হোম পুনর্মুদ্রণ গদ্য বদলে যাওয়া গান

বদলে যাওয়া গান

বদলে যাওয়া গান
532
0

মানুষের জীবন প্রতিমুহূর্তে যেমন বদলে যেতে থাকে তেমনি ভিন্ন-ভিন্ন সময়ে জীবনের অভিঘাতে শিল্পের আস্বাদনও বদলে যায়। এই বদলে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে, পূর্ববর্তী কোনো আস্বাদন অসম্পূর্ণ ছিল। রবীন্দ্রনাথের বেশকিছু গান রয়েছে, যে গানগুলোর রচনাকালীন বা রচনা-পরবর্তী কিছু ঘটনা বা তথ্য গানগুলোর আস্বাদনকে বদলে দিচ্ছে। শিল্প আস্বাদনকালে সৃষ্টিকালীন ইতিহাস দিয়ে অধিকৃত হয়ে থাকাটা রবীন্দ্রনাথ সমীচীন মনে করেন নি। আমরা যদি আস্বাদনকালে গানের ইতিহাসকে সম্পৃক্ত না-ও করি, তবুও বদলে যেতে পারে তাঁর গান। শিল্পসৃষ্টিকালীন বা সৃষ্টিপরবর্তী ঘটনাকে জড়িয়ে না নিয়েও শিল্প হিশেবে গান কী কী উপায়ে বদলে যায় সেই আলোচনা-প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে কিছু কথা বলা যেতে পারে।


রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে অন্যান্য সংগীতকারের মূল পার্থক্য হলো, রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানকে অবিকল্প রূপ দেবার চেষ্টা করেছেন।


আমরা জানি ‘সংগীত’ ন্যূনতম প্রতীকবহ একটা শিল্প। আর গান সংগীতেরই একটা বিশেষ নির্মিতি। অপরাপর শিল্পের সঙ্গে গানের মূল পার্থক্য হচ্ছে তা গায়ক-নির্ভর। ফলে গায়ক ভিন্নতায় গান এমনিতেই অল্প-বিস্তর বদলে যায়। গানের ক্ষেত্রে এটা মেনে নেওয়া হয়। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে অন্যান্য সংগীতকারের মূল পার্থক্য হলো, রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানকে অবিকল্প রূপ দেবার চেষ্টা করেছেন। এবং সেই রূপটি যাতে বজায় থাকে তার জন্যে বিস্তর অনুনয়-অনুরোধ-আক্ষেপ করতে হয়েছে তাঁকে। এবং রবীন্দ্রসংগীতের সুর বজায় রাখার ব্যাপারে তাঁর গভীর উদ্বেগ ছিল। তাছাড়া, সংগীতকার হিশেবে রবীন্দ্রসংগীতের গায়ক-নির্ভরতা তাঁকে কতটা অসহায় করেছিল, তাও আমরা জানি।

রবীন্দ্রনাথ কখনো সুরে কথা বসিয়েছেন, কখনো-বা কথা আগে এসেছে, সুরটি এসেছে পরে। গানের কথাকে আমরা আমাদের ভাষিক সীমানায় পাই, অনুধাবনকেও চিহ্নিত করতে পারি, শব্দ দিয়ে এর প্রতীকীকরণও সম্ভব হয় আমাদের পক্ষে। অথচ সুর এমন এক সাংগীতিক ধ্বনিজগৎ যা নিরর্থ করে দিতে চায় আমাদের দৈনন্দিনের সঙ্গে জড়িত শব্দসমূহকে। শব্দ আর শব্দের সীমানায় থাকে না। সুর তাকে অজানা অচেনা পথে অনুভূতিদেশে পৌঁছে দেয়; সেই পথ অনেক জমাট স্মৃতিকে বহন করে নিয়ে আসে, অনেক অজানা স্বপ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। ‘আমি’ আর ‘না-আমি’র ব্যবধান ঘুচে যায় তখন। নিজের সঙ্গে এই বিস্তৃতি নিয়ে সংলগ্নতায় গানই আমাদের নিয়ে যেতে পারে।

গান নিয়ে যথাযথ ও সার্থক কিছু উল্লেখের পথে প্রধান অন্তরায়—গানকে আমরা চোখ মেলে তাকিয়ে দেখতে পাই না। আবার, বিরোধের মতো শোনালেও, গান বিষয়ে যেকোনো কিছু বলা সহজ হয়ে যায়, কারণ গানকে আমরা চোখ মেলে তাকিয়ে দেখতে পাই, এমনকি চোখ বন্ধ করেও যদি তাকাই, তবুও দেখি। গান বিচার-বিশ্লেষণ করতে গেলে তো বটেই, তা আস্বাদন করতে গেলেও এর বিশেষ ধরনের পাঠ আমরা গ্রহণ করে থাকি। এই ‘বিশেষ ধরনের’ গৃহীত পাঠটি, যারা  গানকে দেখতে পাই বা গানকে দেখতে পাই না, তাদের কাছে ভিন্ন-ভিন্নরকম হয়ে থাকে। কবিতার সঙ্গে যদি গানের তুলনা করি, তবে একটি তুলনা এভাবে আসতে পারে যে, লিখিত একটি কবিতাকে যে-কেউ হাত দিয়ে স্পর্শ করতে পারে, শতবর্ষ পরও নির্দিষ্ট ওই কবিতার শরীর পাল্টায় না; কিন্তু কবিতা কিংবা কবিতা নয় এমন কিছুকে যখন সুর দেওয়া হয়, যখন তা গান হয়ে ওঠে, তখন যে-কেউ সেই গানকে শোনাতে পারে। সে-ক্ষেত্রে গানের বাণী নির্দিষ্ট হলেও, সুরটা নির্দিষ্টভাবে বজায় রাখতে অনুনয় করা হলেও, গায়ক কিন্তু নির্দিষ্ট নয়। অর্থাৎ গানের শরীর পাল্টাচ্ছে, গানের স্বভাব পাল্টাচ্ছে, কেবল বজায় থাকছে গানের কথাটুকু, যা কি-না গান নয়।

একটি গানের জন্য একজন গায়ক নির্দিষ্ট না হওয়ায় (এমনটি নির্দিষ্ট হওয়া জরুরি নয়, এমনকি স্বাভাবিকও মনে হয় না), রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানের সুর বজায় রাখার মিনতি করে চূড়ান্ত কোনো সাফল্য বোধ করি অর্জন করতে চান নি। তাঁর গানের স্বভাবটুকু বজায় রাখার যেন চেষ্টা করা হয়, সেই লক্ষ্যেই মিনতি করেছিলেন। আমাদের সার্থক সংগীত-শিক্ষা নেই, আন্তরিকতারও অভাব রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের সময়েও যথাযোগ্য সংগীত-শিক্ষা ও আন্তরিকতায় ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। তিনি শেষ বয়সে এসে নিজের গানকে নিজের বলে চিনে নিতে বিব্রত হয়েছিলেন। তাঁর মনে হয়েছিল, কথাটাই বুঝি-বা তাঁর নিজের, কিন্তু সুরটা নয়।


রবীন্দ্রনাথের জীবিতকালে তাঁর গানের এই বিকৃতির বিষয়টি ততটা মর্মান্তিক না-ও শোনাতে পারে, কারণ এই বিকারের সঙ্গে রবীন্দ্রসংগীতের ব্যাপক প্রসারের একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।


গায়ক যতই আন্তরিক হোন না কেন, তিনি কবিকে যতই বুঝতে চান, সত্যকে যদি স্বীকার করি, তবে গায়ক-ভিন্নতায় গানের স্ব-ভাব কিন্তু পাল্টাবেই। বিভিন্ন কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গানের যে রূপায়ণ, তা রবীন্দ্রনাথের কাছে, তাঁর নিজের গান সম্পর্কে নিজের যে ধারণা—তার কাছাকাছি স্বভাবের হতে পারে কিংবা তা থেকে অনেক দূরেও সরে যেতে পারে। গায়ক তাঁর চিন্তাশীলতা ও ক্ষমতা দিয়ে রবীন্দ্রনাথের গানের ধারণায় পৌঁছতে না-পারায় রবীন্দ্রনাথের সময় রবীন্দ্রনাথের গানের যে মর্মান্তিক বিকার দেখা দিয়েছিল তা আজও মর্মান্তিক শোনাতে পারে। রবীন্দ্রনাথের জীবিতকালে তাঁর গানের এই বিকৃতির বিষয়টি ততটা মর্মান্তিক না-ও শোনাতে পারে, কারণ এই বিকারের সঙ্গে রবীন্দ্রসংগীতের ব্যাপক প্রসারের একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।

আমরা জানি, সমানদৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন রসগ্রাহীদের দেখার চোখগুলো আলাদা হয়ে থাকে। কারণ চোখ যখন দেখে না, তখন তার সঙ্গে মনের (মতান্তরে মস্তিষ্কের) সম্পর্ক থাকলেও সকল ক্ষেত্রে ফলাফল সমান: ‘না-দেখা’। কিন্তু চোখেরা যখন দেখতে পায়, তা যদি রসিকের হয়, এবং ভিন্ন-ভিন্নজনের তবে তার ফলাফল হবে ‘বিভিন্নভাবে দেখা’। একইভাবে প্রকাশিত একটি গানকে ভিন্ন-ভিন্নভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভিন্ন-ভিন্নভাবে প্রকাশিত একটি গানকে যারা আস্বাদন করছেন, তাঁদের আস্বাদন করার ক্ষমতা পরস্পর সমান রয়েছে বলে যদি মেনে নিই, তবুও কি আস্বাদিত গানটি সমান হয়? যখন একই কথাবিশিষ্ট রবীন্দ্রনাথের গানকে আমরা বিভিন্ন গায়কীতে ভিন্ন-ভিন্ন সুরে পাই তখন কি তা ‘একটি গান’ হয়ে থাকে! তাকে কি নির্দিষ্ট-কথা-বিশিষ্ট ভিন্ন-ভিন্ন গান হিশেবে আমরা চিনে নিতে পারি?

তা হলে রবীন্দ্রনাথের গানের সুনির্দিষ্ট রূপকার কে হবেন? রবীন্দ্রনাথ নিজেই, নাকি সেই গান ব্যক্তিগত ধারণায় বিভিন্ন রূপে রয়ে যাবে! যদিও রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে রবীন্দ্রনাথের খুব বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না—স্বগত নিরালায় কিংবা নাওয়ার ঘরে গলাছেড়ে আমাদের গাইতে বলেছিলেন তিনি। তবুও, ব্যাপারটা অত সহজ কাজ ছিল না আমাদের পক্ষে, যত সহজে তিনি বলেছিলেন! আর তাই, মেয়েকে অপাত্রে দিলে যেমন সবকিছু সইতে হয়, পরের মুখে তাঁর গান নষ্ট হবার কষ্টটুকু সেইরকম দুঃসহ হয়ে উঠেছিল তাঁর কাছে। নিজের গানের অবিকল্পরূপের ধারণা, অবিকল্প রূপ দেবার চেষ্টা এবং বিশেষত্ব বজায় রেখে তাঁর গান শেখানোর যে সানুনয় অনুরোধ তিনি বুলাবাবুকে (গীতালির অন্যতম উদ্যোক্তা প্রফুল চন্দ্র মহালনবীশকে) করেছিলেন, তা তাঁর গান নিয়ে বিশেষ আশার ইঙ্গিত বহন করে।

অন্যদিকে, রবীন্দ্রনাথের গানের চেহারা কীরকম হবে, গানের নিহিত কাব্যাংশ কোথায় খুঁজব সেটাও বিবেচনার বিষয়। কারণ, গীতবিতান-এ একটি গানের লিখিতরূপ এবং সেই গানটি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে যেভাবে গাওয়া হচ্ছে, তার লিখিতরূপ (যা স্বরবিতানে নির্দেশিত) শুনতে একরকম নয়। ফলে তাদের আবহ ভিন্ন-ভিন্ন। স্বরবিতানে যৌক্তিক পুনরুক্তি দিয়ে গানকে সম্ভাবনার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, বাণী আর স্বরবিন্যাসের সচেতনতা দিয়ে। যেমন, ‘তিমির অবগুণ্ঠনে’ গানটিতে আমরা তমাল বনের ’মর্মর’-এর প্রতিধ্বনি ‘মরি মরি’তে শুনতে পাই, নদীর জলের ‘ঝর্ঝরে’ও ‘ঝরি ঝরি’ পুনর্ব্যক্ত হয় কিংবা ‘কে তুমি’ শব্দের সুরবিন্যাসের বিভিন্নতা ও ‘কে তুমি’  শব্দের পুনরুক্তি গানটিকে ব্যঞ্জনা-ঋদ্ধ করে। গীতবিতান-এ গানটির লিখিত-বাণীতে আমরা উল্লিখিত বিষয়গুলি পাই না। সুরবিন্যাসের ধরনে কোনো গানের বাণীর অভিপ্রায় অনুযায়ী আমরা গাইতে পারি না কখনো-বা। যেমন: ‘আমার/সকল দুখের/প্রদীপ জ্বেলে/দিবস গেলে/করব নিবেদন—’[পূজা পর্যায়: ২০১ নং গান] গানটিকে অধিকাংশ গায়ক-গায়িকা গেয়ে থাকেন এই বিরতি-প্রয়াসে: ‘আমার সকল দুঃখের প্রদীপ/জ্বেলে দিবস/গেলে করব/নিবেদন’। গাইবার সময় অনভিপ্রেত বিরতির ফলে গানটির লক্ষ্য-ভ্রষ্ট হচ্ছে। আর তাই, গান গাইবার সময় গানের অর্থকে বজায় রাখতে গিয়ে কোথাও-বা অনিবার্য বিরতি নির্দেশকের প্রয়োজন হয়। এই বিরতির নির্দেশনা হিশেবে স্বরলিপিতে ওই শব্দটির পর ‘কমা’ চিহ্ন ব্যবহার করলে গানের মহিমা বজায় থাকতে পারে; পুরাতন পত্রিকায় প্রকাশিত স্বরলিপিতে কাঙ্গালীচরণ সেন, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, ইন্দিরা দেবীরা মাঝে মাঝে কমা ব্যবহার করতেন। এই বিরামচিহ্নটি প্রচলিত স্বরবিতানে না থাকায় ‘পথের শেষ কোথায়’ গানটিতে ‘মনে ভয়/ লাগে সেই’ গেয়ে থাকেন গায়কগণ সুরের বিন্যাসগত কারণে। ‘মনে/ ভয় লাগে সেই’ এমনই হবার কথা উচ্চারণ প্রয়াস। স্বরলিপিতে ‘মনে’ শব্দটির পর কমা ব্যবহার করলে বিভ্রান্তি এড়ানো যেত। কখনো-বা একক প্রয়াসে উচ্চারণ করতে হয় এমন শব্দের মধ্যবর্তী অংশের সুরের উচ্চনিচতায় অন্বিষ্ট কাব্যবস্তু বিপত্তির মুখে পড়ছে। যেমন, নৃত্যনাট্য চণ্ডালিকায় চণ্ডালিনী ‘প্রকৃতি’ আত্মস্বরূপ চিনে নেবার পরম মুহূর্তে যখন উচ্চারণ করছে ‘মরণের সিংহদ্বার ওই খুলছে’—তখন স্বরবিন্যাসের ধরনে অধিকাংশ গায়ক-গায়িকা যা গাইছেন, তাতে মনে হতে পারে ‘মরণের সিংহ’ বুঝি-বা ‘দ্বার’ খুলছে। স্বরবিন্যাস এইরকম:

I র্সা   র্সর্জ্ঞা  র্জ্ঞা  র্জ্ঞর্ঋা । র্জ্ঞর্ঋা  -া  র্সা  -া   I  র্সা  -র্জ্ঞা র্জ্ঞা -র্ঋা । র্জ্ঞর্ঋা  -া  র্সা  -া I
I ম     র০   ণে    র০  । সিং  ০  হ   ০    I দ্বা   র  ও    ই   । খু   ল্    ছে  ০ I

[নিম্নরেখা দ্বারা মিড় নির্দেশ করা হচ্ছে]

গানের ছন্দের পর্ববিভাজনে গানের বাণীর পদবিভাজন হওয়ায় এই ধরনের অর্থ-বিপত্তি ঘটছে, প্রাথমিক স্বরলিপিতে যেরকমভাবে ‘কমা’ ব্যবহার করা হতো, সেইরকমভাবে বিরাম-নির্দেশক ব্যবহার করলে তা ঘটতে পারতো না। তাছাড়া, গানের বাণীর অর্থ না বুঝে গান গাওয়াও এই বিপত্তিগুলোর কারণ। গীতবিতান দেখে দেখে গান গাইবার প্রবণতাও গায়ককে দূরবর্তী করেছে গানের কাছ থেকে, এমকি গান আস্বাদনকারী প্রত্যক্ষ শ্রোতার কাছ থেকে। কলকাতায় রবীন্দ্রসংগীতের বিশেষ একটি অনুষ্ঠান শোনার অভিজ্ঞতা জানিয়েছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর একটি প্রবন্ধে, যা এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে:

তবে রবীন্দ্রসংগীতের আসরে একটা জিনিস খারাপ লাগে। রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকতেও কি এটা চলত? সামনে খাতা খুলে গান করা? আট দশ লাইনের একটা গান তাও দেখে গাইতে হয়? আমি তো এমন অনেককে চিনি, যারা গায়ক নয় কিন্তু রবীন্দ্রনাথের প্রায় সব গান তাদের মুখস্থ। …সবচেয়ে অবাক হলাম ঋতু গুহকে দেখে। আজকাল কী সাঙ্ঘাতিক ভালো গাইছেন তিনি, গলায় যেন মন্দিরের কারুকার্য। একই সঙ্গে এত জোরাল ও সুরেলা গলা ইদানীংকালে আর কার? …অথচ তাকেও খাতা খুলে দেখতে হয়।১০


শৈলজারঞ্জন মজুমদার একবার শঙ্খ ঘোষের কাছে দুঃখ করেছিলেন, শান্তিনিকেতনের সংগীত শিক্ষার্থীদের একাগ্রতার অভাব দেখে, নিষ্ঠার ঘাটতি দেখে।


সুনীল তাঁর এ-জাতীয় গান-আস্বাদনের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এভাবে:

“এই সব গায়িকাদের আমি সাবধান করে দিচ্ছি। এরপরে, কোনো অনুষ্ঠানে যখন তাঁদের কেউ গান গাইতে যাবেন, গেটের কাছে গাড়ি থেকে নামবার সময়েই খোঁচা খোঁচা চুল, ঢ্যাঙা, মুখে বসন্তের দাগ, মিশমিশে কালো একজন গুণ্ডা মতন লোক তাঁর হাত থেকে গানের খাতাটা নিয়ে দৌড়ে পালাবে। সেই লোকটা আমি।”১১

রবীন্দ্রনাথ চেনা শব্দে অচেনা আবহ নির্মাণ করে গেছেন, ফলে তাঁর গানে ‘মরণের সিংহ’ ‘দ্বার’ খুলতেই পারে—যাকে আমরা চণ্ডালিকার গানের সুর-মাত্রাবিন্যাসের বিপত্তিজনিত অর্থভেদ হিশেবে চিহ্নিত করেছিলাম। এর ব্যতিক্রম চিন্তা করার মতো সতর্ক সবসময় আমরা থাকতে পারি না। তাই এই ধরনের বিপত্তিগুলো এড়ানো খুব কঠিন। ফলে, অনিবার্যভাবে বদলে যাওয়া গানের কাব্যবস্তুর অন্বেষণে গীতবিতান এবং স্বরবিতান-এর বাণীবিন্যাসের সদর্থক বিবেচনা করব আমরা। আর বাণী যেমন ভাষাবাহী, সুরও তেমন ভাষাবাহী—যে-ভাষা গানের বাণীকে প্রাত্যহিকতার সংকীর্ণতা থেকে মুক্তি দেয়, ‘আকাশের জিনিস’ করে তোলে।

উপরিউক্ত আলোচনায় আমরা দেখতে পাচ্ছি গান বদলে যাচ্ছে বিভিন্নভাবে, সবগুলো ক্ষেত্রেই যে বদলে যাওয়াটাকে অনিবার্য বলব, তা নয়। রবীন্দ্রসংগীত শিক্ষা ও সাধনায় শিল্পীদের একাগ্রতা ও মনোবৃত্তির বদল না-হওয়া গান-বদলে যাওয়ার নিবার্য কারণগুলোর অন্যতম। শৈলজারঞ্জন মজুমদার একবার শঙ্খ ঘোষের কাছে দুঃখ করেছিলেন, শান্তিনিকেতনের সংগীত শিক্ষার্থীদের একাগ্রতার অভাব দেখে, নিষ্ঠার ঘাটতি দেখে।১২ এ-কালের সংগীত-শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের আচরণে খুব বেশি শুভ পরিবর্তন হয়েছে বলা যায় না। ফলে রবীন্দ্রনাথের গানকে রবীন্দ্রনাথের গানের মহিমায় দেখতে চান এমন শিক্ষার্থীর অভাব রয়েছে। অন্যদিকে, শিল্পীদের রয়েছে শিক্ষাগ্রহণের আগেই সভাশোভন সজ্জা নেবার আগ্রহ। তাই রবীন্দ্রসংগীতকে ও পূর্ণায়তন রবীন্দ্রনাথকে বুঝবার চেষ্টা দুর্লক্ষ। আবার, সংগীত-সাধকদের নিশ্চয়ই কেউ রয়েছেন যাঁরা রবীন্দ্রগানের প্রকাশের ‘আলোকবর্তিকা’ হতে পারতেন; অথচ আমাদের অনায়াসে পূরণ হওয়া সসীম-লক্ষ্য, তাঁদের সংগোপনতা ভঙ্গ করতে পারে নি। আমরা তাঁদের আলোক থেকে বঞ্চিত হয়েছি। কার কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান আত্মপ্রকাশ করছে তা নিয়ে সতর্কতার পাশাপাশি আমাদের বিবেচনা করা দরকার, নিছক স্বরলিপি-পরম্পরা দিয়ে তাঁর গানকে স্বমহিমায় পেতে পারি কি-না।

‘স্বরলিপিতে গানের কাঠামো রয়েছে’—এই যুক্তিতে (যেহেতু কাঠামো রয়েছে, গানটি নয়) কেউ কেউ গানকে খুঁজছেন স্বরলিপির বাইরে। অন্যদিকে, কেউ কেউ মনে করছেন, রবীন্দ্রনাথের গানের যে ধারণা, তা স্বরলিপিতে সেই গানের যে কাঠামো রয়েছে তা পুরোপুরি মান্য করলেই পাওয়া সম্ভব। আবার, রবীন্দ্রনাথের গানের স্বরলিপিতে গানের কাঠামোটুকুই-বা কতটুকু নির্ভুল তা নিয়ে যুক্তিতর্ক চলছে।১৩ প্রথমত, গান শুনে সঙ্গে সঙ্গে স্বরলিপি করবার দুঃসাধ্য কাজটি যাঁরা করেছেন, তাঁরা তা নির্বিশেষে কতটুকু নির্ভুলভাবে করতে পেরেছেন, সেই বিষয়ে সংশয় রয়েছে। দ্বিতীয়ত, স্বরলিপি সম্পাদনায় প্রার্থিত সতর্কতার অভাব ছিল।১৪ তৃতীয়ত, বিশ্বভারতী-অনুমোদিত স্বরলিপির বর্তমান পাঠকেই গানের বিশুদ্ধরূপ মনে করলেও, স্বরবিতান-এর পরিশিষ্টের পাঠান্তর, সুরান্তরগুলো মূল্য পেতে পারে।১৫ রবীন্দ্রনাথের জীবিতকালেও ‘মেঘের পরে মেঘ জমেছে’ গানটি তিনজন স্বরলিপিকারের কাছে পড়েছিল।১৬ এমনকি দিনেন্দ্রনাথ নিজেই ওই গানের দুইরকম স্বরলিপি করেছেন সময়ভেদে।১৭ চতুর্থত, রবীন্দ্রনাথ-শৈলজারঞ্জন-সন্‌জীদা খাতুন পরম্পরা হয়ে শেখা একটি গান (গীতবিতান-এর গ্রন্থপরিচয়) ‘প্রথম যুগের উদয় দিগঙ্গনে’র একটি অংশ ‘বহুজনতার মাঝে অপূর্ব একা’। এই ‘একা’ অংশটির স্বরলিপি অনুযায়ী সুর:

I ধা  পা  – । -া  -া  -ধপা I
I এ   কা  ০ ।  ০  ০   ০০ I ১৮

অথচ গুরুপরম্পরায় পেয়েছি এইভাবে—

I ধা  পা  -া ।-া  ধা -পধপা I
I এ   কা  ০ । ০  ০  ০০০ I


চরম বিপত্তি হচ্ছে, ‘রবীন্দ্রসংগীত-গায়কী’ বিষয়ক প্রশ্নে সকল সংগীত শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং রসবোদ্ধাগণ একমত হলেও, সেই মতামতকে ঠিক ‘উত্তর’ বলা যাবে, এমন কোনো সম্ভাবনা নেই।


প্রসঙ্গত, শৈলজারঞ্জন মজুমদার নিজেই গানটির স্বরলিপি করেছিলেন। লক্ষ করা গেল, গুরু-পরম্পরায় শেখা গানটির কোনো কোনো অংশের সুরের সঙ্গে স্বরলিপিতে চিহ্নিত সুরের কোথাও কোথাও অমিল রয়েছে। ‘চিনিলে না আমারে কী’ গানটিও তিনি সন্‌জীদা খাতুনকে নিজের করা স্বরলিপির মতো শেখান নি। ‘রূপে তোমায় ভোলাব না’-ও সেইরকম কণিকাকে দিয়ে রেকর্ডে অন্যরকম গাইয়েছেন। আবার, শৈলজারঞ্জন যতটা যত্ন করে গানের স্ব-ভাব অনুযায়ী উচ্চারণগুলি নির্দেশ করেছেন ওই গানে, তা তো সদ্‌গুরু-পরম্পরা দিয়েই বহন করে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। অর্থাৎ, স্বরলিপির হুবহু অনুসরণের সঙ্গে যথার্থ সংগীত-শিক্ষার সম্পর্ক সম্পূর্ণ নয়। ফলে রবীন্দ্রসংগীতও অনেকটা নির্ভর করছে রবীন্দ্রনাথের সংগীতচিন্তার পঠন-পাঠন-অনুসরণ, আর সদ্‌গুরু পরম্পরার ওপর; প্রথমটি দুরূহ, দ্বিতীয় ক্রমে ক্রমে আমাদের সাধ্যাতীতই বলা যায়। কারণ শান্তিনিকেতন থেকে যারা গান শিখে আসছেন, তাদের পরস্পরের সুর এবং গায়কীতেই অমিল রয়েছে। এবং স্বরলিপিকে অগ্রাহ্য করবার প্রবণতাও তাঁদের মধ্যে আমরা দেখতে পাই।১৯ চরম বিপত্তি হচ্ছে, ‘রবীন্দ্রসংগীত-গায়কী’ বিষয়ক প্রশ্নে সকল সংগীত শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং রসবোদ্ধাগণ একমত হলেও, সেই মতামতকে ঠিক ‘উত্তর’ বলা যাবে, এমন কোনো সম্ভাবনা নেই। রবীন্দ্রনাথের গানের প্রায়োগিক দিক নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে, যার উত্তর যারা দিতে পারতেন তাঁরা এখন আর জীবিত নন।২০ তাই, রবীন্দ্রসংগীতের রূপ রস চিহ্নিতকরণের সকল পদ্ধতিই এখন তর্কাতীতভাবে দাঁড়িয়ে আছে, তর্কের সম্মুখীন হয়েও। ফলে (বিরোধের মতো শোনালেও) রবীন্দ্রসংগীতের সমালোচনামাত্রই ভিন্ন-ভিন্নভাবে মূলগত হয়ে আছে। অর্থাৎ, অনুধ্যানের সংকল্প ও প্রতীকীকরণের ক্ষমতা দিয়ে রবীন্দ্রনাথের গানকে প্রশ্নাতীতভাবে নির্ণয় করা যাচ্ছে না, এর বিকাশের পথটিও চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। রবীন্দ্রনাথের হাজার দুয়েক গানের মধ্যে প্রায় শ-চারেক গান বিভিন্ন সংগীতশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগে শেখানো হচ্ছে। বাকি গানগুলোর মধ্যে যেগুলোর সুর রক্ষিত আছে, তার ভবিষ্যৎ কী হবে আমরা জানি না।

যুগ বদলের সাথে তাঁর গান বেঁচে থাকবে বলতে নিশ্চয়ই রবীন্দ্রনাথ বোঝান নি এমন যে,  গুটি-কয়েক গান স্বমহিমায় টিকে থাকবে। এত সব বিপত্তির মধ্যে তাঁর গানের বেঁচে থাকা সম্ভব কি-না তা বিবেচ্য। কারণ, যেখানে স্বরলিপি-বিগ্রহ২১, যেখানে সুনির্দিষ্ট কারো কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান আত্মপ্রকাশ করছে না, যেখানে তাঁর সংগীতচিন্তা গভীর এবং অনির্ণেয়—কথা ও সুরের সম্পর্ক নিয়ে রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছেন, ‘মত বদলিয়েছি। কতবার বদলিয়েছি তার ঠিক নেই’২২—সেখানে কেবল নিষ্ঠা দিয়ে রবীন্দ্রনাথের গানের স্বরূপ পাওয়া যাবে কি-না, সংশয় থাকতে পারে আমাদের মনে।

‘গান’ গায়কের কণ্ঠ অবলম্বন করে বেঁচে থাকে। এখানেই সংগীতকারের অসহায়ত্ব। কোনো গান যিনি কণ্ঠে ধারণ করেন এবং প্রচার করেন, তাঁর ওপরই নির্ভর করছে সেই গানের ভবিষ্যৎ। এতসব বিগ্রহ-বিপত্তির মধ্যে রবীন্দ্রনাথের গান ‘নির্ভরতা’র মধ্য দিয়েই বেঁচে থাকে। যদি ধরে নিই, তাঁর গান স্বরলিপি নির্ভর হয়ে বাঁচে—তবে সেই গানের বেঁচে থাকার অবলম্বনটি অন্তত নির্দিষ্ট: ‘স্বরলিপি’। অন্যদিকে, তাঁর গান যদি গুরু-পরম্পরায় বাঁচে, তবে মূল বিপত্তি হতে পারে ‘গুরু’ এবং তার ‘পরম্পরা’। রবীন্দ্রনাথের সংগীতচিন্তাকে অনুধাবন, স্বরলিপি থেকে গানের যথাযথ পাঠ নেওয়া, এবং সদ্‌গুরু উপরিউক্ত সকল বদলে যাওয়াকে সদর্থক করতে পারে।

 

তথ্যনির্দেশ :
১. ২০০৯ সনের একটি ঘটনা এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করব। রসবোদ্ধা খান সারওয়ার মুরশিদ বুঝতে পারছিলেন না, ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল’ গানটি তাঁকে হঠাৎ এমন প্রবলভাবে আলোড়িত করছে কেন! এর কোনো কারণ আছে কি-না কিংবা ওই গানটি সম্পর্কে বিশেষ কিছু তাঁর জানা আছে কি-না তা তিনি সন্‌জীদা খাতুনের কাছে জানতে চেয়েছিলেন। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় এ বিষয়টি আমি সন্‌জীদা খাতুনের কাছ থেকে জেনেছি।
 ২. ‘‘তোমাদের কাছে আমার মিনতি—তোমাদের গান যেন আমার গানের কাছাকাছি হয়, যেন শুনে আমিও আমার গান বলে চিনে নিতে পারি। এখন এমন হয় যে, আমার গান শুনে নিজের গান কি-না বুঝতে পারি না। মনে হয় কথাটা যেন আমার, সুরটা যেন নয়। নিজে রচনা করলুম, পরের মুখে নষ্ট হচ্ছে, এ যেন অসহ্য। মেয়েকে অপাত্রে দিলে যেমন সবকিছু সইতে হয়, এও আমার পক্ষে সেইরকম। বুলাবাবু, তোমার কাছে সানুনয় অনুরোধ—এদের একটু দরদ দিয়ে, একটু রস দিয়ে গান শিখিও—এটাই আমার গানের বিশেষত্ব। তার ওপর তোমরা যদি স্টিমরোলার চালিয়ে দাও, আমার গান চেপ্টা হয়ে যাবে। আমার গানে যাতে একটু রস থাকে, তান থাকে, দরদ থাকে ও মীড় থাকে, সেই চেষ্টা তুমি কোরো।’’—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সংগীতচিন্তা, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, কলকাতা, সংস্করণ ১৩৯৯, পৃ. ২৬২
 ৩. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সংগীতচিন্তা, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৬২
 ৪. ‘‘আমার গান যদি শিখতে চাও, নিরালায় স্বগত, নাওয়ার ঘরে কিংবা এমনি সব জায়গায় গলা ছেড়ে গাবে। আমার আকাঙ্ক্ষার দৌড় এই পর্যন্ত... এর বেশি ambition মনে নাই রাখলেম।’’—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সংগীতচিন্তা, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৬১
 ৫. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সংগীতচিন্তা, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৬২
 ৬. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বরবিতান ১৪, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, কলকাতা, ১৪০১, পৃ. ৩০-৩১
৭. ‘‘এমনকি সরলা দেবীকৃত স্বরলিপিতে লয়াঙ্ক ও স্বরের হ্রাসবৃদ্ধির নির্দেশ থাকত; সর্বসাধারণের গ্রহণক্ষমতা বিচার করে জটিলতা পরিহারের জন্যে তা বর্জন করা হয়।’’ —সন্‌জীদা খাতুন, ‘রবীন্দ্রসংগীত স্বরলিপির কথা’, সাহিত্য-কথা সংস্কৃতি-কথা, জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন, ঢাকা,  ১লা বৈশাখ ১৪১১, পৃ. ৫২
৮. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বরবিতান ৫৬, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, কলকাতা, অগ্রহায়ণ ১৩৯৯, পৃ. ৪০
৯. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বরবিতান ১৮, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, কলকাতা, ফল্গুন ১৪০১, পৃ. ১১৪ 
‘সিংহদ্বার’ শব্দটির একটি অংশ ‘সিংহ’ শব্দটি উচ্চারণ করবার পর কাহারবা তালের আবর্তন শেষ হয়ে যাচ্ছে। বাকি শব্দাংশ ‘দ্বার’ গিয়ে পড়ছে তালের পরবর্তী আবর্তনের শুরুতে সম-এ গিয়ে। ফলে গায়কদের একটা ঝোঁক থাকছে আবর্তন শেষে একটু কেটে উচ্চারণ করবার।
১০. সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, ‘রবীন্দ্র সংগীতের আসরে’, সুব্রতরুদ্র সম্পাদিত রবীন্দ্রসংগীতচিন্তা, প্রতিভাস, কলকাতা, প্রথম প্রতিভাস সংস্ককরণ জানুয়ারি ১৯৯৩, পৃ. ১২৩-১২৪
১১. সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৪
১২. ‘‘দুঃখ করলেন শৈলজারঞ্জন এবারকার শান্তিনিকেতন নিয়ে। ক’মাসের দায় নিয়ে আছেন এখানে, শেখাতে যান সকালে তিনদিন, বিকালে তিনদিন। কিন্তু ছেলেমেয়েরা যে নিয়মিত আসে এমন নয়। কোনো দিন হয়তো ভরে গেল সব, কোনো দিন ফাঁকা। উনি বলছেন, আর আচমকা আমার মনে পড়ে যাচ্ছে ‘বিসর্জন’-এর লাইন, একটু ভিন্ন অর্থে: ‘জানো কি একেলা কারে বলে?... দিতে চাই নিতে কেহ নাই!’ একদিন নাকি তবলা বাজাতে বলেছিলেন একজনকে, মুখের উপর না ছুঁড়ে দিয়ে চলে গেল সে। টাকা আর প্রচারেই গ্রাস করেছে সব, শাসনও নেই শৃঙ্খলাও না। কিন্তু কার কাছে-বা বলব, কাকে নিয়ে-বা অভিযোগ করব। এরা তো সব নিজেরই ছেলেমেয়ের মতো।’’—শঙ্খ ঘোষ, জার্নাল, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ২৫ বৈশাখ, ১৩৯২, পৃ. ১৩৮-১৩৯
১৩. ‘রবীন্দ্রসংগীতের স্বরলিপি সমস্যা’ নামের একাধিক প্রবন্ধ স্বরলিপিকে বিবেচনাযোগ্য করেছে যতটুকু, ততটুকু গ্রহণযোগ্য করে নি। শ্রী নীহারবিন্দু সেন, আলপনা রায় উপর্যুক্ত শিরোনামে প্রবন্ধ লিখেছেন। শূন্য দশকের শুরুতে অধ্যাপক সন্‌জীদা খাতুন স্বরলিপির বিবর্তন নিয়ে বিশ্বভারতীতে গবেষণা করেছেন।
১৪. স্বরলিপির সুরভেদ, পাঠভেদ, সুর-সংশোধন ইত্যাদি বিষয়গুলি আমাদের কৌতূহলী করে, কিন্তু স্বরলিপির সম্পাদক এই সকল পরিবর্তনের কারণ উল্লেখ না করায় আমাদের কৌতূহল চরিতার্থ হয় না।
১৫. এ প্রসঙ্গে স্মরণীয় ২০০২ সালে চাঁদপুরের রবীন্দ্রসংগীত সম্মেলনের একবিংশ বার্ষিক অধিবেশনে ‘সংকোচের বিহ্বলতা’ গানটির পাঠান্তর ‘সন্ত্রাসের বিহ্বলতা’ গাওয়া হয়েছিল; তাছাড়া ‘আজি ঝরঝর মুখর বাদর দিনে’ গানটির মতো অসংখ্য গানের সুরান্তর রয়েছে, যা গাওয়া হয়ে থাকে।
১৬. ‘‘এই প্রসঙ্গে ‘মেঘের পরে মেঘ জমেছে’ গানটির উল্লেখ করা যেতে পারে। আমরা জানি এই গানের স্বরলিপিকার তিনজন: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর (কেতকী, ১৩৪৬), সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় (গীতলিপি, তৃতীয় খণ্ড, ১৯১০-১৯১৮’র মধ্যবর্তী কোনো সময়), এবং ভীমরাও শাস্ত্রী (সংগীত গীতাঞ্জলি, ১৮৪৭)। দিনেন্দ্রনাথ ও সুরেন্দ্রনাথের স্বরলিপি দু’টি যথাক্রমে স্বরবিতান একাদশ খণ্ড (কেতকী) ও সপ্তত্রিংশ খণ্ডে স্থান পেয়েছে মূলরূপ হিশেবে, এবং ভীমরাও শাস্ত্রী-কৃত স্বরলিপিটি আছে স্বরবিতান সপ্তত্রিংশ খণ্ডের পরিশিষ্টে ‘সুরান্তর’ অংশে...’’ —আলপনা রায়, ‘রবীন্দ্রসংগীতের স্বরলিপি: কিছু সমস্যা’, আলাপ থেকে বিস্তার, প্যাপিরাস, কলকাতা, বৈশাখ ১৩৯৯, পৃ. ৭৪।
১৭. ‘‘ঢালা গানকে ওভাবে তালে গাওয়া সম্ভব নয় বলেই হয়তো ১৩২৬ সালে ‘কেতকী’তে দিনেন্দ্রনাথ ‘মেঘের পরে মেঘ জমেছে’ গানটিকে তিনের পর্বে সাজিয়ে, ১৩৩৫-এর সংস্করণে আবার সেই গান চারের পর্বে সাজান!’—সন্‌জীদা খাতুন, রবীন্দ্রসংগীতের ভাবসম্পদ, অবসর, জানুয়ারি ১৯৯৯, পৃ. ১৭৬। ‘ভাবের ছন্দে গাইবার গানকে তালে বেঁধে বিন্যাস করতে গিয়ে দিনেন্দ্রনাথ দুবার দুইরকমভাবে পর্ববিভাগ করেছেন। গানটি বাস্তবিক পক্ষে তালে গাওয়া হয় না বলে তাল বাঁধবার এই প্রয়াস নিরর্থক বলতে হবে। দিনেন্দ্রনাথ নিজে ‘হিস মাস্টার্স ভয়েস’ রেকর্ডে এই গানটি অনিবদ্ধ তালে গেয়েছেন।’’ —সন্‌জীদা খাতুন, রবীন্দ্রসংগীতের ভাবসম্পদ, অবসর, জানুয়ারি ১৯৯৯, পৃ. ১২৯।
১৮. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বরবিতান ৫৯, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, সংস্করণ চৈত্র ১৪০৩, পৃ. ৮
১৯. ‘‘শান্তিনিকেতনে আমরা এইরকমই গেয়ে থাকি’’ এই কথা চালু থাকাতে মুখে মুখে শিখে ছায়া-ছায়া শেখার অস্পষ্টতাকে স্বরলিপির সাহায্যে শোধন করে পোক্ত করবার চেষ্টার অভাব থেকে গেছে।’’ —সন্‌জীদা খাতুন, ‘রবীন্দ্রসংগীত স্বরলিপির কথা’, সাহিত্য-কথা সংস্কৃতি-কথা, প্রাগুক্ত, পৃ. ৬০
২০. ‘‘...ভুল অনেকেই করেছেন। তবে সে-সব ভুল সংশোধনের দায়িত্ব নিয়েছেন খুব কম জনেই। সংশোধনের দায়ে যাঁরা কঠোর ভাষায় অভিযুক্ত হয়েছেন, তাঁদেরই ভুল আমি বেশি করে তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি।...সংশোধন করতে গিয়ে জটিল কারুকার্য যোগ করা কতটা সঙ্গত ও সৌজন্যসম্মত হয়েছে, সে প্রশ্ন উঠতেই পারে।...কারুকাজের অভাবের দরুনই কি বিশেষ করে এই দুজনের স্বরলিপি ‘সম্পাদনা’ করবার প্রয়োজন অনুভূত হয়েছিল? এ জিজ্ঞাসার উত্তর দেবার জন্যে সম্পাদকদের কেউই আর আজ বেঁচে নেই।’’ —প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৭
২১. ‘‘...যাঁরা কেবলমাত্র স্বরলিপির আনুগত্য স্বীকার করে এ ধরনের গান গাইবেন, তাঁরা সে-সব গানের উপর অত্যন্ত অবিচার করবেন। সে-সব গানের গায়কী পদ্ধতিটি শুনে না শিখলে সব মাটি। ‘সখী, আঁধারে একেলা ঘরে’, ‘বেদনা কী ভাষায় রে’, ‘বাজে করুণ সুরে’, ‘বন্ধু, রহো রহো সাথে’, ও ‘কখন দিলে পরায়ে’ ইত্যাদি গান ক’টি স্বরলিপি আকারে প্রকাশিত হয়েছে নানা পুস্তকে। এইখানে প্রত্যেক সংগীতানুরাগীকে মনে রাখতে হবে যে, এই সব স্বরলিপি দিনেন্দ্রনাথ যখন তৈরি করেন তখন স্বরলিপির নিয়মে বাঁধবার জন্যে কোনো গান চার মাত্রা কোনো গান তিন মাত্রা দাদরা, সাতমাত্রা তেওড়া ইত্যাদি নানারকম ছন্দের মাত্রায় তাকে স্বরলিপি লিখতে হয়েছিল। স্বরলিপি দেখে কেউ যেন মনে না করেন, গুরুদেব বা দিনেন্দ্রনাথ উভয়েই স্বরলিপির ছন্দে এই সব গান গাইতেন। আমার শান্তিনিকেতনবাসের জীবনে রচিত যাবতীয় গান-রচনা এবং শিক্ষার সঙ্গে আমি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলাম বলেই এ কথা আরও জোর দিয়ে বলতে পারছি।’’ —শান্তিদেব ঘোষ, রবীন্দ্রসংগীত, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, কলকাতা, পুনর্মুদ্রণ পৌষ ১৪০৮, পৃ. ১৩৯-১৪০
২২. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সংগীতচিন্তা, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৪১

 

রচনাটির উৎস : রবীন্দ্রনাথের গান: গানের তথ্য গানের সত্য, মনফকিরা প্রকাশনী, কলকাতা, প্রকাশকাল ২০১৬
অভী চৌধুরী

অভী চৌধুরী

জন্ম ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪, টঙ্গিবাড়ি, মুন্সিগঞ্জ।

বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। এমফিল : 'রবীন্দ্রনাথের গান : গানের তথ্য এবং গানের সত্য'। পিএইচডি : 'বাংলা বাগর্থ: ভাষাদার্শনিক অনুসন্ধান'।

পেশা : সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
অবেলার গান [সবুজপত্র প্রকাশনী, কলকাতা, ২০০৮]
একগুচ্ছ জুঁই [কথাপ্রকাশ, ঢাকা, ২০১৩]

প্রবন্ধ—
নিহিতার্থের খোঁজে [মনফকিরা প্রকাশনী, কলকাতা, ২০১১]
রবীন্দ্রনাথের গান: গানের তথ্য গানের সত্য [মনফকিরা প্রকাশনী, কলকাতা, ২০১৬]

ইমেল : ovee74@yahoo.com
অভী চৌধুরী

Latest posts by অভী চৌধুরী (see all)