ভাষা চরাচর

ভাষা চরাচর
658
0

সেই কবে উপনিবেশের যুগে আমেরিকা মহাদেশে ছড়িয়ে গিয়েছিল এস্পানিওল, আজ সেই ঘটনার ৫২০ বছর পরে আমেরিকা মহাদেশের প্রধানতম ভাষা এস্পানিওল

সকাল থেকে তলিয়ে ভাবছি। আমাদের জাতিগত প্রবণতা আচরণ। আমাদের মানে বাঙালিদের। আমার চোখের সামনের পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির কথা বেশি করে সামনে আসছে কারণ আমি নিজে তাই। গত কুড়ি বছরে কলকাতা শহরবাসীর মধ্যে ধাপে ধাপে কমছে আর্থিক বৈষম্য (গোটা দেশের মত), বাড়ছে খরচ করতে পারা মানুষের সংখ্যা এবং তারই সঙ্গে বেড়েছে গ্রাম থেকে শহরে খুব কম মাইনেতে কাজ করা মানুষের সংখ্যা। এ তো বাহ্যিক, ভিতরে দেখছি কমছে বাংলা জানা তরুণের সংখ্যা। যে শ্রেণির খরিদক্ষমতা বেশি তারা খুব কম বাংলা লেখে বা পড়ে। প্রবাসে দেখি দ্বিতীয় প্রজন্মে কেউই বাংলা জানেন না। আর মন খারাপ দাঁড়িয়ে ওঠে যখন এই অবস্থা আমি আমার আরেক ভাষা এস্পানিওল বা স্প্যানিশের সঙ্গে তুলনা করি। ইওরোপে ইংরেজিভাষীরা জানেন তাঁদের দেশের বাইরে উত্তর ইওরোপের মানুষরা ইংরেজি জানেন বা বোঝেন তাঁদের ভাষার সঙ্গে মিলের কারণে কিন্তু দক্ষিণ ইওরোপে ইংরেজি জানা লোক খুঁজে পাওয়া কঠিন। ভাল ইংরেজি তো আরও বিরল। এস্পানিয়া বা স্পেন দক্ষিণ ইওরোপেরই দেশ। সেখানে তাদের নিজেদের ভাষা নিয়ে কাজের অন্ত নেই। সেই কবে উপনিবেশের যুগে আমেরিকা মহাদেশে ছড়িয়ে গিয়েছিল এস্পানিওল, আজ সেই ঘটনার ৫২০ বছর পরে আমেরিকা মহাদেশের প্রধানতম ভাষা এস্পানিওল। এমনকি পর্তুগিজভাষী ব্রাজিলের মানুষও অনেকটা বুঝতে পারেন এই ভাষা। সবচেয়ে আকর্ষক হল দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের মার্কিন অভিবাসী ইস্পানোরা কিন্তু মাতৃভাষা ভোলেন নি। বরং তৈরি হয়েছে মার্কিন দেশের এস্পানিওল ভাষার আকাদেমি। যারা এভাষার দুনিয়াব্যাপী নিয়ন্ত্রাদের মধ্যে গণ্য এক সংস্থা এখন। মার্কিন দেশে এই মুহূর্তে ২২% মানুষ ইস্পানোভাষী। সে দেশে এস্পানিওল ভাষা জ্যান্ত। এটা বাঙালি এপার ওপার কোনও পারের অভিবাসীদের ক্ষেত্রেই হয় নি। প্রথম অভিবাসী যিনি তিনিই। তারপর শুধুই কথ্য হিসেবে বেঁচে থাকে বাংলা।

সাহেবরা বলেন আধুনিক ভাষা লুপ্ত হয় না। অথচ দেখা যাচ্ছে উত্তর ঔপনিবেশিক পর্বে ভারতের মত জটিল দেশে সমস্ত দেশজ ভাষাই বিপদে

তবে অভিবাসীদের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম, শুধু নিজেদের ভূখণ্ডে তাকালে বাংলা ভাষার সম্পর্কে শুধু কলকাতা শহরের দুরবস্থা ছাড়াও বেশ কিছু জিনিস ভাবার আছে বলে মনে হয়। পশ্চিমবাংলায় বাংলাভাষার মনন চর্চা আজও ভীষণভাবে কলকাতা-কেন্দ্রিক। তাতে হয়ত ক্ষতি হত না সেই অর্থে যদি জেলা ও শহর—এই মোটা দাগের বিভাজনটা না থাকত। এই বিভাজন আমাদের সমস্ত রকমে বিচ্ছিন্ন করেছে আমাদের বাস্তবতা থেকে। এমনকি ভাষা থেকেও। বাংলাভাষার দুটি প্রামাণ্য অভিধান (হরিচরণ ও জ্ঞানেন্দ্র মোহন) সঙ্গত কারণেই সম্পূর্ণ নয়। কিন্তু তার পরে আর কেউ এগিয়ে এলেন না একটি অভিধান হাতে যেখানে আমাদের গ্রামীণ ও জেলার নিজস্ব শব্দগুলি সংগৃহীত হবে। অথচ আগের দুটি অভিধানে কাজ অনেকটাই এগিয়ে রাখা ছিল। মনে হয় এখানে আমাদের সেই ঔপনিবেশিক মানসিকতাই কাজ করে যায়। কলকাতায় বলা হয় না অতএব সেই শব্দটির কোনও গুরুত্ব নেই! একটা সহজ উদাহরণ দিই। জোউরো। আমি ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি দক্ষিণ ২৪ পরগণায় হুলুস্থুল বা হুলুস্থুলু অর্থে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়। আমি আজও পর্যন্ত কোনও বাংলা অভিধানে শব্দটি দেখি নি। এরপর আসে মুসলমানি ও খেরেস্তানি (এই শব্দটিও অভিধানভুক্ত নয়, কারণ এটিকে বাড়ির কাজের লোকেরা বলে, বাকিদের তো খ্রিস্টানি আছেই) শব্দভাণ্ডার। বাঙালিজাতির ৬৫% মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও হিন্দু বাঙালি সে শব্দভাণ্ডার সম্পর্কে অবহিত নয়। যদিও মুসলমান বাঙালি (শুধু দক্ষিণ ২৪ পরগনার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি) হিন্দু বাঙালির প্রাত্যহিক ব্যবহৃত শব্দ সম্পর্কে অবহিত। একটা খেরেস্তানি শব্দ এখনি মাথায় আসছে যা অভিধানে নেই, টাপা, দক্ষিণ ২৪ পরগণায় পুরনো খেরেস্তানদের মধ্যে এটি প্রচলিত, এর অর্থ ঢাকনা। বহু বছর পরে এখন বুঝি এটি পর্তুগিজ তাপা থেকে এসেছে।

সাহেবরা বলেন আধুনিক ভাষা লুপ্ত হয় না। অথচ দেখা যাচ্ছে উত্তর ঔপনিবেশিক পর্বে ভারতের মত জটিল দেশে সমস্ত দেশজ ভাষাই বিপদে। গত কুড়ি বছরে ইংরিজি ইশকুলের চল বেড়েছে। গরিব ছাড়া কেউ আর দেশজ ভাষা মাধ্যমে পড়ে না। পশ্চিমবঙ্গে হিন্দিকে একটা জোরালো শত্রু বলে মনে করা হলেও সে ভাষার অবস্থাও এক। আমার বসবাসের দিল্লি শহরে শুধু নিম্নবর্গের মানুষ ছাড়া কেউ হিন্দি বলে না। মধ্যবিত্ত হিন্দি লিখতে পড়তে পারে না। হিন্দি মাধ্যম ইশকুলে শুধু নিম্ন আয়ের পরিবারের ছেলেমেয়েরা যায়। ইংরেজি না বলতে পারাটা একটা হীনম্মন্যতার কারণ। যে সব শিশু এখন মাতৃভাষা শিখছে না বা শিখলেও ভাল করে শিখছে না তারা যখন বড় হবে অর্থাৎ ২০ বছর পরে দেশীয় ভাষার কী হবে ভাবলে শিহরণ হয়। এইসবের মধ্যে এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম হল মালয়ালাম, তামিল, কন্নড়, তেলুগু চাপে পড়ে থাকা সাঁওতালি (প্রাচীনতম এক ভাষা হলেও বাংলার ঔপনিবেশিক চাপে এখন তাদের আত্মপরিচয় লেখার সময়)। যেখানে দিল্লি শহরে বাংলা বইয়ের ৩টি মেলা হয় এবং সে মেলার ক্রেতা শুধু বৃদ্ধ ও প্রথম প্রজন্মের অভিবাসী সেখানে মালয়ালাম বইমেলায় দেখি ইশকুল ফেরত কৈশোর কিনে নিচ্ছে মাতৃভাষার সাহিত্য। দিল্লির প্রাণকেন্দ্রে বিক্রি হচ্ছে তামিল ও মালয়ালাম দৈনিক। সেখানে বাংলা কাগজ বিকেলবেলা বা পরের দিন পাওয়া যায়।

আমাদের বহুখণ্ডিত অস্তিত্বে কি একটি অখণ্ড অভিধানও আশা করা যায় না—যাতে একটি অভিন্ন বানানবিধিও থাকা দরকার

অথচ বাংলার এমনটা হয়ত হওয়ার কথা ছিল না। বাংলাদেশের বাংলাভিত্তিক আত্মপরিচয়ের দিকটা দূর থেকেও আন্দাজ করা যায়। কিন্তু ভারতে? সংখ্যায় ভারতের দ্বিতীয় ভাষাকে দুর্বল লাগছে কেন? যেখানে সংখ্যায় অনেক কম মালয়ালাম তেজি হয়ে উঠছে?

একটা ভাষা লুপ্ত হবার প্রথম লক্ষণ শব্দ বর্জন (এটা অবশ্য বিলিতি বিশ্ববিদ্যলয়ের পণ্ডিতরা বলেন)। আর তার সঙ্গে যদি জুড়ে যায় জাতপাত তাহলে তো কথাই নেই! যেমন ধরা যাক কলকাতা শহরে যৌনতার পরিভাষা ইংরেজি। কোনও যৌন শব্দ আমাদের বাংলায় বলা হয় না। অথচ যাঁদের ইংরেজি নেই তাঁদের পরিভাষার দিকে আমরা তাকাই না। তাঁদের বহু শব্দ আমাদের অভিধানের বাইরে থেকে যায়। আমাদের ভাষার দণ্ডমুণ্ডেরা হয়ত ভাবেন নি এভাবে যে বাংলাটা কলকাতার বাইরে বলা হয়! যে কাজ জ্ঞানেন্দ্র মোহন ও হরিচরণ মিনারপ্রতিম উচ্চতায় তুলেছিলেন সে কাজ তার পরে এগুলো না। বাকি থেকে গেল পশ্চিমবঙ্গের জেলার অজস্র শব্দ, ত্রিপুরা, আসামের শব্দ। বাংলাদেশ তার মত করে এগিয়েছে। কিন্তু মনে হয় সেখানেও আমাদের এদিকের বহু শব্দ বাদ পড়ে আছে।

এখানেই আবার মনে হয় এস্পানিওল ভাষার কথা। ভাষাটি দুনিয়ার ২২টি দেশে চর্চা করা হয়। তার মধ্যে ২১টিতে মাতৃভাষা আর ২২তম দেশে (ফিলিপিন্স) তা দ্বিতীয় ভাষা। ১৭১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত রেয়াল আকাদেমিয়া এসপানিওলা (Real Academia Española) এস্পানিওল ভাষার প্রথম নিয়ামক সংস্থা। সে উপনিবেশের কাল। এরপর তৈরি হয়েছে এস্পানিওলভাষী দেশগুলির মানচিত্র। তৈরি হয়েছে তাদের ভাষা নিয়ামক সংস্থা। এতগুলি দেশ, তাদের সামাজিক ও ভৌগোলিক অবস্থান আলাদা হওয়ার ফলে ভাষার ব্যবহার ও শব্দভাণ্ডার আলাদা হয়ে গেছে। আদি দেশ এস্পানিয়ার বহু শব্দই বাতিল হয়েছে আমেরিকা মহাদেশে, আবার থেকেও গেছে বহু পুরনো শব্দ যা আজকের এস্পানিয়ায় ব্যবহৃত হয় না। সাধারণ মানুষের স্তরে এস্পানিয়ায় আজও একধরণের ইউরোকেন্দ্রীক উন্নাসিকতা থাকলেও ভাষা নিয়ন্ত্রা ২২টি আকাদেমির তা নেই। তাঁরা সকলে মিলে একটি অখিল ইস্পানোভাষী অভিধান তৈরি করেছেন। তাতে যেমন সাদা এস্পানিয়া আছে তেমনি আছে কালো কুবাও (CUBA)। তাতে যেমন এস্পানিয়ার এউস্কেরা থেকে প্রভাবিত শব্দও আছে তেমনই আছে আমেরিকার কেচুয়া গুয়ারানি থেকে আসা শব্দও। প্রতিটি শব্দের পাশে লেখা আছে তার ব্যুৎপত্তি। ২০০১ সাল থেকে সে অভিধান ছাপা হচ্ছে নিয়মিত এবং তার এক বিনামূল্যের অন্তর্জাল সংস্করণও আছে (www.rae.es)।

মনে হয় বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে এমনটা করা খুব কঠিন হবে না। আমাদের বহুখণ্ডিত অস্তিত্বে কি একটি অখণ্ড অভিধানও আশা করা যায় না—যাতে একটি অভিন্ন বানানবিধিও থাকা দরকার। হয়ত বানান নিয়ে অনেকে একমত হবেন না, কিন্তু এক সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে তাকে তৈরি করাই যায়। তাতে সময় লাগবে, কিন্তু দুদেশেই তো ভাষা আকাদেমি রয়েছে। তাঁরা একসঙ্গে কাজ করতে পারেন না? বা বড় কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ?

তবে তাতে শুধু কলকাতা ও ঢাকার পণ্ডিতরা থাকলে হবে না। থাকতে হবে জেলার শব্দভাণ্ডারের সঙ্গে পরিচিত পণ্ডিতদেরও। এবং অবশ্যই থাকতে হবে আসাম ও ত্রিপুরার পণ্ডিতদের। নির্দিষ্ট সময় অন্তর কমিটি বদলে নতুন পণ্ডিতদের জায়গা করে দিলে মনে হয় কাজের গতি ও পরিধি দুটোই বাড়বে।⌈⌋

কালীকৃষ্ণ গুহ সম্পাদিত ‘আরেক রকম’ পত্রিকা থেকে

 

কবি

প্রকাশিত কবিতার বই ৪টি। বৌদ্ধলেখমালা ও অন্যান্য শ্রমণ কাব্যগ্রন্থের জন্য ভারতের জাতীয় সাহিত্য আকাদেমির যুব পুরস্কার পেয়েছেন, পেয়েছেন স্পেনের আন্তোনিও মাচাদো কবিতাবৃত্তি। স্পেনে দুটি কবিতার বই প্রকাশ পেয়েছে। পেশায় স্পেন সরকারের ভাষাশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইন্সতিতুতো সেরবান্তেস-এ স্পেনীয় ভাষার সহকারী অধ্যাপক।

subhro

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

জন্ম ১৫ অগাস্ট ১৯৭৮; কলকাতা। জীববিদ্যায় স্নাতক, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। স্পেনীয় ভাষায় দিপ্লোমা সুপেরিওর, ইন্সতিতুতো সেরবান্তেস।

পেশা : স্পেনীয় ভাষা শিক্ষক, ইন্সতিতুতো সেরবান্তেস নয়াদিল্লি।

প্রকাশিত বই :
জাদু পাহাড়ের গান [ভাষাবন্ধন, ২০০৫]
চিতাবাঘ শহর [কৌরব, ২০০৯]
Ciudad leopard [Olifante, 2010]
বৌদ্ধলেখমালা ও অন্যান্য শ্রমণ [কৌরব, ২০১২]
Poemas metálicos [Amargord, 2013]
কাচের সর্বনাম [কৌরব, ২০১৪]
ঋতু দ্বিপ্রহর [পদ্যচর্চা, ২০১৭]

ই-মেইল : subhropoesia@gmail.com
subhro

Latest posts by শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (see all)