হোম পুনর্মুদ্রণ গদ্য স্নায়বিক কুয়াশার ভিতরে

স্নায়বিক কুয়াশার ভিতরে

স্নায়বিক কুয়াশার ভিতরে
454
0

রানা যখন রাস্তায় নেমে এল, তখন সন্ধ্যা খানিকটা গাঢ় হয়েছে; পরিচিত অথচ অন্যান্য রঙ সম্পর্কে বিভ্রম-জাগানো আলো জ্বলে উঠেছে, অধিকন্তু সন্ধ্যার আকাশ থেকে যে আলো এসে পড়ে, তাতেই সব রঙ অচেনা হয়ে আসে। আমরা জানি না, সে এখন কী ভাবছে, তবে তার বিষণ্নতা দেখে ধরে নেওয়া যেতে পারে, পৃথিবীতে এমন কিছু রঙ কিংবা আলো আছে, যেগুলোর ধর্মই হচ্ছে আর সব রঙ শুষে নেওয়া, এই গাঢ় সন্ধ্যায় এটা ভেবে তার ভিতরের ফাঁকা জায়গাটা প্রসারিত হচ্ছে না-কি! এখন ঠান্ডা হাওয়া আসছে, এমন একটা জায়গায় সে দাঁড়িয়ে, যেখান থেকে পশ্চিমের আকাশ আড়াল করে রাস্তার দু’পাশ থেকে গাছগুলি সার বেঁধে আছে; আর হাওয়া যেন সেদিকেই যাচ্ছে, কারণ ডালগুলি নড়ছিল, তাতে পাতা ঝরছিল মন্থরভাবে, যেন এই পতনে তাদের আপত্তি ছিল। একটা অ্যাম্বুলেন্স এই আপত্তি ভেদ করে দ্রুত চলে গেল ওঠানামাময় টানা শব্দ ছড়িয়ে, রানা সেদিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ, তারপর হাঁটতে লাগল।


লাল শাড়ি ছেড়ে স্ত্রী ডলি প্রথম যে রাতে হালকা গোলাপি নাইটি পরে শুয়েছিল তার পাশে, নীল আলো আর মৃদু সানাইয়ের মধ্যে ভেসে যাওয়া সেই রাতে রানা বুঝতে পেরেছিল, গন্ধটার একটা রঙ আছে, সেটি সম্ভবত বেগুনি


আমরা এখন ভাবছি যে, সে বাসায় ফিরে যাচ্ছে হেঁটেই, কারণ এটা আমাদের জানা বা ধারণা থাকার কথা, তার কোনো তাড়া নেই, ফিরে যাওয়া ছাড়া, বা, কোথাও সে ফিরছে না কিংবা যায় নি কোথাও—কেননা কোথাও যেতে চায় নি সে, কেবল একটা গন্ধের ভিতরে ঢুকতে চেয়েছিল, সেই গন্ধের নাম তার জানা ছিল না, পরিচয়টাও স্পষ্ট ছিল না, তাকে চিনতে গিয়ে সে ঢুকে গিয়েছিল রঙের ভিতরে—তার এইটুকু সামর্থ্য ছিল অথবা ছিল না, বা, সে ভাবতে পারত, যেখানে প্রবেশ করতে চেযেছিল, সে-জায়গা পৃথিবীতে তার জন্য সৃষ্টিই হয় নি। আজ হাঁটতে হাঁটতে এটা সে ভাবতে পারে, আমরা তাকে সেই অনুরোধটা করতে পারি কি? না, পারি না, তাকে অনেক বোঝানো হয়েছে, নিকটজনরা এটা করে, যেমন এই আচ্ছন্নতা থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য তাকে বিয়ে করানো হয়েছিল, সেও করেছিল এই আশায় যে—কোনো একদিন ওই গন্ধের খোঁজ পেয়ে যাবে; লাল শাড়ি ছেড়ে স্ত্রী ডলি প্রথম যে রাতে হালকা গোলাপি নাইটি পরে শুয়েছিল তার পাশে, নীল আলো আর মৃদু সানাইয়ের মধ্যে ভেসে যাওয়া সেই রাতে রানা বুঝতে পেরেছিল, গন্ধটার একটা রঙ আছে, সেটি সম্ভবত বেগুনি এবং এটা এখানে নেই; কেবল স্ত্রীর গায়ের গন্ধ, পারফিউম. নীল আলোয় সাদা হয়ে ওঠা নাইটির রঙ মিশে একটা অদ্ভুত, অচেনা ও অপ্রীতিকর গন্ধ এখানে তৈরি হয়েছে; তবু তার শরীর প্রাণপণ শুঁকে শুঁকে সেই গন্ধ চোখ বন্ধ করে খুঁজতে থাকে সে, দেখে, পাইকপাড়ার বশিরউদ্দিন স্কুলের গলির মাথা অতিক্রম করা মাত্র এক নারীর শরীর থেকে সুখকর, তীব্র কিন্তু নরম ও নেশা-ধরানো গন্ধ এসে তাকে কুয়াশার ভিতর টেনে নিয়ে যাচ্ছে, প্রথমে তার পিছু পিছু এবং পরে পাশাপাশি সে হাঁটতে থাকলে ক্ষণিকের জন্য সেই নারী রানার দিকে তাকানোর পর সে তাকে প্রশ্ন করে, ‘ক’টা বাজে?’ নারীকণ্ঠ থেকে শুনতে পায়, ‘সাড়ে সাতটা।’ রানা হাঁটতে থাকে, গলি শেষ হয়ে আসে, বিশ্ববিদ্যালয়ের লাল বাসটিও তখন এসে পড়লে সে তাতে উঠে পড়ে আর দরজার হ্যান্ডেল ধরে অপস্রিয়মাণ সেই নারীর দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে থাকে; তখন শায়িত স্ত্রীর তলপেট পার হয়ে রানার ঘ্রাণেন্দ্রিয় স্তনের দিকে যায় আর দেখে, পরের দিন সে আবার একই সময়ে গলির মাথায় দাঁড়ায় এবং সেই নারীকে আসতে দেখে। তারা পাশাপাশি হাঁটে, কথা বলে, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস সেদিন তাকে অতিক্রম করে চলে যায়। তারা নীল বডি ও হলুদ ছাদের একটা মিনিবাসে উঠে পাশাপাশি বসে, দু’চারটি কথা ও দীর্ঘ নীরবতার পর শাহবাগে নেমে যাওয়ার মুহূর্তে নারী বলে, ‘নেমে যাবেন? প্রতিদিন আমি মতিঝিলে যাই, আপনাকে কোথায় খুঁজবো?’ খুব উদ্বিগ্ন ও দুঃখিত স্বর, কিন্তু রানার তো সময় নেই, আর তার শরীরে সেই গন্ধও তো ছিল না যে সকালের ক্লাস বাদ দিয়ে পৃথিবীতে যতক্ষণ তাকে পাওয়া যায়, ততক্ষণ তার সঙ্গে থাকবে! অধিকন্তু স্ত্রীর স্তনের মাঝখানে মুখ ঘষতে ঘষতে তার মনে পড়ে, সেদিন সেই নারী বেগুনি কার্ডিগান পরে নি, প্রথম বারের মতো রানা সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে, ওই গন্ধের রঙ বেগুনি, সে টের পায় যে-শরীরে নাক ঘষে একটা গন্ধ খুঁজে বেড়াচ্ছে, তা বেগুনি রঙের একটা ড্রামে এক লক্ষ বছর ডুবিয়ে রাখলেও সেই গন্ধ পাওয়া যাবে না; সার্কাসের ডলফিন যেমন জল থেকে হঠাৎ কিন্তু পূর্বনির্ধারিতভাবে মাথা তোলে, তেমনি ডলির শরীর থেকে সে মুখ তুলে বসে এবং সরে যায়; সেবলে, ‘কী হলো? কোনো সমস্যা?’ রানা কিছু বলেছিল কি?

হলিফ্যামিলির রাস্তাটা ফাঁকা, যেন তার শূন্যতাকে সমর্থন করে নিজের নির্জন বুক মেলে ধরেছে, সে হাঁটতে থাকে। আর কোনোদিন সেই নারীকে দেখে নি, কারণ, পরের মাসেই তাকে পাইকপাড়া থেকে তালতলায় চলে আসতে হয়; সে ভুলেই গিয়েছিল; হঠাৎ এক শীতের কুয়াশাময় সকালে উত্তর দিক থেকে বেগুনি শাড়ি পরা এক নারীকে তালতলা বাসস্ট্যান্ডে হেঁটে আসতে দেখে, এবং হাওয়ায় একটা গন্ধ টের পায়, বেশিক্ষণ তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না, সেই নারী তাকে অতিক্রমকরার সময় তার মনে হয় স্ট্রবেরির নির্যাসের মধ্যে রাতভর ডুবে না থাকলে এমন গন্ধ সকালে কারও শরীর থেকে ছড়িয়ে পড়া সম্ভব নয়; কিন্তু সে বুঝতে পারে না, এটা কি তাই, যা ন’বছর আগে তার স্নায়ুর ভিতরে একবার ঢুকে বেরিয়ে গিয়েছিল, অথবা ঢুকে যাওয়ার পর কর্টেক্সের খুব সূক্ষ্ম এক কোণে লুকিয়ে আছে আজও, বা, নেই; ‘তবু খুঁজে দেখি, যদি পেয়ে যাই’ ধরনের আশা ও দেহভাষা নিয়ে সেই নারীর পাশাপাশি হাঁটতে থাকলে তার সন্দিগ্ধ চাউনি সে লক্ষ করে; রানা পিছিয়ে যায় কিন্তু হাঁটা থামায় না; যদিও হলিফ্যামিলির রাস্তার মাঝামাঝি এসে সিগারেট ধরানোর জন্য তাকে কিছুক্ষণ দাঁড়াতে হয়, লাইটারের আগুন উঁচু হয়ে উঠলে রাতটির কথা ফের তার মনে পড়ে; খাট থেকে নেমে সে জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢালে, তখন ডলি বলে, ‘কী হইছে! শরীর খারাপ? ঠিকাছে, শুয়ে পড়ো।’ তিন ঢোক পানি খেয়ে রানা সরলরেখায় শুয়ে পড়ে, তখন ডলি তার মাথায় হাত বোলাতে থাকলে সে চোখ বন্ধ করে পরের সকালের কুয়াশায় ঢুকে যায়, সেই নারীর পাশাপাশি হাঁটা শুরু হয়; কিন্তু দশ-বারো পা এগুতেই সে থেমে পড়ে, রানাও থামে, শোনে,
‘আপনি আমাকে ফলো করছেন কেন?’
সে বলে, ‘কই, না তো!’
‘গতকাল আপনাকে আমি দেখছি। অনেকক্ষণ আপনি আমার সঙ্গে হাঁটছেন।’
‘সঙ্গে হাঁটা আর ফলো করা এক জিনিস না।’
‘না। আপনি এটা করবেন না।’
‘এই রিকোয়েস্ট আমাকে করবেন না। প্লিজ। আমার কোনো বাজে উদ্দেশ্য নাই। আপনি জাস্ট কিছুক্ষণ আপনার সঙ্গে আমাকে হাঁটতে দেন। প্লিজ।’
‘কেন?’
‘পরে বলবো। অবশ্যই বলবো। কী, দাঁড়িয়ে আছেন কেন, হাঁটেন। আপনাকে কাজে যেতে হবে না?’


টয়লেট থেকে বের হয়ে স্ত্রী বলে, ‘তুমি অসুস্থ, বিয়ের আগে তোমার বোঝা উচিত ছিল’


রানা এখন ডলির পাশে শায়িত অবস্থায় হাঁটছে, হলিফ্যামিলির রাস্তায়, ফুটপাতের কিনার দিয়ে হাঁটছে, এমনকি, সে হাঁটছে সেই নারীর সঙ্গে, এইমাত্র স্মৃতির ভিতরে যে তার মুখোমুখি, তারপর পাশাপাশি, যত দূর যেতে পারে, তার কোনো তাড়া নেই, থাকার কথা নয়। সিগারেটের ধোঁয়া উড়ে মিশে যাচ্ছে হাওয়ায়, একটা পাতা তার কাঁধ ছুঁয়ে মন্থরভাবে মাটি স্পর্শ করল, একটা কুকুর লেজ নাড়তে নাড়তে তাকে অতিক্রম করে ফুটপাতে উঠল, সেই নারী রানাকে নিরীক্ষণ করে পাশ থেকে, সে টের পায়, বলে, ‘আমাকে খারাপ ভাবছেন? না-কি ভাবছেন আমি একটা পাগল বা বেকার, আমি তো বেকারই; কিন্তু এটা কোনো বিষয় না, আপনাকে সব বলব।’ নারী হেঁটে চলে, স্ট্রবেরির গন্ধ নিতে নিতে রানাও হাঁটে আর ভাবে, হয়তো এটা থেকে সেই সুখকর ঘ্রাণের শুরু, কুয়াশার সঙ্গে শীতের হাওয়ায় যদিও এটা মিলছে না, তবু এই বেগুনি রঙ থেকে আশা করা যায়, যায় তো, পাইকপাড়ার সেই গলির মধ্যে যা হারিয়ে ফেলেছিল, নিশ্চয়ই একদিন পাওয়া যাবে আর এই নারীর মধ্যে তা রয়েছে; তালতলা পার হয়ে তারা আইডিবি ভবনের কাছে এসে পড়লে নারী বলে, ‘এখন যান, যথেষ্ট হইছে, এখন গেলে খুশি হব।’ রানা তাকে অখুশি করে না, কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকে; বেগুনি শাড়িতে আবৃত দেহটি অপস্রিয়মাণ হতে থাকলে গন্ধটিও দূরে সরে যাওয়ার কথা, কিন্তু তা ঘটে না, রানার স্নায়ুর মধ্যে আটকে থাকে, সে উল্টা দিকে হাঁটা শুরু করে আর সিদ্ধান্ত নেয় যে আগামীকাল এখানে, ঠিক এই সময়ে কুয়াশার ভিতর দাঁড়িয়ে থাকবে; ডলি ক্ষুব্ধ ও কাতর স্বরে তাকে বলে, ‘তুমি অক্ষম, তোমাকে দিয়ে হবে না, আমার জীবন বরবাদ করে দিছ!’ হলিফ্যামিলির রাস্তা শেষ হয়ে আসে, এখন সে কী করবে বুঝতে পারে না; ডলি বলে, ‘তুমি যদি নাই পারো, আমাকে ধরলা ক্যান? কেন আমার শরীরে নাক ঘষে ঘষে আমারে উঠায়া দিছ? দায়িত্বহীন কোথাকার!’ রানা সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, কেবল মন্থর যানবাহনগুলি দেখে, ডলির বিস্ফারিত চোখ দেখে, বেগুনি কার্ডিগান ও শাড়ি দেখে আর কুয়াশা দেখে, এবং শোনে, ‘কালই ডাক্তারের কাছে যাবা, বুঝছ, শুনছ, কী বলছি?’ সে ইঞ্জিনের শব্দ শোনে, কিন্তু দেখে, খাট থেকে নেমে ডলি টয়লেটে ঢুকে খুব জোরে ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেয় আর শাওয়ারের শব্দ শোনে; সে দেখে শোনে দেখে শোনে দেখে শোনে দেখতে থাকে শুনতে থাকে দেখতে-শুনতে থাকে আর একটা লোক দৌড়ে যায় ওপারের ফুটপাত ধরে, ওয়ালসো টাওয়ারের দিকে, পরের দিন সেই নারী আর আসে না সেখানে, অনেকক্ষণ পর রানা অনুভব করে যে সে দাঁড়িয়ে আছে এবং এখন হাঁটা দরকার, যদিও কোনো তাড়া তার নেই, কেননা সে জানে, কেউ তার জন্য অপেক্ষা করে না, কোনো ঘটনা বসে নেই তার জন্য; এমন-কি হাঁটা না-হাঁটায়ও অন্য কারও তো দূরের কথা, নিজেরও কিছু আসে যায় না; তবু সে জাস্টিস আবু সাইদ চৌধুরীর বাড়ি পার হয়ে বাংলা মোটরের মোড়ে দাঁড়ায়; স্ট্রবেরির গন্ধমাখা সেই নারীকে হঠাৎ একদিন, মিরপুর রোডে মেট্রো শপিং মলের সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখে সামনের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে যায়, কাছাকাছি হওয়ার মুহূর্তে, আশ্চর্য, কিছু বলে ওঠার আগেই সে বলে, ‘আরে, আপনি? এইখানে?’  তখন হতবিহ্বল রানা বলে, ‘এই তো, এখানে একটা কাজ ছিল’, আর দেখে ডার্ক সার্কেলের মধ্যে তার চোখ ডুবে আছে, যেন সে রাতের পর রাত অনিদ্রা পার করে তার মুখোমুখি, তবু তার স্বরে উৎসাহ লক্ষ করে রানা বলে, ‘যদি আপনার আপত্তি না থাকে, আজ আমরা কফি খেতে পারি’; মোড়ের রাস্তা পার হয়ে রানা হাঁটতে থাকে, টয়লেট থেকে বের হয়ে স্ত্রী বলে, ‘তুমি অসুস্থ, বিয়ের আগে তোমার বোঝা উচিত ছিল’, তখন তার শরীর থেকে সাবানে মেশানো চন্দনের কেঠো গন্ধ ঘরময় ছড়িয়ে পড়ছিল, সেই গন্ধের ভিতর থেকে সে শোনে, ‘তোমাকে আর দুই সপ্তা সময় দিলাম, বুঝছ, দুই সপ্তা, না-কি আরও চাও?’ রানা বলতে পারে, ‘আমাকে দিয়ে হবে না, সো আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু টাচ ইউ অ্যানি মোর, ইউ মে লিভ মি অ্যান্ড লেট মি গেট রিড অব দিস হেল!’ কফি খেতে খেতে রানা জানতে পারে এই নারীর ডিভোর্স হয়েছে ছ’মাস হলো, আর সে জানায় যে তিন মাস ধরে সে নিজের স্ত্রীকে সুখ দিতে পারছে না কেবল একটি হারানো গন্ধ খুঁজতে গিয়ে, ওষুধেও কাজ হচ্ছে না। রানা বলে, ‘আপনাকে আমি খুঁজছিলাম, কারণ আমার মনে হইছে, আপনার ওই স্ট্রবেরির গন্ধের মধ্যে কিছু আছে, এখান থেকেই শুরু হইছে, এখানেই সেই গন্ধের শুরু, আমি রঙটাও আইডেন্টিফাই করছি, বেগুনি।’ তার দিকে হতভম্বের মতো সে তাকিয়ে থাকে, বলে, ‘আপনি একটা আজব লোক তো!’ রানা হাঁটছিল, সোনারগাঁও হোটেলের পাশ দিয়ে যেতে যেতে মনে পড়ল, অটোরিকশায় ওঠার আগে সাভারগামী একটা বাসের বিপুল শব্দগর্জনের পটভূমিতে সেই নারী তাকে বলেছিল, ‘আমার নাম পলা, আপনি তো জানতেও চান নাই, আজব, নিজের নামও বলেন নাই, এই নেন কার্ড, চলি।’ সে কারওয়ান বাজারের মোড়ে এসে দাঁড়ায়, দেখে পান্থপথের দিকে অর্ধবৃত্তাকার হয়ে গাড়িগুলি যাচ্ছে আর তার সামনের ওপারের রাস্তায় যানবাহনের দীর্ঘ সারি থমকে আছে; একটা ভিক্ষুক এসে তখন হাত পেতে বলে, ‘বাই, আমার মাছুম বাচ্চাডার কিডনি শ্যাষ অইয়া গেছে বাই, ম্যাডিকেলে চিক্কুর দিতাছে, অরে বাঁচান, যা পারেন দ্যান।’ শুনে পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটা দশ টাকার নোট বের করে এবং দেয়, কিন্তু তা হাতে নিয়ে ওর দিকে ফিরিয়ে দেয়, বলে নোটখান ফাইসা গেছে, বলদাইয়া দ্যান’; তখন সে ভিক্ষুককে আপাদমস্তক দেখে, বলে, ‘ভেরি গুড। ওইটা রাখো, আরেকটা দিচ্ছি।’ রানা আরেকটা দশ টাকার নোট বের করে নিজেই দেখে, তারপর দেয়; তখন তার সামনে দিয়ে জোরেশোরে গাড়িগুলি চলে যেতে থাকে এবং সেও হাঁটতে শুরু করে; তার স্নায়ুর মধ্যে বেডরুম ঢুকে যায়, আর সেখানে স্ত্রী খাট থেকে নামানো পা স্লিপারে গলিয়ে বলে, ‘তুমি ভেবো না, আমি অত ছোটলোক, তোমার চাকরির কোনো ক্ষতি হবে না; কিন্তু আমি তোমাকে নিয়ে আর থাকতে পারছি না, তুমিও তো পারছ না, পারছ? তোমার জন্য আমার খুব মায়া হচ্ছে, কষ্ট হচ্ছে; কিন্তু এটা কোনো জীবন হতে পারে না, তবে একটা কথা বলি, তুমি আর কাউকে বিয়ে করবা না, বিয়ে সবার জন্য না, বুঝছ?’ রানা একটা সিগারেট ধরিয়েছিল, স্ত্রীর কথার মধ্যেই তার ছাই দীর্ঘ হয়ে নিচের দিকে বেঁকে খানিকটা মেঝেতে পড়ে; ততক্ষণে সে রাস্তা পার হয়ে ওরিয়েন্টাল ব্যাংকের বিল্ডিংটা অতিক্রম করে যায়; পলাকে সে একদিন রমনার পুকুরের পাশে নিয়ে গিয়েছিল, বলেছিল, ‘আমি নিশ্চিত, তোমার মধ্যে সেই সৌরভ আছে, যা আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি বছরের পর বছর’; রানা সৌরভ শব্দটি ব্যবহার করেছিল। তাতে পলা থুশি হয়েছিল কি? আর সেদিনই তারা নিউমার্কেটে যায়, এবং পলাকে একটা বেগুনি রঙের জর্জেট শাড়ি কিনে দেয়; তার আগে পলার বাহুর ত্বকের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে, বলে, ‘তোমার স্কিনে দারুণ মানাবে, তাই না?’ ইয়ানির একটা সিডিও কিনে দেয়, তার আগে শুনে নেয় টেনে টেনে, ‘আনটিল দ্য লাস্ট মোমেন্ট’ শোনার শুরুতেই বলে, মিউজিক কম্পোজিশনটা কেমন বেগুনি রঙের মনে হচ্ছে না?’
হাসতে হাসতে পলা বলে, ‘আমার তো মনে হয় পাহাড় থেকে পাথর পড়ছে একটার পর একটা।’
সে বলে, ‘ওকে, তুমি সময়টা বুঝতে পারছ, কখন পাথর গড়িয়ে পড়ছে?’
‘পাগল, কখন, শুনি?’
‘কখন আর, সকাল, কুয়াশার সকাল। সন্ধ্যাও হতে পারে, তবে কুয়াশা তো সকালেই থাকে। তখন তুমি চোখ বন্ধ করে শুনে দেখো, বেগুনি রঙের মধ্যেই তুমি আছ। আর একটা খুব সুন্দর গন্ধও পাবে। সেটাও বেগুনি। দেখো।’


তারপর স্ট্রবেরির তীব্রবিপুল গন্ধের মধ্যে পরস্পর ঠোঁটের আস্বাদ নিতে নিতে বিছানায় উঠেছিল


রানা কারওয়ান বাজারের ফুট ওভারব্রিজের কাছে এসে পড়ে। তীব্র আর একটানা শব্দগর্জন নিয়ে একটা ডাবল ডেকার পড়িমরি ছুটে চলে, বা, তার মনে হয়, পিছনের হেডলাইটগুলোর গতিময় আলো বিশাল বাহনটিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে সজোরে, তাতে উড়ন্ত ধুলা দেখা যায়, না-কি ধোঁয়া এবং এই বিভ্রমের ভিতরে সে ভাবতে পারে, ডলি তাকে বলেছিল, ‘একটা চাকরির বিনিময়ে তুমি আমাকে বিয়ে করতে রাজি হইছিলা, সেটা পাইছ, এইটাই তোমার উদ্দেশ্য ছিল, ছিল না?’ সে ভাবে যে চাকরিটা ছেড়ে দেবে কিন্তু পলাকে জানাবে না; সহসা নিজের প্রতি ঘৃণা বোধ করে, ডিভোর্সের পর কেন এতদিন সে চাকরিটা বয়ে বেড়াচ্ছে, কেন তার কখনো মনে হয়নি একটা খাঁটি কাওয়ার্ডের মতো প্রতিদিন আট ঘন্টা কেবল নিজের জন্য এই আপোসের মধ্যেও প্রাণপণ একটা গন্ধ খুঁজে বেড়াচ্ছে; কিন্তু যতদিন পলাকে নিয়ে ঘুরেছে, এটা-ওটা কিনে দিয়েছে, খাইয়েছে, বিল সব সময় সেই মিটিয়েছে, ভেবে সে চাকরি ও প্রাক্তন স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা অনুভব করে; কিন্তু পরের ফুট ওভার ব্রিজে ওঠার সময় এক মহিলা তাকে অতিক্রম করে নেমে গেলে তীব্র এক পারফিউমে সে গন্ধের জগতে ফিরে যায়, এবং হতাশ ও বিমর্ষ হয়ে পড়ে : পলার কথা মনে পড়ে, তার বাসা থেকেই আজ সে ফিরছে, তার দেয়া বেগুনি শাড়িটি পরেছিল সে, বেডরুমে ইয়ানির ‘আনটিল দ্য লাস্ট মোমেন্ট’ বাজিয়ে তারা কিছুক্ষণ হাত ধরে বৃত্তাকার নেচেছিল, তারপর স্ট্রবেরির তীব্রবিপুল গন্ধের মধ্যে পরস্পর ঠোঁটের আস্বাদ নিতে নিতে বিছানায় উঠেছিল, একবার শাড়ির উপরে আরেকবার ত্বকে পায়ের পাতা থেকে গ্রীবা অব্দি রানা তার অবোধ্য, অস্থির ও দুর্দমনীয় নাক ঘষতে ঘষতে এক সময় কিছুটা অসাড়, প্রায় প্রশ্বাসহীন, নিশ্চুপ হয়েছিল পলার কামনাসঙ্কুল শরীরের উপর, তারপর আচমকা ও দ্রুত বিছানা ছেড়ে মেঝেয় ছেড়ে রাখা প্যান্ট আর পলারই উপহার টি-শার্টটি পরেছিল। ‘কী হলো’ ধরনের চেহারা নিয়ে সে উঠে বসেছিল তখন, নির্বাক; আর রানা তাকে ‘যাই। আমাকে ভুলে যেয়ো। ভালো থেকো’ বলে দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছিল।

ইন্দিরা রোডে সে এখনও হাঁটছে। হাঁটুক। তাকে আমরা যেন আর না দেখি। হাওয়া বইছে না-কি! না বইলেও কারও আপত্তি থাকার কথা নয়।

 

০৬. ০৪. ১৬
চঞ্চল আশরাফ

চঞ্চল আশরাফ

জন্ম ১২ জানুয়ারি, ১৯৬৯; দাগনভুইয়া, ফেনী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সম্মানসহ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই :
কবিতাগ্রন্থ : চোখ নেই দৃশ্য নেই (১৯৯৩), অসমাপ্ত শিরদাঁড়া (১৯৯৬), ও-মুদ্রা রহস্যে মেশে (২০০২), গোপনতাকামী আগুনের প্রকাশ্য রেখাগুলো (২০০৮), খুব গান হলো, চলো (২০১৩)।

উপন্যাস : কোনো এক গহ্বর থেকে (১৯৯৭), যে মৎস্যনারী (২০১১)।

গল্পগ্রন্থ : শূন্যতার বিরুদ্ধে মানুষের জয়ধ্বনি (১৯৯৯), সেই স্বপ্ন, যেখানে মানুষের মৃত্যু ঘটে (২০০৭), কোথাও না অথচ সবখানে (২০১৩)।

স্মৃতিগ্রন্থ : আমার হুমায়ুন আজাদ (২০১০)।
প্রবন্ধগ্রন্থ : কবিতার সৌন্দর্য ও অন্যান্য বিবেচনা (২০১১)

ই-মেইল : chanchalashraf1969@yahoo.com
চঞ্চল আশরাফ