হোম গদ্য গল্প শায়লার দিকে যাওয়া

শায়লার দিকে যাওয়া

শায়লার দিকে যাওয়া
719
0

সোয়াকোটি লোকের এই ঢাকা শহরে শায়লা নাজনীন কোথায় থাকতে পারে?

আমার দারিদ্র্য বিমোচন প্রজেক্টের ড্যানিশ কনসালটেন্ট শীতের শুরুতে ঢাকায় ল্যান্ড করলে তারে এই প্রশ্নটা ছুঁড়ে মারি, এজন্য না যে তিনি শায়লারে চেনেন, বরং এজন্য যে, গতবার নিজ দেশে ফেরত যাওয়ার আগে তিনি বলতেছিলেন, হাতের তালুর মতো আমাদের এই ঢাকা শহর মেট্রোপলিটন হয় কেমনে? এইবার আমি তারে বিনয় মজুমদার স্টাইলে ধরি।

হাতের তালুর সমান স্পেস ঢাকা শহরকে মেট্রো বানায় না, বানায় সোয়াকোটি পপুলেশন। সোয়াকোটি লোক মানে সোয়াকোটি স্পেস, একেকটা গড়ে দেড়শ গিগা কইরা। এই শহরে তুমি যদি কাউরে হারায়া ফেল, নর্মাল স্ট্যাটিস্টিকসে আবার ওরে দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা সোয়াকোটি ভাগের এক ভাগ। তোমার কোপেনহাগেন-এ সেইটা বড় জোর বিশ লাখ ভাগের এক ভাগ। আবার ধরো, প্রতিদিন এই শহরে তোমার সাথে বড়জোর শ’খানেক লোকের দেখাসাক্ষাৎ হয়। বছরে দেখা হয় চল্লিশ হাজার লোকের সাথে। টেনেটুনে তুমি যদি আর তিরিশ বছর বাঁচো, মোট বার লাখ লোকের দেখা পাবে তুমি। এখন দেখ, একবার যদি তুমি এই শহরে কাউরে হারায়া ফেল, বাকি জীবনভর খোঁজাখুঁজি কইরা তারে পাওয়ার সম্ভাবনা ১৪ শতাংশ মাত্র। নর্মাল স্ট্যাটিস্টিকস।

দেশি মসলার রান্না খাইয়া আমার ড্যানিশ কনসালটেন্ট ঘন ঘন কোপেনহাগেন। দারিদ্র্য বিমোচন পিছায়া যায়, এই অবসরে আমি শায়লারে খোঁজাখুঁজির প্লান করতে থাকি। নর্মাল স্ট্যাটিস্টিকসে যে চেষ্টা সুদূরপরাহত, কস্টার স্যামপ্লিং-এ সেইটা সম্ভাবনার সীমানায় আইসা দাঁড়ায়।


ওরে সবাই বাতিস্তুতা ডাকত, শায়লার প্রেমাকাঙ্ক্ষী ছিল সে। শেষে একদিন পিস্তল ঠেকায়া সন্ধ্যাবেলা আমার কাছ থেকে নিয়া যায় শায়লারে, ছাড়ে পরের দিন।


শায়লা পড়ত ইকনমিক্সে, মাঝারি মানের ছাত্রী ছিল বরাবর। নিম্নমধ্যবিত্ত রক্ষণশীল ব্যাকগ্রাউন্ড, সুতরাং ব্যাংকে বা কলেজে চাকরি করার সম্ভাবনা। ঢাকা শহরে তপসিলি অ-তপসিলি মিলায়া মোট ২৫ খানা ব্যাংক আছে, যাদের হেড অফিস, লোকাল অফিস, কর্পোরেট অফিস, মহিলা শাখা, বিলবুথ মিলায়া প্রায় ২৫০টি শাখাপ্রশাখা। ব্যাংকার্স রিক্রুটমেন্ট কমিটি আর বাংলাদেশ ব্যাংকের সংগৃহীত ডাটা থেকে খুঁজে খুঁজে আমি মোট ১৫ জন শায়লা নাজনীনকে বার করি, জন্মতারিখ বিবেচনায় বাদ দিই ১১ জনকে। বাকি থাকে ৪ জন। হতে পারে এই চারজনের একজনই সেই শায়লা, যারে আমি খুঁজতেছি। হতে পারে, পূবালী ব্যাংকের যে শাখায় আমি একটা একাউন্ট অপারেট করি, সেখানেই শায়লা চাকরি করে। হয়তো ব্যাংকের রিমোট কোনায় কিং সাইজের একটা লেজার বইয়ের উপর হামলে-থাকা হেজাব-পরা মহিলাটিই শায়লা, যার হেজাবের ভেতরে কোনো মুখমণ্ডল আছে কিনা জানার প্রত্যাশা আমার কোনোদিন হয় নাই। আমার ভাবনার দৌড় এবার সত্যি-সত্যি আমায় আতঙ্কিত করে:

‘হ্যালো ম্যাডাম, চিনতে পারছেন?’

‘আরে… তুমি? এখানে?’

‘এখানে তো আমি আসি দু’বছর ধরে।’

‘কিন্তু…একদিনও তোমার সাথে দেখা হয় নি….আশ্চর্য!’

অভিযোগ-উতরানো আভা। আলোচনা, অত্যন্ত সঙ্গত কারণে, অফিসের টেবিল থেকে দ্রুত কোনো রেস্তোরাঁর দিকে গড়ায়।

‘তুমি একদম বদলাও নি।’

কোনো কোনো রেস্তোরাঁর পরিবেশে এরকম বিবৃতিদানের উস্কানি থাকে।

‘তুমি কিন্তু অনেক বদলেছ।’

আমি হেজাব দেখাই। ব্যাংকার শায়লা হাসে।

‘হ্যাঁ…শ্বশুরবাড়ির নিয়ম। সবাই হেজাব পরে। ব্যাকডেটেড।’

‘না না…বরং মোস্ট আপডেটেড। এখন তো পশ্চিমে হেজাব পরার রাইট নিয়ে ব্রাইট ব্রাইট সব মুভমেন্ট হচ্ছে।’

‘তোমার একাউন্ট কি সেভিংস?’

আমার বিত্তবৈভব আন্দাজ করার চেষ্টা শায়লার।

‘না। কারেন্ট। আমি ক্ষণবাদী মানুষ। সেভিংসে বিশ্বাস নেই।’

স্পেস বাইর করার জন্য আমার একটু খ্যামটা। শায়লা তত্ত্বের ফাঁদে পা দেয় না।

‘কারেন্ট একাউন্টে খুব নমিনাল একটা ব্যালান্সের এগেইনস্টে আমাদের কনজিউমার ক্রেডিট লোনটা কিন্তু খুব ভালো। গাড়ি আছে তোমার?’

‘আমার বসের একটা আছে।…আচ্ছা, টেবিলের কাচের নিচে যে ছবিটা ছিল…তোমার ছেলে?’

‘হ্যাঁ, সানিডেলে পড়ে। টু-তে।’

‘পাশেরটা নিশ্চয়ই স্বামীর।’

‘না না…ওটাতো গাব্রিয়েল বাতিস্তুতার ছবি। ঐ যে… আর্জেন্টিনার ফুটবলার।’

মনে পড়ল, শায়লার সাথে হাকিম চত্বরে ঘোরাঘুরির মাত্র তৃতীয় দিনে ক্যাম্পাসের এক লম্বাচুল ক্যাডারের হাতে কী মাইরটাই না খাইছিলাম। ওরে সবাই বাতিস্তুতা ডাকত, শায়লার প্রেমাকাঙ্ক্ষী ছিল সে। শেষে একদিন পিস্তল ঠেকায়া সন্ধ্যাবেলা আমার কাছ থেকে নিয়া যায় শায়লারে, ছাড়ে পরের দিন। শাপে বর হলো এই ঘটনা। বাতিস্তুতার প্রেমাগ্নি নির্বাপিত হলো, অনুতাপ আর অসহায়ত্বে আমরা আরো প্রেমঘন হয়া উঠলাম।

ব্যাংকার শায়লার সাথে বাক্যালাপ আর আগায় না। আমি নানাভাবে কল্পনাকে ঠেলি, কিন্তু ওর চাকা কাদার মধ্যে একেবারে ডাইবা গেছে মনে হয়। অগত্যা একদিন আমার কনসালটেন্টের অফিসে গিয়া ওর গলা জড়ায়া হাউমাউ কর‌্যা কাঁদি। বলি, লক্ষণ খুব খারাপ, ডাটার মধ্যে জিনি ইনডেক্স নাইমা যাইতেছে, পরিসংখ্যানের বই থেকে গরিবি বিদায় নিতেছে, আমার আর চাকরি নাই। কনসালটেন্ট হো হো হাসে। বলে, মন্দ কি, ফি বছর আসা লাগব না, তিন বছর পরপর আইসা একটা ইভালুয়েশন কইরা যামুগা। এই বালের বেইজলাইনে আমার জান কাবার হওয়ার দশা!

এ পর্যায়ে আমি টিচার শায়লারে নিয়া আশায় বুক বাঁধি। কল্পনায় তারে দেখি, হেজাব নয়, ফিনফিনে ফ্রেমের চশমাপরা। একদঙ্গল ছাত্রছাত্রীঘেরা অবস্থায় একটি বিরাট মথের মতো কাশরুম থিকা বাইর হইতেছে। সেইদিনই ডাটার জন্য ব্যানবেইজ যাই। সরকারি-বেসরকারি মিলায়া মোট ৩৬টা কলেজ আছে ঢাকা শহরে। এর মধ্যে মাত্র দুইটিতে অর্থনীতি বিভাগ নাই। বাদবাকি ৩৪টার মধ্যে শায়লা একাধিক থাকলেও অর্থনীতির প্রভাষক শায়লা নাজনীন আছে একজনই। পড়ায় তিতুমীর কলেজে।

অতএব ফিল্ড ইনভেস্টিগেশন। দুরুদুরু বক্ষে তিতুমীর কলেজে গিয়া দেখলাম বিশ্ব পরিষ্কার দুই শিবিরে বিভক্ত। এক শিবিরে ছাত্র, অন্য শিবিরে শিক্ষক। যেখানে ছাত্র আছে, সেইখানে শিক্ষক নাই। আবার যেখানে শিক্ষক আছে সেইখানে ছাত্র নাই। দুই দলই মহাখুশি। অর্থনীতি বিভাগের ম্যাডাম শায়লা নাজনীন ছুটিতে আছেন। চারমাসের প্রসূতি ছুটি।

আহাহা! এখন কি নিশ্চিন্ত মনে প্রকাশ্য সংবাদ হয়া গর্ভধারণ করলা প্রিয়তমা! মনে আছে, সেই যে ঝামেলা বাধায়া ফেললাম? তারপর তোমার কত হাতে ধরা পায়ে ধরা! রোজ সকালে এগারটা ম্যাটার্নিটি ক্লিনিকের ঠিকানা নিয়া ধর্না দিতাম তোমার হলে। ডেসপ্যারেট বেলী-রাজু জুটির কাহিনি শুনাইতাম, আলাপ করায়া দিতাম তিন্নী-পিয়ারদের সাথে। তোমার ভয়ে-নীল মুখের সামনে ওরা ওদের অ্যাবরশনের ডালভাতমার্কা কাহিনিগুলি বলত সমানে।


আমি শিউর ঐ ব্যাটার পোস্টিং সচিবালয়ে। নন-ক্যারিয়ারিস্ট মুডে সকালসন্ধ্যা সংসারসেবা করে। গর্ভবতী স্ত্রীর শয্যাপাশে একটি করুণ কমলালেবু। অসহ্য!


কাজ পিছায়া যাইতেছে, কনসালটেন্টের এই অভিযোগ নিয়া একদিন তার সাথে তুমুল বাহাসে নামি। তারে বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস থেকে হিড়হিড় কইরা বার কইরা আনি, আর বলি, ঐসব জিনি ইনডেক্স আমি বিশ্বাস করি না। এইসব ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের টাকাখাওয়া আমাদের মাথামোটা ইকনমিস্টদের বুজরুকি। পভার্টি-গ্যাপ বাড়তেছে, আমি হলফ কইরা কইতে পারি। আলট্রা-পুউর দের নিয়া কোনো বেইজলাইন নাই। সরকার, ওয়ার্ল্ডব্যাংক বা এডিবি কেউ করে নাই। ওরা মডারেট গরিবদের পরিস্থিতিরেই পভার্টি বইলা চালায়। সত্যিকারের পভার্টি লাইন অনেক নিচে ডাইবা গেছে, স্ট্যাটিস্টিকসে এইগুলা নাই, সব এইচআইভি/এইডস-এর ফান্ড বাড়ানোর ধান্দা। ভাতের বদলে কনডম গিলাইতে চায় শালারা।

‘ওয়্যার য়্যু এভার ইন দ্য লেফট পলিটিকস?’

আমার কনসালটেন্টের মুখে সস্নেহ সংশয়।

‘আই ওয়াজ নট, স্যার!’

আমি মিলিটারি স্টাইলে চিল্লাই।

‘বাট আই ওয়াজ, মাই সান। আই ড্রিমট অব অ্যা সোশ্যালিস্ট ডেনমার্ক থ্রু-আউট মাই ইয়ুথ।’

খেদায় ঢুকাইতে চায়। বহুৎ পুরান ট্রিক।

‘দ্যাট এনাবলস ইউ টু কোপ উইদ ব্লাডি ওয়েলফেয়ার ক্যাপিটালিজম। গুড হোমওয়ার্ক।’

মনে মনে বলি। আর মুখে বলি, ঐটা তোমার সমস্যা। বামপন্থার ভুত আমার ঘাড়ে নাই। ফলে কনসালটেন্ট তার পন্থাবদলের ইতিহাসবয়ান থিকা আমারে নিষ্কৃতি দেন।

টিচার শায়লার ব্যাপারে আমি বীতশ্রদ্ধ হয়া পড়ি। ওর গর্ভাবস্থার ডাটা আমার হাইপোথিসিসরে নাল বানায়া দিয়া ওর সুখীসমৃদ্ধ দাম্পত্যজীবনটাকে ফোরকাস্ট করতে থাকে। ব্যাংকার শায়লাও আমার মনে এতখানি আতঙ্ক পয়দা করতে পারে নাই। আগে মনে হইত, ওর সরকারি চাকরিজীবী স্বামী রিমোট পোস্টিং লয়া কোনো থানাসদরে হাবুডুবু খাইতেছে। এখন আমি শিউর ঐ ব্যাটার পোস্টিং সচিবালয়ে। নন-ক্যারিয়ারিস্ট মুডে সকালসন্ধ্যা সংসারসেবা করে। গর্ভবতী স্ত্রীর শয্যাপাশে একটি করুণ কমলালেবু। অসহ্য!

অনেকদিন আগের কথা মনে পড়ে, শায়লার যেবার অসুখ করল, দীর্ঘদিন বাড়িতে, বাড়ি থিকা আমার হলের ঠিকানায় চিঠি আসল ওর। করুণ আহ্বানভরা একটা চিঠি। আমারে সম্বোধন করা, চিঠির শেষে ওরই নাম, কিন্তু হাতের লেখা ওর ছিল না। পরে জেনেছিলাম, ঐ চিঠি লিখে দিছিল ওর মা। কাঁপা কাঁপা হস্তাক্ষরে একটি নিখুঁত পারিবারিক ষড়যন্ত্র। আমি দেখতে যাই নাই।

আমি তখন সাবরিনার নানারকম উচ্চাভিলাষের অংশ হয়া গেছি। সকালসন্ধ্যা ডাটা টেম্পার করি, প্রাইমারি ডাটা নষ্ট করি, শায়লার সাথে আমার অ্যাফেয়ারটাকে আমার তরফে চ্যারিটি বইলা চালাই। স্ট্যাটিস্টিকস আমায় উৎসাহ দেয়, স্ট্যান্ডার্ড এরর আওতার মধ্যেই থাকে। সাবরিনা আমার মহত্বে মুগ্ধ হয়, সাবরিনার মহত্বে আমিও পাল্টা মুগ্ধ হই, শেষে নিজের মহত্বে নিজেই মুগ্ধ হইতে শুরু করি। এতসব মুগ্ধতার মাঝে আলট্রা-পুউরের মতো মিলায়া যায় শায়লা নাজনীন। মাস্টার্স ফাইনাল দিতে আইসা জলজ্যান্ত দুইমাস হলে থাকলেও আমার সাথে দেখা হয় না তার।

আমার ড্যানিশ কনসালটেন্ট নানারকম মেইল কৈরা আমারে ডাক পাড়েন। বলেন, সেকেন্ডারি ডাটার নিচে তিনি নাকি আটার বস্তার মতো চিৎপটাং হয়া আছেন। এখন নাকি গরিবদের অ্যাসেট-এনালিসিস করতে চান। আমি উত্তর দিই, ফালায়া থোও ঐসব ডাটার বস্তা, ঐখানে যারা আছে তারা মডারেট, পাতিবুর্জোয়ার চাইতেও ভয়ানক। ওরা জানে তোমার কী কী ডাটা লাগবে, তোমার প্রয়োজনে ওরা ল্যান্ডলেস হয়, ক্রেডিটের টাকা তুইলা মৌজ মারে। হার্ডকোর গরিব হয়া ওরা এনজিও অফিসে যায়, আবার ইভালুয়েশন রিপোর্টের সময় ঠিকঠিক প্রয়োজন-মতো ওয়েল-অফ হয়া যায়। এতে তোমার আত্মতুষ্টি হয়, তোমার আত্মতুষ্টি আর কিসে কিসে হয় ওরা জানে। ওরা তোমার জিনি-ইনডেক্স দিয়া মোয়া বানায়া খায়, অ্যাসেট এনালিসিস-এর কাগজ দিয়া বাচ্চার হাগা মোছে।

তুমি শীতকালে বেড়ায়া যাও, এসি-লাগানো পালকিতে উইঠা মানিকগঞ্জের দুইটা গ্রাম ঘুইরা ঘুইরা দ্যাখো আর ফটাফট ছবি তোল। সন্ধ্যা হইতে-না-হইতেই তোমার গুলশানের রেস্টহাউসে হান্দায়া যাও। তুমি গ্রামে যাওয়ার তিনদিন আগে থেকে সেখানে রিহার্সাল চলে। আর সেই নাটকে ঢুইকা তুমিও ঘনঘন ঘড়ি দ্যাখো, ওদের কাজ আরো সহজ কইরা দাও। তুমি পভার্টি মাপ তোমার প্রজেক্টে, এর বাইরে তোমার যাওয়ার উপায় নাই। আর তোমার লোকাল রিসিভার এনজিওরা মাত্র দুইদশকে এই দেশে এমন এক তুখোড় রেসপন্ডেন্ট জেনারেশন বানাইছে, যারা তোমার অফস্পিন, লেগস্পিন, গুগলি সব বুঝে। রাতের অন্ধকারে বুঝে। তাদের দুধের বাচ্চারাও বুঝে। কিন্তু তুমি দ্যাখো নাই বর্ষায় অষ্টগ্রাম কেমন থৈ থৈ করে, ক্ষুধার মহামারি কী জিনিস, মঙ্গার অজগর কিভাবে চুপচাপ একসাথে দুইতিনটা গ্রাম গিল্যা ফালায়। তুমি কোনোদিন জানবা না আলট্রা-পুউর নিজের ঘরের মধ্যেই কেমনে দিনের পর দিন ইনভিজিবল হয়া থাকে।

কথা শেষ করে আমি হাঁপাই।

ডিভোর্সের প্রথম বছরে পুরুষেরা এরকম একটুআধটু র‌্যাডিক্যাল হৈয়া যায়, আমার কনসালটেন্ট আমারে এইভাবে মাপেন। ফলে আমার চাকরি বহাল থাকে। উপরন্তু কয়েকদিনের ছুটি জোটে।

আচ্ছা, এমনও তো হৈতে পারে যে, শায়লা শেষমেষ নারীবাদী হয়া গেছে! কদমছাঁট চুলের শায়লা নাজনীন অ্যাকশন-এইডের টাকায় ডমিস্টিক ভায়োলেন্সের উপর ডকুমেন্টারি বানাইতেছে! লিভ টুগেদার করতেছে শ্মশ্রুমণ্ডিত ও নারীবাদী কোনো যুবকের সাথে। রগরগে যৌনতা ছাড়াই। অতৃপ্ত আদর্শবাদী জীবন। উত্তেজনায় আমি শোয়া থেকে উইঠা বসি।


শায়লা জানে, প্যাট্রিয়ার্কি ছাড়া যৌনতায় ইনটেনসিটি আসে না। ওর রক্তে সেই বীজ ঘুমন্ত আছে। প্রয়োজন তারে জাগায়া দেয়া।


এনজিও ব্যুরো’র ডাটা রিলায়েবল লাগে না। ওরাই পইপই করে বৈলা দিছে, রেজিস্ট্রেশন দেখবেন এক নামে, সাইনবোর্ড দেখবেন আরেকটা। কেবলা ঘুইরা গেলে ওদেরও যে ঘুরতে হয়। কর্তার ইচ্ছায় কর্ম! তিনজন শায়লাকে পাওয়া যায় যারা নারীবাদী উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করে। ঠিক করি, র‌্যানডম নয়, যেখানেই নারী অধিকারের গন্ধ পাব, সেইখানেই শায়লা নাজনীনের কথা জিগায়া দেখব। খুঁজব সর্বত্র। পুরুষতান্ত্রিকতাসহ। শায়লা জানে, প্যাট্রিয়ার্কি ছাড়া যৌনতায় ইনটেনসিটি আসে না। ওর রক্তে সেই বীজ ঘুমন্ত আছে। প্রয়োজন তারে জাগায়া দেয়া।

একদিন আমার কনসালটেন্ট বাড়িতে আইসা হাজির। চোখেমুখে বামপন্থি অনুতাপ। ছাইচাপা। আলট্রা-পুউর বিষয়ে প্রাইমারি ডাটার সন্ধানে নামতেছেন। আমি তারে অনেক বুঝাই। বলি, দ্যাখো, দেখানোর দা আর কোপানোর দা এক না। আলট্রা-পুউর নিয়া কথা কইবা, ফান্ড চালু থাকব। আলট্রা-পুউর খুঁজতে গেলে তুমিই আলট্রা-পুউর হয়া যাবা। এই কথায় আমার কনসালটেন্টের মনে আরো বিপ্লবী জোশ আসে। আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয় আমার, রবার্ট চ্যাম্বার্স-এর আদলে চে’ গুয়েভারার ভুত দেখি আমি।

আলট্রা-পুউর নয়, নতুন চাকরি খুঁজি আমি। সাথে সাথে নারীবাদী অফিস। খোঁজ পাই, আমার ড্যানিশ কনসালটেন্ট মধুপুরের জঙ্গলে গিয়া খুঁটি গাড়ছেন। পায়ে পা বাধায়া ঝগড়া লাগাইছেন কারিতাসের সাথে। চার্চের একটি রেস্ট হাউসে থাকেন তিনি, রোজ রাতে তার টিনের ঘরের চালে আইসা হনুমান শাসায়া যায়। তিনি ফিল্ডে নামলেই চার্চের ফাদাররা নাকি আলট্রা-পুউরদের গহিন জঙ্গলের দিকে ভাগায়া দেয়। সেই অবসরে তিনি গোটা বর্ষাকাল ধরে হেন্ডারসন দ্য রেইনকিং-স্টাইলে একটা উপন্যাসও নাকি লিখতেছেন।

আর আমি অলিতে গলিতে চাকরি ও নারীবাদ খুঁজি। সোয়াকোটি স্পেসের বিশাল এই মেট্রোপলিটনে। এভাবে প্রতিদিন শায়লার দিকে একটু একটু করে আগাই। একেকটা এলাকায় খোঁজাখুঁজি শেষ কৈরা ফিরা যাবার পথে দেখি, আরো গোটাদুই নারীবাদী অফিস গজায়া গেছে। তাতে স্বস্তি হয়। মেটাফিজিক্স হয়। একই ক্যাটাগরিতে অনন্তকাল খোঁজাখুঁজি চালায়া যাওয়ার সম্ভাবনা বলবৎ থাকে।

 

টীকা (না পড়লেও ক্ষতিবৃদ্ধি নাই) :
অ্যাসেট এনালিসিস : যাদের অ্যাসেট নাই, তাদের অ্যাসেট মাপার একখান পশ্চিমা ফরম্যাট।
আলট্রা পুউর : দারিদ্র্যসীমার তলানিতে যাদের থাকার কথা, কিন্তু হায়, তারা সেখানেও নাই!
প্রাইমারি ডাটা : ফিল্ড থেকে সরাসরি সংগৃহীত ডাটা। ফিল্ড-রিসার্চার নামক একদল বোবা এবং কলুর বলদ এই কাজ করে থাকে।
সেকেন্ডারি ডাটা : উন্নয়ন-গবেষকদের স্বপ্নের ধন। অন্যের রক্তেঘামের এই জোগাড় তাদেরকে ঢাকা বা ন্যুইয়র্কে (কখনও প্লেনের মধ্যে ল্যাপটপে) বৈসা গিগা গিগা ম্যাটার বানাইবার উৎসাহ দেয়।
পভার্টি লাইন : দারিদ্র্যের লক্ষণরেখা। এই রেখার নিচে যাদের আয়-ব্যয় তারাই গরিব, পশ্চিমা গবেষকেরা এইভাবে তৃতীয় বিশ্বে জুতো আবিষ্কার করেন। এ প্রসঙ্গে তারাপদ রায়ের বিখ্যাত কবিতাটি স্মর্তব্য।
ব্যানবেইজ : বাংলাদেশের একটি সরকারি সংস্থা যেখানে শিক্ষাবিষয়ক তথ্যাদি সংরক্ষণ (ও গবেষণা?) করার কথা। কেউ কথা রাখে না।
জিনি ইনডেক্স : একটা দেশে ধনী-গরিবের ব্যবধান মাপার একটা ব্যবস্থা। নামটি গিনিপিগের কথা মনে করায়া দেয় বইলা এরে গিনি না বইলা আদর কইরা ‘জিনি’ ডাকা হয়।
রবার্ট চ্যাম্বার্স : সাসেক্সের শিক্ষক। গ্রামীণ দারিদ্র্য এবং উন্নয়নের রীতিকৌশল নিয়া অনেক চ্যাটাং চ্যাটাং আলাপসালাপ করেন, কিন্তু তার চাকরি ও প্রমোশন অব্যাহত থাকে।
স্ট্যান্ডার্ড এরর : যতটুকু ভুল করলে বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ খাপ্পা হয় না।
প্যাট্রিয়ার্কি : একটি (অ)মানবিক, (অ)মানসিক এবং দৈশিক অবস্থা, যা নারীপুরুষ নির্বিশেষে কিছু কিছু মানুষের চেতনায় ও রাজনীতির মধ্যে বিদ্যমান। কিন্তু নারীবাদ এরে পুরুষের একচ্ছত্র সম্পত্তি বইলা হাহুতাশ করে।
সুমন রহমান

সুমন রহমান

সহযোগী অধ্যাপক at University of Liberal Arts Bangladesh
জন্ম ৩০ মার্চ ১৯৭০, ভৈরব। দর্শনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পিএইচডি সাংস্কৃতিক অধ্যয়ন-এ।

প্রকাশিত বই :
ঝিঁঝিট (কাব্যগ্রন্থ), ১৯৯৪, নিউম্যান বুকস
সিরামিকের নিজস্ব ঝগড়া (কাব্যগ্রন্থ), ২০০৮, পাঠসূত্র
গরিবি অমরতা (গল্পগ্রন্থ), ২০০৮, মাওলা ব্রাদার্স
কানার হাটবাজার (প্রবন্ধ), ২০১১, দুয়েন্দে

ই-মেইল : sumon.rahman@ulab.edu.bd
সুমন রহমান

Latest posts by সুমন রহমান (see all)