হোম নির্বাচিত অলীক মানুষ : একটি অনবদ্য উপন্যাস পাঠ

অলীক মানুষ : একটি অনবদ্য উপন্যাস পাঠ

অলীক মানুষ : একটি অনবদ্য উপন্যাস পাঠ
510
0

বাংলাদেশের একজন বয়োজ্যেষ্ঠ কবি ও কথাসাহিত্যিকের সঙ্গে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের অলীক মানুষ  উপন্যাস প্রসঙ্গে আলাপ হচ্ছিল। তিনি জানালেন, মুস্তাফা সিরাজের কোনো লেখা পড়া তো দূরের কথা, তাঁর নামটাও তিনি আগে কখনো শোনেননি, আমার কাছেই প্রথম শুনলেন। আমি তখন খানিকটা বিস্মিত হয়েছিলাম। পরে বিস্ময়টা কেটে গেছে। একজন লেখককে, যিনি আবার প্রবীণ, দুনিয়ার সব লেখকের নাম জানতে হবে এমন কোনো শর্ত নেই। ২০১৪ সালে সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী প্যাত্রিক মোদিয়ানোর নামও তো আমরা আগে কখনো শুনিনি। বাংলা ভাষার অনেক বড় বড় লেখকও শোনেননি। তাতে আমাদের কোনো ক্ষতি হয়নি, মোদিয়ানোরও না।

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ আসলেই বাংলাদেশে তুলনামূলক অনুল্লেখিত একটি নাম। পশ্চিমবঙ্গে তাঁর সমকালীন লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সমরেশ বসু আমাদের এখানে বহুল পঠিত, বহুল আলোচিতও। অভিজিৎ সেন, দেবেশ রায়, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস এদেশে মোটামুটি পঠিত হলেও মুস্তাফা সিরাজের উপন্যাস বা গল্প ঠিক সেভাবে পঠিত হয়নি। দু-চার বছর আগেও নবীন-প্রবীণ সিরিয়াস পাঠকের অনেকেই তাঁর নামের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না। থাকলেও তাঁর লেখা খুব একটা পড়া ছিল না। পড়লেও তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি অলীক মানুষ  খুব বেশি পাঠক পড়েছেন এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যাবে না।

একটি বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা বলি। ২০১২ সালের মে মাসে আমার সম্পাদিত সম্প্রীতি বেরুবে। পত্রিকাটি সাধারণত বিষয়ভিত্তিক প্রকাশিত হয়। ওই সংখ্যার বিষয় ছিল ‘বিশ শতকের বাংলা উপন্যাস।’ বিশ শতকের নির্বাচিত মোট ছাব্বিশটি উপন্যাসের মূল্যায়ন ছাপব। তন্মধ্যে মুস্তাফা সিরাজের অলীক মানুষও ছিল। নির্বাচিত প্রায় সব কটি উপন্যাসের আলোচনা লেখার জন্য আলোচক পাওয়া গেল, কিন্তু অলীক মানুষ নিয়ে লিখতে কেউ রাজি হচ্ছিলেন না। অনেকেই বলছিলেন উপন্যাসটি তাঁদের পড়া নেই। দু-একজনের পড়া থাকলেও লিখতে তাঁরা রাজি হচ্ছিলেন না। ভারী তো বিপদের কথা! একটিমাত্র লেখার জন্য সংখ্যাটি আটকে থাকবে নাকি! কোথাও পাব লেখা? কলকাতায়ও কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। একজন লিখবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিলেও শেষ পর্যন্ত লিখলেন না। চাইলে আমি নিজেই একটা আলোচনা লিখতে পারি। আমি উপন্যাসটি পড়েছি তার আগের বছর, ২০১১ সালে। বইটির সন্ধান দিয়েছিলেন কবি পিয়াস মজিদ। কিন্তু নানা ব্যস্ততার কারণে এটি নিয়ে লেখার মতো সময় পাচ্ছিলাম না। তাছাড়া খানিক দ্বিধাগ্রস্তও ছিলাম। একটি উপন্যাস পড়ে সাধারণত লিখিত বা মৌখিকভাবে পাঠের অনুভূতি ব্যক্ত করা যায়। অলীক মানুষ  এমনই এক শিল্পোত্তীর্ণ উপন্যাস, যা পড়ে কেবলই নির্বাক বসে থাকতে হয়। উপলব্ধি প্রকাশের নির্দিষ্ট ভাষা খুঁজে পাওয়া যায় না।

আমাকে যদি বাংলা সাহিত্যের সেরা দুজন গল্পকারের নাম বলতে বলা হয়, আমি চোখ বুঝে, কোনো রকমের দ্বিধা না করে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ ও সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের নাম বলে দেবো

এই অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝেছিলাম উপন্যাসটি আসলেই আমাদের এখানে কম পঠিত। কেন কম পঠিত? কারণ মুস্তাফা সিরাজ ছিলেন সেই লেখক যাঁর প্রচারটা ছিল তুলনামূলক কম। দেবেশ রায়, সুনীল, শীর্ষেন্দু এমনকি সমরেশ মজুদারের যে কদর বা যে প্রচার বাংলাদেশে, কলকাতা থেকে তাঁরা ঢাকায় এলে যতটা মাতামাতি হয় আমাদের লেখকমহলে, নানা সভা-সেমিনারে তাঁদের যেভাবে অতিথি করা হয়, দৈনিক পত্রিকার সাহিত্যপাতাগুলোতে যে হারে তাঁদের সাক্ষাৎকার ছাপা হয়, সেই কদরটা, সেই প্রচারটা মুস্তাফা সিরাজের ক্ষেত্রে ছিল না। জীবৎকালে তিনি ছিলেন নদীর অন্তঃপ্রবাহী স্রোতরে মতো। তাকে নিয়ে খুব একটা মাতামাতি ছিল না, উচ্ছ্বাস ছিল না, মিডিয়ায় তিনি খুব একটা খবর হতেন না। মৃত্যুর পরও তাঁকে নিয়ে খুব একটা আলোচনা হয়নি। তিনি মারা গেছেন ২০১২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর। কলকাতার কোনো লেখকের মৃত্যুর পর আমাদের জাতীয় দৈনিকগুলো যে গুরুত্ব দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করে, মুস্তাফা সিরাজ ততটা গুরুত্ব পাননি। দু-একটা পত্রিকার ভেতরের পাতায় সিঙ্গেল কলামে হয়ত ছোট্ট একটা নিউজ ছাপা হয়েছে। তাতে সিরাজের গুরুত্ব বোঝা যায় না। তিনি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতেন যদি দৈনিকের সাহিত্যপাতাগুলো তাঁর উপর বিশেষ একটা সংখ্যা বের করত। তার জীবৎকালেও তার দু-একটা সাক্ষাৎকার, দু-একটা গল্প আমাদের পত্রিকাগুলোতে ছাপা হতে পারত। দু-একটা ছোট কাগজ তার উপর বিশেষ কোনো সংখ্যা বের করতে পারত। কোনো কিছুই হয়নি। আমাদের সাহিত্য সম্পাদকরা ব্যর্থ হয়েছেন সিরাজের মতো একজন মহান লেখককে চিনিয়ে দিতে। একই ব্যর্থতা আমাদের অগ্রজদেরও। ফলে মুস্তাফা সিরাজের লেখার ভুবন আমাদের কাছে অনেকটা অপ্রকাশিত থেকে যায়।

তবে আশার কথা, সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের অগ্রসর সাহিত্য-পাঠকদের কাছে তাঁর নামটি পৌঁছে গেছে। অনেক পাঠককে তাঁর অলীক মানুষ  উপন্যাসটির ভূয়সী প্রশংসা করতে শোনা যাচ্ছে। এই পৌঁছানোটা কিন্তু মিডিয়ার মাধ্যমে হয়নি, হয়েছে মুখে মুখে। একবার যিনি মুস্তাফা সিরাজের লেখার স্বাদ পেয়েছেন তিনি সেটা আরেকজনকে বলেছেন। আরেকজন আরেকজনকে বলেছেন। এইভাবে ধীরে ধীরে সিরাজের নাম ছড়িয়ে পড়ছে, তাঁর লেখা ছড়িয়ে পড়ছে। ভবিষ্যতে আরো ছড়াবে। না ছড়িয়ে তো উপায় নেই। বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের সিরাজের কাছে যেতেই হবে। তাঁকে অস্বীকার করলে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকেই অস্বীকার করা হবে।

আমাকে যদি বাংলা সাহিত্যের সেরা দুজন গল্পকারের নাম বলতে বলা হয়, আমি চোখ বুঝে, কোনো রকমের দ্বিধা না করে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ ও সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের নাম বলে দেবো। দুজনই আমার কাছে সমান নমস্য। সিরাজ লিখেছেন গ্রামবাংলা নিয়ে। গ্রামবাংলাকে তিনি যতটা নিবিড়ভাবে তার লেখায় উপস্থাপন করেছেন, বাংলা ভাষার খুব কম লেখকের পক্ষেই তা সম্ভব হয়েছে। আর সন্দীপন লিখেছেন বাংলার নগর নিয়ে। আমার কাছে মনে হয় গল্পকার হিসেবে মুস্তাফা সিরাজ গ্রামের দোর্দাণ্ড প্রতাপশালী মাতবর, আর সন্দীপন নগরের ক্ষমতাবান মেয়র। সিরাজের গল্পের ভূমি গ্রাম, সন্দীপনের নগর। সিরাজের গল্পে চরিত্র হয়ে এসেছে গ্রামের মানুষ, হাজামজা খাল-বিল, গহীন বন-জঙ্গল, অথৈ নদ-নদী আর বিস্তীর্ণ তৃণভূমি ইত্যাদি। অপরদিকে সন্দীপনের গল্পে চরিত্র হয়ে এসেছে নগরের মানুষ, নগরের অলিগলি, পার্ক, রেস্তোরাঁ, রেলিং, ড্রইং ইত্যাদি। শিল্পের সকল শর্ত মেনেই, আঙ্গিক ও ভাষার স্বকীয়তার মধ্য দিয়েও সিরাজের গল্প সাবলীল, আর সন্দীপনের জটিল। সিরাজের গল্প দিনের আলোয় পড়া যায়, সন্দীপনের গল্প পড়ার জন্য প্রয়োজন রাতের গভীর নৈঃশব্দ। সিরাজের গল্প পড়াশেষে বোধের দরজায় ধাক্কাটা আসে সমুদ্রের ভয়াল মৌজের মতো, আর সন্দীপনের বর্ষার খরস্রোতা নদীর মতো। সিরাজ তাঁর গল্পের ভীত সমকালে রেখে ভবিষ্যতের দিকে ছড়িয়ে দিয়েছেন, কিন্তু সন্দীপন সমকালকে অনেকটা অস্বীকার করে ভীত গড়তে চেয়েছেন ভবিষ্যতে। ফলে সন্দীপনের গল্প পাঠকের কাছে জটিল ঠেকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। অপরপক্ষে সিরাজের গল্প সরল, সাবলীল। সহজেই বোধগম্য। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এই দুই গল্পকারের নাম অক্ষয় হয়ে থাকবে, এতে আমি অন্তত কোনোরূপ সন্দেহ করি না।

মুস্তাফা সিরাজের গল্প খুব বেশি পড়ার দরকার নেই। কলকাতার দে’জ পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত তাঁর ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’ বইটির গল্পগুলো পড়লেই বোঝা যাবে গল্পকার হিসেবে তিনি কতটা মহান, কতটা শক্তিশালী। আমি নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি, গল্পগুলো পড়ার পর যেকোনো সিরিয়াস পাঠক তাঁর লেখার কাছে মাথা না নুইয়ে পারবেন না। তাঁর গল্পসমগ্র পড়ে বোঝা যায় তিনি শুধু মানুষের গল্প বলেন না, মানবেতর প্রাণীরাও তার গল্পে অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। তাঁর চরিত্ররা মানুষ, তবে কাল্পনিক মানুষ নয়। বিপুল বৈচিত্র্য-বৈভবে ভরা বঙ্গভূমির ভূপ্রকৃতি থেকে উঠে আসা প্রাকৃত মানুষ। তারা যখন কথা বলে আবহ-সঙ্গীতের মতো প্রকৃতির চাপাস্বরের গুঞ্জরণ শোনা যায়। তারা যখন হাঁটে তখন আকাশ হাঁটে, চন্দ্র-সূর্য-কালপুরুষ-আদমসুরত-সন্ধ্যাতারারা হাঁটে, এমনকি নদীর স্রোতও তাদের পিছু পিছু কলকল স্বরে বয়ে চলে বিশ্বস্ত অনুচরের মতো। গত শতকের বাংলা ভাষার কথাসাহিত্যিকগণ প্রান্তের দিকে নজর ফেলেছেন, গ্রামবাংলার প্রতিচ্ছবি ধরা পড়েছে তাদের গল্প-উপন্যাসে। মুস্তাফা সিরাজও সেই প্রান্তভূমির কথক। তার কথাসাহিত্যও চিরায়ত গ্রামবাংলার প্রতিচ্ছবি। তবে অনেক বেশি জীবন্ত। অন্যদের চেয়ে একেবারেই আলাদা। তার গোত্র স্বতন্ত্র। তার গল্প-উপন্যাস পড়ার সময় মনে হয়, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি কাহিনি যেন আমার বুকের ভেতর থেকে উঠে আসা। গল্পটা আমি জানতাম, শব্দটা আমি চিনতাম। পুরনো প্রেমিকার মতো তারা আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। তাদের দেখে আমি আবেগের ধাক্কা খাই, আপ্লুত হই। বিখ্যাত ঔপন্যাসিক তারাশঙ্কর বলতেন, ‘আমার পরেই সিরাজ, সিরাজই আমার পরে অধিষ্ঠান করবে।’

শুধু কি গল্প? উপন্যাসেও মুস্তাফা সিরাজের শ্রেষ্ঠতা অনন্য। গল্পের মতো তিনি উপন্যাসও লিখেছেন অনেক। বেঁচে থাকার তাগিদে তাঁকে প্রচুর লিখতে হয়েছে। আমি বলছি না তাঁর সব উপন্যাসই সেরা। কোনো লেখকেরই সব লেখা সেরা হয় না। সারা জীবনে একটি, দুটি, তিনটি, বড়জোর পাঁচ-সাতটি সেরা উপন্যাস লেখা যায়। সিরাজও লিখেছেন একাধিক সেরা উপন্যাস। তাঁর তৃণভূমি, মায়ামৃদঙ্গ, উত্তর জাহ্নবী  উপন্যাস তাঁর অন্যসব উপন্যাসের চেয়ে অবশ্যই সেরা। তবে এগুলোকেও ছাড়িয়ে গেছে তার অমর সৃষ্টি, বাংলা ভাষার অনন্য সাধারণ উপন্যাস অলীক মানুষ । যে পাঠক একবার উপন্যাসটি হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছেন প্রশংসা না করে তার উপায় নেই। পাঠক হিসেবে উপন্যাসটি আমার মধ্যে যে প্রভাব ফেলেছে তার রেশ এখনো পর্যন্ত কাটিয়ে উঠতে পেরেছি বললে সত্যি বলা হবে না। উনিশ-বিশ শতকের বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের, বিশেষত মুসলমানের চরিত্র, সে-সময়ের সামাজিক বাস্তবতা, অস্থিরতা, মানুষের অন্তর্জগতের অনুসন্ধান এর আগে অন্য কোনো উপন্যাসে ঠিক এইভাবে, এমন অভিনব আঙ্গিকে, এমন মহাকাব্যিক বয়ানে ধরা হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। রেশ কাটিয়ে উঠতে না পারাটাই স্বাভাবিক। এর মাধ্যমে অলীক মানুষের  মহত্ব প্রমাণিত হয়। অর্থাৎ এটি একটি মহৎ উপন্যাস। কেননা মহৎ উপন্যাস সবসময়ই পাঠকের সঙ্গে থাকে। অলীক মানুষ  যেমন আমার সঙ্গে আছে।

এ যাবৎ এগারোটি ভারতীয় ভাষায় এটি অনূদিত হয়েছে

উনিশ-বিশ শতকের মুসলিম অন্দর-মহলের এক তথ্যপূর্ণ ডকুমেন্টেশন অলীক মানুষ । মুস্তাফা সিরাজ নির্মোহভাবে তাঁর সহজাত ভাষায় বুনেছেন অসংখ্য কাহিনি-উপকাহিনির মধ্যে দিয়ে একটি মহাকাব্যিক আখ্যান। এক’শ বছরের এই লৌকিক-অলৌকিকের আখ্যানটি রচিত হয়েছে কোলাজ রীতিতে। কখনো সহজ বয়ানে, কখনো মিথ ও কিংবদন্তী আবার কখনো ব্যক্তিগত ডায়েরি, সংবাদপত্রের কাটিং জুড়ে দিয়ে। একেবারে নতুনতর আঙ্গিকে দূর সময় ও বিস্ময়কর মানুষের বৃত্তান্ত এঁকেছেন সিরাজ। উপন্যাসটি বাঙালি হিন্দু-মুসলমান জীবনে অনাবিষ্কৃত এক সত্যের উদ্ভাসন। পড়তে পড়তে আমাদের ভাবায়। শিরদাঁড়া সিধা করে বসে উপন্যাসটি পড়তে হয়। লৌকিক-অলৌকিক, প্রেম-অপ্রেম, মায়া-বাস্তবতার পরস্পর-বিপরীত গতির মাঝখানে সংগ্রামরত মানুষ কীভাবে অলীক মানুষে পরিণত হয় এবং কীভাবে সেই মানুষ মীথের বিষয় হয়ে ওঠে, তা এমন কুশলতায় আর কখনও বর্ণিত হয়নি।

বহু অর্থেই অলীক মানুষ বঙ্গভূমির ইতিহাসের এক সন্ধিকালের প্রামাণ্য দলিল। উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয় আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’ প্রকাশের প্রায় আট বছর আগে, ১৯৮৮ সালে। সময় ও পটভূমিতে, চরিত্রসৃষ্টি ও কাহিনি নির্মাণে, ভাষা ও প্রতীকের ব্যবহারে, ইতিহাসচেতনা ও সমাজচেতনার প্রতিফলনে, এমন স্বতন্ত্র আঙ্গিকে এবং এমন অনন্যসাধারণ, সব অর্থে ট্রাডিশন-বহির্ভূত উপন্যাস বাংলা ভাষায় এরপর আরো লেখা হয়েছে হয়ত, কিন্তু আমার নজরে আসেনি। এ যাবৎ এগারোটি ভারতীয় ভাষায় এটি অনূদিত হয়েছে। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় ভারতীয় পাঠকসমাজ এটিকে বিশেষ মূল্য দিয়েছেন।

উনিশ-বিশ শতকের একজন মুসলমান ধর্মগুরু এবং তার পরিবার পরিজনকে কেন্দ্র করে অলীক মানুষের  কাহিনি বিস্তৃত। কেন্দ্রীয় চরিত্র বদিউজ্জামান। পুরো নাম সৈয়দ আবুল কাশেম মুহাম্মদ ওয়াদি-উজ-জামান আল-হুসায়নি আল-খুরাসানি। লোকমুখে তিনি বদিউজ্জামান নামেই পরিচিত। ইহলোকে তিনি পরলোকের অবলেশ অন্বেষণ করে বেড়ান। গ্রামের পর গ্রামে তার কেরামতি ছড়াতে ছড়াতে ক্রমে তিনি হয়ে উঠতে থাকেন এক বিস্ময়কর মানুষ, অলীক মানুষ। অথচ তারই পুত্র শফিউজ্জামান পিতা-প্রদর্শিত পথের উল্টোদিকে হাঁটতে হাঁটতে হয়ে পড়ে ধর্মদ্রোহী। নৈরাজ্যবাদী চেতনায় জর্জরিত, পরিণামে আত্মদ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত এই তরুণ নিষ্ঠুর ঘাতকে পরিণত হয় এবং সেও হয়ে পড়ে আরেক অলীক মানুষ।

বদিউজ্জমান ও শফিউজ্জামান―লেখক এ দুটি চরিত্র নিয়ে এমনভাবে খেলেছেন, যে খেলা আমাদের বিস্মিত করে। বিস্মিত হতে হতে আমরা দোনোমনায় ভুগতে শুরু করি। কোনটি সত্য আর কোনটি মিথ্যা সঠিক সিদ্ধান্তে আসতে পারি না। আমাদের কাছে আপেক্ষিক বলে মনে হয় সত্য ও মিথ্যাকে। বদিউজ্জামানের মতাদর্শ সঠিক, নাকি শফিউজ্জামানের মতাদর্শ? দুজন দুই দর্শনে বিশ্বাসী। দুটি দর্শনই যুৎপৎ আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। আমরা সিদ্ধান্তে আসতে পারি না কোনটাকে গ্রহণ করব।

বদিউজ্জামান চরিত্রটি লেখকের দাদার আদলে অঙ্কিত। উনিশ-বিশ শতকের বাঙালি মুসলমানের একটা শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে বদিউজ্জামান। তার চেতনার মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয় সেই সময়কার এক শ্রেণির বাঙালি মুসলমানের মানস। তিনি ধর্মগুরু, পীর। উপন্যাসের শুরুতেই আমরা তার দেখা পাই। এক জায়গায় তিনি বেশিদিন থাকেন না। নানা জায়গায় দ্বীনের দাওয়াত, অর্থাৎ ইসলাম ধর্ম প্রচার করে বেড়ান। উপন্যাসের শুরুতেই দেখা যায় এক গ্রাম ছেড়ে অন্য গ্রামের উদ্দেশে পাড়ি দিচ্ছেন তিনি। দেখা যায়, একটি গাড়ি বহর চলেছে পদ্মাতীরের কাটালিয়া গ্রাম থেকে পোখরা। ক্যারাভন চলতে থাকে। বিলুটি গোবিন্দপুর, নবাবগঞ্জ, কুতুবগঞ্জ, খয়েরডাঙা, মৌলাহাট। সাতখানা গাড়িতে এই ঠাঁই বদল। গাড়িতে আছে বদিউজ্জামানের স্ত্রী সাইদা, বুড়ো মা। আছে দুই ছেলে, শারীরিক প্রতিবন্ধী মেঝ ছেলে মণি এবং সুস্থ-সবল ছোট ছেলে শফি। আরও আছে একটি বাজা গরু মুন্নি এবং ধাড়ি ছাগল বাচ্চাসহ কুলসুম। আছে বদি-পরিবারের খেদমতগার অবৈতনিক কয়জন বান্দা ও মুরিদ।

বদিউজ্জামান চলছেন প্রচলিত পথ ছেড়ে, মাঠ পেরিয়ে, নদী পেরিয়ে। মৌলাহাট গ্রামটি দেখে থেমে পড়ল এই সাত বহর। গ্রামের মানুষ সংবাদ পেয়ে নদীর পারে আসে। তারা গ্রামবাংলার সহজ-সরল মানুষ। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি খাটে। তাদের বউ-ঝিরা ক্ষেতে ভাত পৌঁছে দেয় আর মুশকিল আসানের জন্য পীরের থানে যায়। থানে এটা-ওটা দিয়ে মানত করে। এটাই তাদের সংস্কৃতি। তারা অপেক্ষা করছিল তাদের নিজস্ব একজন পীরের জন্য। মৌলানা বদিউজ্জামানকে দেখে তাদের মনে হয় তাদের পিতৃপুরুষ এমন মাজেজাপূর্ণ একজন পীরের আগমন সংবাদই বলে গিয়েছিল একসময়। তারা বদিউজ্জামানকে পেয়ে একেবারে বর্তে যায়। তারা মৌলানা বদিউজ্জামানের নাম দেয় ‘বদিপীর’।

পীরবাদ বঙ্গ-ভারতীয় লোকসংস্কৃতি। পীর-ফকিরদের মাধ্যমেই এদেশে ইসলাম প্রচারিত হয়েছিল। এদেশের মানুষ ইসলামকে গ্রহণ করলেও তাদের নাড়ির যোগ থেকে যায় পূর্বপুরুষের মধ্যে প্রচলিত গল্প-কাহিনিতেই। ইসলাম ধর্ম-শাস্ত্রদি চর্চা না করে তারাও পূর্বপুরুষদের মতোই রামায়ণ-মহাভারত পাঠ করত। হিন্দুরা যেমন গুরুর প্রতি ভক্তিশীল তেমনই মুসলমানরা গুরুর পরিবর্তে পীরের প্রতি ভক্তিশীল। ফলে মুসলমানের পীর হলো হিন্দু গুরুর বিকল্প এবং ক্রমে ক্রমে সত্যপীর, মানিকপীর, ঘোড়াপীর, মাদারীপীর ও কুমীরপীর নামে পাঁচ পীরের পূজা আরম্ভ হলো। মাছ ও কচ্ছপকে খাদ্য দেওয়া, গাছের ডালে সুতো বাঁধা ইত্যাদি গ্রাম্য হিন্দু সমাজে প্রচলিত নানা ‘কুসংস্কার’ বাঙালি মুসলমানরা মেনে থাকে ইসলামের নির্দেশে নয়, বহু পুরুষের ধারাবাহিত বিশ্বাসে। এভাবে হিন্দুদের বনদুর্গা বা বনদেবী, ওলাইচণ্ডী প্রভৃতি লৌকিক দেবী মুসলমানদের বনবিবি, ওলাবিবির রূপ নিয়েছে। শ্রীচৈতন্যের শ্রীকৃষ্ণনামসংকীর্তনের মতো মুসলমানদের মধ্যেও প্রচলিত হলো মিলাদ অনুষ্ঠান। এই মিলাদ কিন্তু আরবীয় ইসলামে নেই, আছে শুধু ভারতীয় ইসলামে। সুফিরা যে ইসলাম আমদানি করেছিলেন আরব থেকে, ভারতে এসে তা হিন্দু ধর্মের সঙ্গে মিশে তার আদি রূপ ধরে রাখতে পারলেন না। বহু হিন্দুয়ানি সংস্কৃতিকেও গ্রহণ করে নিতে হলো ইসলামকে।

তার মধ্যে যখন ‘মানুষ লোকটি’ জেগে ওঠে তখন তিনি স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করতে ঘরে যান। সাইদা তার বিবি। একদিন সাইদা তাকে সঙ্গ না দিয়ে ফিরিয়ে দিল। কেন

লোকের সংস্কৃতির পথ ধরেই মৌলাহাটের মানুষ বদিউজ্জামানকে পীর হিসেবে মেনে নেয়। কিন্তু বদিপীর পীরবাদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেন। যেভাবে জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন শায়খ আহম্মদ শিরহিন্দি, শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি, সাইয়েদ আহমদ বেরলবি এবং তাদের পরবর্তীকালের অনুসারীরা। এরা প্রত্যেকেই ভারতীয় লোকসংস্কৃতিকে অস্বীকার করেছিলেন। সমন্বয়ধর্মী ভারতীয় ইসলামকে অস্বীকার করে আমদানি করেছিলেন কট্টর গোড়া আরবীয় ইসলাম। তাদের মতো বদিপীরের কাছেও গান-বাজনা হারাম। তিনিও মনে করেন নারী হচ্ছে শষ্যক্ষেতের মতো। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, তিনি পীরবাদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেন, অথচ তারই অজান্তে তিনিই হয়ে ওঠেন একজন পীর। যাকে তিনি অস্বীকার করতে চান তাকেই তিনি ধারণ করছেন, লালন করছেন নিজের ভেতরে। এ তার তাত্ত্বিক পরাজয়। তার এই পরাজয় দেশীয় সংস্কৃতির কাছে। মুস্তাফা সিরাজ এই পরাজয়টা আমাদের দেখিয়েছেন শৈল্পিকভাবে।

আবার পীর হলেও বদিউজ্জামান যে মানুষ, নিতান্তই মাটির মানুষ, লেখক তা খোলাসা করে দিচ্ছেন তার পাঠকদের কাছে। বদিপীর মসজিদে পড়ে থাকেন সারাক্ষণ, মৃদস্বরে কেতাবের কথা বলেন। তিনি সাধারণ কোনো মানুষ নন, অসাধারণ এক অলৌকিক মানুষ। তার মধ্যে যখন ‘মানুষ লোকটি’ জেগে ওঠে তখন তিনি স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করতে ঘরে যান। সাইদা তার বিবি। একদিন সাইদা তাকে সঙ্গ না দিয়ে ফিরিয়ে দিল। কেন? কারণ সাইদা জেনেছে তার পীর স্বামী পরনারীতে আসক্ত। কে সেই নারী? গ্রামের জাদুমন্ত্রবিদ্যায় আসক্ত এক কাহিন আওরত, দুশ্চরিত্র মহিলা। তার নাম ইকরাতন। গোপনে ইকরাতনের প্রেমে পড়ে যান বদিপীর। এবাদত-বন্দেগীর মধ্য দিয়ে তিনি ধীরে ধীরে যে অলৌকিকত্বে পৌঁছে যাচ্ছিলেন, ইকরাতন তাকে নামিয়ে আনে মাটির পৃথিবীতে। ইকরাতনকে তিনি গোপনে বিয়ে করেন। এ এক চূড়ান্ত শিল্পস্পর্শী ক্লাইমেক্স। সাইদা যখন এই খবর জেনে যায় তখন স্বামীকে সে অবহেলা করতে শুরু করে। ওদিকে তার ছোটপুত্র শফিও গৃহত্যাগ করে। বদিপীর তাঁর জাগতিক বুদ্ধি, শাস্ত্রীয় জ্ঞান এবং শরীরী বাসনা-কামনা নিয়ে হয়ে ওঠেন এক নিঃসঙ্গ মানুষ। স্ত্রী সাইদার প্রত্যাখান আর শফির আত্মগোপন তাঁকে তাঁর ধ্যানের জগৎ থেকে দূরে সরিয়ে আনে। তিনি চলে যান একা একা আবার দূরের যাত্রায়। ফিরে এলে এক কুহকী নারীর, ইকরাতনের, শরীর হয়ে ওঠে তার অনিবার্য গন্তব্য। ইসলামি সাদা জোব্বা পরা তিনিই হয়ে ওঠেন দুশ্চরিত্রা ইকরাতুনের সন্তানের জনক। সাংসারিক ও সামাজিক ছাপে পড়ে বদিপীর ইকরাতনকে তালাক দিতে বাধ্য হন বটে, কিন্তু ইকরাতন তার মনের মধ্যে প্রেমের যে রেখা এঁকে দিয়ে গেছে, তাকে তিনি কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারেন না। তাই ইকরাতনের জন্য তার অন্তর ফেটে যায়। দুই হাতে মুখ ঢেকে তিনি কাঁদেন আর বলেন, “হে পরওয়ারদিগার! হে কুলমখলুকাতের মালেক! বনি আদমের মৃত্তিকা নির্মিত এই ওজুদের ভিতরে তুমি কী গোপন চীজ (জিনিস) স্থাপন করিয়াছ জে সামান্য ধাক্কায় তার সমুদয় জিন্দেগী কাঁপিয়া উঠে? হতভাগিনী কাহিন আওরত! কেয়ামতের পর হাশরের ময়দানে আমি উহার জন্য নেকির অর্ধাংশ তৈয়ার রহিলাম।”

তন্ত্রমন্ত্র ইসলামের হারাম। ইকরাতন তন্ত্রমন্ত্র চর্চা করে। সে কাহিন। যে বদিউজ্জামান গ্রামের মানুষের কাছে পীর, সর্বজনশ্রদ্ধেয়, ইসলামের ধারক-বাহক, তিনিই কিনা ইকরাতনের মতো একটা কাহিন আওরতের জন্য পরকালে জীবনের অর্ধেক নেকি দান করতে চাচ্ছেন! এও তার আরেক পরাজয়। এই পরাজয়টাও সংস্কৃতির কাছে, ভারতীয় লোকদর্শনের কাছে। আরবীয় যে ইসলামকে তিনি কায়েম করতে চাচ্ছেন, সেই ইসলাম বারবারই হেরে যাচ্ছে এদেশীয় সংস্কৃতির কাছে। কী দারুণ ক্ষমতা মোস্তাফা সিরাজের! অপরদিকে, বদিউজ্জামানের বড় ছেলে নুরুজ্জামান ফাজিল পাস করে পুরোদস্তুর উর্দুভাষী। সে বুঝেছে তারা বিখ্যাত পীর বংশের লোক। তাই একটা তফাৎ রাখা দরকার গ্রামের গরীবদের থেকে। কী তফাৎ? ভাষার তফাৎ। আশরাফের ভাষায় কথা বলতে হবে তাদের। আশরাফের ভাষাটা কী? উর্দু। মুস্তাফা সিরাজ নুরুজ্জামান চরিত্রের মধ্য দিয়ে আমাদের দেখাচ্ছেন শ্রেণিবৈষম্য শুধু ভারতীয় হিন্দুদের মধ্যেই ছিল না, ছিল মুসলমানদের মধ্যেও। আশরফ, আতরফ, আজলফ, আরজল শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল মুসলমানরা। এভাবেই হিন্দু-মুসলমানি সংস্কৃতির ব্যবচ্ছেদ করেছেন সিরাজ। এটা সম্ভব হয়েছে তার অভিজ্ঞতার কারণে। জন্মসূত্রে তিনি মুসলিম সংস্কৃতিকে যেভাবে বুঝতে পেরেছিলেন, পরবর্তীকালে তেমনি বুঝতে সক্ষম হয়েছিলেন হিন্দু সংস্কৃতিকেও।

উপন্যাসের দ্বিতীয় কেন্দ্রীয় চরিত্র শফিউজ্জামান ওরফে শফি ইংরেজি শিখতে গিয়ে বংশচ্যুত হয়। সে বিবাগী হয়ে বাড়ি ছাড়ে। মানুষের মুক্তির জন্য লৌকিক সংগ্রামে নামে। বিদ্যাচর্চা, প্রকৃতি, নারী সাহচর্য, ব্রহ্মবাদ ও মননচর্চা কিছুই তাকে ধরে রাখতে পারে না। সে হয়ে ওঠে নৃশংস ঘাতক। উন্মূল। এই ঘাতক মানুষটিই এক সময় লোকমুখে হয়ে ওঠে একজন অলীক মানুষ, কিংবদন্তীর মানু, যার নাম হয় ছবিলাল। শফিউজ্জামান ওরফে শফি ওরফে ছবিলাল যেন বিশ শতকের আধুনিক বাঙালির, প্রতিবাদী, জাগ্রত এবং বিদ্রোহী বাঙালির প্রতীক। তার চরিত্রে ভাস্বর হয়ে ওঠে সূর্যসেন, ক্ষুধিরাম কিংবা প্রফুল্ল চাকী। যারা যুদ্ধ করেছিল আধিপত্যবাদী বৃটিশদের বিরুদ্ধে, এই দেশকে শত্রুমুক্ত করতে প্রাণপণ লড়াই করেছিল। শফি একটি শ্রেণিবৈষম্যহীন সমাজ চায়। মার্কসবাদ তাকে এই দর্শনে উদ্বুদ্ধ করে। লেখক স্পষ্টভাবে না বললেও আমরা সহজেই বুঝতে পারি মার্কসবাদই শফিকে সত্যের সন্ধান দেয়, লড়াইয়ের প্রেরণা জোগায়। ক্রমাগত তার মধ্যে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। প্রশ্ন করতে করতে এক সময় ধর্ম জিনিসটাকে ঘৃণা করার অদ্ভুত সিদ্ধান্ত তাকে গ্রাস করে। জিনগস্ত্রের মতো একলা, জনহীন কোনো স্থানে থুথু ফেলে সে মনে মনে বলে, “ঘৃণা ধর্মকে, যা মানুষের মধ্যে অসংখ্য অতল খাদ খুঁড়ছে। ঘৃণা, ঘৃণা এবং ঘৃণা! ধর্ম নিপাত যাক। ধর্মই মানুষের জীবনে মানুষের স্বাভাবিক চেতনা আর বুদ্ধিকে ঘোলাটে করে। তার চোখে পরিয়ে দেয় ঘানির বলদের মতো ঠুলি।”

উনিশ শতকের শেষ প্রহর ও বিশ শতকের প্রথম পাদের ফরাজী-ওহাবী আন্দোলন, ব্রাহ্ম আন্দোলন, সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন, হিন্দুত্বের পুনরুদ্ধার আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত এই উপন্যাসে মুসলিম পীর পরিবারের লৌকিক-অলৌকিক-বিশ্বাস অভিজ্ঞতামিশ্রিত জীবনের কাহিনি চিত্রিত। লেখকের কথায়, “আসলে অলীক মানুষ বলতে আমি বুঝিয়েছি মিথিক্যাল ম্যান। রক্তমাংসের মানুষকে কেন্দ্র করে যে মিথ গড়ে ওঠে, সেই মিথই একসময় মানুষের প্রকৃত বাস্তব সত্তাকে নিজের কাছেই অস্পষ্ট এবং অর্থহীন করে তোলে। ব্যক্তিজীবনের এই ট্র্যাজেডি ‘অলীক মানুষ’-এর মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। উপন্যাসটিতে ইচ্ছাকৃতভাবেই কোনো কালের ধারাবাহিকতা রাখিনি। অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ মিলে মিশে এক হয়ে গেছে। এই আখ্যানে প্রকৃতপক্ষে শুধুমাত্র দুটি-ই চরিত্র ধর্মগুরু বদিউজ্জামান এবং তার নাস্তিক পুত্র শফিউজ্জামান। এই দুটি মানুষ নিয়ে আমি এক ধরনের খেলা করতে চেয়েছি। একজন মনে করেন, মানুষের নিয়ন্তা ঈশ্বর, অন্যজন ধারণা পোষণ করেন যে মানুষ নিজেই তার নিয়ন্তা।”
(সৈ. মু. সি : অলীক মানুষ-এ আমি সেচ্ছাচারীর আনন্দ পেয়েছি, কোরক, শারদীয় ১৪০০ বঙ্গাব্দ)

তার মানে প্রথম মানুষ বদিউজ্জামান সাবেকি দর্শনে বিশ্বাসী, আর তার পুত্র শফিউজ্জামান আধুনিক দর্শনে বিশ্বাসী। মার্কসবাদ তাকে নতুন আলোয় উজ্জীবিত করে। ‘মানুষ নিজেই তার নিয়ন্তা’ এ তো মার্কসেরই কথা। শফি যদি ইংরেজি না পড়ত, সে যদি গৃহত্যাগী না হতো, সে যদি লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত না হতো, তাহলে হয়ত কোনেদিনই এই সত্যের সন্ধান পেত না। তাকেও হতে হতো তার বাবার মতো ধর্মগুরু, কিংবা তার ভাই নুরুজ্জামানের মতো কট্টরপন্থী ইসলামবাদী। আমাদের স্বীকার করতেই হয় সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের অলীক মানুষ একটি অসাধারণ ব্যতিক্রমী উপন্যাস। সময় ও পটভূমিতে, চরিত্রসৃষ্টি ও কাহিনিনির্মাণে, ভাষা ও প্রতীক ব্যবহারে, ইতিহাসচেতনা ও সমাজচেতনার প্রতিফলনে আছে মৌলিকত্ব ও অভিনবত্ব, যা বাংলা উপন্যাসে বিরল। এই ভিন্নগোত্রের উপন্যাসটি অবহেলা করা কঠিন। অলীক মানুষ  সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজকে দিয়েছে বাংলা উপন্যাসে একটি স্থায়ী স্থান, সেই সঙ্গে খ্যাতি ও প্রভূত অর্থ। উপন্যাসটির জন্য তিনি চারটি পুরস্কার পেয়েছেন : ভূয়ালকা পুরস্কার, বঙ্কিম পুরস্কার, সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার এবং সুরমা চৌধুরী মেমোরিয়াল আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কার। ২০০৯ সালে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সাম্মানিক ডি.লিট উপাধি দেন। আসলে অলীক মানুষ এমনই এক বহুঅর্থগামী, বহুতত্ত্বগামী, বহুদর্শনগামী উপন্যাস, যার সম্পর্কে লিখতে গেলে পুরো একটি বই হয়ে যাবে। স্বল্প পরিসরে উপন্যাসটির মর্মার্থকে ধরা প্রায় অসম্ভবই বলা চলে। তবু লিখলাম। এই লেখাটির মধ্য দিয়ে অন্তত একজন পাঠকেরও যদি উপন্যাসটি পড়ার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়, সেটাই বা কম কিসে?

স্বকৃত নোমান

স্বকৃত নোমান

জন্ম ৮ নভেম্বর, ১৯৮০, বিলোনিয়া, পরশুরাম, ফেনী। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড থেকে তিনি কামিল পাস করেন। বিএ পাশ করেন সোনাগাজী ডিগ্রি কলেজ, ফেনী থেকে। পেশায় সাংবাদিক।

উল্লেখযোগ্য বই :
নাভি (উপন্যাস), ২০০৮, ধাবমান ও বনলতা পাবলিকেশন্স।
রাজনটী (উপন্যাস), ২০১১, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ।
বেগানা (উপন্যাস) ২০১২, বিদ্যাপ্রকাশ।
হীরকডানা (উপন্যাস) ২০১৩, বিদ্যাপ্রকাশ।
নিশিরঙ্গিনী (গল্পগ্রন্থ) ২০১৪, জাগৃতি প্রকাশনী।
কালকেউটের সুখ (উপন্যাস) ২০১৫, জাগৃতি প্রকাশনী
বালিহাঁসের ডাক (গল্প), ২০১৬, অনিন্দ্য প্রকাশ

আবদুশ শাকুরের জীবনী, বাংলা একাডেমি, ২০১৫
প্রাচ্যের ভাব আন্দোলনের গতিধারা (প্রবন্ধ), ২০০৯, বাঙলায়ন।
খ্যাতিমানদের শৈশব (গবেষণা), ২০১০, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ।
আবদুশ শাকুরের বয়ান, শ্রোতা স্বকৃত নোমান (সম্পাদনা) ২০১২, রোদেলা প্রকাশনী।
গুণীজন কহেন (সাক্ষাৎকার সংকলন) ২০১২, অন্বেষা প্রকাশন।
বহুমাত্রিক আলাপ (সাক্ষাৎকার সংকলন), ২০১৫, বিদ্যাপ্রকাশ।

ই-মেইল : swakritonoman@gmail.com
স্বকৃত নোমান

Latest posts by স্বকৃত নোমান (see all)