হোম বই নিয়ে আয়নায় ঘোরানো মুখ

আয়নায় ঘোরানো মুখ

আয়নায় ঘোরানো মুখ
1.37K
0

সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের তীর্থরেণুতীর্থসলিল কাব্যগ্রন্থের অনুবাদগুলো নিয়ে বুদ্ধদেব বসু প্রসন্ন কোনো মন্তব্য করেন নি। অনুবাদের সার্থকতা নিয়ে যে তিনি বড় কোনো আপত্তি তুলেছিলেন, তা নয়। তাঁর প্রশ্ন ছিল অনূদিত কবিতাগুলোর রকম নিয়ে। সত্যেন্দ্রনাথ-অনূদিত কবিতাগুলোর হরেক চরিত্রের মধ্যে রুচি ও অনুভবের কোনো ঐক্য তিনি খুঁজে পান নি। যা পেয়েছিলেন, তাকে তাঁর মনে হয়েছিল রুচির এক সর্বাত্মক শিথিলতা। কিন্তু, সত্যি সত্যি, একজন কবি অপর ভাষার আরেকজন কবিকে অনুবাদ করতে উন্মুখ হয়ে ওঠেন ঠিক কী কারণে? এর একটিমাত্র কোনো জবাব নিশ্চয়ই কোথাও নেই। তবে পশ্চিমবঙ্গের কথাশিল্পী দেবেশ রায় কথাচ্ছলে এর এক ধরনের জবাব দিয়েছিলেন ঢাকায়, একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়-আয়োজিত সাহিত্য সম্মেলনে। একজন কবি আরেকজন কবিকে অনুবাদ করার জন্য তাগিদ বোধ করেন তখনই, বলেছিলেন দেবেশ রায়, যখন ভিন্ন ভাষার সেই কবিতাটি পড়ে তাঁর মনে হয়, আরে, এমন একটি কবিতা যদি আমি নিজে লিখতে পারতাম! টি এস এলিয়ট যে অনুবাদ করতে ছোটেন সাঁ জঁ পার্সকে কিংবা সুধীন্দ্রনাথ দত্ত স্তেফান মালার্মেকে, এই আগ্রহ ও অনুবাদকর্মের মধ্য দিয়ে তাঁদের নিজ নিজ কবিমনও অনেক দূর পড়ে নেওয়া সম্ভব। মাতাল মানচিত্র নামে অনুবাদ কবিতাবইটির পাতা উল্টাতে উল্টাতে যেমন এখন পড়ে নেওয়া যাচ্ছে আবদুল মান্নান সৈয়দেরও কবিমন। এঁকে নেওয়া যাচ্ছে তাঁর কবিতারুচিরও এক পরিসীমা।


প্রথম কাব্যগ্রন্থ জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ-এর কবিতাগুলোয় পরাবাস্তবের এক স্বতঃস্ফূর্ত উন্মোচন ঘটেছে


১৯৭০ সালে প্রকাশিত এই বইটির ভূমিকায় মান্নান সৈয়দ বলছেন, ‘আমি বিশ্বকবিতার প্রেমে অতিক্রম করে গেছি দেশের দেয়াল, কালের পাহারা। এই অনুবাদকবিতাগ্রন্থে পাঠক তাই কোনো বিশেষ দেশ বা কালের ক্রমিক কবিতা বা কোনো নির্দিষ্ট বিষয়োৎসারিত কবিতার সন্ধান পাবেন না।…এই অনুবাদগুচ্ছ…কোনো সাধু বা আদর্শিক উদ্দেশ্যের দ্বারা প্রণোদিত নয়; খেলাচ্ছলে রচিত বরং।’ মান্নান সৈয়দ যতটা দাবি করেছেন, তাঁর অনূদিত কবিতা মোটেই ততটা ছড়ানো নয়। এ বইয়ে তিনি অনুবাদ করেছেন ১৫ জন কবিকে। ভূগোলের হিশেবে পাশ্চাত্যখণ্ডের বাইরে এতে ঠাঁই মিলেছে মাত্র দুজনের—লি পো আর অক্তাভিও পাসের। কালের হিশেবে আধুনিকতাবাদের উন্মেষপূর্বকালের কবির সংখ্যা এতে তিন—লি পোকে বাদ দিলে মাত্র দুই—পার্সি বিসি শেলি ও জন কিটস। খেলাচ্ছলেরও এক অচেতন ছক থেকে যায় বটে।

এ কথা আজ প্রায় কিংবদন্তিপ্রতিম হয়ে উঠেছে যে আবদুল মান্নান সৈয়দ পরাবাস্তববাদে আমুণ্ড নিমজ্জিত হয়েছিলেন। মান্নান সৈয়দের দিক থেকেও এ ধারণার প্রতি এক ধরনের সম্মতি ছিল। পরাবাস্তববাদ নিয়ে একাধিক প্রবন্ধ লিখেছেন তিনি, বের করেছিলেন পরাবাস্তব কবিতা নামে একটি কাব্যগ্রন্থ। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ-এর কবিতাগুলোয় পরাবাস্তবের এক স্বতঃস্ফূর্ত উন্মোচন ঘটেছে, কোনো কোনো আলোচকের এমন মন্তব্যে তাঁর সগর্ব অনুমোদন ছিল। পরাবাস্তব কবির অভিধাটি তিনি মুকুটের মতো মাথায় পরেছিলেন আনন্দের সঙ্গে। পরাবাস্তব কবিতায় তিনি খুঁজে পেতে চেয়েছিলেন তাঁর অন্বিষ্ট বিশুদ্ধ কবিতার আদর্শ। আবদুল মান্নান সৈয়দের ওপর একটি ছোট্ট রচনায় একবার লিখেছিলাম : ‘মান্নান সৈয়দের মূল প্রবণতা দুটো : এক. কবিতায় বিশুদ্ধতার উন্মোচন, দুই. অবচেতনার উদ্বোধন। এই অস্থির ও যুযুধান পৃথিবীতে কোথায় মিলবে বিশুদ্ধ কবিতা, কী হবে তার সংজ্ঞার্থ—এ এক প্রশ্ন বটে। কিন্তু দিগন্তের বাইরের সেই অস্পষ্ট অপ্রাপ্য পৃথিবীই আবদুল মান্নান সৈয়দের কবিতাকে সবচেয়ে বেশি কাতর করে তুলেছে। আর এখানেই সূত্র মেলে, হয়তোবা, তাঁর অবচেতনার সাধনারও। এ সাধনার এক বড় সহায় তাঁর বিশ্লেষণী মন, এবং সে পথে যুক্তির এক সচেতন বিপর্যয়। অর্থাৎ, মান্নান সৈয়দের কবিতায় অযুক্তির যে উত্থান তা অটোমেটিক রাইটিংয়ের ফল নয়, ভুলভাবে অনেকে যা মনে করে থাকেন। এটি বরং তাঁর মননের অর্জন। তিনি তাঁর অবচেতনাকে শিকার করতে চান এক পূর্বকল্পিত অনুধ্যান থেকে, আর তা করেন এক যুক্তিশাসিত ঘোরে।’ জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ থেকে তাঁর বহুল উদ্ধৃত ‘অশোককানন’ কবিতাটি একবার দেখে নেওয়া যাক :

জ্যোৎস্না ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে দরোজায়, সব দরোজায়, আমার চারিদিকে যতোগুলি দরোজা আছে সময়ের নীলিমার পাতালের; জ্বলছে গাছসকল সবুজ মশাল; বাস একটি নক্ষত্র, পুলিশ একটি নক্ষত্র, দোকান একটি নক্ষত্র: আর সমস্তের উপর বরফ পড়ছে।—এ রকম দৃশ্যে আহত হয়ে আমি শুয়ে আছি পথের উপর, আমার পাপের দু চোখ চাঁদ ও সূর্যের মতো অন্ধ হয়ে গেল, আর যে-আমার জন্ম হলো তোমাদের করতলে মনোজ সে অশোক সে: জ্যোৎস্না তার কাছে ভূত কিন্তু একটি গানের উপর, দরোজা তার কাছে পুলিশ কিন্তু একটি জন্মের উপর, মৃত্যু তার কাছে দোজখ কিন্তু একটি ফুলের উপর ॥

কবিতাটিতে আবদুল মান্নান সৈয়দ একটি উদ্ভটের জগৎ রচনা করেছেন। আমাদের চিরচেনা পৃথিবীর নানা উপাদানঅনেকটা সালভাদোর দালির চিত্রকর্মের মতো—এমন এক নতুন সম্পর্কে এখানে হাজির হয়েছে যে পুরো অভিজ্ঞতাটিই হয়ে উঠেছে অচেনা। কিন্তু এর ভাষার দিকে একটু নিবিড়ভাবে তাকালেই বোঝা যাবে এ কবিতা অটোমেটিক রাইটিং বা স্বতশ্চল রচনা নয়। এর শব্দ ও বাক্যের বিন্যাস সযত্নচর্চিত। লক্ষ করলে দেখা যাবে, এখানে পাশাপাশি সাজানো অব্যবহিত পরপর বাক্যের অন্বয়ের ধরন ও শব্দের অনুক্রম একই ধাঁচের : ‘বাস একটি নক্ষত্র’, ‘পুলিশ একটি নক্ষত্র’, ‘দোকান একটি নক্ষত্র’; ‘মনোজ সে’, ‘অশোক সে’; ‘জ্যোৎস্না তার কাছে ভূত কিন্তু একটি গানের উপর’, ‘দরোজা তার কাছে পুলিশ কিন্তু একটি জন্মের উপর’, ‘মৃত্যু তার কাছে দোজখ কিন্তু একটি ফুলের উপর’। ইন্দ্রিয়ের বিপর্যয়ে নয়, ভাষার সচেতন অনুশীলনে এবং শব্দের সুশৃঙ্খল ও সমরূপ বিন্যাসে রচিত হয়েছে এ কবিতার উদ্ভট।


লেখকের বিশ্বাস, পরাবাস্তববাদে ছিল তার প্রথম নান্দনিক বিস্ফোরণ।


পরাবাস্তব কবিতার প্রেমে আবদুল মান্নান সৈয়দ পড়েছিলেন, এ কথা সত্য। কিন্তু তাকে তিনি স্থির করে নিয়েছিলেন নিজের সংজ্ঞার্থে। আর তা করতে গিয়ে ছোট করে এনেছেন পরাবাস্তববাদের নান্দনিক প্রত্যয় ও ভাবার্থ, বিস্তার করে নিয়েছেন এর লেখককুলের তালিকা; এতটাই বিস্তার যে ‘সুররিয়ালিজম : পরাবাস্তব বিশাল বিশ্বে’ শিরোনামে তাঁর লেখা এক প্রবন্ধে এর বলয়ের মধ্যে এসে ঢুকে পড়েছেন জেরার দ্য নেরভাল, শার্ল বোদল্যের, স্তেফান মালার্মে, জঁ আর্তুর র‌্যাঁবো, পল ক্লোদেল, হুগো ফন হফমান্‌স্থালের মতো কবিরা—নিজের নিজের নন্দনভাবনায় যাঁরা একান্তভাবেই স্বকীয়, কেউ কেউ আদৌ কখনো পরাবাস্তববাদের সংস্পর্শে আসেন নি বা আসার কোনো সুযোগই পান নি।

বলেছি যে পরাবাস্তববাদের নান্দনিক প্রত্যয় ও ভাবার্থ তিনি ছেঁটে সংকীর্ণ করে এনেছিলেন। গত শতকের প্রথম মহাসমরের ধ্বংসস্তূপের ওপর এবং দ্বিতীয় মহাসমরের পটভূমিকায় উন্মেষ ঘটেছিল পরাবাস্তববাদের। সে সময়ের ইউরোপে একের পর এক নানা শিল্প-আন্দোলনের তরঙ্গ আছড়ে পড়ছিল। সব আন্দোলন এক বাটখারায় ওজন করার মতোও ছিল না। ইতালিতে ভবিষ্যদ্বাদী শিল্প-আন্দোলন যে অবশেষে মুসোলিনির ফ্যাসিবাদের কোলে গিয়ে আশ্রয় নেয়, আর অন্যদিকে সালভাদোর দালির মতো দুয়েকজনের বিপরীতপ্রস্থান বাদ দিলে পরাবাস্তববাদী কবি-শিল্পীরা যে একে একে বামপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়েন, সেটা নেহাৎ আপতন নয়। ফরাসি দার্শনিক রেনে দেকার্তে-প্রস্তাবিত যুক্তিবেদের ওপর ভিত্তি করে এনলাইটেনমেন্টের প্রভুত্ব ও উপনিবেশের গোড়াপত্তনের প্রসঙ্গ নিয়ে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে যে দার্শনিক ধুন্ধুমার চলছে, বর্তমান লেখকের বিশ্বাস, পরাবাস্তববাদে ছিল তার প্রথম নান্দনিক বিস্ফোরণ। তা নিয়ে বিশদ আলোচনার ক্ষেত্র এটি নয়। কিন্তু পরাবাস্তববাদী ইশতেহার শুরুই হয়েছিল সেই যুক্তিবেদকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। পরাবাস্তববাদী কবি-শিল্পীরা খুঁড়ে আনতে চেয়েছিলেন মানুষের সেই অনশ্বর সত্তার কিছু স্ফুলিঙ্গ, যা চাপা পড়ে ছিল এই সাম্রাজ্যিক সভ্যতার গাদের তলায়। উপনিবেশিত আফ্রিকার কবি আইয়েমে সেজেয়ার যে পরাবাস্তববাদে তাঁর নেগ্রিচ্যুড শিল্প-আন্দোলনের শেকড় খুঁজে পেয়েছিলেন, সেটা তাই অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। শেকড়সমেত মূল গাছটিকে উপেক্ষা করে মান্নান সৈয়দ কেবল পরাবাস্তবের কিছু কিছু ফলের স্বাদ চেখে দেখতে চেয়েছিলেন। আসলে তাঁর ঝোঁক ছিল সেই ধরনের কবিতার প্রতি, যেখানে মাতাল কল্পনা ডানা মেলতে পারে, মুক্তি পায় কবির নান্দনিক স্বেচ্ছাচার, যাতে অদ্ভুতের আর কোনো শেকড় থাকার দরকার পড়ে না। তাই পরাবাস্তবের পরিধি কিছুটা সম্প্রসারিত করে আধুনিকতাবাদের কিছু কিছু ধারা মান্নান সৈয়দ তার মধ্যে মিশিয়ে দিয়েছিলেন।

আবদুল মান্নান সৈয়দের মাতাল মানচিত্র নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে যে এত কথা বলতে হলো, তার কারণ বইটির কবি নির্বাচন ও কবিতার চয়নেও আছে তাঁর সেই একই মনের প্রতিফলন। তাঁর ভাষান্তরিত কবির তালিকায় আছেন চীনের লি পো; ব্রিটেনের পার্সি বিসি শেলি ও জন কিটস; যুক্তরাষ্ট্রের এডগার অ্যালান পো; ফ্রান্সের জঁ আর্তুর র‌্যাঁবো, গিয়োম আপোলিন্যের ও পল এলুয়ার; জার্মানির রাইনের মারিয়া রিলকে ও গেয়র্গ ট্রাক্‌ল্; স্পেনের আন্তোনিও মাচাদো, হুয়ান রামোন হিমেনেথ, ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা ও রাফায়েল আলবের্তি; গ্রিসের ওদিসিউস এলিতিস ও মেহিকোর অক্তাভিও পাস। রাজনীতিতে প্রবলভাবে লিপ্ত পল এলুয়ারকে অনুবাদ করতে গিয়ে যে তিনি বেছে নিলেন একটি মিষ্টি প্রেমের কবিতা কিংবা নির্বাচিত কবিতার ১৯৭৫ ও ২০০১ সালের সংস্করণে মাতাল মানচিত্র অংশে চিলির বিপ্লবী কবি পাবলো নেরুদার ভাষান্তর নতুন করে যুক্ত করতে গিয়ে যে তিনি যথাক্রমে বেছে নিলেন কবির মৃত্যুচেতনা ও আত্মিক অনুপ্রেরণার কবিতা, তার মধ্যেও আছে মান্নান সৈয়দের সেই বিশিষ্ট মন।


মান্নান সৈয়দ বলেছেন, ‘আমি কবিতা অনুবাদে ঘোর অবিশ্বাসী…


কিন্তু বহুল উদ্ধৃতিতে জীর্ণ রবার্ট ফ্রস্টের সেই উক্তি, ‘অনুবাদে যা হারায় তা-ই কবিতা,’ আর যোহান ভল্ফগাং ফন গ্যোটের কিছুটা অপরিচিত বচন, ভালো কবিতার প্রাণস্পন্দন টিকে থাকে অনুবাদের পরেও;—কবিতা তরজমা করতে গিয়ে এই বিপরীত দুই আপ্তবাক্যের মধ্যবর্তী কোন পথটি ধরে হেঁটেছেন আবদুল মান্নান সৈয়দ, সেটা এক বড় প্রশ্ন। মাতাল মানচিত্র-এর ভূমিকায় মান্নান সৈয়দ বলেছেন, ‘আমি কবিতা অনুবাদে ঘোর অবিশ্বাসী…।’ কেন, তার কারণ ব্যাখ্যা করেন নি। সামান্য কোনো ইঙ্গিতও দেন নি। আমরা বরং অন্যত্র যাই। বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন, আধেয়টা দেওয়া থাকে বলে অনুবাদকর্মটিকে কবি তাঁর জন্য প্রকরণের একটি সমস্যায় পর্যবসিত করেন। এ বড় প্রতারক কথা। যে সুনির্দিষ্ট ভাষাবিন্যাসের মধ্যে একটি কবিতার ‘আধেয়’ ধরা থাকে, তার বাইরে সেই ‘আধেয়’র অস্তিত্ব কোথায়? ‘অ্যাগেইন্‌স্ট ইন্টারপ্রেটেশন’ প্রবন্ধে সুজ্যান সনটাগ এত দূর পর্যন্ত বলতে চেয়েছেন যে কবিতা তো দূরে থাক, যেকোনো শিল্পসাহিত্যকলায় উপরিতলের ওপারে তাকানোর চেষ্টামাত্রেই বিভ্রান্তিকর, ফলে অনুচিত। সুজ্যান না হয় একটি নির্দিষ্ট ঘরানার নন্দনতত্ত্বের প্রতিনিধি। তারপরও কবিতার ক্ষেত্রে ব্যাপারটি সত্যিই বড় জটিল ও কুজ্ঝটিকাময়। অন্যান্য সাহিত্যকলায় ভাষা বাহনবিশেষ। অথচ কবিতায় ভাষা তো বাহনমাত্র নয়, একটি বিশেষ ভাষাবিন্যাসেই প্রতিটি কবিতার গন্তব্য। শব্দের আভিধানিক অর্থ যে কবিতার শব্দব্যবস্থার মধ্যে কর্পূরের মতো উবে যায়, সে রহস্যের গোড়া এখানেই। ফলে কবিতায় আধেয়র প্রশ্ন অতটা সরল নয়। এই জটিল পথের বাঁকে অসহায় অনুবাদক বেচারা কী করবেন? প্রত্যেক কবি-অনুবাদককে তাঁর তাঁর মতো করে এ সমস্যার সুরাহা করতে হয়। বুদ্ধদেব বসুর কথাটিকে বড় জোর এ অর্থে গ্রহণ করা চলে যে আঙ্গিকের খাঁজে খাঁজে সাবধানে পা ফেলে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টাই হয়তো কবিতা অনুবাদের প্রধান বিকল্প। তাই কবিতার অনুবাদক যদি হন কোনো কবি, তার অনুবাদের ক্ষেত্রে শৈলীবিচারের প্রশ্ন প্রথমেই উঠতে বাধ্য।

এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে আবদুল মান্নান সৈয়দের অনুবাদ মোটের ওপরে পাঠযোগ্য। এ কথা বিশেষভাবে বলতে হয় এ কারণে যে বাংলা ভাষায় কবিতার ভালো অনুবাদ অত্যন্ত দুর্লভ। মান্নান সৈয়দের নিজের কবিতায় সুরের চেয়ে চিত্র রচনার দিকে ঝোঁক প্রবল। তিনি ছন্দে লিখেছেন প্রচুর, কিন্তু কোথাও ছন্দের ছকে ঘা দেওয়ার চেষ্টা করেন নি। তাঁর পদক্ষেপে নৃত্যপরতার বড় অভাব। কোথাও কোথাও স্বরভঙ্গও ঘটেছে। তারপরও চিত্রপ্রধান ও সুরপ্রধান দুধরনের অনুবাদেই তিনি হাত বাড়িয়েছেন। কিন্তু তার সাফল্য স্বাভাবিকভাবেই চিত্রপ্রধান কবিতায়। ছন্দ রক্ষা করতে বা মিল দিতে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় শব্দ কবিতায় ঢোকানোর ফলে কোনো কোনো কবিতার অভিপ্রায় বা আবহ ক্ষুণ্ন হয়েছে। ওদিসিউস এলিতিসের কবিতার তরজমা প্রসঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, ‘সাধারণ অন্ত্যমিল ও অর্ধমিল বা একাক্ষর মিল সচেতনভাবে প্রয়োগ করেছি।’ সচেতনভাবেই তিনি তা করেছেন হয়তো। কিন্তু বলতেই হয়, ওদিসিউস এলিতিসের ‘সুভাষণ’ কবিতার স্বরসঙ্গতি নির্মাণের চেষ্টা শ্রুতিকে একেবারেই তৃপ্ত করে না। অ্যালান পোর ‘একা’ কবিতাটির কথাই ধরা যাক। ‘অ্যালোন’ কবিতায় পো লিখেছেন, ‘ফ্রম চাইল্ডহুডস আওয়ার আই হ্যাভ নট বিন/ অ্যাজ আদারস অয়্যার; আই হ্যাভ নট সিন/ অ্যাজ আদারস স; আই কুড নট ব্রিং/ মাই প্যাশনস্ ফ্রম আ কমন স্প্রিং।’ মান্নান সৈয়দ অনুবাদ করেছেন, ‘শৈশবসময় থেকে আমি আর-কারো মতো নই—/ দেখি নি অন্যের মতো—একক উৎস থেকে তাথৈ/ জেগে উঠে নি আমার সাধারণী রক্তিম বাসনা…।’ মূল ইংরেজির ‘স্প্রিং’ শব্দের ‘কমন’ বিশেষণটি কেন ‘সাধারণী’ হয়ে ‘রক্তিম বাসনা’র আগে এসে বসল, সে প্রশ্ন না হয় বাদই দিলাম। অনুবাদের দ্বিতীয় চরণে ‘তাথৈ’-এর অনুরূপ কোনো শব্দ তো মূল কবিতায় নেই। ছন্দসাম্য নষ্ট করে শব্দটি শুধু পঙ্‌ক্তিটির স্বরভঙ্গই ঘটায় নি, অযাচিত চপলতা সঞ্চার করে কবিতার অভিপ্রায়ও ক্ষুণ্ন করেছে।


তাঁর অনুবাদের আয়নায় তাই ধরা পড়ে কবি আবদুল মান্নান সৈয়দেরই মুখচ্ছবি।


অনেক সময় অর্থান্তরও ঘটে গেছে কোনো কোনো তরজমায়। জঁ আর্তুর র‌্যাবোঁর ‘প্রথম প্রদোষ’ কবিতাটির কথাই ধরা যাক। মান্নান সৈয়দের তরজমায় এ কবিতার প্রথম চরণ, ‘মেয়েটি একেবারে আমূল নগ্নিকা…!’ অথচ অলিভার বারনার্ড-অনূদিত র‌্যাঁবোর রচনাসমগ্রের সংস্করণে এ কবিতায় মেয়েটিকে দেখতে পাচ্ছি ‘ভেরি মাচ হাফ-ড্রেস্‌ড্’। এমনকি মান্নান সৈয়দের তরজমায়ও কবিতার দ্বিতীয় স্তবকের প্রথম চরণে মেয়েটি যখন আবার ফিরে আসছে, তখন সে ‘মস্ত কেদারায় আধেকনগ্নিনী’। এ সব ব্যত্যয়ে কবিতার মেজাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই প্রমাদটুকু বাদ দিলে ও মূল কবিতাটি ভুলে গেলে অনূদিত রচনাটি কবিতা হিশেবে পড়তে দারুণ।

শৈলীর অনুপুঙ্খ বিচারে ঢুকলে আবদুল মান্নান সৈয়দের অনুবাদে যে সমস্যা আমরা দেখতে পাই, সেটি তাঁর একার নয়, বাংলা কবিতায় এর দীর্ঘ পরম্পরা রয়েছে। ফলে আঙ্গিকে ধ্রুপদী নিষ্ঠায় বিশ্বাসী শার্ল বোদল্যেরের বহু নিপাট অন্ত্যমিলের কবিতা বুদ্ধদেব বসুর হাতে নিষ্পন্ন হয় অর্ধমিলে। মূলে অন্ত্যমিলে লেখা রিলকের ‘শরৎ’ বা লোরকার ‘ঘোড়সওয়ারের গান’, ‘তিনটি নদীর ছোট্ট গাথা’ ও ‘বিদায়বাণী’ মান্নান সৈয়দ তরজমা করেছেন বটে ছন্দে, কিন্তু অন্ত্যমিল উপেক্ষা করে গেছেন। তাতে অবশ্য মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায় নি। অনুবাদগুলো পড়তেও খারাপ নয়। তবু অনুবাদক যখন কবি, তখন কবিতা অনুবাদের আক্রার এই বঙ্গভাষায় আমাদের প্রত্যাশা অযাচিতভাবেই একটু বেশি হয়ে যায়।

আবদুল মান্নান সৈয়দ যে খুব নিবিষ্টভাবে অনুবাদ করেছেন, তা নয়। কিন্তু যখন অনুবাদ করেছেন, তখন যে কবিতাটি পড়ে অনুপ্রাণিত হয়েই তা করেছেন, তাঁর অনুবাদে সেটা স্পষ্টভাবেই বোঝা যায়। তাঁর অনুবাদের আয়নায় তাই ধরা পড়ে কবি আবদুল মান্নান সৈয়দেরই মুখচ্ছবি। হয়তো একটু ঘুরিয়ে ধরা; কিন্তু সে রকমই উৎকেন্দ্রিক, খ্যাপাটে ও ছায়ামেদুর।

২৩ নভেম্বর ২০১০

সংশ্লিষ্ট পোস্ট : আবদুল মান্নান সৈয়দের বাছাই কবিতা
সাজ্জাদ শরিফ

সাজ্জাদ শরিফ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদক at প্রথম আলো
জন্ম ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৬৩, পুরান ঢাকা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর।

প্রকাশিত বই :
ছুরিচিকিৎসা [কবিতা, ২০০৬, মওলা ব্রাদার্স]
যেখানে লিবার্টি মানে স্ট্যাচু [গদ্য, ২০০৯, সন্দেশ]
রক্ত ও অশ্রুর গাথা [অনুবাদ, ২০১২, প্রথমা]

ই-মেইল : sajjadsharif_bd@yahoo.com
সাজ্জাদ শরিফ