হোম বই নিয়ে অব্যক্ত সন্ধির কথকতা

অব্যক্ত সন্ধির কথকতা

অব্যক্ত সন্ধির কথকতা
430
0

১.

এসো গন্ধপুষ্প, এসো রাতের লণ্ঠন, এসো হে অহেতুগুঞ্জন…
দেখো, সহস্র পায়রা উড়ছে আজ আর ফুটে উঠছে ভুট্টার খৈ।
তোমার চারপাশে কেন এত ছড়ানো টিস্যু? এত এত ব্লাঙ্ক
সিডি, তাসের পাহাড়?

এই লাইনগুলি বিধান সাহা তার বই অব্যক্ত সন্ধির দিকে’র প্রথম পর্ব ‘তাসের পাহাড়’-এর প্রবেশক হিসেবে লিখেছেন। এখানে বিমূর্তায়ন ও রূপক-প্রতীক-চিত্রকল্প খচা যে প্রতিবেশ আমাদের পঙ্‌ক্তিভোজে আহ্বান করছে তার জগৎটি সাম্প্রতিক কালে আমাদের পরিচিত। উপরন্তু রহস্যভরা সে জগতে অনুপ্রবেশ ও উন্মোচনের আকাঙ্ক্ষা অচিরেই হাওয়ায় মিলিয়ে যায় খানিক এগুলো। রচনার স্বর ও সুর এখানে রহস্যপ্রিয় নয়, কিছুটা বাকবিভূতিতে আকীর্ণ।

এ-অংশটি টানাগদ্যে লেখা। টানা গদ্যকবিতা (Prose Poem) এখন সারা পৃথিবীতেই এমন একটি সংরূপ (Genre) হিসেবে গৃহীত যেখানে অনুচ্চার্য স্বরকে আত্মীকৃত করা যায়। সাহিত্যে এটি কবিতা ও গদ্যের মধ্যবর্তী একটি সংরূপ হিসেবে নতুন স্থান দাবি করছে। পদ্যের কাঠামোতে যা বলা চলে না কিংবা গদ্যের সীমাকেও যা পেরিয়ে যায়, গদ্যকবিতার আধারে তাকেই তো ব্যক্ত করা চলে। কিন্তু আমাদের সাহিত্যে এটিকে এভাবে কখনও বিবেচনা করা হয় নি। কবিতা হিসেবেই একে নিয়েছি আমরা, কাব্যগ্রন্থের ভেতরে স্থান দিয়েছি এ-ধরনের রচনাকে। একক গ্রন্থ খুব বেশি নেই টানা গদ্যকবিতায় লেখা। বিধান সাহা যেহেতু তার গ্রন্থে গদ্যকবিতাকে একটা স্বতন্ত্র পর্বে স্থান দিয়েছেন, সেহেতু কাজ হিসেবে এটিকে বিশেষ পর্যালোচনায় নেওয়া প্রয়োজন। এই সংরূপটি নিয়ে পশ্চিমা সাহিত্যে ব্যাপক  চিন্তা ও চর্চার পর এটি অভিনিবেশ দাবি করে।

আধুনিকোত্তর ও উপনিবেশোত্তর এই কালখণ্ডে এসে আমরা এমন কবি-ব্যক্তিত্বের দেখা পাচ্ছি যার ইন্দ্রিয়গুলি খুবই প্রখর। তিনি অদৃশ্যকে দেখেন, অশ্রুতকে শোনেন, অনির্ণেয়কেও অনুভব করেন কিন্তু সম্পৃক্ত হন না প্রায়, বিভিন্ন দৃশ্য ও ঘটনার মধ্যকার গেরো তিনি নিজের মতো করে খোলেন আর খুলতে গিয়ে হয়তো তা আরও জটিল করে তোলেন। পাঠকের জন্য স্পেস তৈরি হতে থাকে এভাবে। বিধান সাহার প্রতিশ্রুতিও হয়তো এমনই। রহস্য ও  বিস্ময়কে তিনিও চিহ্নিত করতে পারেন। ৪ সংখ্যক গদ্যকবিতাটি দেখা যাক :

পাতানো বাগানে এত এত শান্ত ঝরনা, সাপুড়ের বিস্তারিত বীন, বিষ, মধু ও মূর্ছনা যে আঁকানো গাছেও কী দারুণ ফুল ফুটে আছে!
ডাকিনীমন্ত্র, আত্মবিষ আর উন্মুক্ত আকাশে পিছলে যাওয়া পায়রার ডাক শুনে এদিকে বিস্ময়ে ভেসে গেছে দিন। মুহূর্তের তুচ্ছতা, আয়ুক্ষয়, উড়ন্ত হাসি—এসব নিয়ে ব্যক্তিগত মিনারের পাশ ঘেঁষে রোজই যে রোদ উঠছে, তার দিকেও তাকিয়ে আছে কেউ?
পাথরের পাশে তার জ্বলে ওঠা দেখিও আমায়।

এ পর্বের ২০টি গদ্যকবিতার প্রতিনিধিস্থানীয় রচনা এটি নয়। মিতকথন এই অংশে সুলভ নয়, বরং বিধান সাহা এখানে বেশ প্রগলভতা-আক্রান্ত। গদ্যে বহু ও বিচিত্রস্বর আত্মীকরণের যে সুযোগ থাকে তিনি তা গ্রহণ করেন নি; এর পরিবর্তে হয়ে উঠেছেন বিবৃতি ও বর্ণনামুখর। মাত্র একটি গদ্যকবিতায় (১৭ সংখ্যক) আমরা দেখি, গল্প বা গল্পাংশ বর্ণনাকে অবলম্বন করেছেন তিনি। গদ্যকবিতায় গল্প বা কাহিনি বর্ণনার প্রবণতা খুবই প্রচলিত ও কার্যকর একটি কৌশল যা বোদল্যের থেকে শুরু করে এই ধারার সকল রথী-মহারথীই ব্যবহার করেছেন। বয়ন-প্রকৌশল, কাহিনি, রহস্যময়তা, সূক্ষ্মদর্শন—সব মিলিয়ে এটিকে সার্থক বলা চলে। এখানে দুটি দীর্ঘ বাক্য তৈরি করেছেন তিনি অসমাপিকা ক্রিয়া, ড্যাশ ইত্যাদিকে গেঁথে গেঁথে। যেমন :

তীর্থপুরোহিতের পুরনো অতীতকে, প্রকাশ্যে, সিনেমার নগ্ন পোস্টারের মতো সেঁটে দিয়ে—নদীতে ভাসমান ফল ও কড়ি কুড়িয়ে সেই উন্মাদিনীর পাশে রেখে—পুণ্যার্থীদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে—স্নেহে, চুম্বনে— সেই পাগলিনীর দিকে একবার তাকিয়ে—পুনরায় সে নেমে গেল জলে।  (১৭)

এমন বাক্য তাঁর কাহিনি বর্ণনাকে সহায়তা করেছে, একটা গতি এনে দিয়েছে। কিন্তু এ-নিয়ে আরও নিরীক্ষা অন্যান্য লেখায় চালানো যেত সম্ভবত। ভাষানিরীক্ষাও তার অন্বিষ্ট নয়। এখানে যে লেখকসত্তার দেখা আমরা পাই সে সমাজ-প্রতিবেশের চাপে ও লাঞ্ছনায় বিপর্যস্ত, কিঞ্চিদধিক অহমতাড়িত, অভিমানী, নিঃসঙ্গ, সর্বোপরি বিশ শতকীয় বঙ্গীয় আধুনিকতার উত্তরাধিকারমুগ্ধ। এ কথা শুধু এ-পর্বের জন্য নয়, পুরো বইয়ের কবিতার পরিপ্রেক্ষিতেই বলা যায়। বঙ্গীয় রোমান্টিক ও আধুনিকতাবাদীদের কাছে আমরা কবিদের এ-কালের পয়গম্বর বা সন্ত হিসেবে জেনেছিলাম। কবির কবিতা অনেকটা প্রত্যাদেশের মতোই আর তারা আসলে অলোকসামান্য প্রতিভার অধিকারী—এমন ছিল সে ধারণা। বিধান সাহাও এমন ধারণায় অনেকটা আক্রান্ত মনে হয়। তাই দেখা যাবে সন্তসুলভ উপদেশ, ভবিষ্যদ্বাণী আর আশাবাদের চাপ :

১.    যে রাজ-জোকার একা একা চরে, তার কোনো ব্যথা নেই, ভেবো না কখনও। বুদ্ধের মতো শান্ত হও, হও বিহারের মতো বিস্তৃত ও সবুজ।  (০৫)
২.    যেখানেই থাকো রোদ উঠবেই। (১০)
৩.    সন্দেহ রেখো না মনে। আস্থা রাখো। আস্থা রাখো। একদিন মিলিবে কুসুম। (১১)
৪.    অনন্তে যতই চাও বা সাধু সাধু রবে তোলো ধুয়া—নিজের দিকেই শুধু হেঁটে যেতে শিখেছে মানুষ! (১৬)
৫.    আর জেনে রাখো—
আমাদের সকল কথাই কোনো-না-কোনোভাবে আত্মবিরোধী। নানা ধরনের কর্মতৎপরতার ভেতর দিয়েই সন্দেহের জন্ম। কাঙ্ক্ষা থেকেই ঈর্ষার শুরু। সহজ বিষয় সহজভাবে নিতে না পারাই প্রেম।…  (১৯)

প্রশ্ন করতে পারেন কেউ: ‘তাসের পাহাড়’ পর্বটির জন্য গদ্য কি অনিবার্য ছিল? পদ্য-পঙ্‌ক্তিতে ভেঙে কি এদের লেখা যেত না? প্রথাগত ছন্দ এড়ানোর জন্যই কি এই প্রয়াস? এই প্রশ্নগুলিকে উপেক্ষা করা এখানে কঠিন। দুয়েকটি বাদে আর সবগুলি গদ্যকবিতাই পঙ্‌ক্তি-ভেঙে লেখা যেত। এই রচনাগুলিতে অনেক বলার যে চাপ লক্ষ করি, তা হয়তো এভাবে এড়ানো সম্ভব ছিল। কবিতার পুরনো ও প্রায়-অনিবার্য যে-সব অস্ত্র আছে—উপমা, রূপক, চিত্রকল্প, ভাষার কারিকুরি—কোনোদিকেই তিনি মন দিতে পারেন নি। যার কারণে এখানে গদ্য তার নিজের বেড়া ডিঙিয়ে যেতে পারে নি, গদ্যকবিতায় যা একান্ত অনিবার্য।

b●   ●   ●

প্রকাশক : চৈতন্য ।। প্রচ্ছদ : রাজীব রাজু
মূল্য : ১০০ টাকা

●   ●   ●

২.

বইয়ের দ্বিতীয় পর্বের শিরোনাম ‘অন্ধের নখরা’। এখানে কবিতার সংখ্যা ১৫টি। এখানে ছন্দ মূলত অক্ষরবৃত্ত, শিথিল মাত্রাবিন্যাসে রচিত। গদ্যে লেখা পর্বে অতিকথনের যে অভিযোগ ছিল, এখানে তা করা যায় না। মিতকথনের পরিচয় বহন করলেও অধিকাংশ কবিতাই বিবৃতিপ্রবণ, কখনওবা দর্শনক্লিষ্ট :

১.    শয়তানও বিপরীত প্রভু
অসীম শূন্যতায় ঈশ্বরের সমান্তরাল—

যেহেতু আগুনে দিয়েছি হাত!    (০৪)

২.    স্মৃতি আঁকড়ে যে বাঁচতে চায় / জেনো, তার বর্তমান মৃত। (০৭)

কোনো কোনো কবিতায় দেখা যায় ডায়েরি লেখার ভঙ্গি, বিভিন্ন প্রসঙ্গের কোলাজ ইত্যাদি। কিন্তু কবিতার কাছে আমরা যেমনটা চাই, তেমন চিত্রকল্প কি উপমা (জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন, উপমাই কবিত্ব) বেশ দুর্লভই বলতে হয়। কিংবা সুলভ নয় এমন লাইন :

অভেদ আগুন যেন, যেন উড়ন্ত মিথুন শূন্যে
উড়ছে—উড়ছে হাওয়া আর জলের ভেতর দিয়ে অবিশ্বাস্যভাবে—
ক্রমাগত উথাল-পাথাল, ধুম অন্ধকার
শাখায় রচিত কুয়াশার ফুল যেন—

কখনও লক্ষ করি তিনি পুরনো কবিতার লাইনকে নিজের লেখায় আত্মীকৃত করছেন:

সময় এক বুড়ো জাদুকর—
তার গোপন ঝোলার ভেতর লুকিয়ে রাখে
নির্দয় চাবুক, অগ্নি, অতৃপ্ত আত্মার বিষণ্ন লিরিক…

স্কুলেপড়া Ralph H0dsgon-এর বিখ্যাত পঙ্‌ক্তি মনে পড়ে যেতে পারে আমাদের : TIME, you old gypsy man, /Will you not stay,/ Put up your caravan/ Just for one day? এখানে TIME, you old gypsy man-কেই রূপান্তর করেছেন সময় এক বুড়ো জাদুকর বলে। এরপর বাকিটুকু তারই বিনির্মাণ।

৩.

‘বিভ্রমের রূপকথা’ শিরোনামে বিধান সাহার বইয়ের তৃতীয় পর্বটিও পূর্ববর্তীটির মতো অক্ষরবৃত্তে রচিত। এখানে ছন্দশাসন আরও সংহত। মহাপয়ারের কাঠামোটি স্পষ্টত অনুসরণ করেছেন তিনি। সনেট আর সনেট-ভাঙা ফর্মে ১২ টি কবিতা রয়েছে এখানে। কবির ছন্দ-স্বাচ্ছন্দ্য প্রশংসা পেতে পারে :

পুজো শেষ হয়ে গেছে—কুয়াশা পড়েছে রোজ মাঠে
তুমি কি এমন দিনে—চিনচিনে ব্যথা পাও টের?
অথবা, আদা-চা খেতে খেতে—সিনে-ম্যাগাজিনে রাখো
চোখ? পুলক পুলক কোন আভা ভেসে ওঠে চোখে?  (০৫)

বিভিন্ন স্বর ও সুরের যে মিশ্রণ তিনি ঘটিয়েছেন, তা তার পূর্বসূরি কারুর কারুর প্রেরণাজাত, কিন্তু স্বকীয়তা তদধিক মূর্ছিত

কিন্তু এমন পঙ্‌ক্তি কি আমরা গত শতকের ত্রিশ-চল্লিশ-পঞ্চাশ-ষাটের দশকের বাংলা কবিতায় পড়ি নি? এ-ও বলতে চাই এই প্রসঙ্গে যে, আগে ছন্দ-স্বাচ্ছন্দ্য বলতে যা বুঝিয়েছি তা সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ব্যবহৃত তাৎপর্যের সমান্তরাল নয়। (সুধীন্দ্রনাথ দত্ত বলেছিলেন যে কবি-প্রতিভার একমাত্র অভিজ্ঞানপত্র হচ্ছে ছন্দ-স্বাচ্ছন্দ্য। এতে স্থূলভাবে শুধু ছন্দ-দক্ষতাকেই বুঝিয়েছেন তিনি, তা নিশ্চয়ই নয়।) এমনসব পঙ্‌ক্তির ভিড়ে কখনও কখনও পড়ি : তার বেদনার্ত ম্লান হাসি আলোকচিত্রের মতো / অন্ধকার হলঘরে দর্শক-বিহীন পড়ে আছে। তখন মনে হয় কবি তাড়াহুড়া না-করে একটু স্থির হয়ে নিজের দিকে তাকাতে পারতেন, অপেক্ষা করতে পারতেন। না-ভেবে অনেক বলার চাপ তাকে হয়তো ঠিক রাস্তার দিকে নিয়ে গেল না। অনেকসময়ই আমরা দেখি তাকে পথ হাতড়াতে :  না-বুঝে জলের গতি জলে তুমি দিও না সাঁতার— / এইদিকে ময়ূরাক্ষী, ক্লান্ত সাপ, ব্যথার সোপান! / জানো না তো, কেন সেই শ্যামচুড়ি কখনও কিনি নি— / আজও কেন যৌনধ্যান সমাপনে ডরাই অযথা? / মলিন বায়ুস্তম্ভের নিচে কথার গিমিক— / ধূলিসম্ভার, অযোনিগান… শোনো, ব্রহ্মবাগানের / দিকে ওত পেতে আছে প্রকাণ্ড বাকরাক্ষস। / শান্ত হও আরেকটু শান্ত হও, ওগো তীর্থবক—/ ভেবো না, সমুখে শান্ত জলাধার পাবে তুমি/  জাদুর পাথর পাবে, আর পাবে আয়নামহল/ চিন্তাহীন ছুটে চলো, নগরান্ধের নিকটে যাও / তাকে শোনাও, ময়নাসুন্দরীর তাবৎ আখ্যান—/ শাল বাগানের কথা, সেই সেই সব কলরব! / স্থির হও, স্থির হও, হও আরো রূপালি নীরব! এখানে বিভিন্ন স্বর ও সুরের যে মিশ্রণ তিনি ঘটিয়েছেন, তা তার পূর্বসূরি কারুর কারুর প্রেরণাজাত, কিন্তু স্বকীয়তা তদধিক মূর্ছিত। এই কবিতাটির শুরু ও শেষের বাক্যে অন্তত যা তিনি বলেছেন, তা নিজেরই সত্তার প্রতি যদি হয়, তবে কবিতা উপকৃত হবে। সামান্য কিছু ভুল-বানানের শব্দ, খুবই গৌণ ত্রুটি। মুখ্য যা-কিছু, তা অচিরেই তিনি অর্জন করবেন—এই প্রত্যাশা, বিধান সাহার পাঠক আমরা করতেই পারি।

রাশেদুজ্জামান

রাশেদুজ্জামান

জন্ম ১৭ ডিসেম্বর, ১৯৭৬;টঙ্গী, গাজীপুর।
বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
পেশা : সরকারি কলেজে শিক্ষকতা।

প্রকাশিত বই:
পাখি ও প্রিজম [কবিতা, ২০০৮, র‌্যমন পাবলিশার্স]
ঘুমসাঁতার [কবিতা, ২০১২, বনপাংশুল]

ই-মেইল : rashed_kobi@yahoo.com
রাশেদুজ্জামান