হোম পুনর্মুদ্রণ গদ্য সর্বমানুষের মুক্তি না হলে কাব্যেরও মুক্তি হবে না—মােহাম্মদ রফিক

সর্বমানুষের মুক্তি না হলে কাব্যেরও মুক্তি হবে না—মােহাম্মদ রফিক

সর্বমানুষের মুক্তি না হলে কাব্যেরও মুক্তি হবে না—মােহাম্মদ রফিক
1.00K
0

ষাটের দশকে ‘সমকাল’ ও ‘কণ্ঠস্বরে’ লেখালেখি শুরু করা কবি মোহাম্মদ রফিক জীবনভর নদী, জল, কাদামাটির সঙ্গে যুক্ত জীবনযাপনের চিত্র তুলে এনে তাঁর স্বাদু কবিতার মধ্য দিয়ে বাংলা কবিতার ভাণ্ডার মণিরত্নে ভরে দিয়েছেন। কীর্তিনাশা, কপিলা, গাওদিয়া, খোলা কবিতা, বিষখালী সন্ধ্যা বা কালাপানি, অশ্রুময়ীর শব বা নোনাঝাউ—তাঁর এসব কাব্য বাংলা কবিতায় অনন্য সংযোজন বলে স্বীকার করবেন কবিতার পাঠক পদবাচ্যের যে কেউ। ‘সব শালা কবি হবে‘—সামরিক শাসন ও শাসকের তথাকথিত কবি হওয়ার অভিলাষের বিরুদ্ধে তাঁর রচিত বহুবিশ্রুত পঙ্‌ক্তি। আধুনিক বাংলা কাব্যসম্ভারে তাঁর ‘কপিলা (১৯৮৩) মহাকাব্যোপম এক সৃষ্টি।

সর্বমানুষের মুক্তি-চেতনার কবি মোহাম্মদ রফিকের জন্ম ১৯৪৩ সালে ২৩ অক্টোবর বাগেরহাট জেলার বেমরতা ইউনিয়নের বৈটপুর (বর্তমান চিতলী) গ্রামে। পিতা সামছুদ্দীন আহমদ এবং মাতা রেশাতুন নাহার। আট ভাই বোনের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা মোহাম্মদ রফিক ৬০-এর দশকের ছাত্র আন্দোলনে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে এবং স্বাধীন বাংলাদেশে আশির দশকের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছেন।

খুলনার বাগেরহাটেই কেটেছে কবির শৈশব। স্থানীয় বিদ্যালয়ে লেখাপড়া শুরু করলেও পরবর্তীতে পিরোজপুর জেলা স্কুল, বরিশাল ও খুলনা জেলা স্কুলে পড়াশুনা করেছেন রফিক। খুলনা জেলা স্কুল থেকে ১৯৫৮ সালে মেট্রিকুলেসন (মাধ্যমিক) পাস করেন তিনি। মেট্রিক পাস করে ঢাকার নটরডেম কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন, কিন্তু পরে ঢাকা কলেজে মানবিক বিভাগে চলে যান। এ সময় কথা সাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাথে তার বন্ধুত্ব হয়, যা তাঁর সাহিত্যিক চেতনায় প্রগাঢ় ছাপ ফেলে। ১৯৬১ সালে ইন্টার মিডিয়েট (উচ্চ মাধ্যমিক) পাস করেন। সে বছরই রাজশাহী সরকারি কলেজে ইংরেজিতে অনার্সসহ স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি হন কবি মোহাম্মদ রফিক। এরপর অংশ নেন সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনে। সামরিক আইনে তাকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয় সামরিক আদালত। এ সময় দিনের পর দিন পালিয়ে বেড়ান মোহাম্মদ রফিক। তবুও জেল এড়াতে পারেন নি। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান বিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকায় তাকে বহিষ্কার করা হয় রাজশাহী কলেজ থেকে। পরবর্তীতে, সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে মামলায় জয় লাভ করে পাস কোর্সে বিএ পাশ করেন ১৯৬৫ সালে। একই বছর ইংরেজি বিষয়ে এমএ-তে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

১৯৬৭ সালে মোহাম্মদ রফিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫৮ সালে কবি যুক্ত হন ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে, আইয়ুব শাহির আমলে খুলনা, যশোর, বাগেরহাট এবং পরবর্তীতে বগুড়া এবং রাজশাহী অঞ্চলে ছাত্র ইউনিয়নকে সংগঠিত করেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ বৈশাখী পূর্ণিমায়  প্রকাশিত হয় ১৯৭০ সালে। ১৯৭১ সালে সক্রিয়ভাবে যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন ১ নম্বর সেক্টরের হয়ে। স্মরণীয় ভূমিকা রেখেছেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রকে সংগঠিত করে তুলতে। ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত হয় মোহাম্মদ রফিকের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ধুলোর সংসারে এই মাটি। আশির দশকের শুরুতে স্বৈরাচার এরশাদের রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের প্রেক্ষাপটে দেশে সাম্প্রদায়িকতা, দারিদ্র্য ও একনায়কতন্ত্রের যে ভয়াল থাবা বিস্তৃত হয় তারই প্রেক্ষাপটে লেখেন খোলা কবিতা (১৯৮৩)। যার লক্ষ লক্ষ কপি বিলি করেছে স্বৈরাচারের পতনপ্রত্যাশী, গণতন্ত্রকামী বাংলাদেশের মানুষ।

কীর্তিনাশা (১৯৭৯), খোলা কবিতা ও কপিলা (১৯৮৩), গাওদিয়া (১৯৮৬), স্বদেশী নিঃশ্বাস তুমিময় (১৯৮৮), মেঘে এবং কাদায় (১৯৯১), রূপকথা কিংবদন্তি (১৯৯৮), মৎস্যগন্ধা (১৯৯৯), মাতি কিসকু (২০০০), বিষখালি সন্ধ্যা (২০০৩), নির্বাচিত কবিতা (২০০৩), কালাপানি (২০০৬), নির্বাচিত কবিতা (২০০৭), নোনাঝাউ (২০০৮), দোমাটির মুখ (২০০৯), অশ্রুময়ীর শব (২০১১), কালের মান্দাস (২০১২), ঘোরলাগা অপরাহ্ণ (২০১৩), বন্ধু তুমি প্রসন্ন অবেলায় (২০১৫)—এসবই মোহাম্মদ রফিকের কবিতাগ্রন্থ। ঐতিহ্য প্রকাশ করেছে কীর্তিনাশা, গাওদিয়া  ও কপিলা  নিয়ে কাব্যসংকলন ত্রয়ী (২০০৯)। ঐতিহ্য আরো প্রকাশ করেছে মোহাম্মদ রফিক রচনাবলী (২০০৯) মোহাম্মদ রফিক রচনাবলী (২০১০) । ১৯৯৩ সালে অরুণ সেনের সম্পাদনায় কোলকাতার প্রতিক্ষণ থেকে প্রকাশিত হয়েছে মোহাম্মদ রফিকের নির্বাচিত কবিতা । কবিতার পাশাপাশি তাঁর রয়েছে বেশ কয়েকটি গদ্যগ্রন্থ। এর মধ্য ভালোবাসার জীবনানন্দ (২০০৩), আত্মরক্ষার প্রতিবেদন (২০০১, ২০১৫) ও স্মৃতি বিস্মৃতির অন্তরালে (২০০২) অন্যতম। কবি মোহাম্মদ রফিক আয়ওয়াতে ইন্টারন্যাশনাল রাইটিং প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করেন ১৯৯৩ সালে। মার্কিনিদের আয়ওয়া শহরের অভিজ্ঞতা, ভিন দেশের লেখকদের সঙ্গে কবির মত বিনিময়, দেশ-বিদেশের সাহিত্যের খবর ইত্যাদি বিষয় নিয়ে ২০০৩ সালে প্রকাশিত হয় তার দূরের দেশ নয় আয়ওয়া বইটি। নব্বইয়ের দশকে বেশ কিছু ছোটগল্প লেখেন কবি। চট্টগ্রামের শুভানুধ্যায়ী পাঠকরা প্রকাশ করেছে তাঁর গল্প-সংগ্রহ । ১৯৮১ সালে কবি আলাওল পুরস্কার, ১৯৮৭ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ২০১০ সালে কবি একুশে পদক পেয়েছেন। কবি মোহাম্মদ রফিক শিক্ষকতা করেছেন বাজিতপুর কলেজ, চট্টগ্রাম মহসীন কলেজ এবং স্বাধীনতার পরে ঢাকা কলেজে। ১৯৭৪ সালের মার্চে যোগ দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। ২৯ জুন ২০০৯ পর্যন্ত দীর্ঘকাল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পর অবসরে আছেন কবি। তার সহধর্মিনী ছিলেন নিজের স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল কবি জিনাত আরা রফিক। ২০০৫ সালের ৭ ডিসেম্বর তিনি প্রয়াত হন। দুই ছেলে শুভস্বত্ব রফিক ও শুদ্ধস্বত্ব রফিক। বর্তমানে তুমুল এক সৃজন-সময় পার করছেন কবি।

আলাপ শুরুর সময় ৩১ মে, ২০১৫, রববিার, সকাল ১১.১০, উত্তরা…

 

শি. সা.

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

(গাওদিয়া’র প্রথম সংস্করণের একটি বই দেখিয়ে) স্যার, এটা আছে আপনার কাছে?

মােহাম্মদ রফিক

(অবাক হয়ে) না, এটা কােথায় পেলে তুমি?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

স্যার, নীলক্ষেতের পুরনো বইয়ের দোকান থেকে। ছান্দসিক আবদুল কাদিরের সংগ্রহের বই থেকে। আপনি উনাকে স্বাক্ষর করে উপহার দিয়েছিলেন। শিল্পী কামরুল হাসানের প্রচ্ছদ। বিশ টাকায় কিনেছি।


তুমি কীর্তিনাশা লিখেছ? আমি বললাম, জি। উনি বললনে, তুমি অনেক বড় কবি।


 মোহাম্মদ রফিক

তুমি তাে অদ্ভুত জিনিস মনে করিয়ে দিলে। আমি কী কাজে যেন বাংলা একাডেমি গেছি একদিন। গিয়ে দেখি যে এক বয়স্ক লােক খুব কষ্ট করে কী একটা প্রবন্ধের প্রুফ দেখছেন। একজন প্রৌঢ় লােক। আমার মনে হলাে একটু সাহায্য করি। আমি বললাম উনাকে যে, আমি আপনাকে সাহায্য করি। উনি বললেন, ‘হাঁ তুমি আমাকে সাহায্য করতে পারাে’। আমি সাহায্য করলাম। করে, আমি প্রুফ দেখে বেরিয়ে এসেছি। বাইরে শিশির দত্তরা আড্ডা মারছে। ওখানে দাঁড়িয়ে আমিও ওদের সাথে গল্প করছি। একটু পর শামসুজ্জামান খান বেরিয়ে আসলেন ঐ প্রৌঢ় মানুষটিকে নিয়ে। আমাকে বললেন, মােহাম্মদ রফিক, উনি আপনার সাথে একটু কথা বলতে চান। উনি আমাকে বললেন, তুমি বললে কােনো ক্ষতি নেই তাে! আমি বললাম, না, আমি আপনার ছেলের বয়সী হবো। বললেন, তুমি কীর্তিনাশা লিখেছ? আমি বললাম, জি। উনি বললনে, তুমি অনেক বড় কবি। আমি তাে তখন বিব্রতবোধ করছি। গাধার মতো হাসছি। উনি বললনে, ‘তুমি মনে করছে যে, আমি আধুনিক কবিতা বুঝি না! কিন্তু ছন্দ তাে বুঝি। তুমি অনেক বড় কবি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

(হাসির পর) কবিতার ছন্দের ব্যাপারে বাংলা সাহিত্যে উনি কিন্তু বড় অথরিটি স্যার! ছান্দসিক আবদুল কাদিরের ঐ বড় কবি অভিধা খুব ছােট করে দেখার কিছু নাই।

মোহাম্মদ রফিক

আমি তখন উনাকে চিনিই না। আর প্রশংসা শুনে আমি তো আরো গাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। উনি বলছেন যে, “তোমার ছন্দের যে হাত, আর কোনো কবির এই হাত আমি দেখি নাই।’’ এই বলে রাগান্বিতভাবে গটগট করে চলে গেলেন। শামসুজ্জামান খান বোকার মতো আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। আমিও তার দিকে। শামসুজ্জামান খান বললেন, আপনি উনাকে চেনেন? আমি বললাম, ‘না তো’। উনি বললেন, আবদুল কাদির। তো আমি গিয়ে যে উনাকে বলব, আমি আপনাকে চিনতে পারি নি, সেটাও করা হয়ে ওঠে নি। কেমন যেন এক ধরনের ঔদ্ধত্য ও অহমিকা ছিল, আমি গিয়ে আবার আড্ডা দিতে শুরু করেছি ওদের সাথে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

গাওদিয়া’র এই কপিটা স্যার আমি পেয়েছি নীলক্ষেতে। ছান্দসিক আবদুল কাদিরের সংগ্রহের অনেকগুলো বইয়ের সাথে। উনার বাড়ির কোনো লোক বোধহয় সব একসাথে বিক্রি করে দিয়েছিল। আপনার নিজের স্বাক্ষর করা এবং লেখা—শ্রদ্ধাভাজনেষু, আবদুল কাদির, করকমলে। আমার খুবই ভালো লাগল আপনার সিগনেচার দেখে এবং আমি কিনলাম। আপনার কাছে কি এই সংস্করণের কোনো কপি আছে?

মোহাম্মদ রফিক

না, নাই।

12794425_1095420893831787_3587239568866383550_n

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

এই বইটা দিয়া শুরু করার কারণ স্যার, গাওদিয়া’র শুরুতে, প্রারম্ভ পত্রে আপনি লিখেছেন, “গাওদিয়া, হতে পারে একটি গ্রাম,/ শহর কিংবা গঞ্জ,/ এমনকি সারাটা বাংলাদেশ”। ১৯৪৩ সালে আপনার জন্ম, এখন পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময়ের কাব্যচর্চায় আপনি বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ, দুর্দশা, কষ্ট, বেদনা…এগুলো আসলে আপনার কবিতায় অনেক বেশি মূর্ত হয়ে উঠেছে। এবং তার চেয়ে বেশি শক্তিশালীভাবে উঠে এসেছে এই অঞ্চলের মানুষের অদম্য চেতনা বা স্পিরিটের গল্প। একভাবে বলা যায়, রাজনৈতিক দিক-নির্দেশনার গল্পও। তো স্যার, জানতে চাই, আপনার যে পোয়েটিক ফিলসফি বা কাব্যদর্শন, তা দাঁড়াল কিভাবে?

মোহাম্মদ রফিক

শোন, তুমি যে প্রশ্ন তুললে, এর উত্তর দেওয়া এত সহজ নয়। কারণ, যখন আমি কাজ শুরু করেছি, তখন আমি এত কিছু চিন্তা করি নাই। যেকোন কবিই যে কাজ করে, তা তার বেড়ে উঠার সাথে, জীবন যাপনের সাথে সম্পর্কযুক্ত। সাযুজ্যপূর্ণ। কতগুলি ব্যাপার আমার মধ্যে খুব প্রভাব রেখেছে, প্রভাবিত করেছে, এখন আমি বুঝি, যখন আমি ফিরে তাকাবার চেষ্টা করি, আমি যে এখানে দাঁড়ালাম, কিভাবে দাঁড়ালাম! যা হয়ে উঠলাম, কিভাবে হয়ে উঠলাম! আমার উপর একটা বিরাট প্রভাব পড়েছে আমার দাদার। আমার দাদা খুব শিক্ষিত মানুষ ছিলেন না, কিন্তু স্বশিক্ষিত ছিলেন। সেই আমলে তিনি সিক্স পর্যন্ত পড়েছিলেন। এন্ট্রান্স পরীক্ষা তখন একটা মানদণ্ড। তিনি সেটা দিতে পারেন নাই। তিনি আমাদের অঞ্চলে একটা প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

এটা কি স্যার নাইনটিন থার্টির দিকে?

মোহাম্মদ রফিক

না, এটা তারও আগে। উনিশশো বিশ টিশ থেকে শুরু। তার আগ থেকেও হতে পারে। তবে তিনি রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং সামাজিকভাবে খুব সচেতন ব্যক্তি ছিলেন। তিনি রাজনৈতিকভাবে সুভাষ বোসের শিষ্য ছিলেন। তখন সমগ্র বাংলাই সুভাষ বোসে মুগ্ধ। এবং কংগ্রেস করতেন। ধর্মীয়ভাবেও তিনি খুব সচেতন ছিলেন। তিনি নামাজ পড়তেন, প্রতিদিন কোরান শরীফ পড়তেন, হাদীস পড়তেন এবং শুধুই পড়তেন না, জেনে বুঝে পড়তেন। প্রতিটা শব্দের অর্থ তিনি জানতেন এ কথা তিনি আমাকে বলেছেন। কিন্তু তিনি খুব ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

সে সময়ই তিনি মুক্ত চিন্তার মানুষ ছিলেন!

মোহাম্মদ রফিক

হ্যাঁ। উদার ছিলেন। তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন, তিরিশটা রোজা রাখতেন, কিন্তু তিনি আমাকে বলেছেন, “দেখ, ধর্ম আমাকে শিখিয়েছে—আমার ধর্ম করার অধিকার যেমন আমার, ঠিক তেমনি আমার পাশের বাড়ির প্রতিবেশী, সে যদি অন্য সম্প্রদায়ের মানুষও হয় তাহলে তারও নিজের ধর্ম পালন করার একই অধিকার আছে। সে অধিকার যেন রক্ষিত হয় সেটা দেখাও আমারই দায়িত্ব। এটা আমার ধর্মই আমাকে শিক্ষা দিয়েছে। তুই আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারিস, তাহলে কেন আমি এত ধর্ম পালন করি। তার উত্তর হচ্ছে, আমি একটা ধর্ম পালনকারী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছি, ধর্মপালন করা আমার উপরে দায়িত্ব হিশেবে বর্তেছে। আমার সংস্কৃতির অংশ হিশেবে। সেটা রক্ষা করাটাও আমার দায়িত্ব। এবং অতি শৈশবকাল থেকেই পাকিস্তান রাষ্ট্র নিয়ে আমার মনে একটা সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

সেটা কি রকম?

মোহাম্মদ রফিক

আমার এখনো স্পষ্ট মনে পড়ে ১৯৪৭ এ বা ৪৮ এ যখন পাকিস্তান হলো, তখন আমার দাদা ঐ অঞ্চলের ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট। আমাদের ওখানে যে স্থানীয় স্কুল আছে, সেখানে সেদিন প্রথম পাকিস্তানি পতাকা তোলা হবে। পতাকা উত্তোলন উৎসব। সব লোক সাজগোজ করে যাচ্ছে। কিন্তু আমার দাদা বসে আছেন। তিনি যাবেন না। তখন আমার বাবা তখন তাগড়া যুবক। পাকিস্তান বিষয়ে তারও উৎসাহ আছে। তিনিও যাবার জন্য তৈরি হচ্ছেন। দাদাকে বলছেন, বাপজান চলেন চলেন। দাদা বললেন, যেতে হলে তোমরা যাও। একটা জালেম রাষ্ট্র হতে যাচ্ছে এই পাকিস্তান। আমি গেলাম বটে সেই উৎসব দেখতে, কিন্তু আমার মনে দাদার ঐ দৃঢ় মুখ আর কথাটা কোথায় যেন গেঁথে রইল। এটা একটা আর দ্বিতীয়ত, তোমরা সে সময় দেখ নি, আমাদের গ্রামে মূলত হিন্দু এবং নিম্নবর্ণের হিন্দুরা বসবাস করত। নদীর ধার ঘেঁষে তাদের পাড়া প্রথমে, তারপর মুসলমানদের বাড়িঘর ছিল। ছেলেবেলা থেকে আমার বন্ধুত্ব ছিল ঐ হিন্দু পরিবারের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে। তারাই কিন্তু তখন লেখাপড়া করত, বই আদান-প্রদান করত। আমি বাংলা উপন্যাস, বাংলা কবিতার বই, ইংরেজি উপন্যাস, ইংরেজি কবিতা, এসবের সাথে যোগাযোগ আমার ঐ শৈশবে হিন্দু পরিবারের ছেলেমেয়েদের মধ্য দিয়েই হয়েছে। এবং সত্যি কথা বলতে কী, ঢাকা কলেজে আসার আগ পর্যন্ত মুসলমান ছেলেরা কেমন হয় তা আমি জানতাম না। আমার প্রথম বাঙালি মুসলমান বন্ধু হচ্ছে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, প্রয়াত প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক। এবং বলা যায় এখন পর্যন্ত সেই আমার একমাত্র বন্ধু, কারণ তার সঙ্গে আমার দীর্ঘজীবন, মানে যতদিন সে বেঁচে ছিল, আমরা একসাথে থেকেছি। আমাদের শিল্পসাহিত্য চেতনার আদান-প্রদান, হাসিঠাট্টা, মদ্যপান এসব আমরা, সবটা করেছি। এবং আমি খুব অল্প বয়সেই বামপন্থী রাজনীতির প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ বোধ করেছি, ফলে সম্পৃক্ত হয়েছি।


আমি তো আদর্শের রাজনীতি করেছি। ঐ আদর্শে আমি বিশ্বাস করি। এবং এর প্রতি দুর্বলতা আমার আছে, থাকবেও। আমার কবিতায়ও ঐ আদর্শের প্রভাব রয়েছে।


শিমুল সালাহ্উদ্দিন

সম্পৃক্ত হলেন কিভাবে?

মোহাম্মদ রফিক

সেটাও মজার ঘটনা। আমি কিন্তু মার্কস লেলিন পড়ে বামপন্থার প্রতি আকৃষ্ট হই নি। আমি আকৃষ্ট হয়েছিলাম দস্তয়ভস্কির উপন্যাস পড়ে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

এবং দস্তয়ভস্কি আপনার প্রিয়তম লেখক!

মোহাম্মদ রফিক

হাঁ, অন্যতম প্রিয় লেখকদের একজন। আমি তখন ক্লাস এইটে পড়ি। দস্তয়ভস্কির লাঞ্ছিত এবং নিপীড়িত উপন্যাসটি আমি খুলনা থেকে কিনে এনেছিলাম। এই উপন্যাসটি পড়ার পর থেকে আমার মধ্যে কেন যেন বামপন্থার প্রতি এক ধরনের দুর্নিবার আকর্ষণ তৈরি হয়। এবং যতদিন আমি সক্রিয় বামপন্থী রাজনীতির সাথে যুক্ত থেকেছি, আমি আমার জায়গা থেকে নড়ি নি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

এখনো কি নড়েছেন স্যার?

মোহাম্মদ রফিক

এখনো যে নড়েছি, তা না। আমি তো আদর্শের রাজনীতি করেছি। ঐ আদর্শে আমি বিশ্বাস করি। এবং এর প্রতি দুর্বলতা আমার আছে, থাকবেও। আমার কবিতায়ও ঐ আদর্শের প্রভাব রয়েছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আপনার কবিতার কথা জানতে চেয়েছিলাম স্যার, কবির দর্শন—

মোহাম্মদ রফিক

আমি যে আমাদের সমাজ, বোধ, জীবন, বেদনা, সমাজজীবন নিয়ে কাজ করেছি, আপাতভাবে যা দেখা যায়, এসবই কেবল দানা বেঁধেছে, এটাই শুধুমাত্র নয় কিন্তু। কিছু জিনিস আমি কবিতায় খুব সচেতনভাবে করতে চেয়েছি। তুমি তাকিয়ে দেখ, ইউরোপীয় সভ্যতা, যা দিয়ে আমরা খানিকটা মোহাচ্ছন্ন বলব, এই ইউরোপীয় সভ্যতা কিন্তু মূলত গড়ে উঠেছে গ্রিক পুরাণের উপর নির্ভর করে। এই পুরাণটা, মিথটা কিন্তু একটা জাতির মেরুদণ্ড গঠন করার জন্যে খুব প্রয়োজন। তুমি নৃ বিজ্ঞানের ছাত্র, তুমি বুঝবে, একটা কথা আছে প্রত্নতত্ত্ব প্রতিভা।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

প্রত্মপ্রতিভা, স্যার!

মোহাম্মদ রফিক

আমি ইংরেজিতে বলি আর্ক-জিনিয়াস (Ark-genius)। আমি যদি বঙ্গবন্ধুর কথা চিন্তা করি, তাহলে দেখ বাঙালিদের এমন অনেক লোকের চেহারা কিন্তু ভেসে ওঠে। আমার মনে ভেসে ওঠে, বাঙালি ভাবলেই যাদের চেহারা তার মধ্যে তিনি অন্যতম। তোমার সামনেও ভেসে উঠতে বাধ্য, কারণ কোনো লোক, শুধু শেকড় না, তার মাটি থেকে বিচ্যুত হয় না। মাটির সমস্ত ঐশ্বর্য নিয়েই সে বেড়ে ওঠে কিন্তু। আমি সচেতনভাবে যেটা ভেবেছি, আমাদের, বাঙালির, একদম বাঙালির, একটা নিজস্ব পুরাণ গ্রহণীয়। এবং তুমি দেখবে, আমি কিন্তু সচেতনভাবে আমার কবিতায় সেটা করার চেষ্টা করেছি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

হাঁ স্যার, চরিত্র হিশেবে আপনার কপিলায় তো এদেশের মাঠ ঘাটের মানুষই মিথ হয়ে উঠেছে। ঈশা খাঁ এর বংশের বঁধু না পলাইতাম আমি কিংবা ময়মনসিংহ গীতিকার মহুয়া মলুয়ার চরিত্র যেখানে কবিতায় উঠে এসেছে। কিংবা গাওদিয়া’র কথা যদি বলি!

মোহাম্মদ রফিক

কোত্থেকে নিয়েছি যদি বলো, আমি নিয়েছি বাঙালি লোকগাঁথা, লোককাহিনি এমনকি বাংলা উপন্যাসকেও আমি ব্যবহার করেছি। যেমন তুমি নিজেই মঞ্চের জন্য কপিলা নির্দেশনা দিয়েছ।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

জি স্যার। শুধু তো কপিলা’য় না স্যার, আপনার অন্যসব রচনাবলীতেও আঞ্চলিক বিবিধ মিথের উপস্থিতি রয়েছে। এবং এই পুরাণ প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ বিস্তার নিয়েছে আপনার কবিতায়।

মোহাম্মদ রফিক

তা বলতে পারো। শুধু কপিলা-ই নয়, মহুয়া, বেহুলা, দামোদর এই চরিত্রগুলো পুরাণ থেকেই আমার কবিতায় আমি তুলে আনতে চেষ্টা করেছি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

এই সমস্ত কিছুর বাইরে, আপনি যা যা কিছু গ্রন্থিত করেছেন কবিতায় উপাদান হিশেবে, তার বাইরে আপনার কবিতায় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মতো বিশুদ্ধতার এক ধরনের প্রচেষ্টা আছে। একজন কবির এই যে প্রকল্প, এটা আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

মোহাম্মদ রফিক

এটা হয়তো আমার পঠনপাঠনের একটা প্রক্রিয়া। আমি ব্যক্তিগতভাবে যেটাকে আমরা বলি ধ্রুপদী সাহিত্য, তার প্রতি আমার একটা মারাত্মক আকর্ষণ আছে। ছেলেবেলা থেকেই মহাকাব্যের প্রতি আমার এক ধরনের দুর্বলতা ছিল। মহাকাব্য হয়েছে কিনা জানি না, কিন্তু আমি চেষ্টা করেছি। কপিলাকে অনেকেই সার্থক মহাকাব্য বলেছে। অরুণ সেন বলেছেন। শুনেছি সুধীর চক্রবর্তীও নাকি লিখেছেন। আমি এখনো, হোমার বলো, ভার্জিল বলো, ঈনিড বলো, দান্তে বলো, আফ্রিকা বা ল্যাটিন আমেরিকার কবিতা বলো, বা আমাদের রামায়ণ, মহাভারত বলো, কিংবা আমাদের সাহিত্যের মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ বলো, এদের প্রতি আমার ভীষণ প্রেম রয়েছে। ষাটের দশকে যখন আমি লিখতে শুরু করি, তখন কিন্তু আমি মূলত রবীন্দ্রনাথের বলয়েরই ছিলাম। এখনো আমি মনে করি যে, আমি রবীন্দ্রনাথের বলয়েরই লোক। বাংলা কবিতার ছন্দ আমাকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করে। যে একজন গায়ক, সে যদি তাল লয় ভুল করে, তাহলে আমরা তাকে কখনোই গায়ক স্বীকৃতি দেবো না। হয়তো তার গান শুনতে পারি, কিন্তু শিল্পীর কাতারে তাকে কখনোই স্থান দেবো না। কবি যদি হতে চায় কেউ, বা টিকে থাকতে চায় কবি হিশেবে, এবং একটা লেখা লিখে ভাবে এটা কবিতা পদবাচ্য কী না, তাহলে অবশ্যই তাকে বাংলা ছন্দের ওপরে অধিকার অর্জন করতে হবে। এবং সেই ছন্দটাকে যেভাবে ইচ্ছে সেভাবেই যেন সে ব্যবহার করতে পারে। এটা প্রথমত, দ্বিতীয়ত যেটা আমি বলি, পুরনো কবিতা ধর, চর্যাপদ, বৈষ্ণব পদাবলী, গীতিকা, মধ্যযুগের কবিতা, আমি সবটাই পড়েছি। আমি একটা কথা বলতে পারি যে, ২০০৩ বিসি থেকে শুরু করে, ৩০০০ বিসি থেকে শুরু করে পৃথিবীতে যত উল্লেখযোগ্য কবিতা লেখা হয়েছে, যেখানেই লেখা হোক, যেগুলো প্রকাশিত হয় নি বা আমার কাছে আসে নি সেগুলো আলাদা কথা, যেগুলো হয়েছে, অনুদিত, প্রকাশিত তার সাথে আমার যোগাযোগ নেই সেটা হতে পারে না। পৃথিবীর মোটামুটি সব অঞ্চলের ছোট বড় সব কবিরই কিছু না কিছু কবিতা আমি পড়েছি। এবং তার একটা অনুরণন নিশ্চয়ই আমার মধ্যে আছে। আমি যখন লিখতে বসি, তখন আপনা আপনিই আমার কবিতা বিষয়ে অর্জিত যে ধারণা, তা ভেতরে কাজ করতে থাকে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

স্যার, এটা বলা হয়ে থাকে যে আধুনিক বাংলা সাহিত্যে মহাকাব্যের একটা বড় ধরনের হাহাকার ছিল। কপিলা যেটা একভাবে অবসিত করেছে বলে আমি মনে করি। কপিলা নিয়ে প্রচুর কাজ হয়েছে, শঙ্করসাঁও জালের সেট নির্মাণ সহযোগিতা নিয়ে আমি কাজ করেছিলাম, তার বাইরে লেখালেখিও হয়েছে প্রচুর। কপিলা’র যে মূল শক্তির জায়গা এটা আপনার পরবর্তী প্রজন্ম একভাবে আবিষ্কার করেছে। আপনি যখন কপিলা লেখা শুরু করেন, সেই প্রস্তুতির সময়টা যদি বলেন আমাদেরকে।

মোহাম্মদ রফিক

আমার যেটা ধারণা যে, আমি মানুষের মুক্তিতে বিশ্বাস করি। অবশ্যই আমি মানুষের অর্থনৈতিক সাম্যে বিশ্বাস করি। আমি মনে করি প্রত্যেক মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত। শুধু তাই না আমি মনে করি নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়াটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। এবং নারীশক্তি যতটা বিকশিত হবে, একটা সমাজ ততটা বিকশিত হবে। এটা আমার ভিতরের বিশ্বাস। আমি কপিলাতে গিয়ে সেই নারীশক্তির বিষয়টাকে বুঝতে চেষ্টা করেছি। তুমি দেখবে যে ঐখানে কিন্তু প্রতিমা হয়ে আসছে বারবার কপিলা, কপিলার ভূমিকায় নারী। এরকমই আমি ইদানিং কালে, আরেকটা বই আমার লেখার প্রস্তুতি, প্রস্তুতি বলা ঠিক হচ্ছে না, লেখা হয়ে যাচ্ছে, মানে প্রকাশের পথে, সেটা হলো বেহুলার অপর পরিচয়। এবং আরেকটা লেখায় আমি হাত দিয়েছি সেটা হচ্ছে মহুয়াকে নিয়ে একটা দীর্ঘকাব্য—প্রায় আশি পৃষ্ঠার বেশি। এবং তোমার মনে আছে কিনা যে কপিলা’রও কিন্তু আশি পৃষ্ঠা।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

স্যার ত্রয়ীতে ৬২ পৃষ্ঠা,  প্রথম সংস্করণে খুব সম্ভবত ৮৪ পৃষ্ঠা।

মোহাম্মদ রফিক

হাঁ, কপিলা, মহুয়া এবং বেহুলা এই তিনটাকে নিয়ে আমি একটা জগৎ তৈরি করতে চাই। যে জগতে এই নারীশক্তির বিকাশকে অন্তত আমি আমার জায়গা থেকে পূর্ণমাত্রায় অবলোকন করতে পারব। আমাদের সমাজে নারী যতটা বিকশিত হবে, নারী যতটা এগিয়ে আসবে, নারী যতটা হাল ধরতে পারবে, আধুনিক অর্থে নয়, একজন বা দুইজন নয়, সমস্ত নারীরা যখন এগিয়ে আসবে, তখন আমাদের সমাজে ভিতর থেকে একটা অবশ্য পরিবর্তন হবে। এবং সেই পরিবর্তনের জন্য আমি অপেক্ষা করছি।


ইদানিংকার একটা কবিতায় আমি লিখেছি, মৃত্যুকে জয় করাই হচ্ছে জীবনের, বেঁচে থাকার মূল অনুষঙ্গ। তোমাকে তো বললাম, মানব মুক্তির, সর্ব মানুষের অধিকারের পক্ষে দাঁড়াবার একটা তাড়না আমার ভেতরে আছে।


শিমুল সালাহ্উদ্দিন

স্যার, গত কয়েকটা বইমেলায় আপনার যে বইগুলি বেরিয়েছে, প্রথমা থেকেঅশ্রুময়ীর শব, শুদ্ধস্বর থেকে ঘোর লাগা অপরাহ্ণ, রূপসী বাংলা থেকে বন্ধু তুমি প্রসন্ন অবেলায়, বেঙ্গল থেকে কালের মান্দাস, শুদ্ধস্বর থেকে দোমাটির মুখ,

মোহাম্মদ রফিক

এইগুলি তো আমি আমার এখনকার বই ধরিই না। এখন আমার সামনের যে বইমেলা, আশা করছি দুটো নতুন কবিতার বই বেরুবে। সবমিলিয়ে আমার মোটামুটি পাঁচটা বই প্রকাশিত হবার পথে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

বাহ্। প্রচুর লিখছেন, স্যার। আমার প্রশ্নটা ছিল স্যার, যে বইগুলোর নাম করলাম সবগুলো বইয়ের শিরোনামই কেমন মৃত্যুগন্ধি! এটা কেন স্যার?

মোহাম্মদ রফিক

খুব ভালো প্রশ্ন করেছ। এই প্রশ্নেই বোঝা যায় আমার কবিতার প্রতি খুব মনোযোগ আছে তোমার। গত কয়েক বছরে আমি হঠাৎ করে কয়েকবার অসুস্থ হয়েছি। গত চার পাঁচ বছরের মধ্যে প্রায় পাঁচ ছ বার আমি হাসপাতালে গেছি। আমার মাতৃবিয়োগ ঘটেছে। দীর্ঘদিনের ভালোবাসার কর্মস্থল জাহাঙ্গীরনগর ছেড়ে এসেছি। কবিতা তো যাপন থেকে আলাদা কিছু না। এটা একটা কারণ ছিল। দ্বিতীয়ত মনে হয়েছে যে যাবার বেলায় একটা নিজস্ব কথা উচ্চারণ করে যাওয়া ভালো। তবে, এটা কিন্তু আমার পুরো কথা নয়। এখন আমি নিজের ভেতর এক ধরনের উজ্জীবন অনুভব করছি। আমি মনে করি, এই উজ্জীবনের নেশাটা আমি রেখে যেতে চাই। ইদানিংকার একটা কবিতায় আমি লিখেছি, মৃত্যুকে জয় করাই হচ্ছে জীবনের, বেঁচে থাকার মূল অনুষঙ্গ। তোমাকে তো বললাম, মানব মুক্তির, সর্ব মানুষের অধিকারের পক্ষে দাঁড়াবার একটা তাড়না আমার ভেতরে আছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

হাঁ স্যার, কালাপানি’র কবিতায় তো আপনি লিখেছেন, ‘শীতশীত/ দুহাঁটুতে সিঁধিয়েছে মৃত্যুভীতি/ মনে লয়/ আসন্ন বিলয়/ সর্ব মানুষের/ দ্যাখ, ন্যাড়া কঞ্চিতে ধরেছে ফুল/ পূর্ণিমার। আপনি সবসময়ই সর্ব মানুষের হতে চেয়েছেন। সর্ব মানুষের আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতিফলনের কথাই যেন মনে করিয়ে দেয় আপনার এ কবিতা। সর্ব মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা থেকেই কি আপনার কবিতা মুদ্রিত হয় আপনার শাদা খাতার পাতায়? এবং আপনার কবিতার চরিত্ররা যেন সুলতানের আঁকা ছবির সেই দৃঢ়, ঋজু, পেশীবহুল মানুষগুলি, এইখানে স্যার, আমি জানতে চাই, সুলতানের যে চিত্রকলার জগৎ, সেটার সাথে আপনার কবিতার জগতের একটা অস্পষ্ট মিল যেন আছে—

মোহাম্মদ রফিক

12788244_1096701330370410_1208243882_nতুমি খুব ভালো একটা প্রসঙ্গ তুলেছ। আমি আশির দশকের শুরুতে, তখন বোধহয় আমার কীর্তিনাশা বেরিয়েছে, কপিলা বোধহয় লেখা হয়েছে, খোলা কবিতা লেখার আগে আগে, আমি একবার যশোর গেলাম। যাওয়ার পর আমার খুব ইচ্ছে হলো যে আমি নড়াইল যাব, সুলতান ভাইকে দেখে আসব। তখন কিন্তু আমি উনাকে চিনি না। নাম শুনেছি, কিংবদন্তি শুনেছি, প্রচুর কল্প কাহিনি শুনেছি। তো আমার ইচ্ছে হলো যে আমি যাবই যাব। উনাকে চাক্ষুস দেখব। তো আমি যশোর থেকে দুটা ছেলেকে বললাম যে আমি নড়াইল যাব। তখন কিন্তু যাওয়ার পথ অত সুগম ছিল না। এবং তখন ঐ ঝরঝরে বাসে যেতে হতো। বহু পথ হেঁটে আর নৌকায় যেতে হতো। একদিন সকাল বেলা যশোর থেকে রওনা দিলাম আমরা তিনজন। এবং দশটা এগারোটা নাগাদ সুলতান ভাইয়ের ভাঙাবাড়িতে গিয়ে আমরা হাজির হলাম। সুলতান ভাই তখন একা থাকেন এবং সঙ্গে একজন মহিলা থাকেন, যিনি রান্নাবান্না করে দেন। বাঁশের একটা মাচার উপর খাঁচার ভিতরে একটা বেজি, সাপ, শকুন এসব পালেন তিনি। এবং মাচার নিচে ঐ ডাম্প জায়গায় গাঁদা মারা তাঁর ছবি। এবং আমাদের মনে হলো সেই সকাল বেলাতেই, তিনি গঞ্জিকা ছাড়া আর কিছু সেবন করেন না। তো এরমধ্যেই কথাবার্তা চলছে। হঠাৎ করে তিনি বললেন, এই আপনারা কিন্তু দুপুরবেলা আমার এখানে খেয়ে যাবেন। আমরা কিছুতেই রাজি হচ্ছি না। তিনি জোর করছেন। বলছেন, অবশ্যই খেয়ে যেতে হবে। তখন যে মহিলা সুলতান ভাইয়ের সাথে থাকতেন, তিনি আমাদের ডেকে নিয়ে বললেন, উনি যে আপনাদের খেয়ে যেতে বলছেন, বাড়িতে তো কিছুই নেই। চালও নেই। কী খাবেন? আমি আস্তে আস্তে তাকে বললাম, ভাববেন না, উনি বলে ফেলেছেন, আমরা ব্যবস্থা করছি। আমি গিয়ে তখন অশোক সেন নামে আমার সাথে যে দুজন গেছেন তাদের একজন, তাকে টাকা দিয়ে বললাম যে, বাজার করে নিয়ে আসো। তো সে, দ্রুত গিয়ে মাছ, শাক-সবজি এসব নিয়ে আসলো। আসার পরে ঐ মহিলা রান্নাবান্না করল। সুলতান ভাইসহ আমরা খেলাম। সুস্বাদু রান্না অবশ্যই। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, সুলতান ভাই একবার জিজ্ঞেসও করলেন না, এই খাবার কোত্থেকে আসলো, অথচ প্রসন্ন চিত্তে খেয়ে নিলেন! সুলতান ভাই এমনই সরল ও জগৎ সংসারের ভাবনাহীন মানুষ ছিলেন। তো সন্ধ্যায় সেই অজ পাড়া গায়ে অন্ধকার নামলে আমরা চলে এলাম। এবং দেখলাম যে সুলতান ভাইয়ের বাড়িতে ইকেট্রিসিটি নাই। আমি মনে করলাম যে এটা আমার দায়িত্ব—আমি জেলা প্রশাসক এর সাথে দেখা করে তাকে বললাম যে, আপনি আর্থিকভাবে না পারেন, অন্তত তাঁর বাড়িটায় বিদ্যুতের ব্যবস্থা করে দিন। তাতে অন্তত তীব্র শীতে একটু উষ্ণতা এই বাড়িতে তৈরি হবে। পরে আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি যে, উনি সেটা করেছিলেন।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

স্যার, শিল্পী সুলতান কি জাহাঙ্গীরনগরে গিয়েছিলেন?

মোহাম্মদ রফিক

এ ঘটনার কিছুদিন পরেই, আমি তখন জাহাঙ্গীরনগরে, তুমি তো জানোই প্রান্তিকের কাছে যে বাসাটায় থাকতাম, হঠাৎ করে একদিন দেখি যে সুলতান ভাই হাজির। কি ব্যাপার! বলে ভাই, আমি তো আপনার এখানে থাকতে এসেছি। এবং সুলতান ভাই প্রায় ছ’মাস আমার সাথে কাটিয়ে গেল। এবং উনি প্রতি সকালবেলা উঠে আমার একটা ছবি আঁকতেন। বাসা বদলে আসার পর সেই ছবিগুলি যে কোথায় হারিয়ে গেছে আর কোনো খোঁজ নেই এখন। এঁকে এঁকে তিনি আমার খাটের ওপর বিছানার নিচে রেখে দিতেন। তখন আমিও খুব মদ্যপানে আসক্ত ছিলাম। আর আমি দেখতাম উনি সকালবেলা উঠেই গাঁজা নিয়ে বসেছেন। ফরীদি (হুমায়ূন) ছিল আমাদের ছাত্র, আরেক জন ছিল মেহেদী বলে নাম, দুজনেই মারা গেছে। উনি ঐ দুজনকে দিয়ে গাঁজার ব্যবস্থা করাতেন। আমি বললাম সুলতান ভাই, গাঁজা খেলে তো শরীর নষ্ট হয়। তো, উনি খুব ছেলে মানুষ ছিলেন, অদ্ভুত অদ্ভুত সব গল্প করতেন! আমাকে বললেন যে, আচ্ছা রফিক, তো কী করি! আমি বললাম, আপনিও আমার সাথে মদ্য পান করেন। উনি রাজি হলেন। তখন আমি ফরীদিকে বললাম, ফরীদি, একটা ব্যবস্থা তো করতে হয়। তো, ও ঢাকা থেকে একটা ভালো মদ জোগাড় করল। আমরা তো বাংলা খেতাম, বুঝতেই পার। ফরীদি, সুলতান ভাই খাবে বলে একটা ভালো, বিদেশি মদ নিয়ে এল ক্যাম্পাসে। খুব আয়েশ করে আমি ফরীদি আর সুলতান ভাই বসলাম। একটু খেয়ে সুলতান ভাই বললনে, এটা তো জল, হা হা হা, এটা তো কিছু হয় না। এটা আমি খাব না। হা হা হা। (দুজনের সম্মিলিত হাসি)

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আর খেলেনই না?

মোহাম্মদ রফিক

তুমি অবাক হয়ে যাবে, উনি যে গাঁজায় একেকটা টান দিতেন, তুমি বা আমি যদি দেই ওরকম, আমি নিশ্চিত আমাদের বুক ফেটে যাবে। সুলতান ভাই সকাল বেলায় উঠে ঠিকমত কথা বলতে পারত না, কিছু করতে পারত না, কিন্তু গাঁজায় টান দেবার পরই বলত যে, এইবার ভাল্লাগছে। এই হচ্ছে সুলতান ভাই। তারপরে, আমার ছাত্ররা, তাদের বিদায় উপলক্ষে উৎসব করবে, তারা শিল্পী সুলতানকে উৎসব আমন্ত্রণ জানাবে, ওরা উনাকে আমন্ত্রণ করতে গেল, বলল যে, আপনি কোথায় থাকবেন! আমাদের টিএসসিতে গেস্ট হাউস আছে, ওখানে আমরা ব্যবস্থা করতে পারি আপনি চাইলে। বলল, রফিক ভাই আছে না? ওরা বলল, যে, হাঁ আছে। উনি বললেন, তাহলে গেস্ট হাউসে থাকব কেন? রফিক ভাইয়ের ওখানে থাকব। তো আমার ছাত্রদের একজন কবির এসে বলল যে স্যার, সুলতান ভাই তো বলছে আপনার এখানে থাকবে। তো আমি বললাম, ঠিক আছে, থাকবে। তখন তিনি গাঁজা টাজা ছেড়ে দিয়েছেন, কিন্তু প্রচণ্ড কাশি। এবং কিছুদিন আমার এখানে থাকলেন, জাহাঙ্গীরনগরে মুক্ত মঞ্চ থেকে সম্বর্ধনা নিলেন, এরপর তো ফিরে গিয়ে মারা গেলেন। আমার ধারণা সুলতান ভাই খুব সরল ধরনের, সাহসী লোক ছিলেন, নিজের কল্পনার জগতে বিচরণ করতেন।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আপনারা দুজনেই এই অঞ্চলের মানুষের যাপনের মূল সুরটা ধরেছেন, নিজেদের সৃষ্টি কর্মে প্রোথিত করেছেন—

মোহাম্মদ রফিক

করতে পেরেছি কিনা জানি না, তবে আমি এখনো চেষ্টা করে যাচ্ছি। এই হচ্ছে আমার সাথে সুলতান ভাইয়ের সংশ্রব। তবে আমার মনে হয় যে, সুলতান ভাইয়ের এই নেশায় থাকার সুযোগ নিয়ে এই দেশে অনেকে অনেক সুবিধা বাগিয়ে নিয়েছে। অনেকেই ব্যবসা করছে এই দেশে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

এখনো করছে।

মোহাম্মদ রফিক

আমি তোমার সাথে একমত, এখনো করছে। আমার সময়ের দুই বড় শিল্পী সুলতান ভাই এবং কামরুল হাসান, দুজনের সাথেই আমার খুব হৃদ্যতা ছিল। এমনকি  কাইয়ুম ভাইয়ের সাথেও।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

হাঁ, সময়ের বড় শিল্পীরা সকলেই আপনার বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন। কপিলা’র প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ তো করেছিলেন কাইয়ুম চৌধুরী।

মোহাম্মদ রফিক

এবং কপিলা’র প্রচ্ছদের তো একটা গল্প আছে। কপিলা কিন্তু আমি লিখেছিলাম মাত্র, আমার আবার হয় কী এক এক সময় তাগিদ আসে লেখার…

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

এটা জানতে চাই, স্যার। এটা কি ঐশী?

মোহাম্মদ রফিক

না। তা বলব না। হয়তো এটা দীর্ঘদিনের প্রস্তুতির ব্যাপার। এবং সেই প্রস্তুতি সম্বন্ধে আমি তেমন সচেতন থাকি না। হঠাৎ করে, আমার মধ্যে একটা ঘটনা বা কোনো একটা টানাপোড়েন, কাছের মানুষের কোনো ঘটনা, মান-অভিমান বিভিন্ন ভুল বোঝাবুঝি আমার মধ্যে এক ধরনের আবেগ তৈরি করে। সেই আবেগটাই তাগিদাটা তৈরি করে। এমন হয়েছে যে, আমি একদিনে সাতটা আটটা কবিতাও লিখেছি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

সম্প্রতি আর্টসে ভিডিওসহ ছাপা হওয়া কবিতাগুলিও এই মে মাসের মধ্যেই লেখা দেখলাম।

মোহাম্মদ রফিক

এবং আমি বেহুলাও লিখে ফেলেছি অনেক। তোমাকে আমি দেখাতে পারি পাণ্ডুলিপিটা, তুমি দেখলে অবাক হয়ে যাবে। এবং আমি মহুয়া যে লিখছি সেটারও একই অবস্থা—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

দেখব স্যার, কথা শেষ করি। স্যার, মহুয়া বলতেই সেলিম স্যারের কথা মনে পড়ল। আপনার বন্ধু এবং শত্রু একসাথে বলা যায়। জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থীদের আপনারা দুজন দুর্দান্ত কিছু সময় ও অভিজ্ঞতা উপহার দিয়েছেন। ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক বলয় গড়ে তুলেছেন। আপনার শেষ সময় পর্যন্ত খুব অল্পকালের, আমার যে অভিজ্ঞতা তাতে বলতে পারি, একটা অনিন্দ্য সুন্দর সময় আপনারা দুজনই জাহাঙ্গীরনগরকে দিয়েছেন। এবং এই ২০১৫ সালে বসে বলতে পারছি, এখন বাংলাদেশে যারা খারাপ লিখছে না, ভালো লিখছে তাদের বিশাল একটা দল আপনাদের দুজনের স্নেহছায়া পেয়ে বড় হয়েছেন। আপনারা থাকায় তাদের প্রস্তুতিটাও হয়েছে বেশ মজবুত।

মোহাম্মদ রফিক

শোন, সেলিম এবং আমি, সেলিম মনে হয় চাকরিতে যোগ দিয়েছে আমার মাস ছয়েক আগে। আমি গিয়ে দেখি যে সেলিম আছে। তার আগে থেকেই ছিল আর কি! এবং আমি থাকতে থাকতেই ও মারা গেল। ওর সাথে  আমার একটা অদ্ভুত সম্পর্ক ছিল। সেটা আমি—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

ঠিক মারা যাওয়ার পরপর আপনি একটি দৈনিকের পাতায় লিখেছেন, বড় আবেগঘন সে লেখা, তার শিরোনাম—

মোহাম্মদ রফিক

আমি মনে করি যে, আমি জানি না আমাদের কাজ কতটা কী হয়েছে, কিন্তু আমি মনে করি আমাদের মধ্যে দেওয়া-নেওয়াটা দুইজনকেই প্রচণ্ডভাবে সাহায্য করেছে। এবং সেলিম একদিন প্রান্তিকে আমাকে বলছে যে, আপনি কী লেখেন কী পড়েন তা জানতে আমি আপনার পেছনে স্পাই লাগিয়ে রাখি। এবং এই ধরনের ঘটনা কিন্তু বাংলাদেশে আর নেই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

বিরল!

মোহাম্মদ রফিক

বিরল না শিমুল, নেই। দুইজন সৃষ্টিশীল লোক, যে মানেরই হোক, একজন তিনতলায় আরেকজন দোতলায় থাকত শুরুতে, পরে ও দোতলায় আমি নীচতলায়, রুম থেকে বেরুলেই দুজনের চেহারা দেখা যেত। তার আগে একজন দোতলায় আর একজন নিচতলায় চাকরি করছে। এই যে ঘটনাটা, আমার মনে হয় না যে বাংলাদেশে, কোনো সাহিত্য চর্চায় এটা আর ঘটবে! আমার সেই অর্থে ইলিয়াস ছাড়া কোনো বন্ধু না থাকলেও আমি সেলিমকে আমার বন্ধু মনে করি। কারণ, সেলিমকে দিয়ে আমি উপকৃত হয়েছি, সেলিমও উপকৃত হয়েছে। দুজনের চরিত্রগতভাবে কিছু অমিল ছিল। ওর চরিত্র ঠিক আমার সঙ্গে যেত না আর কী!

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আপনাদের অনুসারীদলও তো ভিন্ন ছিল, স্যার।

মোহাম্মদ রফিক

অনুসারীরা কখনো আসল লোক হয় না। অনুসারীরা কখনোই বুঝবে না আসলে ওর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা কী ছিল! কিন্তু এমন ধর আছে কেউ কেউ যারা দুইজনেরই অনুসারী ছিল। যেমন আমি ফরীদি নাম বলব। ফরীদি যেমন ধর দুজনের সাথেই তাল রেখে চলেছে। সুতরাং একেবারে যে আলাদা ছিল তা না। এমন কী আনু মোহাম্মদও তাই। আনুর সাথে দুজনের সম্পর্কই খুব ভালো ছিল। যদিও আনু ঠিক সৃষ্টিশীল লেখক না, স্কলার, অন্য জগতের লোক, এরকম আরো দু-একজন আছে যাদের উভয়ের সাথে ভালো সম্পর্ক ছিল। তবে কবিতা কেন্দ্রিক যেসব সম্পর্ক তোমাদের সাথে, তোমাদের আমি অনুসারী মনে করি নি কখনো, তোমরা আমার সহযাত্রী। ফজল মাহমুদের কথা বলতে হয় যে মারা গেছে। ওর সাথে দুইজনেরই ভালো সম্পর্ক ছিল।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

সুনীল সাইফুল্লাহ?

মোহাম্মদ রফিক

সুনীলের সাথে সেলিমের সম্পর্ক ছিল না। সবসময় নিজের ভেতরে থাকত। আত্মমগ্ন। ওর কিছু প্রবলেমের কথাও আমাকে বলেছিল। আমার মনে হয় শেষ পর্যন্ত ওর আত্মঘাতী হবার কারণও ওটাই। সুমন (রহমান), কফিল (আহমেদ) কিংবা (মাহবুব) পিয়ালের কথা বলতে পার, ওরা যেমন আমার সাথেই আড্ডা দিত বেশি। শামীমের (শামীম রেজা) আবার দুজনের সাথেই ভালো সম্পর্ক ছিল।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

তো স্যার, দীর্ঘ সময় শিক্ষকতা করে অবসর নিয়েছেন। জাহাঙ্গীর নগরের শিক্ষার্থীরা আপনাকে গ্রান্ডফেয়ার ওয়েল দিয়েছে, তা বিভাগে, বিভাগের বাইরে, উভয় জায়গায়ই।

মোহাম্মদ রফিক

ঐ প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে একটা কথা তোমাকে বলে নেই, মনে পড়েছে, আমরা যখন ষাটের দশকে লিখতে শুরু করেছিলাম, আমাদের মধ্যে এক ধরনের নির্বেদ এবং অবক্ষয়বোধ কাজ করত। সেটা কিন্তু সবার মধ্যেই ছিল। এমনকি আমি রবীন্দ্রনাথের বলয়ে থাকলেও, আমার মধ্যেও সেটা কাজ করেছে। সাতষট্টি সালে, আমি তখন চট্টগ্রামে চাকরি পেয়ে গেলাম। চট্টগ্রামের ভূমণ্ডল কিন্তু একটু আলাদা, পাহাড়, সমুদ্র, আমাদের দক্ষিণ বঙ্গ সেই তুলনায় সমতল।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

বাগেরহাট, খুলনা হয়ে চট্টগ্রাম!

মোহাম্মদ রফিক

হাঁ, আমার মূল ভূমি কিন্তু দক্ষিণ বাংলা, বরিশাল, বাগেরহাট এইসব জায়গা। বরিশাল বাগেরহাটের মধ্যে কিন্তু প্রাকৃতিকভাবে খুব একটা পার্থক্য নেই। যেটা আছে বরিশাল ও চট্টগ্রামের মধ্যে। যা বলতে চাচ্ছিলাম, তারপরে, তো সেই পাকিস্তানি নির্বেদ ও অবক্ষয় বোধ কাটিয়ে ওঠার একটা তাগিদ, অনুভব, চেষ্টা ছিল আমাদের মধ্যে। আমার মধ্যে বিশেষ করে, বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের বক্তৃতা একটা বিরাট তোলপাড় ঘটিয়েছে। এবং এটা নিয়ে আমি লিখেছি একটা কবিতা, ব্যাঘ্র বিষয়ক এ। ঐ বক্তৃতা শোনার পরে আমার হঠাৎ মনে হলো আমি এতদিন শেয়াল ছিলাম, বক্তৃতা আমাকে বাঘে রূপান্তরিত করে দিল। তারপরই লেখা কবিতা ব্যাঘ্র বিষয়কআমি যে বঙ্গবন্ধুকে বাঘ বলেছি তা না, ঐ সাতই মার্চের ভাষণ শুনে আমার ভেতরে যে অনুভূতিটা হয়েছিল সেটাকে আমি ঐভাবে ধরার চেষ্টা করেছি। সেই বক্তৃতাকে আমার মনে হয়েছিল একটা শ্রেষ্ঠ কবিতা। আমার মনে হয়, যারা শুনেছিল সেই বক্তৃতা, তারা প্রত্যেকেই—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

শৃগাল হইতে ব্যাঘ্রে রূপান্তরিত হইয়া ছিল!

মোহাম্মদ রফিক

হ্যাঁ। যখন পঁচিশে মার্চ পাকিস্তানিরা ক্র্যাক ডাউনটা করল তারপর আমি মানুষের যে চেহারা আমি দেখেছি, এটা আমি আমার ছাত্রদেরকেও বলেছি, সেই চেহারা আজকে আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যখন আমি শুনি যে একটা গারো মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়েছে, তখন আমি অবাক হয়ে যাই, কারণ বাঙালি এরমক নয়। আমি এই জাতির সবচেয়ে বড় বিপদের সময়ও তাদের যে চেহারা দেখেছি, এই চেহারা তাদের ছিল না।


পাহাড়ের চূড়ায় পাক আর্মির টহল চৌকি আছে, দেখলেই গুলি করে দেবে। গুলি চালালে সবাই মারা পড়বেন। সুতরাং যেতে হলে আপনাদের সব কাপড় খুলে ফেলতে হবে। মেয়েরা শুধু ব্রা-পেন্টি রাখতে পারবে। আর ছেলেরা শুধু আন্ডার অয়্যার।


শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আপনার দেখা চেহারা কেমন, স্যার?

মোহাম্মদ রফিক

এটা শুনলেই বুঝতে পারবে। ক্র্যাক ডাউনের পরে আমরা যখন ভারত যাচ্ছি পালিয়ে, আমাদের দলে কমসেকম দুইশ জন লোক ছিল। তাদের ভেতরে ৬৫ বছরের বিধবা থেকে শুরু করে, ১৬, ১৭ বছরের নারী পর্যন্ত ছিল। আমরা টিলাময় রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি, হঠাৎ করে বৃষ্টি হলো। রাস্তা ভয়ঙ্কর পিচ্ছিল হয়ে গেল। কেউ পা ফেলতে পারছে না। পা পিছলে যাচ্ছে। তখন আমাদের যে লিডার ছিলেন, তিনি বললেন, আপনারা একজন আরেকজনের মাজায় ধরেন। আমার সামনেই একজন তরুণী ছিলেন, ১৭/১৮বছর বয়স হবে…

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আপনার গল্প সংগ্রহে এই যাত্রা নিয়ে একটা দুর্দান্ত গল্প আছে।

মোহাম্মদ রফিক

হাঁ, গল্পে আমি লিখেছি তো, সেই তরুণী, আমি খুব ইতস্তত করছি তাকে ধরতে, সে আমাকে বলল, আপনি তো পড়ে যাবেন, আপনি আমাকে ধরেন, হাঁ, এবং জানো, আমার তাকে ধরে কিছুই মনে হলো না। এবং তারপর আমরা যখন ইসে, বর্ডার পাড় হব, লিডার বললেন, আপনারা যে দুই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে যাবেন, এই কাপড় চোপড় পড়ে তো আপনারা পার হতে পারবেন না। পাহাড়ের চূড়ায় পাক আর্মির টহল চৌকি আছে, দেখলেই গুলি করে দেবে। গুলি চালালে সবাই মারা পড়বেন। সুতরাং যেতে হলে আপনাদের সব কাপড় খুলে ফেলতে হবে। মেয়েরা শুধু ব্রা-পেন্টি রাখতে পারবে। আর ছেলেরা শুধু আন্ডার অয়্যার। আর কিচ্ছু না। সেই অবস্থায় যখন আমরা পার হচ্ছি। বৃষ্টি হচ্ছে। তখন ঐ যে ৬৫ বৎসরের বিধবা ছিলেন, তিনি পা পিছলে একেবারে কাদায় পড়ে গেলেন। আমি ধরতে গেলাম, দেখি পাঁচছয়টা যুবক একসাথে ধরতে এসেছে। তাদের বয়স আমার চেয়ে কম। ওরা বলল, আমরা থাকতে আপনি কেন? আমিও যুবকই কিন্তু তখন। আমি কিন্তু তখন মাত্র ২৯।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আমার এখনকার বয়সী, স্যার।

মোহাম্মদ রফিক

12736218_1096701333703743_1719358961_nআমি বললাম যে ঠিক আছে, ধরেন সবাই ধরেন। সবাই ধরে তাকে প্রায় কাঁধে করে, ঘাঁড়ে করে নিয়ে গেল। এতগুলো মানুষ আমরা পার হলাম, যাওয়ার পর আমি এ কজনের মুখ কালো দেখলাম না, সবাই হাসি মুখ, কেউ বলতে পারল না যে কেউ কারো সাথে কোনো খারাপ ব্যবহার করেছে। আমরা পঁচিশে মার্চের পরে যে বাড়িতে আশ্রয় নিলাম, সেই বাড়িতে, ছোট্ট একটা বাড়িতে বিশ্বাস করবা না, গরীব গৃহস্থের বাড়ি, সুজিত দস্তিদারের বাড়ি, ৯৯জন লোক আশ্রয় নিলাম, তাদের খাওয়াও জুটল, সবই জুটল। সারা বছরের খোরাকের গোলা খালি করে দিয়ে। এবং কয়েকদিন পরে দেখা গেল আর কিছুই নাই। ভদ্রলোক বাড়িতে আমাদের রেখে পটিয়ায় বাজার করতে গেলেন, সেইদিন পাকিস্তানি আর্মি বম্বিং করল ঐ এলাকায়। তার ঊরুতে স্প্লিন্টার লাগল, ঊরুতে এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে গেল। আহত অবস্থায় সুজিত দস্তিদার আশ্রিতদের জন্য বাজার নিয়ে, চাল ডাল নিয়ে বাড়ি ফিরল। এবং সেইদিন আমাদের ক্যাপ্টেন হারুন ছিল, পরে তো সে মেজর জেনারেল টেনারেল হয়ে রিটায়ার করেছেন, হারুন আহত হয়ে ঐ পটিয়ায় হেল্থ কমপ্লেক্সে চিকিৎসা  নিতে আসল। আমি দেখতে গেলাম। সেখান থেকে ফিরছি, দেখি এক ভদ্রলোক, বুক পর্যন্ত শুভ্র শাদা বড় দাঁড়ি, কাঁদছে আর মোনাজাত করছে— “হে আল্লাহ, এই জালেম পাকিস্তান তুমি ধ্বংস করে দাও’। আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখি তার দুচোখ বেয়ে ঝরঝর করে পানি পড়ছে। খুব সম্ভ্রান্ত উচ্চ বংশের মুসলমান হবেন। তার চোখে পানি দেখে আমি দাঁড়ালাম। উনি মোনাজাত শেষ করলেন, বললেন, খোকা তুমি কে? আমি পরিচয় দিলাম। বললাম যে দস্তিদার বাড়িতে থাকছি। উনি বাড়ির পথ বলে দিয়ে বললেন, তুমি আমার বাড়িতে যেও। সন্ধ্যা বেলায় আমি গেলাম। তখন উনি আমাকে বললেন, দেখেন, আপনি আমাকে কাঁদতে দেখে মনে হয় অবাক হয়ে গেলেন! শোনেন, এই পাকিস্তানের জন্য আমরা কী না করেছি! শুধু জান দিতে বাকী রেখেছি। আর সবই তো করেছি। কিন্তু আজকে এই পাকিস্তান একটি জালেম রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। সেইদিনই আমি বুঝলাম যে পাকিস্তান থাকছে না। মানে, আমার মধ্যে বিশ্বাসটা বদ্ধমূল হলো, এই পাকিস্তানের ভাঙন অবশ্যাম্ভাবী।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

স্যার, সাতই মার্চে তো—

মোহাম্মদ রফিক

পাকিস্তানের মৃত্যু হয়ে গেছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আমি বলছিলাম, স্বাধীনতার ঘোষণা একভাবে চলে এল—

মোহাম্মদ রফিক

অবশ্যই, যদি কেউ অস্বীকার করতে চায় আমি বলব তার কোন বোধ নেই। মনে রেখ, ইতিহাসের বহুকথা অব্যক্তই থেকে যায়!

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রূপকার্থে থেকে যায়, স্যার!

মোহাম্মদ রফিক

হাঁ, রূপকার্থে থেকে যায়! সুতরাং ঐ রূপক বাস্তবের চেয়ে অধিক বাস্তব।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

স্যার, সাতই মার্চের পর শৃগাল থেকে ব্যাঘ্রতে পরিণত হলেন—

মোহাম্মদ রফিক

তুমি যদি আমার আগের লেখা পড়ো, বৈশাখী পূর্ণিমায়কীর্তিনাশা যদি মিলিয়ে পড়, তাহলে বুঝবে আমি নতুন জন্ম নিয়েছি। তোমাকে তো আমি বলেছি, মুক্তিযুদ্ধ নতুন আমাকে জন্ম দিয়েছে। এবং আমার পিতা শামসউদ্দীন আহমেদ, কিন্তু পুনর্জন্মের পিতা হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

স্যার, আপনি তো মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এক নম্বর সেক্টরের সাথে যুক্ত ছিলেন, এবং পলিটিক্যাল অফিসার হিশেবে ছিলেন। এই বিষয়গুলো নিয়ে আপনি কখনোই প্রকাশ্যে বলেন নি, দেনা-পাওনার হিশেব করেন নাই। অনেক কবি সাহিত্যিকই সেটা করেছেন, সুবিধা নিয়েছেন। এই বিষয়গুলো আপনি কখনোই রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগান নাই, বা তুলে ধরেন নাই। কেন?

মোহাম্মদ রফিক

না, এটা তো আমার কাজ না। আজকে আমি তোমাকে বলি, অনেক জায়গা আমি বিভিন্নভাবে কাজ করেছি। যেমন বগুড়া, রাজশাহীতেও আমার ভূমিকা আছে, রাজশাহীতে অনার্স তৃতীয় বর্ষে থাকা অবস্থায় আমাকে বের করে দেওয়া হয়েছে, রাস্ট্রিকেট করা হয়েছে, আমি যে আজকে আমার এ অবস্থানে পৌঁছেছি, সেটা আমার কর্মগুণে, ভাগ্যগুণে বলব না। সেসব কথা আমাকে কখনো লিখতে হবে ভাবি নি। সে আবার আরেক ধরনের ইতিহাস। এসব কথা যে আমাকে বলতে হবে তা আমি কখনো বিশ্বাস করতাম না। আমি মনে করতাম আমার ব্যক্তি কর্ম অন্তরালে থাক, আমার লেখাই সামনে আসুক।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

কিন্তু ব্যক্তির যে যাপন বা প্রভাব বলয় তা অনেক সময় লেখকের লেখায়ও ভূমিকা রাখে।

মোহাম্মদ রফিক

এখন মনে হয় রাখে। এসব আমি এখন না হয় ভবিষ্যতে যদি সময় পাই কিছু কিছু লিখব।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

মুক্তিযুদ্ধের ঐ সময়টার আপনি যে ঘটনাগুলো বললেন, আপনি গেলেন এবং ষোলই ডিসেম্বর আমরা—

মোহাম্মদ রফিক

আচ্ছা, তুমি মুক্তিযুদ্ধের ঘটনার কথা বলছ, আমি তখন এক নম্বর সেক্টরে কাজ করি, মেজর রফিক তখন এক নম্বর সেক্টরে ছিলেন। আমি সেখানে কাজ করতাম বেতনও পেতাম। পরে আমি সেখান থেকে গিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতারে কাজ করা শুরু করি। কিন্তু এসব ব্যাপার মিলিয়ে আমি যে মুক্তিযুদ্ধে সক্রীয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছি, তার কাগজপত্র তো আমার কাছে ছিল। পরে আমি যখন ঢাকায় এসে নামলাম, আমার মনে হলো আমি তো এই কাগজ পত্রগুলো আমার নিজের সুবিধার্থে ব্যবহার করতে পারি। কিন্তু আমি মুক্তভাবে এই দেশ থেকে গিয়েছিলাম, মুক্তভাবে ফিরতে চেয়েছি। সমস্ত কাগজপত্র রানওয়েতে উড়িয়ে দিয়ে আমি দেশে প্রবেশ করেছি। ঢুকে দেখলাম, আমি মনে হয় দেশে ফিরলাম এগারোই জানুয়ারি, ১৯৭২, তখন সেখানে আমাকে অনেক কিছু বুঝিয়ে দিতে হয়েছিল বলে ফিরতে একটু দেরি হয়। ফিরে দেখি, আমার চাকরি নেই। আমি তখন নোমান সাহেবের কাছে যাই। উনি তখন শিক্ষা দপ্তরের দায়িত্বে আছেন। আমি গিয়ে বললাম, স্যার, আমার তো চাকরি নাই। তিনি হাসতে হাসতে বললেন, আমি জানি তুমি দেশের জন্য কী করেছ। সুতরাং তুমি যাও, তোমার চাকরি আছে। আমি গিয়ে চিটাগং এ যোগ দিলাম। যাওয়ার কিছুদিন পর—আমি আবার নোমান স্যারের প্রিয় ছাত্র, আমি, ইলিয়াস (আখতারুজ্জামান) উনার ছাত্র, মান্নান (সৈয়দ) উনার ছাত্র। আমি ঢাকা কলেজে আসলাম। এক লোক আমার কাছে আসলেন। তিনি বললেন তিনি মুক্তিযোদ্ধা। আমি তখন অবাক হলাম। কী বলেন এসব। আমি আপনাকে একুশ না জানি ছাব্বিশে ডিসেম্বর কফি হাউসে দেখেছি, আপনি তখন আমাকে বলেছেন, আপনি ঐ দিনই দেশ থেকে এখানে এসেছেন, তাহলে আপনি কিভাবে মুক্তিযোদ্ধা হোন! তিনি, হে হে করছেন, আমতা আমতা করছেন, আমি তো অবাক। তখন আমি তাকে বললাম, আমি তো জানি আপনি মুক্তিযোদ্ধা না। আসলে আমি এটাও জানি, এদেশে অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছেন, যারা সত্যিকার অর্থেই মুক্তিযোদ্ধা, যাদের কোনো সার্টিফিকেট নেই, এবং আমরা করলাম কী! আমরা মুক্তিযুদ্ধের পর সকল যোদ্ধাদের অস্ত্রহীন করে গ্রামে গ্রামে, তাদের গ্রামে পাঠিয়েদিলাম, দিয়ে দেশটাকে দখল করার চেষ্টা করলাম। এখান থেকেই আমাদের বিয়োগান্তক কাহিনির শুরু। আমার কিছু গল্পে এসব ঘটনা আছে। এবং লেখার চেষ্টা করেছি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

স্যার, মুক্তিযুদ্ধের ৪৪ বছর চলে গেছে। আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছি। এবং বিশ্ব রাজনীতিতেও আমরা অবদান রাখতে শুরু করেছি।

মোহাম্মদ রফিক

আরো অনেক অবদানই আমাদের থাকবে। আমি তো মাকে একটা কথা বলি, তুমি যখন আমাকে এই প্রশ্নটি করেছ তখন আমি বুঝেছি, আমি যখন আইওয়াতে গেলাম, তখন আমার কাছে ব্যাপারটি স্পষ্ট হলো। বিশেষ করে লাটিন আমেরিকা বা আফ্রিকা বা অন্যান্য দেশের লেখকদের সাথে আমার বন্ধুত্ব হলো। আমি বোঝালাম, তাদের বললাম, তারাও জানতে আগ্রহী হলো, আমি তখন বুঝলাম, বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের এত উৎসাহ কেন! আমরা সাধারণত বলে থাকি, আমাদের দেশে গ্যাস তেল পাওয়া যায়, এসব তাঁরা দখল করতে চায়। কথাটা কিছুটা হলেও সত্য। তুমি দেখ, পৃথিবীর এই যে মানচিত্র, এই মানচিত্র তৈরি করেছেন কারা?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

ব্রিটিশরা?

মোহাম্মদ রফিক

শুধু ব্রিটিশরাই নয়, পশ্চিমারাও। আমরা যাদের পশ্চিমা বলি, আমাদের দেশের সীমারেখা নিয়ে যাদের সমস্যা, আবার ভারতের সাথে চীনের, বা চীনের সাথে অন্যান্য দেশের। তেমনি লাতিন আমেরিকায়ও সীমান্ত সমস্যা আছে। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে এ সমস্যা লাগিয়ে রেখেছে। এখানে শুধু বৃটিশরা একা না, টোটাল পশ্চিমাজগৎ। তার সাথে যুক্ত আমেরিকাও। এখন আমাদের এখানে কারা সমস্যা তৈরি করেছেন, লাইবেরিয়ায় কারা তৈরি করেছে, ওরা। আর বাংলাদেশ তৈরি করেছে কারা! স্বাধীন করেছে কারা?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আমরা।


সাহিত্যে নোবেল পাওয়ার চেয়ে বিজ্ঞানে নোবেল পাওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেদিন যদি জগদীশ চন্দ্র বসু নোবেল পেয়ে যেতেন, তাহলে এর প্রভাব বাঙালি জাতির উপর অন্যরকমভাবে পড়ত। তখন হয়তো হিন্দু মুসলমান রায়ট বা ৬৫ এর ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ সম্ভব হতো না।


 মোহাম্মদ রফিক

তবে এটা ঠিক যে আমরা ভারতের কাছ থেকে সাহায্য নিয়েছি, রাশিয়ার কাছে সাহায্য নিয়েছি। আর আমেরিকা যখন স্বাধীন হয় তখন তারা কি ফ্রান্সের কাছে সাহায্য নেয় নি? পৃথিবীর প্রত্যেক দেশই তাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে অন্যদেশের সাহায্য নেয়। আমরাও নিয়েছি। এটাকে বড় করে দেখার কিচ্ছু নেই। কিন্তু আমাদেরকে স্বাধীন করেছি আমরা। এটা আমাদের আত্মশক্তির জায়গা। এবং এই জায়গাটার কথা ওরা জানে। এবং ওরা জানে, আমরা যদি দাঁড়াই মাথা তুলে, আমরা পৃথিবীটাকে কাঁপিয়ে দিতে পারি। শোনো, তোমাকে আমি একটা কথা বলি, যে কথা আমি আমেরিকায় গিয়ে বক্তৃতায় বলেছি, নোবেল পুরস্কার যদি কোনো সভ্যতার মানদণ্ড হয় তবে আমরা বাঙালিরা তোমাদের চেয়ে তেইশ বছর এগিয়ে আছি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

কিভাবে?

মোহাম্মদ রফিক

আমরা বাংলাতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছি ১৯১৩ সালে, আর তোমরা (আমেরিকানরা) পেয়েছ ১৯৩৬ সালে। সো, ডোন্ট ফরগেট ইট। এবং আমি বলি, আজ রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কারটি শুধু রবীন্দ্রনাথের জন্যই সৌভাগ্য বহন করে না, সমগ্র বাঙালি জাতির জন্য এই সৌভাগ্য বহন করে নিয়ে এসেছে। এটা কেউ ভাবে না! রবীন্দ্রনাথকে নোবেল দেওয়ার পেছনে বৃটিশ শক্তি কাজ করেছে। আর ওরা ভেবেছিল রবি দ্বারকানাথ ঠাকুরের বংশধর, জমিদার, আমরা ওকে পার্মানেন্টলি আমাদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারব। কিন্তু সেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন জালিয়ান ওয়ালাবাগের হত্যার প্রতিবাদে নাইট উপাধি ত্যাগ করল, এবং চিঠিটি লিখল প্রত্যাখ্যানের, সেটা এক কথায় অসাধারণ ছিল। ওদের মুখের মধ্যে থুতু মেরে দিল। তখন তারা বুঝল, আরে, এটা কী হলো! তারপরের কাজটা করল সুভাষবসু। সুভাষবসু যখন তাদের চাকরি ছেড়ে লাথি মেরে চলে আসলো, তখন তারা বুঝল, খবরদার, বাঙালিকে তো একসাথে রাখা যাবে না। রাখলে ওরা আমাদের উপরই খবরদারী করবে। সো, ডি ভাইড অ্যান্ড রুল। তুমি দেখবে ওরা একই ভাবে চেষ্টা করেছে রবীন্দ্রনাথ যেন নাইট পায়, আবার জগদীশ চন্দ্র বসু যেন নোবেল না পায়। তারা বুঝেছে, সাহিত্যে নোবেল পাওয়ার চেয়ে বিজ্ঞানে নোবেল পাওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেদিন যদি জগদীশ চন্দ্র বসু নোবেল পেয়ে যেতেন, তাহলে এর প্রভাব বাঙালি জাতির উপর অন্যরকমভাবে পড়ত। তখন হয়তো হিন্দু মুসলমান রায়ট বা ৬৫ এর ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ সম্ভব হতো না। এবং ধরো, আমরাই ইউবিরোধী বা ইহুদীবিরোধী, ইহুদীরা যে কাণ্ড কারখানা করেছে, তাতে আমরা তাদের বিরোধী না হয়ে পারি না। কিন্তু আমরা চাই ইহুদীরা তাদের অধিকার পাক। অবশ্যই পাক। সেটা কারো প্রতিশ্রুতির ভেতর দিয়ে না, তারা নিজেদের যোগ্যতায় সেটা পাক। তবে ইহুদীরা পৃথিবীতে চেতনার দিক দিয়ে বিরাট শক্তি। মানুষ শুধু অস্ত্র দিয়েই পৃথিবী শাসন করে না। এক অর্থে ইহুদীরাই পৃথিবী শাসন করছে। কারণ আমেরিকা যে খবরদারী করে সেটা তৈরি করেছে কারা!

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

ইংরেজরা।

মোহাম্মদ রফিক

12825168_1096701337037076_279384043_nএকটা কথা, আজ যদি বাংলা অবিভক্ত থাকত, তাহলে দেখতে এ অঞ্চলের শুধু নয়, পৃথিবীর চিন্তা চেতনার সর্বক্ষেত্রে অধিকারটা বাঙালিরই থাকত। এবং সেটাকে ভাঙার জন্য ১৯১৯ সাল থেকে ইংরেজরা উঠে পড়ে লেগেছে। সেটা তারা বাস্তবায়ন করেছে। তুমি তাকালে দেখবে ১৯৩৬ এর আগে হিন্দু মুসলমান মারামারি হয়েছে? মারামারি তো অন্য বিষয়, জমি নিয়ে মারামারি বা সীমানা নিয়ে মারামারি, কিন্তু যাকে বলে সাম্প্রদায়িক দাঙা, সেটা কিন্তু ৩৬ এর আগে এ অঞ্চলে হয় নি। এটা ইংরেজের একটা প্লান। শুধু ইংরেজরা বলব না, সমস্ত উপনিবেশবাদীরা চক্রান্ত করেছে। এবং তারা বুঝাতে চেয়েছে আমরা অসভ্য, আমরা অমুক-তমুক, আমরা এটা জানি না, সেটা জানি না। তারা সব জানে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

স্যার, অরুণ সেনের মতো লোক আপনার কবিতা নিয়ে অসাধারণ দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছেন। সনৎ কুমার সাহা, গত বছর একুশে পদক পেলেন, নিয়মিতই লিখেছেন আপনার উপর। তথাপি, আমাদের সমালোচনা সাহিত্যে তো, আসলে সংকট আছে, তার মধ্যে এই পাওয়াগুলি কি ভাবে দেখেন?

মোহাম্মদ রফিক

তখন তো তোমাকে বললাম, ইদানিং শুনছি যে সুধীর চক্রবর্তী লিখেছেন। আমি লেখাটা হাতে পাই নি। হাতে পেলে তোমাকে বলতাম। সেখানে তিনি বলেছেন, আমি শুনেছি ঐ পত্রিকায়, আমার কপিলা উনার ভালো লেগেছে। আমার কিন্তু ঐ ব্যাপারে কোনো দুঃখ নেই। আমি বাংলা সাহিত্যের দুজন প্রধান লেখক, অরুণমিত্র তারপর আবদুল কাদীর সাহেব তাদের প্রশংসা পেয়েছি। আমাকে মুখোমুখি বলেছেন, অন্যের সামনে বলেছেন।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

জ্বি স্যার। অন্য একটা প্রসঙ্গে যাই। সেটা হলো আপনি তো বললেনই স্যার, বাংলা কবিতায় আপনি হলেন রবীন্দ্রবাদী।

মোহাম্মদ রফিক

রবীন্দ্রবাদী মানে ঐ বলয়ের।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন 

ঐ বলয়টা স্যার কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

মোহাম্মদ রফিক

বৈষ্ণব পদাবলী বা গীতিকা বা আমার ইতিহাস হলো বাঙলার সংস্কৃতি। বাঙলার যে আবহমান সংস্কৃতি লালন এবং যার ভিতরে এবং বিশেষ করে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের একটা বিরাট ভূমিকা আছে, তুমি দেখো, এই দক্ষিণাঞ্চলই কিন্তু সেই অর্থে, এক অর্থে বাঙলার সংস্কৃতিকে তৈরি করেছে। তুমি মাইকেল বলো, রবীন্দ্রনাথ বলো, লালন বলো এরা সবাই এখান থেকে উঠে এসেছেন। হাসন রাজা বলো, সবাই কিন্তু এখান থেকে উঠে আসছে। দক্ষিণবাংলা বাঙলার জল, মাটি হাওয়ার বাঙলা। এবং আমি চেয়েছি, আমি মনে করি, আর্টারী, এই রক্তনালী যাকে বলে। বাঙলার রক্তনালী হচ্ছে বাঙলার নদী, বাঙলার জল এবং আমি চেয়েছি যে আমার কবিতায় যেন শেষ পর্যন্ত জল কথা বলে, নদী কথা বলে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

হাওয়া কথা বলে!

মোহাম্মদ রফিক

হাওয়া কথা বলে, মাঝি কথা বলে, পাখি কথা বলে । হাঁ, আমি এটাই চেয়েছি এবং আমি এখনও যদ্দিন আমি বেঁচে থাকব, এটাই চেষ্টা করে যাব।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

সংলাপের কিছু ব্যবহার আপনি কবিতায় খুব সফলভাবে করেছেন এবং সেটা এমন একটা সময়, ষাটের দশক মানে হলো, ষাটের দশক থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কবি আমাদের সাহিত্যে দাঁড়িয়েছেন নিজেদের স্বাতন্ত্র্য নিয়ে। আপনি স্যার সংলাপের এক ধরনের মজার ব্যবহার করেছেন, যেমন কপিলা বাগাওদিয়া কিংবা রূপকথা কিংবদন্তির মধ্য দিয়ে যেগুলো আছে। যেমন—প্রথম ও দ্বিতীয় বইয়ের মধ্যেও সেই জিনিসগুলো আছে। যেটা জানতে চাই স্যার, ষাটের দশকের পরে সত্তর, আশি, নব্বই, এই সময়ে আমরা আসলে সেই রকম শক্তিমান কবি আর সেভাবে পাচ্ছি না। ষাটের দশকের মধ্যে আসলে কি এমন জাদু ছিল যে আপনারা এতগুলো মানুষ আলাদাভাবে দাঁড়ালেন।

মোহাম্মদ রফিক

সেই কথা বলতে গেলে তুমি সারা পৃথিবীর দিকে তাকাও। সারা পৃথিবীতে কিন্তু ষাটের দশক একটা সাড়া জাগানো সময়। তোমাকে যদি আমি জিজ্ঞেস করি, তুমি গত পঞ্চাশ বছরে একজন দার্শনিকের নাম বলোতো, যার প্রভাব সারা পৃথিবীতে পড়েছে?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

জাঁ জাঁক রুশো, জাঁ পলসার্ত্রে।

মোহাম্মদ রফিক

না না, গত পঞ্চাশ বছরে তৈরি হয়েছে?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

স্যার, গত পঞ্চাশ বছরে তৈরি হয়েছেন এমন দার্শনিক তো স্যার ফ্যুকো, দেরিদা।

মোহাম্মদ রফিক

কিন্তু আজকে তুমি ভাবতে পারবে না, আমাদের সময়ে, তখনকার ইসে, এই ধরো সার্ত্রে, কামু প্রবল প্রতাপ নিয়ে এলেন। শুধু তাই না আমাদের অঞ্চলেও ধরো, এবং ষাটের দশকে সারা পৃথিবী তারা শাসন করেছে। যেমন সুয়েকার্নো, যেমন জওহর লাল নেহেরু, আজকের অমিতাভের মতো নায়ক আর আছে? হাঁ, ষাটের দশকে ফিদেল ক্যাস্ট্রো পৃথিবীতে এসেছে, আমাদের বঙ্গবন্ধুর উত্থান হয়েছে। এইসব ঘটনা তো সব মিলিয়ে ষাটের দশক তৈরি হয়েছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

বটেই কিন্তু স্যার—

মোহাম্মদ রফিক

তারপরে মুক্তিযুদ্ধের মতো একটা বড় ঘটনা ঘটে গেছে। এবং মনে রেখ কোনো কবি কিন্তু নিজে নিজে তৈরি হয় না, কবি হয়তো একটা ব্যক্তিগত প্রতিভার স্ফুরণ। কিন্তু সেই ব্যক্তিগত স্ফুরণটা কিন্তু নিজে নিজে খুব একটা ঘটে না। যতটা তার সমাজ বা আশপাশ তৈরি করে। একটা বলয় প্রয়োজন হয়, এই বলয়টা হারিয়ে যাচ্ছে ইদানিং। তা তুমি কি করে আশা করো যে, এখনও একজন লোক শুধুমাত্র নিজের ইসের বলে একটা বিরাট কাজ করে ফেলবে? সেটা সম্ভব না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

স্যার, আমি মনে করি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার এবং আহসান হাবীব এদের একটা প্রভাব আপনাদের মধ্যে মানে ষাটের দশকের কবিদের মধ্যে ছিল।

মোহাম্মদ রফিক

না। এই কথাটা আমি মোটেও মানতে রাজি না। ঐভাবে না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

সম্পাদনার প্রভাব।

মোহাম্মদ রফিক

আমাদের সময় শ্রেষ্ঠ সম্পাদক ছিলেন সিকানদার আবু জাফর। তুমি এই নামটা বলতে ভুলে গেছ।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

হাঁ আমি বলতে ভুলে গেছি। স্যরি স্যার।

মোহাম্মদ রফিক

হাঁ এবং যদি লেখক তৈরি করে থাকেন সেইটা একমাত্র সিকানদার আবু জাফর ভাই। সায়ীদ সাহেব যেটা করেছেন, সায়ীদ সাহেব সম্পর্কে খুব একটা উচ্চ ধারণা আমার নেই। আমি সায়ীদ সাহেবের ছাত্র। এবং তিনি কিন্তু রাজনৈতিকভাবে খুব প্রতিক্রিয়াশীল লোক। এবং তিনি ছাত্র জীবনে মুসলিম লীগের ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং ওঁ যখন রাজশাহী কলেজের শিক্ষক হয়ে যায়, তখনও গিয়ে সরাসরিভাবে প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আঁতাত করেছেন। আমি যখন ভিপি ছাত্র ইউনিয়নের, তখন আমি তাঁকে কলেজ থেকে বিতাড়িত করেছি। সুতরাং…


হাঁ, তখন আমি তাদেরকে বলেছি যে, আমাকে জোর করে বা চোখ রাঙিয়ে ভয় দেখাতে পারবেন না। আপনি কাগজ খুলে দেখেন, আমি যখন ছাত্র, এই দেশে মার্শাল ল কোর্টে যাদের বিচার হয়েছে তার প্রথম নাম্বার আসামি আমি।


শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আপনার শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও?

মোহাম্মদ রফিক

শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও। কারণ তখন আমরা জীবন মরণ সংগ্রামে আইয়ুব শাহীর শাসনের বিরুদ্ধে। তখন আমাকে মার্শাল ল-এ আটকে জেলে পাঠানো হয়। এবং তুমি একটা কথা মনে রেখ, এখানে যখন আমাকে আর্মি নিয়ে গিয়েছিল—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

এরশাদের আমলে?

মোহাম্মদ রফিক

হাঁ, তখন আমি তাদেরকে বলেছি যে, আমাকে জোর করে বা চোখ রাঙিয়ে ভয় দেখাতে পারবেন না। আপনি কাগজ খুলে দেখেন, আমি যখন ছাত্র, এই দেশে মার্শাল ল কোর্টে যাদের বিচার হয়েছে তার প্রথম নাম্বার আসামি আমি। আমার মার্শাল ল কোর্টে দশ বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছে, ১৯৬২ সালে। হাঁ। আমার কোর্টে যিনি প্রিজাইডিং অফিসার ছিলেন সে পাকিস্তান আর্মির একজন বিগ্রেডিয়ার ছিল —ওঁকে দেখলে লোকে ওঁর রুমেও ঢুকতে সাহস করতেন না। ওঁকে স্যার স্যার বলে মুখে ফ্যানা তুলে ফেলত। সেই লোক আমাকে যখন শেষে দশ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেয় তখন পুলিশ রিপোর্ট করা হয়। আমি হচ্ছি কমিউনিস্ট পার্টির মেম্বার। তিনি বোধহয় জীবনে কমিউনিস্ট দেখেন নি। তিনি বোধহয় ভাবতেন যে কমিউনিস্টরা সবসময় আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকে। তিনি তাঁর এজলাস থেকে নেমে এসেছেন এবং আমার দিকে তাকাচ্ছেন। আমি হাফ প্যান্ট পড়ে দাঁড়িয়ে আছি। আমি তখন প্রথম বর্ষ অনার্সে ভর্তি হয়েছি। রাজশাহী ইউনিভার্সিটিতে অনার্স ছিল না। অনার্সটা পড়ানো হতো রাজশাহী কলেজে। আমি তখন হাফ প্যান্ট পড়ি। তিনি নেমে দেখছেন যে, হাফ প্যান্ট পড়া একটা ছেলে কমিউনিস্ট।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

হা হা হা।

মোহাম্মদ রফিক

হা হা। আমি এই কাহিনি কিন্তু ওদেরকে বলি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

এই কাহিনিটায়-ই তো স্যার আসব। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আপনার জীবনে। খোলা কবিতা যখন লিখা হলো, এরশাদের বিরুদ্ধে, স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে, আসলে এই বিশাল আন্দোলন এবং সেই আন্দোলনে খোলা কবিতা বিশাল ভূমিকা রেখেছিল। হাজার হাজার শ্রমিক জনতার সামনে আপনি কবিতা পড়েছেন। হাজার হাজার কপি বিক্রি হয়েছে। এটা বোধহয় আপনার জীবনের অন্যতম বড় ঘটনাগুলির মধ্যে একটি।

মোহাম্মদ রফিক

অবশ্যই। আমার খোলা কবিতা  সম্ভবত আমার সর্বাধিক প্রচারিত কবিতা।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

সেই ঘটনাটা মানে ঐ দিনের ঘটনাটা আমি জানতে চাই, যেদিন আপনি প্রথম—

মোহাম্মদ রফিক

Rafik Mainএখন প্রশ্ন হচ্ছে যে তোমার মনে নেই, এরশাদ যখন প্রথম ক্ষমতায় আসলো, ৮৩ সালের জুন জুলাই টুলাই হবে, আমি এখন ভুলে গেছি। তো তখন কিন্তু কোনো দলই, প্রথম এরশাদের বিরুদ্ধে মুখ খোলে নি বাংলাদেশে। হাঁ বিএনপি বলো, আওয়ামী লীগ বলো, কমিউনিস্ট বলো, কেউই না। আমি সেদিন খুলনা আজম খান কলেজে। ছাত্র ইউনিয়নের অনুষ্ঠানে গেছি তাদের প্রধান অতিথি হিশেবে সম্মেলনে বক্তৃতা দিতে। তো পরদিন আবার ঢাকায়, তখন আমার চুল বড় তো, দেখি যে, যশোর থেকে আর্মি যাচ্ছে। আমি একটু অবাক হলাম, আর্মি যায় কেন? তারপরে দেখি, ফরিদপুরে এসেছি, এসে ফরিদপুরে বাস থামিয়েছে, নেমে আমি একটু চা খেতে বসেছি। দেখি লোকজন আমার দিকে ইয়ে মানে খুব অন্যরকমভাবে তাকাচ্ছে। আমি খুব সংশয়ে পড়ে গেলাম। তো একজন বয়স্ক লোক উঠে এসে আমার পাশে বসে আমতা আমতা করে বলল, আপনি কোন পীরের মুরিদ? বললাম, না আমি কোনো পীরের মুরিদ না। কিন্তু আপনাকে তো বলতে হবে যে আপনি অমুক পীরের মুরিদ। আমি বললাম, কেন? বলল, আপনার যে বড় বড় চুল। আমি বললাম তাতে কি হয়েছে?, বলল, আপনাকে তো ঘাটে আর্মি এসে ধরবে, পুলিশ চুল কেটে দেবে। আমি বললাম—কেন? বলল, জানেন না যে, আর্মি, পুলিশ নেমেছে। মার্শাল ল জারি হচ্ছে এবং চুল কাটছে। আমি খুব লজ্জিত বোধ করলাম, মানে খুব খারাপ লাগল যে, আমার চুল কাটবে? তো আমি, যাই হোক, আমি মনে খুব আতঙ্ক নিয়ে এসে পৌঁছালাম। জাহাঙ্গীরনগর এসে পৌঁছালাম। তার কয়েকদিন পরে দেখি পত্রিকায়, মনে হয় দৈনিক বাংলায়, প্রথম পৃষ্ঠায় দেখি এরশাদ সাহেবের কবিতা। ভালোবাসা বিষয়ক। আর সেটি কিছু হয় নি, মানে কবিতার। এবং আমি ইন্টারোগেশনে সেই আর্মি অফিসারকে বলেছিলাম, এই কবিতা যদি আপনি লিখতেন, এই কাগজে ছাপা হতো? উনি বলল, না। তাহলে আজকে কেন এই প্রথম পাতায় ছাপা হলো? যাই হোক তারপরে বলি, আমি খুব অবাক হয়ে গেলাম, যে বাঙালি ভালোবাসায়, আমি মনে করি যে ভালোবাসার চেতনায় বাঙালি খুব সমৃদ্ধ। সেটা নিয়ে হাসি তামাশা করা এবং সর্বত্র এরা আমাদের মূল্যবোধকে ধ্বংস করে দেওয়ার প্রকল্প নিয়ে নেমেছে। মানে মার্শাল ল জারি হওয়া না। মূল্যবোধগুলোকে ধ্বংস করে দেওয়ার ব্যবস্থা। এবং হঠাৎ একদিন আমি কেন জানি, জানি না, রাতে কবিতাটা লিখতে বসে গেলাম।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

সব শালা কবি হবে পিঁপড়ে গো ধরেছে উড়বেই……

মোহাম্মদ রফিক

হাঁ সে যাই হোক। ওর ভেতরে অনেক ব্যাপার আছে—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

অবশ্যই, ঐ যে আপনি বলেছেন, যার মাথায় বুদ্ধি আছে সে বুঝবেই।

মোহাম্মদ রফিক

ওর ভিতরে চুলের ঘটনাটাও কিছুটা আছে। বেয়াদব চুল রেখে রাস্তা ঘাটে বেরুব না। তা যাই হোক আমি ঐ লিখে ভাবলাম যে এটাকে কি করা যায়? প্রথমেই ভাবলাম, এটা প্রচার হওয়াটা দরকার। তো ছাত্র ইউনিয়নের এক ছেলেকে বললাম। যা হোক তখন আবিদ আজাদ কবি, ওঁর একটা প্রেস ছিল, আমি আবিদ আজাদের শরণাপন্ন হলাম, এটা ছেপে দেবে নাকি? আবিদ রাজি হলো এই শর্তে যে, আমি এটা চেপে রাখব। যখন আর্মি দেখেছে, আমি বলেছি যে, এটা আমার লিখা, তো প্রত্যেকের ক্ষেত্রে যেটা আমি বলব যে, একজন আন-উইলিং লোককে আমার উইলিং কাজের পার্টনার হতে দেওয়া। আপনাদের অনেক ইয়ে আছে, পারলে খুঁজে বার করবেন, কোত্থেকে। যাই হোক, আবিদ আজাদের প্রেস থেকে ছেপে ছাত্রদেরকে দিলাম বিলি করতে। তারপরে তো কবিতাটা মহা ইয়ে পেয়ে গেল। কত লক্ষ কোটি ছাপা হয়েছে হিশেব নেই। রংপুরে গিয়েছিলাম এক অনুষ্ঠানে, এক ছেলে এসে আমাকে বলল যে, আপনাকে আমি মিষ্টি খাওয়াব। বললাম, কেন? বলল, যে স্যার, আপনার খোলা কবিতা না হলে তো আমি বিয়ে করতে পারতাম না।


আমি আপনার খোলা কবিতাটা হাতে পেলাম আর সেটা ফটোকপি করে ১০০ টাকা করে বেঁচে বিয়ে করে ফেললাম।


শিমুল সালাহ্উদ্দিন

মানে?

মোহাম্মদ রফিক

সে বলে যে, আমি দীর্ঘদিন ধরে প্রেম করছিলাম কিন্তু টাকা পয়সার জন্যে বিয়ে করতে পারছিলাম না। আমি আপনার খোলা কবিতাটা হাতে পেলাম আর সেটা ফটোকপি করে ১০০ টাকা করে বেঁচে বিয়ে করে ফেললাম।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

(হাততালি) হা হা হা।

মোহাম্মদ রফিক

তো আমি এখন ঐ বিয়ের অনুষ্ঠানে তো আর নিতে পারব না, তাই এখন আপনাকে মিষ্টি খাওয়াব। তখন সে আমাকে রংপুরের প্রধান মার্কেটে নিয়ে গিয়ে মিষ্টি খাওয়ালো।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

এটা তো একটা অসাধারণ প্রাপ্তি হিশেবে রয়ে গেল।

 

মোহাম্মদ রফিক

আমি আরেকটা ঘটনা বলি, আমি কলকাতা যাব। তো বাসের টিকেট কাটতে গিয়েছি কলাবাগানের ঐখানে। তোমার বয়সী একটা ছেলে লিখছে, টিকেট কাটছে, সে বলছে, একটা খাতায় নাম লিখতে হবে। নাম কি আপনার? আমি বললাম, মোহাম্মদ রফিক। অবাক হয়ে বলে, আপনি খোলা কবিতার লেখক? আমি বললাম যে, হাঁ কেন, কি হয়েছে? বলল, আপনার কাছ থেকে আমি একশ টাকা কম নেব। টিকিটের দাম তিনশ টাকা ছিল, সেটার একশ টাকা বোধহয় সে তার পকেট থেকে দিয়েছে। নিলই না। এগুলোই তো ভালোবাসার প্রমাণ। ড. আখলাকুর রহমান একদিন আমাকে বলে, জানো, আমি তোমার খোলা কবিতার কত কপি বিক্রি করেছি! আচ্ছা, তারপরে তারেক আলী, লন্ডনে আলী তখন নিযুক্ত ছিল। ওরা আমাকে বলে যে, ওদের বাড়িতে একদিন ইন্ডিয়ান অ্যাম্বেসির এক অফিসার গেছে, সে বলছে,  এখানে আপনাদের মোহাম্মদ রফিক নামে একটা লোক কবিতা লিখেছে, এক ডলারে বিক্রি হচ্ছে। তো আলী তখন বলছে, ওটা এক ডলার নয় এক টাকা দাম যাতে সব লোকে পড়ে। বলে, তাই নাকি? এর কিছুদিন পরে, আমার সাথে এক ভদ্রলোক দেখা করতে চায়। দেখা হতো কি না আমি জানি না, অধ্যাপক সাঈদ বলল, নাস্তা খেতে আসিস। ওঁ তো আমাকে তুই তুই করত, আমরা একসঙ্গে পড়েছি। তুই যদি আসিস, তো আমরা একসঙ্গে দেখা করতে যেতে পারি, তো আমরা গেলাম সাঈদের বাসায়। গিয়ে দেখি যে এক ভদ্রলোক ইয়ে স্যুটট্যুট পড়া, অনেক কথা টথা বললেন। ইন্ডিয়ান ডিফেন্স সেক্রেটারি ইস্ট জোনের। বলল, আমরা সবাই আপনাকে চিনি। আমাদের সবাই আপনার লেখা পড়েছি। আমাদের সেক্রেটারি মহলে প্রচুর আলোচিত আপনি। কিন্তু আপনি যে রাজনৈতিক দলের পক্ষে ঐ রাজনীতির পক্ষে এখন আমরা নই। সরাসরি সে বলল, আমাদের হিশেবে আপনারা যদি ক্ষমতায় যান, ছয় মাসের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না। কিন্তু আপনি যদি ব্যক্তিগতভাবে কখনও মনে করেন যে, অসুবিধায় আছেন তাহলে শুধু কোনো মতে বর্ডার ক্রস করে বিএসএফকে আপনার নাম বলবেন আর আমার নাম বলবেন। এরাই সব ব্যবস্থা করবে—বর্ডার ক্রস করে যেকোন ক্যাম্পে গিয়ে আমার নাম বলবেন, তারপরের ব্যবস্থা, ভারত সরকারের অতিথি। আমি দৃঢ়কণ্ঠে বললাম যে, আশাকরি সে প্রয়োজন হবে না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

হা হা হা। সে প্রয়োজন হবে না।

মোহাম্মদ রফিক

তুমি বুঝতেই পার যে, কি ধরনের আলোড়ন তৈরি করেছিল কবিতা। আমি, আমাদের ওখানে একটা রাজনৈতিক গ্রুপের সঙ্গে জড়িত ছিলাম। তারা এসে বলল যে, আমরা এ ব্যাপারটা নিয়ে একটা অনুষ্ঠান করতে চাই। রিহার্সাল শুরু করলাম। একদিন সেলিম এসে উপস্থিত হলো, আমি এই একটা অংশের গান করে দেবো। বললাম দাও। ওঁ ঐ অংশের গান করে দিল। তারপরে জমজমাট অনুষ্ঠান হলো। এর পরে ঢাকা থেকে কবিরাও এল। রুদ্র এল, আরও কে কে জানি এল। ও তুষার দা। জমজমাট অনুষ্ঠান হলো। এর কয়েকদিন পরে ঢাকা থেকে ছাত্রলীগের নেতা, জাসদের নেতা, ছাত্র ইউনিয়নের নেতা সবাই আমার জাহাঙ্গীরনগরের বাসায় হাজির হলো। বিএনপি, ছাত্রদলের নেতা ছিল কিনা মনে নেই, হয়তো ছিল—হয়তো ছিল না। উপস্থিতরা বলে, আমরা এটা নিয়ে অপরাজেয় বাঙলার নিচে একটা অনুষ্ঠান করব। শুনে ছেলেমেয়েরা যারা অংশ নিয়েছিল ওরা খুব উৎসাহী হলো।  অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে অনুষ্ঠানটা হলো। আমি বলব একটা ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, তারা কিন্তু সাহস করে নিচে আসলো না। ঐ দোতালা, তিনতালায় দাঁড়িয়ে থাকল। অনুষ্ঠান হওয়ার পর ঐ ছাত্ররা, ঐ নেতারা বলল, স্যার, আমরা এরশাদ বিরোধী মিছিল করব। তবে আমরা রাস্তায় যাব না। আমি বললাম যে আচ্ছা ঠিক আছে। সেটাই হচ্ছে বাংলাদেশে প্রথম এরশাদ বিরোধী মিছিল এবং সর্বদলের ছাত্র-ছাত্রী এবং নেতা-নেত্রী অংশ নিল। ঐখানে—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

স্যার, আপনি কি ঐখানে খোলা কবিতাটা পড়লেন?

মোহাম্মদ রফিক

না আমি পড়ি নি। ঐ ছাত্রছাত্রীরা পাঠক্রম করল। কেউ আবৃত্তি করল। আমি উপস্থিত ছিলাম।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

বাহ।

মোহাম্মদ রফিক

শিক্ষকদের মধ্য থেকে একজনই অংশ নিয়েছিল। সে হচ্ছে হুমায়ূন আজাদ। আর ছাত্রদের মধ্য থেকে অংশ নিয়েছিল, রুদ্র, কামাল। এরা।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

স্যার, হুমায়ূন আজাদ যেহেতু এল-ই, একটা জরুরি বিষয় আমি অবতারণ করতে চাই, বাংলা একাডেমি পুরস্কার দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর আপনি এবং হুমায়ুন আজাদ নিলেন সেই পুরস্কার। এবং সেটা হলো এরশাদ সাহেবের সময়!

মোহাম্মদ রফিক

হাঁ, এরশাদ থাকতেই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

স্বৈরাচারের কাছ থেকে পুরস্কার নিলেন! মানে ঐ পুরস্কার নিয়ে তো কিছু ঘটনাবলী ছিল। মানে সংক্ষেপে যদি বলা যায়।

মোহাম্মদ রফিক

না আমি এটা খুব বিব্রতবোধ করি। আমি লোক পরম্পরায় শুনেছি। এরশাদের বা এরশাদের লোকজনের জন্যই আমাকে পরপর তিন বছর বাংলা একাডেমির পুরস্কার দেওয়া হয় নি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

এবং বাংলা একাডেমি পুরস্কার তিন বছর বন্ধ ছিল।

মোহাম্মদ রফিক

না এক বছর বন্ধ ছিল। সে বছর লোক যে ছিল, মঞ্জুর-এ-মওলা, সে বলেছিল, লোক পাওয়া গেল না বলে দিলাম না। যাই হোক, বিষয়টা হচ্ছে সে চেষ্টা করেও আমাকে দিতে পারে নি। ইমোশনালি প্রবলেমটা আমাকে বলতেও পারে নি। পরে বলেছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আচ্ছা।

মোহাম্মদ রফিক

তারপরে যে ঘটনা ঘটল, আমি যায় যায় দিনে লেখালেখি করলাম—লিখলাম, আমার নাম যেন আর না আসে প্রস্তাবে। চিঠি লিখলাম। তো পরের বছর আবার পুরস্কার দেওয়ার সময় আসলো। আমি তখন অনেক সময় নিজের বই নিজে বিক্রি করতাম। হঠাৎ দেখি ঐ দিন বিকেল বেলা আমার টেবিলের আশপাশে কবি’রা ঘুরঘুর করছে। নূরুল হুদা এবং অন্যান্য কবি। আবার আবু হেনা মোস্তফা কামাল। আবু হেনা মোস্তফা কামাল খুব বড় রোল প্লে করেছে। তিনি আবার আমার স্যারও, এক সময়কার রাজশাহীতে। যাই হোক তিনিও খুব চাইলেন আমি পুরস্কার নেই। আমার সাথে উনার সম্পর্ক তখন খুব একটা ভালো ছিল না। তিনি এটা তাঁর বক্তৃতায়ই বলেছেন। অবশ্য পরবর্তী কালে আবার ওর সাথে আমার সম্পর্ক ভালো হয়ে যায়। তো ঐ দিন দেখি কি হঠাৎ বিকেলের দিকে, নুরুল হুদা, শওকত ওসমান, কবীর চৌধুরী ও আবুল হোসেন আমার টেবিলের চারদিকে ঘুর ঘুর করছে। আমি বুঝতে পারলাম না যে কি হচ্ছে। তো কে জানি, এদের মধ্যে একজন এসে আমাকে বলল যে, আমরা এটাকে একটা চ্যালেঞ্জ হিশেবে নিয়েছি এবং আমরা বলেছি যে তুমি যদি পুরস্কার না নাও তাহলে আমরা অপমানিত হব। আমরা কেউ এই কমিটিতে থাকব না। তুমি এটাকে নাও।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

এটাকে রিজেক্ট করো না।

মোহাম্মদ রফিক

শওকত ওসমান আমার নিজের শিক্ষক। দীর্ঘদিনের জন্য।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

একেবারে সরাসরি শিক্ষক।

মোহাম্মদ রফিক

তারপর আবুল হোসেন সাহেব। আমি দেখলাম যে ওদের অপমান করে আমার কোনো লাভ নেই। এর পরে নূরুল হুদা আসলো, এসে বলল, আপনি চলেন আমরা কোথাও যাব চা খেতে। এই আর কি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

হুমায়ূন আজাদের সাথে পাওয়া এতে বোধহয় আপনার খুব একটা তৃপ্তি কাজ করে নাই।

মোহাম্মদ রফিক

সত্যি খুব একটা তৃপ্তি যে কাজ করেছে তা না। হুমায়ূনের লেখাটেখা যাই হোক, হুমায়ূনের মানে, সব কিছু মিলিয়ে নিয়ে আমি খুব একটা সন্তুষ্ট নই। যদিও হুমায়ূনের উপর আমি কিছু লেখা লিখেছি। এখনও লিখব। তবে হুমায়ুনের কিছু ব্যাপারে আমার আপত্তিও আছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আপত্তিও আছে!

মোহাম্মদ রফিক

হুমায়ূনের সাথে আমার ছাত্র অবস্থায় যোগাযোগ হয় নি। যদিও আমি যখন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ওঁ তখন প্রথম বর্ষে। ওঁ যখন চিটাগাং বিশ্ববিদ্যালয়ে তখনই প্রথম আমার বাড়িতে আসে। চট্টগ্রামে একটা হোটেলের ছাদে আমরা আড্ডায় বসতাম। সেখানে অনেক গল্প টল্প হয়েছে , পানাহার, খাওয়া-দাওয়া হয়েছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

অনুপম সেনের সাথে আপনার সম্পর্ক কিরকম ছিল?

মোহাম্মদ রফিক

অনুপম সেন অনেক দিল দরিয়ার মানুষ, সে সবাইকে খাওয়াতো টাওয়াতো। ঢাকায় এটা নিয়ে কিছু কটূক্তিপূর্ণ কথা ছড়ায়। তারপর আমি যখন কলকাতা গেলাম, তখন দেখলাম ওর একটা কবিতা অনুদিত হয়েছে। বইমেলায় ওর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর ও এমন একটা ভাব নিল যে, সে খুব বড় একজন কবি তা সে আগে থেকেই জানতো এবং আমরা কেন এটা বুঝি নি!

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

হা হা হা।

মোহাম্মদ রফিক

আমি তাঁর প্রতিক্রিয়ায় খুব অবাক হয়ে গেলাম। একজন লোকের একটা কবিতা ছাপা হয়েছে ভালো কথা, অনুবাদে, কিন্তু সেটা থেকে তো এত গর্ববোধ করার কারণ নেই। আর আমি বাংলা একাডেমির পুরস্কারের ব্যাপারে, আসলে আমি পুরস্কার টুরস্কারকে অত বড় ভাবে দেখি না। আগের বছর যেদিন পুরস্কার ঘোষণা হবে, হলো না। আর কি সবার প্রতিক্রিয়া! আমি তখনও বই বিক্রি করি আমার টেবিলে। সে (হুমায়ূন আজাদ) এসে আমার টেবিলে, তখন বাংলা একাডেমিতে নাসির আলি মামুনের ছবির প্রদর্শনী চলছে, লেখকদের পোট্রেইট নিয়ে প্রদর্শনী। সে এসে আমাকে প্রস্তাব দিল, “চলেন সব নামিয়ে ফেলি, ভেঙ্গে ফেলি। হাঁ, কত বড় সাহস, এই লোক বলল পুরস্কার দেবে, বলেছে দেবে, এখন বলছে দেবে না। নামিয়ে ফেলি চলেন”। আমি তো অবাক। আমি বললাম, সাবধান। মামুন না আপনারও ছবি তুলেছে, আর আপনি ওর প্রদর্শনী নামিয়ে ফেলবেন! আশ্চর্য! সুতরাং ওর কিছু ব্যাপারে আমার আপত্তি ছিল। এবং পরবর্তীকালে ওর কবিতার যে ভূমিকা তাও ঠিক কবি সুলভ বা সুবিবেচনা প্রসূত মনে হয় নি আমার।

12789802_1096679863705890_385933102_o
নাতির সঙ্গে একটি অবকাশ-মুহূর্ত

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

একুশে পদক পেলেন ২০১০ সালে। আপনি তো বললেনই স্যার, পদক বা পুরস্কারের ব্যাপারে, পুরস্কারে কারও লেখার কোনো মূল্যায়ন হয় না। কিন্তু স্যার, ঐ যে টিকেটের দাম অর্ধেক রাখা, অজস্র কবিতা পাঠকের ভালোবাসা, শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা, ঐ রকম পুরস্কার তো  প্রচুর পেয়েছেন। মানুষের ভালোবাসার পুরস্কার।

মোহাম্মদ রফিক

হাঁ, মানুষের ভালোবাসার পুরস্কার প্রচুর পেয়েছি। রাইট।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

সেটার তো মূল্য দেন, স্যার?

মোহাম্মদ রফিক

অবশ্যই। মানুষের ভালোবাসাকে আমি মূল্য অবশ্যই দেই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

যে কবির জনম আপনি কাটালেন স্যার, সেই কবি জনমের কোনো অতৃপ্তি কি আছে?

মোহাম্মদ রফিক

না, আমি লিখছি প্রচুর। এমন আরেকটা কথা আমি তোমাকে বলতে চাই। একজন কবি সবসময় তাঁর সমস্ত লেখার জন্য জনগণের কাছে পরিচিত হয় না। যেমন, নজরুল, কাজী নজরুল ইসলামকেই ধরো, আমরা তাঁকে চিনি বিদ্রোহী কবিতার জন্য।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

জ্বি স্যার।

মোহাম্মদ রফিক

হাঁ সবাই। কিন্তু এটাই কি তাঁর পরিচয়?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

তাঁর আরও বহু ভালো লিখা আছে।

মোহাম্মদ রফিক

জীবনানন্দ দাশ বনলতা সেন বা রূপসী বাংলা। কিন্তু এটাই কি তাঁর পরিচয়?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

কিন্তু এটা গুরুত্বপূর্ণ।

মোহাম্মদ রফিক

এটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাঁকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বাহন। এখন খোলা কবিতা লোকের ভালো লেগেছিল, এটা আমার নিজের প্রাপ্য। আমি কিন্তু নিজে খোলা কবিতা নিয়ে খুব উৎসাহী ছিলাম না। আমি মনে করতাম যে, এটা আমার রাজনৈতিক কর্মেরই একটা অংশ। এটা ঠিক ইয়ে না। মানে কবিতা হিশেবে খুব উচ্চস্তরের না। আমাকে প্রথম আশ্বস্ত করল মঞ্জুর-এ-মওলা। সে আমাকে একদিন কথায় কথায় বলল, এটা ঠিক না। এটা কবিতা হিশেবেও ভালো। তারপর অরুণ সেন, তাঁর প্রতিক্ষণ থেকে নির্বাচিত কবিতায় পুরো কবিতাটা ঢুকিয়ে দিল। আমি দেখে অবাক হলাম। সে বলল ‘হাঁ’ তারপর আমি আরও অবাক হলাম। আইওয়া ইউনিভার্সিটির একটা ওয়েব সাইট। ওখানে গেলে তুমি দেখবে, ওখানেও পুরো কবিতাটির ইংরেজি অনুবাদ করেছে। এবং ওরা আমাকে বার বার বলেছে যে, তুমি এই প্রচারে এত বিমুখ কেন?


কবির প্রচার কবিতা দিয়ে হোক। তুমি আজকে ভাবো যে, রবীন্দ্রনাথ, মাইকেল, জীবনানন্দ দাশ, কতদিন টেলিভিশনে এসেছে?


শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আপনি একটু বেশিই প্রচার মাধ্যম অবান্ধব, স্যার।

মোহাম্মদ রফিক

আমি প্রচার মাধ্যম এত বিমুখ কেন? এটা তুমি প্রচার করে, অনুবাদ করে করে অামেরিকানদের বিস্মিত করো না কেন?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আপনার মধ্যে এই প্রচার বিমুখতার কারণ কি?

মোহাম্মদ রফিক

আমি মনে করি, কবির প্রচার কবিতা দিয়ে হোক। তুমি আজকে ভাবো যে, রবীন্দ্রনাথ, মাইকেল, জীবনানন্দ দাশ, কতদিন টেলিভিশনে এসেছে?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

হা হা হা।

মোহাম্মদ রফিক

তোমাকে আমি একটা কথা বলি, তুমি যে সাহিত্যের জগতের অবক্ষয়ের কথা বললে এর মূল কারণ হচ্ছে মিডিয়া। তুমি একটা কবিতা, ধরো দীর্ঘকবিতা লিখলে, একটা গল্পের মতো তিন চার পৃষ্ঠা কবিতা লিখো, কোনো দৈনিক পত্রিকা এটা ছাপবে?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

ছাপানো সম্ভব না তো। তার তো সংবাদ দরকার। একুশ লাইনের বাইরে কবিতা ছাপা যায় না স্যার।

মোহাম্মদ রফিক

তাহলে এরাই মূল ক্ষতি করছে। আমি মনে করি এখন কবিদের প্রথম উচিত, তোমাদের মতো তরুণ কবিদের, এইসব পত্রিকা টত্রিকাতে লিখা বন্ধ করে দেওয়া। নিজেদের প্রকাশ মাধ্যম তৈরি করা। তুমি পাঁচ টাকায় পারো, দশ টাকায় পারো বিকল্প মাধ্যম তৈরি করো। আমরা তখন সায়ীদ সাহেবের সেই পত্রিকায় অনেকেই লিখেছিলাম। উনার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব—মতের অমিল থাকা সত্ত্বেও তিনি কিন্তু আমাদের একত্রিত করেছেন।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আমি এই কথাটাই বলছিলাম।

মোহাম্মদ রফিক

সে যে আমাদেরকে খুব একটা দিক নির্দেশনা দিয়েছে তা না। কারণ সে সব সময় আমাকে বলতো যে, তিনি হচ্ছেন পুরোপুরি রোম্যান্টিক। আর আমি হচ্ছি সেখানে ধ্রুপদী সাহিত্যের প্রতি নিবেদিত। তিনি চট্টগ্রামে গিয়ে আমাকে একি কথা বলেছেন, যে তোমার সাথে আমার ইয়ে নেই। আবার সে কিন্তু আমার ক্ল্যাসিক চর্চার প্রবন্ধ ছেপে কলকাতায় নিয়ে গেছে পত্রিকা। এটাই হচ্ছে তাঁর গুণ। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছি, মুখোমুখি বলেছিও এসব। তবে এই ব্যাপারটা ছিল, তিনি কিন্তু সবাইকে এক করেছিলেন।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

অন্য আরেক জনের মতামত সেটাকে তিনি গুরুত্ব দিতে জানেন।

মোহাম্মদ রফিক

হাঁ, জানেন। তারপর সে যখন রাজশাহী কলেজ ছাড়তে বাধ্য হলো, তার সাথে আমার রাজশাহী রেলে দেখা। তিনি আমাকে দেখে বললেন, তুমিই না সেই লোক যে বোদলেয়ার পড়েছে? সে কিন্তু ঐ বিষয়টা আর তুলল না। সে তখন, তুমি চিন্তা করো, এটা কিন্তু তাঁর বিশাল হৃদয়ের পরিচয়।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

স্যার, সিকান্দার আবু জাফরের কথাতো বললেন না।

মোহাম্মদ রফিক

সিকান্দার আবু জাফরের সাথে আমার, সিকান্দার ভাই তখন, মানে আমরা যখন এসেছি তখন তাঁর প্রায় শেষ দিনগুলি চলছে। হাসান আজিজুল হকের শকুন গল্পটা সমকালে ছাপা হয়েছিল। সেটা খুব আলোচিত তখন। হাসান তখন কলেজের মাস্টার। সে উৎসাহিত হয়ে আরেকটা গল্প লিখে পাঠাল। সিকান্দার আবু জাফর ঐ গল্পটা ছাপলেন না। হাসান তখন দুঃখে কষ্টে গল্পটা ছিঁড়ে পানিতে ভাসিয়ে দিল। এবং হাসান পরে বলেছিল, আমার এই গল্প যদি ছাপানো হতো তবে আমার উন্নতি আর হতো না। এই হচ্ছে সিকানদার আবু জাফর।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

গ্রেট।

মোহাম্মদ রফিক

আহসান হাবীবের সাথে সম্পাদক হিশেবে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। ওঁর সম্পর্কে বরং নির্মলেন্দু গুণ-রাই ভালো বলতে পারবেন। আবুল হাসান থাকলে বলতে পারত। কারণ ওদের লিখাই বেশি ছাপা হয়েছে। আমি দৈনিক পত্রিকায় প্রথম লিখেছি সংবাদে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

সংবাদেই সবচেয়ে বেশি লিখেছেন।

মোহাম্মদ রফিক

এর কারণ হচ্ছে আবুল হাসনাত। তারপরে তুমি ধরো, আমি বহুদিন দৈনিক পত্রিকায় লিখি নি। কারণ মিডিয়ার প্রতি আমার আস্থা না থাকা। তারপরে ভোরের কাগজের জন্যে লিখেছি। আমার একটা লিখা নিয়ে ভোরের কাগজ ছাপল। তারপর ভোরের কাগজের সাথে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেল। সম্পর্ক দীর্ঘদিন ছিল সাবের (মইনুল আহসান) ও জাফর (আহমেদ রাশেদ) থাকা পর্যন্ত। তারপর কিছুদিন প্রথম আলোতেও লিখেছি। পরে সংবাদের সাথে যোগাযোগ আকারে-ইঙ্গিতে ছিল। মানে হাসনাত থাকতে যেরকম ছিল ওরকম না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

স্যার, আপনার এখন যে জীবন যাপন, আপনি প্রচণ্ড উজ্জীবনের মধ্যে আছেন। এখন আপনার যাপনটা কেমন, স্যার? আপনি এখন সারাদিন একাই থাকেন?

মোহাম্মদ রফিক

আমি প্রথম রাত থেকে শুরু করি, রাত নয়টায় বিছানায় যাই, ভোর সাড়ে তিনটা থেকে সাড়ে চারটার মধ্যে উঠি। উঠে এক ঘণ্টার মধ্যে মুখটুখ ঠিক করা বা ঘর ঠিকঠাক করে আবার, ওষুধ পত্র সব গোছগাছ করে, আমি ঠিক পাঁচটার সময় বই খাতা নিয়ে লিখতে বসে যাই। এবং একভাবে আমি সাড়ে সাতটা পর্যন্ত লিখি। তারপর আড়মোড়াটোড়া ভেঙ্গে পৌনে আটটায় উঠে যাই। আটটায় নাস্তা করি। নাস্তা করে একটু রেস্ট টেস্ট নিয়ে তারপর হাঁটতে যাই। হেঁটে ফিরে আসি, এসে স্নান করি, স্নান করে ধরো একটু হাল্কা নাস্তাটাস্তা করি আবার। করে আবার একটু বই পত্রটত্র পড়ি, দৈনিক কাগজটা দেখি, দেখে, তারপর আর সারাদিন ঐভাবে কাটাই, বসে থাকি। তারপরে যদি ইচ্ছে করে লিখি মানে লিখাটা এখন আমার মূল কাজ। তাগিদ বোধ করলাম তো লিখতে বসে গেলাম। সন্ধ্যার পর আর সেভাবে কাজ করতে চাই না। সন্ধ্যার পর আমি বসে থাকি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

আমরা তো স্যার অনেক কথা বার্তা বললাম। মোটামুটি যে জায়গাটা বাদ রইল, এই সময়ে যারা লিখছে স্যার, তাদের যে সব প্রবণতা গুলো আপনার ভালো লাগে, সেটা কিভাবে চিহ্নিত করেন?

মোহাম্মদ রফিক

প্রশ্নটা হচ্ছে, যে প্রবণতাটা আমার ভালো লাগল, মানে আমি অবশ্যই চাই, আমার স্বপ্ন আরেক জনের ভেতর সফল হোক। হাঁ, সেটা আমি চাই। কিন্তু আমি মনে করি না যে, এটা ঠিক দৃষ্টি। আমার স্বপ্ন তো আরেকজন পূরণ করবে না। তাকে তার স্বপ্ন পূরণ করতে হবে। সুতরাং তাকে তার মতো করে লিখতে হবে। তবে আমি অবশ্যই আশা করব, তার লিখা পড়ে যেন মনে হয়, সে বিষয়টা জানে। এটাই তার ভুবন।  এই ভুবনটাকে সে তুলে আনছে। এই ভুবনটা তাকে এক জায়গায় পৌঁছে দেবে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

অনেক ধন্যবাদ, স্যার।

মোহাম্মদ রফিক

হাঁ, এটাই হচ্ছে আমার মূল কথা। আমি তোমাকে আবারও বলি যে, আমি মনে করি, কাব্যের মুক্তি এবং মানুষের মুক্তি দুটো এক কথা নয়। সর্ব মানুষের মুক্তি না হলে কাব্যেরও মুক্তি হবে না। সুতরাং ঐ চিন্তা আমাদের আপাতত করে যাওয়া। অর্থাৎ সাধনা করে যাওয়া। মানুষকে উজ্জীবিত করে যাওয়া। যদি কোনোদিন সেই বিস্ময়কর ঘটনাটা ঘটে, হয়তো আরেকজন বঙ্গবন্ধু, হয়তো আরেক জনের নেতৃত্বের মধ্যে, বঙ্গবন্ধুর মতো সেই ঘটাবে। সেই দিনের আশায় বসে দিন গুণছি।

 

◙    ◙    ◙

 


আলাপ শেষের সময় ৩১ মে, ২০১৫, রবিবার, দুপুর ১.১৫। সাক্ষাৎকারটি জুন ২০১৫-তে মাসজুড়ে চার কিস্তিতে দৈনিক জনকণ্ঠের সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।


শ্রুতিলিখন সহায়তা : জব্বার আল নাঈম ও আমেনা তাওসিরাত

কবিকে নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন

কবি। শিল্প, সংস্কৃতি ও বিনোদন বিভাগের প্রধান হিসেবে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনে কর্মরত। জন্ম ১৭ অক্টোবর, ১৯৮৭, তুরাগ, ঢাকা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যায়ন বিভাগ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণ করেছেন। শিক্ষাজীবনে পালন করেছেন জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোট ও আবৃত্তি সংগঠন 'ধ্বনি'র সভাপতির দায়িত্ব।

কবিতার বই চারটি : শিরস্ত্রাণগুলি (২০১০, ঐতিহ্য), সতীনের মোচড় (২০১২, শুদ্ধস্বর) ও কথাচুপকথা…(২০১৪, অ্যাডর্ন বুকস) ও সংশয়সুর (২০১৬, চৈতন্য)।

সাক্ষাৎকারগ্রন্থ: আলাপে, বিস্তারে (২০১৬, চৈতন্য)।

‘কবির কবিতা পাঠ’ অনুষ্ঠানের আয়োজক সংগঠন ‘গালুমগিরি সংঘ’র সমন্বয়ক। বিবাহিত; স্ত্রী ও ছোটভাইকে নিয়ে থাকেন বাংলামোটরে।

ই-মেইল : shimulsalahuddin17@gmail.com
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন