হোম গদ্য ঈশ্বরপ্রদত্ত গাধা, তোমাকে বলছি : জীবন, আমার বোন

ঈশ্বরপ্রদত্ত গাধা, তোমাকে বলছি : জীবন, আমার বোন

ঈশ্বরপ্রদত্ত গাধা, তোমাকে বলছি : জীবন, আমার বোন
773
0

‘রূপকল্প’ বলে একটা শব্দের প্রস্তাব করা যাক—যার মধ্যে ঠিক রূপ নয়, রূপের অতিরিক্ত রূপকের আভাস ফুটে উঠবে আর থাকবে কল্পনার উদ্ভাস। ইংরেজিতে হয়তো একে মেটাফর বলা যেতে পারে। কিংবা নাও পারে।

সাম্প্রতিক কালে কবিতায় আমি রূপকল্পের সন্ধানে নেমেছি। বুঝে উঠতে চাইছি, একজন কবি তার রচনায় কিভাবে রূপকল্প নির্মাণ করেন কিংবা আদৌ করেন কিনা। সেই সঙ্গে দেখতে চাই, পূর্বতন কবিকে নবীন কবি কিভাবে ছেড়ে যান—রূপকল্পের নিরিখে। আরও স্পষ্ট করে যদি বলতে হয়, আমি কবির নিজস্ব জগৎটাকে খুঁজে পেতে চাইছি। অর্থাৎ এই বাস্তবের বাইরে যে ছায়া-বাস্তব জেগে ওঠে কারও কবিতায়, সেই বাস্তবতাকে আমরা কেমন করে চিহ্নিত করব—তার জন্য একটা বিশেষ চিহ্নসূত্র স্থাপন করার কথা ভাবছি। এই চিহ্নসূত্রটি হলো রূপকল্প। লিখনশৈলীর অন্য সব বিষয়, লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি আপাতত মুলতুবি রেখেই এগোনো যাক।

উৎপলকুমার বসু কিংবা আবদুল মান্নান সৈয়দ বাংলা কবিতায় নতুন একটা অভিঘাত নিয়ে এসেছিলেন, এ নিয়ে খুব বেশি তর্ক নেই সম্ভবত। বিশেষ করে ষাটের দশকে খুব কাছাকাছি সময়ে প্রকাশিত দুটি বই—পুরী সিরিজ এবং জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ—বাংলা কবিতায় আঙ্গিকের দিক থেকে অভিনবত্বের দাবিদার—এ দাবি আমি স্বীকার করি।

তাদের এক সঙ্গে আলোচনায় আনবার উদ্দেশ্য এ নয়, দুই বাংলার পাঠককে দ্বৈরথে আহ্বান, বরং তাদের খানিকটা মিলিয়ে দেখার প্রয়াস। বিশেষত মিল যেখানে রয়েছে কাব্যের টেক্সট ও কন্টেক্সটে। একদিকে বাঙালি স্বাধিকার-প্রমত্ত হয়ে উঠছে, অন্যদিকে নকশালবাড়ির বিপ্লবী দীক্ষা ছড়িয়ে পড়ার অপেক্ষা করছে। দুইটি বিস্ফোরণের পূর্ব মুহূর্তের কবিতা আমাদের আলোচ্য, ‘যখন ফুল তার গন্ধে আমাদের সতর্ক করছে’ আর ‘চীৎকারের নিচে পড়ে আছে আমাদের শাদা শহর—তার পিঠ, কাঁধ, গ্রীবা, ঊরু, জানু: একফোঁটা আস্বচ্ছ বিহ্বল নীল শিশির সময়ের সবুজ পাতায়’।


বিশেষ কোনো অনুষঙ্গের প্রতি কবির ঝোঁক টের পাওয়া যায় তার পুনরাবৃত্তিমূলক প্রয়োগের মাধ্যমে।


আমরা যখন জীবনানন্দের কবিতার কথা ভাবি তখন কিছু অনুষঙ্গ আমাদের মনকে অধিকার করে ফ্যালে। যেমন—শিশিরের শব্দ, মেঠো চাঁদ, নক্ষত্রের রুপালি আগুন, পেঁচা, শকুন, চিল, শিরীষের ডালপালা, নোনা মেয়েমানুষ, হরিণ, বেবিলন, এশিরিয়া, লাশকাটা ঘর, সুচেতনা, সবিতা, বনলতা সেন এমনি আরও কিছু। জীবনানন্দের কবিতায় এরা যে চারিত্র নিয়ে হাজির হয়, তাকে ঠিক বুদ্ধদেব বা সুধীনের কবিতায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। জীবনানন্দের নির্জন স্বাক্ষর এদের গায়ে লেগে আছে। এসবই তার কবিতার রূপকল্প। কোনো কোনো কবির ক্ষেত্রে এই রূপকল্পের সিদ্ধি এতটাই যে, ‘জীবনদেবতা’ বললে কবির নাম আর বলতে হয় না কিংবা ‘খাঁচার পাখি’ বললে।

বিশেষ কোনো অনুষঙ্গের প্রতি কবির ঝোঁক টের পাওয়া যায় তার পুনরাবৃত্তিমূলক প্রয়োগের মাধ্যমে। ফলে কবি তার অজান্তেই পাঠকের কাছে ধরা পড়েন রূপকল্পের অভিসন্ধি নিয়ে। কিন্তু এসবের বাইরেও রূপকল্প গড়ে উঠতে পারে, যেখানে কবির বারবার প্রত্যাবর্তন ঘটে না, পাঠকেরও নজর এড়িয়ে যায় প্রায়শ। এসব হলো গৌণ রূপকল্প। একজন কবির সমগ্র রচনার প্রেক্ষিতে তাই রূপকল্পের অনুসন্ধান করা উচিত, সেটাই যথার্থ। কিন্তু যেহেতু আমাদের আলোচ্য একেকজন কবির একটি মাত্র বই, সেক্ষেত্রে গৌণ রূপকল্পের অন্বেষাতেই আমাদের সন্তুষ্ট থাকতে হবে। না হলে, মান্নান সৈয়দের ‘মাছ’ কিংবা উৎপলের ‘ময়ূর’ আমরা কিছুতেই এড়াতে পারতাম না।

 

শহর ও বন

দুজন কবির দুটি কবিতায় অভিনিবেশ দেয়া যাক। আমি পাঠককে অনুরোধ করব উৎপলের ‘প্রকৃতির ছবি’ কবিতার পাশে মান্নানের ‘পাগল এই রাত্রিরা’ কবিতাটি খুলে বসতে।

উৎপল বলছেন, তিনি নাকি ৬৩ সালে নিরক্ষর বেশ্যাদের চিঠি লিখে দিচ্ছেন, বলা ভালো, তাদের ফেলে দেয়া চিঠিগুলির পুনর্লিখন করছেন। বাবু ও দালাল ছাড়াই তিনি বুঝতে চেষ্টা করছেন, বেশ্যারা কী লিখেছিল চিঠিতে। আর কেনইবা তারা চিঠিগুলি ফেলে দিয়েছিল, যদিও তার উত্তর নেই কোনো। কবির এই হাস্যকর পাঠপ্রচেষ্টার খেলা কিছুটা যেন লুকাতেও চাইছেন। হঠাৎ মনে হয়, মরিয়মদের কার্পাসবাগানে ‘ঈশ্বরপ্রদত্ত গাধা’ হয়ে ঢুকে পড়েছেন তিনি, একাকী। কে এই মরিয়ম? কবি বলছেন, ‘তুমি আমার সন্তান নও’। তবে কি সন্তানতুল্য? বেশ্যাদের কি শেষ পর্যন্ত উচ্ছেদ করা হয়েছে কোনো বিশেষ জায়গা থেকে—এমন প্রশ্নও মনে আসে। কারণ—‘বনবিভাগের অফিসের ঢালু মাঠে ওদেরই বা নেমে যেতে দেখেছি’। মরিয়ম বা মরিয়মেরই মতো কবি-আত্মার কোনো নিরুদ্দিষ্ট পার্শ্বচরকে তিনি বিদায় জানান ‘অল্প জানা রেলইস্টিশন থেকে হেমন্তকালীন ট্রেনে তুলে’। পুবে-পশ্চিমে ধানপাট ভালো হোক, বিদ্যুৎ তাঁতের কল হাতঘড়ি সোডাকারখানা বসুক দিকে দিকে, কোথাও ঠিকই লেগে রইল ‘চোখের জলের দাগ’। তার কবিতায় অধিদেবতার দেখা না মিলুক, তার মল ঠিকই পড়ে থাকে বনে।

ঈশ্বরপ্রদত্ত গাধার সূত্রে আমাদের মনে পড়বে—‘প্রতিভা : আত্মহত্যা করতে চলে যায় একটি গাধার পিঠে চড়ে… এইসব অতিবস্তু দৃশ্য তার সইল না বলে, একটি গাধার পিঠে চড়ে : কবি। [টুকরো-টুকরো মৃত্যু ৫/মান্নান সৈয়দ]

মান্নান আরও লিখছেন : ‘পানি ফুরোলেও অভ্যস্ত ঝরনার দিকে ছোটে গাধা….
নদীর তীরের মতো অলস সেই গাধা—অবিকল নগ্ন, উন্মোচিত’। [গাধা এবং আমি]

জীবনদাশের সেই পঙ্‌ক্তিটিও স্মরণযোগ্য এখানে: ‘আবহমানের ভাঁড় এসেছে গাধার পিঠে চ’ড়ে’। এইসব গাধা নিশ্চিতভাবেই হিমেনেথের প্ল্যাতেরো নয়। লাঞ্ছনা ও বিদ্রূপের বাহন হয়তো।

কিন্তু শুধু গাধার কথাই বলি কেন, একটা সবুজভুক সিংহের দেখাও আমরা পাই জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছে: ‘আমার একেকটি দিন একেকটি সবুজভুক সিংহ হয়ে আমাকেই খাচ্ছে শেষ রক্তের পয়সা পড়া অবধি’।


সে কখনোবা তিন স্তনের নারী হয়ে তাকে তাড়া করেও নিয়ে যায়।


মান্নানের ‘পাগল এই রাত্রিরা’ কবিতায় আমরা দেখি, ‘রাত্রিরা বেথেলহাম-কে ব্রথেলে পরিণত করে’। পাশাপাশি আরও দুএকটি কবিতার সহায়তা নিলে বুঝতে পারব, যে ‘রাত-শহরের’ ছবি আঁকছেন কবি, সেখানে বেশ্যার উপস্থিতি বেশ উজ্জ্বল। সে কখনোবা তিন স্তনের নারী হয়ে তাকে তাড়া করেও নিয়ে যায়। সে যেমন পীড়িত, তেমনি পীড়নকারী; শঙ্কা ও করুণার যুগলবন্দি যেন :

এসো, পান করো অপ্রেম, হায় আত্মতাড়িতেরা, পতিতার মতো অতিরঞ্জিত সত্যের মুখমণ্ডল রাখো প্লেটের উপর অভুক্ত [বাঙালি কবিতা]

প্রতিটি শিল্পীর তিনটি পা থাকে অথচ আবার বেশ্যার ছড়ায়ও যথেষ্ট আশবাব…

উধাও রেনোয়াঁ, শুধু তোমারই নয়, প্রতিটি শিল্পই তৃতীয় পায়ের অপরাধে বিরচিত, এবং বেশ্যারা, একমাত্র বেশ্যারাই প্রতিটি শিল্পের দাম দিতে জানে। [সমস্ত ভাসান দিলাম সমস্ত উড়াল ৩]

অসীম যে-মেয়ে অলিতে-গলিতে ঝিমন্ত ফোয়ারায়, বিচ্ছুরিত আঙুরঅলার গাড়ির পাশে, ইঁদুরের মতো ধাবমান ট্যাক্সিতে, রাস্তায় ও জোচ্চরের প্রশংসিত আস্তানায় সারারাত্রি সর্বত্র ফেরি করে বেড়িয়েছে শরীর, মাটিতে থুবড়ে পড়ায় মুখ থেকে বেরিয়ে পড়ল তার সতেরো লক্ষ চার হাজার একশো তেইশটি তারা, আর তার ত্বকের ভিতরকার উচ্ছল দোকানগুলি মরে যেতে থাকল একে-একে [পাগল এই রাত্রিরা]

দোকানের প্রসঙ্গ মান্নানের কবিতায় বারবার ফিরে আসে :

দোকান একটি নক্ষত্র [অশোককানন]

মাঘের হিমের হিরে চারদিকে জ্বলছে যেন সন্ধের দোকানবীথি, তোমার চোখে-মুখে স্বর্গ এসেছে নির্ধারিত হয়ে, সূর্যের একটি রশ্মি ছুরির মতো এসে বিঁধল আমাদের নিটোল গল্পে। [পরস্পর ২]

হায়, সবাই কেবল নিজের পাশের মানুষটিকে ঠেলে দিতে হয়ে ওঠে তাপের শীর্ষদেশ, আত্মার দোকানদার, স্বভাবের কুচকাওয়াজ। [টুকরো-টুকরো মৃত্যু ১]

জানালার পাহাড় হয়ে উঠেছে আমার শরীর, শরীরের মধ্যে সন্ধ্যের দোকান—কী ভিড়ের চাপ! [সমস্ত ভাসান দিলাম সমস্ত উড়াল ১]

কী চড়া বাজার! আমাদের পাশের লোকটির সত্যি-সত্যি গলা কেটে নিল চীনে প্লেটের উপর এক গাঢ় দোকানদার।…

শহরতলির ভোঁতা মাঠ পেয়ে কী কান্না পেয়ে গেল আমাকে ছেলেমানুষের মতো। আমার আপন অপার বালিশে রাজপুত্রের মুখ গুঁজে পরপার-দেখা-না-যাওয়া মানুষের মতো কাঁদলাম আমি। আমি কি কাঁদলাম চড়া বাজারের জন্য? কাটা মুণ্ডুর ক্ষোভে? গাঢ় দোকানদারের কারণে?’ [সমস্ত ভাসান দিলাম সমস্ত উড়াল ২]

আমার শরীরের ভিতরকার এইসব দীপ্ত দোকানগুলি মেরে ফেলে আমি শিল্পহীন ভালোবাসা সাধারণে দিতে পারতাম যদি! [সমস্ত ভাসান দিলাম সমস্ত উড়াল ৩]


মান্নানের কবিতায় ঘটছে একটা শহরের পত্তন।


এতক্ষণে পাঠক নিশ্চয়ই আঁচ করতে পেরেছেন, মান্নানের কবিতায় ঘটছে একটা শহরের পত্তন। রাজধানী ঢাকারই প্রতিভাস ফুটে উঠছে। তাই ‘দরোজা তার কাছে পুলিশ কিন্তু একটি জন্মের উপর’—ষাটের দশকের আইয়ুবি শাসন, দালাল ব্যবসায়ী, ছাত্ররাজনীতি, মিছিল, কারাবরণ—এসবেরই সমান্তরালে নাগরিক মধ্যবিত্তের জেগে ওঠা। কবি-জীবনের উপলব্ধি—

‘যখন এই অগ্নি শহরের দুষ্ট পানির মতো বাণিজ্য করে আত্মা, মাংসাশী এই সময়ে ছড়ানো-ছিটানো ইতস্তত সুন্দর কবিতার লাইনের মতো দিকে দিকে ফলে ওঠে কনুইপাশের মানুষটিকে ঠেকিয়ে’। [টুকরো-টুকরো মৃত্যু]

এই শহরের আত্মা যেন বাণবিদ্ধ হয়ে জ্বলে
শান্তি-কান্তি-ক্লান্তির ওপারে [সুবাতাস]

গোল শহরটা অচল পয়সা [সুবাতাস]

পক্ষান্তরে উৎপল আমাদের টেনে নিয়ে যাচ্ছেন শহরের উপান্তে, সমুদ্রতীরে কোনো বনের ভিতর। যেখানে আপাতদৃষ্টে বলা যাচ্ছে—‘সস্তা ও কোমল তরিতরকারিময় দেশে ভালমন্দ খাও দাও/ তোমার পিছনে কোনো গোয়েন্দার চোখ নেই।’ যদিওবা ক্রমশ প্রকাশ্য—

● গন্ধক মেশানো জলে স্নান করে জেলঘুঘুদের আত্মা
● বন্দুকের চোরাচালানের মতো মনে হয় নিজেকে আমার
● আমারো চতুর্দিকে গরাদের স্তব্ধ ছায়া পড়েছে এখন

এই গরাদ থেকে বেরুতে চাইছেন বলেই তো অর্জুনগাছের মতো সমুদ্রছায়ায় বসে থাকা—

রৌদ্র থেকে ফেলে দাও গরাদের ক্রমপরম্পরা
গরাদের মধ্যে থেকে মাল্যবান পাহাড়ের ব্যাকুল লাক্ষাবনে
আমারো মস্তিষ্ক, নেশা, চৈতন্য, সমাধি
পাদ্রীদের, সন্ন্যাসিনীদের হাতে চলে গেছে।

জানু তুমি! তুমিই জানালা! অনুসন্ধিৎসায় তুমি খুলে যাও
পুরুষের প্রেমের খেয়ালে। [পুরী সিরিজ ১]

সমুদ্রের কাছে এসে তার মনে হয়, সফলতা নামে কোনো সামুদ্রিক জাতি আছে বুঝি! সমুদ্রেরও চরিত্র নির্মাণ করেন তিনি—‘যা কিছু তরঙ্গে ফ্যালো/ সমস্তই ফিরে আসে—সমুদ্রের অহেতু মর্যাদাবোধ, এই সব।’

‘এত বড় বেসরকারী আতুরালয়ের নীল ভানুসিন্ধুজলে/ লুকোচুরি খেলা ভালো’—কিন্তু অপার লীলাই তার লক্ষ্য নয়, লক্ষ্য ‘অখিল শুশ্রূষা’—

লাবণী লাবণ্যরাশি এই জল, এই প্রতিকার,
পৌত্তলিকতা ছাড়া আমি আর জানি নে কিছুই
সিন্ধুজলে এই সব উপকূলবর্তী আগুন
নেভে কি নেভে না তাও পৌত্তলিকতা এসে বলে দেয় [পুরী সিরিজ ৯]

তরঙ্গে নেমেই আজ বোঝা গেল সমুদ্রকপাট
আরো দূরে। [আরো প্রকৃতির ছবি]


বনে আগুন না লাগতেই দমকল কেন বনে ঢুকে গেছে, সেটা একটা প্রশ্ন বটে।


সমুদ্রের কথা থাক। একটু বনে ঢোকা যাক। ‘না হয় গাড়ির টায়ারচিহ্ন ধরে চলেছি এবার গভীর বনে দিকে দমকল কিছু আগে গেল’—

বনের ভিতর শুনেছিলাম শিস/ বনের ভিতর রৌদ্রে খসে পড়ে /কাঁচুলি [স্মৃতি]

বনের ভিতর গিয়ে মনিব হারায় আর/ নিশ্চেতন পড়ে থাকে বৃষ ও মানুষ [আকাশযান]

বনের ভিতরে আজ সকালের উদ্দেশ্যবিহীন দমকল একা একা ঘুরছে
[আমারই প্রাণের দিকে চেয়ে দেখি]

বনে আগুন না লাগতেই দমকল কেন বনে ঢুকে গেছে, সেটা একটা প্রশ্ন বটে। আরেকটু খোলাশা করে দেখা যাক—

বস্তুত বনের মধ্যে, নির্বাসনে, কাঠের বাড়িতে
সমসাময়িক বলে কিছু নেই,
যূথবদ্ধ হাঁস, পাখি, শিকারীর আনাগোনা ছাড়া।
তাদের কর্তব্য বহু—খাদ্য আর খাদকের পরস্পর কর্তব্য, বুদ্ধির
প্রতিযোগিতাও আছে, শিকারীর রাইফেল তেমনই মর্যাদাবান
গত বছরের মতো, শিকারীর কার্তুজ তেমনই সন্ত্রাসবাদী গত
দশ বছরের মতো, মানুষের সভ্যতাও বন্যতার পাশাপাশি
পরিবর্ধমান গত সহস্র ঋতুর মতো—
[উনিশশো বাষট্টি শেষ হল]

তাই অরণ্য, অরণ্য বলা ঠিক হবে না, বলা যেতে পারে অরণ্যেতর এই বন—হৃদয়ের দুর্গমতা নয়, সৌন্দর্যের রহস্যমন্দির নয়, এক সন্ত্রস্ত প্রেক্ষিত রচনা করছে উৎপলের কবিতায়।

 

ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্বের নির্মাণ

জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছে আমাদের পরিচয় ঘটে শহরের অলি-গলিতে ঘুরে ফেরা এক ব্যক্তিপুরুষের সাথে। শহরের অস্তিত্ব তার ব্যক্তিত্বকে ছাপিয়ে উঠতে পারে না। বলা চলে, শহরের অনুষঙ্গ আসে ঐ পুরুষসত্তার অনুচর হয়ে। আর পুরী সিরিজে কথক ক্রমেই আড়ালে সরে যেতে থাকে। তার মুখ পটভূমি থেকে ব্লার হয়ে জলছাপের মতো সিলুয়েটে ফুটে ওঠে ধীরে ধীরে। মান্নানের স্বর তাই এত আবেগমথিত, কম্প্র; উৎপল সে জায়গায় অনেক বেশি নিরাসক্ত। কারণ তারই ভাষ্য: ‘স্বল্পমূল্যে পুংমহিষের পুরুষত্ব নষ্ট করা চলে তবু বেদনা জাগে না আজ কিছুতেই’। দৃশ্য থেকে সরে যাবার আগে সেই স্বর শুধু বলে যায়:

শোনো, কৃষিসমবায়ে আমার অনেক কথা বলবার ছিল—মৌ-প্রজনন নিয়ে পরীক্ষামূলক বাক্স আজ সকালেই আমি খুলে দিয়েছি মাঠের উত্তাল বায়ুর দিকে
[কুসংস্কার সম্বন্ধে কবিতা]

…না হয় মফস্বলে সামুদ্রিক
মাছের সম্পাদনা তুমি কোরো।… [পুরী সিরিজ ৮]

হ্যাঁ, কৃষিজীবীদের সপ্রাণ উপস্থিতি নয়, তাদের প্রতি মৌন দৃষ্টিপাত—ঘটেছে পুরী সিরিজের কবিতায় বারেবারে। মৌমাছি-আক্রান্ত চাষী, হলুদ সর্ষে ক্ষেত, সৈকত, সীমানা, ধান, গোলাঘর, বীজের উত্থান, সার, বৃষ্টিজল, কূপের বিন্যাস, জলসিঞ্চনের মতো জননীপ্রতিভার কথা তার ভিতরলোক আচ্ছন্ন করে রাখে। তিনি চেয়ে দেখছেন স্বাধীনতা মানে পুঁজির উত্থান—যাকে মনে হয় ‘নির্নিমেষ করুণ অঙ্গার সভ্যতার নাভির ভিতরে’—যেখানে ‘মানুষ রেডিওর মতো এক অর্বাচীন বক্তার সম্মানে পরিবারসহ শ্রোতা’, যেখানে ‘কাগজে নিত্যই সম্পাদক ছাপার কলের সঙ্গে কীভাবে সঙ্গম করে’ তারই বিবরণ শুধু মুদ্রিত হয়। সত্তা, সূর্য আর স্বাধীনতার কাছে তাই তার আর্তি উদ্বেল আখের বনে, বার্লিখেতে, যবের কিনারে, তরঙ্গশাসিত তটে উৎপাদনের মন্ত্র জাগানোর; আর কাপ্তানের বাইনাকুলারে, শত্রুজাহাজে, পণ্যে, অন্ধকারে গুপ্ত আর্মাডায় ভালোবাসার আলো ছড়ানোর।


তবু পুরী সিরিজ শেষ পর্যন্ত জীবনানন্দকে ছেড়ে যাবারই পটভূমি।


জীবনানন্দ-শাসিত এই ভাষা ও অনুষঙ্গ, পাঠকের চোখে ধরা পড়বে নিশ্চয়ই। তবু পুরী সিরিজ শেষ পর্যন্ত জীবনানন্দকে ছেড়ে যাবারই পটভূমি। সেই প্রস্থান ততদূর—জীবনানন্দের হাঁস থেকে তার ‘রাজহংসের ফৌজ’ যতদূর দৌড়ে যায়—যতখানি তারা হয়ে ওঠে ‘যুদ্ধের সন্তান’।

অন্যদিকে জন্মান্ধের কবি জীবনানন্দ থেকে বেশ দূরেই আছেন—অস্থির, অপরিমেয়, অপরিশীল,  অসংযম-বাক্য আর বাকশৈলী নিয়ে। বাংলা কবিতার সাধারণ পাঠক এই ভাষিক বিপর্যয় মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না তখনও। সত্যি বলতে কি, বাংলাদেশে তখন সংবাদ প্রতিবেদনের অনুগামী সহজবোধ্য ও সরলপাচ্য কবিতার বেশ রমরমা। ঠিক তখনই জন্মান্ধ-কবির উচ্চারণ : আমিই অ্যানাক্সাগোরাসের কালো বরফ।

উন্মাতাল, পাপবিদ্ধ কিন্তু বিদগ্ধ এক ‘আমি’র প্রতিষ্ঠাই যেন তার লক্ষ্য। যে আমি ঈশ্বর ও শয়তানকেও বাগে আনতে চায়—

ঈশ্বর নামক গৃহপালিত মিস্তিরি ভুল সিঁড়ি বানাচ্ছে আমাদের উঠোনে বসে—আগুনের, যে-অসম্ভবের সিঁড়িতে উঠতে-উঠতে আমরা সবাই পাতালে নেমে যাবো হঠাৎ।…

আমি মানুষ হতে চাই না, মানুষ নামের ফানুশ, আমাকে ঈশ্বর বানাও কিংবা শয়তান…

আমার এক হাত ধরে টান দিয়েছেন শয়তান, আরেক হাত ঈশ্বর—কী উল্লাস আমাকে নিয়ে! আমি ঐ দুজনের ভোজ…।  [পাগল এই রাত্রিরা]

প্রতিভা তার কাছে ‘সেই শয়তান, যিনি আমার কাঁধ থেকে আলগা করে ফেললেন হাড়, খুবলে নিলেন চোখ, তারপর নগ্ন করে ছেড়ে দিলেন পুরোনো এই বাড়িতে, যেখানে আমার মধ্য থেকে ডাক দিল মৃত সব নিরিন্দ্রিয় কবি’। প্রতিভা তার কাছে ‘বেয়াড়া মেয়েমানুষের মতো’, বলছেন, ‘আমি তাঁর ক্রীতদাস : জীবন, আমার বোন, কেন আমার চাবি আমার বোনের ভেতর প্রতিশ্রুত হতে পারবে না?’ এই সেই চাবি, যার অভাবে ‘করুণ কবাটের মতো ঝোলানো বাড়ির দেয়াল থেকে লুটিয়ে থাকে যেন বর্ম কিংবা বিরুদ্ধ পদ্ধতি হাওয়ার’। এই সেই চাবি, রাত্রি হলেই চাবির প্রসঙ্গ চলে আসে। মনে হয় উদ্ভ্রান্ত পরিব্রাজক ক্লান্ত হয়ে কোথাও প্রবেশ করতে চাইছে—

‘আমি, করতলে চাবি নিয়ে, ঘুমের ভিতরে ফিরি দুয়ারে দুয়ারে’ [রাত্রিপাত]

‘আমার কবিতা :/ দরোজায় অক্টোপাশ, চাবিছিদ্রে নিমন্ত্রণকারী/ বিজোড় পতিতা॥
[টুকরো-টুকরো মৃত্যু ৩]

আমার বাক্সের চাবি ছুঁড়েছি তোমার মনে ফেলে [সুবাতাস]

আমারি চতুর্দশী হৃদয় স্বর্গের চাবিগুচ্ছ কিনা এরকম অমাবস্যার ভিতরে দাও আমাকে সমুদ্র থেকে চশমা-পরা জ্ঞান তুলে আনতে [অভাব]


জীবনকে বোন বলে সম্বোধন বাংলা কবিতায় এই প্রথম।


যে কথার সূত্র ধরে ‘চাবি’তে এলাম, সেখানে আবার একটু ফেরা যাক—‘জীবন, আমার বোন, কেন আমার চাবি আমার বোনের ভেতর প্রতিশ্রুত হতে পারবে না?’

জীবনকে বোন বলে সম্বোধন বাংলা কবিতায় এই প্রথম। প্রসঙ্গত আমাদের মনে পড়বে, উৎপল লিখেছেন : ‘নিজেরই বোনের প্রতি যৌনতা ও উপদ্রব আমি লক্ষ্য করি’। খুব সতর্কভাবেই কবি লিখেছেন ‘লক্ষ্য করি’, ‘অনুভব করি’ নয়। তবু অনুভবের ছোঁয়াচ কি লাগে না এখানে? বাংলা কবিতায় এই অস্বস্তিও প্রথম এল। এর আগে জীবনদাশ প্রেমিকাকে ‘হৃদয়ের বোন’ পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেছিলেন।

 

চাঁদ, জ্যোৎস্না, ভূত, আত্মা

দেবতা-বোধ অথবা অধিবিদ্যক ধারণাগুলি উৎপল কিংবা মান্নানের কবিতায় হাজির হয়েছে মোটিফ আকারে। এসবের আর্কেটাইপ-ভ্যালু নিয়ে নতুন রূপকল্পের সম্ভাবনা খুঁজে ফিরেছেন দুজনেই—

‘আকাশ আজ দেবতার ছেলেমেয়েদের নীল শার্টপাজামার মতো বাস্তবিক’।
[পুরী সিরিজ-য়ের শেষ কবিতা]

বাস্তব হোক না হোক, এই ব্যাজ, অপহ্নুতি পাঠকের মনে চকিতে নিয়ে আসে চিত্রের অধিক ব্যঞ্জনা। বাংলা কবিতায় দেবতা তো ছিলই, এখন প্রবেশ করল দেবতার ছেলেমেয়েরা। ফলে নাতি-পুতিরও আসার সম্ভাবনা তৈরি হলো। পরবর্তী কাব্যগ্রন্থে মান্নানেরও একটি কবিতায় আমরা পেয়ে যাই—

‘সূর্যাস্ত ফেলছে নিঃশব্দে ফেরেশতাদের রঙচঙে কাপড়-চোপড়।’ [লণ্ঠন]

কিংবা

‘আল্লার কড়ে আঙুলে আমার কড়ে আঙুল লাগিয়ে দিয়েছি ঝট করে।’
[রক্তের পলাশবনে কালো ফেরেশতারা]

ফেরেশতাদের কাপড়-চোপড় এর আগে আমরা দেখি নি, জানতাম না সেগুলি সূর্যাস্তের মতো রঙচঙে। আল্লার কড়ে আঙুলে নিজের কড়ে আঙুল লাগানোর কথা কি ভেবেছিল কোনো উন্মাদ সুফিও? ধর্মযুগের অবসানে আধুনিকতার তুঙ্গস্ফূর্তি ঈশ্বরের ভাবমূর্তিকে কেমন অবলীলায় কবিতার ইমেজে পর্যবসিত করল! এভাবেই নতুন হয়ে উঠল নীল আকাশ ও সূর্যাস্তমুহূর্ত।

অতীন্দ্রিয় বিষয়াদি কখনো বিদ্রূপাহত হয়েও কবিতার ভরকেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছে। যেমন উৎপলের ‘আত্মা’—

সবুজ রহস্যময় আত্মা, তুমি বাছা, চাও নাকি সশব্দ প্রস্থান…

…চলো সন্দেশের বাক্স নিয়ে পাহাড়ের খাদের কিনারে গিয়ে বসা যাক…

….তুমি কি শ্মশানে তদ্বির করো শাপমোচনের…   [কুসংস্কার সম্বন্ধে কবিতা]

মান্নানের জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছে মেটাফিজিক্স বিশ্বাসের, মুক্তির, সম্ভ্রমের কোনো দূতিয়ালি করতে হাজির হয় নি। তারা এসেছে উদ্ভটত্বের প্রতিষ্ঠা দিতে, ত্রাসের সঞ্চারপথে কোনো গহন সুড়ঙ্গ তৈরি করতে, দৃশ্যমানতাকে দুমড়েমুচড়ে দিতে। যেন তারা—‘কার্তিক তারার সৈন্যদল’। তাই তার কবিতায় রাত্রি, জ্যোৎস্না, ভূত, আত্মা পরস্পরের সমার্থক হয়ে ওঠে কখনোবা। সব মিলিয়ে তার চেতনার যে মানচিত্র তা অনেকটা এমন—

মেয়েমানুষ, যারা ল্যামপোস্টের মতো হাঁটছে এখন; আর খ্যাতি, সাততলা খ্যাতি; আর টাকা, তদবিরবাহিত টাকা; এই আমার দেশ—সারল্য আর পিচ্ছিলতায় ভরা

আমি নারীর নর্দমা থেকে কুমারের মতো জেগে উঠে বানাতে বসলাম নিজেকে সারল্য আর ভালোবাসা আর আমার আল্লাহ্‌র বিন্যাসে।’ [অভাব]


মান্নানের কবিতায় যে অনুষঙ্গটি সবচেয়ে বেশি হাজির, তা হলো জ্যোৎস্না, চাঁদ।


মান্নানের কবিতায় যে অনুষঙ্গটি সবচেয়ে বেশি হাজির, তা হলো জ্যোৎস্না, চাঁদ। এই চাঁদ-জ্যোৎস্না-রাত্রির সহচর হিশেবেই আবির্ভূত হয় ভূত, আত্মা ইত্যাদি। কিছু উদাহরণ দিলেই পাঠক এর ঠেলা (খেলা) বুঝবেন—

জ্যোৎস্না ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে দরোজায়… আমার পাপের দুচোখ চাঁদ এবং সূর্যের মতো অন্ধ হয়ে গেল… জ্যোৎস্না তার কাছে ভূত কিন্তু একটি গানের উপর [অশোককানন]

অন্ধকার দেখে আলো হেসে ফেলল বরং, তথা জ্যোৎস্নার ঘাগরা পরে অভিসারী সত্য জানালায় এসে টোকা দিচ্ছে নিঃশব্দে [রাত্রিপাত]

আমি ভূতের মতো উল্টো-পায়ে পুরনো এই বাড়িতে উঠছি, নামছি, চাবিহীন হাসছি [পাগল এই রাত্রিরা]

জ্যোৎস্না কী?—না, জ্যোৎস্না হয় জল্লাদের ডিমের মতো চুলহীন জলবায়ুহীন মুণ্ডু, জোড়া-জোড়া চোখ, সাতটি আঙুলের একমুষ্টি হাত, রক্তকরবীর অন্ধকার, এবং একগুচ্ছ ভুল শিয়ালের সদ্যোমৃত যুবতীকে ঘিরে জ্বলজ্বলে চীৎকার। [জ্যোৎস্না]

কাঁচা মাংসের ভূতে লুকানো একটি আলপিন জ্যোৎস্নার মতো বিঁধে ফেলল আমাকে [অভাব]

হে চাঁদ, তুমি কি ঈশ্বরের ঘড়ি? একটা দুঃখিত পাথর? হার্দ্য হাঁসের রুপোলি ডিম?
[চাঁদে-পাওয়া ১]

কিশোরীর নতুন স্তন নাকি তুমি [চাঁদে-পাওয়া ৩]

নিষ্ঠুর ড্রামের মতো প্রচণ্ড বেজে চলেছে চাঁদ—অবিশ্বাস্য সব হিরের পাহাড়ে প্রতিধ্বনি তুলে, ধনীদের অনির্বচনীয় পুঁজি চোখ তুলে তাকায়—যখন ভীষণ উল্লাসে নাচছে চাঁদ ধাতুর নেপচুনের মতো ফাঁকা সব অহঙ্কারের বুকের উপর? [চাঁদে-পাওয়া ৪]

চাঁদ, তুমি কি একটা অথৈ পাড়াগাঁর মেয়ে [চাঁদে-পাওয়া ৫]

পৃথিবীর একটি সারাক্ষণ পাখি জীবনের ঔরসে প্রসব করে বন্দুকের গুলি। দুজন তাকে দেখেছিল : ভালোবাসা ও ভূত : তারা পরস্পরকে সেই পাখি ভাবে॥ [টুকরো-টুকরো মৃত্যু ৭]

ভাসিয়ে দিলাম মদ আর গোলাপের সন্ধেগুলি; আর অনাব্য আত্মাগুলি—যা আমি জোগাড় করেছিলাম ভাঙা জানালার উঁচু পরোক্ষের বাড়ি থেকে পালকভর্তি কৈশোরিক অ্যাডভেঞ্চারে চড়ে। [সমস্ত ভাসান দিলাম সমস্ত উড়াল ৩]

 

কথা হয় রামধনুর ভিতর হু-হু টেলিগ্রাফে

কেবল কিছু সুন্দর চিত্রকল্পের কারণেই এই দুটি কাব্য আমার আরাধ্য হয়ে উঠতে পারত। আজ পর্যন্ত বৃষ্টির এমন অভিনব উপস্থাপন আমি কোথাও পড়ি নি—

● ভাঙছে থার্মোমিটার শত-শত, নাকি বৃষ্টি স্থির ফুটপাতে?

এমন আরও দুএকটি নমুনা—

● সূর্য টেনে নিয়ে যাচ্ছে কালো রেলগাড়ি

● শেলাই করছে পাখি অসীমের ব্রিজ—
দেখেছি হরিৎভেদী প্রশান্ত ল্যাম্পোস্ট দাঁড়িয়েছে পাতার ভিতরে

উৎপল থেকেও ছিনিয়ে আনা যায় এইসব লাবণ্যশোভা—

● লাখো লাখো গুণ্ঠনমিছিল এই নীল ঢেউ

● মেঘের ভিতর থেকে আবির্ভূত জীবনের প্রথম এয়ারোপ্লেন

● মরণশীল উদ্ভ্রান্ত মোরগ ক্রমে উড়ে যায় মৃত্যুর পরেও লাল টালি-বারান্দায়


ইতিহাস-চেতনার মহাবয়ান পিছনে ফেলে ব্যক্তিচেতনার নানা বিক্ষেপ..


কিন্তু না, এসবের বাইরে, বাংলা কবিতার মুক্তি বলব না, বলব নতুন এক ইশারা জাগিয়ে তুলেছিল এই দুটি কাব্য। যার ধারা কোনো না কোনোভাবে এখনও বহমান। কবিতার কাছে কেবল বক্তব্য আর বাণী প্রত্যাশা না করে বরং তার ভিতর দিয়ে আমাদের চারপাশটাকে, আমাদের চৈতন্যকে আতশকাচের নিচে ফেলে দেখার চোখ তৈরি করেছে এই কবিতাগুলি—আরও গভীর অভিনিবেশে নিয়ে যাবার মন।

ইতিহাস-চেতনার মহাবয়ান পিছনে ফেলে ব্যক্তিচেতনার নানা বিক্ষেপ—যা হয়তো কবিতায় ফুটিয়ে তুলতে চায় স্নায়ু-সংবেদন, সেরিব্রাল ইফেক্ট—বাংলা কবিতাকে সেদিকে টেনে এনেছে এই কবিতাগুলি। সূক্ষ্মতর, অস্ফুট সেই বিবেচনায় এই কবিযুগল  ছিটকে বেরিয়ে গেছেন জীবনানন্দ থেকে।

এই বেরিয়ে যাওয়া, নতুন পথ সৃষ্টি করা—এর বিশদ ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ হতে পারে। আমরা শুধু কিছু রূপকল্পের সন্ধান করেছি এই লেখায়, অর্থ-নিষ্কাশনের প্রয়াস ছাড়াই। কারণ এ ধরনের কবিতায় অর্থাগম একটি প্রাতিস্বিক ব্যাপার। সর্বজনীন করে তুলতে গেলেই তা হেঁয়ালিপূর্ণ হয়ে উঠতে বাধ্য। তাই অনুধাবনের জানালা খুলে রাখতে চেয়েছি পাঠকের জন্য। উদ্ধৃতির পর উদ্ধৃতি, দৃশ্যের পর দৃশ্য গেঁথে তুলেছি, যেন পাঠক নিজেই হয়ে ওঠেন রূপকল্পের আবিষ্কর্তা—যে রূপকল্প কবির নিজের জগৎটাকে চিনতে সহায়তা করে শুধু, এর বেশি কিছু নয়।

সোহেল হাসান গালিব
গালিব

সোহেল হাসান গালিব

জন্ম : ১৫ নভেম্বর ১৯৭৮, টাঙ্গাইল। বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর।
সহকারী অধ্যাপক, ঢাকা কলেজ, ঢাকা।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
চৌষট্টি ডানার উড্ডয়ন ● সমুত্থান, ২০০৭
দ্বৈপায়ন বেদনার থেকে ● শুদ্ধস্বর, ২০০৯
রক্তমেমোরেন্ডাম ● ভাষাচিত্র, ২০১১
অনঙ্গ রূপের দেশে ● আড়িয়াল, ২০১৪

সম্পাদিত গ্রন্থ—
শূন্যের কবিতা (প্রথম দশকের নির্বাচিত কবিতা) ● বাঙলায়ন, ২০০৮
কহনকথা (সেলিম আল দীনের নির্বাচিত সাক্ষাৎকার) ● শুদ্ধস্বর, ২০০৮।

সম্পাদনা [সাহিত্যপত্রিকা] : ক্রান্তিক, বনপাংশুল।

ই-মেইল : galib.uttara@gmail.com
সোহেল হাসান গালিব
গালিব