হোম গদ্য কবিতার বইগুলো : ৪র্থ পর্ব

কবিতার বইগুলো : ৪র্থ পর্ব

কবিতার বইগুলো : ৪র্থ পর্ব
674
0

সুরের ভাষা যে না বোঝে সংগীত তার কাছে এক প্রকাণ্ড প্রহেলিকা, দুর্বোধ শব্দ মাত্র। সুতরাং এটা ঠিক যে মানুষ কথা কয়ে বলুক অথবা সুর গেয়ে বা ছবি রচে কিম্বা হাত পায়ের ইশারা দিয়েই বলুক সেটা বুঝতে হলে যে বোঝাতে চলেছে তারও তেমন ভাষা ইত্যাদির জটিলতা ভেদ করা চাই।

—অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

ঘাসফুল অপেরা মাহবুব অনিন্দ্যের প্রথম কাব্যগ্রন্থ। একজন কবি প্রথম কাব্যগ্রন্থে কয়েকটি সমস্যা প্রবলভাবে অনুভব করেন। (কেউ হয়তো সারা জীবন এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারে না।) ভাষা হাতড়ে বেড়ানো ও ভাষাকে একটা সুনির্দিষ্ট আকার দেওয়া। যদি সুর আর রূপ দিয়ে বাক্যসমূহকে যথোপযুক্ত আকারদানই কবির একমাত্র কর্ম হয়ে থাকে, তাহলে একটা টোটাল শিল্প প্রক্রিয়া আসলে কিভাবে সম্পন্ন হয়? ‘শিল্পের প্রকৃত কাজ অনুভূতির প্রকাশ এবং understanding এর সঞ্চারণ। যে ভাবেই হোক, প্রকাশ বা সঞ্চারণের মাধ্যমে শিল্পী তার অনুভূতিকে স্থানান্তরিত করেন শিল্প গ্রহীতার কাছে। এই স্থানান্তর প্রক্রিয়া শিল্পের গ্রহণ যোগ্যতার জন্য অপরিহার্য। (হার্বার রীড/ সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলামের নন্দন তত্ত্ব থেকে)

তরল রাত্রিতে যারা লিখেছে ক্যামোফ্লাজ ও ক্যাকটাস জীবনের মহিমা
(সন্মানিত স্মৃতি মণ্ডলী ও মাননীয় উপহাসগণ)

কবিতার নামটি নিতে না পারলেও (‘সন্মানিত স্মৃতি মণ্ডলী ও মাননীয় উপহাসগণ’ এইগুলা সস্তা ইমোশান তৈরির প্রচেষ্টা। অধিকাংশ কবিই এইটা করছে।) কবিতার লাইনটিতে, এই যে রাত্রিকে তরল আকারে কল্পনার মধ্যে নতুনত্ব আছে। একটা বিশেষ অভিজ্ঞতা আমাদের মনের উপর ক্রিয়া করে তাকে এক বিশেষ পরিণতি ও আকার দান করছে। যাকে অনুভব করা যায় মাত্র, তাকে বস্তুর আকার দেওয়া বা ক্যামোফ্লাজ ও ক্যাকটাস জীবনের মহিমা রচনার প্রক্রিয়াকে বৃহদার্থে ভাবা যায়। কিছুটা বিন্দু থেকে সিন্ধুতে টার্ন করার পূর্ব ধাপ।


অন্তর্গত বা আত্মগত দিক থেকে মাহবুবের কবিতা বহির্গত বা বস্তুগত দিক থেকে এক অন্তর্লোকের দিকে যাত্রা করেছে


একটা কবিতা যখন রচনা করা হতে থাকে তখন কবি সাধারণত তার বর্ণনীয় জগতের বস্তুগুলোকে সুনির্দিষ্ট স্পেস এবং স্থিতি দেন, যাতে তারা প্রকাশ উপযোগী শব্দ সহযোগে পাঠকের সাথে কমিউনিকেট করতে পারে। প্রকাশ করতে পারে তার মনোজগৎ এবং চেতনা জগতের যাবতীয় ঘটনাবলী। অভিজ্ঞান কবিতায় ‘আমাকে ঘিরে ধরেছে কিছু নান্দনিক সাপ’ শুরুর এই শঙ্কাটুকু পুষ্প-পুষ্প শব্দে (পুষ্প-পুষ্প শব্দে ভেঙে যায় গান। এইখানে পুষ্প শব্দটির দুইবার ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। যেখানে পুষ্প শব্দেই কাজ চলে যায়। সেখানে দুইবার ব্যবহার করে শব্দটির উপর নিয়ন্ত্রণ আনা হয়েছে। আরো নরম আর স্পষ্ট করা হয়েছে।) ভেঙে যাওয়া কোনো গানের রেশ ধরে কারো রক্তমাখা চোখে ঘুমাতে না যাওয়ার অভিমান হয়ে যাচ্ছে। (যদিও কবিতাটা কিছু আগেই শেষ হতে পারত।) বাচ্যার্থকে ছাড়িয়ে অর্থান্তরের রহস্যকে প্রকাশ করছে তারা।

মাহবুব অনিন্দ্য’র কবিতায় ব্যাখ্যা-প্রবণ। তার লক্ষ্য ছিল কবিতাকে শীর্ণ নয়, বিস্তৃতি দেওয়া। (বলা ভালো, শিল্প-সৃষ্টির লক্ষ্য। সৃষ্টির রহস্য, শিল্পের ভিতরকার সত্য ও তার লক্ষণগুলোর প্রকাশ) ফলে যেমন কিছু মেদবহুল দুর্বল লাইন এসেছে তার কবিতায়—‘আমার ভুল বানানের কবিতা শুনে’ ‘প্রাগৈতিহাসিক ডিনারের গল্পে’ ইত্যাদি। তেমনি সুন্দর লাইনও লিখেছেন তিনি—‘কি বেদনায় অমন তুমি ভেসে যাও?’ বা ঝিঁঝিঁ ও জোনাকির মতো আলোকময় শব্দেরা আছে’ লাইনগুলোতে অনিন্দ্যের অবলোকনের শৃঙ্খলার সন্ধান পাওয়া যায়। বক্তব্যগুলোতে এমন কিছু আছে যা শব্দ, অর্থ এ সবের অতিরিক্ত কিছু। ভাবের ব্যঞ্জনা সেখানে সোজাসাপ্টা অর্থকে অলঙ্কারের অতীত এক ভিন্নলোকে পৌঁছে দিচ্ছে।

অন্তর্গত বা আত্মগত দিক থেকে মাহবুবের কবিতা বহির্গত বা বস্তুগত দিক থেকে এক অন্তর্লোকের দিকে যাত্রা করেছে যেন। যে যাত্রাপথে অতি ভয়ানক, পুরাতন চোরাবালি। সমস্ত সৃষ্টি রহস্য এইখানে ছন্দময়, বেদনাময় হয়ে নিজেরই অসাড়তা ঘোষণা করছে কখনও কখনও—

তুমি আমাকে দূর নিকট শেখাও
(হেলা ফেলা)

কখনও সে শিল্পলোকের যাত্রা পথে সমস্ত মোহপাশ ছিন্ন করার একটা সুরও টের পাওয়া যায়—

পুনর্বার জাগাও প্রাণে সেরকম সপ্ন ও মৃত্যু
(শূন্য-সম্ভাবনা)

এই মন্ত্র, সৃষ্টির কল্পনা, মিথ্যা ও ভঙ্গুর জগৎচিত্রটির পুনর্নবায়নের কথা বলছে। বর্জ্য ভরাতুর পৃথিবীর অভ্যন্তরে শিকড় বিস্তার করে, মাটির তলাকার অন্ধকার টেনে এনে প্রকাশ করছে। কল্পনা ও বাস্তবকে তুলে এনে ফেলা হচ্ছে আলোকের মন্ত্রের নিচে।

শেষ পর্যন্ত একটা নির্দিষ্ট স্বরে কথা বলে গেছেন অনিন্দ্য। পূর্বজদের প্রভাব এড়িয়ে তিনি একটি সুনির্দিষ্ট ভাষার মহল তৈরি করতে চেয়েছেন। এই সুর, স্বর, ভঙ্গিমা তীব্র না হলেও তার নির্মাণ, জীবনকে কত গভীরভাবেই প্রকাশ করেছে।


বিচিত্র বিশ্ব চরাচরের অফুরন্ত রস ছেঁকে এই মধুর সৃষ্টি করেছেন অনিন্দ্য।


আমাদের কোনো অন্ধকার নেই
(নোনা জলের গান)

তালপাতার জাহাজে স্বপ্নেরা হৈ চৈ
(আধেক জীবন)

যে কোনো জীবিত ফলের আশায় হরিয়াল পাখিরা শুয়ে থাকে মাদার গাছের ডালে।
(পাতা বক্সের সবুজ)

ও পারেও এ রকম বৃষ্টি হয়, এ রকম রোদ ছায়া; সামান্য বাতাসে উড়ে গেল বিপন্ন কাঁটাতার
(বিপন্ন বিশ্বের গান)

আমার নিঃশ্বাসের কাছে চুপচাপ শুয়ে ছিল কাশবন।
(সত্য গাছের গল্প)

স্বপ্নের ভেতর কখন ঘুমিয়ে পড়েছি—চোখ থেকে বেড়ে উঠছে শত শত গাছ
(সাপ খেলা)

বিচিত্র বিশ্ব চরাচরের অফুরন্ত রস ছেঁকে এই মধুর সৃষ্টি করেছেন অনিন্দ্য। ‘আমাদের কোনো অন্ধকার নেই’ বলার মধ্য দিয়ে যেমন বিশ্ব রাজ্যের উপর প্রভুত্বকে অস্বীকার করা হয়েছে, তেমনি ‘একটা মাধবি পাতার আড়ালে বেঁচে বর্তে আছি’ বলে সত্য নিষ্ঠার সাথে জীবনদৃষ্টিকে প্রসারিত করা হয়েছে। তার কবিতা আমার সময়ের উল্লেখযোগ্য অর্জন এই কারণে যে তার কবিতায় বাস্তব আর সুন্দর মিলে ঝুলে জীবনের দিকে ঝুঁকে আছে। আমাদের জীবনবাস্তবতা তার কবিতায় বাগজাল বিস্তার করে এক সুনির্মিত রসাতলের দিকে হেলে আছে যেন।

অনুপম মণ্ডল

অনুপম মণ্ডল

জন্ম ৮ ডিসেম্বর ১৯৮৮; কৃষ্ণনগর, খুলনা। সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। পেশায় শিক্ষক।

প্রকাশিত বই :
ডাকিনীলোক [কবিতা, চৈতন্য, ২০১৬]

ই-মেইল : anupamsoc@gmail.com
অনুপম মণ্ডল