হোম বই নিয়ে আমি এক ড্রপআউট ঘোড়া : ভাষার পাষাণ-প্রাচীরে (অব)মুগ্ধ সহিস

আমি এক ড্রপআউট ঘোড়া : ভাষার পাষাণ-প্রাচীরে (অব)মুগ্ধ সহিস

আমি এক ড্রপআউট ঘোড়া : ভাষার পাষাণ-প্রাচীরে (অব)মুগ্ধ সহিস
444
0

বইটিকে সরাসরি কবিতার বই বলতে চান নি তিনি। না চেয়ে ভালোই করেছেন। কিন্তু বইটি আসলে কী তা বলার লোভও সামলাতে পারেন নি। পারলে, আরেকটু উপকার হতো আমাদের

রবীন্দ্রনাথ দিয়ে শুরু করেছেন কবি। অনেকটা নিজের নিয়ম ভেঙে কবিতার বইটির শুরুতেই গদ্যে একটি ভূমিকা দিয়েছেন। স্মরণ করেছেন ঠাকুরের প্রশ্ন, কে তুমি? ‘আমি এক ড্রপআউট ঘোড়া’-র প্রথম প্রশ্নও ‘কে তুমি’? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মজনু শাহ’র মধ্যবর্তী যে-সময় তা কি ব্রাকেটবন্দি হয়ে পড়ল এই প্রশ্নে? ঠাকুরের প্রশ্নে, শাহ আমাদের জানাচ্ছেন যে, ‘একটা চিরন্তন আবেদন আছে’। না-থেমে বলছেন, ‘আমূল সত্তা-কাঁপানো এই প্রশ্ন’ এবং প্রশ্ন তুলছেন, ‘আদৌ কি এর কোনো উত্তর হয়?’ প্রশ্নটি নিয়ে ভেবেছেন শাহ এবং দেখেছেন, ‘প্রশ্নটির মর্মমূলে যে অন্তর্ঘাতশক্তি, তা সম্মোহিত, বিপন্ন, বিব্রত যেমন করে, বিবমিষাও জাগায়।’

ঠাকুরের বিষম ১১ লাইনের অবসরে ‘প্রথম দিনের’ আর ‘দিবসের শেষ সূর্য’ দুইবার এই প্রশ্ন তুলেছিল, কে তুমি? উত্তর পাওয়া যায় নি। এই জিজ্ঞাসা তাঁর ‘শেষ লেখা’য় অন্তর্ভুক্ত হেতু ধরে নেয়া যায় উত্তর পাওয়ার আগেই আমাদের মায়া ত্যাগ করেছেন ঠাকুর। কিন্তু প্রশ্নটি রেখে গেছেন। উত্তর পাওয়ার আশাটিও কি রেখে গিয়েছিলেন তিনি? দলিলে নেই কিন্তু হাওয়ায় যে ছিল সেটা বুঝা যায়। শাহ আমাদের তা অনেকটা নিশ্চিতও করেন। অন্যমনস্ক বা ধ্যানমগ্ন শাহ যখন প্রশ্নটি শোনেন, কে তুমি, প্রথমে নিশ্চিত হয়ে নেন যে প্রশ্নটি তাঁকেই করা হয়েছে। তারপর, যেন যোগ্য কোনো শিষ্যকে তিনি উত্তরের অধিকার দিয়ে যাচ্ছেন এমন ঢংয়ে, আলগোছে বলেন, ‘তবে শোনো, আমি এক ড্রপআউট ঘোড়া’।

এই অভিজ্ঞতা আমাদের কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলে। ভূমিকায় যে বিপুল প্রশ্ন-সংশয় তুলেছিলেন শাহ, ‘আদৌ কি এর কোনো উত্তর হয়’, সেটা নিছক এক ভণিতা তবে? প্রশ্নটির মর্মমূলের তথাকথিত অন্তর্ঘাতশক্তি, যা কবিকে সম্মোহিত, বিপন্ন, বিব্রত করার পাশাপাশি তাঁর ভেতরে বিবমিষাও জাগায়, সেই অন্তর্ঘাতশক্তির কী হলো? শাহ’র সময়ে এসে প্রশ্নটি আর তত ওজনদার বা চিরন্তন নয়, হারিয়ে ফেলেছে তার ভাব-গাম্ভীর্য, আঘাত করার সব অন্তঃশক্তি? যদি হয় সেটাও এক অগ্রগতি বটে। আমরা তো জানি এই সেই সময়, যখন ‘নো দাই সেল্ফ’-এর ডিকোডিফিকেশন ঘটে যাচ্ছে হাজারো সেল্ফিতে। ক্যামেরা-সভ্যতার এই যুগে, আয়নার সামনে দাঁড়ানোর অবসর ফুরোলো তবে?

mo●   ●   ●

প্রকাশক : চৈতন্য
প্রচ্ছদ : বিধান সাহা (দালির চিত্র অবলম্বনে)
মূল্য : ১০০ টাকা

●   ●   ●

আমি এক ড্রপআউট ঘোড়া মজনু শাহ-র ৬ষ্ঠ গ্রন্থ। প্রথম পঙক্তিতেই আত্মপরিচয় দিয়ে দেবার ফলে, আমাদের মনে হতে পারে, সম্পূর্ণ বইটি বোধ হয় এক ছিটকে পড়া ঘোড়ার দর্শন; সর্বার্থেই। তথাকথিত ইঁদুর-দৌড়ের এই জীবনকে কবি হয়তো প্রতিস্থাপিত করেছেন ঘোড়দৌড়ে। আর একান্ত বাধ্য হয়ে বা স্বেচ্ছ্বায় নিজেকে দৌড় থেকে সরিয়ে নিয়ে দেখছেন ছুটে চলা অন্যসব ঘোড়া/মানুষের ‘রণরক্ত সফলতা’। তারই ধারাবিবরণী হয়তো শুনব আমরা, আর শুনতে শুনতে যারা এই ঘোড়ার প্রতি বাজি রেখেছিলেন তাঁদের আবছা-হতাশ মুখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে মিলিয়ে দেখব নিজেদের মুখ। কিন্তু কবি আমাদের ওরকম ভাবনার শ্রম থেকে আগে-ভাগেই রেহাই দেন। আগের ৫টি কবিতার বইয়ের ক্ষেত্রে বলার প্রয়োজন মনে না করলেও ৬ষ্ঠ বইয়ে এসে তিনি আমাদের নিশ্চিত করেন যে, বইটিকে সরাসরি কবিতার বই বলতে চান নি তিনি। না চেয়ে ভালোই করেছেন। কিন্তু বইটি আসলে কী, তা বলার লোভও সামলাতে পারেন নি। পারলে, আরেকটু উপকার হতো আমাদের। ফলত, এই বই পড়ার সময় কবির লেখা ভূমিকা আমাদের মাথায় রাখতে হয়। তিনি বলছেন, ‘এই গ্রন্থের লেখা তাৎক্ষণিক!’ আরো নির্দিষ্ট করে বলছেন, ‘কবিতার সেট-থিওরি, করণকৌশল, আর সমস্ত আখ্যানবর্ণনার বাইরে এসে, সন্ধ্যার আকাশে ভেসে বেড়ানো একখানি ছোট সিন্ধুমেঘ, যতটুকু বলে, তারই আয়োজন।’

মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো নাকি পাপ! কবির প্রতি বিশ্বাস হারানো তাহলে মহাপাপ! কবি প্রণীত ভূমিকায় আমরা বিশ্বাস রাখব। পাশাপাশি, ধর্মরক্ষা করে যতটুকু সংশয় ধারণ করা যায় সেটুকুও ব্যবহার করব এই পঠনে। এখানে আরেকটু কথা আগ বাড়িয়ে বলে নেয়া যেতে পারে। ‘আমি এক ড্রপ আউট ঘোড়া’ আলোচনা করতে গিয়ে কবির সামগ্রিক কবিতাপ্রকল্প নিয়ে কথা চলে আসবে। তাকে বাধা না দিয়ে বরং আমরা অধিকারই দেব এই আলোচনাকে শেষ পর্যন্ত অনুসরণ করার। তাতে কবির কাজের প্রতি আমরা আরো গভীরতর অভিনিবেশের সাথে তাকাতে পারব হয়তো।

শাহ শুধু বসুতেই থেমে থাকেন নি। নিজের একটি কবিতা-ভাষা এবং জগৎ তৈরির মহান উদ্দেশ্যে তিনি দ্বারস্থ হয়েছেন নিকটবর্তী আরো সব পূর্বসূরিদের কাছে

এক্ষণে কবিকথিত ‘তাৎক্ষণিক’ বিষয়টি নিয়ে একটু তলিয়ে দেখব আমরা। তাৎক্ষণিক লেখা আসলে কতটা তাৎক্ষণিক? এর সাথে স্বতঃস্ফূর্ততার সম্পর্ক কতটুকু? তাৎক্ষণিক লেখা দিয়ে কী শুধু তাৎক্ষণিকতাকে ধরা হয় নাকি তাৎক্ষণিকের ভেতরে উঁকি দিতে পারে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড তার সমগ্র সময় ও সময়হীনতা নিয়ে? তাৎক্ষণিকভাবে তা কোথা থেকে এসে উদয় হয়? ‘নক্ষত্রের ইশারা’ থেকে নাকি অবচেতনের কালগ্রাসী অন্ধকার থেকে?

এরকম অজস্র প্রশ্ন ভিড় করে মাথায়। এক্ষেত্রে এক-একজন স্রষ্টার প্রক্রিয়া একেক রকম। স্রষ্টার সেই ওয়ার্কশপে না ঢুকে আমরা তার সৃষ্টি দেখে কথা বলতে পারি শুধু। তবে এটুকু বলে রাখা ভালো, তাৎক্ষণিকতার নানারকম ফাঁদ ছড়িয়ে রয়েছে জগৎময়। আপাতত যাকে মনে হচ্ছে তাৎক্ষণিক তা হয়তো ভেতরে ভেতরে রচিত হয়ে বসে আছে অনেকদিন। আবার যাকে তাৎক্ষণিক বা স্বতঃস্ফূর্ত বলেই ভেবে নিচ্ছি একান্ত মৌলিক, তা হয়তো কবেকার পড়ে-ফেলা অন্য কারো কোনো অমোঘ পঙক্তির প্রতিধ্বনি মাত্র। মুখ খোলার অবসরে আমরা এইমাত্র তার উপশব্দটি শুনলাম শুধু।

আবার একজন সাধকের তাৎক্ষণিকতা আর ছদ্ম-পারফর্মারের তাৎক্ষণিকতার ভেতর রয়েছে বিস্তর প্রভেদ। ফেসবুক বা অনলাইন মিডিয়ায় আমরা যে কবিতার-মহামারী দেখি বেশিরভাগই তো দেখি তাৎক্ষণিকতার অতি-আলোয় প্রকটিত। একটাই সান্ত্বনা, তাৎক্ষণিকভাবে তা পড়ে, তাৎক্ষণিকভাবে লাইক দিয়ে বা না দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে প্রশংসা শোনার অপেক্ষায় বসে থাকা কবিটির জ্বলন্ত প্রোফাইলটিকে পাশ কাটানোর সফলতা প্রতিদিন আমাদের বাঁচিয়ে রাখে।

কিন্তু মজনু শাহকে আমরা চিনি। তাঁর কবি জীবনের ৫টি পূর্ণাঙ্গ কাব্যগ্রন্থ নিয়ে শাহ কবি হিসেবে বাংলাভাষীদের কাছে ন্যায্য প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন ইতোমধ্যে। শাহ’র প্রতি অনেক কবি ও অকবির প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য ঈর্ষা সে-প্রতিষ্ঠাকে সত্যায়িত ও প্রত্যয়িত করে ফেলেছে। তদুপরি পতাকা হাতে আছে শাহ’র কিছু প্রায়-সক্ষম আর ততোধিক অক্ষম অনুসারীর দল। বাকিটা, লোকে যেমন বলে, মহাকালের হাতে—আল্লাহ ভরসা!

শাহ’র তাৎক্ষণিকতায় তাই ধ্যানমগ্ন দ্রষ্টার অন্তর্দশন থাকা স্বাভাবিক। অন্তত আমাদের প্রত্যাশা তেমনই। কবির কাছে যা আসে এপিফ্যানির মতো। বিদ্যুৎ-ঝলকের ক্ষিপ্রতায়। তাকে না-ঘাটিয়ে তার মতো করে আসন দেয়াটা প্রকৃত কবির কাজ। ‘আমি এক ড্রপ আউট ঘোড়া’য় এরকম বেশ কিছু পঙক্তি পাঠক পাবেন। তাদের একটি :

তারাপুঞ্জ, মা কোথায়?

অসম্ভব শক্তিশালী এই পঙক্তি কিন্তু ভারী নয়। কাব্যিকতা মোড়া নয়। শুধু এক সাধারণ জিজ্ঞাসা, মা কোথায়? কার মা—তারাপুঞ্জকেই কি জিজ্ঞেস করা হচ্ছে, মা কোথায় তাদের? নাকি তাদের জিজ্ঞেস করছেন এক মা-হারা প্রশ্নকর্তা? অনেকরকমভাবে রিলেট করতে পারেন পাঠক এই ক’টি শব্দের পঙক্তির সাথে। এই প্রশ্ন অমোঘ হয়ে ধরা দেয় আমাদের স্বপ্নে? দেশে বা বিদেশে যখন আমরা তাকাই আকাশের দিকে, দূরে-থাকা মাকে মনে পড়ে। মা কোথায়? জিজ্ঞেস করার জন্য তারাপুঞ্জ ছাড়া আর কেই-বা আছে আমাদের! এই প্রশ্নের ভেতর আশ্চর্য এক শিশুকাল লুকিয়ে আছে। আমাদের অধিকাংশ শিশু, যারা শৈশবে মা হারায়, আত্মীয়স্বজনের কাছে থেকে তারা শিখে নেয় তাদের মা ওই আকাশের তারা হয়ে আছে। সেখান থেকে মা সব কিছু দেখছে। শিশুর জগৎ তখন পরিচালিত হয় ঐ তারাপুঞ্জের ভেতর বসে থাকে মায়ের চোখে চোখে। তাকে সাক্ষী রেখেই শিশু জয় করে তার প্রতিদিনের রাজত্ব, তাকে সাক্ষী রেখেই অবলীলায় রাজ্য ত্যাগ করে ঢুকে পড়ে নিঃস্ব কান্নার হাহাকারে। কিন্তু সেই শিশু একসময় বড় হয়। বুঝে যায় মা আসলে সেখানে নেই। এক রূপকথার ভেতর বেড়ে উঠা তার জগৎ ভেঙে পড়তে থাকে। কিন্তু ভেঙে পড়ে না তারাপুঞ্জের সাথে তার প্রতিদিনের যোগ। তাই তাকেই জিজ্ঞাসা, তোমাদের কাছে যদি নেই, তবে, মা কোথায় আসলে? উত্তরের আশা না করেই এই প্রশ্ন প্রতিধ্বনিত হতে থাকে আমাদের বুকের ভেতর।  মায়ের আশা করতে করতে যেখানে ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে বোবা তারাপুঞ্জের এক নির্জন আকাশ।  এইটুকু লেখার সময় অযথাই মনে পড়ল অধুনা এক জনপ্রিয় গান, ‘রাতের তারা, আমায় তোরা বলতে পারিস, কোথায় আছে কেমন আছে, মা’। মাকে নিয়ে এরকম অজস্র মায়াময় গান ও কবিতা আছে বাংলায়। কিন্তু মজনু শাহ মাত্র তিন শব্দে যে হাহাকার, প্রশ্ন ধরেছেন তা তুলনাহীন। অসাধারণভাবে সাধারণ।

এ রকম আরো কিছু উজ্জ্বলতর পঙক্তি পাওয়া যাবে বইটিতে। একেবারে এলোমেলোভাবে পাতা উল্টিয়ে যা পাওয়া গেল :

কোনো কোনো ফুলের মধ্যে মহীয়সী ডাকঘর আছে। [৪৮]

মীননাথ, এত কেন মেঘের পর্দা? [৬৬]

ওগো দয়াময়, পিঁপড়েদের চোখ, পিঁপড়েদের চলার ছন্দ তুমি কিভাবে বানাও? [১৫৯]

তোমার ছোটবোন ঘুমযন্ত্র সারাইয়ের কাজ জানে? [৫৭]

তোমার মশলাবাক্সের গায়ে ফুঁ দেই, ফুটে উঠে রাতের নির্মম গদ্য। [২৪]

রাত্রির তৃতীয় পঙক্তি থেকে উৎসারিত সমস্ত পাখি! [২১৭]

এরকম আরো বেশ কিছু পঙক্তি বইটির মহিমা বাড়িয়েছে। তাদের সবগুলোই হয়তো সমান শক্তিশালী নয়, সহজ বা আন্তরিকভাবে নগ্ন নয়, কিন্তু একটি সংবেদনশীলতা তৈরি করে। কবি হিসেবে মজনু শাহ’র কাছে আমাদের  যে-ক্রমবর্ধমান প্রত্যাশা এই সব পঙক্তি তাকে আরো উসকে দেয়। কিন্তু এপিফ্যানির এই যোগ, দুঃখজনকভাবে মেলে নি বেশিরভাগ পঙক্তিতে। ফলে বেশকিছু মলিন পঙক্তি পেয়েছি আমরা। নিরেট বক্তব্যের মতো। যেমন,

তোমার সূক্ষ্ম-সত্তা গিলে খায় আমার সমস্ত সৃষ্টিকে। [২]

পাঠকের মনোবিকলন, পাঠকের পাখিআত্মা আমি স্বীকার যাই। [২৭]

একটি স্ফুলিঙ্গে কেঁদে ওঠে আল্লাহ্‌র ব্যাখ্যা। [১২২]

একটি মুহূর্তের মধ্যে শুয়ে থাকে বিচক্ষণতা অথবা ড্রাগন। [১৪১] ইত্যাদি।

এই পঙক্তিগুলো তথ্য দেয়া বা ঘটনার বর্ণনা করা ছাড়া আলাদা কোনো সংবেদনা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। সুখের কথা এ ধরনের পঙক্তিগুলোও বইটির বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়। আমি এক ড্রপআউট ঘোড়ার বেশিরভাগ পঙক্তি বিমুঢ় হয়ে বসে আছে উপরের দুই ধারার মধ্যবর্তী হয়ে। কবির কথায় বিশ্বাস রাখলে পঙক্তিগুলো হয়তো তিনি তাৎক্ষণিকভাবেই পেয়েছেন। কিন্তু সেগুলোকে কবিতা করে তোলার লোভটা সামলাতে পারেন নি তিনি। ফলে অধিকাংশ পঙক্তির ভেতর চেপে বসেছে তথাকথিত কাব্যিক চাপ। মজনু শাহ’র ভাষার মুদ্রাদোষের শিকার হয়ে পঙক্তিগুলো নিজেদের হারিয়ে ফেলে হাঁসফাঁস করেছে।

এই কথাটিকে বোঝার জন্য আমরা শাহর সমগ্র কবিতাপ্রকল্প একবার খতিয়ে দেখব। মজনু শাহ’র কবিতা সৃষ্টিশীলতার ধর্ম মেনেই বাংলাকবিতার পূর্বসূরিদের উত্তরাধিকার বহন করছে। কবি অবশ্য খুব বেশি দূরে যাবার কথা ভাবেন নি। নব্বইয়ের অনেক কবির মতো তিনিও ’৫০-এর দশককে প্রান্তবিন্দু ধরে নিয়েছেন। এবং সেক্ষেত্রে উৎপলকুমার বসুর কাব্যপ্রচেষ্টাকে গুরুত্ব দিয়েছেন অনেক বেশি। বলা যায়, তাঁর পছন্দ অনেকটা সচেতনতার সাথেই। তিরিশোত্তর কবিতা স্রোতের ভেতর ভিন্ন একটি স্বর খুঁজে নেবার চেষ্টা। কিন্তু শাহ শুধু বসুতেই থেমে থাকেন নি। নিজের একটি কবিতা-ভাষা এবং জগৎ তৈরির মহান উদ্দেশ্যে তিনি দ্বারস্থ হয়েছেন নিকটবর্তী আরো সব পূর্বসূরিদের কাছে। যেসব কবি এবং তাদের কবিতাপ্রকল্পের যেসব বৈশিষ্ট্য থেকে শাহ কাব্যিক অনুপ্রেরণা নিয়েছেন তার তালিকাটি এরকম হতে পারে :

১.  উৎপলকুমার বসু: স্বরভঙ্গি, ঘোর-লাগা ভাষা—যা উঠে আসে মূলত অর্ধচেতনা ও স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের আকস্মিকতা থেকে
২.  জহরসেন মজুমদার, প্রভাত চৌধুরী : অ্যাবসার্ডিটি, যুক্তি-বিপর্যয়
৩.  বিনয় মজুমদার, রণজিৎ দাশ : যৌন ফ্যান্টাসি
৪.  গৌতম বসু : আপাত-শান্ত পর্যবেক্ষণ ও গভীরতা-অনুসন্ধানী উচ্চারণ

নিজের কাব্যজগৎকে নির্মাণ করতে কবি মানুষের প্রতি ততটা ভরসা রাখেন নি যতটা রেখেছেন জগতের অন্যান্য জীবজন্তুর উপর। গাধা, ঘোড়া, বাঘ থেকে শুরু করে মায় পিঁপড়ের ঘাড়ে শাহ চাপিয়ে দেন তার কাব্যরুচি বহনের দায়

উপরের তালিকাটি খেয়াল করলে দেখা যাবে, একজন ছাড়া বাকি সব কবিই এখনো জীবিত এবং কমবেশি সক্রিয়। এই যে প্রায় একই সময়ে সক্রিয় কবিদের কবিতা-ভাষা এবং জগৎকে আত্মস্থ করে নিজের একটি কবিতাপ্রকল্প প্রতিষ্ঠা করা, তার জন্য শাহ-র প্রতিভা ও সাধনার জেদকে স্বীকৃতি জানাতে হয়। বোঝা যায় পাঠক হিসেবে শাহ অন্তর্ভেদী, ছড়ানো কবিতার ভেতর থেকে নিজের জন্য কোন হিরাটি বেছে নিয়ে নিজের মতো ধুয়ে-মুছে কেটে আলাদা একটি শেপ তৈরি করে নেবেন সেটা তিনি দখল করেছে অসাধারণভাবে। সাথে যোগ করেছেন নিজের অসম্ভব কল্পনাশক্তি আর ধীরে ধীরে কৌশলে তৈরি করেছেন ঐসব কবিদের রাজত্ব থেকে খুব কাছেও নয় আবার খুুব দূরেও নয় এমন একটি পেরিফেরির জগৎ। প্রধান এইসব অস্ত্র নিয়ে বাংলা কবিতায় এখন পর্যন্ত মজনু শাহ’র অবদান হয়তো মৌলিক নয়; কিন্তু একথাও স্বীকার করতে হবে যে, নিজের মতো করে একটি জগৎও প্রায় গুছিয়ে ফেলেছেন তিনি। যার প্রভাব তরুণ এবং অতিতরুণদের উপর পড়তে দেখছি আমরা। কবি হিসেবে যে-কারো জন্য যা বড় এক শ্লাঘার বিষয়।

নিজের কাব্যজগৎকে নির্মাণ করতে কবি মানুষের প্রতি ততটা ভরসা রাখেন নি যতটা রেখেছেন জগতের অন্যান্য জীবজন্তুর উপর। গাধা, ঘোড়া, বাঘ থেকে শুরু করে মায় পিঁপড়ের ঘাড়ে শাহ চাপিয়ে দেন তার কাব্যরুচি বহনের দায়। পশুপাখিদের বলা যায় শাহ’র কবিতাফ্যাক্টরির প্রধান শ্রমিক। এই সচেতন প্রচেষ্টা শাহর কবিতাকে একটি আলাদা জগতের বলে চিহ্নিত করে। পূর্বসূরিদের ভাষাভঙ্গি ও নির্যাস নিয়েও কেবল এই আলাদা প্রাণিজগতের উপস্থিতি পাঠককে কনভিন্সড করতে সফল হয় যে, এই কবিতা একান্ত মজনু শাহ’র। সেসব প্রাণীদের উপর তিনি কখনো কখনো হয়তো মনুষ্যত্ব অর্পণ করেছেন (যেমন, ফার্নের আড়ালে পড়াশুনা করতে করতে সাপটা হলদে বর্ণ হয়ে গেল, ৭৬)। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পশুপাখির কথা এসেছে তাদের রেফারেন্স থেকেই। এ এক সামান্য উদাহরণ মাত্র। কিন্তু প্রমাণ চাইলে বলাই যায়, আমি এক ড্রপআউট ঘোড়ার মোট ২৬২টি পঙক্তির ভেতর পশুপাখি প্রধান অবলম্বন হিসেবে হাজির হয়েছে প্রায় ৯৮টি পঙক্তিতে, শতকরা হিসেবে প্রায় ৩৮ ভাগ। কবির অন্যান্য কাব্যগ্রন্থগুলো পড়লেও এই প্রবণতা চোখে পড়তে বাধ্য। কিন্তু তাতে সমস্যা কী? সমস্যা আদতে থাকার কথা নয়। কিন্তু হয়েছে। এই প্রবণতার কারণে দেখা গেছে শাহ’র কবিতা থেকে মানুষ সরে গেছে অনেক দূরে। তাঁর কবিতাকেন্দ্রে মানুষ দাঁড়াবার জায়গা পায় নি তেমন। মানুষের প্রসঙ্গ এলে দেখি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অবধারিতভাবে এসে যায় যৌন ফ্যান্টাসিও :

সান্তাহারগামী ডাউনট্রেনের মহিলা-কামরা থেকে আজ এত ভুট্টা পোড়া গন্ধ আসছে কেন? [৭৪]

আমি কোনোদিন ঐ রতিশিক্ষিকার টয়ট্রেনে চড়ব না আর? [২৫৩]

মানুষের এই সংক্ষেপায়ন তাঁর কবিতা নিয়ে আমাদের সন্দিগ্ধ করে তোলে, মানুষের বাচ্চা হিসেবেই হয়তো এই বোধ বেশি করে কাজ করে আমাদের ভেতর। শাহ’র কবিতায় মানুষের ব্যাপক অনুপস্থিতি আরেকটা সমস্যা তৈরি করে। কবিতাগুলোকে অস্থানিক করে ফেলে। আরেটু খোলাসা করলে বলতে হয়, শাহ’র কবিতা পড়লে বোঝা যায় না তাঁর অভিজ্ঞান, বৌদ্ধিক বিবেচনা কোনো মাটি থেকে জারিত হয়েছে। বলে ফেলা যায় না তিনি বাংলাদেশের কবি। শাহ’র পশুগুলো—বাঘ, হরিণ, কবুতর এসবকেও বাংলাদেশি মনে হয় না। শাহর কবুতর যেমন জালালী বা বুনারা নয়, রম্যকবুতর। প্রাণীগুলোও যেন উঠে এসেছে ক্ল্যাসিক সব কাব্যগ্রন্থ থেকে। কেউ কেউ সেটাকেই পরম লক্ষ্য হিসেবে নিতে পারেন—নিজেকে স্থান- ও সময়-নিরপেক্ষ করে রাখার জন্য। ক্ল্যাসিক হওয়ার এই চেষ্টার ভেতর এক ধরনের আত্মপ্রতারণা আছে। স্থানিক এবং সমসাময়িক না হলে যে-কোনো ধরনের শিল্পপ্রচেষ্টা জগতের জন্য মনে হয় তুমুল অপচয়। সেই স্থানিক ও সমসাময়িক শিল্পের ভেতর যদি সর্বস্থানিক এবং সর্বসমসাময়িক হওয়ার তাকদ থাকে তা ধীরে ধীরে ধীরে ক্ল্যাসিক হয়ে ওঠে. এমনিতেই। কিন্তু জগতে বিধাতার প্যাঁচ এমন যে, আপনি স্থানিক এবং সমসাময়িক না হয়ে সর্বস্থানিক বা সর্বসমসাময়িক হতে পারবেন না। একজন উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস বা শিমাস হিনি তাই আগে সর্বার্থেই আইরিশ কবি এবং পরে ক্ল্যাসিক, সর্বমানুষের। একজন রবীন্দ্রনাথ বা একজন জীবনানন্দ দাশ যেমন আগে বাংলার, তারপর সারা দুনিয়ার, মহাকালের। স্থানিক এবং সমসাময়িক হওয়া মানে কোনোভাবেই তথাকথিত রাজনৈতিক চেতনার কবিতা বা সাংবাদিক-তরলতায় দৈনন্দিনের কাব্যভাণকে বোঝানো হচ্ছে না। এসবের বাইরেও কথা থাকে। ক্ল্যাসিক অর্থে এই মহাবিশ্ব চেতনার যে গভীরতর ধারা এবং ইতিহাস, তথা মহাসময়ের ও দর্শনের যে উত্তরাধিকার একজন কবি অর্জন করেন নিজের সময়ের একজন সৃজনশীল মানুষ হিসেবে, তিনি তার সাথে কিভাবে ইন্টারঅ্যাক্ট করেন? যে-কোনো ধরনের মিথস্ক্রিয়ার জন্য কবির টুলগুলো কী? দৈনন্দিনতায় ডুবে আমাদের যাপিত জীবনের ব্যক্তিক থেকে মহাবৈশ্বিক যে ব্যাপ্তি তার ধারাবিবরণীর অনেক অনেক গভীরে জমা হতে থাকে এক নির্যাস, যা ঠিক স্থানিকতা, সমসাময়িকতার ফটোগ্রাফি নয়, কিন্তু সেসবরেই রসে জারিত। এই নির্যাস থেকে তৈরি হয় কবির নিজের জন্য  বিন্দুসত্যের। এই বিন্দুসত্য একজন কবির ধ্রুবতারা। ভাষার সমস্ত স্তর পেরিয়ে, কল্পনার সাত-সমুদ্র আর তের নদী পার হয়ে এসে কবিকে থিতু হতে হয় সেই বিন্দুসত্যতে।

আমি এক ড্রপআউট ঘোড়ার বেশির ভাগ পঙক্তিকে তাই মনে হয় যেন মজনু শাহর অপেক্ষাকৃত দীর্ঘতর কবিতা থেকে তুলে-আনা বিচ্ছিন্ন পঙক্তির সংকলন

জীবন, জগৎ, এই ব্রহ্মাণ্ড ও ব্রহ্মাণ্ডের বাইরের আর সব ব্রহ্মাণ্ড ও তাদের প্রাণিকুল নিয়ে, কবির নিজের একান্ত অন্তর্দেশ নিয়ে আসলে বলার কথাটি কী? এই প্রথম ও শেষ প্রশ্নে মুখোমুখি হতে হয় একদিন। উত্তর সরাসরি না বললেও হয়, কিন্তু কবিতার ভেতর দিয়ে তিনি কোন অনুভব, স্পদন ধরতে চান এসবের। তা স্পষ্টতর হতে হয় কবির কাছে। একদিনে হয় না, একটি কবিতা বা একটি কাব্যগ্রন্থে হয় না, যদি না প্রতিভায় কবি হোন ত্রিকালদর্শী। কিন্তু আন্তরিক ও নিজের প্রতি সৎ কবির প্রাত্যহিক সাধনায়, ম্যাচিউরড হওয়ার যাত্রাপথে ধীরে ধীরে স্পষ্টতর হতে থাকে তা। তখন খুলে পড়তে থাকে ভাষার রঙিন স্তর। কল্পনা থিতু হয়ে আসে। কব্জির জোরের শোমেনশিপ বিনীতভাবে লুকিয়ে রাখে নিজেকে। নিজের সাথে আর জগতের সব কিছুর সাথে তখন কথা হয় সরাসরি ভাষায়। নগ্নতা ছাড়া তার আর কোনো গয়না থাকে না। মজনু শাহর সর্বশেষ দুটি বই, ব্রহ্মাণ্ডের গোপন আয়না এবং আমি এক ড্রপআউট ঘোড়া পাঠ করতে গেলে এমন ভাবতে প্রলুব্ধ হতে হয় যে, এই কবির মধ্যেও বোধ হয় সেই সময় এসে হাজির হয়েছে। ফর্ম এবং কন্টেন্ট সেরকমই ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু এই উচ্চাশা ঠোকর খায় পাঠের সময়। ব্রহ্মাণ্ডের গোপন আয়না শিকার হয়েছে নানারকম বিমূর্ততার। সংলাপের নামে গন্তব্যহীন বাগবিস্তারের। প্রশ্ন আছে কিন্তু উত্তর নেই; বেশি করে আছে উত্তরের নামে অস্পষ্টতর ভাষার অনুশীলন, যা কবি-ব্যক্তিত্বকে ঢেকে ফেলে উদ্ধার-অসম্ভব ক্যামোফ্লেজে । আর আমি এক ড্রপআউট ঘোড়া শিকার হয়েছে কাব্যিকতা তাৎক্ষণিকতার দোটানায়। কিন্তু দুটো বইয়ে একটি জিনিস খুব পরিষ্কার যে, এই ধরনের কাব্যপ্রচেষ্টা প্রজ্ঞা এবং অভিজ্ঞানের যে গভীরতা দাবি করে তার জন্য কবি মজনু শাহ হয়তো এখনো প্রস্তুত নন। সেজন্য এক ধরনের আপসরফার ভেতর দিয়ে গেছেন তিনি। লেখাগুলোকে তাদের নিজেদের মতো জগৎ তৈরি করতে না দিয়ে অহেতুক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে চাপিয়ে দিয়েছেন নিজের কাব্যিকতা ও ভাষার মুদ্রাদোষ। পঙক্তিগুলোকে সেদিক থেকে বাড়তি শক্তি যোগাতে চেয়েছেন। আর সেখানেই পঙক্তিগুলো অনেকটা বোবা ও অসম্পূর্ণ হয়ে পড়েছে। আমি এক ড্রপআউট ঘোড়ার বেশির ভাগ পঙক্তিকে তাই মনে হয় যেন মজনু শাহর অপেক্ষাকৃত দীর্ঘতর কবিতা থেকে তুলে-আনা বিচ্ছিন্ন পঙক্তির সংকলন । শাহ’র কবিতাপরিবারের বাইরে এসে নিজ পায়ে দাঁড়াতে তারা অনেকটা অক্ষম।

আবারো ভূমিকা স্মরণ করি। শাহ বলেছেন, ‘কবিতার সেট-থিওরি, করণকৌশল আর সমস্ত আখ্যানবর্ণনার বাইরে এসে, সন্ধ্যার আকাশে ভেসে বেড়ানো একখানি ছোট সিন্ধুমেঘ যতটুকু বলে, তারই আয়োজন’। আমি এক ড্রপআউট ঘোড়ায় এই ছোট সিন্ধুমেঘই প্রবল সত্যি হয়ে ওঠে শেষ পর্যন্ত। ভেসে বেড়াতে বেড়াতে যতটুকু দেখা যায়, শোনা যায় তার অগভীর টুকরো বিবরণী হয়ে থাকলো এই বই। আরো নিকটে এলে হয়তো, প্রকৃত সারস উড়ে যেত, কিন্তু ফেলে যাওয়া জগতে যে দৃশ্যের জন্ম হয়ে চলে তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করা যেত বেশি।

কথাসাহিত্যিক বাসুদেব দাশগুপ্ত একটি জিনিস পরিমল রায়ের বরাতে আমাদের ধরিয়ে দিয়েছিলেন বেশ আগে। “পরিমল রায়, ‘ভেগোলজিস্ট’ নামে একটি শব্দ আবিষ্কার করেছিলেন। তাঁর ভাষায়, ‘যেখানে গন্তব্য নাই অথচ গমন আছে, ক্ষুধা নাই অথচ ভুঞ্জন আছে, বক্তব্য নাই কিন্তু বাক্য আছে—অর্থাৎ যেখানে যাবতীয় সন্ধান-বিকৃত মনোবৃত্তির ঊর্ধ্বে লক্ষ্যনিরপেক্ষ নভোচারী চিলের মতো কেবল ভাসিয়া বেড়াইবার উৎসাহ আছে, সেখানেই ভেগোলজির প্রকৃষ্টতম প্রকাশ।” (বাসুদেব দাশগুপ্ত, রচনাসংগ্রহ, ২৭৯)

মজনু শাহ’র সার্বিক কবিতাপ্রকল্পে এই ‘ভেগোলজি’র একটি স্পষ্ট ছায়া আছে। মজনু শাহ ভালো কবি। কিন্তু তাঁকে মহৎ কবিতে উত্তীর্ণ হতে হলে সিন্ধুমেঘের ভেগোলজি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রকৃতি, মানুষ আর সব প্রাণীদের সাথে তাঁর আত্মীয়তা গভীরতর হবে তাতে। মানুষের সমস্ত ছোটলোকি, হারামিপনা, প্রকৃতির সাথে থাকতে না-পারার ব্যর্থতা, ক্রূর জটিলতা, অপমনুষ্যত্ব, আপাত-ভবিষ্যৎহীনতা আর (এসব কিছুর পরেও) তার যে অপার সম্ভাবনা, তার সবকিছু ঘেঁটেই বের করে আনতে হবে কবিতার বিন্দুসত্যকে।

আমি এক ড্রপআউট ঘোড়া বই হিসেব একান্ত মজনু শাহর থেকে গেল। সমস্ত সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেখিয়েও যে তা কবি মজনু শাহকে অতিক্রম করতে পারল না এই আফসোসটুুকু আমাদের প্রত্যাশার সাক্ষী এবং মজনু শাহ’র প্রতিভার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধার নিদর্শনও।


উৎসর্গ
:

ভাতৃহত্যা, ধর্মমতে, কবীরা গুণাহ। আর ভাতৃলিখিত কবিতা? স্পষ্টত বলা না-থাকলেও সেও কমকিছু হবে না নিশ্চয়! ভাইয়েরই তো মানসসন্তান!  কবিতার আলোচনা কবিতার শরীর থেকে জন্মকালীন ইনোসেন্স জামা খুলে নেয় অথবা পরিয়ে দেয় অনাবশ্যক বাড়তি কোনো জামা। আলোচনা পড়ে একটি কবিতা পাঠ তাই ওই জামা খুলে নেয়ার বা আরেকটি জামা পরানোর পর কবিতাটি পাঠের স্বাদ দেয় পাঠকের মননে। আলোচনা না পড়ে কবিতাটি পাঠ করলে যা হওয়ার সম্ভাবনা কম। তাই যে-কোনো ধরনের আলোচনা আসলে কবিতার ওই ইনোসেন্সকে হত্যা করা। সময়ের প্রখ্যাত কবি মজনু শাহ আমার বন্ধু। কিন্তু বন্ধুত্বের সীমানা অবারিত রেখেই সে-সম্পর্ক অনেকদিন ধরে জড়িয়ে গেছে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে। সাহিত্য নিয়ে আমাদের বিবেচনা দুজনের দুরকম হওয়া সত্ত্বেও সম্পর্কের বেলায় একই সূত্রে গ্রন্থিত। তাঁর বই আমি এক ড্রপআউট ঘোড়া আলোচনা করতে গিয়ে এই কথাগুলো মনে এল। না এলেও পারত!

লিটল ম্যাগজিন ‘শিরদাঁড়া’কে কেন্দ্র করে আমাদের আর সব বন্ধুদের সাথে আমি এক ড্রপআউট ঘোড়া বইটি কবি আমাকেও উৎসর্গ করেছেন। নশ্বর এ-জীবনে এ এক পরম প্রাপ্তি আমার। জানি না, পুস্তক সমালোচনা উৎসর্গ করার চল আছে কিনা। তবে আমি আমার এই আলোচনাটি আর সব বন্ধুদের কাছে ক্ষমা চেয়ে কেবল অগ্রজপ্রতিম মজনু শাহ’র নামেই উৎসর্গ করলাম।

সুহৃদ শহীদুল্লাহ

জন্ম ২৯ এপ্রিল ১৯৭৫, কুষ্টিয়া।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
ঈশ্বরের অটোবায়োগ্রাফি [২০০০]
আমার যুদ্ধাপরাধের কাহিনীসকল [২০০৭]
জলপাই, স্নেহ ও শর্করা [২০১২]
শরীর, সর্বস্ব তুমি [২০১৪]
উদীয়মান সমাধি শিবির [২০১৬]

অনুবাদ—
তরুণ কবির প্রতি চিঠি / রাইনার মারিয়া রিলকে [২০১১]
রেজর ব্লেডে তৈরি বাড়ি/ লিন্ডা মারিয়া বারোস[২০১৭]

ই-মেইল : shuhrid.shahidullah@gmail.com