হোম গদ্য কবিতার বইগুলো : ৩য় পর্ব

কবিতার বইগুলো : ৩য় পর্ব

কবিতার বইগুলো : ৩য় পর্ব
440
0

মানুষের চেতনা তার অস্তিত্বকে নিরূপণ করে না। বরং তার সামাজিক অস্তিত্বই তার চেতনাকে নিয়ন্ত্রিত করে।
                                                                                        —কার্ল মার্কস।

কথাটা একটু সহজ করে বললে দাঁড়ায় সমাজ তথা বহির্পৃথিবী অন্তর্গত চেতনাকে নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থাৎ যেকোনো শিল্প সৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দুতে অদৃশ্যভাবে হলেও কোনো না কোনো অর্থনৈতিক বাস্তবতা বা সামজিক দ্বন্দ্বের অবস্থিতি রয়েছে। অর্থাৎ সাহিত্য সৃষ্টি একটি বিশেষ যুগের আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থার সৃজনও বটে। আর সেই যুগ কেটে গেলেও তারা মানব মনকে আনন্দ দেয়।

মাঝে মাঝে জুতো ছিঁড়ে যাওয়া ভালো।
জুতোর সনির্বন্ধ আলিঙ্গনে পায়ের পাতার চুমো পৌঁছায় না চোখে।
তোমার পা দেখার অবসর তো পেলাম
ভালো তো কবেই বেসেছি, আজ থেকে পায়ের গোলাম।
(দুর্ঘটনা প্রবণ কবিতার উৎস)

আমাগো ঘরে ভাত নাই
তাই
বউরে ঠাপাই
হাড়জির জিরে বউ আমার
একান্ত আহার
(বিপরীত কামশাস্ত্র)

তিন বেলা আহার্য—জল গ্রহণ করি, তবু আটাশের অনাহারী
(খোঁপা খুলে দাও)


শামশামের কবিতা কেবল পুঁজিবাদী কাঠামোর বিরুদ্ধেই কথা বলে নি—কিছু তুমুল রোমান্টিক পঙ্‌ক্তিরও জন্ম দিয়েছে।


সাহিত্য যদি জীবনের দর্পণ হয়ে থাকে। তবে ওই দর্পণে শামের জগৎ কিছুটা বিকৃত; বিস্রস্ত রূপে প্রতিফলিত হয়েছে। অন্তত উপর্যুক্ত চরণগুলো সেই সাক্ষ্য দেয়। সুন্দর এইখানে মায়ের পাঠানো বিস্কিট। মোয়া-লাড্ডুর সাথে মাটিতে গড়াগড়ি যাচ্ছে। আমাদের জীবন যেন এইখানে বহু ব্যবহারে জীর্ণ।

শামশামের কবিতা নিয়ে যেটা উপলব্ধি তা হলো সাধারণত সেখানে Object Reality থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে আলো ফেলা হয়েছে অন্তর্জগতের দিকে। ইনি চাকাটাকে বা দেখার লেন্সটাকে ঘুরিয়ে দিয়েছেন, ফলে তার কবিতায় স্বপ্নের চেয়ে বাস্তব, চৈতন্যগত অধিবাস্তবের বদলে সমাজবাদী রিয়্যালিটির নির্মাণ করে চলেছেন।

আর সকলের হয়; আমাদের বিনাশে বাড়ে না রক্তবীজ
(রক্তবীজে ভরে থাক সংসার)

লেবুগন্ধী রাত—অনিশ্চিতির পাতায় টলমল কাঁপে দীর্ঘশ্বাসে
(যদি সে লখিন্দর, আমি তবে বেহুলা সাপ)

আমার নদীরা শুকিয়ে খাক; জল ছেড়ে মাছ বোবা আর্তনাদে
অশ্রুহীন কাঁদে।
(নদী কাঁদে তোমার উরুতে মুখ লুকিয়ে)

এই সুর। এই নিরীক্ষার অন্দর মহলে অদৃশ্যভাবে হলেও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বা সামাজিক দ্বন্দ্বের অবস্থিতি রয়েছে। এই অবলোকন কল্পনাকে দূরে ঠেলে বাস্তবকে হাড্ডিসারসহ এক নতুন পরিসীমায় বাঁধতে চেয়েছে। এর সুর দূরাগত নয়, কাছেরই। সোজা সাপ্টা এর প্রকাশ ভঙ্গি।

তবে শামশামের কবিতা কেবল পুঁজিবাদী কাঠামোর বিরুদ্ধেই কথা বলে নি—কিছু তুমুল রোমান্টিক পঙ্‌ক্তিরও জন্ম দিয়েছে। যদিও তাকে আমি রে‌ামান্টিক কবি এবং ওই কবিতাগুলোকে রোমান্টিক কবিতা বলতে নারাজ। প্রেমকে লক্ষ্য করে নয়। প্রেম এই খানে মহা কাঠামোর একটা অংশ হিশাবে এসেছে—

খোঁপা খুলে দাও।
অলক অরণ্যে খুঁজি অলৌকিক সোনা
(খোঁপা খুলে দাও)

আমার দৃষ্টি তোমার কণ্ঠলগ্ন হয়ে আছে
(কস্তুরীর ঠোঁটে সুবাসিত দুপুর)

স্মৃতির পাথর গড়িয়ে দিলে তুমি ফের দলিত কুসুম।
(অঙ্গুরীয় অবহেলা)

বৃহত্তর প্রলেতারিয়েত-গোষ্ঠীর যে অর্থনৈতিক অবকাঠামো সেখানে নিশ্চুপ আর প্রেমিকা অনিদ্রার পাথর বুকে জড়িয়ে দুরাশার দিকে নিভৃতে ভালোবাসা খুঁজছে।

আদম হাওয়ার কাছে ফেরত চেয়েছিল বুকের হারানো পাঁজর
(আদম পাহাড়)


ব্যক্তি ও সমাজের দ্বন্দ্ব-জটিল সম্পর্কের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছে শামশামের কবিতার সৌন্দর্য।


এ অভিমত আপাত দৃষ্টিতে যতই সরল মনে হোক না কেন, তা মোটেই সহজ নয়। এর স্পর্শ, স্বাদ ও ঘ্রাণ চেতনাকে এক অনন্ত লোকের দিকে নিয়ে এসে দাঁড় করায়। এই সুন্দর, এই যে অপার সৌন্দর্য শুধু দর্শনেন্দ্রিয়ের মধ্যেই তার কল্যাণ নির্ধারণ করে না। এক অলস ভোগবিলাসী শ্রেণির অবসর বিনোদনের সখের সামগ্রীকে শামশাম টেনে এনেছেন। ছেড়ে দিয়েছেন তাদেরকে যুদ্ধ-ফেরত সৈনিকের হাতে। যার হাতে আজন্ম বারুদের গন্ধ লেপ্টে আছে। ব্যক্তি ও সমাজের দ্বন্দ্ব-জটিল সম্পর্কের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছে শামশামের কবিতার সৌন্দর্য।

বুদ্ধের ধ্যানের ভেতর লুকিয়ে আছে তক্ষক (নির্বাণ)

রাম নাই, তবু আছে রামরাজত্ব, সকলেই কুশ ও লব (প্রায়শ্চিত্ত)

সূর্য ঘুমিয়ে গেলে জেগে থাকে কুন্তির চোখ (প্রত্যেক সন্তানের ভেতর কর্ণের বেদনা)

সাহিত্যে আধার ও আধেয়ের দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের ভেতরে ঘুরে ঘুরে শামশাম এই ধর্মমত প্রচার করেছন। ধনতান্ত্রিক সমাজের বিষাদ ও বিষণ্নতাকে পুঁজি করে এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের নির্মাণ করতে চেয়েছেন।

পরিশেষে দুইটা বিপরীত কথার কলহ তুলে ইতি টানব। চিত্রশিল্পী অঁরি মাতিস বলেছিলেন, সকল শিল্পকর্ম ঐতিহাসিক যুগের চিহ্ন ধারণ করে। কিন্তু মহৎ শিল্প সেটাই যাতে এই চিহ্ন সবচেয়ে গভীর। আবার ভিন্ন সুরও শুনেছি আর্ডনোর মতে, বাস্তবের সাথে সাহিত্যের সরাসরি সংযোগ নাই। বাস্তবতা থেকে আর্ট বিযুক্ত, এবং এই বিযুক্তিই আর্টের বিশেষ তাৎপর্য ও ক্ষমতার উৎস। শামশামের কবিতার অতি-বাস্তবতা কল্পনাকে সুন্দর হতে দেয় নি। সুর এইখানে ক্লিশে। আমি যে ধ্যানের সন্ধান করি, যে স্থিতি, বাণীর গভীরতা আমি প্রত্যাশা করি; তার খুব কমই পেয়েছি। বাস্তবকে আঁকতে গিয়ে সুন্দরের সূত্রাবলীকে তিনি দূরে ঠেলে ফেলেছেন তা আমাকে আঘাত করেছে।

 

অনুপম মণ্ডল

অনুপম মণ্ডল

জন্ম ৮ ডিসেম্বর ১৯৮৮; কৃষ্ণনগর, খুলনা। সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। পেশায় শিক্ষক।

প্রকাশিত বই :
ডাকিনীলোক [কবিতা, চৈতন্য, ২০১৬]

ই-মেইল : anupamsoc@gmail.com
অনুপম মণ্ডল