হোম বই নিয়ে অপহৃত সূর্যাস্তমণ্ডলী—জাফরানের গন্তব্য ও ঘ্রাণ

অপহৃত সূর্যাস্তমণ্ডলী—জাফরানের গন্তব্য ও ঘ্রাণ

অপহৃত সূর্যাস্তমণ্ডলী—জাফরানের গন্তব্য ও ঘ্রাণ
242
0

‘অপহৃত সূর্যাস্তমণ্ডলী—জাফরানের গন্তব্য ও ঘ্রাণ’

—উক্তিটা স্বল্পদৈর্ঘ্য হলেও যথার্থ বিশ্লেষণের গুরুত্ব বহন করে। যেমন, আমি মনে করি বাংলা কবিতায় ৯০ দশকের স্বকীয়-স্বতন্ত্র ভূমিকা বেশ উজ্জ্বল-দীপ্তিময়—যা কেউ স্বীকার না করলেও অন্তত খতিয়ে দেখার বিষয়টি প্রস্তাব আকারে পুনর্বিবেচনা করার প্রয়োজন আছে। কবিতা নিয়ে প্রবল পরীক্ষা-নিরীক্ষার যে অসংখ্য উদাহরণ তাঁরা স্থাপন করতে চেষ্টা করেছেন—তা বিগত, অন্য কোনো দশকের বেলায় হয় নি, যা মোটা দাগে বলা যায়। কিন্তু এত ভাংচুর ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের পরও শেষতক তাঁরা কোনো সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত আঁচড় রক্ষা কিংবা প্রলম্বিত করতে সক্ষম হন নি। প্রতিবেশী দশক হওয়ায় প্রথম দশকের দূরদর্শী-সচেতন কবিরা পূর্বসূরিদের যাবতীয় গবেষণার বিভিন্নমুখী উপাদানগুলো খুব সহজেই নিজেদের মতো করে আত্মস্থ করেছেন দ্রুত। অর্থাৎ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে সময় ক্ষেপণ হয় নি মোটেও। যার ফলে দেখা যায়, প্রথম দশকের অনুসন্ধানী কবিরা শুরু থেকেই নিজেদের নিজস্ব কাব্যমত ও পথ নির্মাণ করে সৃষ্টির বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় শামিল হয়ে সম্ভাবনার প্রতিটি ক্ষেত্রকে পুস্পিত ও পল্লবিত করতে সচেষ্ট থেকেছেন। কথাটি ঠিক কার এ মুহূর্তে মনে পড়ছে না। স্মৃতি অনেক মূল্যবান মুহূর্তে প্রতারণা করে। ‘সাহিত্যে আলোচনা ও সমালোচনা শ্বাস-প্রশ্বাসের মতোই জরুরি’—বাক্যটিকে শ্রদ্ধা করে পুনঃপাঠের আকুতি নিয়ে প্রবেশ করব কবি জাকির জাফরানের তৃতীয় কবিতাবই অপহৃত সূর্যাস্তমণ্ডলীর বিচিত্র বিভূতির অন্দরমহলে। স্বভাবে মিতবাক, গম্ভীর হলেও, জাফরানের কবিতা স্বল্প কথায় অধিক কথার বয়ন ও বিশ্লেষণে পরিপূর্ণ—যা উত্তীর্ণ পাঠকের কাছে বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনায় তুমুল, কিন্তু শান্ত ও নিরীহ উপচারে পরিকীর্ণ। মর্ডানিষ্ট ধারাটির অপ্রতিহত প্রভাব আলোচ্য গ্রন্থের পরতে পরতে মুক্তোদানার মতো দীপ্তি ছড়িয়ে আছে। তবে একপেশে এককেন্দ্রিকতার সতর্ক শাসনকে পাশ কাটিয়ে আরক্ত রসে নিজেকে উদ্ধারে সিদ্ধহস্ত। যা একজন কবিসত্ত্বার বিশুদ্ধ শক্তি।

11657483_1016331885046433_404089178_n●   ●   ●

প্রকাশক : চৈতন্য
প্রচ্ছদ : নির্ঝর নৈঃশব্দ্য
মূল্য : ১০০ টাকা

●   ●   ●

আমি বলি সে-ই কবি, যে কিনা বাতাসের ঢেউ স্বচক্ষে দেখার ক্ষমতা রাখে, সামান্য ধুলো থেকে নক্ষত্রমণ্ডলীর সবচে ক্ষীণ গোপন তারাটির গতিবিধিও আয়ত্তে রাখে

বোদলেয়ার কবিকে তুলনা করেছিলেন আলবাট্রসের সাথে—‘কবি এমন এক বিহঙ্গ যার নিজের বিশাল পাখার ভারে নিজেই মোহ্যমান এবং উড্ডয়নরহিত। তাঁকে বয়ে বেড়াতে হয় সুদৃশ্য একজোড়া পাখা যা তাঁকে উড়তে বলে এবং একই সাথে গেঁথে রাখে ভূমিতে’। আপাদমস্তক শিল্প বিবেচনায় জাফরানের কবিতা অনবদ্য ঘ্রাণ, নান্দনিক চেতনা চর্চার উর্বর উপত্যকা। যেখানে আনন্দ-আবাসন গড়তে গেলে শুধু ইন্দ্রিয়ের গভীরতাই যথেষ্ট নয়, হৃদয়কে করা চাই দেখার চোখ। বিগত কয়েক দশকের কবিতার দিকে তাকালে সহজেই অনুমান করা যায়, বাংলাদেশের কবিতা যতটা রাজনীতিমুখর ততটা অন্তর্মুখীন নয়। এটা একদিকে যেমন দুর্বলতার প্রতীক অন্যদিকে দূরদর্শিতার সীমাহীন অভাব। যার ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমাদের চেতনার ভেতরপ্রদেশকে আলোকিত করা দূরে থাক, মননকেও উদ্দীপিত করে না। জাফরানপাঠে এটুকু নিশ্চিত হওয়া যায়, তিনি সমকালের সভাপতি কিংবা তাৎক্ষণিকতার দূত হতে চান নি। বরং সৃষ্টির ব্যাকুলতায় বিশ্বকবিতার সাথে গভীর সম্বন্ধ স্থাপনের লক্ষে আত্মদর্শন ও অভিনিবেশকে রাঙিয়ে দেবার অটল অঙ্গীকারে তৎপর। আমি বলি সে-ই কবি, যে কিনা বাতাসের ঢেউ স্বচক্ষে দেখার ক্ষমতা রাখে, সামান্য ধুলো থেকে নক্ষত্রমণ্ডলীর সবচে ক্ষীণ গোপন তারাটির গতিবিধিও আয়ত্তে রাখে। অর্থাৎ কবি চিরকালই advance জগতের আজন্ম বাসিন্দা। বস্তুগত ও অবস্তুগত সবকিছুই ইন্দ্রিয়ের ঘনিষ্ঠ সহচর। আর সে কারণেই কবিকল্পনায় অসম্ভব, অবাস্তব—এ জাতীয় শব্দ দ্বিধা ও দ্বন্দ্বের পিচ্ছিল প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে শস্যদানার সম্ভারে কুসুমাস্তীর্ণ হয়। যে কোনো কবি তাঁর নিজের সময়ের নির্ভরযোগ্য প্রতিনিধি। সময়ের অনুক্ত উচ্চারণ কবিকণ্ঠেই সবচে বেশি শোভা পায়। বর্তমানে দাঁড়িয়ে অতীত অভিজ্ঞতা বা ইতিহাসের নির্ভরতায় ভবিষ্যতের অনুমেয় ঘটন-অঘটনের প্রকাশ কিংবা নির্মম বাস্তবতার সাক্ষ্য প্রদান দায়িত্বশীল ও কাব্যিক আদর্শের পরিচয়। যার কোনো ঘাটতি দেখি না জাফরানের কাব্যভাবনা ও বিচারে। অপহৃত সূর্যাস্তমণ্ডলীতে প্রেম, বিরহ ও রাজনীতি প্রধান উপজীব্য বিষয়। প্রেমের উপস্থাপন আগের মতোই সচ্ছল-স্বভাবজাত হলেও রাজনীতির উপস্থাপন ও ব্যাখ্যা প্রদানের ক্ষেত্রে যে প্রকরণের আশ্রয় নিয়েছে, নিঃসন্দেহে তা আলাদা মাত্রিকতার। অবশ্য এ ক্ষেত্রে তাঁর দ্বিতীয় কবিতাবই নদী এক জন্মান্ধ আয়নাতে অতুলনীয় মর্যাদায় প্রতিফলিত হয়েছে। এ পর্যায়ে এসে ভাবছি, রাজনীতির এমন নতুন প্রকাশবিভূতির সক্ষমতা সমকালে কে বা কারা ধারণ করছে? আমার অনুসন্ধান-অনুমান বলছে, এ ধারাটি নতুন চিন্তাকাঠামোর স্বস্তিদায়ক উন্মোচন। এটি বাহবাসূচক সংযোজন, অন্তত তাঁদের জন্য—যারা এখনো মনে করে বাংলা কবিতা সর্বত্রগামী হয় নি, জীবনের অভিজ্ঞতার ও অনুভবের সকল স্তর ছুঁয়ে যাবার প্রবণতা এখনো দুর্লক্ষ্য। রাজনীতি ও প্রেম—এই দুই বিষয়ের বাইরে সাধারণত কবিরা খুব বেশি বিচরণ করতে চায় না। রাজনীতির কবিতায় প্রেম মজ্জাগত, প্রেমের কবিতায় রাজনীতি। এ দুই মৌলিক আরাধনা  মানুষের জীবনের সাথে অবিচ্ছেদ্য, যেন স্নায়ু ও রক্তস্রোতে নিবিড় প্রবহমান। আমাদের কবিরা এ দুটো বিষয়ের তুমুল উদযাপনের মধ্য দিয়ে জীবন ও জগতের জমাট অনুভবকে ছুঁয়ে দেখতে চান। তবে বিশেষ করে পূর্বসূরিদের রাজনৈতিক কবিতার নির্মাণশৈলী ও অজস্র একঘেয়ে সৃষ্টির ভারে যখন আমরা বিরক্ত, অনাসক্ত ঠিক তখনই জাফরানের উদ্ধার—পাঠপূর্বে অচেনা, জাফরানীয় উদ্ভাবনী শক্তি উজ্জীবিত করে। আশাবাদী হবার প্রেরণা যোগায়। যার ফলে রাজনৈতিক কবিতা মেদসর্বস্ব বক্তব্যপ্রধান, শ্লোগাননির্ভরতার ক্লান্তিকর লম্বা দাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে পুনরায় মনোরঞ্জনের খোরাকে পরিণত হয়েছে। যে কেউ প্রশ্নফলা ছুঁড়ে দিতে পারে—কোন বিবেচনায় তাঁর রাজনৈতিক কাব্যচিন্তা এত প্রণিধানযোগ্য? উত্তরে বলব, সৎ উপলব্ধির কথা, রূপক আর প্রতীকের সমন্বয়ে নির্মিত কাব্যভাষা, যা পাঠকের চিন্তাকে উসকে দিতে সক্ষম। কবিতার হাজার বছরের সোনালি ইতিহাস থাকলেও আজ অবধি সর্বসম্মত সংজ্ঞা নিরূপণ করা সম্ভব হয় নি। তবুও যে যার অভিজ্ঞতা, মেধা ও মননের উৎকর্ষে নিজের মতো করে কবিতার এক ধরনের সংজ্ঞা নির্মাণ ও নির্ভর করে অগ্রসর হন বলে ধারণা করি। বস্তুত একটা কবিতা কিভাবে পরিপূর্ণ, উত্তীর্ণ, সর্বোপরি ‘হয়ে উঠছে’ তার নেপথ্যে কি শর্ত বা কোনো ধরণের গুণাবলির পরহেজগার হতে হয়—এ জিজ্ঞাসা উত্তরোত্তর অপ্রতিরোধ্য—দায়িত্বশীল কবি ও বোদ্ধা পাঠক—উভয় শ্রেণিতেই। এটি বহাল আছে বলেই যুগে যুগে কবিতার রূপ বদলায়। পাঠকরুচি নতুন সৃষ্টির প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ভেতর অবগাহন করে তৃপ্ত হতে চায় চিরকাল। কবি জাকির জাফরানের তৃতীয় গ্রন্থ অপহৃত সূর্যাস্তমণ্ডলী যে সব কারণে আমাকে আগ্রহী করে তুলেছে, যার ফলে স্বপ্রণোদিত হয়ে আলোচনার দারস্থ হয়েছি, তা উদ্ধার করা যাক। তাতে পাঠকের সাথে আলোচকের চিন্তার যোগসূত্র স্থাপন কিংবা তর্ক-বিতর্কের জায়গা সৃষ্ট হয়ে পারস্পরিক বোঝাপড়ার নতুন দিগন্তের দ্বার উন্মোচিত হবে।

 

১. নিজস্ব প্রকাশভঙ্গির স্বচ্ছ ও অভিজাত উজ্জ্বলতা।

২. অভিজ্ঞতার উচ্চারণ নির্মাণশৈলীর স্বতঃস্ফূর্ত সহচর।

৩. কবিতায় বহুরৈখিক চেতনার ফলপ্রসূ উন্মীলন।

৪. বিষয়ের সাথে গভীর আত্মীয়তা স্থাপনের মাধ্যমে বাক্যে বাক্যে সমন্বয়ের সুরক্ষা।

৫. বোধের প্রচার ও প্রসারে আসক্তির আয়োজনকে দক্ষতার সাথে নিয়ন্ত্রণ।

৬. মিতবাক বক্তব্যের ধার, জুতসই শব্দের আহরণ ও চিন্তার সৌন্দর্য তৈরি।

৭. অলংকারের সংযত ব্যবহারে মনোজ্ঞ সুরের সংগ্রাহক।

৮. দূরদর্শী,ইন্দ্রিয়ঘন উপাত্তের আশ্রয়ে আন্তর্জাতিকতার সন্ধান।

 

উপরোক্ত গুণাবলির কর্ণধার হিসেবে জাফরানের সৃষ্টিকে এক কথায় বলব, রূপ-রস-ঘ্রাণের অনন্য আহ্বায়ক। বেশিরভাগ কবিতাই উঁচু স্বরগ্রামে বাঁধা। প্রেম, বিরহ, সামাজিক বাস্তবতা ও রাজনৈতিক দৃষ্টি একটু বেশি প্রগাঢ় বলতে হয় । প্রথম কবিতা ‘অপহৃত সূর্যাস্তমণ্ডলী’—যা গ্রন্থেরও নাম । সে কবিতা দিয়েই উদাহরণে যাওয়া যেতে পারে :

ফিরে এসো গুম হয়ে যাওয়া পাখি
বসন্ত-গোধূলি থেকে পালিয়ে আসা রমণীদের
পাড়ি দিতে হবে এক দীর্ঘতম কৃষ্ণচূড়া সেতু।
হাতের আলোতে জাগে আগুন-সমাধি
ক্ষমা করো চাঁদ, আর শীতলক্ষ্যা নদী,
জলের একাকিত্বের মধ্যে ঢুকে গেল এতগুলো পাখি

আমরা বুঝি নি, ক্ষমা করো অহেতু নির্দেশমালা
আমরা শুনিনি কিছু, আমরা কিছুই দেখি নি।

 কোনো রচনা তখনই সাহিত্য মূল্য পায়, যখন বিষয়কে অতিক্রম করে কবির চিন্তার চাপ বা মনের ছাঁচ তার বৈশিষ্ট্য সম্পাদন করে, সৃষ্টির মাহাত্ম্য তখন আর ঠিক বিষয়ের উপর নির্ভর করে না—বক্তার ব্যাক্তিত্ব, ভাবচিন্তার আলোড়ন, ভাষার অনুরূপ মৌলিক ভঙ্গি তাকে এমন একটি রূপে রূপান্তরিত করে—যে, তা আর কেবল তথ্য ও তত্ত্ব হিসেবেই মূল্যবান নয়, উত্তম সৃষ্টি হিসেবেই উপাদেয়। পাঠকালে আমরা একটা নতুন দৃষ্টি, নতুন ভাবনাভঙ্গি, জীবন ও জগতের মানবীয় জিজ্ঞাসার নবদিক ও বিশিষ্ট মনোভাবের পরিচয়ে মুগ্ধ হই।

আফিম মেশানো চোখ—
তোমার দৃষ্টির পথ মাস্তুলে ভরা।
এসো বসি, গান করি, শুই
শুঁকে দেখি, কে আগে?
তুমি নাকি আমি আজ ডাকহরকরা?    [আফিম]

কিংবা

এই রাতে
চাঁদের কলঙ্কটুকু কোথায় লুকাবো?
ওহো শীত, কুয়াশা-পতন,
এ আমি ঘুমাই যদি, অর্ধেক ঘুমাবো।       [অর্ধেক ঘুমাবো]

‘হৃদযন্ত্র’ নামক কবিতায় এসে সত্যিই হৃদয়ের চাহিদা যেন তৃপ্ত হয়। আবেগের সুনিয়ন্ত্রিত আহ্বানে সাড়া না দিয়ে উপায় থাকে না। কোমল কৌশলে কর্ণসুখের তির্যক ধারণা পুনঃপাঠের নিমন্ত্রণ করে।

যে কখনো কারও জন্যে অপেক্ষা করে না
আফিম ফুলের মধ্যে তার
অশ্রু জমা থাকে।

Style বা ভঙ্গি যার যত উন্নত, গভীর ও সুস্পষ্ট—অর্থাৎ কবিতার ভেতর দিয়ে যে ব্যক্তিত্বের সন্ধান পাই, তা যত হৃদয়গ্রাহী সত্য ও সুন্দর বলে প্রতীয়মান হয়, তাঁর শিল্প ততই উৎকৃষ্ট। মৌলিকতা কবির অনন্য সাধারণ ব্যক্তিত্ব। লেখা পড়ামাত্র বুঝতে পারি—এ এক নতুন, সম্পূর্ণ অপরিচিত ব্যক্তির সাথে আবদ্ধ হতে যাওয়া। এ দৃষ্টি, এ ভঙ্গি, এ ভাষা যেন আর কোথাও নাই, এই মৌলিকতাই কাব্যের প্রাণ। যেখানে এ বস্তু আছে সেখানে রস-সংবেদনা অনিবার্য। ব্যক্তির নিজস্ব ভাবদৃষ্টি যে রচনায় প্রতিফলিত হয়—বিষয় বা matter যেমনই হোক, তা এমন একটি রূপ গ্রহণ করে, যা বিষয়-নিরপেক্ষ একটা অতিরিক্ত বস্তু। যার অনুপস্থিতি থাকলে সাহিত্যপদবাচ্য হয় না। চলমান সময়ে একটা সীমাবদ্ধতা লক্ষ্য করি। রসবোধ প্রায় সবারই আছে, কিন্তু রসজ্ঞান নেই। অর্থাৎ কাব্যরস আস্বাদনের শক্তি আছে, কিন্তু তার স্বরূপ উপলব্ধির সক্ষমতা অনেকেরই নেই। বিষয়বস্তুর বিস্তার ও গভীরতার মধ্যে কল্পনার অবকাশ থাকা খুবই জরুরি। তা না হলে good poetry হতে পারে, কিন্তু great poetry মোটেও নয়। এ সূক্ষ্ম জায়গায় জাফরানের কবিতার গাঢ় সম্ভাবনার সূত্রটি ক্রমশ উজ্জ্বলতর হতে দেখছি। আদিকাল হতে অদ্যকার কাব্যজ্ঞানীরা রসসৃষ্টির সার্থকতা সম্বন্ধে একমত। টানা গদ্যেই হোক, আর পদ্যেই হোক, কবির সৃষ্টিকল্পনায় যা প্রকাশ পায়, তাতে জগতের যে রূপটি আমরা প্রত্যক্ষ করি, তা ব্যবহারিক রূপ নয়—বাস্তব প্রয়োজনপীড়িত মন, জগৎকে যে ভাবে ধারণ করে, এটি সেই ধারণার অনুরূপ নয়। কবিতায় aesthetic sentiment একটি স্বতন্ত্র অনুভূতি। এখানে কবির দৃষ্টি বা imagination কাজ করে তাকে দিব্যদৃষ্টি বলা যেতে পারে। তাতে জীবন ও জগতের মধ্যে সর্বত্র অবাধ আত্মস্ফূর্তির অবকাশ পায়। যা কিছু অসম্পূর্ণ, নিষ্ফল, যা মানুষের দুর্বলতা ও অক্ষমতার প্রকাশ বলে চিত্তের জন্য গ্লানিজনক, তার সে অসম্পূর্ণতা আর থাকে না। কবি সৃষ্টি করেন, তাঁর সেই দিব্যদৃষ্টি পৃথিবীকে যে ভাবে পুনঃসৃষ্টি করে, তা-ই আসল স্বরূপ। এই দ্রষ্টা হিসেবেই কবি স্রষ্টা। কবি যখন কুৎসিতের মধ্যে সুন্দরকে দেখেন, ক্ষুদ্রের ভেতর মহৎকে, কঠোরতার ভেতর কোমলতাকে, অনিত্যের মধ্যে নিত্যকে দেখেন তখন বিষয়টি পরিষ্কার হয়। মানুষের ভেতরপ্রদেশে, মগ্নচৈতন্যের মধ্যে এই কবিকল্পনার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। কবিকল্পনার স্বরূপ উপলব্ধির দিনে [এ মুহূর্তে মনে পড়ছে না] কোনো এক কবি বলেছিলেন, ‘The poet are the unacknowledged legislators of the world.’ প্রসঙ্গক্রমে বহু কথার হাওয়া আসছে। যারা সচেতন কাব্যচর্চায় নিবিষ্ট, অনুসন্ধানী তাঁদের ভেতর বোধ করি এ প্রশ্নটি সুগভীর ব্যাপ্তি নিয়ে আছে—আগামী দিনের বা ভবিষ্যতের কবিতা কেমন হতে পারে? আমি উদাহরণ হিসেবে ‘ধানের প্রাচীর’ কবিতাটিকে উদ্ধৃত করলাম—

একটি ধানের শীষে
মূর্ছা যায়
ভোরের শিশির

কৃষক ঘুমায়
কিষাণিও ঘুমায়
মাঝখানে ধানের প্রাচীর।

কিংবা

বিশুদ্ধ বাতাস
পাওয়া গেল
মৃতদের হৃদপিণ্ডে।

 আমরা যত এগিয়ে যাচ্ছি, ততই প্রযুক্তিনির্ভর হচ্ছি। হাতের মুঠোয় চলে আসছে পৃথিবী। তাই বিনোদনের নতুন নতুন সব ক্ষেত্র করায়ত্ত, বহুবর্ণিল। যদিও কবিতা সবার জন্য নয়। তারপরেও যে ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী তারা হয়তো গ্রহণ করবেন স্বল্পদৈর্ঘ্য কবিতাকে। যেখানে অত সময় ব্যয় করার মতো সময় বা মানসিকতা থাকবে না। এটি একটি সম্ভাবনা মাত্র। ক্ষুদ্র কবিতার কাছেই হয়তো ফিরে আসবে সেই সংখ্যালঘু কাব্যরসিক মানুষজন। যারা চাইবেন অল্পের ভেতর অধিকতর বিভিন্নমুখী কথার বিস্তার। যা পড়া মাত্র ছুঁয়ে যাবে, আবার রহস্যভারে রয়ে যাবে অধরা। ‘আকাশ’ শিরোনামের ৬ লাইনের কবিতা থেকে মাত্র ২ লাইন উদ্ধৃত করলাম—

মৃত মানুষ থাকে পৃথিবীর নিচে
সবচে বড় আকাশ কেবলই মৃত মানুষের।

পাঠমাত্র সহজ হলেও সরল নয় মোটেও। সহজ কথা সহজভাবে তুলে ধরা খুব কঠিনতর কাজের একটি। দুই লাইনের বুননরীতিতে একজন শক্তিমান, সুবক্তাকে আবিষ্কার করতে মোটেও বেগ পেতে হয় না। পড়ার সাথে সাথে যেন একটা সুস্থির দৃশ্যকল্প আপনাতেই তৈরি হয়ে যায়। পাঠকমনে এমন প্রশ্নের আবির্ভাব মোটেও অবান্তর নয়। অবচেতনে পাঠকের মনে সৃষ্টিসুখের যে চাঞ্চল্য গর্জে ওঠে, তাতে বরং এটিই জাগ্রত হয় যে, এহেন কাজ আমিও পারতাম। এই যে এত কথার ভিড়ে পাঠকমনের ‘আমিও পারতাম’—এই বাসনাবিলাসই কাব্যিক আদর্শ ও কবিতার রসশক্তি । এটা অনস্বীকার্য—যে ধরনের জ্ঞান কবি ও রসিকের পক্ষে যতখানি প্রয়োজন, পণ্ডিতের তাতে চলে না। কবিপ্রতিভা ও পণ্ডিতের মেধা এক নয়। একটি সহজাত, অন্যটি সাধনার ফল। কিন্তু একটি কথা আমাদের সব সময় মনে থাকে না যে, রসিকের রসবোধশক্তিটাও কবিপ্রতিভার মতোই সহজাত। কবিপ্রতিভা যেমন প্রকৃতির gift, রসিকতাও তেমন। কোনো কবিতার রসমাধুর্য অপর কবির নিকট যতটা প্রকাশ পায়, সেই কবি—অর্থাৎ যিনি কবিতাটির স্রষ্টা—তাঁর নিকটেও ততটা নয়। কিন্তু এখানে গভীর সত্যের সন্ধান পাই—যিনি কবিতা লেখেন, তিনিও যেমন কবি, যিনি সেই কবিতার নির্যাস পান করেন, তিনিও কবি। কবি ও ক্রিটিক উভয়ের বৃত্তি যে মূলে একই শক্তির বিভিন্ন ক্রিয়া, তা বোধ হয় সর্বজনস্বীকৃত। পাঠকরা তাঁদের ব্যক্তিগত রুচি ও বোধশক্তির উপর নির্ভর করলেও, প্রত্যেকের রুচির স্বাধীনতা সত্ত্বেও কবির সাথে একটা সামাজিক বন্ধন বিদ্যমান থাকে। সে বন্ধন কিন্তু বাধ্যতামূলক নয়, বরং বন্ধনের আশ্বাসের একটি আত্মীয়তার সম্বন্ধ স্থাপিত হয়। অনেকটা এমন—

বন্দুকের নলের ভিতর দিয়ে আমি বসন্ত-বাতাস হয়ে
বয়ে যেতে চাই

 শেষ পর্যন্ত একজন দক্ষ কবি কবিতার মাধ্যমে সৌন্দর্যের চর্চা করেন এবং সে সৌন্দর্য অনুরূপভাবে কেমন করে পাঠকমনে প্রতিস্থাপিত করা যায়, সে বিষয়ে সতর্ক-সজাগ থাকেন। ‘নারী ও বিড়াল’ কবিতা দিয়ে সমাধানে যাওয়া যেতে পারে—

বিড়াল রাতের অন্ধকারে ইঁদুর শিকার করে—
নারীরাও আঁধারে, ঘাম আর দীর্ঘ নিঃশ্বাসের লোভে,
খুঁজে নেয় নিজের শিকার।

কবিতার অনেক গুণ অনুসন্ধান ও উদ্ধারের পর কবির পক্ষে তা নিবেদনের একমাত্র নির্দেশিকা হলো, ভাষার মন্ময় রূপান্তরের মধ্য দিয়ে নিজস্ব style বা ভঙ্গির প্রতিষ্ঠা। পূর্বেও তা সামান্য ইঙ্গিত দিয়েছি। ওখানেই রহস্য, ওখানেই সব পথ এসে এক পথের সন্ধান ও সম্মান পায়। সূক্ষ্ম-তীব্র-তীক্ষ্ণ এ জায়গায় জাকির জাফরানকে আলোকিত হতে দেখে পুলক অনুভব করি। তিনি যে ভাষা ও ভঙ্গির পরিচালক, তা একেবারেই তাঁর অন্তঃকরণ হতে পাঠকের অন্তঃকরণে সেতু নির্মাণ করার সার্থকতা। কোনো কবিতা যদি সত্যকার সুকাব্য হয়, তবে তার সকল অঙ্গেই একটি বৈশিষ্ট্য জাজ্বল্যমান থাকে—সে কবিতার সবকিছুই তাঁর নিজের মতো স্বতন্ত্র, একান্ত।

অনন্ত সুজন

জন্ম ২৭ নভেম্বর ১৯৭৭; ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
শিক্ষা : স্নাতকোত্তর (রাষ্ট্রবিজ্ঞান)। পেশা : লেখালিখি।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
পিপাসাপুস্তক
জেল সিরিজ
লাল টেলিগ্রাম
সন্ধ্যার অসমাপ্ত আগুন

সম্পদনা :
শূন্যের সাম্পান [প্রথম দশকের নির্বাচিত কবি ও কবিতা]
অনতিদীর্ঘিকা [প্রথম দশকের দীর্ঘ কবিতা সংকলন]

সম্পাদিত ছোটকাগজ : সুবিল

ই-মেইল : anantasujon77@gmail.com