হোম বই নিয়ে অপস্রিয়মাণের ভাস্বর মহাবিশ্ব

অপস্রিয়মাণের ভাস্বর মহাবিশ্ব

অপস্রিয়মাণের ভাস্বর মহাবিশ্ব
644
0

প্রতিটি ফেনোমেননেরই নিজস্ব গল্প থাকে। দেখা জগতের ঘটনাপুঞ্জের পাশে যে জগদগুচ্ছ নিজেদের গোপন করেছে, মুছে গেছে, হারিয়ে গেছে, ঝরে পড়েছে তাদের গল্প, আর্তি, প্রণতি, দীর্ঘশ্বাস, ব্যাকুলতা, ধ্বনিময়তা বা ছন্দ ও সুর গল্পগুলোর অন্তরে চোখ রাখেন কবি। ধীর ও প্রাণময় অন্তর্বাস্তবের রত্ন আহরণে নিজেকে এমনভাবেই নিয়োজিত করেছেন অনুপম মণ্ডল। রত্নগুলো বেদনার। ঝিনুকের বেদনায় জন্ম নেয়া মুক্তোর মতো। বেদনা বাংলা ভাষায় দুঃখের চেয়ে ভিন্নতর ও গভীর মাত্রার। অনুপম বেদনা ও অপস্রিয়মাণতার মন্দিরে ধ্যানমগ্ন থাকেন। শূন্যের কবিতা এমন বাস্তবসমূহের দিকে অন্তর্যাত্রা (আনাবাজ) করেছিল। দৈনন্দিনের প্রাত্যহিকতা পেরিয়ে আধ্যাত্মিকতার রাগ শূন্যের কবিতায় নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছিল। অনুপম সেইসব জলার মীন ও কুসুমের বর্ণকে নতুন করে তুলেছেন নিজের আত্মার সংশ্লেষে।

আমার কাব্যবিশ্বাসে প্রত্নমানস মৌন ও মূলভূমি। অনুপমের প্রত্নমানসে দেখি খোওয়া যাওয়া, অপস্রিয়মাণ, পতিত, অবহেলিত, বিস্মৃত, অলক্ষিতের উত্থান ঘটে—

তারপর বিস্মৃতির অভিমুখে যেতে যেতে সে রব
ছিন্ন সুষমার মতোই ফণা
তুলে
দেখে নেয় নক্ষত্রের পরিসর


রূপ, অবয়ব, চিহ্নে তিনি পিপাসাকে ধারণ করেন, ডৌলে মেলে ধরেন। মৌন জগদগুলো কেবল এই পৃথিবীরই নয়, আরও দূর-বিস্তৃত।


প্রতিটি হারানো বা খোওয়া যাওয়া, অসমাপ্ত বাস্তবের, বা পরিণতির ঠিক পাশেই লুকিয়ে পড়া অপূর্ণতার বাস্তবের ছিন্ন সব শ্বাসাঘাত অনুপমের কবিতার বিন্যাসে রেখা টেনে যায়। স্মৃতির বলয়ের উপরিতল বা অন্তরমহল ঘিরে থাকা বলয়ের নিঃসীমতাকে ক্লান্তিহীনভাবে ভাষা দিয়ে চলেন অনুপম। রূপ, অবয়ব, চিহ্নে তিনি পিপাসাকে ধারণ করেন, ডৌলে মেলে ধরেন। মৌন জগদগুলো কেবল এই পৃথিবীরই নয়, আরও দূর-বিস্তৃত। বলতে শুনি তাঁর ধাতুর স্বরাঘাত ছুঁতে চায় মহাবৈশ্বিকতা। বিমূর্তায়ন দেখলাম এখানে। ছিন্ন সুষমার মতো রব দেখে নেয়—

একটা তারার প্রশাখায় জেগে আছে সারা রাত্রি

অশ্রুতির রূপায়ণে স্তব্ধ শোচনার আর্তি শোনেন তিনি। মন্থর স্ফুলিঙ্গ হয়তো মৃত্যুরহিত মূর্তি, অতএব তা কেন্দ্রাতিগ, ধাবমান হয় প্রতাপের বিপরীতবিহারে, স্তব্ধ হয়ে যায় বিক্ষিপ্ত তৃষ্ণারা—

একটা মন্থর স্ফুলিঙ্গ
এইরূপে
ক্রমশ সরে যাচ্ছে
আর
সরে যাচ্ছে দ্যাখো কেন্দ্রের থেকে

ব্যথা ও দহনের ভাস্কর হয়ে ওঠেন অনুপম। ব্যথার সম্পূর্ণতারও অভিসারী তিনি। কেননা এ দহন পূর্ণতা দেয়। বিষাদের ভাষ্য গাঢ় হয়ে ধরা পড়ে—

নিঃসঙ্গ ক্লাউনের বিষাদ
ওই আবছা অটোগ্রাফ
কিম্বা ওই উদ্ধত
উরুচিহ্ন

এভাবে ভাষা গাঢ় হয়ে এলে তা নিজেই খুঁজে নেয় ভিন্ন কূল, ভিন্ন ধ্যানমাত্রা। তখন সুর বদলে যায়। সব বাস্তবকে শব্দে প্রকাশ করবার অবস্থায় হয়তো কোনো শব্দগুচ্ছই যাবে না কখনো। ধ্যান করি তাই অপাঠ্য বা অপ্রকাশ্যকে ভাষার বৃহৎ পরিসরে ধরা। সন্তাপের ভাষা শুনুন অনুপমে—

ওই তীর, তারা রক্তের ভার নিয়ে বুঝি বা গড়িয়ে নামে।

কিংবা

উদভ্রান্ত একটা অর্গান বইছে নিজস্ব গরাদের দিকে

আরও

সুরেলা কোনো ক্রন্দনের ভিতর দিয়ে যেতে যেতে দেখি
সৌরগন্ধের মতোই আরো গভীর হয়ে ওঠে!

সুরের অস্তিত্বের ভেতরে ঢুকছেন অনুপম। বিপর্যস্ত বাক্যরাশি ক্রমবিলীন বলে ঘোষণা করছেন। কিন্তু তারা রূপান্তরিত হচ্ছে মলিন ফলের ভেতর প্রতিসরিত হয়ে। সুরেই বিশ্বসৃজন—

দিগন্ত। মৃত সে ঘোড়ার ক্ষুরে চিরে যাওয়া, এক
সুর।


এলানো ওই লহরীর পাতে, ছিটানো সুরের বেদনাটুকু একটু একটু করে যেন সে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়।
প্রপাতের ডাল জুড়ে শুধু ভরে থাকে তার রূপের নির্মাণ।

দৃশ্যাবলি একে অন্যকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে যায়, নস্যাৎ করে, কিংবা নিজেরাই বিলীন হয়—এসব সত্যের মাঝেই জগৎ নিজেকে প্রকাশ করে, আমাদের সাথে খেলা করে, মৃদু হাসে।

হালকা হিমের মতোই শান্ত
মূঢ় ওই নাভি
ঢেকে রাখে আধো খসা তার রাগ
অঝোর জবার তরঙ্গ


শিল্পীর মাধ্যমটি তার সাথে সহবাসে যেভাবে শ্বাস ফেলে তাই তার কারুময়তা। অনুপমের কাব্যে বাস্তবগুলো কোমল হয়ে ধরা দেয়।


অনুপম সেই সত্যকে ধরতে পেরেছেন। তিনি আধুনিক নন বলেই যন্ত্রনায় ধরেন নি এই সত্যকে, বেদনায় ধরেছেন। আমি তার এই প্রত্যয়কে মূল্যবান ভাবি। পরমের দিকে যাত্রার ভাষ্যকে ভিন্ন জগতের মাঝ দিয়ে শূন্যের দশক যেভাবে ধরতে চেয়েছে অনুপম সেই পথের সারথি বটেন—

আর ভাস্বর সে ধাতুর আয়তন নড়ছে
একা একাই; হয়তো তারার দিকে; অন্ধকারে

দহনমাত্রায় সুফি আধ্যাত্মিকতাকে সুরে বাঁধেন অনুপম—

গভীর হয়ে ওঠে, ওই পিপাসাপ্রহার।

তিনি শোনেন অপাঠ্য গুঞ্জন; যেনবা মনসুর আল হাল্লাজের কিংবা শামস-ই-তাবরিজ বা রিলকের অনির্বচনের বাণী এই। এল ধ্যানের ছবি—

নিদ্রাভর্তি ওই কাঠবাদামের ওপর দিয়ে যেতে যেতে ঘন হয়ে আসে কোন ঘন্টাধ্বনি

পরমের তীরে বেদনার আরতি—

মৃদু কোনো প্রভা
পৌঁছাতে চাইছে
ধ্বনিময়
কোনো ক্রন্দনের নিকটে

বহমান ঘটনাপুঞ্জের গভীরে, ঘটনাপুঞ্জ ঘিরে থাকা রহস্য ও সৌন্দর্য, যার গতি আমাদের ছাঁচে অধরাই থেকে যেতে চায় তার রূপ দেখি—

থেমে যায় অস্ফুট বিভার দিকে কোনো অস্তরাগ

জীবনের স্পন্দমানতার পাশেই প্রতি পলে চুপ করে থাকা মৃত্যু ছাড়াও মানুষ বলেই মৃত্যু-অতিক্রান্ত সুন্দর জেগে থাকে সঙ্গমের পাশে—

রূপের ছাল ছাড়িয়ে জেগে থাকে
কোনো নির্ভার লুব্ধতা
আর
তার অশ্রুর অন্বয় থেকে
ওই আলোকপরিধির দিকে সরে যায় কেউ


মৃতের শত শত মৌন আর্তিগুলি ভেসে আসে
বহু ভাঙা কবর খুঁড়ে
ওই সবুজ আপেলটিই কেবল দুলতে খাকে
দুলতে খাকে
অচিহ্নিত কোনো উপকূলে

বহু আগে লেখা এক প্রবন্ধে বলেছিলাম শিল্পীর মাধ্যমটি তার সাথে সহবাসে যেভাবে শ্বাস ফেলে তাই তার কারুময়তা। অনুপমের কাব্যে বাস্তবগুলো কোমল হয়ে ধরা দেয়। অনুবাস্তবের অসামান্য রূপায়ণ দেখি অনুপমের হাতে; আভাকাণ্ড প্রপঞ্চটি লক্ষণীয়—

ওই দাস নিরুত্তর তার জিহ্বার শোষণ ফেলে চাপা দিয়ে রাখে আভাকাণ্ড

এদুয়ার্দো চিয়িদার মতো ভাষ্করপ্রতিমতাও দেখেছি আমরা অনুপমে—

কোনো ঋজুভঙ্গি জবার মতোই ঝুলন্ত ওই আয়তন

হয়তো সে লৌহের বিভাষা; দোলে; নিদ্রার সুস্থির নিস্তব্ধতায়

13446120_1123404724349614_346632613_o
প্রকাশন : চৈতন্য ।।  প্রচ্ছদ : রাজীব দত্ত

মহাবৈশ্বিকতা, অনুবিশ্বের অন্তরের আঁধারে জ্বলা নক্ষত্রের নির্মাণ, সমান্তরাল বাস্তব—এসবের বাইরেও অনুপমের শিল্পিতার মহাকাব্যিক জগৎ বহু রত্নে ভরা। শূন্যের কয়েকজন অগ্রজের জগদভাষ্যের ছায়াসূত্রে তিনি এগিয়েছেন, এবং ক্রমেই প্রাতিস্বিকতার দিকে দৃঢ় পায়ে হাঁটছেন। নিজের রত্নগুলো তিনি চেনেন নিজেরই মতো, তা থেকে আলোক আহরণে তার আয়াস সাধুবাদ পাবে পাঠকের কাছে। তার সময়ে অনুপম নিঃসন্দেহে অগ্রণী। আমাদের কবিতায় বেদনাকে ফলিয়ে তোলা ও পরমের ধ্যান নিয়ে কাজ করার প্রত্যয় অনুপমকে বহুদূর নেবে বলে আমার বিশ্বাস। বলে রাখি, উনি কবিতার অন্তরমহলের বাসিন্দা। মুখ বুজে সুর নেন, বাণী দেন মোহময়।

তানভীর মাহমুদ

তানভীর মাহমুদ

জন্ম ৯ অক্টোবর, ১৯৮০, ঢাকা। ইংরেজিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। এমবিএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। অপরাধতত্ত্ব ও বিচার-এ এমএসএস।
পেশা : চাকরি।

প্রকাশিত বই : প্রতিবিহার (কবিতা)

ই-মেইল : editor.hansadhani@gmail.com
তানভীর মাহমুদ