হোম নির্বাচিত বাংলা কবিতায় আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার

বাংলা কবিতায় আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার

বাংলা কবিতায় আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার
549
1
প্রথম কিস্তির লিংক

দ্বিতীয় কিস্তি…


ফরিদ কবির

আমরা আরো কয়েকজন কবির বক্তব্য শুনব, তার আগে রফিক ভাইকে আবারও একটু সুযোগ দিতে চাই। জহিরকে আমরা একটু পরে সুযোগ দিচ্ছি, যেহেতু রফিক ভাইয়ের একটু তাড়া আছে, তিনি জাহাঙ্গীরনগর যাবেন। কষ্ট করে আমাদের এ বৈঠকে অংশ নেয়ায় আমি তাকে সাপ্তাহিক কাগজের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানিয়ে রাখি। উনি আসাতে আমরা খুব প্রাণিত হয়েছি। আমরা রফিক ভাইকে কিছু বলার জন্য অনুরোধ করছি।

মোহাম্মদ রফিক

এটা তো তর্ক-বিতর্কের কোনো জায়গা না। আমি ব্যক্তিগতভাবে স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি, গণতান্ত্রিকতায় বিশ্বাস করি, আমি মনে করি, সৃষ্টিশীলতার কোনো পরিমাপক যন্ত্র নেই। সুতরাং একই সময় বিভিন্ন ভাষায় লেখা হবে, বিভিন্নভাবে লেখা হবে, বিভিন্ন প্রকরণে লেখা হবে কিন্তু তারপরে কতগুলি বিষয় আমাদেরকে মনে হয় বিবেচনায় রাখলে আমাদের জন্য কাজটা করা ঠিক হবে। কোনো সৃষ্টিশীল কাজই সহজ নয়, সহজতর হওয়ার প্রশ্নও নয়, তবে আমাদের ভুলপথে না যাওয়ার একটা বা আমাদের সমস্ত শ্রম ব্যর্থ না হওয়ার একটা জায়গা থেকে যেতে পারে। আমরা কারা? আমরা কোত্থেকে এসেছি? আমরা একান্ত মধ্যবিত্ত ঘরের পোলাপান। আমরা একটা জীবনযাপন, জীবনযাত্রা, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে এসেছি। আমাদের গ্রামে খালেক ভাই ছিল আমার খুব প্রিয়জন, কৃষিকাজ করতেন। তার কাছে মানুষ হয়েছি, তার অনুষঙ্গ আমার লেখায় বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে। কিন্তু আমি যদি বলি যে আমি খালেক ভাইয়ের ভাষাচেতনা উত্তরাধিকারসূত্রে বহন করি তাহলে বুঝতে হবে আসলে আমার কোথাও একটা গণ্ডগোল রয়ে গেছে। হ্যাঁ, আমি ভাষার আঞ্চলিকতায় বিশ্বাস করি না। আমি মনে করি যে ভালো কর্ম, সৃষ্টিশীল কর্ম—সে যেখানেই হোক যেভাবেই হোক আমি আগেও বলেছি তার মূল্য আছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে কিছু তত্ত্ব, বিবেচনা, বোধ, বিশ্বাস, রাজনীতি—এর কোনোটা দিয়েই কবিতা হয় না। এইগুলি দিয়ে প্রবন্ধ হতে পারে, কিন্তু কবিতা হয় না। কবিতার জন্য সবকিছুই মেরুদণ্ডের ভিতরে পড়ে গিয়ে শ্বাস নিতে হবে। আমি মার্ক্স পড়েছি, আমি একজন মার্ক্সিস্ট, আমি মার্ক্সিস্ট কবিতা লিখতে পারব না। এবং তার প্রভাব বাংলা সাহিত্যে ভূরি ভূরি রয়েছে। বাংলা সাহিত্যে মূলত যারা মার্ক্সীয় কবি হিসেবে পরিচিত তারা মধ্যবিত্তের একটি প্রতিবাদ বা প্রতিরোধের কণ্ঠস্বরমাত্র। ওর সাথে প্রকৃত মার্ক্সিজমের কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের ওইগুলি কবিতাও হয় নি, মার্ক্সিজমও হয় নি। সুতরাং আমরা যাই বিশ্বাস করি, যে ভাষায়ই চর্চা করি, যে বোধই ধারণ করি না কেন, এটা আমাদের ভেতরে মরে গিয়ে মেরুদণ্ডের ভেতর স্থিত হবে এবং লাভা উদ্‌গিরণের মতো বেরিয়ে আসবে, শুধুমাত্র তখনই সেটা কবিতা হয়ে উঠবে। কবিতা কী? এরও কোনো মাপ নেই। পৃথিবীতে কবিতার পরিবর্তন হবে, কবিতার চেহারার পরিবর্তন হবে, চরিত্রের পরিবর্তন হবে। কবিতার কোনো নান্দনিক মানদণ্ড কখনো ছিল না, কোথাও ছিল না। তাহলে হোমার যদি কবি হন তাহলে সাফো কী? সাফো যদি কবি হন তাহলে ভার্জিল কী? ভার্জিল যদি কবি হন তাহলে কাতুলণ্ডুস কি? আমাদের দেশেও বলা যায়, যদি লালন কবি হন তাহলে রবীন্দ্রনাথ কী? কিন্তু তারা সবাই কবি এবং তারা একটা জায়গায় এক—সেটা হচ্ছে তাদের বোধ, তাদের বিশ্বাস, তাদের উচ্চারণ। ও একটা সুন্দর ভাষা ব্যবহার করেছে, আমি ওটা ভালো স্মরণ করতে পারছি না যে ওটা মাটির ভিতর থেকে বা নিজের শরীরের ভিতর থেকে উঠে এসেছে। যখন আমাদের লেখা আমাদের মেরুদণ্ড ভেদ করে বেরিয়ে আসবে তখন দেখা যাবে, বাদবাকি প্রশ্ন অবান্তর। এবং আমি নৈরাজ্য শব্দটি ব্যবহার করতে রাজি না। অনেকে নৈরাজ্যের পক্ষে কথা বলেছেন, নৈরাজ্য নয় কথাটি আসলে স্বাধীনতা। নিজেকে প্রকাশ করার নামই স্বাধীনতা এবং সেই স্বাধীনতা প্রতিটি শিল্পকর্মের জন্য দরকার, কবিতার জন্য তো আরো বেশি। আরো একটি কথা বলে আমি মোটামুটি আপনাদের কাছ থেকে বিদায় নেব। একটা জায়গায় ভের্লেন বলেছেন, বাদবাকি সব সাহিত্য, এই হচ্ছে কবিতা। সুতরাং ওই হচ্ছে কবিতা আমরা যতই অস্বীকার করি না কেন, ওই হচ্ছে কবিতা। সেইখানে পৌঁছাতে গেলে সমস্ত প্রশ্ন বিলীন হয়ে যায়। তখন ওই যে হারমান হেসের সিদ্ধার্থর বিশ্বদর্শন, একজন কবির ঘটে। আপনারা যে আমার কথা ধৈর্য ধরে শুনলেন এই জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে আপনাদের কাছ থেকে আমার বিদায় নিতে হচ্ছে। আমি আরো বসে থাকতে পারলে আনন্দিত হতাম! তুষার দাশ সবচেয়ে পরে এসেছে বহুকাল পরে দেখা হলো। সকলকে ধন্যবাদ!

ফরিদ কবির

ধন্যবাদ রফিক ভাই! আমরা আপনার বক্তব্য শুনলাম, বাংলা কবিতায় আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগ বিষয়ে বিভিন্ন মতামতও পেলাম। এবার আমরা জহির হাসানকে তার বক্তব্যের সুযোগ দিতে পারি। জহির…

জহির হাসান

দুইটা জিনিশ, একটা হচ্ছে আঞ্চলিক ভাষা, আরেকটা হচ্ছে মান ভাষা। এই দুইটাকে যদি ক্ষমতার প্রশ্নে বিপরীত শব্দজোড় হিশেবে আমি নিই, এবং দুইটার অর্থ যদি স্বীকার করি তাহলে এ প্রশ্নটা স্বাভাবিকভাবেই আসবে, মান ভাষাটা আসলো কোত্থেকে? বোধহয় ৪৭-পূর্ব বাংলায়, ইতিহাসে যেটা এখন পাকিস্তান, এই মানভাষাটাই পূর্ব বাংলার ভাষা কিংবা এটা কলকাতার ভাষা। কলকাতার ভাষা মানে যেটা মোটামুটি একটা লিখিত বইয়ের ভাষা বা তাদের একটা ভাষা আছে যেটা তাদের আঞ্চলিক ভাষা, সেখানে আঞ্চলিকতাও আছে। বিশেষ করে কলকাতার ভাষা, ’৪৭ সালে যখন দেশ ভাগ হয়ে গেল তখন পর্যন্ত পূর্ববঙ্গে যে মান ভাষাটার চর্চা চলছিল সেটা সেখানেও চলছিল। আমি এখানে আবুল মনসুর আহমদের একটা বক্তব্য পেশ করতেছি। উনার বক্তব্য এই, যে মান ভাষাটা এযাবৎ চলে আসছে বা যা আমরা বলতেছি এইটা আসলে কলকাতার ভাষা। যখন এই কলকাতার ভাষার ভিতরে সীমানা নির্ধারিত হয়ে যায়, ততদিনে বাংলাদেশেরও একটা সীমানা এসে গেছে। পাকিস্তানের একটা সীমানা ছিল। তারপরে একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে একটা সীমানা নির্ধারিত হয়।

’৪৭ পূর্ব কলকাতার ভাষা ও তার লিখিত ভাষার যে রূপটা আমরা চর্চা করছি তখন বাংলাভাষা হিশেবে, সেটাকে আমরা পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাকেন্দ্রিক মানভাষা হিসাবে নিয়েছি। ভাষা তো ডিসপ্লেসড হবেই। একেবারে কলকাতার ভাষার মতো তো আর বাংলাদেশের ভাষা হবে না। কেননা আঞ্চলিক স্থান ভেদে, ভূগোল ভেদে, ভাষাগোষ্ঠী ভেদে ভাষা তো আলাদা হবেই। তবে একটা কমন জায়গায় বোধহয় ঠিক যে ’৭১ পরবর্তী যখন সীমানা নির্ধারিত হয়ে গেল তখন আমাদের ভাষাটার উত্তরাধিকার হিশেবে কলকাতার সেই ভাষাটা, যেটা মোটামুটি ডমিনেট করত আমাদের ভাষার ওপর, সেই ভাষাটা আমাদের উত্তরাধিকার হিশেবে সেখানে নিয়ে গেছিল বোধহয় কেউ না কেউ। এই যারা সেখানে মধ্যবিত্তের সাহিত্যের চর্চা করে তারা এটা নিজের কাছে আদর করে একটা সুন্দর বোধে নিয়ে নিছিল।

কোনো ধারায় এটা চর্চার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিশেবে ভাবতে পারি, এর বাহিরে যারা ভাবতে পারছে পরবর্তী সময়ে এটা তখন সাহিত্যের চর্চা হয়ে যাবে। এই যারা সত্তর আশি বা এরকম আস্তে আস্তে একটা ভাষাগোষ্ঠী বা বিশেষ দল মানে বিশেষ করে কবিরা, যারা এই ভাষাটা নিয়ে সাহিত্যের অন্যান্যদের চেয়ে বেশিমাত্রায় চর্চা করছেন আর কি। শামসুর রাহমান যেখানে একটা আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার করছেন সেখানে আবার অন্য কেউ, যেমন আল মাহমুদও তার আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করছেন তার কবিতায়। কিন্তু যে ভাষাটা ডমিনেটর হিশেবে দেখবেন, সেখানে কিন্তু সেই মান ভাষাটাই থেকে গেছে। এইভাবে ভাষার ব্যাপারে মধ্যবিত্তের একটা ধারণা চলে আসছে যে, এইখানে যে ভাষায় তারা কথা বলছে, সেই ভাষা কিন্তু প্রচলিত সাহিত্যের ভাষাই। আর সাহিত্যের ভাষা মানেই তো একটা রেগুলার মান ভাষা।


আসলে তার তো শক্তি নাই। সে তৈরি করতে পারছে না নতুন করে মান ভাষাকে, পারমুটেশন-কম্বিনেশনে যেতে পারছে না, আর আবিষ্কার করতে পারছে না একটা ভাষাকে


image
‘ঢোঁড়াই চরিতমানস’-এর লেখক সতীনাথ ভাদুড়ী

সেখানে পরবর্তী সময়ে নব্বই দশকের শুরুতে এই আঞ্চলিক শব্দের কিছু প্রয়োগ শুরু হয়ে গেছে। আস্তে আস্তে যেটা বাড়তে থাকে কারো কারো লেখায়। তবে এখানে বলে রাখা ভালো যে, বহু আগেই এইসব আঞ্চলিক ভাষা মান ভাষার ভিতর দিয়েই কমবেশি অনেকের কবিতায় চর্চা হয়েছে। আবার থেমে গেছে। যদি আপনি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ পড়েন, কিংবা ‘নীলদর্পণ’ পড়েন, দেখবেন, সেখানেও আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগ হয়েছে। এইগুলার চর্চা বহু আগে থেকেই চলে আসছিল। যদি দেখি, সতীনাথ ভাদুড়ী, এ রকম অনেকে আছেন, যারা এ রকম আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করেছেন। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে যে, আমাদের এই ব্যবহারটা আর্কাইভাল হচ্ছে কিনা? এখানে কথা উঠতে পারে আমি মধ্যবিত্ত, ঠিক আছে সেটা মানলাম। এখন কি আমরা গবেষকদের মতো, তাদের শিষ্যদের মতো বিভিন্ন এলাকায় যেয়ে যেয়ে আঞ্চলিক ভাষা চর্চার মধ্য দিয়ে সেগুলো সংগ্রহ করব, একটা অভিধান তৈরি করব? সেখান থেকে নিয়ে নিয়ে ব্যবহার করব বা কায়দা করে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করব? হয়তোবা এ রকমই আর্কাইভাল দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আর্কাইভাল জায়গা থেকে মধ্যবিত্তরা এই ভাষার ব্যবহার করতেছে। আসলে সেটা ঠিক হবে কিনা? ভাষার সাথে যখন সেই ভালোবাসাটা থাকে না, সংবেদনশীলতা থাকে না, তখন কি আর্কাইভাল জায়গা থেকে এই শব্দগুলা ব্যবহার করি? যখন ভালোবাসার সংযোগ থাকে, যখন সংবেদনশীলতার সংযোগ থাকে, বা কোনো একটা বিষয়ের প্রতি যখন সেটা আর্কাইভাল থাকে না, তখন সেটা তার আর কিন্তু সখের জায়গায় থাকে না। যেমন ‘ঢোঁড়াই চরিতমানস’-এ সতীনাথ ভাদুড়ী ভাষার যে রকম ব্যবহার করেছেন, আমার মনে হয় না, তিনি সে ভাষার ব্যবহার আর্কাইভাল জায়গা থেকে করেছেন। সেখানে আমার মনে হয় যে অনেক বেশি সংবেদনশীলতার জায়গা থেকে, যদিও তিনি একজন ব্যারিস্টার মানুষ এবং উপন্যাস লিখতে গেছেন নিজের মধ্যবিত্ত জীবন থেকে, কিন্তু আমার মনে হয় যে উপন্যাসটা পড়ে আমি অনেক বেশি ইম্প্রেসড হয়েছিলাম।

সাহিত্যের এই যে সীমানা, এটা কিন্তু নির্ধারণ করে দেয়া যাবে না, কে আসলে লিখতে পারবে আঞ্চলিক ভাষায় আর কে লিখতে পারবে না। কিংবা কে আসলে ওই মধ্যবিত্তের মধ্যে জীবনযাপন করছে। তাই বলে সে লিখতে পারবে না, এটা আমি বিশ্বাস করি না। যে কেউ, যদি তার সংবেদনশীলতা, ভালোবাসা থাকে, সে যদি ডুবে যেতে পারে, সে-ই লিখতে পারবে, এছাড়া কেউ পারবে না, এ রকম তো বলা যাবে না। রাইসু যখন লিখল ‘কালিদাসের লগে মেগ দেখতেছি’—সেটা আমার বন্ধু বলে আমি কোট করি নি কোনো জায়গায়। এই যে ‘মেগ’—যার প্রচলিত ব্যবহার হচ্ছে ‘মেঘ’, ম এ-কার ঘ মেঘ, আর ম এ-কার গ মেগ—এই দুইটা শব্দ, এখানে দুইটা শব্দের ডিসটেন্সটা কোথায়? একজন বলতেছে ‘আমি মেঘ দেখতেছি’ আর ম একার গ মেগ যখন হয়, তখন দুইটা শব্দের অর্থ কিন্তু একই থাকে। হয়তো লোক, যারা এই দুইটা শব্দে কথা বলছে, সেই লোকগুলা আলাদা। যে মেঘ বলতেছে সে হয়তো আলাদা, যে মেগ বলতেছে সেও হয়তো আলাদা। সেখানে আমরা মধ্যবিত্তের, যারা ভাষার চর্চা করছি, সেই জায়গাটায় হয়তো রাইসু আঘাত করতে চাইছে, সেই জায়গায় নিয়ে যেতে চাইছে। কবিদের যেটা প্রথম বই, সেই কবিতার বইয়ে তো সে সুন্দর কবিতা দিয়েই শুরু করে। আমরা দেখি যে রাইসু তার প্রথম কবিতায় ‘চোদাচুদি’ এই ধরনের শব্দের ব্যবহার করেছে, যেটা বইয়ের প্রথম কবিতাটিতে সে প্রয়োগ করেছে। হয়তো এইটা ওর একটা রাজনীতি, আমার বিশ্বাস আর কি। তাও জানি না, কী কারণে সে ওটা করল? এইটা করেছে, মধ্যবিত্ত এই ভাষাটার ওপর রিলেটেড, এই জায়গাটা থেকে, কিংবা এই রাজনীতির জায়গা থেকে ব্যবহার করেছে। মধ্যবিত্ত যেখানে আঁকড়ে ধরে, মনে হয় এই জায়গাটা ছাড়া তার জীবনে আর কিছু নেই। ভাষাকে কিভাবে যেন পাথর বানিয়ে ফেলেছে এই মধ্যবিত্তটা। সেই পাথুরে জীবন থেকে সে হয়তো একটু পিঠটান দিতে চাইছে, ধাক্কা দিতে চাইছে, তার এই জায়গাটা তেমনি কিছু একটা আর কি। এই মধ্যবিত্তটাকে একটু বোঝানো, একটু সচেতন করে দেওয়া আর কি। কথা হলো যে রাইসু তো সামাজিক বিপ্লব বা ওরকম কিছু করতে যাচ্ছে না। মধ্যবিত্তের অনেকে, বা একজন গরিব মানুষ, যারা ম এ-কার গ বলছে, আর যারা নাকি পয়সাওয়ালা কিংবা ক্যাপিটালিস্ট, বা যারা নাকি পোলিশ মধ্যবিত্ত সে ম এ-কার ঘ বলবে—এ রকম না বোধ হয় বিষয়টা। বিষয়টা হচ্ছে, এটা ভাষার জায়গা থেকে শুধুমাত্র হয়েছে আমার মনে হয় না, ভাষার এই ব্যবহার নিয়ে ফরিদ ভাইয়ের সাথে একদিন তর্ক হলো। ফরিদ ভাই বলল যে, ‘দেখ, ক্ষমতা হচ্ছে দুই ধরনের—একটা হচ্ছে জ্ঞানগত ক্ষমতা, আরেকটা হচ্ছে সম্পদ থেকে অর্জিত ক্ষমতা।’ এখন একটা মধ্যবিত্ত শ্রেণি, ধরা যাক তাদের পয়সা আছে, মনে করা যাক তার একটা ভালো ক্যাপিটাল আছে। সে ম একার গ দিয়ে বলছে, আবার যে তার পয়সা নাই সে একেবারে গরিব মানুষ, সেও কিন্তু একই ভাষাগোষ্ঠীর ভেতরে ম একার গ বলছে, সেও বড়লোক, আরেকজন দরিদ্র, কিন্তু সে ম এ-কার গ বলছে। একটা বিষয়, যখন কেউ মনে করেন যে, এই আঞ্চলিক ভাষা যখন এক হইছিল, যে স্বাধীনতা দিয়ে যাবে, তখন সেটা একটা মান ভাষায় চলে যেতে পারে। তাতে কী এসে যায়? আমার তো মনে হয় এখানে যে হেজিমনিটা আছে, এইটা বোধ হয় মূল ব্যাপার। হেজিমনিটা রাইসু বোধহয় ওই ভাষার ভেতর দিয়ে দেখাতে চাইছে। ওই হেজিমনিটা আউট করতে চাইছে বা আমরা যখন এ রকম চেষ্টা করতেছি। আমরা প্রথম দিকেই চেষ্টা করছি এরকম করা যায় কিনা? এই হেজিমনিটা ধরা আর কি। এই হেজিমনিটা যারা ধরে না, শুধু মান ভাষার পক্ষ নিয়ে বলে যাবে, সেটা তো হতে পারে না। কারণ এই হেজিমনিটা ট্রেসআউট করতে হবে, এটাকে রাজনৈতিকভাবে দেখতে হবে। আমি মনে করি, এ রকমভাবে দেখাটা খুবই জরুরি। শুধু ভাষা দিয়ে কোনো শ্রেণিগত অবস্থান পরিবর্তন করা যায় না। এই হেজিমনি ভাষাগত অবস্থানই সনাক্ত করে না, তাকে বদলেও দেয়। সেটা আসলে আমাদের সচেতনতার ফল, নান্দনিকতার দিক থেকে দেখতে গেলে একটা মোচড় দেওয়া আর কি। এ রকম একটা সাবধান করে দেওয়া যে, তোমরা শক্ত হয়ে গেছ, তোমাদের মেরুদণ্ড শক্ত হয়ে গেছে, তোমরা একটু ব্যায়াম করো, ভাষার মধ্যে এইসবই চলে আসছে আর কি। এখন এই নান্দনিকতার যে চর্চা, এই চর্চার কোনো সীমারেখা নাই। মান ভাষার চর্চা করা আসলেই খুব টাফ। মানে ভাষার শুদ্ধিকরণ শিল্প হিসেবে এখন মান ভাষায় যদি বলেন, শক্তি হারাইয়া ফেলছে, আচ্ছা ভালো কথা, আসলেই শক্তি হারাইয়া ফেলছে? শিল্পপ্রকরণ চর্চায় নতুন নতুন কবি আর কোনো আবিষ্কারই করতে পারছে না। যার কারণে সে বলছে মান ভাষার শক্তি নাই, হারাইয়া গেছে। আসলে সে তার শক্তিটা বুঝে উঠতে পারছে না। আসলে তার তো শক্তি নাই। সে তৈরি করতে পারছে না নতুন করে মান ভাষাকে, পারমুটেশন-কম্বিনেশনে যেতে পারছে না, আর আবিষ্কার করতে পারছে না একটা ভাষাকে—আর কতবার বলবে, প্রকরণও শর্ট হয়ে আসছে, একই প্রকরণ বারবার ঘুরে ফিরে আসতেছে। এই প্রকরণের স্বল্পতার কারণে মনে করতেছে মান ভাষা শেষ হয়ে গেছে। আরে মান ভাষার এখনো সম্ভাবনা আছে, চালান, অসুবিধা কী? না হয় দুই ভাষাতেই লিখলেন। বরং সেখানে ভালোবাসা এবং সংবেদনশীলতাটা দুই ভাবেই ব্রেক করবে, আমি এটাই মনে করি।

ফরিদ কবির

বাংলা কবিতায় আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার বিষয়ে আমরা এতক্ষণ প্রায় সবার কথা শুনলাম। বাকি রইলেন কবি তুষার দাশ। তার কথা শোনার পর আমরা বিস্তারিত আলোচনায় যাব। কিন্তু তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানেই দেরিতে পৌঁছান, ফলে সন্দেহ হচ্ছে, ভবিষ্যতে তার নাম ‘লেট তুষার দাশ’ হয়ে যায় কিনা! বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্ন কর্পোরেট হাউজে তার নিমন্ত্রণ থাকায় তিনি মনে করেন লেট করাটা তাদের অধিকার। যাই হোক, আমি তুষার দাকে অনুরোধ করছি তার বক্তব্য দেয়ার জন্যে।

তুষার দাশ

আসলে আমার অধিকার নেই এখানে কথা বলার, কারণ আমি দেরি করেছি। অন্যান্যরা কী বলেছে সেটাও আমি শুনি নি।

ফরিদ কবির

অন্যরা কী বলেছেন সেটা আসলে আপনার শোনার দরকারও নেই। আমরা এখন চাই, আপনি এ বিষয়ে আপনার নিজের কথাটাই বলবেন। তারপর আমরা আলোচনায় যেসব প্রশ্ন উঠেছে সেসব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। বাংলা কবিতায় এখন যে আঞ্চলিক বা নাগরিক ভাষার ব্যবহার হচ্ছে, সেটাকে আপনি কীভাবে দেখছেন? এটার কোনো সম্ভাবনা বা ক্ষতিকর দিক আছে বলে কি আপনি হয়? দুটো নিয়েই বলতে পারেন, সম্ভাবনা এবং সংকট।

তুষার দাশ

shamsul-haq
‘পরানের গহীর ভিতর’ কাব্যের রচয়িতা সৈয়দ শামসুল হক

এগুলি খুব কঠিন ব্যাপার আসলে, আমার এইসব ব্যাপারে কথা বলার অধিকার কতটুকু আছে আমি জানি না! তো, মানে কবিতার ব্যাপারে যখনই কথা বলতে হবে একটা বেঠিক জায়গায় আমি ফেরত যেতে চাই। সেটা হচ্ছে, কবিতাটা কেন লিখি? বা কবিতার প্রয়োজনীয়তা বা জরুরি ব্যাপারটা আসলে কী? আমি কম্যুনিকেট করতে চাই বা যোগাযোগ করতে চাই। এখন আমি যে ভাষায় যোগাযোগ করে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করব, যে ভাষায় কথা বললে অন্যে বুঝতে পারবে সেটাতে যদি আমি থাকি সেটা আঞ্চলিক হলো কি মান ভাষা হলো এ নিয়ে প্রশ্ন করার তো কিছু দেখি না। এখন মানের ব্যাপার নিয়েও তো প্রশ্ন তোলা যায় যে, কে বলছে মান? মানটা কার নির্ধারণ করে দেয়া? এখানে আরেকটি বিষয় সামনে চলে আসছে, সেটা হচ্ছে যে, আসলে আঞ্চলিক কেন বলছি? আঞ্চলিক কি আমি অঞ্চলের ক্ষেত্রে বলছি, নাকি বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চল অর্থে বলছি। সেই অর্থে যদি আঞ্চলিক হয়ে থাকে তাহলে তো যে কোনো অঞ্চলের যে কোনো শব্দই কবিতায় উঠে আসতে পারে, সেখানে তো আমাদের বিতর্ক করার কোনো অবকাশ নাই। ব্যাপক অর্থে এ উপমহাদেশে যে বাংলাভাষী অঞ্চলটা রয়ে গেছে সেখানে বিভিন্ন শব্দ যদি উঠে আসে, সেটা যদি বাংলা শব্দ হিসেবে স্বীকৃত হয় এবং সেটার মধ্য দিয়েই যদি লোকজন যোগাযোগ করে থাকেন এবং সেটা কোনো একটা নির্দিষ্ট অঞ্চলে যদি যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে থাকে তাহলে সেটা তো বাংলা শব্দ, সেটা আমরা যে কেউ ব্যবহার করতেই পারি। তবে আমি কোন তাৎপর্যে ব্যবহার করছি সেটার ওপর সব নির্ভর করছে। আর প্রথম কথা হচ্ছে যে এখানে এই শ্রেণির বিষয়টা এসে যায় আর কি যে, ওই মান ভাষা যারা নির্ধারণ করেছেন ওরা সমাজের দাপটের শ্রেণি ছিল। তা না হলে তারা এভাবে ভাষাটা বেঁধে দেবেন কেন? ভাষা তো একটা অন্তহীন প্রবাহের মামলা, সেখানে তো বেঁধে দেয়ার কোনো মামলা নাই যে, ভাই এইটুকু চলবে, এইটুকু চলবে না। তো আমরা এখানে যে উপাদানগুলোর কথা সবাই জানি, এটা নতুন করে বলার কিছু নেই। যেমন সৈয়দ শামসুল হকের কথাই প্রথমে আসে, সেটা হচ্ছে যে উনি যে ‘পরানের গহীন ভিতর’ লিখেছেন, আমার তো মনে হয় না মান ভাষায় তাতে মানের কোনো সমস্যা হয়েছে। এবং সৈয়দ শামসুল হক থেকে রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ব্রাত্য রাইসু—এরা সবাই কমবেশি কবিতায় আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করেছেন এবং একটা উদাহরণ তৈরি করেছেন। এখন এটা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছে কিনা? আমার ভালো লেগেছে কিনা? আমি যে কোনো শব্দ ব্যবহার করি, বেসিক্যালি কম্যুনিকেশনটা যদি করে দিতে পারি, আমি যে কারণে কবিতা লিখছি, সেখানে আমি যদি কম্যুনিকেশনের কাজটা সহজ করে দিতে পারি, তবে আমার কবিতার মধ্যে ‘মেঘ’ ‘গ’ দিয়ে লিখলাম না ‘ঘ’ দিয়ে লিখলাম, ডাজন্ট ম্যাটার। আমি বুঝতে পেরেছি, ও আসলে ‘মেঘ’ বলতে চেয়েছে। কম্যুনিকেশনটা তো হলো, এখন আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার না করে বহু লোক মান ভাষা ব্যবহার করে বহু কবিতা লিখে গেছেন, আমরা পড়তে পারি নি। মানে আমি বলতে চাইছি, ওখানে কমিউনিকেশনটা হয় নি। এখন অনেকে মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবিতা নিয়ে শঙ্কিত যে এটা পড়া যায় না, এটা বোঝা যায় না, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা নিয়ে শঙ্কিত যে এটা বোঝা যায় না, রবীন্দ্রনাথের অনেক কবিতা কঠিন কবিতা, বোঝাই যাচ্ছে না। তো কম্যুনিকেশন যদি না হয়, একেবারে সাধু ভদ্রলোকদের দাপুটে ক্ষমতাশীলদের ভাষায়, মান ভাষা ব্যবহার করে সেগুলো লেখা হয়েছে, তো আমাদের সাথে যদি কম্যুনিকেশন না হয়, সেগুলোর তো কোন লাভ নেই। আমার মনে হয় যে, শ্রেণিগত দিক থেকে একদিক থেকে সংকীর্ণতাও বলা চলে বা শ্রেণিগত একটা চাপিয়ে দেয়ার ব্যাপারও বোধহয় আছে যে, আমরা এই ভদ্রলোকেরা এই ভাষা ব্যবহার করি, সুতরাং পৃথিবীর আর কেউ যদি এই ভাষায় না লেখো তাহলে কবি হতে পারবে না—হয়তো এরকম একটা এটিচ্যুড কাজ করেছে। আমি যেটা মনে করি ওখানে কিছু ব্যাকরণবিদ আছে, কিছু একাডেমিশিয়ান আছে, তাদের এটিচ্যুডটা এমন যে, বেঁধে দিয়েছি রাস্তা—ওটার ওপর দিয়ে হাঁটলে তুমি কবি, আদারওয়াইজ তুমি কবি না। এগুলা একাডেমিশিয়ানদের মামলা আর বেশি পণ্ডিত যারা, তারা হয়তো এটা করে। আমার কথা হচ্ছে যে ভাষার মধ্যে কোনো সীমাবদ্ধতা থাকবে কেন? আঞ্চলিক, অনাঞ্চলিক এই কথাগুলাই কিন্তু শ্রেণিতাত্ত্বিক কথা। এ রকম কোনো কথা নেই, ভাষা তার মতো চলবে। নদীর পানি কোনো অংশ ঘোলা কোনো অংশ পরিষ্কার, এটা আমরা দেখতে চাই না। আমার কথা হচ্ছে প্রবাহটা চলছে, আমি নদীটাকে দেখছি। আমি ভাষাটাকে দেখব, সেটা যদি আমাকে কম্যুনিকেট করে তাহলেই আমি নেব নইলে সেটা যে ভাষায়ই লেখা হোক সেটা হবে না। ব্যক্তিগতভাবে আমি এভাবেই বিষয়টা সংজ্ঞায়িত করলাম আর কি, এর বেশি আমার আর বলার নেই।

aa

আড্ডার টেবিল

ফরিদ কবির

তুষার দাশকে ধন্যবাদ তার বক্তব্যের জন্য। আমরা সবার কথাই শুনলাম। আমার মনে হয় যে আমরা পরবর্তী আলোচনাটা আরেকটু স্পেসেফিক করার জন্য কিছু সূত্র ধরিয়ে দিতে চাচ্ছি। কারণ এখানে আমরা যে আলোচনাগুলো শুনলাম তাতে কিন্তু দেখা যাচ্ছে আমরা একেকজন একেক জায়গা থেকে কথা বলেছি। আর এতে মনে হয়েছে যে, আসলে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারে সমস্যাটা কী? ওই রকম করে বললে মনে হবে আসলেই সমস্যাটা কোথায়? আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারে কোনো সমস্যা তো নেই। কিন্তু কতগুলি প্রশ্ন এখানে উঠে এসেছে, যেটার উত্তর খোঁজার চেষ্টা আমরা করতে পারি। তা না হলে এই আলোচনাগুলি বিক্ষিপ্ত হতে থাকবে এবং এখনো কিছুটা বিক্ষিপ্ত আছে। এখানে আলোচনায় এসেছে যে, মান ভাষা কেউ একজন বা একটা গোষ্ঠী নির্ধারণ করে দিয়েছে। কাজেই আমরা এটা কেন মেনে নেব? ফলে এই বিদ্রোহের কারণে আঞ্চলিক বা নাগরিক ভাষা ব্যবহার হচ্ছে কিনা? দুই নাম্বার হচ্ছে, ডেভিড সজ্জন বিপ্লব যেটা বলেছে যে, আঞ্চলিক ভাষায়—বরিশালের ভাষায় বা ঢাকায়া ভাষায় একটা কবিতা লেখা হলো সেটা একটা জিনিস, আবার যেটা মাতিয়ার বলেছে যে, হচপচ অর্থাৎ জগাখিচুড়ি বা কসমোপলিটন ভাষার যে ক্রিয়াপদ ব্যবহার করা হচ্ছে সেটা এক জিনিস। আবার কোনো অঞ্চলের স্ল্যাং যেটা ব্যবহার হচ্ছে সেটা আরেক জিনিস। অর্থাৎ স্ল্যাং কিন্তু অঞ্চলভেদে একেক রকম হয়, বরিশাইল্যা হলে একরকম হবে, নোয়াখাইল্যা হলে এক রকম হবে সিলেটি হলে এক রকম হবে, আবার চিটাগাঙের হলে আরেক রকম হবে। এই যে কবির অঞ্চলভেদে ভাষা বদলে যাচ্ছে, সেক্ষেত্রে একটা বিশৃঙ্খখলা বা নৈরাজ্য তৈরি হচ্ছে কিনা? আমরা দেখছি যে, কবিতায় যেটা আসছে সেটা কিন্তু আসলে কোনো৬ অঞ্চলের ভাষা আসছে না। এখানে আমরা যে জগাখিচুড়ি ভাষায় কথা বলি, বিশেষ করে যে ক্রিয়াপদ ব্যবহার করি, যেমন— ‘যাইতেছি’, ‘খাইতেছি, ‘করতেছি’ ইত্যাদি, আমরা কি এ ভাষাটিকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছি কিনা? আর, এটা করতে গেলে এ ধরনের ক্রিয়াপদ নিয়ে নতুন কোনো সমস্যা তৈরি হবে কিনা? কেউ কেউ বললেন যে, বর্ণনা ও প্রবন্ধের ভাষাতেও আঞ্চলিক বা নাগরিক ভাষা ব্যবহার করতে চান তারা। অনেকে করছেনও। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, একেক জন একেক রকম ক্রিয়াপদ ব্যবহার করছেন। যেমন তুষার দাশ যখন এ ধরনের ভাষা ব্যবহার করছেন তখন এক রকম হচ্ছে আবার রাইসু যখন লিখছে তখন আরেক রকম হচ্ছে। কেউ হয়তো বলছেন ‘যাইতেছি’, কেউ বলছেন ‘যাইত্যাছি’, কেউ ‘যাইতাছি’। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে যে আমরা বিভিন্ন রকমের ক্রিয়াপদ পাচ্ছি। এ অবস্থায় আমরা যদি ভবিষ্যতে আমাদের লিখিত ভাষার একটা পরিবর্তন চাই, তাহলে ভবিষ্যতে ওই ভাষাটার চেহারা কেমন হবে? মানে আমি ওই সম্ভাবনা থেকে… আমি ধরে নিচ্ছি হচ্ছে, আমরা ধরে নিচ্ছি যে আমরা ওই রকমই একটা কিছু করতে চাই যে আমরা উদ্ধার করতে চাই মান ভাষাটাকে। যেমন জহির বলল যে, মান ভাষাটা হচ্ছে কলকাতার ভাষা, যদিও আসলে তা কলকাতার ভাষা নয়, আবার টিপু যেমন বলল যে, এটা ক্ষমতাসীনদের চাপিয়ে দেয়া ভাষা, তো তর্কের খাতিরে আমরা ধরে নিলাম এ দেশের জন্য আমরা এই ‘মিশ্র’ বা ‘জগাখিচুড়ি’ ভাষাটাই বা ‘নাগরিক’ ভাষাটাই বেছে নিলাম। এ ক্ষেত্রে সম্ভাবনার পাশাপাশি কোনো সংকট তৈরি করতে পারে কিনা? আমি এ প্রশ্নটাও রাখবো যে, আমাদের শিশুরা ক্রিয়াপদ ব্যবহার করতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে পারে কিনা?

শিহাব সরকার

আসলে আমার মনে হয় আলোচনাটা একটু বিস্তৃত হয়ে গেছে। এত ভয়াবহ আলোচনা হবে আমি বুঝতে পারি নি। এখানে সাংঘাতিক একটা বিষয়, মানে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মতো একটা ব্যাপার কিন্তু এসে যাচ্ছে।

ফরিদ কবির

ধরেন যে রাষ্ট্র এই ভাষা স্বীকার করে নিল। তারপর কী হতে পারে?

শিহাব সরকার

তখন আঞ্চলিক ভাষাই একটা প্রমিত রূপ নেবে। এখন যে ভাষায় আমরা মোটামুটি কথা বলি, যেমন ‘আইছি’, ‘গেছি’, ‘খাইতেছি’, ‘বসতেছি’, ‘পড়তেছি’—এসবের একটা প্রমিত রূপ দেয়া যায়। ফরিদ, এ বিতর্কটা কিন্তু নতুন না, এটা বহু পুরনো বিতর্ক। ৫০-এর দশকের শুরুতে একটা গ্রুপ চেয়েছিল যে পূর্ববঙ্গীয় বা পূর্ব-পাকিস্তানের একটা আলাদা ভাষা করা যায় কিনা। পশ্চিমবঙ্গের যে বাংলাভাষা তার থেকে এটা পৃথক থাকবে। আমাদের জাতিসত্তা, মানে পাকিস্তানে বাংলা-জাতিসত্তাকে একটা আলাদা শেপ দেয়ার জন্য। এখন আমরা যে আলোচনা করছি, তা প্রায় সেরকমই মনে হচ্ছে। তাছাড়া, আপনারা তো বুঝবেন যে আমাদের পোশাক-পরিচ্ছদ, খাবার-দাবার, হিন্দু-মুসলিম মিলেমিশে মোটামুটি একটা আলাদা, যেটা পূর্ববঙ্গীয় সেটা কিন্তু আছে।

ফরিদ কবির

শুধু হিন্দু? খ্রিস্টান-বৌদ্ধও আছে…

শিহাব সরকার

হ্যাঁ, হ্যাঁ, এগুলো মিলিয়ে পূর্ববঙ্গীয় একটা রূপ মোটামুটি আছে আর কি। তাছাড়া, ভাষা নিয়ে একটা যুদ্ধ করেছি আমরা, একটা দেশ স্বাধীন করেছি। স্বাধীন একটা পলিটিক্যাল গ্রুপ আমরা আদায় করেছি। সেখানে আমাদের নিজেদের ভাষাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার কথা তো আমরা ভাবতেই পারি। তবে, আমার মনে হয় আজকের আলোচনার সূত্র ধরে এটা নিয়ে আরো ঘনিষ্ঠ আলোচনা হতে পারে। কারণ এই প্রশ্ন নিয়ে আমরা মাত্র ক’জন আলোচনা করছি, কিন্তু আরো তো লোকজন আছে, আরো কাউকে কাউকে এ আলোচনায় যুক্ত করা যায়। আমি মনে করি পূর্ববঙ্গীয় মানে, বাংলাদেশের ভাষার একটা আলাদা প্রাণ আছে, আলাদা একটা জোর আছে। আমাদের মুখের ভাষাই অন্যরকম। ইদানিং এটা ন্যারেশনেও আসছে যেটা আপনি বলছেন…

ফরিদ কবির

ন্যারেশানে আসছে—এটা মনে হয় মাদল বলেছে…


নানা রকম আমাদের ক্রিয়াপদ, ক্রিয়াপদই মেইন সমস্যা, নাউন তো আছেই, অন্যান্য প্রোনাউন, শব্দসমস্যা


শিহাব সরকার

এখানে আমি শুরুতে বলেছিলাম ন্যারেশানে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার হলে একটা নৈরাজ্য, আমি মিন করেছি একটা বিশৃখলা, মানে একটা বিভাজন তৈরি হবে যে, কোন অঞ্চলের ভাষা, নর্থ বেঙ্গলের, নাকি দক্ষিণবঙ্গের ভাষা…

ফরিদ কবির

মানে, বইয়ের ভাষা কী হবে?

শিহাব সরকার

হ্যাঁ, নর্থ বেঙ্গলের আঞ্চলিক ভাষা। আমি আঞ্চলিক শব্দটা বাদ দিচ্ছি। নর্থ বেঙ্গলের ভাষা, নাকি দক্ষিণবঙ্গের ভাষা, নাকি কুমিল্লা অঞ্চলের ভাষা, না, ফরিদপুরের ভাষা—কোনটা আমরা নেব?

ফরিদ কবির

হ্যাঁ, ঠিক কোনটা আমরা নেব? কীভাবে নেব…

শিহাব সরকার: আমরা হয়তো এখন একটা রাষ্ট্র-সমস্যার মধ্যে আছি। কিন্তু ৫০ বছর পরে দেখা গেল একটা ভাষা হয়ে গেছে আমাদের। অস্বাভাবিক কিছু না, এটা খুবই স্বাভাবিক। হতেই পারে, রাষ্ট্র যখন স্বাধীন… আমাদের পতাকা রয়েছে, মুদ্রা রয়েছে, আমাদের সবকিছু আলাদা। আমরা একটা স্বাধীন রাষ্ট্র, আলাদা ভাষা তো হতেই পারে। যেমন অ্যামেরিকান ইংলিশ, অস্ট্রেলিয়ান ইংলিশ, কানাডিয়ান ইংলিশ…

ফরিদ কবির

আমি তর্কের খাতিরে একটু তর্ক করি। অস্ট্রেলিয়ান বা অ্যামেরিকান ইংলিশেরও পার্টিকুলার একটা ব্যাকরণ আছে, একটা স্ট্রাকচার আছে। অর্থাৎ ওইটাও এখন ওদের জন্য প্রমিত। তার মানে আপনি তো নতুন একটা ভাষা করতে গিয়ে আসলে আরেকটা ভাষাই তৈরি করতে চাচ্ছেন। অর্থাৎ এমন একটা মান ভাষা, যে মান ভাষায় আমরা চিটাগাঙ থেকে এসে, নোয়াখালি থেকে এসে, বরিশাল থেকে এসে ওই ভাষায় কথা বলব। নইলে কম্যুনিকেট করব কীভাবে?

শিহাব সরকার

চাটগাঁয়ের ভাষা না, আবার কুমিল্লার ভাষাও না, বাংলাদেশের ভাষা…

ফরিদ কবির

হ্যাঁ, বাংলাদেশের ভাষা। ওই ভাষাটাতে যে আমরা কথা বলব, এই ভাষাটা কে তৈরি করবে? আপনি যদি তৈরি করেন তাইলে আমি আপত্তি করব, কারণ আমার ওখানে প্রভাব থাকতে হবে, কারণ আমি চিটাগাঙের লোক। আমি তো আপনাকে আপনার ভাষার প্রভাব বেশি থাকবে এটা হতে দেব না। আমি এই প্রশ্নগুলো সামনে আনছি আর কি। বা এক সময় যশোরবাসীরা বলবে যে শব্দটা হবে ‘খাতি’, ‘খেতে’ হবে না, এটা ‘খাতি’ই হতে হবে। তো এভাবে আমরা একটা প্রমিত জায়গায় যেতে পারবো কিনা? নাকি বিশৃখলা শুরু হবে…

শিহাব সরকার

ফরিদ, আমি আমার বক্তব্যটা শেষ করে দিয়ে উঠে যাই। নানা রকম আমাদের ক্রিয়াপদ, ক্রিয়াপদই মেইন সমস্যা, নাউন তো আছেই, অন্যান্য প্রোনাউন, শব্দসমস্যা। অদূর ভবিষ্যতে এটা নিয়ে কথাবার্তা হতে পারে, কারণ এটা খুবই স্পর্শকাতর ব্যাপার। এবং ৫০ বছর থেকে এটা নিয়ে মেলা ঠাট্টা-ঝগড়া হচ্ছে। এবং এটা নিয়ে আমরা কি আরেকটা ঝগড়া বাধায়া দেব, নাকি আলোচনাটা প্রশমিত করব? আর কবিতায় তো শেষ বলে কিছু নাই। আচ্ছা কবিতার ভাষায় আসি। কবিতায় কিন্তু শেষ বলে কিছু নাই, নৈরাজ্য বলে কিছু নাই। আমি নৈরাজ্য বলেছিলাম, স্বাধীন অর্থে…

ফরিদ কবির

হ্যাঁ, এই ব্যাপারে তো কোনো সন্দেহ নাই।

শিহাব সরকার

হ্যাঁ, আর ভাষা তো শুধু সাহিত্য না, অনেক কিছু…

ফরিদ কবির

আমার আসলে এই প্রশ্নটাই ছিল যে, আমরা কি ভাষা হিসেবে এটাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার দিকে নিয়ে যেতে চাই, নাকি এটা একটা জাস্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষা…

শিহাব সরকার

হ্যাঁ, তুমি যদিও বলেছ—‘কবিতায় আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার’। তো সেটা একটা ছোট্ট গণ্ডি, মোটামুটি সাহিত্যে এর ব্যবহার নিয়েই আলোচনাটা করা যায়। কিন্তু এটার, ভাষার যে একটা চরিত্র আছে, আঞ্চলিকতা আছে সেটার জন্য তো সংবাদপত্র আছে, জ্ঞানবিজ্ঞানের বই, একাডেমি… সবকিছু মিলিয়ে একটা বৃহত্তর পার্সপেক্টিভ আছে। আজকে কারো কারো আলোচনায় একটা স্ফুলিঙ্গ আমরা জানতে পারলাম। পরে এটা নিয়ে আরো নানা রকম আলোচনা হতে পারে।

 

শেষ কিস্তির লিংক