হোম পুনর্মুদ্রণ গদ্য শিল্পে একাঙ্গীকরণ বা ফিউশন তত্ত্ব

শিল্পে একাঙ্গীকরণ বা ফিউশন তত্ত্ব

শিল্পে একাঙ্গীকরণ বা ফিউশন তত্ত্ব
2.46K
0
১৪ জানুয়ারি ছিল সেলিম আল দীনের অষ্টম প্রয়াণদিবস। নাট্যাচার্যের প্রতি আমাদের অনিঃশেষ শ্রদ্ধা।  শিল্পসৃজনের কলকব্জা খুলে দেখাতে গিয়ে তিনি একটি তত্ত্ব উদ্ভাবন করেছিলেন, যার নাম দিয়েছেন ‘একাঙ্গীকরণ বা ফিউশন তত্ত্ব’। আমাদের বিবেচনায় লেখাটি বিশেষভাবে তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, যারা সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ডে জড়িত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের ‘থিয়েটার স্টাডিজ’ পত্রিকা ও ‘বনপাংশুল’ সাহিত্যপত্রিকার সৌজন্যে লেখাটি এখানে মুদ্রিত হলো…


শিল্পসৃষ্টির কৌশল, রচিয়তার ভাব ও উপকরণগত সংশ্লে­ষণে যে ভিন্ন এমনকি যেসকল বিপরীত স্বভাবের উপাদান একীভূতরূপে আত্মপ্রকাশপূর্বক তন্মধ্যে নবার্থ ও নবরূপ উন্মোচন করে—তা পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লে­ষণই শিল্পে একাঙ্গীকরণ তত্ত্ব, একীকরণ বা ফিউশন তত্ত্ব নামে অভিধেয়।

শিল্পকর্মের ভাব ও বিষয়কে কেন্দ্র করে শিল্পীর আহৃত উপাদান একটি বিশেষ শৃঙ্খলা-রচনা দ্বারা এক অনিবার্য পরিণতি ও রূপ লাভ করে। তাঁর আহৃত সম ও বিষম উপাদানসমূহ রচনার আঙ্গিক, ভাষা, অলংকার-বাচ্যার্থ ও ব্যঞ্জনঙ্গমতায় একীভূত হয়। উপরন্তু শিল্পস্রষ্টার ভাবলোকে ইতিহাস ভূগোল রাজনীতি ও সমকালের নানান অভিঘাত সক্রিয় বা নেপথ্য উপাদানরূপেও বিদ্যমান থাকে।

শিল্পের রূপ ও রস, ভাষা ও আঙ্গিক বিচারের ক্ষেত্রে ধ্রুপদীকালের নন্দনতাত্ত্বিক বিবেচনা তার সূক্ষ্মতম নৈয়ায়িক বিধানসমূহ রয়েছে। কিন্তু একথাও মনে রাখা চাই যে, উত্তরযুগে শিল্পক্ষেত্রেও জীবনদৃষ্টির পরিবর্তনের সঙ্গে ধ্রুপদী রীতির একান্ত বৃত্তে শিল্পবিচারের রীতি আবদ্ধ হয়ে থাকল না এবং তা নতুন নতুন শিল্পতত্ত্বের নবতর শৃঙ্খলার অধীনে নীত ও বিশ্লে­ষিত হয়েছে।

প্রাচীন মহাকাব্যকালে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য মানবজীবনকে প্রথম আবিষ্কার করেছিল মহাজাগতিক প্রেরণায়। হোমারের ইলিয়াড, অডিসি এবং বাংলা-ভারত-উপমহাদেশের রামায়ণ, মহাভারত মানুষের সঙ্গে অদৃশের যে দৈববন্ধন ঘটাল—তাতে প্রথম ধরা পড়ল সামষ্টিক ও ব্যক্তিমানুষের রূপ। কিন্তু এ চারটি মহাকাব্যর বিষয়, চরিত্র, আয়তন বিবেচনা করলে দেখা যায়—রূপ, রস ও রীতিসংক্রান্ত প্রাচীন এবং আধুনিককালের নন্দনতত্ত্বের মহাকাব্যস্রষ্টার গূঢ়কৌশলসমূহ এবং কৌশলসমূহের মূল বিষয়টি সর্বত্র প্রায় অনুদ্ঘাটিত। ধ্রুপদীকালে রচিত প্রাচ্য মহাকাব্যর নৈয়ায়িক সূত্র আছে। কিন্তু তা থেকে যথেষ্টভাবে স্রষ্টার অপরিমেয় শিল্পকৌশল অনুধাবন করা যায় না। যদি এই উচ্চারণ খানিকটা অনিশ্চিত হয়—তথাপি অর্থে বলা যায়—দু’একটি স্থল ব্যতীত শিল্পসৃষ্টি কৌশলের একটি প্রধান বিষয়—একাঙ্গীকরণ কৌশলের ব্যাখ্যা বা এর নৈয়ায়িক যুক্তি সে অর্থে তত্ত্বরূপে কোথাও পরিদৃষ্ট হয় না।

ভরতনাট্যশাস্ত্রে নানাবিধ রূপক বা নাটক সৃষ্টির উপাদান দেওয়া হয়েছে ব্রহ্মবিধি নির্দিষ্টরূপে। কিন্তু উরুভঙ্গ-এর মধ্যে মহাভারতের প্রতিষ্ঠিত কাহিনি থেকে কোন কৌশলে মূলের বিসম্বাদীরূপে নবার্থ রূপান্তরিত করলেন ভাস—তা বিবেচনার কোনো স্থান নাট্যশাস্ত্রে নেই। অন্যদিকে অ্যারিস্টটলের পোয়েটিকস-এ শিল্পের বিষয় মাধ্যম এবং কমেডি ও ট্র্যাজেডির অঙ্গ ও প্রাণধর্মের বিষয়টি আবিষ্কৃত হতে দেখলেও—আমরা জানি না—তাঁর কলের বহু পূর্বে আরিস্তেফেনিসের দ্য ফ্রগস, দ্য ক্লাউডস প্রভৃতি নাটকের ভেতর কীরূপে মহাকাব্যিক বিস্তার ঘটল।

ফ্রগস নাটকে দেখা যায়—একটি পাতালযাত্রা—কত বিচিত্ররূপে—ইহলৌকিকতাকে অলৌকিকের ছদ্মাবরণে তীক্ষ্ণরূপে হাস্যবিদ্ধ করছে—এবং এঁর লেখক সমকালে গ্রিক ট্র্যাজেডির অধঃপতনে কতটা ক্ষুব্ধ।

লঙ্গিনুসে—পেরিহাইপসু শিল্পের উচ্চতা নির্ণয়ের দুর্লভ অভিজ্ঞতা এমনভাবে বিন্যস্ত যে তা আজ পর্যন্ত শিল্প বিচারের ক্ষেত্রে দেশকাল নির্বিশেষে গ্রাহ্য হতে পারে। তাঁর Amplification তত্ত্বটিও চমৎকার। তাতে দেখা যায়—রচনার বর্ধিতকরণ কৌশলে বাক্য থেকে বাক্য বিস্তারিত হতে হতে ভাষার বাণীরূপ কিভাবে শিল্পস্বর্গে পৌঁছে যায়।

একীকরণ/ একাঙ্গীকরণতত্ত্ব এই সকল ধ্রুপদী শৃঙ্খলার সন্ধানের সঙ্গে শিল্পকর্মের আকার-আয়তন, অর্থ, ভাব আবিষ্কারঙ্গম। এই তত্ত্বের ধারায় আমরা বুঝতে পারি—হোমার কিভাবে অলিম্পাসের পাহাড়চূড়ায় প্রধান দেবতা জিউসকে একচ্ছত্র দেবতা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করলেন—সমকালের তাগিদে—বুঝতে পারি—বিশাল মহাভারতের যুদ্ধক্ষেত্রে গীতার মতো একটি দুর্লভ দার্শনিক ভাবনা—মূল কাহিনির মধ্যে সহসা কিভাবে একাঙ্গীকৃত হলো।

কার্যত থেবোপোলিস এবং স্ফিংস—দুটো প্রসঙ্গই ইজিপ্ট থেকে নীত হয়েছে ইডিপাসের জীবনের নাটকীয় এবং অনিবার্য পতনের প্রয়োজনে।

সোফোক্লেস অজানিত মাতৃগামিতার পাপকে গ্রিসীয় আবহে ন্যাস করেছিলেন। ধারণা করা যায়—বহু পূর্বে থেকে প্রচলিত যে-কাহিনি প্রাচীন মিশরীয় লোকায়ত জীবনে প্রচলিত ছিল, সোফোক্লেস তাকেই হয়তোবা গ্রিসীয় শিল্পপ্রক্রিয়ায় ট্র্যাজিডিতে একাঙ্গীকরণ করেছিলেন। এই একাঙ্গীকরণ সমধর্মী—অর্থাৎ লেখকের ভাবের অনুকূলে গৃহীত কাহিনি। এই কাহিনির মধ্যে নানা অংশ যেমন আপেল্লোর মন্দিরের দৈববাণী, করিন্থ থেকে ইডিপাসের পলায়ন ইত্যাদি আমরা ফিউশনরূপে কল্পনা করে নিতে পারি। এটাও একীকরণের/একাঙ্গীকরণ দৃষ্টান্ত। এবং সোফোক্লেস মানুষের মহাজাগতিক বিধানের ফিউশন ঘটিয়েছেন এই কাহিনিতে—এক কালদুর্লভ ধ্রুপদী ভঙ্গিতে। একীকরণ তত্ত্বের মাধ্যমে আমরা শিল্পস্রষ্টার Craft of Elaboration-এর বিষয়টি বেশ বুঝতে পারি। প্রাচ্যর যে কোনো মহাকাব্য—যেমন রামায়ণ, মহাভারত, আরব্যরজনী, কথাসরিৎসাগর এবং ফেরদৌসীর শাহনামা এর দৃষ্টান্তস্থলরূপে গ্রাহ্য হতে পারে। এর মধ্যে সোমদেব ভট্টের কথাসরিৎসাগরের Craft of Elaboration সহজ উদাহরণরূপে নেয়া যায়।

কথাসরিৎসাগরের নরবাহনদত্ত—জনন লম্বক অধ্যায়ে দেখা যায় জমজ সন্তানের মাতা দরিদ্র ব্রাহ্মণী বাসবদত্তার নিকট প্রেরিত হলো। রাজ্ঞী বাসবদত্তা ব্রাহ্মণীর জ্ঞান পরীক্ষার নিমিত্তে বললেন :

— ব্রাহ্মণী, আমাকে কোনো আখ্যায়িকা বলুন।
অতঃপর ব্রাহ্মণী পুরাকালের এক সামন্ত নরপতির গল্প শুরু করে। গল্পান্তে অভিভূত রানী যখন ব্রাহ্মণীর পরিচয় জিজ্ঞাসা করে বলেন—
— তোমার জীবনের ইতিহাস আমাকে বলো, আমি শ্রবণ করিতে আগ্রহান্বিত।১
তখন ব্রাহ্মণীর মুখে শুরু হয় পিঙ্গলিকার কাহিনি। এবং তৎপর দ্বিতীয় তরঙ্গে নরবাহনদত্ত—জনন প্রসঙ্গের শুরু।

দেখা যাচ্ছে যে, প্রতি গল্পের শেষেই আরেকটি গল্পের সম্ভাবনাকে অনিবার্যকারণ দ্বারা বিস্তারীকরণ একটি ধ্রুপদী কৌশল। তা কথাসরিৎসাগরে যেমন আছে—তেমনি তৎপূর্ববর্তীকালের সকল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যর মহাকাব্যে রয়েছে। Elaboration-এর মাধ্যমে গল্প বর্ধিতকরণের এই কৌশল ইলিয়াড এবং অডিসি-তেও রয়েছে। অডিসির সমুদ্র যাত্রায় আমরা দেখি বিচিত্র বিপরীত অভিজ্ঞতা—তরঙ্গঘৃষ্ট ইজিয়ান সমুদ্রের পথে ইথাকার কূলে পৌঁছাবার বিচিত্র সংগ্রাম। ইলিয়াডে এই কৌশল অধিকতর নাট্যমুখর। ইলিয়াডে নাট্যকৌশলের একাঙ্গীকরণ—অডিসিতে বর্ণনাত্মক রীতির একীকরণ।

মহাভারত রামায়ণে প্রতি অনুচ্ছেদের একাঙ্গীকরণ-রীতি আলোচনা করলে দেখা যায়—কোথাও কোথাও—এর দুটি অনুচ্ছেদের ভেতর—সেকালে এবং এর পূর্ণাঙ্গ গড়নের কালে—নতুন একটি কাহিনির একাঙ্গীকরণ সম্ভব হয়েছিল।

কৃত্তিবাসী রামায়ণের পুরো গল্পটা বাল্মীকির মতো নয়। তাতে রুদ্র রৌদ্র প্রভৃতি রস ঠিক রসশাস্ত্র-বিধি অনুসারে নেই, কিন্তু যখন দেখি বিশাল বাল্মীকি রামায়ণের যুদ্ধক্ষত মুছে গিয়ে তা একান্তরূপে প্রেম ও ভক্তিকাব্য হয়ে উঠেছে তখন বুঝতে পারি ওর মধ্যে বাঙালির নবজাগ্রত কৃষ্ণভক্তি অচিরে একাঙ্গীকৃত হবে:

সরযূর স্রোত বহে অতি খরশাণ।
স্রোতে নামি তিন ভাই ত্যাজিলেন প্রাণ ।।
স্বর্গেতে দুন্দুভি বাজে, পুষ্প-বরিষণ।
সরযূতে তিন ভাই ত্যাজেন জীবন।
নরদেহ ছাড়িয়া গেলেন তিন জন।।
বৈকুণ্ঠে শ্রীবিষ্ণু গিয়াছেন দরশন।
শ্রীরাম ভরত আর শত্রুঘ্ন লক্ষ্মণ।
মিলি হইলেন এক-দেহ নারায়ণ।।
সীতাদেবী আইলেন শ্রীরামের পাশে।
লক্ষ্মীরূপা হইলেন সীতা অবশেষে।।২

তিন ভাই বৈকুণ্ঠে গিয়ে নারায়ণে রূপান্তরিত হলেন। এবং এই নারায়ণই তৃতীয় জন্মে কৃষ্ণরূপে যে মর্তে আবির্ভূত হবেন—তার ভক্তি পূরণের দার্শনিক ইতিহাসও রয়েছে এর মধ্যে। বাস্তবে তা ঘটেছিল। চৈতন্যদেবের কালে কৃষ্ণভক্তিবাদের উত্থানে এ সত্য আরও বাস্তবরূপে ধরা দিয়েছিল।


একটি গল্পের ভেতর বক্তা আরেকটি দৃষ্টান্তমূলক গল্প বললো এবং সেই গল্প থেকে অনিবার্যরূপে আরো অনেকগুলো প্রাসঙ্গিক গল্প বেরিয়ে এল—খুব সংক্ষেপ এ-ই হচ্ছে একাঙ্গীকরণ তত্ত্বের একটি বিশেষ দিক—বিচিত্র বিষয় আত্মসাৎকরণপূর্বক কাব্যের কাহিনি সৃষ্টি, আঙ্গিক ও আকারদানের কৌশল।

একীকরণ/একাঙ্গীকরণ বা ফিউশন তত্ত্বের সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করলে আমরা এর বিভিন্ন দিকগুলোর সঙ্গে ভিন্নভিন্নভাবে পরিচিত হতে পারি। প্রথমত এই তত্ত্বের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ফিউশনের ক্ষেত্রে—
১. শিল্পসৃষ্টির কৌশল, রচিয়তার ভাব ও উপকরণগত সংশ্লেষণ পর্যবেক্ষণ।
২. ভিন্ন এমনকি বিপরীত স্বভাবের উপাদানের একীভূত রূপ-সৃষ্টি-কৌশল বিচার।
৩. এবং উপর্যুক্ত বিষয়গুলোর একীভূত উপাদানরূপে নবার্থক হয়ে উঠেছে কিনা তা দেখা।

শিল্পসৃষ্টির কৌশল—কাল এবং ব্যক্তিপ্রতিভার ফিউশন। বিপরীত স্বভাবের উপাদানকে চিত্র-সঙ্গীত-নাট্য-কাব্যকলার মধ্যে সংস্থাপন—শিল্পকর্মের নবরূপ বা নবতর মহিমার সৃষ্টি—একীকরণ বা ফিউশন।

সঙ্গীতের ক্ষেত্রে খুব সহজে আমরা এ বিষয়টি অনুধাবন করতে পারি। বাঙলা গানে উনিশ শতকের প্রারম্ভে নিধুবাবু পাঞ্জাবি টপ্পার একাঙ্গীকরণ ঘটিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর সঙ্গীতের সুরের উপকরণ যে কথা—তা প্রধানত বাঙালির পুরাণাশ্রয়ী। উত্তরকালে রবীন্দ্রনাথ আকাশস্পর্শী প্রতিভায় নিধুবাবুর টপ্পাকে ভেঙে বিচিত্রভাবের এ ধাঁচের সুর তৈরি করলেন। রবীন্দ্র-টপ্পার ভাবলোক বিশ্বজনীন এবং তা নিতান্ত টপ্পাশ্রয়ীও নয়। ফাল্গুনী নাট্যের একটি গান—‘তোমায় নতুন করে পাব বলে হারাই ক্ষণে ক্ষণ’-এর উদাহরণরূপে গ্রাহ্য হতে পারে। সুরটি বিশ্লেষণে দেখা যায়—টপ্পার কাজ এই চরণের দু’স্থলে মাত্র, বাকি কথার সুর টপ্পার কারুকার্যের ভেতর রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব, মৌলিক সুর নিপুণতার সঙ্গে একাঙ্গীকৃত এবং পরবর্তী চরণে যেখানে বলা হয়েছে—‘দেখা দেবে বলে তুমি হও যে অদর্শন’—সেখানে আবার শেষোক্ত শব্দে টপ্পার কৌশলই প্রযুক্ত হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী চরণসমূহ—
‘ওগো তুমি আমার নও আড়ালের/ তুমি আমার চিরকালের’—নিঃসন্দেহে টপ্পা বিসম্বাদী। কিন্তু সুরের গহিন এবং ঘনস্রোতে যে তীক্ষ্ণতা—তা টপ্পার কারুকাজকে চরণান্তে আরো বেশি অনিবার্য করে তোলে। এ যদি টপ্পার হুবহু অনুকরণ হতো তবে তা ফিউশন তত্ত্বের একটি সাধারণ লক্ষণ বলে বিবেচনা করা যেত। তাতে তা দেশকালের প্রেক্ষাপটে নবরূপসৃজনের সাধারণ সীমায় এতটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হতো না।


‘সন্ধ্যামালতী যবে ফুলবনে ঝুরে/ কে আসি বাজালে বাঁশী ভৈরবী সুরে’—গানটি রচিত হয়েছে মূলত কাফি ঠাটে, কিন্তু এর মধ্যে নজরুল অসাধারণ নৈপুণ্যে একাঙ্গীকরণ করেছেন রাগ ভৈরবীর।


রবীন্দ্রনাথ কোথাও কোথাও সরাসরি বাউল বা রামপ্রসাদের সুরের একাঙ্গীকরণ করেছেন তাঁর গানে। বাউল সুরের অনুকৃত গানগুলির মধ্যে—‘ভেঙে মোর ঘরের চাবি’ কিংবা ‘আমার সোনার বাংলা’ উল্লেখযোগ্য। এ সকল গানে মূলত বাউল ঠাটের মধ্যে রবীন্দ্র-ভাবলোকের যে ফিউশন ঘটেছে তা বাংলা গানের ক্ষেত্রে এক অভিননব সম্পদরূপে বিবেচ্য। কাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে রাগ ও সুরের ফিউশন বিস্ময়কররূপে বহুমুখী। উদাহরণস্বরূপ, দ্বিতীয় একটি বিসম্বাদী রাগের মাধ্যমে সৃষ্ট নজরুলের ‘সন্ধ্যামালতী’ এর উৎকৃষ্টতম উদাহরণ। গানের দু’টি চরণ—

‘সন্ধ্যামালতী যবে ফুলবনে ঝুরে/ কে আসি বাজালে বাঁশী ভৈরবী সুরে’—গানটি রচিত হয়েছে মূলত কাফি ঠাটে, কিন্তু এর মধ্যে নজরুল অসাধারণ নৈপুণ্যে একাঙ্গীকরণ করেছেন রাগ ভৈরবীর। কাফি গোধূলি পর্বের রাগ, ভৈরবী সকালের এবং আশ্চর্যের বিষয় হলো দুই রাগের মিশ্রণে সন্ধ্যামালতীর যে সুরলোক তৈরি হলো তার একটি ব্যাখ্যাও এই গানে পাওয়া যাচ্ছে। সন্ধ্যামালতী ফোটার সময় সূর্যাস্তের কিছু আগে এক অপরূপ বাঁশি বেজে উঠলো পূর্ণিমার। সেই পূর্ণিমা এতটা উজ্জ্বল যে, প্রকৃতির ঘটল কালভ্রম। এ যেন যুগপ্রবর্তক কোনো কবি, যাঁর আবির্ভাব অনিবার্যকালকে সৃষ্টির উদ্ভাসে নবকালে করেছে রূপান্তরিত।

একাঙ্গীকরণ তত্ত্ব খুব সহজে অনুধাবন করা যায় সঙ্গীতের ভাঙন-গড়নে। খুব সাধারণ শ্রোতার কানেও তা আনন্দ দান করে। একটি গানের ভেতরে বিচিত্র ধারার সুরস্রোত ভিন্ন রকম চলন-রেখা তৈরি করে। সুর-সংশ্লেষণের এই পদ্ধতিও একাঙ্গীকরণ তত্ত্বের আওতায় পড়ে।


হ্যামলেটএ মিড সামার নাইটস ড্রিমে রূপগত একাঙ্গীকরণ কৌশলের দুটি সাধারণ উদাহরণ এখানে দৃষ্টান্তরূপে তুলে ধরা যায়। এই নাটকের Act III Scene II-তে Hautboys Plays নামের একটি অণুনাট্য মূকাভিনয়ের মাধ্যমে নিষ্পন্ন হতে দেখি। বলা বাহুল্য, যে দলটি রাজসভায় হ্যামলেট নির্দেশিত নাটকটি প্রদর্শন করে তারা ভ্রাম্যমাণ লোকায়ত নাট্যদল। শেক্সপিয়ার সুগভীর শিল্পকৌশলে প্রাক্তন রাজা ক্লডিয়াসের হত্যাকাণ্ড এবং হ্যামলেট-মাতা গার্ট্রুডের ভূমিকাকে মঞ্চে নিয়ে এসেছেন এইভাবে :

Hautboy’s plays. The dumb show enters. Enter a king and a Queen very lovingly; the Queen embracing him, and he her. She kneels, and makes show of protestation unto him. He takes her up, and declines his head upon her neck; lays him down upon a bank of flowers: she, seeing him asleep, leaves him. Anon comes in a fellow, takes off his crown, kisses it, pours poison in the king’s ears, and exit. The Queen returns; finds the king dead, and makes passionate action. The poisoned, with some two or three Mutes, comes in again, seeing to lament with her. The dead body is carried aways. The poisoned woes the Queen with gifts: she senses loath and unwilling a while, but in the end accepts his love.

এই দৃশ্যে ওফেলিয়ার সকরুণ উক্তি৪—

What means this, my lord?

হ্যামলেট বলে—

Marry, this is miching mallecho; it means mischief.

শেক্সপিয়ার হ্যামলেট নাটকের মঞ্চবহির্ভূত প্রাক্তন ঘটনার ফিউশন ঘটিয়েছেন। দর্শক বুঝতে পারে প্রকৃতপক্ষে ক্লডিয়াসের সিংহাসন আরোহণের নেপথ্য প্রক্রিয়া বা ষড়যন্ত্র কী ছিল। শুধু তাই নয়, যে মিশ্চিভিয়াস ডিডস—ক্লডিয়াসের এই মূকাভিনয়ের মাধ্যমে তার প্রতিক্রিয়া দর্শনও যেন হ্যামলেটের কাম্য। বাস্তবে আমরা দেখি এই অণুনাট্যান্তে ক্লডিয়াসের প্রতিক্রিয়া কী হয়েছিল। তখন ওফেলিয়া এর একটা সঙ্গত ব্যাখ্যা করে এই বলে যে—

Belike this show imports the
argument of the play.

এ মিড সামার নাইটস ড্রিম-এর পঞ্চম অঙ্কে পিরামুস-এর প্রসঙ্গে এথেন্সের ডিউক থেসিউস বলেন—Is there no play, to case the anguish of a torturing hour? Call philos trate.৫

অতঃপর পিরামুসের প্রসঙ্গ। কারণ পিরামুস তৎকালীন ইংল্যান্ডের ভ্রাম্যমাণ নাট্যদল—যারা বিচিত্রবেশে সাধারণ্যে আনন্দ দান করত। এ মিড সামার নাইটস ড্রিম-দৃষ্টে বলা যায় এ দলটি বিচিত্র ধরনের মুখোশ পরতো এবং তাদের কাজ ছিল রঙ্গব্যঙ্গ পরিহাসের মাধ্যমে আনন্দ দান। শেক্সপিয়ার নিজস্ব শিল্পপ্রতিভায় লোকায়ত নাটককে স্বপ্নাদিষ্ট ভালোবাসার চন্দ্রালোকিত রাত্রে নাট্যমধ্যে সংযুক্ত করেছিলেন।

নাট্যে বিসম্বাদী বিষয়কে ফিউজ করবার কৌশল এলিজাবেথীয় কালের আগে পরে এক বিশিষ্ট শিল্পীরীতি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। ইংরেজি নাটকে এর সূত্রপাত মার্লোর হাতে। মার্লো ক্যামব্রিজে পাঠকালে লাতিন নাট্যকার প্লাউতুসের নাটক থেকে শিখেছিলেন অনেক কিছু। সঙ্গে গ্রিক ট্র্যাজেডি এবং সঙ্গে মিনান্দারের নিও-কমেডির পাঠ তো ছিলই। এই অভিজ্ঞতার আলোকে মার্লো—ডক্টর ফস্টাস নাটকে খুব সফলভাবে—তা দ্য ট্র্যাজিক্যাল হিস্ট্রি হওয়া সত্ত্বেও—কমেডিকে একাঙ্গীকৃত করতে সমর্থ হয়েছিলেন। উত্তরকালে ট্র্যাজেডির ক্রিয়ায় কমেডিকে নানাভাবে এনেছিলেন শেক্সপিয়ার তার নানান নাটকে।

কবর খননের দৃশ্য, ম্যাকবেথে ডাকিনীদের দৃশ্য কিংবা কিং লিয়ারে কান্টের সঙ্গে কথোপকথনকালের দৃশ্য—আমরা দেখি কমেডির দৃশ্য মূল ঘটনা কাহিনির সঙ্গে একীকৃত। প্রবল ও অনিবার্য ট্র্যাজেডির উপরে ঘনিয়ে ওঠা কৃষ্ণবর্ণ তরঙ্গের সঙ্গে তা বিস্ময়করভাবে অবিচ্ছেদ্য।

মার্লো সমকালের মোরালিটি প্লের মধ্যে প্রধান চরিত্রকে একাঙ্গীকৃত করলেন এবং গ্লুটোনি, লিচারি প্রভৃতি সাতটি বাইবেলীয় মহাপাপকে বাদ দিলেন না তার নাটক থেকে। ডেভিল তো রইলই। কিন্তু প্রধান চরিত্রের জীবনদর্শন ও আকাঙ্ক্ষার ঝড়ো হাওয়ায় এক মজ্জমান রেনেসাঁ-মানবের আর্তনাদ নাটকের আকাশ-বাতাসকে মথিত করে জীবনের চূড়ান্ত পরিসমাপ্তির দিকে চলে যায়।

তবে এলিজাবেথীয় ঘরানার ট্র্যাজেডির ভেতর কমেডির ঐ প্রয়োগ যতটা শিল্পাঙ্গিকের দাবিতে, ঠিক ততটা তাতে ছিল কালেরও দাবি। এলিবাজেথীয় কালের দর্শকরুচি ট্র্যাজেডির সুগম্ভীর শঙ্খধ্বনি শোনার অনুকূলে ছিল না। সে জন্যে রেনেসাঁ-কালের ইংরেজি ট্র্যাজেডি নাটকগুলোতে আছে মুখরতা এবং কমেডির ফিউশন। সমকালের ক্যাথলিক জনগণের রুচিও যে ঐ সকল নাটককে প্রভাবিত করেছিল সন্দেহ নেই।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ওথেলোর ডেসডিমোনা হত্যার দৃশ্য। বালিশ-চাপা দিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা। কিন্তু মঞ্চে নারী-হত্যার দৃশকে অনুমান করা যায়—শেক্সপিয়ার যিশুর রক্তপাত না করার নির্দেশটাকেও হয়তো ঐভাবে ফিউজ করেছিলেন। এক নিষ্পাপ নারীর মৃত্যু হলো রক্তপাত ব্যতিরেকেই।


বাস্তবিক পক্ষে গ্যেটের মন্তব্য সমর্থন করে বলতে হয় যে, নিরেট ক্লাসিসিজম বা নিরেট রোমান্টিসিজম বলতে পারতপক্ষে কিছু নেই। তা থেকে বোঝা যায় ক্লাসিসিজমে রোমান্টিকের একাঙ্গীকরণ আছে। ভার্জিলেই এর প্রমাণ মেলে।


ধ্রুপদীকালের পরে নব্য ধ্রুপদীবাদের কাল যে এল তা ছিল তাত্ত্বিক ফিউশন। অর্থাৎ এটি গ্রিক ও রোমের আদর্শকে সামনে রেখে ইংরেজি নাটকের মুখোমুখি ফরাসিদের একটি তাত্ত্বিক প্রয়াস। কিন্তু ট্র্যাজেডির ক্ষেত্রে রাসিনের ফ্রেইড্রা ছাড়া আর তেমন কোনো মহৎ ট্র্যাজেডির সৃষ্টি হলো না। পক্ষান্তরে সমকালীন ভদেভিলস-এর লোকায়ত রূপকে সাঙ্গীকৃত করে এবং ফরাসি সমাজকে একেবারে মঞ্চে এনে দাঁড় করিয়ে মলিয়ের যে নতুন কমেডির ধারা তৈরি করলেন তা বিশ্বজয়ী এবং সর্বকালজয়ীও বটে।

তত্ত্বগত একাঙ্গীকরণের ধারায় আমরা দেখতে পাই যে, নিরেট ধ্রুপদীকালের মধ্যেও রোমান্টিসিজম একাঙ্গীকৃত। এবং বাস্তবিক পক্ষে গ্যেটের মন্তব্য সমর্থন করে বলতে হয় যে, নিরেট ক্লাসিসিজম বা নিরেট রোমান্টিসিজম বলতে পারতপক্ষে কিছু নেই। তা থেকে বোঝা যায় ক্লাসিসিজমে রোমান্টিকের একাঙ্গীকরণ আছে। ভার্জিলেই এর প্রমাণ মেলে। ইন্নিসের প্রতি দিদোর প্রেমাকর্ষণ এবং আত্মহত্যা এ সত্য প্রমাণ করে যে, ক্লাসিকেও রোমান্টিকতার ফিউশন আছে।


উত্তরকালে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে যে Pseudo spic-সমূহ রচিত হয়েছে তার মধ্যে ভার্জিলের ইনিড-এর কথা উল্লেখ করা যায়। রোমান সিজার-এর নির্দেশে তিনি রোমক জাতির পূর্ব ইতিহাসরূপে ইনিড রচনা করেন। কিন্তু ইতিহাস ও শিল্পকর্মের বিবেচনায় এর দ্বৈত অবস্থান রয়েছে। দ্বিগ্বিজয়ী রোমান সৈন্যদের রণধ্বজা যখন গ্রিক ও এশিয়ামাইনরসহ আফ্রিকার একটা বিশাল অঞ্চল দখল করছে তখন এই কাব্য রচিত হয়। ভার্জিল এইকালেই রোমানদের বিজয়কীর্তিকে পুরাণাশ্রয়ী ইতিহাসের উপর দাঁড় করাতে চাইলেন। সন তারিখের বাস্তব দায় এড়াতে তিনি বেছে নিলেন ট্রয়ের ভগ্নাবশেষ থেকে বীর ইন্নিসের নতুন ভূমি সন্ধান-নিমিত্তে সমুদ্র যাত্রা।

একাঙ্গীকরণ তত্ত্বে এ রীতিটি বিপ্রতীপ। অর্থাৎ এতে দু’ধরনের ফিউশন ঘটেছে।
১. ইতিহাসে পুরাণের ফিউশন।
২. পুরাণে কাব্যের ফিউশন।

কিন্তু সব লক্ষণ বিচার করে বলা যায় যে, ভার্জিল যেনবা রোমান জাতিসত্তার একটি শক্তিশালী ঐতিহ্যের উৎস খুঁজতে চাইছেন—যাতে করে সমকালের বিশ্বজয়ী রোমানদের বিশ্বজয়ের ছন্দের সঙ্গে তা মেলে।

প্রাচ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য ফেরদৌসীর শাহনামা কেয়ানি রাজবংশের ইতিহাস আবার একই সঙ্গে তা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মহাকাব্যের একটি। ফেরদৌসী ইরানি রাজবংশের ইতিহাস রচনা করতে গিয়ে শৌর্য ও বীর্যের অনিত্যতাকে বারবার তুলে ধরেন। সে জন্যে তাঁর ইতিহাস পুরাণ ও রূপকাশ্রয়ী, যেমন—দানবের হাতে সিয়ামকের নিধন।
কৃষ্ণকায় দৈত্যের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য কায়ুমুরস্ ও হোশঙ্গের যাত্রা, বাদশা জামশেদ সাতশো বছর রাজত্ব করেছিলেন৬ প্রভৃতি।

একাঙ্গীকরণ তত্ত্বের আলোকে ফেরদৌসীর শাহনামা ভার্জিলের ইনিডের সাথে তুলনীয়। উভয় ক্ষেত্রে ইতিহাসের মধ্যে কাব্যের ফিউশন এবং কবির বিশ্বদৃষ্টি ইতিহাসকে বিস্তারিত প্রসারিত এবং মূলত তাকে কাব্যবর্তী করে তুলেছে। ফেরদৌসীর শাহনামায় কাব্যাবতরণের বিষয়টি যেভাবে বলা হয়েছে তা পৃথিবীর অন্য কোনো মহাকাব্যে সে অর্থে লভ্য নয়। ইরানের প্রচলিত লোকায়ত কাহিনির মধ্যে ফেরদৌসী যে ধ্রুপদীরীতিকে একাঙ্গীকৃত করে তুলেছিলেন—তার অসঙ্কোচ বর্ননা তাঁর কাব্যে পাওয়া যায়। শাহনামায় আছে :

এই সংগ্রহ থেকে অনেক কাহিনি/ কথকগণ তাদের শ্রোতাদেরকে পড়ে শোনাতো/ জগতের হৃদয় যেন এইসব উপাখ্যানের মধ্যে সযত্নে রক্ষিত ছিল,/ তাই জ্ঞানী ও মূর্খ সবারই মনোরঞ্জন করতো এই গাথা/ একদা এক মুক্তরসনা যুবকের আবির্ভাব হলো,/ সে ছিল কবি, সুন্দর স্বভাব ও উজ্জ্বলমনা।/ আমাকে সে বললো, এই গাথাকে আমি সাজিয়েছি কবিতার মালায়,/ সেই কবিতা মনোরঞ্জন করছে আসর ও মণ্ডলীর।

শিল্পের তত্ত্বগত দিকটি আলোচনা করলে দেখি, প্রতিটি সুমহৎ শিল্পকর্মেই—সুনির্দিষ্ট তত্ত্বের ভেতর লেখকের ব্যক্তিপ্রতিভা এক সুমহৎ ভাঙনের দ্বারা বৃহৎ ও মহৎ হয়ে উঠেছে। আনা কারেনিনার বাস্তবতা সমকালীন জারশাসিত রুশ সমাজ ও রুশীয় অর্থোডক্স চার্চের ধর্মনীতির বিরুদ্ধে এক অবিনশ্বর প্রতিবাদ। আমরা দেখতে পাই, টলস্টয় মহাকবির প্রেরণায় চরিত্রের চারপাশের মৌলিক বিস্তারিত বিষয়গুলোকে ঐ উপন্যাসে কিভাবে সাঙ্গীকৃত করে নিয়েছেন। ওয়ার এন্ড পিস উপন্যাসের হোমারীয় আঘ্রাণ বিলক্ষণরূপেই বিদ্যমান। কিন্তু তা উপাদানরূপে নয়, মানব-সভ্যতার ও জাতিগত নৈসর্গিক চলনের ভেতর শুভ অশুভের দ্বন্দ্বে ভিন্নকাল ভিন্ন কৌশলে রূপায়িত।


ফিউচারিজমের রাজনৈতিক নিহিতার্থ শিল্পের আবরণে ঢাকা ছিল। অর্থাৎ ঐ শিল্পতত্ত্বে যেন মুসোলিনির স্বৈরাচারী মনোভাবেরই খানিকটা প্রেতচ্ছায়ার ফিউশন মেলে।



কী উপায়ে শিল্পের উপকরণ, উপাদান, আয়তন, আঙ্গিকে ফিউশন ঘটে থাকে তার বিস্তারিত ও অনুপুঙ্খ আলোচনা প্রয়োজন। শিল্পে যখন রিয়ালিজম এল, শেখভ তাকে আত্মস্থ করে রিয়ালিজমের মধ্যেই এক আশ্চর্য সুর সংযোজন করলেন। মানুষের প্রতিদিনের পরিচয় তাঁর নাটকে চিরকালের আর্তনাদতুল্য মূর্চ্ছনায় বাজে। কিংবা যখন রিয়ালিজমের পাশে সিম্বলিজম অনিবার্য হলো—দেখা যায়—সিম্বলিজমের মূল উপাদানে রিয়ালিজম দৃশ্য ও অদৃশ্যরূপে কোনো না কোনোভাবে গৃহীত হচ্ছে। অথবা এক্সপ্রেশনিজমের ভঙ্গুর পৃথিবী যখন মানুষের মহৎ অভিজ্ঞানসমূহকে আসন্ন নাৎসি জার্মানিতে একেবারেই অস্বীকার করে বসলো—ঠিক তখন তার মধ্যে ঢুকে পড়লো চিত্রকলার ইম্প্রেশনিজম। কিন্তু তারও আগে ফ্যাসিবাদী শিল্পতত্ত্ব ফিউচারিজম।

ফিউচারিজমের রাজনৈতিক নিহিতার্থ শিল্পের আবরণে ঢাকা ছিল। অর্থাৎ ঐ শিল্পতত্ত্বে যেন মুসোলিনির স্বৈরাচারী মনোভাবেরই খানিকটা প্রেতচ্ছায়ার ফিউশন মেলে। শিল্পের সমস্ত প্রকরণ ভেঙে দাও—এবং ঐ ভাঙাটাই হলো শিল্প। যেন মুসোলিনির আকাঙ্ক্ষা—ঝড়ে জলে জেগে ওঠো মৌলিক রোম। রাজ্যরাষ্ট্র জাতিসত্তা বিলোপী শক্তিরূপে ফ্যাসিবাদী আত্মপ্রকাশের একাঙ্গীকরণ যেন পরোক্ষভাবে ফিউচারিজমের উদ্ভাবনার পেছনে ছিল। এজরা পাউন্ডের মতো কবিও ফ্যাসিবাদী অর্থনীতির প্রবক্তা হয়ে উঠেছিলেন।

তবে তারও আগে সাম্য-সমাজ-ব্যবস্থায় রাষ্ট্রস্থাপন এবং শিল্পে সাধারণ মানুষের অধিকার, শিল্পকর্মের সমাজ পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ হাতিয়ার হওয়া কিংবা শিল্প সম্পর্কে এই রকম অনেক দায়বদ্ধতার কথা উচ্চারিত হতে দেখি। শ্রেণিদ্বন্দ্বের বৃত্তে বেঁধে দেয়া হলো তার শেকল। আগে তত্ত্ব, পরে শিল্প—এই প্রায় অসম্ভব ও অবাস্তব বিষয়টিকে শিল্পের ক্ষেত্রে তত্ত্ব হিসাবে দাঁড় করানো হলো।

অর্থাৎ সমাজতত্ত্বকে একাঙ্গীকৃত করেই শিল্প—এইরকম একটা পূর্বদায়বদ্ধতাকে মার্কসীয় শিল্পভাবনা হিসাবে খাড়া করা হলো। গিয়র্গ লুকাচ—এই দায়বদ্ধতার সমকালীন রূপায়ণকে আরও বৃহত্তর ও মহত্তর রূপদান নিমিত্তে পৃথিবীর সুবৃহৎ শিল্পধারার প্রাচীন দৃষ্টান্তকে মার্কসীয় শিল্পবৃত্তে গ্রহণ করতে চাইলে তা রাষ্ট্র ও সংঘ কর্তৃক পরিত্যক্ত হলো। জর্জ থমসন প্রমুখ রিচ্যুয়ালের ভেতর শিল্পের অস্তিত্বের সন্ধান করলেন।

একাঙ্গীকরণ তত্ত্বে ফিউশনের বিষয়টি প্রায় সর্বত্র লেখকের মূল শিল্পভাবনা ও ক্রিয়ায় বহির্জগতের আহরিত আঙ্গিকভাব ও অন্যবিধ উপকরণের সাঙ্গীকরণ এবং অনিবার্য বিন্যাস।


চিত্রশিল্পের আঙ্গিকের ক্ষেত্রে ফিউশনের বিষয়টি খুব সহজেই বোঝা যায়—যখন প্রাকৃতজনের মধ্যে শ্রমজীবীর শক্তিকে এস.এম সুলতান প্রি-রাফায়েলেটিক মুডে ধ্রুপদীবর্তী করে তোলেন। কিংবা যখন কোনো নাটকে একই রীতিতে ধ্রুপদী গড়নটাকে লোকায়ত জীবনে একীকরণ-প্রক্রিয়ায় মিশ্রণ করা হয়। অম্লের ভেতর অ্যানোড এবং ক্যাথোড যেমন ঋণাত্মক ও ধনাত্মকের মিলনে অদৃশ্য আলোকে বাস্তবরূপ দান করে, এও যেন ঠিক তেমনি।

গ্যেটের দিওয়ানে প্রাচ্যের কাব্যরীতি একাঙ্গীকৃত—আবার তাঁর রচিত মহত্তম মানবভাষ্য ফাউস্তে প্রাচ্য-প্রতীচ্যের ফিউশনটা আঙ্গিক ও রসগত ভাবেই এসেছে বলে মনে করা যায়। সংস্কৃত নাটকের প্রস্তাবনায় ধ্রুপদীরীতিতে আধিকারিক, নট, নটী, নান্দী—প্রভৃতি ফাউস্তে আছে। অন্যদিকে পাশ্চাত্যের তিন হাজার বছরের মানবোত্থানের হেলেনকে পুরাণের ভস্ম থেকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন—সে সুরসুন্দরী অঙ্কশায়িনী হয়েছে—জন্ম দিয়েছে এক শিশুসংস্কৃতির পুত্র—কিন্তু সে পুত্র অকালমৃত।

ফাউস্তের যে অংশ মঞ্চে আসে নি—সে এই জন্য নয় যে—তাতে আকাশমুখা ফাউস্তীয় বৃত্তে দান্তের সার্কেল বিভাজনের ছাপ আছে। বরং ফাউস্তের দ্বিতীয় খণ্ড বর্ণনাত্মক ও বাণীপ্রধান। সেও প্রাচ্যের মানবমঙ্গলের সুবৃহৎ ধারণা থেকে গৃহীত বলে অনুমান করা যায়। তবে ফাউস্তের আঙ্গিকে দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্বের ছাপ আছে। এই সুমহান গ্রন্থ একাধারে এপিক, নাটক এবং কাব্য। কাব্যনাট্য নিশ্চয় নয়। এপিকতা কাব্যনাট্যের ধারণার চেয়ে বৃহৎ এবং মহৎ। কাব্যনাট্যের আধুনিক ধারণার বহুপূর্বে ফাউস্ত রচিত হয়েছিল।


সহস্র বৎসরের বিশ্বসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথেই প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের মানববিশ্ব এবং শিল্পরীতি এক লোকায়ত অথচ আধুনিক উপায়ে একাঙ্গীকৃত হয়েছিল।


জার্মান ক্লাসিক রোমান্টিসিজমের মূলে আছে ইংরেজি রোমান্টিকতাবাদের সঙ্গে ধ্রুপদীরীতির ফিউশন। গ্যেটের মন্তব্য থেকে বোঝা যায় শেক্সপিয়ারকে তিনি যতটা পছন্দ করতেন, ওয়ার্ডস ওয়ার্থ, শেলি, বায়রন, কিটসের রোমান্টিকতাবাদকে তিনি ততটা অপছন্দ করতেন।

সহস্র বৎসরের বিশ্বসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথেই প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের মানববিশ্ব এবং শিল্পরীতি এক লোকায়ত অথচ আধুনিক উপায়ে একাঙ্গীকৃত হয়েছিল। মনে রাখা চাই যে, ইংরেজ উপনিবেশের দুঃসহকালে রবীন্দ্রনাথ গীতাঞ্জলির মলাটের ভেতর যে সঙ্গীতমুখর কবিতাসমূহ ইংল্যাণ্ডে বহন করেছিলেন—তা এত নিরাভরণ অথচ এত বাঙ্ময়—লালনের কাছাকাছি অথচ ইউরোপীয় রোমান্টিকতার আরেক স্ফুরণ। রোমান্টিকতার ছদ্মাবরণে আরেক আধুনিক রিচুয়্যাল।

নাটকের ক্ষেত্রে এই ফিউশনতত্ত্বটা রচনারীতি ছাড়িয়ে নির্দেশনার ক্ষেত্রে সম্পর্কযুক্ত হয়। ডিউক অব সাক্সে মেনেনজাইন যে রোমান্টিক ক্লাসিকাল নাটকের নির্দেশনা-রীতিটা বের করে আনলেন বিশ্ববিজ্ঞানের নব উত্থানের কালে—তাতে দেনচেঙ্কো, স্তানিশ্লভস্কি যোগ করলেন বাস্তবতা আর প্রকৃতিবাদকে। অন্যদিকে মেথডের যে স্তরগুলো অভিনয়ের জন্য রচিত হলো, তার মধ্যে সবকিছু বর্জন করে মেয়ারহোল্ড নিয়ে এলেন নির্দেশনা—অভিনয়ের নতুন তত্ত্ব। কিন্তু পূর্ববর্তী তত্ত্বে আহৃত টেম্পো এবং রিদম—অর্থাৎ ছন্দোতাল—কিছুতেই এড়ানো গেল না। তাকে নতুন নিয়মের মধ্যে একাঙ্গীকৃত করতে হলো।

একাঙ্গীকরণ তত্ত্ব প্রারম্ভে খুব সরল পথে অগ্রসর হয়। কিন্তু দ্রুত এই তত্ত্বের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে দেখা যায়—শিল্পে এবং তত্ত্বে—সমাজ রাজ্য রাষ্ট্র এবং কালের ফিউশনের বিষয়টি বহুস্তরিক এবং জটিল। কবির ভাবলোকের ভেতর ভাবনার বহুবিপরীত প্রসঙ্গ আশ্চর্য এবং প্রায় অব্যাখ্যেয়রূপে যেভাবে প্রকাশ করে, একাঙ্গীকরণ তত্ত্ব দ্বারা সম্ভবত তারও বিশ্লেষণ সম্ভব। মধুসূদনের শিল্পদ্রোহ রামায়ণকে বেছে নিয়েছিল মেঘনাদের একিলিসীয় বীরত্বের সাজুয্যে। সেই অকালমৃত বীরের গড়নটা হেকটোরীয় পরিণামসত্ত্বেও হেকটোরিয়ান নয়—আবার বাঙালির প্রণয়াসক্ত জীবনের সকল মাধুর্য মেঘনাদেই বর্তমান। এই রীতিটার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দুরূহ। তবে তা যে দুটি ভিন্নমাত্রার চরিত্রকে সামনে রেখে দশকাল সংস্কৃতির একাঙ্গীকরণ এবং স্রষ্টার ভাবলোকে নতুন মাত্রার জন্মদান—তা অস্বীকার করবার উপায় নেই।

যে-কোনো শিল্পকর্মে লেখকের মৌলিক ভাবনার নিউক্লিয়াস বা মূল সংগঠন-কাঠামোর সঙ্গে ভিন্ন ধারার রং, তুলি, ভাষা, সুর—বাক্য, চিত্র বা সুরের নিরন্তর ফিউশন বা একাঙ্গীকরণেই নতুন শিল্পের জন্ম। পৃথিবীর আদিতম শিল্প সৃষ্টি থেকে আজ পর্যন্ত এই জানিত অথচ প্রায় অনুল্লিখিত বিষয়টি শিল্পসৃজনের মূলে কাজ করে থাকে।

যদি বলি সপ্তদশ শতকেই বাঙলা সাহিত্যের কিয়দংশে গ্রিক মিথের ফিউশন ঘটেছিল তবে খুব অবাক হবার মতো বলা হবে সেটা। কিন্তু বাস্তবে যখন দেখি ফার্সি সিকান্দার নামার ভাবানুবাদে ইরানীয় অনুষঙ্গে আলাউল গ্রিক-মিথের একাঙ্গীকরণ ঘটিয়েছিলেন তখন তাতে কেউ প্রতিবাদ করবেন না। বাঙলা কাব্যে ফিনিক্স যে—পদ্মাবতীতে কাকুনুস পাখিরূপে একাঙ্গীকৃত হয়েছিল—সেও বড় আশ্চর্য হবার মতো ঘটনা।

একাঙ্গীকরণের এই বিষয়টি আলাওলে এসেছে অন্যের হাত ধরে—যুগ, রাষ্ট্র, রাজ্য ও সংস্কৃতির কারণে। মধুসূদনে এসেছে সরাসরি। একাঙ্গীকরণের এই দুই রীতিও নানা কালে নানা মাত্রায় পরিদৃষ্ট হয়। কাহিনির একাঙ্গীকরণের ধারায় অন্তর্মুখী ও বহিরঙ্গের ফিউশনের নমুনা প্রাচীন পূর্ববঙ্গ গীতিকার ‌’দেওয়ানা মদিনা’য় অত্যন্ত প্রাসঙ্গিকভাবে উপস্থাপিত হতে দেখি।আলাল যখন দুলালের খোঁজে বেরিয়ে এ প্রান্তর সে প্রান্তর করে কোনো এক প্রান্তরে বসেছিল তখন সেখানকার রাখাল বালকরা ভ্রাতৃ-অন্বেষী আলালের সামনে একটি স্বতঃস্ফূর্ত অণুনাট্যের অবতারণা করে। ঐ অণুনাট্যের বিষয় ছিল আলাল দুলালের শৈশব—বিমাতার চক্রান্তের পরবর্তী জীবনের দুর্ভোগ ভ্রাতৃবিচ্ছেদ। লোকায়ত কাহিনির ফিউশনের কৌশলও একই ধারায় ঘটে। তবে লোকায়তরীতির মৌলিক ধারায় ফিউশনগুলো প্রথম রূপ থেকে বাহিত হয়ে কালে কালে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটের চরিত্র কাহিনি ঘটনা এমনকি সিমেন্টিক্যাল পরিবর্তনসমূহ ঘটিয়ে থাকে। চণ্ডীমঙ্গল, মনসাঙ্গমল কিংবা ধামালী এর উদাহরণ। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় ধামালী—উত্তরকালে চৈতন্য-প্রভাবে তা ‘গোপিকা গান’ বা ‘গীত’ নামান্তর লাভ করে।

মারমাদের মহাকাব্য মনরি মাংৎসুমুইতে বুলু বা পশুনৃত্যদৃষ্টে মনে হয় তা প্রাচীনকালের গল্প, কিন্তু উত্তরকালে বৌদ্ধ ধর্মমতের প্রভাবে তার ভেতরে পুনর্জন্মের ছায়াপাত ঘটে। নিও এথনিক নাট্যের ধারায় আফসার আহমদ-এর সাবাইয়া জ্যা থু কিংবা ওয়ালজানি শেরানজিঙের পালায় (অমুদ্রিত) এই ফিউশনটা ঘটেছে সমকালের প্রেক্ষাপটে।


মিথিক্যাল ফিউশনের ক্ষেত্রে দেখা যায় তা কত অপূর্ব অভাবিত পন্থায় সাধিত হয়। জ্যাঁ পল সার্ত্রের লে মস এবং গ্রিক ট্র্যাজেডির এক ক্ষুদ্র অথচ ভয়াবহ পরিণতির সমকালীন গল্প আল বেয়ার কামুর দ্য ক্রস পারপাস


বিনোদিনীর অভিনয়ের ফিউশন ঘটে প্রারম্ভে—যখন শিমূল ইউসুফ তাঁর ব্যক্তিগত অভিনেত্রী জীবনের বেদনায় কথকতা করেন অপূর্ব কণ্ঠস্বরে। আবার বিনোদনীর অভিনয়ে কথাকলির চলন—উনিশ শতকীয় বলন—মুহূর্তে মুহূর্তে নিজস্ব অভিনয়-কৌশলের সঙ্গে কণ্ঠসঙ্গীতের সংযোগ সমগ্র অভিনয়কে এক মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনাদানে সমর্থ হয়। বলা যায় নাসির উদ্দীন ইউসুফ নির্দেশক হিসেবে এই একাঙ্গীকরণের প্রক্রিয়া নিখুঁত ও অভাবিত শিল্পকৌশলে সম্পন্ন করেছেন।

মিথিক্যাল ফিউশনের ক্ষেত্রে দেখা যায় তা কত অপূর্ব অভাবিত পন্থায় সাধিত হয়। জ্যাঁ পল সার্ত্রের লে মস এবং গ্রিক ট্র্যাজেডির এক ক্ষুদ্র অথচ ভয়াবহ পরিণতির সমকালীন গল্প আল বেয়ার কামুর দ্য ক্রস পারপাস। এ দুই নাটকে নিয়তির স্থলে এসেছে রাষ্ট্র ও ব্যক্তির জীবনের বাস্তবতা কিন্তু তা অমোঘ, অপ্রতিরোধ্য।

সিমেন্টিক্যাল ফিউশনের দৃষ্টান্ত সরাসরি উপস্থাপনের চেয়ে নেরুদার আত্মজীবনীতে প্রাপ্ত একটি ঘটনার উল্লেখ করা যায়। ফরাসি কবি পল এলুয়ার নেরুদার কবিতা পাঠপূর্বক মন্তব্য করেছিলেন যে, নেরুদার ভাষায় এত আঞ্চলিক শব্দ কেন। উত্তরে নেরুদা বলেছিলেন—কেন, আমি তো চিলিয়ান স্প্যানিশ ভাষায় লিখি। বাঙলা কবিতায় এই ফিউশনের দৃষ্টান্ত মেঘনাদবধেও আছে।

কাহিনির নিউক্লিয়াসে ঘটনার অনিবার্য ফিউশন ট্র্যাজেডির চাকা গড়াবার অন্যতম শক্তি। সেটা ধ্রুপদীকালের নৈয়ায়িক শর্তও বটে। শেক্সপিয়ারের হ্যামলেটে দেখা যায়, জননী গারট্রুডের শয়নকক্ষে উৎক্ষিপ্ত হ্যামলেট এসেছে। প্রশ্নে সংশয়ে জর্জরিত করেছে জননীকে। হ্যামলেটের আগমনপর্বেই রানীর সঙ্গে আলাপরত মন্ত্রী—অর্থাৎ ওফেলিয়ার পিতা—হ্যামলেটের দৃষ্টি এড়াতে পর্দার অন্তরালে চলে যায়। গ্যারট্রুডের সঙ্গে কথোপকথনকালে পর্দার অন্তরালে গুপ্তচর আছে ভেবে হ্যামলেট দ্রুত সোর্ডবিদ্ধ করে মন্ত্রীকে। লুটিয়ে পড়ে সে। দর্শক ভীত হয়ে ওঠে মুহূর্তে—এই ভেবে যে—তবে পিতৃহত্যাকারী হ্যামলেটের সঙ্গে ওফেলিয়ার প্রণয় কোন ঊষর শূন্যতায় গিয়ে ঠেকবে।

এখানে ভুলক্রমে হত্যা—নির্দোষ হত্যাকারীর জীবনের দ্রুত যে পরিণাম একীকরণ করল, পরবর্তী ঘটনা সেই পথ বেয়ে হ্যামলেটের অশান্ত জীবনে টেনে এনেছিল এক অসামান্য তরুণ জীবনের পরিসমাপ্তি। ঘটনার ফিউশনের এ দৃষ্টান্ত সেকালের। একালের নাটকে ঘটনার ফিউশন ঘটনার অনিবার্যতা থেকে সংঘটিত হয় না। তা হয় পরিবেশ, চরিত্র এবং চরিত্রের অন্তরালবর্তী মানসিক বয়ন থেকে।

ডাকঘরে—প্রায় কিছুই ঘটে না। এক মৃত্যুযাত্রী কিশোরের আকাঙ্ক্ষার ভেতরে একাঙ্গীকৃত হতে দেখি কতনা বিচিত্র মানব ও নিসর্গের ভুবন।

প্রচলিত নৈয়ায়িকদের টীকাভাষ্যের অনুপুঙ্খতা শিল্পকর্মকে বুঝবার পথটিকে জটিল ও অগম্য করে তোলে। অথচ ফিউশন তত্ত্বে এত সব আয়োজন নেই। এ তত্ত্ব তার সহজ পন্থায় শিল্পের পাঠক এবং শিল্পস্রষ্টাকে সৃষ্টির সহজ কৌশলটি বুঝিয়ে দিতে সক্ষম। একাঙ্গীকরণ তত্ত্ব তাই সহজিয়া পন্থার শিল্পবিচার, অনুধাবন ও শিল্পসৃষ্টি কৌশলের তত্ত্ব।

রবীন্দ্রনাথ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপীয় পরাশক্তিদের নরক-উদ্গারে বিষণ্ন ম্লান এবং হতচকিত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু সেই বেদনা অচিরাৎ এক বিস্ময়কর কবিতা হয়ে উঠল। গীতবিতানে সেটি পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে, কিন্তু সে কবিতাটির ভেতরে ইতিহাস ও সমকালের ফিউশন আজও যেকোনো পাঠককে বিচলিত করে—

একদিন যারা মেরেছিল তাঁরে গিয়ে
রাজার দোহাই দিয়ে
এযুগে তারাই জন্ম নিয়েছে আজি,
মন্দিরে তারা এসেছে ভক্ত সাজি—
ঘাতক সৈন্যে ডাকি
‘মারো মারো’ ওঠে হাঁকি।
গর্জনে মিশে পূজামন্ত্রের স্বর—
মানবপুত্র তীব্র ব্যথায় কহেন, হে ঈশ্বর।
এ পানপাত্র নিদারুণ বিষে ভরা
দূরে ফেলে দাও, দূরে ফেলে দাও ত্বরা।।৮

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের থার্ডরাইখের উত্থান—পরবর্তীকালে আসন্ন হত্যাযজ্ঞকে একেবারে বিশ্ববিবেকের কাছে এনে স্মরণ করিয়ে দেয়া—যিশুর রক্তপাতের পর মানবহত্যা কেন। রবীন্দ্রনাথ অসাধারণ একাঙ্গীকরণের ধারায় যিশুকে স্বয়ং এ নাটকে রক্তাপ্লুত চরিত্ররূপে সঞ্জীবিত করেছেন। কিন্তু প্রথম দুই চরণে অপকৃষ্ট সভ্যতা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের খেদ উহ্য থাকে নি। যারা যিশুখ্রিষ্টকে ক্রুশবিদ্ধ করেছিল, তারাই শিশুখ্রিষ্টের ধর্মকে মানবহত্যার নিমিত্তে ব্যবহার করছে। এটা শ্লেষ-ব্যঙ্গ-বেদনার অপূর্ব ফিউশন।

কবির মূল ভাবনার (নিউক্লিয়াস) সঙ্গে কত বিচিত্র ও বিপরীত চিত্রের ফিউশন ঘটতে পারে, জীবনানন্দ দাশের নিম্নোক্ত কবিতাটি তার প্রমাণ—

যেমন বৃষ্টির পরে ছেঁড়া ছেঁড়া কালো মেঘ এসে
আবার আকাশ ঢাকে—মাঠে মাঠে অধীর বাতাস
ফোঁপায় শিশুর মতো,—একবার চাঁদ ওঠে ভেসে,
দূরে কাছে দেখা যায় পৃথিবীর ধানক্ষেত ঘাস,
আবার সন্ধ্যার রঙে সকল পৃথিবী থাকে ভরে!—
মরে যেতেছে যে তার হৃদয়ের সব শেষ শ্বাস
সকল আকাশ আর পৃথিবীর থেকে পাড়ে ঝরে।
জীবনে চলেছি আমি সে পৃথিবীর আকাশের পথে ধরে ধরে।৯

এখানে মূল ভাবনাটার কথা শেষ পঙ্‌ক্তিতে এসেছে বটে কিন্তু প্রথম চরণেই একাঙ্গীকৃত ‘ছেঁড়া ছেঁড়া কালো মেঘে’দের চিত্রকে ‘যেমন’ কথাটির সাথে একীকরণ করা হয়েছে এবং ‘যেমন’ শব্দটি সব সময়েই দ্বিধান্বিত পন্থায় বিষয়কে বিভাজনের মাধ্যমে একীভূত করে। এরপর নিসর্গের চিরায়ত রূপের মধ্যে একটা নিগেশন—পজিটিভের ধারায় উপনীত হবার জন্য কবি ‘কালো ছেঁড়া মেঘে’দের অনুষঙ্গে এনেছেন ‘মাঠে মাঠে অধীর বাতাস’, কিন্তু তার সাথে ফিউশন ঘটিয়েছেন শিশুর ফোঁপানোর শব্দ—পৃথিবীর নির্মম নিঃশেষীকরণের শুরুতে খুবই আর্দ্র কোমল চিত্রভাবনা। তার সঙ্গে সম্পূর্ণ ভিন্ন—শিশুর কান্নাকে জুড়ে দেয়া হলো—লক্ষকোটি বৎসরের আবর্তনে চলে যাওয়া মানুষদের মৃত্যুশ্বাসের ইঙ্গিত দানের মাধ্যমে। তারপর সেই ফিউশনই কবি ঘটান চিরায়ত প্রকৃতির স্বভাবচিত্রের কাছে—যেমন বলকানো বাতাসে ছিঁড়ে যাওয়া মেঘেদের ফাঁকে একবার চাঁদ ওঠে ভেসে—অতঃপর বৃষ্টি-বাষ্পময় আকাশের দিগন্তে সন্ধ্যা নামে। কিন্তু এখানে আনন্দিত চিত্রের বদলে মূল ভাবনার অনুষঙ্গে আসে সন্ধ্যার রঙ, মৃত মানুষের চোখের রঙ। আর সব শেষে চলমান মৃত্যুর একীকরণ—‘যে মরে যেতেছে তার হৃদয়ের সব শেষ শ্বাস/ সকল আকাশ আর পৃথিবীর থেকে পড়ে ঝরে।’ তারপর কবির নিজের জীবনের একাঙ্গীকরণ ঘটাচ্ছেন এই বলে—‘জীবনে চলেছি আমি সে পৃথিবীর আকাশের পথে ধরে ধরে’—এর নিগূঢ়ার্থ এই যে, প্রকৃতির অন-এড়ানোর পথ ধরে বিশ্ববিধানের অনিবার্য নিয়মে কবিরও সেই সজল-রঙিন পৃথিবীর দিকে যাত্রা। স্পষ্টতই কবিতাটি একাঙ্গীকরণ তত্ত্বেও অনেক বেশি সহজ পদ্ধতিতে অনুধাবন সম্ভব। আর এই অনুধাবন পদ্ধতি পাঠক-গবেষক নয় বরং শিল্পসৃষ্টিতে অগ্রসারজনের জন্যও প্রয়োজনীয়।


বলা হয়ে থাকে, জীবনানন্দ দাশের কবিতা চিত্ররূপময় কিংবা তাঁর কবিতা চিত্রল। কিন্তু তাঁর কবিতার মানবপাঠে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, ভাবলোকের অনিবার্য একাঙ্গীকরণ/একীকরণ বা ফিউশন কবির চিত্রোপলব্ধি।


কবিতাটিতে শব্দ-পদের ফিউশন ও বহুমাত্রিক এবং আপাত দূরবর্তী বস্তুজগৎ এক ভাবনার ঐক্যে যে গাঁথা হলো, তার একটা তালিকাও দেয়া যেতে পারে। যেমন—
১. ছেঁড়া ছেঁড়া কালো মেঘ
২. মাঠে মাঠে অধীর বাতাস
৩. ফোঁপায় শিশুর মতো
৪. চাঁদ ওঠে ভেসে
৫. দূরে-কাছে দেখা যায় পৃথিবীর ধানক্ষেত ঘাস
৬. সন্ধ্যার রঙ, সকল আকাশ
৭. হৃদয়ের থেকে সব শেষ শ্বাস
৮. সকল আকাশ আর পৃথিবীর থেকে পড়ে ঝরে।

এই কবিতাটির ক্ষেত্রে মাত্রাবৃত্তের দীর্ঘলয়ের ছন্দ একাঙ্গীকৃত না হলে নিশ্চিতই মৃত্যু সম্পর্কে বিশ্ব ও নৈসর্গিক উপলব্ধির সুর বেজে উঠত না। স্মরণ করা যেতে পারে, মেঘনাদবধ কাব্যের জন্যে ব্ল্যাংক ভার্স-সম্ভূত অমিত্রাক্ষর ছন্দের ফিউশনটা কতটা জরুরি ছিল। কবিতাটির প্রতিপঙ্‌ক্তিতেই একটি নতুনতর ভাবচিত্রের একাঙ্গীকরণ ঘটে এক সুনিশ্চিত উপলব্ধির দিকে কবিকে আহ্বান করে। কবি সেই আহ্বানের পথ ধরেই—পৃথিবী এবং আকাশের পথ ধরে ধরে—অর্থাৎ এই ভুবনের নৈসর্গিক নিয়মে জীবনের অনিবার্য পথপরিণামে চলেছেন। এক গভীর সংহত উপলব্ধি নিবিড় শান্ত রসে গিয়ে সমাহিত হয় কবিতান্তে।

এ প্রসঙ্গে জীবননান্দ দাশের কবিতা সম্পর্কে একটি প্রচলিত ধারণাও খণ্ডন করা যায়। বলা হয়ে থাকে, জীবনানন্দ দাশের কবিতা চিত্ররূপময় কিংবা তাঁর কবিতা চিত্রল। কিন্তু তাঁর কবিতার মানবপাঠে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, ভাবলোকের অনিবার্য একাঙ্গীকরণ/একীকরণ বা ফিউশন কবির চিত্রোপলব্ধি। কাজেই একাঙ্গীকরণ তত্ত্বে তাঁর কবিতার চিত্ররূপময়তা ‘ভাবচিত্রময়’ বা ‘ভাবচিত্ররূপময়’ নামে আখ্যায়িত হওয়া উচিত।

ইতিহাসের একাঙ্গীকরণের ধারায় শঙ্খ ঘোষের ‘বাবরের প্রার্থনা’১০ কবিতাটি উদাহরণ হিসেবে গ্রাহ্য হতে পারে। সম্রাট বাবরের সন্তান হুমায়ুনের আরোগ্য-কামনার সঙ্গে সমকালের ফিউশনে এ কবিতাটি—নিগূঢ়ার্থ-দ্যোতকতা আবেদনের বিচারে—বাঙলা ভাষায় মহত্তম আধুনিক কবিতার একটি। বাবরের শেষ নামাজের বিষয়ে ঐতিহাসিকভাবে জানতে পারি যে, তা পুত্রের আরোগ্য লাভের নিমিত্তে ঈশ্বরের কাছে নিজের আয়ু স্থানান্তরের আবেদন ছিল। এবং পরবর্তী প্রজন্মের সুস্থতার নিমিত্তে পিতৃপুরুষের ভূমিকায় কবি হতাশ ও ক্ষুব্ধ। তাতে আছে আত্মগ্লানি ক্রোধ ও হতাশার এক অভূতপূর্ব প্রার্থনার বিলাবল।

প্রশ্ন আসে যে, প্রাচ্যের ধ্রুপদী শিল্পতত্ত্বের নৈয়ায়িক শৃঙ্খলার মধ্যে একাঙ্গীকরণকৌশল ও তত্ত্বের স্থান কোথায়। এর প্রয়োজনীয়তা কী, লক্ষ্য কী। কাব্যের ক্ষেত্রে প্রাচীন নৈয়ায়িক বিধানের পাশে এই তত্ত্বের প্রয়োজনীতা কোথায়। কিংবা এই একীকরণ/একাঙ্গীকরণ বা ফিউশন তত্ত্ব কি ঐ সকল এবং সমকালের নানা শিল্পতত্ত্বের পরিপূরক বা রিপ্লেসমেন্টারি ডিসিপ্লিন। এর উত্তরে বলা যায়, ধ্রুপদীকালের কাব্যে উপমান-উপমেয়, শব্দালঙ্কার, রূপক, যমক, অনুপ্রাস-ছন্দ—প্রায় সবকিছুই বিধানের দিক থেকে অনুপুঙ্খ এবং সম্পূর্ণত নৈয়ায়িক। কিন্তু শিল্পরচনা-কৌশলের আবিষ্কার বিবেচনায় ঐ সকল নিয়মের পরিপূরকরূপে একাঙ্গীকরণ তত্ত্বের দৃষ্টিভঙ্গি সে সকল স্থলে শিল্পবিচারের অন্তর্গত হতে পারে।

আমরা যদি বলি—প্রজ্ঞার চুল এত দীর্ঘ যে, রাত্রির দাঁড়ায় মেলে দিলে তা অনাগত উষার আভা স্পর্শ করবে।১১ তখন খুব সহজেই আমরা বুঝতে পারি এটা মেয়েটির চুলের ঘনত্ব ও বিস্তারিত সৌন্দর্য—পোয়েটিক একজাজারেশন বা কাব্যিক অতিরঞ্জন দ্বারা গভীরতর সৌন্দর্যের চেষ্টা থেকে দৃশ্যমান করবার প্রয়াস। এটাও একাঙ্গীকরণ—চুলের সঙ্গে রাত্রির একাঙ্গীকরণ। কিংবা আমরা যেমন সহজতম ভাষায় বলি, ওর মুখটি চাঁদের মতো—তবে একাঙ্গীকরণ তত্ত্বে এ হচ্ছে সরলতম ফিউশন। অর্থাৎ মেয়েটির মুখের সৌন্দর্যে চাঁদ একীভূত করা হলো। অনুরূপ প্রচলিত কাব্য-শৃঙ্খলার পুরাতন ধারার প্রায় সবকিছু একাঙ্গীকরণ তত্ত্বের নানামুখী চলন থেকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। ছন্দমাত্রা—মাত্রার নানা অঙ্কের ফিউশন একাঙ্গীকরণ তত্ত্ব দ্বারা ব্যাখ্যাও সম্ভব। কোন ভাবের ফিউশনে কোন ছন্দ—সে তো রাইম অব দ্য এনসিয়েন্ট মেরিনারে লভ্য। রোমান্টিক কালে কোলরিজ বাইবেলীয় ক্ল্যাসিককে মিস্টিসিজমের ধারায় রূপায়িত করেছিলেন।

তথাপি এই প্রবন্ধের লেখক অসঙ্কোচে স্বীকার করে যে, কোনো একটি শৃঙ্খলা বা তত্ত্ব সর্বত্র প্রযুক্ত হয় না। এবং সকল তত্ত্বেরই রয়েছে নিজস্ব গড়নের মধ্যে এর সম্ভাবনা ও সমৃদ্ধির সঙ্গে সীমাবদ্ধতারও চিহ্ন। তবে বাঙালির সহজ শিল্পরীতির সহস্র বর্ষের ধারায় লক্ষ করলে দেখি, দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব নৈয়ায়িক বিধানরূপে নয়—জনমানবের সাধারণ সাংস্কৃতিকবোধ থেকেই উদ্ভূত। একাঙ্গীকরণ তত্ত্বেও এক ধরনের আপাত সরলতা অস্তিমান, তবু বিশদ এবং বিচিত্ররূপে তার গতি প্রাগুক্ত শিল্পরীতির মতো আধুনিক শিল্পরীতিতেই গ্রাহ্য হতে পারে।

নিম্নে বিস্তারিত উদাহরণ এবং ব্যাখ্যা ব্যতিরেকে শিল্পসৃষ্টির মূলে যে একাঙ্গীকরণের কৌশল তার সন্ধান এভাবে কল্পনা করা যায়—
১. বোধ ও ভাবের ফিউশন
২. বিষয় ঘটনা ও কাহিনিগত ফিউশন।
৩. আঙ্গিকের ফিউশন।
৪. ভাষা বাক্য সিমেন্টিকসের ফিউশন।
৫. তত্ত¡ ও দর্শনগত ফিউশন।
৬. রসগত ফিউশন।
৭. জিও-ফিজিক্যাল ফিউশন।
৮. প্রত্ন-পুরাণ ও ইতিহাসের ফিউশন।
৯. আর্থ-সামাজিক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ফিউশন।
১০. উপনিবেশীয় ফিউশন।
১১. জেনারেল ফিউশন।


একাঙ্গীকরণ তত্ত্বটা খুব সহজেই বুঝতে পারা যায়, যেমন—ঘুড়ি—কাগজ, আঠা, বাঁশের কাঠি ও সুতা—এই কটি বিপরীতমুখা উপকরণের সমন্বয়ে সৃষ্ট। কিন্তু ঐ উপকরণে ঘুড়ি যখন তৈরি হলো, অমনি তা আকাশ-উড়াল নন্দনযোগ্য দৃশ্য হয়ে উঠল।


একাঙ্গীকরণ একটি সাধারণ শিল্পকৌশল, কিন্তু সৃষ্টিকর্মের ভেতর তার সাঙ্গীকরণ অনিশ্চিত অভাবিত এবং অব্যাখ্যেয়রূপে ঘটে থাকে। কেন কোন কবি কিভাবে বিপরীত কিংবা অনুকূল বিষয়গুলোকে আপন রচনার মধ্যে সংস্থিত করবেন, তা নির্ভর করে তাঁর নিজস্ব শিল্পদৃষ্টির ওপর।

একাঙ্গীকরণ তত্ত্বটা খুব সহজেই বুঝতে পারা যায়, যেমন—ঘুড়ি—কাগজ, আঠা, বাঁশের কাঠি ও সুতা—এই কটি বিপরীতমুখা উপকরণের সমন্বয়ে সৃষ্ট। কিন্তু ঐ উপকরণে ঘুড়ি যখন তৈরি হলো, অমনি তা আকাশ-উড়াল নন্দনযোগ্য দৃশ্য হয়ে উঠল। সেই ঘুড়ি ফাল্গুনে কি চৈত্রে-বৈশাখে যখন আকাশে ওড়ে, সে রঙে রূপে ভঙ্গিতে কার না দৃষ্টি কাড়ে।
এই সহজ উপমাটি একাঙ্গীকরণ তত্ত্বের জন্য খুব যে যথেষ্ট তা নয়, তবে তা থেকে এ তত্ত্বের একটা চারিত্র-আভাস পাওয়া যেতে পারে।

শিল্প কখনও একাঙ্গী নয়—চিত্রকলা, সঙ্গীত, কাব্য, উপন্যাস, নাট্য ও নির্দেশনা—জটিল ও বহুমাত্রিক উন্মোচন—বিচিত্রপথে এক একটা শিল্পসৃষ্টি তার আনুষঙ্গিক উপকরণাদি আহরণ করে। এই আহরণের বিষয়টা যে মানুষ নানাভাবে আবিষ্কার করেছে—একাঙ্গীকরণ তত্ত্ব সে বিষয়টাকে সহজভাবে খুলে ভেঙে দেখতে চায়। কোনো একটা প্রবন্ধে এর আলোচনা-ব্যাখ্যা পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। শিল্পের নানা শাখায় একাঙ্গীকরণ উপায়ে সাধিত হওয়ার বিষয়টি অনুপুঙ্খ আলোচনার মধ্য দিয়ে এই তত্ত্বের সম্পূর্ণতা অর্জন সম্ভব।

একাঙ্গীকরণের বিভাজিত অনেকগুলো বিষয় একই কবির একই লেখায় একই সঙ্গে বিদ্যমান থাকতে পারে। আবার তা ভিন্ন ভিন্ন রূপে ও মাত্রাভেদে বিভাজিত হতে পারে। একাঙ্গীকরণ—উল্লিখিত বিষয়সমূহ—একইসঙ্গে কোনো একটি শিল্পকর্মে একই সময়ে সমাহৃত হতে পারে। হতে পারে যে শুধু তা নয়, হয়েও থাকে।

কিন্তু এর মধ্যে ঔপনিবেশিককালে সংঘটিত একাঙ্গীকরণ তত্ত্বের বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। বিশেষত বাঙালিদের জন্য—যাদের সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতিতে উপনিবেশের এক শক্তিদর্পী অথচ নতুন প্রভাব তারা স্বেচ্ছাকৃত বা অনন্যোপায় হয়ে একাঙ্গীকৃত করেছে। সেটা গদ্যনির্মাণে বেশ টের পাওয়া যায়। কালের ধারায় সরল নিয়মে বাঙলা পয়ারে অর্ধযতি পূর্ণ যতিকে কাজে লাগিয়ে বাঙলা গদ্য রচনা করা যেত। কিন্তু এর মধ্যে কমা-সেমিকোলন-ড্যাশ-কোলন অপ্রতিরোধ্যভাবে প্রবেশ করে। করবার কারণ—প্রাচীনকালের শূন্যপুরাণ বা কথকতার ধারায় বাঙলা লেখ্যগদ্য তৈরি হয় নি। বরং ইংরেজি গদ্যের অনুবাদকে আদর্শ গদ্যের স্থলে ন্যাস করা হলো এবং দ্রুত এই গদ্য যথাক্রমে রামমোহন, বিদ্যাসাগর আর বঙ্কিমের হাতে বর্ধনশীল ও সৃষ্টিশীলতার উৎকর্ষে পরিণতি লাভ করলে আমরা গদ্যের সেই অর্থনির্ভর দমের কৌশলের পঠনরীতিটাই গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছি।

বাঙলা গদ্যের নির্মিতির ক্ষেত্রে এই একটা ফিউশন—ঋণাত্মক ধনাত্মক যাই বলি না কেন—ঘটে গিয়েছিল। শাসিতের শিল্পরীতি আমাদের ভাষায় যে ঢুকে পড়েছিল তারও স্পষ্ট চিহ্ন আছে—দুইশত বৎসর পেরুবার পর আজও। এই ফিউশনের ঋণাত্মক দিকটা আগ্রাহ্য করেই ভাবলোকে ইংরেজি শিল্পাদর্শের বিপরীতধর্মী সমগ্র পাশ্চাত্যের ফিউশন ঘটালেন বাঙলা ভাষায় পিতৃপুরুষ মধুসূদন। তাঁর সনেটের রীতি শেক্সপিয়ারীর নয়, ইতালীয়। তাঁর প্রহসন ইংরেজি ধারায় রচিত নয়, তা ফরাসি রীতির। তাঁর মহাকাব্য প্রকৃত অর্থেই গ্রিসীয় আদর্শের এবং তাতে নিশ্চিত কৃত্তিবাসীয় কল্পনাশক্তির সঙ্গে আঙ্গিকগতভাবে গ্রিসীয় আদর্শ কাজ করেছিল। রবীন্দ্রনাথে এসে মানব-ভাবলোক এত বিশাল, এতটা মহাজাগতিক হয়ে উঠেছিল যে, ঔপনিবেশিক কালের ঋণাত্মক ফিউশনকে তা নিশ্চিতই ভুলিয়ে তলিয়ে দিয়েছিল।

একাঙ্গীকরণ শিল্পের এক অবশ্যম্ভাবী শক্তি। একটি পঙ্‌ক্তির প্রারম্ভ মানেই আরেকটি পঙ্‌ক্তিকে একাঙ্গীকৃতকরণ। দ্বিতীয় পঙ্‌ক্তি নিশ্চিতভাবে তৃতীয় ও তৎপরবর্তী বাক্যের ফিউশনগুলোকে অভ্রান্ত করে তোলে এবং যে কোনো শিল্পসৃষ্টির ক্ষেত্রেই লেখক প্রতিপঙ্‌ক্তিতে বস্তু ও উপকরণগত বিষয়ের সঙ্গে ভাবের ফিউশন ঘটান এবং এসবই করা হয় মূল লক্ষ্যের দিকে চোখ রেখে। শিল্পে এর কোনো বিকল্প নেই। চিত্রকলা ভাস্কর্যের বিচারও এর বাইরে নয়। বস্তুতপক্ষে একাঙ্গীকরণ/ একীকরণ বা ফিউশন শিল্পের অবয়ব কান্তি-ভাব ও সামগ্রিক সৃষ্টিকৌশলের অনিবার্য নাভিকেন্দ্র।

টীকা ও তথ্যসূত্র :
১. হীরেন্দ্রনাল বিশ্বাস (অনুবাদ), সোমদেব ভট্ট, কথাসরিৎসাগর, পৃ. ১৭৪, অ্যাকাডেমিক পাবলিশার্স, ১৯৮৪।
 ২. কৃত্তিবাস (সম্পাদনা- সুবোধচন্দ্র মজুমদার), রামায়ণ, প্রকাশন- শ্রী অকনচন্দ্র মজুমদার, দেব সাহিত্য কুটীর প্রাইভেট লিঃ, মে ১৯৮৯।
 ৩. রবীন্দ্র রচনাবলী, একবিংশখণ্ড, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়,
 ৪. A.L. ROWSE (GENERAL EDITOR), THE ANNOTATED SHAKESPEARE, THE HAMLET, ORBIS PUBLISHING LONDON-VOLUME-III, Reprinted 1979, page 230.
 ৫. প্রাগুক্ত, Volume-1, Comedies, পৃ. ২৭০।
 ৬. ফেরদৌসীর শাহনামা, বাংলা একাডেমী, ফেব্রুয়ারি ১৯৯১, ১ম খণ্ড।
 ৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫।
 ৮. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর- গীতবিতান, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৬৮, পৃ. ৮৬৬, ৮৬৭।
 ৯. জীবনানন্দ দাশের কবিতাসমগ্র (সম্পাদনা- কে. এম. মোজাম্মেল হক), ক্যাবকো প্রকাশ, জুলাই ১৯৯৯, পৃ. ৭০, [সম্পাদকের নাম লেখকের অপরিজ্ঞাত]।
 ১০. শক্সখ ঘোষ, কবিতা সংগ্রম (১), দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, মাঘ ১৪০৯।
 ১১. বাবরের প্রার্থনা
এই তো জানু পেতে বসেছি, পশ্চিম
  আজ বসন্তের শূন্য হাত—
  ধ্বংস করে দাও আমাকে যদি চাও
  আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।
কোথায় গেল ওর স্বচ্ছ যৌবন
  কোথায় কুরে খায় গোপন ক্ষয়।
  চোখের কোণে এই সমূহ পরাভব
  বিষায় ফুসফুস ধমনী শিরা।
জাগাও শহরের প্রান্তে প্রান্তরে।
  ধূসর শূন্যের আজান গান;
  পাথর করে দাও আমাকে নিশ্চল
  আমার সন্তুতি স্বপ্নে থাক।
না কি এ শরীরের পাপের জীবাণুতে
  কোনোই প্রাণ নেই ভবিষ্যের?
  আমারই বর্বর জয়ের উল্লাসে
  মৃত্যু ডেকে আনি নিজের ঘরে?
না কি এ প্রাসাদের আলোর ঝল্‌সানি
  পুড়িয়ে দেয় সব হৃদয় হাড়
  এবং শরীরের ভিতরে বাসা গড়ে
  লক্ষ্য নির্বোধ পতঙ্গের?
আমারই হাতে এত দিয়েছ সম্ভার
  জীর্ণ করে ওকে কোথায় নেবে?
  ধ্বংস করে দাও আমাকে ঈশ্বর
  আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।
শঙ্খ ঘোষ : কবিতা সংগ্রহ-১ দেশ পাবলিশিং, কলকাতা মাঘ, ১৪০৯ চয়ন।