হোম নির্বাচিত উপন্যাস-পাঠ : সে রাতে পূর্ণিমা ছিল

উপন্যাস-পাঠ : সে রাতে পূর্ণিমা ছিল

উপন্যাস-পাঠ : সে রাতে পূর্ণিমা ছিল
311
0

আর সব উপন্যাসের মতোই, সে রাতে পূর্ণিমা ছিল-রও রয়েছে একটা কাহিনি। মোটা দাগে, মফিজুদ্দিন মিয়ার উত্থান ও পতনের গল্প নিয়ে উপন্যাসটি রচিত।  সংক্ষেপে তা এই : ব্রহ্মগাছা ইউনিয়নের সুহাসিনী গ্রামের ভূমিহীন কৃষক আকালুর ছেলে মফিজদ্দি কামলা খাটার পরিবর্তে স্বেচ্ছায় মিয়াবাড়ির ঘরজামাই হওয়ার পর ব্রহ্মগাছা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হয় এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তা-ই থাকে। এ নিয়ে পার্শ্ববর্তী গ্রামের খাঁ-পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘকাল ধরে বিরোধ চলে; আফজাল খাঁ চেয়ারম্যান হতে চাইলেও নির্বাচনে অংশ নিতে পারে না; ফলে, তাকে ব্রহ্মগাছা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হয়েই থাকতে হয়। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের আগে এক পূর্ণিমার রাতে অজ্ঞাত আততায়ীদের হাতে মফিজুদ্দিন মিয়া সপরিবারে নিহত হওয়ার পর থেকে ইদ্রিস খাঁ রায়গঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও তার বৃদ্ধ পিতা আফজাল খাঁ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান হয় এবং বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রতিবারই তারা নির্বাচিত হতে থাকে। মফিজুদ্দিনের জন্মকাহিনি, তার পরিবারের গল্প কেবল নয়, জীবদ্দশায় যারা মফিজুদ্দিনের সংস্পর্শে এসেছে, তাদের গল্পও এতে রয়েছে। তার মৃত্যুর আগে-পরের ঘটনারাশি সুহাসিনী গ্রামের বাসিন্দাদের মনোজগতে কিভাবে টিকে থাকে এবং তাদেরকে কী-রকম আচ্ছন্ন করে তা-ও বিবেচ্য হয়ে উঠেছে উপন্যাসটিতে। পাঠের সময় মনে হয়, এটি একটি ন্যারেটিভ মেটাফিকশন, এই ফেনোমেনার বাইরে বিশ্লেষণের কিছুই এতে নেই। বর্ণনার পুঙ্খানুপুঙ্খতায় এ-ও মনে হয়, পাঠকের চিন্তনসক্রিয়তার জন্যে উপন্যাসে কিছুই রাখা হয় নি। যে রূপক সৃষ্টি করা হয়েছে, তা এতই বিস্তৃত, পাঠের পর আখ্যানটিই কেবল জেগে থাকে। এই আখ্যান মফিজুদ্দিনের জীবন নিয়ে এবং সেই জীবনের সূত্রে সুহাসিনীর জনজীবন নিয়ে; লেখক সরাসরি তা বলেন না, গ্রামবাসীরা যা বলে তা-ই আমাদের শোনান। বলা যায়, একটা আখ্যানের সঙ্গে পাঠকের যোগাযোগের ঘটকালিটি তিনি করেন। মেটাফিকশনে এমনটি দেখা যায়।


মূলত একটি কাহিনি জনশ্রুতির সূত্র ধ’রে কিভাবে স্থানিকতার সীমানা পার হয়ে মিথের স্তরে উপনীত হয়, সে রাতে পূর্ণিমা ছিল সেই প্রক্রিয়াটিকে প্রামাণ্য ক’রে তুলেছে


আমরা জানি, ব্যক্তির সমস্যা প্রচলিত উপন্যাসের প্রধান বিবেচ্য; ব্যক্তি কিভাবে তার সমস্যা থেকে উত্তরণের পথে এগোয় এবং সমাজের আর সব মানুষের সঙ্গে নতুন নতুন সমস্যায় জড়িয়ে পড়ে, তা-ই উপন্যাসে ধারণ করা হয়ে থাকে। সমাজের সঙ্গে ব্যক্তির দ্বন্দ্বমূলক সম্পর্কের একটা বিশেষ স্তরের ব্যক্তি কিভাবে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে তাও এতে লক্ষ্যযোগ্য হয়ে ওঠে। কিন্তু সে রাতে পূর্ণিমা ছিল-র মূল চরিত্র মফিজুদ্দিন আত্মপ্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই সমাজের ওপর আধিপত্য বিস্তার করেছে; সে যখন বেড়ে উঠছে তখন থেকেই প্রচলিত প্রান্তিক বা গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করছে; এমনকি, বৃদ্ধাবস্থায় স্থানীয় কতৃত্ব ধরে রাখতে চেয়েছে, দীর্ঘকাল ভোগ ক’রে-আসা ক্ষমতা হাতছাড়া করতে সে রাজি নয়। উপন্যাসের কোথাও আততায়ীর হাতে তার সপরিবারে খুন হওয়ার কারণ উল্লেখ করা না-হলেও এটা বোঝা কঠিন নয় যে, ক্ষমতার ব্যাপারে দুই পরিবারের বাড়াবাড়ি রকমের লোভ এই হত্যাকাণ্ডের মূলে কাজ করেছে। বা, বলা চলে, মফিজুদ্দিনের উত্থান আর ক্ষমতা কুক্ষিগত ক’রে রাখার প্রবল আকাঙ্ক্ষা এবং আফজাল খাঁ ও তার পুত্র ইদ্রিস খাঁর ক্ষমতা লাভের মরিয়া চেষ্টা তার পতন নিশ্চিত করে দিয়েছে। উল্লেখ বাহুল্য নয়, এটি মনে করিয়ে দেয় অ্যারিস্টটলীয় ট্রিনিটি : জন্ম-বিকাশ-উৎকর্ষ-পতন-মৃত্যু; একটি বিন্দু থেকে মফিজের বিকাশরেখা উৎকর্ষে, মানে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন ক্ষমতার নিশ্চিতিতে উঠে আরেকটা বিন্দু রচনা করেছে এবং সেখান থেকে পতনরেখার সূচনা যা মৃত্যুবিন্দুতে এসে থেমেছে। এভাবেই মফিজুদ্দিনের জীবনব্যাখ্যায় অ্যারিস্টটলীয় ত্রিভুজ সৃষ্টি হয়ে গেছে। তার জন্মকাহিনি, কৈশোরের দুরন্তপনা, দুর্দমনীয় যৌবন, প্রতিদ্বন্দ্বিতাসঙ্কুল বার্ধক্য ও মৃত্যু এই রৈখিকতাকে আমাদের সামনে উপস্থিত করে, কিন্তু কেবল এ-বিবেচনায় চরিত্রটির তাৎপর্য নিঃশেষিত নয়। মফিজুদ্দিন আগাগোড়া একটি সম্প্রসারণশীল রূপক : কেননা, স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামোকে চ্যালেঞ্জ ক’রে কিভাবে নিম্নবর্গের বা ক্ষমতার বাইরের ব্যক্তি নিজ এলাকার অধিপতি হয়ে ওঠে এবং দীর্ঘকাল ক্ষমতার চর্চায় অভ্যস্ত হয়ে উঠলে কী তার পরিণতি সেই প্রশ্নের সীমানাও এটি অতিক্রম করে; কেননা, মফিজুদ্দিনের মৃত্যুর পর তা অন্য ব্যক্তিতে স্থানান্তরিত হয় আর সুহাসিনী নামের জনপদটি স্থানীয় ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীনতার রূপক হয়ে ওঠে। প্রসারিত অর্থে, সুহাসিনীর বাসিন্দাদের জীবনে ক্ষমতাকাঠামোর অংশীদার একক ব্যক্তির দীর্ঘকালীন পুনরাবৃত্তি চাঁদের অনুষঙ্গে বিশেষ এক রূপক-চারিত্র অর্জন করে। বিশেষ, কারণ প্রচলিত এইসব বৈশিষ্ট্য এটি বহন করে না : ১. কোনও বক্তব্য ঘুরিয়ে, গল্পচ্ছলে বা ভাবচিত্রের সাহায্যে প্রকাশ করা; ২. ন্যারেটিভ ফিকশনের চেহারা; ৩. ঐতিহাসিক বা রাজনৈতিক চরিত্রকে কোনও বার্তার বাহন করে তোলা; ৪. কোনও বিমূর্ত ধারণা, বিষয় বা তত্ত্বকে উদাহরণে পরিণত করা বা কোনো রূপকল্পে প্রকাশ করা ইত্যাদি। প্রচলিত রূপকের আর একটি দিক হচ্ছে, শিল্পাভিব্যক্তির আগেই এটি বিদ্যমান একটি কনসেপ্ট বা প্রত্যয়ের দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করে। অভিব্যক্তি এই প্রত্যয়েরই বহিরঙ্গ। রূপকের ভেতর থাকে একটি ভাব বা চিন্তা যা রূপকল্পের মধ্য দিয়ে ব্যক্ত হওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রাখে। সে রাতে পূর্ণিমা ছিল একটা রূপকল্প অবশ্যই হাজির করে এবং তার নিজস্ব একটা ধরনও অক্ষুণ্ন থাকে; কিন্তু সেই রূপকল্পের অভ্যন্তরের ভাবটি কী, তা স্পষ্ট ক’রে বলা কঠিন। ফলে উপন্যাসের অভিপ্রায় কী আসলে, তা বলাও মুশকিল। বিদ্যমান কোন কনসেপ্ট বা প্রত্যয় শিল্পাভিব্যক্তির আগে মনোযোগ আকর্ষণ করে এ-উপন্যাসে, ফলে, তা-ও বলা কঠিন হয়ে পড়ে। এভাবেই রূপকের প্রচলিত চেহারা থেকে এটি পৃথকত্ব অর্জন করে।

ssssss
শহীদুল জহির

মফিজুদ্দিনের জন্ম-বিকাশ-মৃত্যুর পুরো আখ্যানটি একই সঙ্গে ধারণ করেছে স্পষ্টতা ও রহস্যময়তা। তার জীবনে আমরা যা-কিছু ঘটতে দেখি, সবই স্বাভাবিক ও সাধারণ; আবার অভূতপূর্ব ও অদ্ভুত। তার জন্মের ঘটনা, কৈশোরে কুকুর মারা, যৌবনে যাত্রাদলের সঙ্গে নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া ও ফিরে আসা, চন্দ্রভানকে বিয়ে করার আগে-পরের ঘটনা, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হওয়া ইত্যাদি গ্রামীণ বাস্তবতায় একই সঙ্গে সাধারণ ও অস্বাভাবিক, পরিচিত ও রহস্যময়, মামুলি ও বিরল ঘটনা। কেন এমনটি মনে হয়, সে-প্রসঙ্গে পরে আসছি। আগে দেখা যাক, উপন্যাসটির আখ্যানস্তর ও মফিজুদ্দনের জীবন বিভিন্ন ধাপে কিভাবে বিস্তৃতি পেয়ে পরিণতির দিকে গেছে। এটা বুঝতে গেলে উপন্যাসের ঘটনাগুলো নিচের ক্রম অনুযায়ী দেখা দরকার :
১.    মফিজুদ্দিনের মায়ের আবির্ভাব;
২.    আকালুর বিয়ে;
৩.    মফিজুদ্দিনের জন্ম;
৪.    কাজী বাড়ির কুকুর মারার মধ্য দিয়ে তার দুরন্তপনা ও দৈহিক শক্তির প্রমাণ;
৫.    মিয়া বাড়িতে কামলা খাটার প্রস্তাব এবং তা অস্বীকার, যাত্রাদলের সঙ্গে নিরুদ্দেশ হওয়া;
৬.    প্রত্যাবর্তন;
৭.   আবার মিয়া বাড়িতে কামলা হওয়ার প্রস্তাব এবং তা প্রত্যাখ্যান ক’রে মিয়া বাড়ির মেয়ে চন্দ্রভানকে বিয়ে ক’রে ঘরজামাই হওয়ার পাল্টা প্রস্তাব;
৮.    পুনরায় নিখোঁজ হয়ে যাওয়া এবং নৌকায় দুই ভাড়াটে খুনির হাত থেকে বেশ্যার কল্যাণে প্রাণরক্ষা;
৯.    প্রত্যাবর্তনের পর সুহাসিনীতে নয়নতারা হাটের পত্তন ও চন্দ্রভানকে বিয়ে করা;
১০.   বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হওয়া;
১১.  খাঁ-পরিবারের সঙ্গে বিরোধ, উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নিজের অংশগ্রহণ নিয়ে মফিজুদ্দিনের গোঁয়ার্তুমি এবং এ-নিয়ে দুই পরিবারের সভা অমীমাংসিত থেকে যাওয়া; ইত্যাদি।

এসব ঘটনার ফাঁকে-ফাঁকে অতিপ্রাকৃত, কাকতালীয় ও রহস্যময় কিছু ঘটনা গুঁজে দেয়া হয়েছে। আখ্যানটির উৎস হিসেবে গ্রামবাসীর স্মৃতিকে ব্যবহার করা হয়েছে; তাদের স্মৃতির সূত্র, অনুঘটক আর তন্ময় সংশ্লেষক হয়ে পূর্ণিমা সারা উপন্যাসে আখ্যানের বলয় বা বহিঃরেখা রচনা করেছে। এসব নিয়েই মফিজুদ্দিনের জীবন-কাহিনি একটা মিথ হয়ে উঠছে। মূলত একটি কাহিনি জনশ্রুতির সূত্র ধ’রে কিভাবে স্থানিকতার সীমানা পার হয়ে মিথের স্তরে উপনীত হয়, সে রাতে পূর্ণিমা ছিল সেই প্রক্রিয়াটিকে প্রামাণ্য ক’রে তুলেছে। মফিজু্দ্দিন পৌরাণিক চরিত্র নয়; কিন্তু তার জন্মের আগে-পরের ঘটনারাশি পৌরাণিকতার আবহ ও শর্তের বাইরে নয়। পুরাণের চরিত্রগুলোর জীবনকাহিনিতে এক ধরনের অস্বাভাবিকতা থাকে; অথবা থাকে না; একটা জনগোষ্ঠির মধ্যে বারবার, বছরের পর বছর ধ’রে নানাভাবে উচ্চারিত হতে থাকলে তাতে এমন সব অনুষঙ্গ-ঘটনা এসে পড়ে, অস্বাভাবিকতা সঞ্চারই যেগুলোর ধর্ম। আর পৌরাণিক কিংবা উপকথার চরিত্রের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিকতাই স্বাভাবিকতা। কিন্তু বিশ্বস্ততায় এটি ব্যাঘাত ঘটায় না, বা, বিশ্বস্ততার প্রশ্নটি এতে অর্থহীন হয়ে পড়ে। সেদিক থেকে দেখলে উপন্যাসটি নিয়ে আমাদের আর একটি বিবেচনার পথ খুলে যায় : মিথের স্রষ্টা মানুষ, এর নিজস্ব একটি সৃষ্টিপ্রক্রিয়া আছে; যে অলৌকিকতা ও অতিলৌকিকতার আবরণ ও আবহে এটি সাধারণ ঘটনা বা এর চরিত্রগুলো থেকে পৃথক হয়ে যায়, তা-ও মানুষের স্মৃতি ও কল্পনার অবদান। ‘গ্রামের লোকদের মনে পড়ে’, ‘সুহাসিনীর লোকরা ভাবে’, ‘গ্রামের লোকেরা বলে যে’ ইত্যাদি উচ্চারণ জনস্মৃতি ও কল্পনায় সে রাতে পূর্ণিমা ছিল-র মফিজুদ্দিন ও তার জীবনকাহিনির পল্লবিত হয়ে ওঠার কথা মনে করিয়ে দেয়, সমকালীন বাস্তবতার খোলস ছেড়ে মিথের তাৎপর্যে উত্তরণের প্রক্রিয়াটিও সেই সঙ্গে চিনিয়ে দেয়। কিন্তু আততায়ীর হাতে সপরিবারে মফিজুদ্দিনের মৃত্যুর পর উপন্যাসে যখন বলা হয়, ‘সুহাসিনীতে এবং রায়গঞ্জে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন অব্যাহত থাকে, ইদ্রিস খাঁ উপজেলা চেয়ারম্যান হয় এবং তার বৃদ্ধ পিতা আফজাল খাঁ হয় ব্রহ্মগাছা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান’ তখন আমরা সমকালীন বাস্তবতায় ফিরে আসি। ফলে, আমরা ধ’রে নিতে পারি, উপন্যাসটি শেষ পর্যন্ত মিথ কিংবা উপকথার সৃষ্টিপ্রক্রিয়া, সমকালীন বাস্তবতায় ছড়িয়ে পড়া যার ধর্ম।


প্রতি পূর্ণিমার রাতে সুহাসিনী হয়ে ওঠে গোটা বাংলাদেশের গ্রাম, সেই গ্রামের মানুষ হয়ে ওঠে গোটা বাংলাদেশের মানুষ


এটি কি যাদুবাস্তবতার উপন্যাস? আমরা জানি, এই ধরনের উপন্যাস ইস্কেপিস্ট ফিকশন নয়, স্পেকুলেশন নয়, থট এক্সপেরিমেন্ট নয়, পৃথিবীকে অন্য চোখে দেখানোর চেষ্টা; এক ভিন্ন বিশ্বদৃষ্টি যা বহির্বস্তু থেকে পৃথক, অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের বাইরে; যা সময়ের রৈখিকতা মেনে চলে না; এর কার্যকারণতত্ত্ব সাবজেক্টিভ ইত্যাদি। জাদুবাস্তবতার এই লক্ষণগুলোর প্রতিটি কোনো-না-কোনোভাবে উপন্যাসটিতে রয়েছে। ইস্কেপিস্ট ফিকশনে বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু আলোচ্য উপন্যাস বাস্তবতাকে ধারণ করে তা অতিক্রমও করে। ফলে, এটি হয়ে ওঠে, ম্যাজিক রিয়্যালিজম সম্পর্কে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের কথায় ‘বাস্তবেব চেয়ে বেশি বাস্তব’। কোনও দূরকল্পনা এতে নেই, বরং সাধারণ ও প্রাত্যহিক ঘটনার সঙ্গে কাকতালীয় ও অতিপ্রাকৃত ঘটনার ফিউশন ঘটানো হয়েছে। আইডিয়া বা ভাবগত নিরীক্ষার প্রকাশ এই উপন্যাসটিতে ঘটে নি, যদিও আঙ্গিকের দিক থেকে এটি পুরোপুরি নিরীক্ষামনস্ক রচনা। বাংলা উপন্যাসের প্রচলিত ফর্ম থেকে আলাদা কিছু সৃষ্টি করা এই নিরীক্ষার অভিপ্রায়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না; কিন্তু এই আলাদা জিনিশটি কী? আগেই বলা হয়েছে, এটি হলো ন্যারেটিভ মেটাফিকশন, যাতে থাকে অভিজ্ঞতা ও নৈয়ায়িক শৃঙ্খলার বাইরের ঘটনার অনুপুঙ্খ বর্ণনা, যা উপন্যাসের কাঠামো থেকে মুক্তি চাইছে; দাবি করছে এমন জগৎ, যা যুক্তি ও ব্যাখ্যার বাইরে; কিন্তু সেই জগৎ ফ্যান্টাসি বা উৎকল্পনার নয়। সে রাতে পূর্ণিমা ছিল-র বিশ্বদৃষ্টি বহির্বস্তু থেকে পৃথক, অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের বাইরে। ফলে, পাঠের সময় আমরা বস্তুপৃথিবী থেকে আলাদা হয়ে যাই, নিজের অভিজ্ঞতার জগৎ থেকে দূরে সরে যাই; কিন্তু চরিত্র আর ঘটনাগুলো বেশ চেনা মনে হয়। জাদুবাস্তবতার উপন্যাসে যা ঘটে, সময়ের রৈখিকতা এতে মানা হয় নি। মার্কেজের হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিচ্যুড-এর শুরু ফায়ারিং স্কোয়াড থেকে এবং এর পর দীর্ঘ ফ্ল্যাশব্যাক; সে রাতে পূর্ণিমা ছিল-তেও তেমনটিই : মফিজুদ্দিনের সপরিবারে নিহত হওয়ার পর থেকে তার জন্মকাহিনি, কৈশোর ও যৌবন, বৃদ্ধাবস্থা ও খুন হওয়ার মধ্য দিয়ে সবংশে পতন এক দীর্ঘ ফ্ল্যাশব্যাকে গ্রামবাসীর স্মৃতির সূত্রে বর্ণনা করা হয়েছে। সময় সব সময় তাতে এগোয় না; দূর-অতীত বর্তমানের প্রতিটি মুহূর্তে হাজির হয়ে থাকে; আর ভবিষ্যৎ ‘অলরেডি হ্যাপেন্ড’। এর জগৎ সম্মোহনকর, রহস্যময়, অদ্ভুত; কিন্তু প্রতিদিনের অনুষঙ্গের মতোই এর ঘটনারাশি, খুব সাধারণ এর অভিজ্ঞতা, যাদের বর্ণনা তারা যেন এসবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। একটি বিশেষ সময়ে তারা এ-সম্পর্কে সচেতন হয়, সেটি পূর্ণিমার রাত; আর তা প্রকৃতিতে বারবার ফিরে আসে। অথাৎ আখ্যানটিও প্রকৃতিতে পূর্ণিমার মতোই বারবার ফিরে আসে।

পূর্ণিমা সুহাসিনীতে মানে এই উপন্যাসে বিশেষ এক তাৎপর্যে হাজির হয়েছে। প্রকৃতির এই অনিবার্যতা থেকে গ্রামবাসীর যেমন মুক্তি নেই, তেমনি তাদের মুক্তি নেই স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামোয় ব্যক্তির দীর্ঘকালীন আধিপত্য থেকে; তার মৃত্যুতেও তাদের মুক্তি নেই, কেননা প্রক্রিয়াটি চলতে থাকে; কিন্তু তারা মুক্তি চায় কি-না তা বোঝা যায় না, কারণ ওই মৃত্যু তাদের শোকগ্রস্ত ও বিহ্বল করে। দীর্ঘকাল অধিষ্ঠিত ব্যক্তির জীবন তাদের স্মৃতিতে পূর্ণিমার অনুষঙ্গে কেবল জেগে ওঠে না, তা নানাভাবে পল্লবিত হতে থাকে। এই স্মৃতির মধ্যে তারা প্রতি পূর্ণিমায় প্রবেশ করে, যদিও তারা আছে সেই বাস্তবতার ভেতরেই। তাদের অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যতের মধ্যে কোনও ফারাক থাকে না; বর্তমান তাদের অতীত, ভবিষ্যতও; ভবিষ্যৎ তাদের বর্তমান, অতীতও। আর প্রতি পূর্ণিমার রাতে সুহাসিনী হয়ে ওঠে গোটা বাংলাদেশের গ্রাম, সেই গ্রামের মানুষ হয়ে ওঠে গোটা বাংলাদেশের মানুষ।

চঞ্চল আশরাফ

চঞ্চল আশরাফ

জন্ম ১২ জানুয়ারি, ১৯৬৯; দাগনভুইয়া, ফেনী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সম্মানসহ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই :
কবিতাগ্রন্থ : চোখ নেই দৃশ্য নেই (১৯৯৩), অসমাপ্ত শিরদাঁড়া (১৯৯৬), ও-মুদ্রা রহস্যে মেশে (২০০২), গোপনতাকামী আগুনের প্রকাশ্য রেখাগুলো (২০০৮), খুব গান হলো, চলো (২০১৩)।

উপন্যাস : কোনো এক গহ্বর থেকে (১৯৯৭), যে মৎস্যনারী (২০১১)।

গল্পগ্রন্থ : শূন্যতার বিরুদ্ধে মানুষের জয়ধ্বনি (১৯৯৯), সেই স্বপ্ন, যেখানে মানুষের মৃত্যু ঘটে (২০০৭), কোথাও না অথচ সবখানে (২০১৩)।

স্মৃতিগ্রন্থ : আমার হুমায়ুন আজাদ (২০১০)।
প্রবন্ধগ্রন্থ : কবিতার সৌন্দর্য ও অন্যান্য বিবেচনা (২০১১)

ই-মেইল : chanchalashraf1969@yahoo.com
চঞ্চল আশরাফ