হোম বই নিয়ে কবিতার বইগুলো : ২য় পর্ব

কবিতার বইগুলো : ২য় পর্ব

কবিতার বইগুলো : ২য় পর্ব
759
0

প্রজ্ঞা, মনন ও চিন্তনের সমবায়ে কবিতা যখন ক্রমশ হয়ে ওঠে তখন কবিকে ভাবতে হয় প্রকাশভঙ্গি, ভাষা নিয়ে। আর এটা তো সত্যি যে, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ভাষা ও কাব্যভাষা বৈধ মতে ভিন্ন। পরিচিত শব্দে কবিকে আনতে হয় অপরিচিতের দ্যোতনা। আর এই শব্দ-বিন্যাসের কৌশলের উপর নির্ভর করে রচয়িতার স্টাইল।


কথাগুলো স্পষ্ট, চেতনার রঙে সুন্দর। আর এর মিউজিক্যাল ভাবও আছে যা মাথার ভেতর গুনগুন করতে থাকে।


পাশ্চাত্য সাহিত্য সমালোচক ওয়ালটার পেটার ‘স্ট্যাইল’ বা রচনাশৈলী বলতে এক সামগ্রিক সাহিত্যের কথা বলেছেন, যেখানে গুণ, অলংকার, রীতি, উক্তি, শব্দ এবং অর্থের বিন্যাস ইত্যাদির লক্ষ আনন্দদায়ক হয়ে ওঠা। আর আনন্দই যদি কবিতার ‘এইম’ হয়ে থাকে তবে আমরা এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, যা-কিছু কুৎসিত তা আমাদের বেদনা দেয়। আর সুন্দরের মধ্যেই আনন্দের যাবতীয় সূত্রাবলী নিহিত থাকে। আর সুন্দর গড়ে ওঠে সঠিক পারম্পর্য, সামঞ্জস্য এবং স্পষ্টতা এই তিন উপাদানের সমন্বয়ে।

একদিন মনের ভেতর গুটিয়ে রাখা পা
                                 (হিব্রু)

কোথাও কি বৃষ্টি হচ্ছে থোকা থোকা?
হয়তো মোমের বিছানা পাতা আছে কোথাও
মাছেদেরও কি ঘুম ঘুম চোখ?
                                (পুকুর লাফাচ্ছে লাফাক)

এতকাল সোয়েটার বোনা শিখছো যারা
শীতকালীন উলকাটা আদর
তোমাদের পে’মময় রোদ
                                (মনোটোনাস শীতকাল)

কথাগুলো স্পষ্ট, চেতনার রঙে সুন্দর। আর এর মিউজিক্যাল ভাবও আছে যা মাথার ভেতর গুনগুন করতে থাকে। দেখা এবং দেখানো এই দুই মিলেই যেহেতু কবিতা, (কিন্তু দেখা, এবং তা অবশ্যই মর্মচোখে দেখা যদি স্বাভাবিক হয়ও তথাপি ‘দেখানো’ একটি স্বতন্ত্র দক্ষতা-নির্ভর ক্রিয়া) যে দেখা মনের, তা অপরকে দেখানো নিঃসন্দেহে দুরূহ। ফারাহ সাঈদের কবিতা যেহেতু সরল, কিছুটা স্পষ্ট; তার দেখার জগৎটাকেও পাঠক দেখে নিতে পারছে সহজে।

গল্প হচ্ছিল নিজের সঙ্গে।
ঝলমলে বারান্দায় রোদের স্তুপ রেখেই গিয়ে ছিলাম।
ফিরে এসে খুঁজে তো পেলাম না।
                                  (সাইকেল ফিরে এসো)

এ কোন ভ্যাপসা দিনে
ছেঁড়া বিকেল সেলাই করো তুমি?
পাতা খুলে উড়ছে হাওয়া, বোটানির বই
পুরনো রুমাল হারিয়ে গেছে কবে।
                                   (ব্রেইল এক স্পর্শছুরি)

এই যে দৃশ্য, বাক্‌প্রতিমা―খুব সহজে এর ভেতরে ঢুকে পড়া যায়। এই সহজ সুর-প্রবাহ আমাদের মনোলোকে সরাসরি প্রকাশিত হয়। এক শাশ্বত সত্যের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয়। যেহেতু শব্দ, অর্থ, ভাব—এই তিনটির বিশেষত্বই কাব্য-মীমাংসার সারকথা। ফারাহ’র কবিতায় এই তিনের সমন্বয়ে এক ঐন্দ্রজালিক শক্তির প্রকাশ আছে। তার কল্পনা, যুক্তি, বুদ্ধি, রূপারূপের অনুশাসনে এক শৃঙ্খলিত সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছে। যা সহজ, স্বতঃস্ফূর্ত, সাবলীল, আবেগদৃপ্ত।

ফারাহ’র কবিতার দৃশ্যায়ন সুন্দর। কাব্য যদি শব্দ ও অর্থের সুসমঞ্জস মিলন (কুন্তক) হয় তবে ফারাহ’র কবিতা অর্থপূর্ণ। ভণিতাহীন। দৃশ্যের নির্মাণ নয়, দৃশ্যেকে ছেঁকে আনার দিকেই তার মনোযোগ। জগতের যাবতীয় কোলাহল ঠেলে এক মৌনতার নির্মাণই তার লক্ষ্য ছিল।

এভাবে থেমোনা ওভার ব্রীজ
                                (যুদ্ধে যাচ্ছ যাও)

মৃদু আঁচে জন্মদাগ বাঁচিয়ে রেখেছে পৃথিবীর
                                (পৃথিবীর নিচুছাদ প্রেম)

কী এক ঢঙে গানটি অবতীর্ণ হচ্ছে (ঐ)
শিখে নেই ভাঙনের মাপজোখ     (ঐ)

“নিরিবিলি কোন ক্যাসকেট তোমার পুতুল-পুতুল ঘরে একা রেখে আসে (মাটি অব্দি হেসো না। কারমেন ল্যোপেজ) এই অনুরাগ জনিত উৎকণ্ঠা। সমুদ্র-সেঁচা মুক্তোর মতোই, যেন ঝুঁটি-ওয়ালা বাক্সে জমা রেখেছেন তিনি। মসৃণ ঘোড়া ও বিষণ্ন বেলুন তার/ রেখেছি রেকাবে, কার্নিশে নয়।” (বিষণ্ন বেলুন তার)


ফারাহ’র কবিতায় সমস্যাও কম নয়। ইংরেজি শব্দের ব্যবহারটা বাহুল্য মনে হয়েছে।


এই সব পঙ্‌ক্তির নির্মাণ অভিনব। অভিনব এই শব্দবন্ধগুলো ‘নেই গাছ’, ‘লায়লাদুপুর ইত্যাদি। তুমুল অর্থহীনতার দিকে যেতে যেতেও তারা অর্থের নির্মাণ করতে চেয়েছে।

কী ভেবে রেখে গ্যাছো অফুরান সুর
                                        (মাইনার)

আজকাল এলাচের ভলিউম বাড়িয়ে রান্নাটাই সকাল
                                       (লেইজি ডেইজি ক্যাফে)

বুকপকেটে ভাঁজ করা নদীযুগল দেখি
                                        (কামনা চিহ্ন)

এই ভঙ্গিমা। অভিপ্রেত অর্থকে অভিব্যক্ত করার ক্ষমতা পাঠককে মুগ্ধ করবে। মুগ্ধ করবে—আমি আর ফিরবো না/ উৎসুক বাগানটি/ ঘটা করে বিদায় দিয়ে বলেছিল—(গিটারে আগলে রেখো) এই অভিমান। সত্যের মতোই এই সৌন্দর্য—স্বর্গীয় ওই সৌন্দর্যের একটা স্পষ্ট ধারণা আমরা খুঁজে পাই ফারাহ’র কবিতায়। প্রকৃতির মধ্যে প্রচ্ছন্ন সত্যকে আবিষ্কার করে ওই সত্যকে প্রকৃতির সাথে মিলিয়ে একটি প্রতিকৃতি তৈরি করার এক আশ্চর্য ক্ষমতা আমরা টের পাই। মরিয়মের জানালা থেকে ছিটকে পড়া চিঠির মতোই তার কবিতা রোদ পোহায়। শীতকালে, সফেদ সিঁড়ির পিঠ চাপড়ে।

তবে ফারাহ’র কবিতায় সমস্যাও কম নয়। ইংরেজি শব্দের ব্যবহারটা বাহুল্য মনে হয়েছে। পরিমিতি দিতে গিয়ে কখনো খাপছাড়া বাক্যের অবতারণা করেছেন—

কফির সঙ্গে টেক্সট করছি
(হঠাৎ ফেনার দিন)

হেডফোন ছুঁড়ে দিলেই
গানটান, এফএম ব্যান্ড
পিকনিক বাসে মিউট
              (মনোটোনাস শীতকাল )

ইত্যাদি। ইত্যাদি। এইসব বাক্য, চিত্রকল্প, দৃশ্যকল্প পাঠক হিশেবে আমার ভেতর এক ধরনের সুরহীনতার উদ্রেক করে। আর একটু ধীর-স্থির হলে হয়তো তিনি এইগুলো পরিহার করতে পারতেন।

তার কবিতার সৌন্দর্যের যে অভিঘাত তা এই সংকটকে কতটুকু প্লাবিত করেছে, পাঠক বিবেচনা করুক।

অনুপম মণ্ডল

অনুপম মণ্ডল

জন্ম ৮ ডিসেম্বর ১৯৮৮; কৃষ্ণনগর, খুলনা। সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। পেশায় শিক্ষক।

প্রকাশিত বই :
ডাকিনীলোক [কবিতা, চৈতন্য, ২০১৬]

ই-মেইল : anupamsoc@gmail.com
অনুপম মণ্ডল