হোম বই নিয়ে অতি ছোট ‘ছোটগল্পের’ বই : ক-এ কবিতা গ-এ গল্প

অতি ছোট ‘ছোটগল্পের’ বই : ক-এ কবিতা গ-এ গল্প

অতি ছোট ‘ছোটগল্পের’ বই : ক-এ কবিতা গ-এ গল্প
850
0

নিজেদের লেখা ছোটগল্প আন্তর্জাতিক মান ছুঁয়েছে বা ছুঁতে পারত—রবীন্দ্রনাথের পরে এ ধরনের চ্যালেঞ্জ বাংলা ছোটগল্পের জগতে বহুকাল দেখা যায় নি। অন্তত কোনো প্রবীণ বা তরুণ লেখককে বাগাড়ম্বর ছাড়া এরকম সাহস করতে দেখা যায় নি। তবে এ-সময়ের তরুণ শক্তিমান কথাশিল্পী শাহ মোহাম্মদ আলম এই যাত্রায় একটি প্রচ্ছন্ন গতিপথ খুঁজে পেয়েছেন বলেই মনে হয়। তার ক-এ কবিতা গ-এ গল্প বাংলা ছোটগল্পকে একটি টার্নিং পয়েন্টের মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছে—এ ধারণাটি করতেই হচ্ছে। যদিও বইয়ের ৩৩টি গল্পেই একই মানের ধারবাহিকতা রক্ষিত হয় নি।


এই গল্পগুলো মনুষ্য-অভিজ্ঞতার সেই ভ্রমণকে প্রতীকে, সংকেতে, ব্যাপ্তিতে, নাটকীয়তায় ভিন্ন ভিন্ন চেহারায় প্রকাশিত করেছে।


এখানে কোনো হঠকারী কথা বলা হয় নি। এজন্য তেড়েফুঁড়ে গোল বাধাতে আসারও কারো দরকার নাই। বইটির আদ্যোপান্ত পাঠ সকলের জন্যই এতদিনকার প্রচলিত অভিজ্ঞতার বাইরের ঘটনা। নামের মধ্যে একটা ধোঁয়াশার আঙ্গিক। লেখার মধ্যেও তাই। গল্পের জন্য ব্যবহৃত ভাষাভঙ্গি, কাহিনির বুনন, চিত্রকল্প এবং কাব্যময়তা নিয়তির দিকে বা পরিণতির দিকে তীব্রগতিতে অমোঘ টান দিয়ে রেখেছে। টেনশন-উৎকণ্ঠার এই গতির বিছানায় নিরুপায় ভেসে যাওয়া ছাড়া যিনি গল্পটি পাঠ করেন তার গত্যন্তর থাকে না। উপসংহারে এসে উৎকণ্ঠাগুলোয় লম্বা শ্বাস ফেলে মুক্তির উপলক্ষ জোটে। অবসন্নতায় স্বস্তি আসে। এগুলো আসলে কী—গল্পবিহীন গল্প, গল্পমুখী কবিতা, অনবদ্য কবিতা-কলা, কবিতা-গল্প না কাব্যগল্প? কী বলা যায় এগুলোকে? উপায় নেই, এগুলোকে গল্পই বলতে হবে, তবে একটু ভিন্ন ধরনের, প্রথাবিরোধী গল্প।

আমরা দেখে এসেছি এ যাবৎ চর্চিত প্রথাসিদ্ধ বাংলা ছোটগল্পগুলো একটা লেভেলে রয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠানের খপ্পরে পড়ে আর বেরুতে পারছে না। গল্পের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত গড্ডল-চর্চা। যে কারণে সাধারণ এবং বিশেষ উভয় ধরনের পাঠকই ছোটগল্পের একটাই শেখানো সংজ্ঞা ‘হইয়াও হইল না শেষ’-এর কথা বলেন। এটা আমরা আমাদের বুঝতে শেখার কাল থেকেইে শুনে আসছি। এর সাথে চিন্তা-পদ্ধতির নতুনত্ব যুক্ত হয়ে সংজ্ঞার মূলার্থকে ভিন্ন মাত্রা দিতে পারে, এটি কিছুদিন আগেও সেইভাবে অনুভূত হয় নি। এজন্য শিল্প-সাহিত্যের ইতিহাসকে অনেক দাম দিয়েই প্রমাণ করতে হয়েছে—নতুন কোনো কিছুই পূর্ববর্তী ভিত্তি ছাড়া তৈরি হতে পারে না। এখানেও হয় নি। এখানের গল্পগুলোতে মূলচরিত্র থাকে একজন ‘আমি’—যার ভাবনায় সব কিছু বর্ণনা হতে থাকে।

একজন ‘আমি’র অভিজ্ঞতা তৈরি করে দেয় পেছনের শতকোটি আমি’র হাজার বছরের অভিজ্ঞতা-সংস্কার-হাসি-কান্নার কেমিস্ট্রি। ছোটগল্পকার শাহ মোহাম্মদ আলম এই কাজগুলোই করেছেন তার তৈরি ছোটগল্পের ভুবন জুড়ে। এসব করতে গিয়ে প্রথাবিরোধী ও নিরীক্ষা-চেতনায় অতি সংবেদনশীল কারুকাজ অনায়াসে নিজের মতো করে ব্যবহার করেছেন। আমাদের ছোটগল্পের ভুবনে এই কাজগুলো ভিন্নমাত্রার হিশাবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। উঁচুদরের পাঠক যারা তারাও অনেকগুলো চিন্তার খোরাক পাবেন এ থেকে। ভাষার কাব্যিকতা, চিত্রকল্পের মনছোঁয়া স্পন্দন, স্রোতের মতো আবেগের তীব্র টান আর মনোলোকের ভাবনার বিদ্যুৎগতি প্রবাহ—যে আবেশটি পাঠক মনে তৈরি করে দেবে তার তুলনা কম। মন তৈরি করেই এই গল্পগুলি পড়া বাঞ্ছনীয়, তা না-হলে লেখক-পাঠকের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে পারে। এটা ঘটলে উভয়পক্ষের মধ্যেই ক্ষতির কারণ হবে।

ক-এ কবিতা গ-এ গল্প-তে যে কাব্য-গল্পগুলি রয়েছে তাতে মানবীয় সত্তার ক্ষত-বিক্ষত উপস্থিতি ও রূপান্তর, ব্যক্তির আর্তি, নিঃসঙ্গতা, ক্ষরণ, দারিদ্র্য, লাম্পট্য অবিকল মানুষের চলমান অভিজ্ঞতাগুলোর মতো। বাস্তব-পরাবাস্তব, ফিকশন-ফ্যান্টাসির ঘোর মানুষকে যেখানে যেখানে যেভাবে নিয়ে যেতে পারে—এই গল্পগুলো মনুষ্য-অভিজ্ঞতার সেই ভ্রমণকে প্রতীকে, সংকেতে, ব্যাপ্তিতে, নাটকীয়তায় ভিন্ন ভিন্ন চেহারায় প্রকাশিত করেছে। এই গল্পগুলো ভিন্ন চেহারা নিয়ে পাঠ-অন্তে সবাইকে ডুব-ভাবনায় বসিয়ে দেয়। জীবন তো জীবনকে জয় করার জন্যই। লেখকরা মানুষকে হতাশা, ক্লান্তি, বিতৃষ্ণা তাড়িয়ে জীবনকে চিনতে উদ্দীপ্ত করে। জীবনে জয়ী হওয়ার জন্য সংগ্রামের বিকল্প নেই—এই সংগ্রাম মনুষ্য-প্রবৃত্তির ভেতরেই অন্তর্লীন স্রোত হয়ে বহমান থাকে।

এই প্রেক্ষিতে মোপাসা, চেখভ এবং রবীন্দ্রনাথ ছোটগল্পকে নিজ নিজ বিশিষ্টতায় কালোত্তীর্ণ রূপ দিয়েছেন। তারা ছোটগল্পের ক্ষেত্রে যে মাত্রা তৈরি করেছেন তাতে তাদেরকে অন্যদের পক্ষে অতিক্রম করা দুঃসাধ্য, তবে অসম্ভব নয়। হেমিংওয়েকেও তো ভুলবার উপায় নেই। আর কাফকার যন্ত্রণার যুগ-জ্বর বরং আরো গভীরভাবে চেপে বসে। কথাশিল্পী শাহ মোহাম্মদ আলম ক-এ কবিতা গ-এ গল্প-র সবকিছু নিয়েই তার যাত্রারম্ভের শুরুতেই একটি উচ্চতায় জায়গা করে নিয়েছেন। একটি প্রতীকী ডায়ালগের মধ্যে সেঁধিয়ে দিয়ে যদি বলি, তাহলে বলা যায় তার গল্পগুলো সমকালকে স্পর্শ করেছে বা করতে পারত। এটি মনুষ্যভাবনা, সমাজ, প্রকৃতি ও রীতিনীতির চিরায়ত রূপকে আত্মস্থ করে একটি ধ্রুপদি ভাবনার বিন্যাস তৈরি করেছে। শাহ মোহাম্মদ আলম গল্পগুলো যখনই লিখুন না কেন ২০১০-এ ফেব্রুয়ারির বইমেলায় বইটি প্রথম আসে। বইয়ের নাম ক-এ কবিতা গ-এ গল্প


গল্পগুলোর মূলশক্তি ও তাৎপর্য হলো, স্বল্পায়তনে অসাধারণ নৈপুণ্যে শব্দের পর শব্দ গেঁথে যে কাহিনির সূত্রপাত ঘটে অবশেষে তা হয়ে দাঁড়ায় মনস্তত্ত্বের গূঢ় অন্তঃদর্শন বিশ্লেষণ


প্রকাশ করেছে ছোটকাগজ প্রকাশনা ‘উলুখড়’। উলুখড়-এর পক্ষ থেকে ব্যাকপেজে জিয়াউল আহসান ক-এ কবিতা  গ-এ গল্প প্রসঙ্গে কিছু বিবেচনা তুলে ধরেছেন। তার কথাগুলো এ ধরনের গল্প অনুভবের জন্য একটা পাঠ-সংকেত হতে পারে। প্রচলিত ধরনের গল্পের বাইরে ভিন্ন মেজাজের এই গল্পগুলো বুঝতে হলে পেছনের বহু বছরের অসংখ্য গল্পকারের নিষ্ঠাপূর্ণ শ্রমকে সম্মান করেই এগোতে হবে।

‘‘গল্পের গল্প থাকে। এইসব গল্পের নেপথ্য অনুকথনের সূক্ষ্মদর্শী বিশ্লেষণ তথা মেদশূন্য সংবদ্ধ ভাব-ভাষাভঙ্গীর প্রকাশ-প্রয়াস কুশলতায় সার্বজনীন অন্তঃপ্রতিকৃতির অনবদ্য গদ্যচিত্র  ক-এ কবিতা গ-এ গল্প। গল্পগুলোর বেশ কয়েকটির ছায়া-সাযুজ্য পাওয়া যায় প্যারাবলের সাথে। প্যারাবল ‘কল্পনা ও কবিত্ব’ শক্তিসমৃদ্ধ অনবদ্য গদ্যশৈলীনির্ভর সংশ্লেষাত্মক কাহিনি এবং অতিসীমিত প্রেক্ষিতে তীক্ষ্ণ অনুরণন। যৌক্তিক কারণেই এ গল্পগুলো সে বিবেচনায় বিচার করা যেতে পারে। শাহ মোহাম্মদ আলমের গদ্য স্থান-কাল-পাত্রের সীমারেখা অস্বীকার করে যে ভিন্নধর্মী গল্পশৈলীর আবেদন তৈরি করে—ব্যক্তিক আবেগ-অনুভূতি-উপলদ্ধি যেন তাতে সবিশেষে মূর্ত হয়ে ওঠে।

গল্পগুলোর মূলশক্তি ও তাৎপর্য হলো, স্বল্পায়তনে অসাধারণ নৈপুণ্যে শব্দের পর শব্দ গেঁথে যে কাহিনির সূত্রপাত ঘটে অবশেষে তা হয়ে দাঁড়ায় মনস্তত্ত্বের গূঢ় অন্তঃদর্শন বিশ্লেষণ। বাংলা ছোটগল্পের ইতিহাসে মনস্তত্ত্বের পারম্পর্য নির্ভর ও পরস্পর সম্বন্ধযুক্ত জটিল উপাদান, উপ-উপাদান, সহ-উপাদান নির্ভর গল্পের সংখ্যা অনুল্লেখযোগ্য। ক-এ কবিতা গ-এ গল্প-র গল্পগুলোর মানসিক ও মানবিক উপাদানের মনস্তাত্ত্বিক ও জাগতিক বিশ্লেষণের সাদৃশ্য মেলে বিগত শতকের ত্রিশ দশক পর্যন্ত—খানিকটা বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, শরৎ-এ; ত্রিশ পরবর্তী অনেকটা বুদ্ধদেব, সোমেন, জীবনানন্দ, কমলকুমার এবং ষাট সত্তর আশি ও নব্বই দশক মিলিয়ে হাসান আজিজুল হক, শাহেদ আলী, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ এবং আখতারুজ্জামান ইলিয়াস প্রমুখের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক-ব্যক্তিক অনুভূতি-উপলদ্ধির শৈল্পিক ক্যানভাসে। এ অর্থে গল্পগুলো সমসাময়িক তো বটেই বাংলা ছোটগল্পের একশ বছরের ইতিহাসে সবল ঋদ্ধ উত্তরসূরি।’’

নিভৃতের এই কথাশিল্পী আগাগোড়া লিটলম্যাগে লিখেছেন, লিটলম্যাগের সংগঠক, লিটলম্যাগ প্রকাশনায় নিরলস শ্রমে-ঘামে দিনপাত করেছেন। তার এই গল্পের বইটি অপ্রচারিত এবং অনালোচিত। আমিও দেরিতে পড়েছি বলে একটু অপরাধবোধ রয়ে গেছে। নিচে ৪টি গল্প তুলে ধরা হয়েছে। পাঠকরা আশা করি পড়ে আনন্দ পাবেন।

 

গল্প
প্যাঁচাকহিনি

প্যাঁচা আমি খুব শ্রদ্ধা করি। প্রতিনিয়ত আমি প্যাঁচা দেখি আর তার জ্ঞান আহরণ করে আরোহিত হই আরো শীর্ষে। তার সাথে আমি  অনেক কিছু শেয়ার করি কোনো প্রত্যুত্তর আসবে না জেনেই। তাদের এই মুডটাই আমার বড় বেশি ভালো লাগে। আমার বা আমাদের কারো কারো সুখ-দুঃখের গল্প শুনতে শুনতে দিব্যি সে শরীর চুলকায়। তারপর আবার সেই ধ্যানাবস্থা। তখন তার মুখভঙ্গি আমার কী যে ভালো লাগে—এ কথা শুনে আমাদের পণ্ডিত মশাই আমাকে ক্লাশচ্যুত করেছিলেন একবার! অতঃপর পরীক্ষায় আমি শূন্য অর্জন করি, ‘আমার জীবনের লক্ষ্য প্যাঁচার সখ্যতা অর্জন’ লিখে খাতা ভর্তি করার অপরাধে! আমি দিনে দিনে এতটা অবাধ্য-দুর্বোধ্য হয়ে উঠছিলাম যে, সবকিছুকে থোড়াই কেয়ার।


অনেক সাধ্যসাধনার পর একদিন মুখ ফসকে বলে ফেলল—শিকার-কৌশল দেখতে নেই।


এখন শুধু তার শিকার পর্ব দেখার অপেক্ষা। সে যেহেতু কোনো কিছু শেয়ার করে না তাই জানাও হয় না—শিকার-কাল আর শিকার-কৌশল। এই একটা কাজে আমি লেগেই আছি ক্লান্তিহীন। আমি তার জন্য সুদৃশ্য গৃহনির্মাণ করলাম; সম্মোহিত হয়ে ঝুলিয়ে রাখলাম আহার, নিকটবর্তী দূরত্বে। আমার বেহায়াপনা দিয়ে আমি আস্তে আস্তে প্যাঁচার মুডের কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম। শিখতে লাগলাম তার শরীরভাষা।

অনেক সাধ্যসাধনার পর একদিন মুখ ফসকে বলে ফেলল—শিকার-কৌশল দেখতে নেই। তবে তোমাকে দেখাব যেহেতু তোমার নিজেরই জানা নেই শিকার-কৌশল। মূলত তোমার মতো প্রাণীসকলকেই আমি শিকার করি। কাউকে চিবিয়ে খাই আর কাউকে খাই চুষে চুষে এবং অবশিষ্টাংশকে লাকড়ি বানিয়ে খাসির পায়া রান্না করি। জানো তো খাসির পায়া আমাদের পদযুগলের শক্তি ও সৌন্দর্য বাড়ায়।


গল্প

এক
শালিক দুই শালিক

মানুষের সঙ্গবিলাসী ছিলাম না। তবু মানুষের কাছেই জানতে চাই ঘর-জানালার সন্ধান। বাধ্য হয়ে যাদের সাথে মেলামেশা করি, অপরিহার্যতা বুঝিয়ে শেষে নির্জনতার সাথে প্রেম করি। তবে যখন যাকে ভালো লাগত তার কাছে যেতাম। পরবর্তীতে ভালোলাগা-মন্দলাগা নিয়ে কখনোই আর ও-মুখ হতাম না।

কিন্তু এর মধ্যে একজন ধুলাবরণ সরিয়ে আমাকে জাগিয়ে তুলল। তাকে আমি আগে থেকেই কিঞ্চিৎ পছন্দ করতাম। মনে আছে একবার পুরোটা শেষ করতে না পেরে তার সাথে শেয়ার করেছিলাম হাভানা চুরুট। সাধারণত তিনি চিলেকোঠায় থাকতেন। আমার মতো এড়িয়ে চলতেন কোলাহল। আমরা চাই বা না চাই আমাদের দেখা হয়েই যেত। যে কারণে কেউ কাউকে এড়াতে পারতাম না বা এড়াতে চাইতাম না। একদিন শ্মশানের কয়লা দিয়ে সিগারেট ধরাতে ধরাতে আমার কাছে আশ্রয় চাইলেন—আমরা দু’জনই যেহেতু কম কথা বলি—সুবিধাই হবে। আমি সাধারণত শয্যা ঋণ দেই না। দুর্বোধ্য শতরঞ্চি দেখিয়ে বললাম—নিরামিষাশী, চলবে? এখানে অনিয়মই নিয়ম—সবকিছুতেই ঈর্ষাযোগ্য বিনয়সহ আপত্তি। তারপর থেকে ক্রমশ তিনি আমার এতটা প্রিয় হয়ে উঠলেন যে আমি হারালাম উভয়কূল—মাতৃকূল-পিতৃকূল।

সবকিছু ফেলে আমি শুধু তাকে দেখি আর শিখি। একসময় বা কখন থেকে যে তার থলে বইতে শুরু করলাম তাও মনে নেই। শুধু তার বিনয়ের সাথে অ্যাডজাস্ট করতে পারতাম না। শেষ পর্যন্ত আমি আর আমি না থেকে তিনিতে পরিণত হলাম; তিনি যখন জেগে ঘুমান আমিও জেগে ঘুমাই। তিনি যখন ধ্যানমগ্ন, আমিও। তিনি যখন তার খাদ্যভাগ আমাকে তুলে দেন, আমিও তুলে দেই। যে কারণে আমরা কখনো অনাহারে থাকি না। শুধু আমরা কথা যত পারি কম বলি।


মুখাবয়ব ভর্তি চোখ—অন্ধকারে কে দিয়েছে এতটা আলোঋণ?


কিন্তু একদিন আমি তাকে অমান্যই করলাম। ততদিনে আমরা উভয় উভয়ের গুরু-শিষ্য। তিনি আমাকে ইশারা করলেন, আমি সাড়া দিলাম না। আমি জানতাম মৃত্যুর ছয় ঘণ্টা পরও বেঁচে থাকে চক্ষুযুগল। ইশারা অবজ্ঞা করে দেখি কোনো ফাঁকে আমার আগেই বাড়ি ফিরে শতরঞ্চিতে সটান। মুখাবয়ব ভর্তি চোখ—অন্ধকারে কে দিয়েছে এতটা আলোঋণ? আমার কিছুটা অপরাধবোধ হলো কিন্তু আমি তার পা-ই খুঁজে পেলাম না। নিশ্চুপ বসে থাকতে থাকতে একসময় দেখলাম। একে একে নিভে আসছে সব চোখ—নিশ্চিত হলাম।

একদিন রাতদুপুরে দড়ি পাকাতে বললেন। দড়ি পাকাতে পাকাতে ভোর হলো। আমি কিন্তু দড়িতে রক্ত মাখাতে রাজি না হয়ে আবারো তাকে অমান্য করলাম। যা করার তিনিই করলেন—আমি চিলেকোঠার জানালা দিয়ে শালিক গুনি—এক শালিক দুই শালিক … চলে যাওয়ার সময়ও আমাদের কথা হলো না। জানা ছিল না বলেই ফাঁসের গিঁট খুলতে এত সময় লাগল।

 

গল্প
বাতাসতুম জব্বারে

শৈশবে ঝড়ে বা ঝড়ের সম্ভাবনায় ভয়ে কুঁকড়ে যেতাম। ঘরগুলোর কী যে বশ্যতা বায়ু-পাবনে। আমাদের আর্ত চিৎকার চাপা পড়ে যায় ঝড়বাদ্যের কলকাকলিতে। অনেক টালবাহানার পর যখন সত্যি সত্যি ঝড় নেমে আসত তখন আমার অসহায় জর্জরিত মা কী একটা ‘বাতাসতুম জব্বারে মন্ত্র আওড়াতে বলতেন এবং চৌকির তলদেশে গিয়ে নিতাম গোরের উষ্ণতা।

আমাদের মন্ত্রপাঠে ঝড়ের সাথে বেশ মজার লড়াই জমত। প্রকৃতির নিয়মেই থেমে আসা ঝড়কে মনে হতো মন্ত্রের কারবার। আমরা ছিলাম পিঠাপিঠি অনেক বোন। যে কারণে প্রায়ই আমরা দুধ না পেয়ে লবণমিশ্রিত ভাতের মাড় প্রতিবেশীর হেঁসেলখানা থেকে চুরি করে আনতাম। এই কারণে পরবর্তীতে আমাদের বুদ্ধিশুদ্ধি নিয়ে মা-বাবাকে অনেক বিব্রত হতে দেখেছি। সুদিন ফিরে আসার আগে মা বাবার জায়নামাজের কাছে গিয়ে বলতেন—‘সবকিছুর জন্য আপনি দায়ী। আপনিই ওদের সবচেয়ে বড় সর্বনাশটা করেছেন।’

মায়ের অনেক কষ্ট। ধর্মীয় কেতাব ফেরি করে কতটুকু আর আনা যায় খাদ্য। মাড় যে খাওয়া যায়, এটা আমরা জেনেছিলাম অপেক্ষাকৃত সম্ভাবনাময় ভাই কর্তৃক। হেঁসেলখানার আশপাশ থেকে জননীর নিরন্তর সংগ্রাম দেখতে দেখতে সে প্রায়ই বলত—সংগ্রাম করে হলেও দিন বদলাতে হবে। তারপর থেকেই মূলত আমরা প্রথম শিখলাম মাড়-চুরি। এক ঘরের মাড়ে চলে দুই জোড়। এতগুলো মুখ তাই আমরা ছড়িয়ে পড়ি। মা আমাদের যৎকিঞ্চিৎ ভাত খাইয়ে আড়ালে গিয়ে বেঁচে যাওয়া যৎসামান্য তরকারি গুলিয়ে খেতেন ভাতের জুস।


শেষ পর্যন্ত আমরা ক্ষুধাকে শুধু তাড়ালাম না, জয়ও করলাম।


বাবার ছিল আবার বেহায়ারকম ধৈর্য। শত তির্যক বাণ বুক পেতে নিয়ে শুধু বলতেন আমি সন্তানদের বুদ্ধিমান বানিয়েছি, চতুর নয়। আমরাও বেশ গর্ববোধ করতাম। তিনি বাড়ি ফিরে অরেক দিন খেতে না পেয়ে প্রার্থনায় বসেছেন ক্ষুধা ভুলতে অথবা তাড়াতে।

শেষ পর্যন্ত আমরা ক্ষুধাকে শুধু তাড়ালাম না, জয়ও করলাম। আমরা সবাই দ্রুত বদলে যেতে থাকলাম। কিভাবে যেন অশেষ অর্থ সম্পদের মালিকও বনে গেলাম আমরা। সবাই নিজস্ব তহবিল গণনায় এত ব্যস্ত থাকি যে আমাদের যেদিন দেখা হয় সেদিন হয় বিশেষ দিন। মা অবিকল আগের পোশাকই পরতেন আর এ-বাড়ি ও-বাড়ি ঘুরে থেকে থেকে ক্লান্ত হতেন। কেননা ক’সন্তানকে তারা খুশি করতে পারেন আর এই বয়সে। এটা বুঝতে পেরে আমরা ভাইবোনরা মিলে করেছিলাম সন্ধিচুক্তি।

সেদিন মা-বাবা ছিলেন আমার বাসায়। বৃষ্টির সাথে প্রচণ্ড ঝড়দিনে বাবা-মা প্রাপ্তিতে আমি শৈশবে ফিরে গেলাম। একালের সামর্থ্যে বর্ষার গান ছেড়ে বাবা-মাকে ঝড় দেখাতে বারন্দায় এসে দেখি সেই আগের মতোই মা সেই মন্ত্রটাই জপছেন, অথচ আমাদের কারোরই মনে নেই! এক ফাঁকে বললেন—গান বন্ধ কর। ঝড়ের লগে তামাশা করোছ?

আমি তড়িৎগতিতে শিল্পীর গলা একদম টিপে দিলাম। তারপর বেশ সাহস করে মাকে বললাম—চলেন না বারান্দায় গিয়ে ঝড় দেখতে দেখতে করি যৌথ মন্ত্রপাঠ। প্রার্থনা লুকিয়ে করতে হবে এমন কথা কোথাও যদি লেখা থাকে, সেক্ষেত্রে আমার কিছু করার নেই।

 

গল্প
আয়না
প্রেম

হঠাৎ করে কমে এসেছে আমার আয়নাপ্রেম।

অথচ এই আমি আয়নাকে কী যে ভালোবাসতাম। ভালোবাসার তপ্তশ্বাসে লজ্জায় কখনো কখনো আয়নাকে ঘোলা হতে দেখেছি। তারপর আমি আবার উদ্ধার করে দিয়েছি আয়নারূপ। আজ কোথায় গেল আমার সেই আয়নাপ্রেম?

যেদিন আয়না আবিষ্কার করেছিলাম সে-দিনটা ছিল বৃষ্টিস্নাত। আমি বাতি নিভিয়ে বসে বসে সাহস সঞ্চয় করছিলাম আর ধ্যানস্থ হওয়ার চেষ্টা করছিলাম। সে কারণে খেয়াল করতে পারি নি কখন কে যেন এনে বসিয়ে দিয়ে গেছে। তারপর থেকে শুরু আমার উন্মাতাল আয়নাপ্রেম। এমনকি একদিন হাত রক্তাক্ত করে আয়নাতে এঁকে দিয়েছি সিঁদুর। দীর্ঘদিন নিঃসঙ্গ বোধ করি নি আয়না-ভালোবাসা ছিল বলেই। বগলদাবা করে বেরিয়ে পড়েছি, তার আগে সময়যন্ত্রকে ফেলে এসেছি আঁস্তাকুড়ে।


যদিও আমি ঠিকই লক্ষ করছিলাম ক্রমশ ম্রিয়মাণ রূপ-লাবণ্য।


আমাদের আকর্ষণীয় চুমুদৃশ্য বাঁধাই করে ঝুলিয়ে দিয়েছিলাম। সদর দরজায়। কতদিন বাড়ি ফিরে না খেয়ে শুধু আয়না খেয়েই রাতকে অতিক্রম করে পৌঁছে গেছি প্রভাতে। অথচ এই আয়নার দিকে এখন যদি-বা তাকাই, তাকাই ঘৃণাভরে। অসহ্য লাগে আজকাল আয়নাসঙ্গ। তারপরও বাধ্য হয়ে একই ঘরে ঘুমোতে হয়। এখন আমি আবার চাই নিঃসঙ্গ হতে; হতে একেবারে সঙ্গিহীন।

ইদানীং আমি ফ্যাকাশে সকালে বেরোই আর ফিরি ঘন রাতে। এই দুই সময়েই বাতি নেভানো থাকে বলে দেখতে হয় না আয়নারূপ। কথাবার্তাও হয় না। যদিও আমি ঠিকই লক্ষ করছিলাম ক্রমশ ম্রিয়মাণ রূপ-লাবণ্য। আমিও চাচ্ছিলাম, যে কোনো একদিন ঘরে দেখব—যে-ভবে নিশ্চুপ এসেছিল, চলে গেছে সে-রূপ নিশ্চুপে। আমি আনন্দে চিৎকার ছাড়লাম কিছুটা।

আমি ঠিক বুঝি না কেন এমন হয়। প্রথম প্রথম বেশ উপভোগ করছিলাম। ভালোই চলছিল, যদিও ‘ভালো’ আমার বেশিদিন সহ্য হয় না। কোনো ভালোতেই গড়তে পারি না বসতি। শুধু কানামাছি-কানামাছি খেলা, একবার একে ধরি, আরেকবার অন্যজনকে ছুঁয়ে যাই। ক্লান্তিকর একঘেয়েমি থেকে পালিয়ে বাঁচতে সত্যি আমি আর খুঁজে পাচ্ছিলাম না চোরাপথ। ক্লান্ত আমি ঘুরেফিরে বারবার ফিরে আসি, যেখানে আমি আর সত্যি কোনোদিনই ফিরতে চাইছিলাম না।

এরই মধ্যে হঠাৎ করে আমার মধ্যে আবার জাগতে শুরু করেছে পুরনো আয়নাপ্রেম। ততদিনে আমার জানা হয়েছে উৎস। আয়না-বিরহ আর সইতে না পেরে একদিন আমি ছুটে গেলাম আয়নাবাজারে। চোখ বুজে কেনা আয়না ঘরে এসে প্রথমেই বলল—নিঃসঙ্গতা নিয়ে অহংকারী হতে চেয়েছিলি? আমি উত্তর দিলাম না, শুধু মনে মনে বললাম—আয়না-সব অভিন্ন আত্মা।

Firoz ahmad

শেখ ফিরোজ আহমদ

জন্ম ১ আগস্ট ১৯৬৩, চাঁদপুর।
অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা : উন্নয়নকর্মী।

প্রকাশিত বই :
পাতকীর ছায়া [কবিতা, অন্তরীপ প্রকাশনী, বগুড়া, ১৯৮৭]
কালের পৃষ্ঠায় [প্রবন্ধ, যুক্ত, ঢাকা, ২০০৮]
মাতরিশ্বা [কবিতা, ভাষাচিত্র, ঢাকা, ২০১০]

ই-মেইল : firozbangla@yahoo.com
Firoz ahmad