হোম নির্বাচিত ইরাশা ভাষার জলমুক : কিছু পাঠ-আভাস

ইরাশা ভাষার জলমুক : কিছু পাঠ-আভাস

ইরাশা ভাষার জলমুক : কিছু পাঠ-আভাস
410
0

এবার অমর একুশে গ্রন্থ মেলায় প্রকাশিত হতে যাচ্ছে
মাজুল হাসানের ৩য় কাব্যগ্রন্থ ইরাশা ভাষার জলমুক
বইটি প্রকাশ করছে চৈতন্য প্রকাশনী। প্রচ্ছদ ও কবিতা অবলম্বনে ড্রইং করেছেন রাজীব দত্ত।

এই বইটির পাণ্ডুলিপি পাঠের কিছু চকিত অনুভূতি ও কয়েকটি কবিতা
পরস্পরের পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো…


ভেতরের কবিতা বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছেও আজ বলা যায়—ব্যাকরণ-ভীরু বাঙালিরা কবিতার ব্যাপারে বরাবরই ছন্দ ও অবয়বের সনাতন পন্থাকে আঁকড়ে প্রথানুদাস হয়ে বাঁচতে চান। আশার কথা এই যে, গত কয়েক দশকে এর বিপরীত একটি ধারাও ক্রমশ উজ্জ্বল ও সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বলতে দ্বিধা নেই, মাজুল হাসান সেই ধারারই বলিষ্ঠ উত্তরাধিকার। বাতাসের বাইনোকুলার-এ তার যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, মালিনী মধুমক্ষিকাগণ হয়ে ইরাশা ভাষার জলমুক-এ মাজুলের কণ্ঠটি পূর্ণতা পেল, বলা যায়। ‘রেডিও পুষ্প’ কবিতার মতো; ‘গন্ধ থাকুক না থাকুক ফুল শব্দটি নিজেই সুরভিপূর্ণ’। মাজুলের কবিতার পরতে পরতে ছড়িয়ে থাকা ‘কেওয়াটিক অট্টহাসি’ কিংবা সুরভিপূর্ণ কথাবার্তায় জড়িয়ে যেতে, পাঠক, আরো একবার আপনাকে স্বাগত।

সজল সমুদ্র


ভালো কবিতা লিখে লাভ নেই। ভালো, তা যাই হোক না কেন, আমরা সবসময় ‘অন্যরকম’ই চাই; তা ভালো হতে পারে, যদিও সেটি মুখ্য নয়। মাজুল হাসান, যখনই লেখেন, আমরা সেই অন্যরকমের স্বাদ পাই। এটি তার শক্তি, সাহস এবং এক কথায় আর্টিস্ট্রির জায়গা। এটি অনুকরণযোগ্য। মাজুলে এটা আছে বলেই তার কবিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তারিক টুকু


মাজুলের কবিতাগুলি এমন একটা জায়গা, যেখানে যে-কোনোকিছু ঘটতে পারে: পাগলামি, খিস্তি, উদ্ভটত্ব, কোমল-কর্কশের মেশামেশি… মানে সবকিছু! এগুলিরে আপনি কবিতা না কইতে পারেন, কিন্তু অন্য কী বলবেন!

রাশেদুজ্জামান


ইরাশা ভাষার জলমুক  থেকে 

মাজুল হাসান


পিতামহ পিতামহী

পাথর আমাদের আদিম পিতা, পাথর আমাদের আদিম মাতা
শিখে নাও—ঘুম কতটা গভীর, কতটা স্থিরতরঙ্গ—সৌম্য
তবু পাথরের অন্তরেই আগুন, পিঙ্গল ডানা গুটানো অভিমান
এরপর ৯৩ হাজার কোটি বছর পর শুধু একটা মৃদু ঠোকাঠুকি

মুহূর্তের জন্ম হুহু করে আকাশ ধূসরে সচল হয় পূর্বাপর আলোকিত চাবুক—
চিম্বুকে তখন সে কী তোড়জোড়! রাজ্যজয়ের নেশায়
দিগ্বিদিক ছুট দেয় মেঘহস্তী

পবনসামন্ত

ঝরে পড়ো মৃগনাভ। বলো—আদি পিতা আঁহো, আদি মাতা আঁহো
দ্যাখো—পাথরের বুক চিড়ে বেরিয়ে আসছে সবুজ; তুমি…

একটা শিশু

রোদ তোমার ইহজন্মের বাবা, মা আজও শ্রাবণ অঝর…

 

ডোরাকাটা বাবা

বাবাকে আমি করুণা করি। উনি ব্যর্থ মানুষ এবং প্রগল্ভ—সে কারণে নয়
উনার একাধারে মাস্তান ও মহর্ষি ভাব ধরে চলাফেরাতেও আমি বিব্রত নই
আমি জানি পাড়ার সবচেয়ে অথর্ব মানুষটাও তাকে বাল দিয়ে পুঁছতো না
তবু নিখিল মানবতার রক্তক্ষরণে উনি কাঁদেন এবং কাঁদতে থাকুন শান্তিতে…
ওসব শোক-টোক আমার হজম হয় না
শহরের নিভৃত বারগুলো আরেকটু দের রাত পর্যন্ত খোলা থাকলেই আমি খুশি
বাবার মতো কথায় কথায় বাঘ-ঘোগ মারাতেও আমার চরম অরুচি
আমি শুধু উনার পরিত্যক্ত ডোরাকাটা জামাটা পরে মহল্লায় ফিরে আসি…

 

পাখিবিশারদ মা

পাখি মানচিত্রের দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব রাগাভিমানগুলো এখনও সবুজ
বুঝতে হবে—ওপাশটা এখনো বনটিয়া-ধনেশদের গুপ্ত আবাস
এমনিভাবে পাখি মানচিত্র থেকে জেনে নেয়া যায় সিমা’পুর প্রতি

কিশোরবেলার যৌনফ্যান্টাসি।

মা আমার পাখিবিশারদ। বলেছিলেন—জীবনে এমন সময় আসে
যখন লৌহবৃক্ষেও ফুটো করে কাঠঠোকরা

এখন আমি মধ্যদুপুর
গুপ্ত জলমুকের মতো শরীর কুচকুচে কালো

আমার প্রতিটি গর্ত থেকে শহরের দিকে উড়ে যায় কলকণ্ঠ বায়স

 

প্রিয় বোনটি

শহর মাত্রই পেরিয়ে যায় একটার পর একটা সুউচ্চ তোরণ, নারঙ্গী বন
ওখানে একদা মেষের লোমের মতো জমকালো রোদ, ইহজগতের মদ
মাতাল ট্রাকসম মানুষ ছুটছে ঝুম-অন্ধকার থেকে আলোকিত গোলক

ছেলেও আছেন, পিতৃহন্তারক-বাজার থেকে এসেছে ঘাতকের আস্তাবল
শিশুর আলজিভ থেকে দুধের বোটা ছাড়িয়ে মা হয়েছেন রাত্রি রোহিণী
লুপ্ত আস্তাবলে দুলছে ঘোড়ার সাদাকালো জীয়ন-লিঙ্গ। রস ঝরছে রস
শুধু প্রিয় বোনটি পাজামায় ক্ষোভ আর ভোঁতা ব্লেড রেখে শিখে নিচ্ছে

গেরিলা প্রশিক্ষণ…

সৎভাই

বাবা চাইতেন আমি যাতে সাহস নিয়ে ওর দিকে চোখ তুলে তাকাই
এক টেবিলে বসেও শান্ত থাকি। কফি খাই।

বাবা ছিলেন চিরসবুজ
আমিই তার গোপন শ্বাসরোমের খবর রাখি নি

জানি—একদিন বাবার কথাই সত্যি হবে
বন্দুক তাক করা পোস্টারের কোলাহল থেকে
জুতো বাঁধার ভান থেকে, সড়ক ডিভাইডারের প্যারালাল আড়াল ছিঁড়ে
আমি আর সেই লোকটা এসে দাঁড়াব আগুনচূড় গাছটার নিচে

আমি বলব—আয়ু, আরে সৎভাই যে!

চলো একটা লম্বা ম্যারাথন হয়ে যাক…

 

নিউ টেগর

দুপুরের চার হাতে ধরা থাকে ৪ প/পোঁদের রমণী—পদ্মিনী, চিত্রিণী,
শঙ্খিনী এবং হস্তিনী। এই কথা শুনে এক রবীন্দ্রভক্ত সংবেদনশীল কবি
আমাকে একহাত নিয়েছিল। বলেছিল, এইসব বহুস্তর কবিতা
ব্ল্যাক ম্যাজিক ছাড়া অন্যকিছু নয়। বস্তুতপক্ষে কবিতাকে হতে হয়
নিরাভরণ; যৌনতার ব্যবহার হতে হয় মনুমেন্টের মতো মসৃণ; শিল্পিত।
অগত্যা আমি সংবেদনশীল কবির খেলনা মিথুন-ভাস্কর্যটি নিরীক্ষার প্রয়াস
পাই। যেখানে পরচুলা আর প্লাস্টিকের ত্বকের ভেতরে একটি নারীযন্ত্রের
ওপর আরেকটি পুরুষযন্ত্র ক্রমাগত পিস্টন চালাচ্ছিল। আর উৎপন্ন হচ্ছিল
টেগর-টেক টেগর-টেক ছন্দ…