হোম গদ্য বাতাসের বাইনোকুলার : অ্যাবসার্ডিটির জগৎ

বাতাসের বাইনোকুলার : অ্যাবসার্ডিটির জগৎ

বাতাসের বাইনোকুলার : অ্যাবসার্ডিটির জগৎ
670
0

মাজুল হাসানের কবিতা গতিময়। চিত্রকল্প ও উপমার এক রঙিন জগৎ। যে ধরনের পরিস্থিতি তিনি নির্মাণ করেন তা এক রকম ম্যাডনেস বা অ্যাবসার্ডিটির দিকে যায়। তাই ‘মানুষ খুশি হলে ক্রাচে ভর দিয়ে বর্ষা হেঁটে যায়’—এরকম একটি দৃশ্যের মুখোমুখি হওয়ার অপ্রস্তুতি আমাদের হতচকিত করে।

আর ‘একটা পাখি উড়ে গেলে মরে যায় সকল কিশোর।’ অস্বাভাবিক কোনো হ্যাপেনিংকে মাজুল হাসান খুব শাদামাটা নির্লিপ্তিতে প্রোজেক্ট করেন। ‘একটা চুল খসে পড়ার শব্দে মহল্লায় ডাকাত ডাকাত আতঙ্ক লেগে যায়’; ‘একটা ঘেঁটু পাখি বয়ে নিয়ে যাচ্ছে সারা শহরের নার্ভ’—এইসব লাইনের যে অস্বাভাবিকতা, এইরকম নানা ট্রিটমেন্ট তার পুরো বই জুড়েই।

ট্রিকারি, পাঠককে দ্বিধার সামনাসামনি ঠেলে দেয়া, অবিশ্বাস নির্মাণ—এইসমস্ত টেকনিককে নিজের কাব্যবোধের সাথে মিশিয়ে কবি এক ভিন্ন এস্থেটিক নির্মাণের কাজ করে গিয়েছেন। তাই তার কবিতা পড়তে পড়তে দেখা হয়েছে সময়ের মতো লম্বা বেণির নার্সের সাথে। দেখা হয়েছে পারদ-মানুষ, আতর-যুবক, মাতাল-ট্রাক, তুঁত-কিশোরী প্রমুখের সাথে। ভিন্ন ভিন্ন চরিত্র যেভাবে তার কবিতায় এসেছে সেটাও আগ্রহোদ্দীপক। এমন নয় যে সব চরিত্রেরা তার কবিতার অন্তঃস্থে সক্রিয়।


তার ভাষা, থ্রোয়িং, পিচ, ট্রিটমেন্ট, ট্রিকারি এইসব এমন এক পাঠ্যাভিজ্ঞতার মুখোমুখি করেছে যা ভিন্ন, নতুন এবং সজীব।


কখনো স্রেফ অনুসঙ্গ, কখনো আবার অর্নামেন্ট হিশেবে তিনি এইসব চরিত্রকে ব্যবহার করেছেন। কিশোর তার এরকম চরিত্রদের মধ্যে উজ্জ্বলতম। একাধিক কবিতায় এই কিশোর চরিত্রকে আনা হয়েছে। তারা সবাই হয়তো আলাদা কিশোর, হয়তো একই। কিন্তু কিশোরে, যে উদাসীন/ মেলানকোলিক প্রেক্ষাপট কিশোরদের মাধ্যমে মাজুল সৃষ্টি করেছেন তা মুগ্ধকর।

  • জেনে রেখ, জ্যৈষ্ঠ দুপুরে আঙুল ও মধ্যমা কেটে
    যে কিশোর চলে যায়; মসৃণতা ছাড়া
    গোলাপবাগান থেকে সে আর কিছুই নেয় না
    (একলা দুপুর একলা যুবতীকে)
  • সহোদরার স্নানদৃশ্য দ্যাখে কিশোর। তৈরি করে গ্ল্যাডিওলাসের বাগান। সপ্তাকাশ থেকে খসে পড়ে ধূমকেতু। ঝাঁটা, বর্শা, শুকনো সেঞ্চুরি পাতার মর্মর শব্দের ধূমকেতু। তখন শহরের সবচেয়ে ভালো কালেকশনের নীলছবির স্টোরটিতেও ভয়ে, জীবনের প্রতি আঠালো মমতায় ফুল বেচতে লেগে যায় ভিতু দোকানদার। তারা ধামাচাপা দিতে চায়, মাকে চুমু খেতে দেখে মনে মনে বাবাকে খুন করার ইচ্ছে পোষণকারী ৮২ হাজার শিশুকে। সমস্ত শৈশবজুড়ে যারা কিনা খুঁজতে থাকে ৮২ লক্ষ জুতসই অস্ত্র। তাই ফিতাঅলা জুতো, নাইটক্যাপ আর স্ট্রবেরি রাবারের মতো ৮২ কোটি উপহার—শিশুকে যা-ই দেয়া হোক না কেন, তাদের মন ভরে না। কারণ, শিশুরা পিস্তল পছন্দ করে।
    (পারিবারিক অস্ত্রাগার)

ম্যাক্সিমের মতো বাক্য বলা মাজুল হাসানের কবিতার আরেকটি লক্ষণ। তার বইয়ে আছে, ‘প্রতিটি জোছনার রাত আশলে একেকটি সুইমিংপুল’; ‘রাত আশলে অসুখী নগরসেবিকা’; ‘রাত অপ্সরীদের ডাইনিং টেবিল’। এইখানে রাত বিষয়ক কিছু বাক্যে দেখা গেল প্রতিবারই একটা সিঙ্গেল এনটিটিকে কবি নতুন করে দেখছেন। ফলত রাত ক্রমশ এক ধাঁধাঁ। গন্তব্যহীন। আবার চূড়ান্ত অ্যাবসার্ড কোনো লাইন, ‘আশলে পৃথিবীর সব সংখ্যার সূত্রপাত এজন্য যে, বাসা বদলানোর কারণে কোনো শিশু হারিয়ে গেলে সে যেন অন্তত ফোন নাম্বারটা বলতে পারে’, খুব সহজে অস্বীকারও করে ওঠা যায় না। এই অন্তবর্তী অঞ্চল, এই অমীমাংসা কবি ছুঁড়ে দিয়েছেন পাঠকের দিকে। আর এইখানেই তিনি একক। তার ভাষা, থ্রোয়িং, পিচ, ট্রিটমেন্ট, ট্রিকারি এইসব এমন এক পাঠ্যাভিজ্ঞতার মুখোমুখি করেছে যা ভিন্ন, নতুন এবং সজীব।

সম্পূরক পাঠ :
বাছাই বারো : বাতাসের বাইনোকুলার থেকে

অমিত চক্রবর্তী

জন্ম ২৯ নভেম্বর, সিলেট। বর্তমান নিবাস যুক্তরাষ্ট্র।

কবি। ‘নকটার্ন’ নামক বাংলা ভাষার শিল্প-সাহিত্য বিষয়ক ওয়েবজিনের সাথে জড়িত।

প্রকাশিত বই :
অান্তোনিয়োর মেঘ [কবিতা; চৈতন্য, ২০১৬]

ই-মেইল : ac05074@gmail.com