হোম নির্বাচিত বাংলা কবিতায় আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার

বাংলা কবিতায় আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার

বাংলা কবিতায় আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার
975
0
২৯ মে ২০০৮ তারিখে সাপ্তাহিক ‘কাগজ’-এর তরফে একটি মাসিক বৈঠকি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকির আলোচনার বিষয় ছিল ‘কবিতায় আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার’। বৈঠকিতে অংশ নেন কবি মোহাম্মদ রফিক, জাহিদ হায়দার, শিহাব সরকার, তুষার দাশ, আবদুর রব, ব্রাত্য রাইসু, মাদল হাসান, সাখাওয়াত টিপু, মাতিয়ার রাফায়েল, ডেভিড সজ্জন বিপ্লব ও জহির হাসান। এতে সঞ্চালক হিসেবে ছিলেন ফরিদ কবির। গ্রন্থনা করেছেন মাহমুদ সীমান্ত। বৈঠকির ছবি তুলেছেন সুবীর কুমার।

●   ●   ●

ফরিদ কবির

যে আলোচনার জন্য আমরা এখানে এসেছি সেটা শুরু করি। এটাকে আমরা আড্ডা হিসেবেই চিহ্নিত করি। আড্ডায় আমরা একটা বিষয়ে আলোচনা করব। সেটা হচ্ছে, ‘বাংলা কবিতায় আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার’। সবাইকে আমার শুভেচ্ছা, আমার কৃতজ্ঞতা যে আপনারা এসেছেন। আমার মনে হয় এটা ভালো হবে, প্রথমে সবাই দু’মিনিটি করে বলি। তারপর বিস্তারিত আলোচনায় যাই। বাংলা কবিতায় ইদানীং আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার দেখা যাচ্ছে, এটার সম্ভাবনা বা ক্ষতিকর দিক কী কী থাকতে পারে? আমার অনুরোধ সবাই দু’ মিনিট করে বলবেন। সবার মতামত পেয়ে গেলে আমরা বিস্তারিত আলোচনায় যাব। আমরা কি শুরু করতে পারি?

মোহাম্মদ রফিক

দু’মিনিটেই কি তুমি মত পেয়ে যাবে?

ফরিদ কবির

না না, এটা সূচনা আর কি, সবাই শুরু করুক। কারণ সবার মতগুলি পাওয়া গেলে আলোচনাটা করতে সুবিধা হবে। ওখান থেকে আমরা কোনো না কোনো সূত্র ধরেই আলোচনায় যাব। তাহলে আমরা রফিক ভাইকে দিয়েই প্রথম শুরু করি।

সাখাওয়াত টিপু

ফরিদ ভাই আপনি বলে দেন, আলোচনাটা কোন জায়গা থেকে শুরু করবেন? মানে আলোচনাটা কোন জায়গায় থাকবে বা থাকবে না…

ফরিদ কবির

আমরা তো জানি, বাংলা কবিতায় আগেও আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার হয়েছে। এখন যেটা হচ্ছে, আমরা এখনকার পরিস্থিতিতে দেখছি, ঢাকার কসমোপলিটন ভাষা বা মিশ্র ভাষার ব্যবহার হচ্ছে বেশি। শুধু কবিতায় নয়, গদ্যেও ভালোভাবেই এর ব্যবহার হচ্ছে। এটা আমাদের কোন দিকে নিয়ে যেতে পারে? এ ব্যাপারেই আসলে আমরা একটু দেখতে চাচ্ছি যে কার কী মত? আমার মনে হয়, কবি মোহাম্মদ রফিককে দিয়ে আমরা শুরু করতে পারি…

মোহাম্মদ রফিক

ফরিদ যে আঞ্চলিক ভাষার কথা বলছে, আমি আঞ্চলিক ভাষার সাথে আরেকটা কথাও যোগ করতে চাই, সেটা হচ্ছে, প্রতিদিনের ব্যবহারিক জীবনে যে ভাষা ব্যবহার করি তার কথা। ব্যবহারিক জীবনে আমরা যে ভাষা ব্যবহার করি আজকালকার কবিতায় এ ধরনের ভাষার একটা বিশেষ ব্যবহার কবিদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, প্রত্যেকেই কিছু কাব্যিক উদ্দেশ্য নিয়ে কাজটা করছেন। এমন না সাবলীলভাবে তারা লিখছে। মনে হয়, তারা লিখতে চাইছে বলে তারা লিখছে। আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার তো হবেই। বহুত আগে, মনে হয়, ৫০-এর দশকে একটা সাহিত্য সম্মেলন হয়েছিল এবং সেখানে এই ভাষা ব্যবহারের প্রশ্নটা উঠেছিল। একদল বলছিল, এদেশে যে ভাষা, বিশেষ করে, তখনকার পাকিস্তানের এ অংশে যে ভাষা চর্চিত হবে সেই ভাষায় আরবি, উর্দু, ফার্সি ভাষার প্রভাব তারা দেখতে চেয়েছিলেন। আরেকদল প্রচলিত বাংলা অর্থাৎ বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ হয়ে যে ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে সেই ভাষারই বহুল প্রচলনের কথা বলেছিলেন। আমি যদি ভুল না করি, তাহলে সেখানে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তার আরেকটা মত প্রকাশ করেছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন এর বাইরেও আরেকটি ভাষা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, এবং সেটা হচ্ছে যে আমাদের দেশে যে বিপুল জনমানুষ তাদের একটা ভাষা আছে, সেই ভাষার ব্যবহার। এবং আমাদের সাহিত্য যত এগুবে ততই সেই ভাষার প্রভাব সাহিত্যের ওপরে পড়তে বাধ্য। আমার মনে হয়েছে যে তাঁর এ কথাটা খুবই মূল্যবান। তবে আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহারটা আমাদের সাহিত্যে ছিলই। যেমন উপন্যাসে অনেক চরিত্রই তাদের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেছে। সেটা খুবই স্বাভাবিক কারণ—সেই ভাষার ভিতরে ওইসব মানুষের চরিত্র ধরা পড়ে। আমাদের নাটকেও বহুদিন ধরে এই ধরনের কথোপকথন আমরা দেখতে পেয়েছি। কিন্তু কবিতায় এই বিষয়টি কিছুটা কম ছিল এবং সঙ্গত কারণেই কবিতায় ভাষার ব্যবহার আমরা সবাই জানি উপন্যাসের বা নাটকের মতো নয়। এইখানে ভাষার একটা আলাদা মূল্য আছে। আমরা বিশ্বাস করি, কবিতা ভাষার সূক্ষ্মতা ফিরিয়ে দেয়। এবং কবিতা ভাষাকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে যায় যেখান থেকে ভাষা মানুষের সৃষ্টি ভাষারূপে রূপান্তরিত হয়। যেমন আমরা যখন একটা শব্দ বলি, একটা শব্দ কিন্তু কবিতায় যখন ব্যবহৃত হয় তখন এক রকম, আবার যখন উপন্যাস কিংবা নাটকে ব্যবহৃত নয় তখন শব্দটি একটি অনুভূতি বা এই জাতীয় বিষয় বোঝায়। কিন্তু যখন কবি একটি শব্দ ব্যবহার করেন তখন প্রতিটি শব্দ শুধু যে তার চৈতন্য থেকে আসে, তা নয়। ওই শব্দটি তার একটি বিশ্ব তৈরি করে, একটি মানবসত্তাকে সে নতুন করে ভাষা দেয়। সুতরাং কবিতায় ভাষা ব্যবহার এবং উপন্যাস ও নাটকে ভাষা ব্যবহার কিন্তু এক নয়। দ্বিতীয়বার একটা বিষয় আমি বলতে চাই, সব শিল্পমাধ্যমই কিন্তু একটা বিমূর্ততার জায়গায় পৌঁছাতে চায় বা শেষপর্যন্ত বিমূর্ততা থেকে সে অব্যাহতি পায় না। যেমন নাটক বা উপন্যাস বা ছোটগল্প—সে কিন্তু একটা জায়গা থেকে বিমূর্ত একটা জগতের দিকে যেতে চায়। আর কবিতা কিন্তু তৈরি হয় একটা বিমূর্ত রূপে বা বিমূর্ততা থেকে, তারপরও বিমূর্ততাকে প্রকাশ করবার জন্য সে ভাষার আশ্রয় নেয়। এবং মূলত এই কারণেই কবিতায় ভাষা সম্পূর্ণ একটি আলাদা আলোক-বিচ্ছুরণ। সুতরাং নির্ধারিত কোনো আঞ্চলিক ভাষার প্রশ্ন অনেক গভীর ধ্যানের দাবিদার। আমি আপাতত এটুকুই বলছি, পরে যদি দরকার হয় আবারও বলব।


অনেকের কবিতায় আজকাল দেখা যায় ‘হারামজাদা’, ‘শুয়োরের বাচ্চা’ ‘খানকি’ ইত্যাদি শব্দগুলি, কিংবা ‘টাশকি মাইরা গেল’—এই ধরনের শব্দ ব্যবহার করার পরে প্রশ্ন হচ্ছে, ওই পঙ্‌ক্তিটি কবিতা হচ্ছে কিনা?


ফরিদ কবির

জাহিদ ভাই কিছু বলেন…

জাহিদ হায়দার

ধন্যবাদ রফিক ভাই। এখানে প্রশ্ন ছিল, বাংলাদেশের বর্তমান কবিতায় আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার এবং তার মাত্রা। আমি তরুণদের যত কবিতা পড়ি এবং তারা যেভাবে আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার করছে, প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে, সেটা আদৌ কবিতা হচ্ছে কিনা এবং মোহাম্মদ রফিক যেটা বললেন যে একটি শব্দ আসলে বিশ্ব তৈরি করে, সে বিশ্ব কোন বিশ্ব তৈরি করে? কবিতা যদি তাই হয়ে ওঠে তবে সে ব্যবহারটি যথাযথ নয়। আমি দুটো উদাহরণ দিচ্ছি, মণীশ ঘটকের ‘কুড়ানি’ কবিতায় আছে ‘খাট্টাশ মণ্ডল আমি তোরে করিনু বিয়া’, পরবর্তী সময়ে আমরা পেলাম শামসুর রাহমানের ‘এই মাতোয়ালা রাইত’। প্রশ্ন হচ্ছে যে, কোন অনুষঙ্গে বা প্রসঙ্গে এই আঞ্চলিক শব্দটি ব্যবহার করা হলো অর্থাৎ পুরো কবিতাটি আঞ্চলিক ভাষায় লেখা হলো? পাঠক হিসেবে আমার প্রথম এবং শেষ চাওয়া আমার বোধে-চেতনায় সেটা কতটা গুরুত্ব তৈরি করেছে। প্রথম দিকে সুধীন দত্তীয় ভাষায় অথবা মাইকেল মধুসূদন দত্তীয় ভাষায় যে কবিতা লেখা হয়েছে সেটাও আমার কাছে কতখানি গ্রহণযোগ্য? তার কাব্যমূল্য কতখানি? এ মুহূর্তে বাংলাদেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিভিন্ন বিশৃংখল অবস্থার ভেতরে প্রতিনিয়ত মানুষ আহত হচ্ছে, পরাজিত হচ্ছে বা বিজয়ী হচ্ছে, সেইসব জায়গা থেকে যে ভাষায় জীবনচর্চা শুরু হয়েছে সেখানে অবধারিতভাবে এই ভাষার চর্চাগুলি মিশে যাচ্ছে কিনা। সেখানে আমার কিন্তু আগের প্রশ্নটি চলে আসছে যে, ওখানে কবিতা পাওয়া যায় কিনা? যেখানে কবিতা সেখানে কোন ভাষা ব্যবহার করল তা নিয়ে আমার কিছু যায় আসে না। যেমন, ইদানীং কবিতায় গালিগালাজ খুব বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। রফিক ভাইদের আমলে একটা বিষয় খুব আলোড়ন তুলেছিল অ্যামেরিকান একজন কবি লিখলেন যে, we fuck america—সম্ভবত এলেন গিন্সবার্গ লিখেছিলেন সেটা। এখন একজন ব্রাত্য রাইসু যখন তার কবিতায় লেখেন ‘চোদাচুদি’ শব্দটি, বা অনেকের কবিতায় আজকাল দেখা যায় ‘হারামজাদা’, ‘শুয়োরের বাচ্চা’ ‘খানকি’ ইত্যাদি শব্দগুলি, কিংবা ‘টাশকি মাইরা গেল’—এই ধরনের শব্দ ব্যবহার করার পরে প্রশ্ন হচ্ছে, ওই পঙ্‌ক্তিটি কবিতা হচ্ছে কিনা? কারণ, কবিতার জায়গায় কোনো ছাড় দেয়া যাবে না। কবিতা সম্পর্কে বহুবিধ কথা বলা যায় এবং এটা সংজ্ঞাতীত একটি ব্যাপার, সেটা কখন কোনভাবে কবিতাকে ধারণ করবে এবং নেবে, সেটা কিন্তু ব্যক্তিমানুষের ওপর নির্ভর করে। মোহাম্মদ রফিক অথবা শিহাব সরকার অথবা ফরিদ কবির, সাখাওয়াত টিপু, মাতিয়ার রাফায়েল বা আবদুর রব—তারা তাদের মত করে কবিতা লিখবে এবং শব্দ ব্যবহার করবে। এখন সে বলতে পারে আমি তো ওই অবস্থাটার ভিতরে ছিলাম, ওই শব্দগুলিই তো আগে শুনেছি এবং তাতে আমার এই শব্দগুলি এসেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সেটা মানসম্মত হয়েছে কিনা? আমরা এগুলি স্টান্ট দেয়ার জন্য করছি কিনা? সেই জায়গাটা বোধহয় খেয়াল রাখা দরকার। ধন্যবাদ।

1
আড্ডার একাংশ

ফরিদ কবির

শিহাব ভাই এবার যদি কিছু বলেন…

শিহাব সরকার

আসলে সাহিত্যের অন্যান্য মাধ্যমের মতো কবিতাও সবকিছুই গ্রহণ করতে পারে। কবিতা একটা যে পরিমিত সো কল্ড স্ট্যান্ডার্ড ভাষায় লেখা হবে এমন কোনো কথা নেই। পৃথিবীর বহু ভাষায় আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার আছে, পটেনশিয়াল একটা এলাকার বিশেষ ভাষার ব্যবহার আছে, আমাদের চোখের সামনেই আছে, আইরিশ কবিতা আর ইংলিশ কবিতা, এবং আইরিশ দু ভাষায় পাশাপাশি লেখা হয়। আইরিশ কবিতার টোন এবং ফর্ম একেবারেই আলাদা। এটা যারা আইরিশ কবিতা পড়েছেন তারা বুঝতে পারবেন। তো সেদিক থেকে আমি মনে করি, আঞ্চলিক ভাষায় কবিতা লেখা হতেই পারে। একটা বিশেষ রিজিওনের ভাষা, যেমন বাংলাদেশের একটা অঞ্চলের ভাষা কোনো কবি তার কবিতায় ব্যবহার করতেই পারেন এবং এটা নতুন কিছু না। একটু আগে মোহাম্মদ রফিক বললেন, জাহিদ হায়দার বললেন যে, এটা চলে আসছে, থাকবে। তবে যে ব্যাপারটি আমাকে ভাবায়, বিশেষ করে ভাবায়, এটা হয়তো শেষপর্যন্ত একটা নৈরাজ্যের জন্ম দিতে পারে। কারণ আঞ্চলিক ভাষার একটা পরিমিত রূপ থাকা উচিত। আঞ্চলিক ভাষা বলতে বরিশালের আঞ্চলিক ভাষা দেব, না গাইবান্ধার আঞ্চলিক ভাষা দেব, না ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আঞ্চলিক ভাষা দেব। কোনটা? এক এলাকার ভাষা, অন্য এলাকার লোক বোঝে না। এখন ‘খাইতাছি’, ‘যাইতাছি’, ‘করতেছি’—এইটা হয়তো সব এলাকার লোক বলছে, কিন্তু ধরা যাক, একটা ‘পুঙ্গির পুত’। ‘পুঙ্গির পুত’ তো বরিশালে বুঝবে না, এটা ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী এলাকার মানুষ বুঝবে। ফলে এ ধরনের শব্দ ব্যবহারের ফলে এক ধরনের নৈরাজ্য হয়তো হয়, নৈরাজ্যের একটা আশঙ্কা থেকে যায়। এইজন্যে আমি ভাবি, আঞ্চলিক ভাষায় কবিতা আসতে পারে কিন্তু এটা যেন ডেলিভার্ড এবং ওয়ার্ডপ্যাড না হয়। না হওয়াই ভালো, একটা পরিমিত ভাষার মতো যেটা আমরা ধরি স্ট্যান্ডার্ড—ওরকম একটা রূপরেখা, স্ট্রাকচার থাকা উচিত। অনেকে লোক-নন্দনের জন্যে, বিশেষ আবেদন সৃষ্টির জন্যে একটা ইডিয়ম ব্যবহার করতেই পারেন। এটা অস্বাভাবিক কিছু না। যেমন, আঞ্চলিক ভাষা ছাড়াও, আজকাল কথ্যভাষা ছাড়াও হঠাৎ করে ক্রিয়াপদে সাধুভাষা চলে আসছে। আমার নিজেরও আজকে অজান্তেই সাধুভাষা চলে আসছে। এটা আমি বিশেষ খেয়াল করি, যেমন আমার একটা বইয়ের নাম আছে … স্যরি, নিজের বইয়ের নাম বলছি, ‘উড়িছে অন্ধ শংখচিল’। আমি ‘উড়ছে’ বলি নি, বলেছি ‘উড়িছে’। ঠিক এরকম অনেক শব্দ এসে যায়। আঞ্চলিক ভাষা আমি খুব একটা ব্যবহার করি না, তবে আমার কবিতায়ও দু’একবার এসে গেছে। একটু আগে তো জাহিদ হায়দার বলল, শামসুর রাহমানের কবিতার কথা বলল, শহীদ কাদরীরও বোধহয় দু’একটা এরকম আছে। আর ইদানীংকালে আমাদের তরুণ কবিরা, বিশেষ করে ব্রাত্য রাইসু আমাদের সামনেই বসা, তার তো বই বইয়ের নামই আঞ্চলিক ভাষায় দিয়েছে, আমি তো চমকে উঠেছিলাম, মনে হয়েছিল এটা সে সাহস করে কিভাবে দিল। কারণ এমনি কবিতায় ব্যবহার করি সেটা পর্যন্ত ঠিক আছে, কিন্তু একটা বইয়ের নাম, বইয়ের একটা পুরো নাম আঞ্চলিক ভাষায় ব্যবহার বোধহয় প্রথম, আমি জানি না এর আগে কেউ দিয়েছে কিনা! বা এর পরবর্তী সময়ে আর কেউ দিয়েছে কিনা! শামীম রেজা এরকম কেউ কেউ হতে পারে। যাই হোক, আমি এ বিষয়টাতে একটা আলোকপাত করতে চাচ্ছিলাম। আমি এটা আসলে পুরোপুরি গ্রহণ করি না, আবার করিও। কবিতা একেবারে আঞ্চলিক ভাষায় এটা নিয়ে এত হইচই করার কিছু নেই। তবে, যেটা বলছিলাম, নৈরাজ্যের আশঙ্কা একেবারে অমূলক না, এ ব্যাপারে আমাদের সতর্ক থাকা উচিত।

ফরিদ কবির

ধন্যবাদ শিহাব ভাই! আমার মনে হয়, সবাই আমরা নিজেদের একটু এক্সপ্রেস করি তারপরে আমরা বিস্তারিত আলোচনা যাই। আমি এর পরে আবদুর রবকে বলব তার বক্তব্য পেশ করার জন্য।

আবদুর রব

কবিতায় আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগ বিষয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমি একমত। তবে আমার কাছে, যে ভাষাটা আমি ব্যবহার করি, পুরো ভাষাটাকেই আঞ্চলিক মনে হয়। যদি আমরা লক্ষ করি দেখব, একটা সময় পরে এটা আঞ্চলিক হয়ে যায়। অথবা অ্যাবসলুট হয়ে যায়। তখন ওটা কিভাবে দেখব? তো এইটা একটা দিক, আরেকটা দিক হলো, আঞ্চলিক ভাষার শব্দ বা এক্সপ্রেশানকে আমি এভাবে বুঝি যে, এই ধরনের প্রকাশ আমাকে বাঁচিয়ে তুলতে পারে। সুতরাং আঞ্চলিক শব্দের যোগান, এক্সপ্রেশানের যোগান আসলে কবিতাকে জীবন্ত করে তোলে এবং কবিতাকে আসলে একটা অগ্নিময় সম্ভাবনার দিকে নিয়ে যায়। তবে এইখানে আমরা দেখব, যে প্রশ্নটা উঠেছে যে, সেটা কবিতা হয়ে উঠল কিনা? বা নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে কিনা? আসলে ‘নৈরাজ্য’, ‘কবিতা হয়ে ওঠা’—এগুলোও কিন্তু একেক ধরনের মানদণ্ডে একেকজন বলছে। এই মানদণ্ডগুলো কী? সে মানদণ্ডগুলো সম্পর্কেও কিন্তু আমাদের জানতে হবে। এবং আমাদের কবিদের সম্বন্ধে যখন আমরা কথা বলব তখন কিন্তু স্পষ্ট করতে হবে, ‘নৈরাজ্য’ বলতে আমরা কী মিন করছি! তারপরে অন্য যে প্রশ্নগুলো উঠছে যে, সেটা ‘কবিতা হয়ে উঠলো’ কিনা! এই প্রসঙ্গটা যখন তুলছি তখন সেটাও কিন্তু আমাকে ব্যাখ্যা করতে হবে, কারণ এটাও কিন্তু একটা বিমূর্ত এক্সপ্রেশান। এই বিমূর্ত এক্সপ্রেশান দেয়া চলবে না। কারণ এখন যারা নতুন লিখছে, আমি মনে করি, তাদের যথেষ্ট শ্রম আছে যথেষ্ট অধ্যবসায় আছে। আমি মনে করি, একটা ভালো চেতনা নিয়ে তারা লিখছে। এটা চল্লিশ-পঞ্চাশের দশকের কবিদের মতো নয়, যারা সব সময় পুরোনো একটা ধ্যান-ধারণা থেকে লিখেছে। তরুণরা বরং এদেশি সাহিত্যের ধ্যান-ধারণাকেই তাদের মূল কাঠামো ভেবে নিয়ে তারপর তারা সে কাজগুলো করছে। আমি এইখানে দেখি যে, আমাদের তরুণ কবিরা ওইটার ধার না ধরে বরং তারা যেটা ধারে সেটা, যেমন যে সরিষাবাড়ি থেকে আসছে, বা বরিশাল থেকে আসছে, সেখানে তার মাটির টান রয়ে গেছে। তার মনে এমন সব শব্দ, এমন সব এক্সপ্রেশান রয়ে গেছে যেটা সে তার কবিতার ভাষায় তুলে ধরছে এবং এটা অবচেতনভাবেই আসছে। শিহাব ভাই, যেরকম বললেন যে উনার ভাষায়ও সাধুভাষা চলে আসছে, তো এটা কেন আসছে? এরকম অবচেতনভাবেই কিন্তু আঞ্চলিক শব্দের একটা এক্সপ্রেশানের প্রভাব রয়ে গেছে আমাদের কবিদের ভিতরে অর্থাৎ সেটা আসলে কখনো ঠেকানো যাবে না। আমাদের দেখতে হবে, এটা শেষপর্যন্ত কী দাঁড়ায়? আর বিমূর্ততার কথাটা আমার কাছে মনে হয়, তর্জমার ভেতর দিয়েই আবার নতুন বিমূর্ততা তৈরি করা হয়। আমি দেখি, আমরা তখন জীবনকে কবিতায় আনছি, জীবন লিখছি সেটার মাধ্যমে কিন্তু একটা বিমূর্ততাকেই আমরা তর্জমা করছি। আবার এই কবিতাটাই তখন শেষপর্যন্ত কবিতা হয়ে উঠছে আমরা যদি বলি সেটা কিন্তু নতুন বিমূর্ততার জন্য। এই কম্পেয়ারটাও আমাদের একটা চলমান প্রক্রিয়া—সেটাও আমাদেরকে অনুধাবন করতে হবে।


এই যে ধরেন হাজার বছর ধইরা যারা গাইতেছে, এখন সাইমন জাকারিয়া ঢুইকা যাওয়ার পরে কিন্তু সেইটা করাপ্ট হচ্ছে এবং ওরা আরো ভদ্র হইতে শিখতেছে


ফরিদ কবির

ধন্যবাদ আবদুর রব! আমি অনুরোধ করছি ব্রাত্য রাইসুকে কিছু বলার জন্য।

ব্রাত্য রাইসু

আমি প্রথমে বলব যে, আঞ্চলিক ভাষা বলতে কিছু নাই। আঞ্চলিক ভাষাকে স্বীকার করার অর্থ হচ্ছে রাষ্ট্রকে স্বীকার করা। এখন কবিরা রাষ্ট্রকে স্বীকার করবেন কি করবেন না সেটা তাদের ভেবে দেখতে হবে। রাষ্ট্র ঠিক করে যে কোনটা মান ভাষা হবে, কোনটা আঞ্চলিক ভাষা হবে। আমি সেটা মাইনা কবিতা লিখতে পারি, না মাইনাও লিখতে পারি। এখন আমি যদি মাইনা লিখি তাহলে কিন্তু আমি আঞ্চলিক ভাষাকে স্বীকার করব। তো আমি আঞ্চলিক ভাষায় বিশ্বাস করি না, আমি মনে করি যে, যে যার খুশিমতো লিখবে, যাকে বলে নৈরাজ্য। অর্থাৎ রাষ্ট্রহীন হইয়া দেখা আমি সেরকম কবিতায় বিশ্বাস করি। মানে লেখার সময় রাষ্ট্রের চিন্তাটা থাকবে না, কবিতার মধ্যে নৈরাজ্যই হবে। অনেকে চিটাগাঙের ভাষায় লিখতে না পাইরা সাধুভাষায় লিখে। কাব্যিক উদ্দেশ্য তো সব কবিতার মধ্যেই থাকবে, কাব্যিক উদ্দেশ্য না থাকলে তো কবিতা হবে না। আঞ্চলিক ভাষার কবিতারও কাব্যিক উদ্দেশ্য থাকে। এটা এক অর্থে প্রায় অর্থহীন কথা, কারণ সব কবিতারই কাব্যিক উদ্দেশ্য থাকে, তা না হলে সেটা তো কবিতা হবে না। আর ‘ভাষাকে বাঁচাব’, ‘আঞ্চলিক ভাষায় লিখতে সুযোগ দেয়া উচিত, এইগুলি একদিন শব্দভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করবে—এই চিন্তাটাও খারাপ। এটার অর্থ হচ্ছে গরিবের রক্ত বাইয়া শেল্টার নিতে হবে—এরকম একটা চিন্তাভাবনা। এটা হলো যে রত্ন টাইনা নিয়া নোয়াখালিতে, টাঙ্গাইলে বা ময়মনসিংহে বিভিন্ন জায়গায় ঘুইরা ঘুইরা ওদের যে কালচারটা আছে অর্থাৎ তারা যে গান গায়, তারা নিজেদের মতো যে এটিচ্যুড করে সেইটাও তাদের রাজধানী থেইকা তুইলা রাষ্ট্রের এই রাজধানীতে নিয়া আসা এবং যে শো-কেন্দ্রগুলি আছে সেগুলিতে শো করা, মিডিয়াগুলিতে দেখানো, ভাষা বাঁচায়, ঐতিহ্য রক্ষা করা—এই ধরনের এটিচ্যুড ঠিক না। এই যে ধরেন হাজার বছর ধইরা যারা গাইতেছে, এখন সাইমন জাকারিয়া ঢুইকা যাওয়ার পরে কিন্তু সেইটা করাপ্ট হচ্ছে এবং ওরা আরো ভদ্র হইতে শিখতেছে। এখন আমার কথাটা হচ্ছে টাঙ্গাইলের লোক, ময়মনসিংহের লোক, সিলেটের লোক যদি মনে করে যে নিজেদের ভাষারে তারা সাহিত্যভাষা করবে তো আমি কে আপত্তি করার? মানে, এটা আপত্তি করলেও কেউ পারবে না। ফলে আঞ্চলিক ভাষায় সাহিত্য করতে দেওয়া আর না দেওয়ার কিছু নাই। ওটা যে রকম আছে সে রকমই চলতে থাকবে। আজকে যদি কেউ বলে সিলেটি ভাষার উপন্যাস আমি বুঝি না, সেটা ঠিক আছে। আবার যদি বুঝতে না পারি, কিন্তু বোঝার খুব ইচ্ছা হয় তখন সেই সাহিত্য অনুবাদ করা হবে। নোয়াখালির সাহিত্য, চিটাগাঙের সাহিত্য ঢাকার ভাষায় অনুবাদ হবে। সেটা ধরা যাক সাখাওয়াত টিপু করল। তো আমরা দেখি যে এই ব্যাপারে দুই রকমের বিরোধিতা আসে। উর্দুভাষা যেমন সবকিছু শেষ কইরা দিছিল, এইটা এভাবে শো করেন হায়াৎ মামুদরা। আরেকটা হলো যে সলিমুল্লাহ খান, ফয়জুল লতিফ চৌধুরী এবং এরকম কেউ কেউ সাধুভাষায় লিখছেন। যেই ভাষাটা চলতি বা সবাই মিলে ব্যবহার করছি এইটা কিন্তু গানের মধ্যে সব সময় আছে। আমরা এটা কবিতার মধ্যে নিয়া আইসা এটাকে একটা লিখিত রূপ দিতে পারি, এইটা আসলে নতুন কিছু না, এটা গানের মধ্য দিয়া সব সময় হাজির আছে। এখন গানের মধ্য দিয়ে দেখেন, যে কোনো গানই শোনেন, সেখানে নিজেদের সংসার নিজেদের ভাষা ছাড়া গান হবে না। এখন আমার মত হইলো, যে যার মতো যেমন খুশি লিখতেছে যার ইচ্ছে হইলো পড়বেন না হয় পড়বেন না, কিন্তু অন্যদেরকে আপনারা নিষেধ কইরেন না।

2
আড্ডার একাংশ

ফরিদ কবির

এ নিয়ে আরো আলোচনায় যাওয়ার আগে আমরা মাদল হাসানের কথা শুনি।

মাদল হাসান

আমার বলার আগে বেশ কয়েকজন বলেছেন। এর মধ্যে কয়েকটা কথা এসেছে, একটা হচ্ছে অনেকে সংলাপে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করলেও বর্ণনায় করেন না। তো এই বিষয়টার হয়তো একটা পরিবর্তন হতে পারে, বা হচ্ছেও কারো কারো লেখায়। শুধু সংলাপ নয়, বর্ণনার ভাষাও আজকাল আঞ্চলিক ভাষায় হচ্ছে। একটা চরিত্র যে অঞ্চল থেকে উঠে আসলো ওই অঞ্চলের ভাষার ওপরেই তার চরিত্র তৈরি হতে পারে। আর, কবিতায় আঞ্চলিক ভাষার যে কথাটা বলা হচ্ছে, জাহিদ ভাই যেমন বলেছিলেন যে, জীবনচর্চা যখন যেমন হবে ভাষাটা তার ভিতর থেকে উঠে আসবে। এ ব্যাপারে আমি একমত যে, যে জীবনের মধ্যে মানুষ থাকে, সেখান থেকেই সে তার ভাষাটা বের করে নেয়। শিহাব ভাই যেটা বলেছিলেন, এতে নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে। তো এক্ষেত্রে আমি শিহাব ভাইর জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি, কবি জাহিদুল হকের একটা বই আছে। অনেকেরই এটা নজরে পড়ার কথা না—‘নৈরাজ্য ঘুঙুর’। তিনি আসলে প্রকৃতগতভাবে নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে চেয়েছেন বলে আমার মনে হয়েছে। হয়তো তার নাম অনেকেই শোনেন নি। তার কবিতা যে খুব ভালো লাগে এমনটা বলব না, কিন্তু তার যে নৈরাজ্য সৃষ্টি করার ক্ষমতা আছে, এটা আমার মনে হয়েছে। এরপরে আবদুর রব ভাই বলেছেন, নৈরাজ্য নয় বরং নতুন পথ নির্মাণ করা। খুবই আশাবাদী কথা এইটা, অবচেতনে আঞ্চলিক ভাষার যে বিষয়টা আছে, আঞ্চলিক নয় এটা, বিমূর্ততা থেকে আরো বিমূর্ততার দিকে যাওয়া—সেকথা তিনি বলেছেন। সেটা হয়তো সমালোচনা সাহিত্য যারা করেন তাদেরকে সুড়সুড়ি দেয়া যাবে। এরপর রাইসু ভাই যেটা বলেছেন, খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন যে রাষ্ট্র থাকলে আঞ্চলিকতা থাকবে। কবি রাষ্ট্রকে মেনে নেবেন কি নেবেন না এটা হচ্ছে তার রাজনৈতিক অবস্থান। ব্যক্তিগতভাবে আমিও রাষ্ট্রের পক্ষে নই, সমাজের পক্ষে। সেই সামাজিকতার মধ্য থেকে বলতে পারি, ওই অর্থে আঞ্চলিকতাও ব্যর্থ। নির্দিষ্ট একটা ভূখণ্ডের মানুষ যেভাবে কথা বলে সেটা তো তার জন্য একটা প্রমিত ভাষাই। আর আঞ্চলিকতার ক্ষেত্রে বলব, লালনের গানে অনেক সময় দেখা যাচ্ছে যে আঞ্চলিক শব্দটা আছে, তার সঙ্গে সঙ্গে মানানসই প্রমিত শব্দটাও আছে। সেই প্রমিত শব্দটা, শ্রুতির মাধ্যমে, দেখা যাচ্ছে তিনি ওটার মাধ্যমে আকৃষ্ট করছেন। ওভাবেই তিনি সাধারণ জনগণের মধ্যে নিজেকে সম্প্রসারিত করতে পেরেছেন। আর একটা ব্যাপারে আমি একমত হতে পারলাম না রাইসু ভাইয়ের সঙ্গে, সেটা সাইমন জাকারিয়ার প্রসঙ্গে যে, তিনি আমাদের অনেক ঐতিহ্যকে করাপ্ট করে দিচ্ছেন…

ব্রাত্য রাইসু

আমি যেটা বলতে চাইছি যে উনি ওই এলাকাটার ভেতরে ঢুকার ফলে ওদের যে স্বাভাবিক চেতনা সেগুলো বিঘ্নিত হচ্ছে, ওখানে নাগরিক সুবিধাগুলি এবং নাগরিক যে সাবস্টেন্সগুলি ঢুকতেছে তার কারণে শ্রোতামণ্ডলি শেষ হয়ে যাচ্ছে। আগে ওদের যে দর্শন ছিল, এখন সভ্যসমাজ ঢুকার ফলে সেগুলি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমি কুদ্দুস বয়াতীর সঙ্গে একবার কথা বললাম, হূমায়ুন আহমেদ তাকে নিয়ে আসছিলো ঢাকায়, তারপর উনি বললেন, আমি তো বেনসন সিগারেট খাই। তার যে বিবর্তনটা হয়েছে, সে গান গাইয়া, বিজ্ঞাপনে অভিনয় কইরা, বেনসন সিগারেট ধইরা কনভার্ট হয়ে গেল। এখন যখনি আপনি যাবেন সে জায়গাটায়, তখন দেখবেন যে তারা কোথাও স্বস্তিতে থাকতে পারে না।

আবদুর রব

তাদের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ততা নষ্ট হয়।

ব্রাত্য রাইসু

স্বতঃস্ফূর্ততাই শুধু না, পুরো জিনিশটাই নষ্ট হয়ে যায়। এখন টেলিভিশনে যখন একটা গান গায়, এই যে ফরহাদ ভাই যখন অনেককে নিয়ে আসলো গান গাওয়ার জন্য, তারা যে গানটা গায় আর তারা তাদের যে অবস্থানে থাকে এবং সেইখানে যে গানটা গায়, সেটা তো এক গান না। তাই বলছি, সবকিছুকেই যেভাবে রাজধানীকরণ করা হয় সেটা করা ঠিক কিনা তা ভেবে দেখতে হবে। মানে আমার তো কোনো আপত্তি নাই, সাইমন জাকারিয়ার যদি চেষ্টাটাই থাকে আমরা নাগরিক সভ্য-সমাজের লোকরা যেন এগুলো না হারাই। কিন্তু আমাদের মতো শহরের লোকরা যখন গ্রামে যায় তখন আমাদের দেখলেই ওরা উপদ্রুত হয়ে যায়। আপনি চান বা না চান ওদেরকে আদর করতে গেলেই ওরা আরো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, আর এটা হবেই, আমি সে অর্থে বলেছি।

মাদল হাসান

কিন্তু সবদিক দিয়েই যে হবে সেটা আমি পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারি না, কারণ মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ। যাই হোক, যেটা দিয়ে আমি শেষ করতে চেয়েছিলাম, আঞ্চলিক ভাষা থেকে অনুবাদ, আঞ্চলিক ভাষা থেকে চলিত ভাষায় অনুবাদের যে কথাটা বলা হচ্ছে, এই বিষয়টা ঠিক আমি মানতে পারলাম না। কারণ পাশাপাশি একই ভূখণ্ডের মধ্যে থাকলে দেখা যায়, কয়েক মাইল পরপর ভাষার যে পরিবর্তন হয়, এটা বোধহয় খুব বেশি দরকার পড়ে না অনুবাদে। যেমন, যখন আমরা নোয়াখালির ভাষা পড়ি তখন কিন্তু কিছু কিছু বুঝতে পারি। যেমন চট্টগ্রামের ভাষা নিয়ে ড. মুহাম্মদ এনামুল হকের যেসব বই আছে, ওগুলো থেকে যদি আমরা কিছুটা শিখতেও চাই, তাহলে শিখতেও পারব। কিংবা শুভাশিস সিনহার মতো যদি কবি থাকে তাহলে আমরা মণিপুরী ভাষাও আয়ত্ত করতে পারব। যাতে করে আমরা তাদের আকৃষ্ট করতে পারি বা তাদের সাহিত্য থেকে কিছুটা রস নিতে পারি।

ফরিদ কবির

ধন্যবাদ মাদল। আমি এরপরে সাখাওয়াত টিপুকে অনুরোধ করছি তার কথা বলার জন্য।

সাখাওয়াত টিপু

প্রথমে আমি একটা আপত্তি করব ‘আঞ্চলিক’ শব্দটা নিয়ে। অঞ্চল ছাড়া পৃথিবীতে কোনো ভাষা আছে কিনা আমার জানা নাই। ফলে এইটা মনে হয়, এই যে কবিতা লেখা বা কবিতার মধ্যে যে শব্দ ব্যবহার করা হয় এটাকে আমি ‘আঞ্চলিক’ শব্দ বলতে চাই না। আমরা পৃথিবীর যে কোনো ভাষায় লিখি না কেন অঞ্চল ছাড়া কোনো ভাষাই হয় না। কারণ দুনিয়ার সকল ভাষাই তো আঞ্চলিক। যে কেউ চাইলে ইংরেজি ভাষায় লিখতে পারে, চাইলে স্প্যানিশ ভাষায়ও লিখতে পারে, সিলেটি বা চাটগাঁর ভাষায়ও লিখতে পারে। সেটাও তো কোনো না কোনো অঞ্চলের ভাষা। তাতে তো কোনো সমস্যা দেখি না। এখানে ‘আঞ্চলিক ভাষা’ বলে নির্দিষ্ট একটা জিনিসকে মানতে বাধ্য করা হয়। আমার মনে হয়, অ্যাপ্রোচটাই ঠিক না। আরেকটা হচ্ছে, কথিত ‘আঞ্চলিক ভাষা’ বলতে আমরা কী বুঝি? আমরা যখন বলি ‘আঞ্চলিক ভাষা’ তখন এর বাইরে একটা ভাষা থেকে যায়। তাতে দেখা যায়, ভাষার ভেতর দুইটা নিয়ম আছে। একটা হচ্ছে, প্রমিত বাংলা, আমরা যাকে একাডেমিক বাংলা বলি। যেটা গবেষণা বা শিক্ষাব্যবস্থায় চালু আছে। ওইখানে এই প্রমিত বাংলা টাকা-পয়সা ছাড়া শেখা যায় না। ফলে এটা রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত ভাষা। সব সময় রাষ্ট্রকে রক্ষা করার জন্য প্রমিত বাংলা ব্যবহার হচ্ছে। এই তথাকথিত প্রমিত বাংলার বাইরে যা কিছু আছে সবই তো আঞ্চলিক ভাষা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই প্রমিত ভাষা কি আঞ্চলিক ভাষার বাইরের জিনিশ?

এখন কবিতার ভাষা কী হবে? কবিতার যে ভাষা, শুধু কবিতায় নয়, সাহিত্যের যে ভাষা, তাতে কোনো কিছু চাপিয়ে দেয়া ঠিক হবে না। কেউ যদি প্রমিত বাংলায় কবিতা লেখে আমার কোনো সমস্যা নেই। ভাষার এ সংকোচনের দায়—যিনি লেখেন তাঁর। ভাষার কিংবা সাহিত্যের নয়। আমি প্রশ্ন করব না আপনি কেন এ ভাষায় চর্চা করেন? কিন্তু যখন বলা হয়, কারো ভাষা নিয়ে যে, কেন এ শব্দ ব্যবহার করল? এটা কেন আঞ্চলিক? তখন বিরোধটা বাধে। প্রথমত, আমি শব্দের মধ্যে কোনো আঞ্চলিকতা দেখি না। কেননা শব্দ হচ্ছে বিমূর্ত একটা জিনিস। আমরা যখন ধ্বনি বা শব্দের মধ্যে কোন অর্থ আরোপ করি তখন শব্দ প্রাণে জেগে ওঠে। ধ্বনি বা শব্দের প্রাণ বা অর্থই নতুন ভাষার জন্ম দেয়। তারপর দুই নাম্বার জিনিশ, আমরা যেটাকে আঞ্চলিক ভাষা বলতেছি, তার বাইরে প্রমিত ভাষায় যে আধিপত্য, সেখানে তো রাষ্ট্রের আধিপত্য। রাষ্ট্রের এবং ভাষার যে সম্পর্ক—এইটা নিয়া রাইসু বললেন, মাদলও বললেন। আমি একটা বিষয় বলতে চাই, রাষ্ট্র ভাষাকেই নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, ভাষা কিন্তু রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে। নিয়ন্ত্রণ একাডেমিতে চলা সম্ভব, তবে ভাষায় নয়। ভাষার দুয়ার খাটো করলে ভাষারই দম বন্ধ হয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, আমাদের যে ভাষা, যে প্রমিত রূপ আছে ওইটা একটা রূপ, এর বাইরে যে রূপ সেটাকে তিনি বলেছেন ‘উপভাষা’। তিনি কথ্যভাষাকেও আলাদাভাবে দেখেছেন। তাঁর দেখার ভেতরেও গণ্ডগোল আছে। আমার কথা হচ্ছে, ভাষা বাঁচে স্থান, কাল, উৎপাদন, চাহিদা, উপযোগিতা, বণ্টনব্যবস্থার ভেতর দিয়ে। সাহিত্যে ভাষার এরিয়া যত বাড়বে ততই ভাষার জন্য মঙ্গলজনক। যখন এইটাকে খণ্ডিত আকারে প্রমিত করা হবে, প্রমিত ভাষায় চর্চা করার আইন চালু হবে, তখনই অমিত সম্ভাবনা খর্ব হবে। এই অমঙ্গল শুধু সাহিত্যের নয়, ভাষারও।


কোনো কিছুকে নৈরাজ্য বলা হয়, তখন তার অবস্থানটা কোথায়? যুক্তিটা কী? কার স্বার্থে? কেন এটাকে নৈরাজ্য বলা হচ্ছে ওইটা আগে পরিষ্কার করতে হবে


আলোচনায় আরেকটা জিনিশ এসেছে, সেটা হচ্ছে নৈরাজ্য। নৈরাজ্য বলতে আসলে আমরা কী বুঝি? এটা হচ্ছে উইলিয়াম গডউইনের তত্ত্ব। রাষ্ট্রের প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধে কেউ কিছু করলে ওইটাকে নৈরাজ্য বলা হয়। নৈরাজ্যকে এভাবে চিহ্নিত করলে সেটা খুবই বিপজ্জনক! অধিকারের প্রশ্নটি এতে মার খেতে পারে। রাষ্ট্রকে পরজীবী করে রাখার জন্যই এটাকে ব্যবহার করা হয়। এই তত্ত্বটাকে বাকুনিন, প্রুধো ও অন্যান্যরা খুব চালু করছিল বাজারে। এখন সাহিত্যের বেলায় এই ধরনের ভাষার ব্যবহারকে নৈরাজ্য বলা ঠিক হবে কি না? একটু রেফারেন্স দেই, পাক আমলে ভাষা-আন্দোলনের সময় পাক-সরকার ভাষা সংক্রান্ত একটা লিফলেট ছেড়েছিল। যেটা হচ্ছে, বাংলাভাষা নিয়ে। ওইখানে লেখা হয়েছিল, পূর্ব পাকিস্তানে গোলযোগের কারণটা কী? গোলযোগের কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে, কিছুলোক কথিত রাষ্ট্রভাষাটাকে অর্থাৎ  উর্দু ভাষাটাকে মানতে চাচ্ছে না। এটা করে ওরা নিজেদের বাংলাভাষার পক্ষে অবস্থানকে জানান দিচ্ছে। ওইখানে, পরজীবী রাষ্ট্রই বাংলাভাষার আন্দোলনটাকে এনার্কিজম বা নৈরাজ্যবাদ বলে চালিয়ে দিতে চাচ্ছে। ফলে কোনো কিছুকে নৈরাজ্য বলা হয়, তখন তার অবস্থানটা কোথায়? যুক্তিটা কী? কার স্বার্থে? কেন এটাকে নৈরাজ্য বলা হচ্ছে ওইটা আগে পরিষ্কার করতে হবে। স্ল্যা‌ং বিষয়ে বলি, একজন রিকশাওয়ালা যখন ঝগড়া করে তাদের ভাষায় স্ল্যাংটা কোথায়? নাগরিকরা হয়তো ভাবছেন, এটা স্ল্যাং। আমি বলব, এটা তো তার ভাষা, সে ভাষায় স্ল্যাং হিশেবে এটাকে ব্যবহার করে না। আমরা যখন সাহিত্য চর্চা করি, আমরা যখন কোনো একটা কিছু চর্চা করতে যাই, তখন আমাদের মধ্যে শুদ্ধতার কথা আসে। যখন ভাবা হয় ওটা শুদ্ধ, ওটা স্ল্যাং। শুদ্ধ কিংবা স্ল্যাং বলে আসলে কোনো কিছু আছে? যেটা আমার ব্যক্তির কাছে শুদ্ধ কিংবা স্ল্যাং, সেটা অন্যের কাছে শুদ্ধ কিংবা স্ল্যাং নাও হতে পারে। এই ব্যাপারটা আমরা কখনো ভাবি না। তারপর, কবিতার ক্ষেত্রে আরেকটা জিনিশ ভাবা হচ্ছে মান। আমরা যখন মান বলি এই মান জিনিশটা কী? এই মানটা কে রক্ষা করবে? এইটা কি রাষ্ট্র রক্ষা করবে? এইটা কি একাডেমি রক্ষা করবে? এটা কি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান রক্ষা করবে? এখানকার একাডেমিক যে ভাষা, ওইটারও তো কোনো মান নাই। একাডেমিক ভাষায় দেখা যাচ্ছে, আবদুল গণি হাজারীও লিখেছেন, শামসুর রাহমানও লিখেছেন। তাদের ভাষায় মিল নাই কোনো। একাডেমিক ভাষার এরকম আরো উদাহরণ দেয়া যায়, জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, সুধীন দত্তরা একাডেমিক ভাষার কবি। এইটা তো এরকমভাবে বলা যাবে না—এইটা মান ভাষা, এইটা অ-মান ভাষা। ভাষার পার্থক্যের কারণে হয়তো বলা যায়, এইটা আরবি ভাষা, এইটা আঞ্চলিক ভাষা। এই বলার ভেতর ক্ষমতার কারসাজি থাকে। এখন যে যেমন খুশি তেমন লিখবে তাতে আমার কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে, যখন বলা হবে এই শব্দটা ব্যবহারের মধ্যে এক ধরনের স্ল্যাঙ আছে। কোন জায়গা থেকে আপনি এই বিচারটা করছেন? আমরা কি আমাদের মধ্যবিত্তকে সংরক্ষণ করার জন্য সাহিত্য করি? নাকি ভাষার যে পরিবর্তন, ভাষার মধ্যে যে গ্রহণ-বর্জনের ব্যাপার আছে, শ্রেণীগত অবস্থান আছে, শাসন কাঠামো আছে, ওই জিনিশটাকে মানদণ্ড ধরে আমরা সাহিত্য করব? এই জিনিশগুলা পরিষ্কার থাকতে হবে। না হলে যে জিনিশটা হবে, তাতে আমরা সবসময় সাহিত্যকে সংকুচিত করব। ভাষার একটা মান থাকবে, ব্যাকরণ থাকবে, একটা সিস্টেম থাকবে। থাকুক! কিন্তু সাহিত্যের ভাষা হবে তার চাইতে অনেক বড়। মান ভাষা যদি একটা ক্ষুদ্র বালুকণা হয়, আর ওইখানে সাহিত্যের ভাষা হবে সমুদ্রের মতো বিশাল। এটার নির্দিষ্ট কোনো এরিয়া থাকবে না। এটা হয়তো গবেষকদের ব্যাপার হবে। এটা হচ্ছে, প্রমিত ভাষার মধ্যে এই এই উপাদান, এই এই চিন্তা, এই এই জিনিশ আছে। সাহিত্যের উপাদান, চিন্তা ও উৎপাদন শুধু প্রমিত ভাষা দিয়ে ঠিক করা যাবে না। এটা হচ্ছে আমার প্রাথমিক অভিপ্রায়।

11270502_10153374972478566_8160325737333664289_o
সঞ্চালক : কবি ফরিদ কবির

ফরিদ কবির

থ্যাঙ্ক ইউ, সাখাওয়াত টিপু! আমরা এবার মাতিয়ার রাফয়েলের কথা একটু শুনি। মাতিয়ার…

মাতিয়ার রাফায়েল

ধন্যবাদ ফরিদ ভাই! এখানে যে আলোচ্য বিষয় সেটা বাংলা কবিতায় আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগ নিয়ে। এর মধ্যে শুরু হয়ে গেছে যে বিতর্কটা আঞ্চলিক ভাষা বলতে আদৌ কিছু আছে কিনা? আঞ্চলিক ভাষার বিরুদ্ধে কয়েকজন মত দিয়েছেন। তো আমাদের টাইটেলটা কিন্তু আঞ্চলিক ভাষা নিয়েই। তার মানে যখন আঞ্চলিক ভাষা বলতে কিছু মানি না, এই কথা ওঠে তখন তো এই টাইটেলটাকেই প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে প্রকারান্তরে। তবে কথা থাকে যে, আঞ্চলিক ভাষা যে-কেউ প্রত্যাখ্যান করতেই পারে, বলতে পারে আঞ্চলিক ভাষা বলতে কিছু নাই। হ্যাঁ, আজকে এই ‘আঞ্চলিক ভাষা’ নিয়ে বিতর্কটা হতেই পারে। আমি মনে করি, ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে রাষ্ট্র থাকুক বা না থাকুক, একেক অঞ্চলে একেক ধরনের ভাষার অ্যাকসেন্ট, আলাদা আলাদা ধ্বনিবৈচিত্র্য, প্রকাশবৈচিত্র্য, অ্যাপ্রোচ, মুভমেন্ট প্রভৃতি আলাদা আলাদা রূপ নিয়ে ভাষার আঞ্চলিকতা থাকবেই। ক্ষুদ্র হোক বা বৃহত্তর হোক এই আঞ্চলিকতার ওপর ভর করেই রাষ্ট্র হয়। যেমন, ভারত, বহু ক্ষুদ্র মাঝারি আঞ্চলিকতা নিয়াই বৃহত্তর ভারত, ভারতীয় আঞ্চলিকতা। চীনা নয়। যখন রাষ্ট্র ছিল না, তখনও এইসব আঞ্চলিকতা ছিল এবং তা থাকবেই। তা ভাষার হোক কি সংস্কৃতির হোক। আর সে জন্যেই ভাষার এই আঞ্চলিকতার প্রশ্নটি উঠে আসছে।

এইভাবে এইসব আঞ্চলিকতা কোথাও কোথাও এমন অবোধ্য যে বাংলাদেশের দুই তিনটা অঞ্চল, আমি মনে করি যারা মানভাষার মধ্য দিয়েই অনুবাদ করে চিন্তা করেন। ঐ অনূদিত মান্যভাষার মধ্য দিয়ে অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষাবাসীর সঙ্গে কমিউনিকেট করে থাকেন। অন্য কোনও আঞ্চলিক ভাষার মধ্য দিয়ে নয়। কয়েকটা অঞ্চল আছে সেখানকার লেখকরা যখন সাহিত্য করেন তখন অনুবাদ করেই মান ভাষায় চিন্তা করেন, লেখালেখি করেন, যা কখনও তার স্ব-আঞ্চলিক ভাষায় সরাসরি করা সম্ভব না। এইগুলা এতই জটিল যে কারো পক্ষে সরাসরি মান ভাষায় চিন্তা করা সম্ভব হয় না। তাকে এক ধরনের অনুবাদ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই আসতে হয়। এখন তিনি যখন লিখতেছেন তখন কি তিনি সেই লেখা সরাসরি মান্য ভাষায় লিখতেছেন, কিংবা তখন কি তিনি অনুবাদ করে লিখতেছেন নাকি সরাসরি তার আঞ্চলিক ভাষার চিন্তাতেই লিখতেছেন? এক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, কেউ আমাদের এখানে নব্বই দশকের শুরুতে কি আশির শেষে একধরনের হচপচ বা গুরুচণ্ডালী ভাষায় লেখা চালু করছেন, দেখা গেছে পরবর্তীতে সেটাকে ধরেই আরও হচপচ ভাষায় কবিতা লেখা হচ্ছে, যেটাকে অনেকেই আঞ্চলিক ভাষার কবিতা বলে আসছেন। কিন্তু এটাকে আমি আঞ্চলিক ভাষা হিসেবে মনেও করি না, এটা হচ্ছে একটা নব্য ক্যারিসম্যাটিক ভাষা। বাংলা কবিতায় এই নব্যস্ফূর্তির যে একটা ভাষা তৈরি হয়েছিল সেই স্ফূর্তিটাই পরবর্তীকালে চলতি দশকের প্রথম পাদে মানে শূন্য দশকের শুরুর দিকে অনেকটা সরাসরি আঞ্চলিক ভাষায় কনভার্ট হয়ে যায়। এখন বাংলা কবিতায় যাকে আঞ্চলিক কবিতার ভাষা হিসেবে বলা হচ্ছে। শূন্য দশকের দিকে এই আঞ্চলিক ভাষার চর্চাটি করেন আমার মনে হয় শামীম রেজা… কিন্তু এই আঞ্চলিক ভাষায় কবিতার চর্চাটি আরও অনেক আগেই হয়ে গেছে, এর আগে যেমন অদ্বৈত মল্লবর্মণ, তিরিশ আধুনিকতার কালেও কবিতা লিখেছেন কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কথ্যভাষায়…এর আগেও আরও অনেকের লেখাতেই এই আঞ্চলিকতা উঠে আসে, লিখেছেন কবিওয়ালা অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি… পরে লিখেছেন সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ, মোহাম্মদ রফিকসহ অনেকেই আলাদা আলাদা আঞ্চলিকতার মেজাজে। এখন দেখা যাচ্ছে, যে ভাষাটাকে বলা হচ্ছে ‘ঢাকাইয়া ভাষা’ এটা আদৌ ঢাকাইয়া ভাষা কিনা? আমি বলব যে, এইটা মোটেও ঢাকাইয়া ভাষা নয়। এই ঢাকা, যেটা বাংলাদেশের রাজধানী, এর কেন্দ্রে, যেখানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অধিবাসী এখানে বসবাস করছেন, তারা প্রত্যেকেই প্রত্যেকের সঙ্গে কমিউনিকেট করতে চাচ্ছেন মান ভাষার মধ্য দিয়ে, যে মান্যভাষায় কমিউনিকেট করতে গিয়ে তারা সকলেই অজান্তে একটা হচপচ বা মিশ্রভাষা তৈরি করে নিতেছেন এই ঢাকায়। এটাকে কি ঢাকাইয়া ভাষা বলা যাবে? এখন কেউ এটাকে বলতে চাইতেছেন কসমোপলিটন ভাষা, কিন্তু আমরা তো ঢাকাকে কসমোপলিটনও বলতে পারব না সেই অর্থে। এখন রাষ্ট্র থাকলে, রাষ্ট্র বিশ্বাস করলে আঞ্চলিক ভাষায় বিশ্বাস করা যাবে। রাষ্ট্র বিশ্বাস না করলে আঞ্চলিক ভাষায় বিশ্বাস করা যাবে না, এটার কোনো যৌক্তিকতা আমি পাই না। বরং আমি বলব, রাষ্ট্র যদি নাও থাকে, তারপরও একেক অঞ্চলে একেক রকমের ভাষার প্রকাশবৈচিত্র্য, অ্যাকসেন্ট, মুভমেন্ট ইত্যাদি দেখা যাবে, এটাকে কেউ চাইলেই নড়চড় করতে পারবে না। চিটাগাঙের ভাষায়, চিটাগাঙের লোকজন যে ভাষায় কথা বলে সেই ভাষায়, সেই অ্যাকসেন্ট-এ কুমিল্লার লোকজন কখনোই কথা বলবে না। এবং বগুড়া-মাগুড়া প্রভৃতির আঞ্চলিক ভাষার লোকজন কখনোই তার নিজের ভাষায় সিলেটের ভাষাকে বুঝতে চাইবে না। তাকে ফিরে আসতে হবে একটা মান্য ভাষাতেই। এক অঞ্চলের লোক অন্য অঞ্চলের ভাষা সরাসরি বুঝতে পারবে না, তাকে বুঝতে হলে এক ধরনের অনুবাদের মাধ্যমেই সেই ভাষাকে বুঝতে হবে।


ঢাকাইয়া ভাষার নামে এখানে এই কাজটিই জগাখিচুড়িসুলভ। আসলে আমি বলতে চাই, সুনির্দিষ্টভাবে ঢাকাইয়া ভাষা বলতে কোনো আঞ্চলিক অস্তিত্বই নাই


তবে এক্ষেত্রে একটা প্রশ্ন আসতে পারে, এবং এটা আমি মনে করি যে আঞ্চলিক ভাষায় যারা কবিতা লিখতেছেন সেটা আদৌ আঞ্চলিক ভাষায় লিখতেছেন কিনা? নাকি তারা যেটা লিখছেন সেটায় স্রেফ আঞ্চলিক শব্দ, ক্রিয়াপদ ইত্যাদি ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে। আমি এটাও মনে করি না যে এখন যারা তাদের নিজ নিজ যে আঞ্চলিক ভাষায় কবিতা লিখতেছেন সেটাও আকাঁড়া আঞ্চলিক ভাষা, বরং মূলত আঞ্চলিক শব্দ ক্রিয়াপদ ইত্যাদি ঢুকিয়ে দিচ্ছেন আর কি। কেউ বরিশালের, কেউ যশোরের, কেউ চিটাগাঙের, কেউ সিলেটের শব্দ, ক্রিয়াপদ ইত্যাদি ঢুকিয়ে দিচ্ছেন। ঠিকঠাক না ঢুকতে চাইলেও ঢুকিয়ে দিচ্ছেন আর কি। হুবহু আঞ্চলিক ভাষায় কারো পক্ষেই কবিতা লিখা সম্ভব না, এমনকি গদ্য লেখাও সম্ভব না। তো মান ভাষা আমাদের দরকার সেইজন্যই, যাতে অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষার সঙ্গে একটা যোগাযোগ হতে পারে। তো সে মান্যভাষাটা আমাদের কী হবে? সব আঞ্চলিক ভাষাই কি মান্যভাষা হতে পারে? এখন আমরা চাটগাঁইয়া আঞ্চলিক ভাষায় কি মান্যভাষা তৈরি করতে পারব, কিংবা সিলেটি আঞ্চলিক ভাষায়? ধরে নিলাম সে আঞ্চলিক ভাষাকে মান্যভাষা করলাম, এক্ষেত্রে এখানে একটা কথা উঠতে পারে, এসব আঞ্চলিক ভাষার অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষা, ক্রিয়াপদ ইত্যাদির ধারণক্ষমতা কতটুকু? বা চিটাগাং কি সিলেটের ভাষায় মান্যভাষা তৈরি করতে পারব কি? সম্ভব কিনা যদি সম্ভব হয় তাহলে তো সে ভাষাকে অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষার সঙ্গে কমিউনিকেট করার জন্যে মান্যভাষা হিশেবে গ্রহণ করতে আমাদের আপত্তিও থাকার কথা নয়। সম্ভব হলে সে ভাষায় কথা বলতে ও ভাবতেও আমাদের আপত্তি নেই। এবং এই সূত্রেই এই যে যেটাকে ঢাকাইয়া ভাষা বলা হয়, তাকে মান্যভাষা করা সম্ভব কিনা? এখন ঢাকায় দেখা যাচ্ছে যে, পুবাইল অঞ্চলে, যেটা ঢাকারই অন্তর্গত, সেখানেও দেখবেন যে আরেক রকম অ্যাকসেন্ট, এক্সপ্রেশনযোগে কথা বলছে, ওইটাও ঢাকাইয়া ভাষা, আবার কেরানিগঞ্জ, জিঞ্জিরার লোকজন, ওদের ভাষার প্রকাশভঙ্গি, অ্যাকসেন্ট, ক্রিয়াপদের ব্যবহার ইত্যাদি অন্যরকম। কালিগঞ্জ কি পুবাইলের সঙ্গে মিল নেই। ওদের ভাষাও ঢাকাইয়া ভাষা, কিন্তু কবিতা লেখার জন্য ঠিক সুনির্দিষ্ট করে আমরা বলতে পারব না এটা ঢাকাইয়া ভাষা, ওটা ঢাকাইয়া ভাষা নয়। কেউ কেউ হয়ত বলবেন পুরান ঢাকার লোকজন যে ভাষাটায় কথা বলছে সেইটা ঢাকাইয়া ভাষা। আসলে ঢাকার ভাষা কোনটা? পুরান ঢাকার ভাষাও কিন্তু এক ধরনের কসমোপলিটান ভাষাই। যখন এটা রাজধানী ছিল পূর্ব পাকিস্তান বা তারও আগে যখন বৃটিশরা কি নবাবরা ছিল, তখন তারা এক ধরনের হচপচ ভাষাতেই কথা বলত, উর্দু বাংলা মিক্সড, কিংবা ফার্সি-উর্দু বাংলা মিক্সড এমন একটা হচপচ ভাষা, যেটা অনেকের লেখাতে আসে, শামসুর রাহমানের একটি কবিতায় আছে, অনেকে সেইটাকেই মনে করি ঢাকাইয়া ভাষা। এইভাবে কোনটা ঢাকাইয়া ভাষা সে প্রশ্নেও আমরা বিভিন্ন দলে আলাদা হইয়া যাই, এখন যারা এইখানে এই প্রশ্নে একাধিক দল আছেন, যারা লিখতেছেন, যাদের অনেকের তথাকথিত এই ঢাকাইয়া ভাষার সঙ্গে জীবন-যাপনও ঠিক সেই পরিমাণ যথেষ্ট নয় অর্থাৎ যার এই ঢাকাইয়া ভাষার সঙ্গে রগে রগে অনুভবযোগ্য অতিবাহন নাই, যাদের অনেকে নিজেরাও বুঝতেছেন না কোনটার কোন অর্থ, ভালো লাগল তো ঢুকিয়ে ফেলল, এই আর কি। এক আঞ্চলিক ভাষাভাষীর কাছে অন্য আঞ্চলিক ভাষার বাগভঙ্গি বুঝি না বুঝি আচমকা ভালো লাগল কি চটকদার লাগল, আর অমনি আঞ্চলিক ভাষার নামে, ঢাকাইয়া ভাষার নামে ঢুকাইয়া দিলাম, এই আর কি। আমি বলব, আঞ্চলিক ভাষার নামে, ঢাকাইয়া ভাষার নামে এখানে এই কাজটিই জগাখিচুড়িসুলভ। আসলে আমি বলতে চাই, সুনির্দিষ্টভাবে ঢাকাইয়া ভাষা বলতে কোনো আঞ্চলিক অস্তিত্বই নাই। তবে এই ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় রাজধানীর বাইরে এই হচপচমুক্ত আঞ্চলিক ভাষাকে যারা কবিতায় নিয়ে আসতে চাইছেন তারা হয়তো তাদের আঞ্চলিক ভাষার একটা শুদ্ধতা দিতে পারবেন। সে তার যে আঞ্চলিক ভাষাকেই কবিতায় রূপ দিতে চেষ্টা করেন না কেন, সেটাও হয়তো তার পক্ষে হুবহু রূপ দেয়া সম্ভব নয়, তবুও তার পক্ষে যদি অনভিপ্রেত হচপচসুলভ কোনো শব্দ ঢুকানোর কায়কারবার করার কামনাবাসনা না জাগে, তখন সেখানে বাংলা কবিতার জন্য কিছু একটা হতে পারে। সেক্ষেত্রে এটা হয়ত শামীম রেজা পারবেন, জহির হাসানরা পারবেন তাদের নিজ এলাকার অঞ্চলের ভাষাকে মান্যভাষারূপে প্রয়োগ করতে। তবে সেটা আমি মনে করি না যে হুবহু পারবেন, এটা মনে হয় কবিতায় খুবই কঠিন। কেননা এখন তো আর কবিতা, যাকে আধুনিক কবিতা বলি, তার হুবহু রূপ সেই আঠারো শতকীয় কি উনিশ শতকীয় আঞ্চলিক ভাষায় চালানো সম্ভব না। এখন আধুনিক চিন্তা তো কেউ আর নিরেট আঞ্চলিক ভাষায় করেন বলেও মনে হয় না। কবিতায় আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগ একটা কঠিন ব্যাপার, এটাই মনে করি আমি। সেই ক্ষেত্রে হচপচ ভাষারই একটা পরিশীলিতরূপ থেকে যদি বাংলা কবিতার একটা নতুন দ্বার খোলে তো ভালো। এতে অন্যান্য আঞ্চলিক হোক তৎসম-তদ্ভব হোক, ওসবের মিশেলে ভাষার একটা ব্যাপ্তি ও সমৃদ্ধি ঘটে। তাতে করে যদি চান্দ্রদ্বীপি ভাষা, ঢাকাইয়া ভাষা, আঞ্চলিক ভাষা ইত্যাদি জাতীয়র সঙ্কীর্ণতা মুক্ত হয় তয় বাংলা কবিতার জন্যই শুভলক্ষণ। আপাতত এখানেই আমার কথা শেষ করছি।

ফরিদ কবির

ধন্যবাদ মাতিয়ার! আমার মনে হয়, আমরা আরো দুজনকে দুমিনিট করে বলার সুযোগ দিতে পারি। এবার আমি ডেভিড সজ্জন বিপ্লবকে অনুরোধ করছি কিছু বলার জন্য।

ডেভিড সজ্জন বিপ্লব

এখানে আমাদের বিষয় হচ্ছে, বাংলা কবিতায় আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার। বাংলা কবিতায় আঞ্চলিক ভাষা বলতে গেলে লোককবিতা বা আধুনিক চর্চাটা বাদ দিলে তিনটা প্রসঙ্গ আসে। একটা হচ্ছে, নির্দিষ্ট আঞ্চলিক ভাষায় লেখা, যাকে বলে লোকধারা, যার একটা চমৎকার ব্যবহার আছে সৈয়দ শামসুল হকের পরানের গহীন ভিতর-এ। আধুনিক লেখার বাইরে লোকধারায় বলব, ওটা নির্দিষ্ট একটা অঞ্চলের ভাষা। দ্বিতীয়ত বলবো যে, কবিতার মধ্যে আঞ্চলিক শব্দপ্রয়োগ। আরেকটা হচ্ছে, মানভাষার সাথে আঞ্চলিক শব্দপ্রয়োগ এবং আঞ্চলিক ক্রিয়াপদের ব্যবহার। এই তিনটাকে আমি এভাবে ভাগ করে দেখি। এ মুহূর্তে আঞ্চলিক শব্দপ্রয়োগ এবং আঞ্চলিক ক্রিয়াপদের ব্যবহার—এগুলো নিয়ে কথা বলা যেতে পারে। এর মধ্যে দুটো পার্থক্য আছে, কেউ হয়তো একটা নির্দিষ্ট অঞ্চলের কথ্যশব্দ এবং ক্রিয়াপদের ব্যবহারটা নিচ্ছে, আবার কেউ হয়ত মিশেলটা নিচ্ছে। যারা নব্বইয়ের শুরুতে এভাবে লেখা শুরু করেন তাদের অনেকের লেখায় আঞ্চলিক শব্দের এবং ক্রিয়াপদের ব্যবহারের পাশাপাশি স্ল্যাং বা ভদ্রলোকের ভাষায় যা অশ্রাব্য এমন শব্দ পাশাপাশি চলে আসছিল। ওই সময় এসব নিয়ে বিতর্কও ছিল। একটু বলে রাখা ভালো, আশির দশক থেকে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার একটা ধুয়া ওঠে। আজকে যে মিশ্রভাষা বা আঞ্চলিক ভাষার কবিতা নিয়ে কথা হচ্ছে, তা কিন্তু ওই তথাকথিত ‘লিটলম্যাগের’ বাইরের কাগজ থেকে নব্বই দশকের প্রথম দিকেই শুরু হয়। যেটা প্রথমে দু’তিনজনের চর্চাতেই সীমাবদ্ধ ছিল, আমি নৈরাজ্য প্রসঙ্গে পরে আসছি, এখন দেখছি এই আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে রীতিমত একটা তুলকালাম কাণ্ড। একটা নির্দিষ্ট অঞ্চলের যে ভাষা ব্যবহার করতেছে সেটাকে যদি আঞ্চলিক ভাষা না বলি, সেক্ষেত্রে আমরা সেগুলোকে কী বলব? তার প্রকৃতিই তো আলাদা। তাহলে কি আঞ্চলিক ভাষা বলতে এই অর্থেই ব্যবহার করা হচ্ছে সাধারণত ওই নির্দিষ্ট অঞ্চল বোঝানোর জন্য বা আমরা অন্য শব্দ ব্যবহার করতে পারতাম কিন্তু সেটা পারি না, সে জন্যে? এর মধ্যে আমাদের মধ্যে যাদের দু-তিনটা বইও আছে, তাদের আগের কবিতা যদি দেখি দেখবো, সেখানে এই আঞ্চলিকতা বা মিশেলভাষা নাই, সেগুলো দেখা যাবে যে আমাদের মানভাষায় লেখা। রাতারাতি, যেন একটা প্ল্যান করে তারা হুটহাট আঞ্চলিক ভাষায় লেখা শুরু করলেন। হুটপাট করে এই লেখাগুলো নিয়ে বইও বের করলেন। যে বইয়ে তাদের আগের মানভাষার কবিতাগুলো নাই। আমি বলবো এটা সস্তা প্রচারের লোভে হয়েছে, যা রীতিমত একটা আত্মপ্রতারণা। এক্ষেত্রে দ্বিভাষিক একটা অবদান থাকতে পারে। সবচাইতে আশার বিষয় বলব বা যাই বলি, এখানে যে যেমন খুশি চর্চা তো করবেই। আমাদের তো কয়েকটা জিনিশ খেয়াল রাখতে হয়, আসলে যারা সচেতনভাবেই লেখেন সেখানে আমাদের একটা জিনিশ বোধে রাখতে হয়, ওই নির্দিষ্ট যে জনজীবন আছে, সেই জনজীবনের এটাকে বলা যেতে পারে একেবারে নিগূঢ় জীবনরস ধারণ করে বেড়ে ওঠা জীবনযাপন। প্রত্যেকটা অঞ্চলের ভাষা একটা নির্দিষ্ট জীবনরস ধারণ করে বেড়ে ওঠে। আমি যদি হুট করে এই ভাষা ব্যবহার করতে চাই তাহলে সেটা শুধু আত্মঘাতীই হয়ে যাবে না, বরং সেক্ষেত্রে তার আগেই খেয়াল রাখা উচিত সেই ভাষার উপর, ভাষার জীবনরসের ভিতর অন্তত কিছুটা কাল তার জীবনযাপন থাকতে হবে, বেড়ে উঠতে হবে। সেই ভাষার সাথে বলতে ওইসব ভাষার সাথে হতে পারে, তাতে কিছুটা মিশেল, বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষা থাকতে পারে, আঞ্চলিক ক্রিয়াপদ থাকতে পারে। আঞ্চলিক শব্দ ঢুকিয়ে দেয়া এক জিনিস, আর আঞ্চলিক ক্রিয়াপদের ব্যবহার আরেক জিনিশ। সেই ক্ষেত্রে তার যদি অবস্থিতি না থাকে, যদি সম্পৃক্ততা না থাকে তাহলে সেটা তো যথাযথ হবে না। সবচাইতে বড় কথা, সেগুলি কবিতা হচ্ছে কিনা? আমরা যে উল্টা-পাল্টা ভাষা ঢুকালাম দেখতে হবে সেটা কবিতা হয়ে উঠলো কিনা? জোর করে আসলে কিছু হবে না। আর, মানভাষা নির্ধারণ করার বিষয় নয়, মানভাষা তো আসলে হয়ে ওঠে। এই ঢাকা শহরে দেখা যায় বিভিন্ন অঞ্চলের লোক আসে, এর মধ্য থেকে যত জীবনরস আসে তা থেকে এখন সেগুলো যদি প্রয়োজনে কবিতা হয়ে ওঠে তাহলে এর বিকল্প আর কী থাকে?


দ্বিতীয় কিস্তির লিংক