভিজ্ঞতা লাভ হয়। কিম্ভূতের কথা কবিই বলতে পারেন, সাধারণের সে ভাব বোঝার কথা নয়। আমরা আল ইমরান সিদ্দিকীর কবিতায় সেই যাত্রার কথাই পড়ি। যেখানে যন্ত্রণাগুলোর ফাঁকে পাতা গলা আলোর মতো সুপেয় সুখানুভূতির দেখা প্রায়ই মেলে এবং এর কৃতিত্ব অবশ্যই কবির, দীর্ণ জগৎটির নয় একেবারেই। কেননা কবি বলেই ইমরান দেখেন, শুনতে পান, শ্বাস নেন, বেঁচে থাকেন এবং আমাদের শোনান।

কত না রঙ তিনি যাপন করলেন দেখি—কমলা সৌন্দর্য, অ্যাকোয়া, ক্রিমসন, ক্ষত্রিয়-সবুজ, খয়েরি-সাদা, অরুণাভ প্রজাপতি, নিবিড়-হরিৎ, আলো-হরিৎ, উন্মাদ বিস্তারে শত-রঙ বিস্ফোরণময় বসন্ত

যন্ত্রণার ইতিহাস দীর্ঘ হলে তাকে মনোদেহ সয়ে তো নেয়ই, এক নৈর্ব্যক্তিকতায় তাকে বুঝতে শুরু করে। সে অবশ্য কিছুটা যেন চিন্তকের বেলায় ঘটে। কবির বেলায় ঘটে ভিন্নরকম। পৃথিবীতে জীবন এক অনাস্থার ভেতর দিয়ে যায় বলেই কেউ কেউ এখানে গুলি গেলেন, কেউ অ্যাবসিন্থ খান ও সাইকেডেলিক ঘোরে নিজেকে সঁপে দেন। কবি কিন্তু চলেন ভেতর দিয়ে—ঐ সব পথের ওপর কাঠিন্যের, রূঢ়তার, অনাস্থার চাপে যেসব ছাপ পড়ে তাদের আনমন করে দেওয়া সব নকশা দেখে দেখে, আত্মায় মেখে। সেসব বিন্যাস, ক্যামিও, ইন্ট্যাগলিও ও এর মাঝে আরও সব বুনন থেকে কবি নিজের দিশা ঠিক পেয়ে যান।

যেমন ইমরান পেয়েছেন হরিৎ বর্ণে ও কথায়, যা তার আত্মাকে গড়ে দিয়েছে বলে দেখেছি এই কবিতাগ্রন্থে। তার সহজতা মাখা ভাষায় স্বীকারোক্তি শুনি শরীর ভর্তি ঠাট্টার, কুণ্ডলে গুটিয়ে যাবার, ভয়াল সব মুখোশের ঝড়ও থাকে, কাগুজে বিমানের ঘুরপাক খেয়ে মাটিতে থুবড়ে পড়ার কথা শুনি অবসন্নতার অবলোকনে। ধ্যান নস্যাৎ করে দেয়ার মতো বহু-উপস্থিত দ্বিধা—পরস্পরবিরোধী সত্য থাকলেও তিনি গ্যালাকটিক নির্জনতা চান, মন্দ্রিত সমুদ্রেই সমাধান পান, তার ইচ্ছে হয় সবুজ পাতায় হাত মোছেন, দেখতে পান রক্তবীজ (রক্তবীজ!! শুনতে কি পেলাম শূন্যের প্রতিধ্বনি?) সবুজ হয়েছে, ক্ষীণতোয়া ও অচর্চিত এক নদীতীরকে তার মনে  হয় নাভিস্থানীয় (আহ! নাভি, যেন সূর্যের কুণ্ডল—অনুভূতির কত গভীরে আমার!!!) এবং দীনতা মুছে যেতে চায় তার। কত না রঙ তিনি যাপন করলেন দেখি—কমলা সৌন্দর্য, অ্যাকোয়া, ক্রিমসন, ক্ষত্রিয়-সবুজ, খয়েরি-সাদা, অরুণাভ প্রজাপতি, নিবিড়-হরিৎ, আলো-হরিৎ, উন্মাদ বিস্তারে শত-রঙ বিস্ফোরণময় বসন্ত। বাংলা কবিতায় শূন্যের দশক যেসব অঙ্গীকার নিয়ে এসেছিল ইমরান সেসবের মাঝে নিজেকে খুঁড়ে দেখেছেন ওপরে বলা প্রত্যয়গুলোয়। কবিতা বহুরকমের হয় যেহেতু, বাস্তবেরও তাই বিভিন্ন হবার সম্ভাবনা থাকে। বৈচিত্র্য বরাবর উল্টো পথেই আসে না কেবল, মনে রাখি আমি। কাছাকাছি বাস্তবকে ভিন্ন মাত্রায় বা ভিন্ন দিশায় দেখেছেন ইমরান। দুটো সদৃশ জগৎ দেখি এখানে—

নিঃসঙ্গ বৃদ্ধের কথা / রণজিৎ দাশ

আজও মনে পড়ে সেই নিঃসঙ্গ বৃদ্ধের কথা, নদীতীরে বসে তিনি জাল বুনছিলেন। জিজ্ঞাসা করেছিলাম, মাছ ও জলের এই গভীর সংসারে তিনি এত একা কেন, সূর্যাস্তের পর কে তার প্রতীক্ষা করে, হাতে নিয়ে নিভু হ্যারিকেন। আকাশে নিবদ্ধ চোখ, মৃদু হেসে, ছিল তাঁর সংক্ষিপ্ত উত্তর : ‘এখানে আমার কোনো নিকট-আত্মীয় নেই, শুধু এক দূরসম্পর্কের ঈশ্বর আছেন।’

বলিরেখাময় / আল ইমরান সিদ্দিকী

ধরে নিয়েছিলাম, বৃদ্ধ লোকটি তার তামাটে মুখ ও এক নিরাকার ঈশ্বর ছাড়া আজ আর কিছুই ধারণ করে না। তার যৌবন, তার ফুলের মতো অগ্নিকণা, সেই কবে অগ্নিকণার মতো ফুল হয়ে শেষে আজ ছিন্ন পাপড়ি ক্ষীণতোয়া শরীরগাঙে ভেসে আছে। এখন দেখি সে বৃদ্ধ, মাধবীলতার দুলতে থাকা ছায়া নিজের টুপিতে ফ্যালে আর বলে ওঠে, ‘মরহুমার কথা মনে পড়ে’। হয়তো মনে পড়ে নতুন ঘর, দারুনকশা, কারো ভরাট স্তনের ওপর শিশুর কান্না, কান্নার দাগ, দাগে নিজের হাতটি মমতায় বুলিয়ে যাওয়া। আজ সবই তার স্মৃতি; তার আপন মানস জুড়ে শেষহীন ছায়াবাজি।

আমি বলি দুই কথা এগিয়ে ইমরান বৃদ্ধের জীবনের অন্তরে প্রবেশ করেন। অগ্রজের ঋণ শুধে দেন তিনি।

ইমরান শূন্যতাকে ভরে দিতে চান বিকাশে প্রকাশে, তবে ভঙ্গির লীলায়, বিলাসে। তার ভালো লাগে সুফি-নৃত্যের ভঙ্গি, ওড়ার ভঙ্গি, তাকিয়ে থাকাকেই করে নেন প্রার্থনার ভঙ্গি, তার অনুভূতি বিকশিত হয় উন্মীলন ভঙ্গির মতো করে। এর পরের যাত্রাটি নিশ্চয়ই ভঙ্গির অন্তর্দেশে ঘটবে তার; দুয়েকবার যে সেখানে তিনি যান নি, তা তো নয়। কিছু পরে তাও লিখছি আমি।

ইমরানের কাঙ্ক্ষার সততা স্বতন্ত্র। তার ‘ক্রিমসন লেক’ কবিতায় বারংবার কান্নার ফোঁটার পাশে অাঁকা হয়ে যাওয়া বৃত্তের ছবিটি যে বিষণ্নতার ছবি গড়ে তার কেন্দ্রে স্থির এক কবির চোখ দেখতে পাই, যিনি অন্তর্দৃষ্টির আরাধ্যের দিকে যাত্রা করেছেন। ‘বিপর্যস্ত’ শিরোনামের কবিতাতে তিনি উদ্ভাসনের কথা আনেন, এবং সেই যাত্রার লক্ষণ আবারও দেখি। সিজ দ্য ডে’র হ্বিলেল্ম অ্যাডলারের মতো কাঁদেন তিনি, তবে শুশ্রূষা মাখতে মাখতে। দুই হাত প্রসারিত রাখেন তিনি। অভিমান মুছে ফেলে পৃথিবীর সব ছায়া এবং ঢেউ ফেটে পড়ার আগে-পরে তারা বহুভাবে ধ্যানভঙ্গিমা গঠন করে—এমন দেখেও প্রাণায়ামে নিজ সাধনায় দূর ভ্রমণের তীব্র তাগিদ জাগরূক হয় তার। আস্থা ও আশায় বলেন, বুকে মর্মজ্ঞানের পদ্ম ফুটুক। সুঘ্রাণে জাগে অনাগত স্মৃতি, জীবন নব-নবায়মান হয়, শরীরময় জাগে সঙ্গীত। তিনি দেখেন বিমূর্তায়নের পথে উড্ডীন চতুর্দিক, বহু বিবর্ণ কুণ্ডলের কেন্দ্রে অমোঘ কুণ্ডলের রূপে জ্বলা এবং হিরন্ময় প্রজাপতির রূপে জীবন। চোখ বন্ধ করলেই ভরাট কুণ্ডলিত হার্লিকুইন সুর শুনতে পান কবি। চোখে তাঁর উপচে পড়া সুর লেগে থাকে। ধ্যানের মাঝে তিনি গর্ভকালীন নীরবতার নামকরণ করেন জীবন, স্বাগত জানানো সবুজ দরোজায় প্রসববেদনা জাগে। কাঁটাতারে মুখ রাখেন যদিও, জীবন তাঁকে ডেকে নেয় থেকে থেকে লাফিয়ে ওঠার নাচে। এসব প্রত্যয়ে আমরা চিনি কবিকে—যে কথা ভঙ্গির অন্তর্দেশের। অন্য যা খোঁজ করি, তার ধ্যানের চিহ্ন তো আল ইমরান সিদ্দিকী রেখেছেনই। একদিন তিনি স্থির বসতি করবেন সেই ধ্যানে—এই আশাকে আমি দুরাশা বলে স্বীকার করি না, অন্তত এখনই নয়। বোধ করি আল ইমরানের সেই মোক্ষ নিশ্চয় দূরে নয়। তার সেই যাত্রার প্রত্যয়ের প্রতি শ্রদ্ধা।

 

তানভীর মাহমুদ

তানভীর মাহমুদ

জন্ম ৯ অক্টোবর, ১৯৮০, ঢাকা। ইংরেজিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। এমবিএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। অপরাধতত্ত্ব ও বিচার-এ এমএসএস।
পেশা : চাকরি।

প্রকাশিত বই : প্রতিবিহার (কবিতা)

ই-মেইল : editor.hansadhani@gmail.com
তানভীর মাহমুদ