হোম নির্বাচিত আমাকে ধারণ করো অগ্নিপুচ্ছ মেঘ : দৃশ্য ও দর্শনের দুর্বহ বেদনা

আমাকে ধারণ করো অগ্নিপুচ্ছ মেঘ : দৃশ্য ও দর্শনের দুর্বহ বেদনা

আমাকে ধারণ করো অগ্নিপুচ্ছ মেঘ : দৃশ্য ও দর্শনের দুর্বহ বেদনা
689
0

বিষয়ে ও প্রকরণে বাংলা ভাষার এক বৈচিত্র্যপূর্ণ কবি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ। আশির দশকের কবিদের মধ্যে সবচেয়ে সক্রিয়, যাঁর কবিতার না আছে কোনো পূর্বসূরি, না উত্তরসূরি। অথচ, বাংলা কবিতার হাজার বছরের যে ইতিহাস, তার স্পন্দন অনুভব করা যায় তাঁর রচনার তনুতে তনুতে। ‘তনুমধ্যা’ কাব্যের মাধ্যমেই তাঁর আবির্ভাব এবং সিদ্ধিলাভ।

এ বছর ৭ জানুয়ারি, ২০১৬—পৌষ-ফাগুনের পালা গাইতে গাইতে তিনি প্রবেশ করলেন ৫০ বছর বয়সের কোঠায়। তাঁকে পরস্পর-এর পক্ষ থেকে অভিনন্দন। সাম্প্রতিককালে তাঁর প্রকাশিত একটি কবিতাবই আমাকে ধারণ করো অগ্নিপুচ্ছ মেঘ—বইটি নিয়ে লিখেছেন রাশেদুজ্জামান। এই লেখাটি আমাদের অভিনন্দনের একটি অভিজ্ঞানমাত্র…


জীবনানন্দ আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন, ‘কবিতা অনেকরকম।’ এই কথাটিতে কবির অন্য একটি অভিপ্রায়ও সুস্পষ্ট; আর তা হচ্ছে : বিচিত্র রকম কবিতাকে গ্রহণ করবার মতো রুচি পাঠকের থাকতে হবে। মধ্য-আশিতে আবির্ভূত কবি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ-এর আমাকে ধারণ করো অগ্নিপুচ্ছ মেঘ কাব্যগ্রন্থটি পড়তে পড়তে ওই কথাটিই মনে পড়তে পারে পাঠকের। গঠনশৈলী, ছন্দ-অলঙ্কার, উপকরণ, বিষয়বস্তু, সুর, স্বর—সকল দিক দিয়েই বিচিত্রের সমাবেশ থাকে সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ-এর কবিতায়, আর এই বইটিতেও তার ব্যতিক্রম হয় নি।

ভিন্ন ভিন্ন কবিতায় যে শুধু, তা-ই নয়, একই কবিতায়ও কখনো নানা রকম সুর-স্বর, বিচিত্র উৎসজাত শব্দ, টেনশন, নাটকীয়তা তিনি অনায়াসে প্রবেশ করান। সবকিছু মিলে একটা হারমনি তৈরি যে তার উদ্দেশ্য, এমনও নয় সবসময়। কখনো কখনো হারমনিকে আঘাত করা, নস্যাৎ করাও তার উদ্দেশ্য থাকে। লক্ষ্য থাকে যেন পাঠকের অভ্যস্ততা আহত হয়। পাঠক একটু নড়ে-চড়ে বসেন, মনোযোগ দিয়ে তাকান।

কবির এই-ই অভিপ্রায় যে, পাঠক তাকাবেন, দেখবেন; আর এই দেখায় সক্রিয় থাকবে সকল ইন্দ্রিয়। প্রথম দ্রষ্টা তো কবি নিজে, কবিতা সে দেখার প্রতিবেদন। এর মাধ্যমে নিজের দেখাকে অন্যের সাথে মিলিয়ে নেওয়াই অভিপ্রায়। ফলে, গ্রন্থের প্রথম কবিতায় কবি যখন চির-জাগর এক চোখের কথা বলেন, আমরা বুঝতে পারি কবির লক্ষ্য কত দূরপ্রসারী। কার এই চোখ ? কবি বলছেন : ‘বিশ্বরূপার’। আমরা তার শরীর কিংবা আকার বিষয়ে জানতে পারি না, কারণ কবি জানান না আমাদের, যেহেতু সে সর্বভূতে, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছে আর কবিই ক্রমে ক্রমে তাকে নিজে দর্শন করবেন ও আমাদের করাবেন। আমরা শুধু জানতে পারি এ যুগলচক্ষু ‘বিশাল’ ও ‘জলে ভাসমান’। তখন জল শব্দের বহু-অর্থময়তা এবং ‘বিশাল’ শব্দে লুকানো ইঙ্গিত আমাদের সচকিত করে। কবি জানান আমাদের, সে চোখ—

নবজাতকের চেয়ে পবিত্র সুন্দর
মৃত্যুর চেয়ে অমোঘ আর সরল
রাত্রির চেয়ে গভীর

(চোখ)

গ্রন্থের প্রথম কবিতাটি সমাপ্ত হচ্ছে উদ্ধৃত চরণগুলোর মাধ্যমে, লক্ষণীয় হলো, কোনো যতিচিহ্ন ছাড়াই। যেন এক উন্মুক্তি, এক জোড়া তরল চক্ষু প্রবিষ্ট হবে পরবর্তী সকল অনুভবে, কবিতায়।

তো, কী দেখে এই চোখ? না কি দেখেন কবি নিজে? ধারণ করেন বিশ্বরূপাকে তার মর্মে? আর টের পান বিশ্বরূপা আর তার বিচ্ছেদ, ফলে জাগে মিলনের আকুতি ও হাহাকার? তৈরি হয় এক ঝুলন্ত উদ্যান, রাত্রির উদ্দেশে রচিত পঙ্‌ক্তিমালা। আহ্বান আসে দৃষ্টি উন্মোচনের—‘মোছো অকাল গ্লোকোমা’। লক্ষ করি আত্মার জেগে ওঠা। কবি প্রশ্ন রাখেন, ‘শরীরে আত্মার গন্ধ না-থাকলে তা কীসের শরীর? / শুয়ারের?’। এই জাগরণ দ্রষ্টার, যার ঘুম নাই। কোনো অষুধেই তার চোখের পাতা এক হয় না। সে দেখে—

ঐ-তো আমার ঘোড়া আসমানের ছাদ ফুঁড়ে যায়!
ঐ-তো সে-ফুঁটো দিয়ে তিন-কোনাচ্চা ঈশ্বর তাকায়!

(ঝুলন্ত উদ্যান, দ্বিতীয় সোপান)

শুধু দেখা তো নয়, ঘটে রূপান্তরও :

আমরা বদ্‌লে যাচ্ছি না কি? আমারও কি গজাচ্ছে না স্তন?
তা কি গুঁজে দিচ্ছি না তোমার হাল্কা গোঁফের তলায়?

(ঝুলন্ত উদ্যান, দ্বিতীয় সোপান)

পুরুষ-সত্তার নারীসত্তায় এই রূপান্তর নেহাৎ লিঙ্গীয় যে নয় তা বলাই বাহুল্য, এ রূপান্তর সংবেদনের ধরন ও মাত্রার। অর্থাৎ কবি লাভ করলেন নতুন সংবেদন; এর নামই হয়তো তৃতীয় চক্ষু। কল্‌বের ভেতর তৈরি হলো আয়না :

আমাদের কল্‌বে কে এ আয়না রুয়ে দিল? কবে? কেন?
আমরা কি আয়নার বাইরে বেরিয়ে রুবরু কোনোদিন
তাকাতে পারবো না?

(ঝুলন্ত উদ্যান, সপ্তম সোপান)

এই আয়নার কারণেই তো একাকার সত্তা বহুতে বিশ্লিষ্ট হয়েছে আর জন্ম হয়েছে দ্রষ্টার। এই দ্রষ্টাই সন্তানের বেড়ে ওঠায় বয়ঃপ্রাপ্তিতে বাৎসল্য স্নেহের অতিরিক্ত এক মর্মাশ্রয়ী মৃত্যুবোধে আক্রান্ত হয়। যে মৃত্যুবোধ পুরনোর বিদায় ও নতুনের আবাহনেরই নয় শুধু, নিরঙ্কুশ ভবিষ্যতের কামনা ও স্নেহাশিসে সিক্ত। ‘টায়রা আঠারোয় পড়ল’ কবিতাটি শুরু হচ্ছে এক অনন্যসাধারণ চিত্রকল্পে :

সন্তানের জন্মকান্না শোনামাত্র ম’রে-যাওয়া মায়ের চোখের
হঠাৎ-বরফ-হওয়া আলোটুকু—আজকে সকালের—

কবিতাটি শেষও হচ্ছে একই প্রসঙ্গের সাথে নিজের মৃত্যুর অনুভূতিকে মিলিয়ে দিয়ে। এভাবে আমরা এমন এক দ্রষ্টাকে পাই, যে দেখতে পায় সত্যের পেছনের সত্যকে। ‘হেলেনের ট্রয়ে হেক্টরের লাশ’, ‘কপিলাবস্তুতর চৌরাস্তায় ছদ্মবেশী’ রাজকুমারের দিগ্বিদিক ছোটাছুটি কিংবা জানাডুতে ‘মহান খানের চোখে’ কোনো মিডাসের সোনার সাম্রাজ্যই কেবল নয়, কবি দেখতে পান :

নিজেকে, সবাই এক মায়াহরিণের
নাভির তালাশে ক্লান্ত লেপে দিচ্ছে পাথরে পাথর,
সভ্যতা, পাথর, তার ইয়ত্তাবিহীন রূপান্তর,

(ঠোঁট)

সময় ও মানবসভ্যতার এই বিবর্তনের সঙ্গে কবি এক মানবিক উপাখ্যান যেন গেঁথে নেন, সাঙ্গীকৃত করেন, রচিত হয় শিল্প :

শুধু, ঐ দু’টি ঠোঁট, তারা পাথরের নয়, তারা
পানির, যে-পানি ভাঙে পাথরের জন্মগুহামুখে,
আমি তো একবার তাতে চুম্বন করেছি, বিনাদাঁতে
একবার পেয়েছি সাড়া? তার পর? আমিও পাথর?

ইতিহাসের, ঐতিহাসিক রূপান্তরের এও এক ব্যাখ্যা, অবশ্যই কবির তরফ থেকে, যে কবি অনুভব করেন তার ‘ঐ হাতটুকু ছাড়া আর সবই নীল ধোঁয়া’, টের পান মাথার উপরে জ্বলছে ‘আকাশের সিসা-দৃষ্টিপাত’ কিংবা হয়তো দেখেন, ‘নবির দিল-এ কাঁপতে-থাকা আল্লার আরশ’। দেখতে পাওয়ার এই অসীম যাদুবলেই তাঁর সামনে উন্মোচিত হতে থাকে ভোর হওয়ার মুহূর্তটি, কবি ঋক-বেদের সূক্ত অনুসরণ করে রচনা করেন ঊষাসূক্ত। আর তাতে অদৃশ্যকে দর্শনের ক্ষণে বাস্তবতা বার বার ছেদ ঘটাতে চায়, ঘটায়ও কিঞ্চিৎ। প্রভাত হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয় অসীমের স্পর্শ পাওয়া এক মোহন নৃত্যনাট্য। ‘ধীরে স্বচ্ছ পাপড়ির পোশাক খুলে’ উন্মোচিত হতে থাকে ভোর।—

এক পবিত্র স্টিপট্রিজ, আহা, এত পবিত্র যে
মনে হবে খোলা নয়, পরা হচ্ছে শুভ্র উলঙ্গতা,

স্বর্গীয় ও পবিত্র আবহ রচিত হতে থাকে প্রভাত হওয়ার উন্মোচন-নৃত্য (Striptease)-কে ঘিরে। মুহূর্ত ক’য়ের সমবায়—কিন্তু কবি অনুভব করছেন একে এক ধীরগতির প্রবাহে—আলো ক্রমে ফুটে উঠছে। কিন্তু এই মুহূর্ত-আবেশ, ধ্যান-কোমলতা এক পলেই যেন টুটে যায়। নির্মম অ্যালার্ম বেজে ওঠে; হানা দেয় নিত্যদিনের বাস্তবতা, যাকে এড়ানোর কোনো উপায় নাই। আঠারো মাত্রার মহাপয়ারে উদারা-মুদারার মৃদুস্বর আলাপের ভেতর আচমকা যেন সপাট তান ঢুকে পড়ে (উত্তর ভারতীয় রাগসঙ্গীতের বহু উল্লেখ কবিতাগুলিতে আছে; আছে শিল্পীদের কথাও)—‘আহ, এই খোনা অ্যালার্ম থামাক/ কেউ উঠে!’—ফলে, ভোর হয়ে ওঠা থেকে প্রেক্ষণ-কেন্দ্র সরে আসে বাস্তবে। আর এই ব্যাঘাত মানতে চান না কবি। দোষ যেন শ্রুতির, কেন শুনলাম? তাই, তিরস্কার :

হায় কান! হায় তুমি ছাগলের, রাসভের কান,
পূতিপঙ্কে-পোতা খুঁটি, অসভ্য অপারগতা তুমি,
আমাকে রেহাই দাও—

এরপর ফের ‘কাঁচুলিতে অমারজনীর যত তারা’ নিয়ে প্রত্যুষের ফিরে আসা তার উন্মোচন-নাট্যে। আর ক্রমেই তা রূপান্তরিত হয় ব্যালেরিনায়—‘ফের পা তুলেছে আলো-ব্যালেরিনা’—আর তখনই সব ভণ্ডুল করে দিয়ে পরিপার্শ্ব জগতের প্রত্যাবর্তন: ‘বোতামে আঙুল—আহ! থামবি তুই সংসার যাতনা!’ ঊষাসূক্ত সিরিজে সাতটি কবিতা, এর প্রথমটি পাঠ করতে করতে পাঠকের মনে পড়তে পারে কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ-এর ‘ভোর’ কবিতাটির কথা। সেখানেও কবি ভোর হওয়ার মুহূর্তটি বর্ণনা করছেন এভাবে :

ভাঙছে ভোর

কোন অদৃশ্য-প্রস্ফুট লাইনের উপর দিয়ে
মাইল-মাইল গতিতে সোজা নেমে আসছে এক-একটি রশ্মি
নেমে আসছে আমাদের ছাদের উপর
আমাদের ছাদ হয়ে উঠছে বিরাট ফোয়ারা এক
শতধারে উচ্ছ্রিত হচ্ছে আলো

(ভোর, ও সংবেদন ও জলতরঙ্গ)

সৈয়দের মুক্তক অক্ষরবৃত্তে রচিত কবিতাটির ভেতরে গতি চাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ‘ভাঙছে’ শব্দটির মধ্যে কবির অভিপ্রায় সুস্পষ্ট। কবি বর্ণনা করছেন ভোর হওয়ার মুহূর্ত, ভোরের সাথে জেগে ওঠা কর্মচাঞ্চল্য, পরিপার্শ্ব, ফেলে আসা জীবনের জন্য হাহাকার। কবিতাটির শেষ দিকে এসে ‘এক টুকরো আলোর ব্রোঞ্জের প্রজাপতি’ বুকের ভেতর ঢুকে নাচতে থাকে। কিন্তু আমরা বুঝতে পারি ওখানেই তার শেষ, কেননা চেতনার পাখা ঝাপটানির শব্দে কবিতা শেষ হয় পূর্ণচ্ছেদ দাঁড়ির মাধ্যমে। অন্যদিকে সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ-এর কবিতা শেষ হয় বিস্ময়-চিহ্নে, যে-চিহ্ন আসলে কথাকে সমাপ্ত করে না, বরং ছড়িয়ে দেয়, এগিয়ে নেয়, ঢুকে পড়ে পাঠকের বিস্ময়ে। ঊষাসূক্ত-এ অবচেতন, বিস্ময় ও ধ্যানের সাথে জাগর-চৈতন্যের যে অভাবিত নাট্য রচিত হয়েছে, তা অভূতপূর্ব। এর অন্তর্গত সঙ্গীত অদ্ভুত এক অর্কেস্ট্রাকে ধারণ করতে পেরেছে। বিচিত্রের সমবায়কে ধারণ করেই এর সাফল্য।

kako

অচলিত-অচেনা শব্দ এমনভাবে ব্যবহার করেন যে পাঠক চমকিত, মুগ্ধ, বিভ্রান্ত ও হতাশ হন

যেমনটি প্রথমে বলা হয়েছিল, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, তার কবিতায় উৎস, ঐতিহ্য, গঠন-প্রক্রিয়া, ধ্বনিগুণ ও সুর ভেদে বিচিত্র শব্দের সমাবেশ ঘটান। তৎসম ও দেশি শব্দ, পুরানো কাব্যিক শব্দ, ইংরেজি-আরবি-ফার্সি-জার্মান শব্দ, সংস্কৃত-ব্রজবুলি শব্দ ও বাক্যবন্ধ, আঞ্চলিক শব্দ ও স্ল্যাং, অচলিত-অচেনা শব্দ এমনভাবে ব্যবহার করেন যে পাঠক চমকিত, মুগ্ধ, বিভ্রান্ত ও হতাশ হন। এর কিছু পরিচয় নেওয়া যেতে পারে—

১. হারুপার্টি হ’য়ে উসকে দেব গ্যালারির রোল
২. হেকসেন-হাওয়ায়
৩. শূন্যের মাছের পেটে হরফ মুকাত্তায়াত-আঁকা এক শালগ্রামশিলা
৪. খ্রিস্টের নয়—প্যারিশ-প্রিস্টের মূত্রে হয়েছে আমার ব্যাপ্টিজম
৫. ইশতার! নিস্তার দেহো এ-দেহটার, তার তো আর নাই পরের-বার
৬. পূষাবিভূষণা ঊষা, তোলো তব তমোপহ বাহু
৭. বরেণ্য ভর্গঃ
৮. চান্দিছিলা বান্দির পো-কে কেন যেন দেখতেই পারি না
৯. ইস্টিশনে বৃষ্টির ব্লিৎস্ক্রিগ
১০. মূর্বা দর্ভ দূর্বা পূর্বাপর
১১. কতিহু মদন তনু দহসি হামারি

আমাদের এই তালিকা আরও দীর্ঘ হতে পারত। কবির অনুপ্রাস-মুগ্ধতার কিছু ছাপও উদাহরণগুলোতে আমাদের কান এড়াতে পারে না। সুব্রত অগাস্টিন গোমেজই সম্ভবত সাম্প্রতিক বাংলা কবিতার একমাত্র প্রতিনিধি যিনি অকাতরে মুসলিম-হিন্দু-খ্রিস্টান ঐতিহ্য, ইউরোপীয় মিথ থেকে উপকরণ গ্রহণ করেছেন, সমৃদ্ধ করেছেন কবিতাকে।

অধিকাংশ কবিতাই রচিত হয়েছে অক্ষরবৃত্তে, মাত্রাবৃত্তেও অনেকগুলি। মেজাজের বৈচিত্র্য সর্বত্রই লভ্য। অক্ষরবৃত্তের ক্ষেত্রে পয়ার ধাঁচের ৮।১০ কিংবা ৮।৮।৬ পদক্ষেপের দিকে আগ্রহ দেখিয়েছেন। কিন্তু যে বিষয়টি অক্ষরবৃত্তের মাত্রাগণনায় আমাদের মনোযোগ কাড়তে পারে, তা হলো, শব্দের শুরু ও মধ্যে বিশ্লিষ্ট অবস্থায় বসা যুক্তধ্বনির বদ্ধাক্ষরকে কঠোরভাবেই এক-মাত্রা গণ্য করেছেন। এ বিষয়ে বাংলা কবিতার ইতিহাসে শৈথিল্যের শেষ নেই। বিশ্লেষণের বদলে আমরা বরং উদাহরণ দিয়ে যাই, পাঠকের শ্রুতি তা সহজেই ধরতে পারবে :

১. দশ-পয়সা পথ, রাত্রি, /  কেউটের কুমানি ফুঁসে যাচ্ছে,
ঝুলি খোলো, দেখতে পাবে; / না-খুললেও পাবে বৈকি সাড়া;      =৮+১০

২. আমি কি তোমার, রাত্রি? / আমাদের বাইরে থেকে কারা
ডাকছে: ওরে দরজা খোল্, / পূর্বদেশ থেকে ত্র্যহস্পর্শ
এসেছে, নজরানা নিয়ে… / আমি কাউকে রুখি না অন্দরে     =৮+১০

৩. ব্রহ্মপুত্র-পাড়ে আমরা / দেখেছি তোমারে, আমরা / জন্মভয়ে খুলি নি দেরাজ,
তুমি কাশে-কাশে এমনি / ঘুরেছ গোল্ডফিশ, তুমি / আমাদের দেখেও দেখ নি,    =৮+৮+১০

plunkett_casualopulence_ba_img
ডেনিস লেভার্টভ (১৯২৩-১৯৯৭)

বিভিন্ন ছন্দ থেকে আরও উদাহরণের সাহায্যে কবির ছন্দ-প্রবণতাকে আরও বিশ্লেষণ করা থেকে আপাতত বিরত থাকছি। বরং আমরা প্রায়-অনালোচিত একটি প্রসঙ্গে মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাই, যাকে বলা যেতে পারে : Line-Break বা পঙ্‌ক্তি-খণ্ডন। প্রকৃত কবিমাত্রই এর অসাধারণ তাৎপর্য অনুভব না-করে পারবেন না। লাইনব্রেক বা পঙ্‌ক্তি-খণ্ডন কবিতায় যতিচিহ্নের বাইরে পরোক্ষ যতির কাজ করে, ছন্দ-সঙ্গীতকে নতুনতর মাত্রা দেয়। আমরা এই প্রসঙ্গে আমেরিকান কবি Denise Levertov-এর দ্বারস্থ হতে পারি, তিনি বলেছেন :

The most obvious function of the line-break is rhythmic: it can record the slight (but meaningful) hesitations between word and word that are characteristic of the mind’s dance among perceptions but which are not noted by grammatical punctuation.

(On the Function of the Line)

ওপরে কবিতার যে উদাহরণ আমরা দিয়েছি, তার দ্বিতীয়টিতে যদি তাকাই, তাহলে কবির পঙ্‌ক্তি-খণ্ডনের প্রশংসাই করতে হয়। কিংবা পড়তে পারি এই ক’টি চরণ :

হে প্রভাত, খোলো, ধীরে, স্বচ্ছ পাপড়িগুলি, আমি দেখি
নিমিষের ফাঁকে-ফাঁকে বেগুনি টুটুতে প্রিমা দোন্না
নাচে—এক পবিত্র স্টিপট্রিজ, আহা, এত পবিত্র যে
মনে হবে খোলা নয়, পরা হচ্ছে শুভ্র উলঙ্গতা,

(ঊষাসূক্ত)

দ্বিতীয় লাইনের খণ্ডনের ফলে ‘নাচে’ শব্দটি তৃতীয় লাইনে এসে পড়ে অভূতপূর্ব এক সঙ্গীত সৃষ্টি করেছে। মনে হতে পারে ছন্দের অনুরোধে কবি এমনটি করেছেন কিন্তু এর ফলে কথিত slight (but meaningful) hesitations between word and word এবং mind’s dance among perceptions-ই শুধু রক্ষিত হয় নি, তৈরি হয়েছে আকস্মিকতা, অনুচ্চ-সঙ্গীতময়তা। অন্য পঙ্‌ক্তিগুলিকেও বিশ্লেষণ করে দেখানোর লোভ সংবরণ করে দু-একটি ব্যত্যয়ে মনোযোগ ফেরাতে চাই। যেমন :

১. একটা-ছোট পায়ে আসে শুদ্ধোদন সমুদ্র-কিশোর
হাতে একটা আধখাওয়া বাতাসা নাকি সাদা
ছেঁড়া রুটি যিশুর শরীর আমি তবু খাই

(অবসন্ন চেতনার গোধূলিবেলায়)

২. …আর একটা পাথুরে পাতালঝড় ফুঁসে
ওঠে, আর প্রাণ পেয়ে স্ফটিকের গা বেয়ে হলুদ
বসুধারা নেমে আসে, নিমেষে আঁধার ন’ড়ে-চ’ড়ে
যত রূপ তত রূপান্তর।

(ঠোঁট)

প্রথম কবিতাটিতে কবি যে বিশ্বরূপার চোখের কথা বলেছিলেন, যাকে বিশ্বব্যাপ্ত ও সর্বদর্শী ভেবে নিয়েছিলাম, তার সাক্ষাৎ শেষেও পাওয়া যাবে। কবি বলছেন :

যে-তুমি আমায় দ্যাখো যেন আমি তোমাতে সঁপেছি
আমার গমনবিন্দু, তুমি তবু যাত্রা-অসংখ্যতা—

(আমাকে ধারণ করো অগ্নিপুচ্ছ মেঘ)

দ্রষ্টার সঙ্গে এবার যুক্ত হচ্ছে পরিব্রাজক সত্তা নাবিক মাতামহের উত্তরাধিকার নিয়েই। ইতিহাসের তিতুমীর ও জয়দেবের সাথে মিথের ইলেক্ট্রা, য়ুলিসিজ, জোকাস্তার সাথে ইতিহাস ও মিথের পৃথিবীতে পরিভ্রমণ, ফেরার অস্পষ্ট আকাঙ্ক্ষায়, দৃশ্য ও দর্শনের ভারে বেদনাহত কবির উচ্চারণ :

বহিত্রচালনা, জানত য়ুলিসিজ, শুধু জানত না সে
বাঁকাজল কেন বাঁকা, জানত না সে মেম্ফিসের রাত,
জানত না সে মৃতের পুস্তক, ঐ বালুশুষ্ক জল
সাপের দাঁতের মতো ঝলসে উঠে কেন নিভে যায়—
মেঘনাদের যজ্ঞাগারে ঢুকে পড়ে মামাটাস মেঘ,
জয়দেব—টেনচটিটলানে আমি ঘুমিয়েছিলাম,
জোকাস্টা, তোমার গর্ভে, আমাকে আবার টেনে নাও।

(আমাকে ধারণ করো অগ্নিপুচ্ছ মেঘ)

য়ুলিসিজ জানত না, কবি জানেন। এখানেই যন্ত্রণা, ব্যথা, ব্যথার উপশম। দেখা ও দেখানোর অসহ ভার :

হে প্রভু উৎপাটন করহ আমায়
এই প্যাপিরাস-লেখ থেকে

(শীতল অনল)

কিন্তু আমরা আশান্বিত, কৃতজ্ঞ ও তৃপ্ত যে কবি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ-এর অন্তঃসত্তা, সংবেদনা এখনও প্রচণ্ডভাবে জীবন্ত, রূপান্তর-সক্ষম, প্রশ্নকাতর, প্রতিক্রিয়া-উন্মুখ, বেদনা-বিহ্বল, রূপমুগ্ধ, অনুসন্ধিৎসু। মেঘনাদের যজ্ঞাগারে তাই মামাটাস মেঘ ঢুকে পড়ে, মৃত্যু ও সৌন্দর্য-চেতনার দ্বৈরথ ও সঙ্গম দেখতে দেখতে অনুভব করেন মাতৃগর্ভে, স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। ইডিপাসের বেদনাবোধ যেন তার মর্মে। আমরাও অনুভব করি অগ্নিপুচ্ছ মেঘ তাই, কবির জননী।


আটকুঠুরি-র অনুষ্ঠানে পঠিত

রাশেদুজ্জামান

রাশেদুজ্জামান

জন্ম ১৭ ডিসেম্বর, ১৯৭৬;টঙ্গী, গাজীপুর।
বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
পেশা : সরকারি কলেজে শিক্ষকতা।

প্রকাশিত বই:
পাখি ও প্রিজম [কবিতা, ২০০৮, র‌্যমন পাবলিশার্স]
ঘুমসাঁতার [কবিতা, ২০১২, বনপাংশুল]

ই-মেইল : rashed_kobi@yahoo.com
রাশেদুজ্জামান