হোম পুনর্মুদ্রণ গদ্য নির্জন দুর্গ থেকে বেরিয়ে

নির্জন দুর্গ থেকে বেরিয়ে

নির্জন দুর্গ থেকে বেরিয়ে
720
0
আজ কবি শামসুর রাহমানের ৮৬ তম জন্মদিন। বাংলাদেশের সর্বাধিক পঠিত ও আলোচিত এই কবি সাম্প্রতিককালে তরুণ কবি-পাঠকদের অভিনিবেশ, আগ্রহ কিছুটা হারিয়েছেন। কিন্তু কেন? এ অনুসন্ধানে পরস্পরে ছাপা হলো কবি সোহেল হাসান গালিবের একটি গদ্য। এর প্রেক্ষিতে পাঠকদেরও আহ্বান করা হচ্ছে ভিন্ন মত বা বিশ্লেষণ থাকলে তা লিখে পাঠানোর জন্য।


দেখাটা দুধরনের হতে পারে : সবার মতো দেখা এবং ‘নতুন দেখা’র দেখা। শেষোক্ত দাবিটি কবির কাছে পাঠকের। কেননা কবি দ্রষ্টাও বটে। দেখার এই দুটি ধরন যে দুমেরুর সে কথাও বলা যাবে না হয়তো। যা কেবল নিজের জন্য, তা আর সকলের মতো হলো কি হলো না, সে খবরে কার কী-বা আসে যায়! কিন্তু যখন ‘অপরের জন্যও উপভোগ্য’—এই ভাবনাটা আসে, তখন তাকে একটু বিশেষ না হলেই নয়। না হলে সেই অপরই বলে বসবে, ‘এ আর কী!’

এইখানে একটা ছোট্ট চালাকি, যদি চোখের সামনে ঝুলিয়ে দেয়া যায় একটা ক্যালাইডোস্কোপ, তবে কিন্তু চেনা জিনিশকেও অচেনা মনে হয়। আর সেই অচেনাকে চেনবার জন্য মৃদুতম হলেও একটু কাঁপন, চার-দেয়া জলের নিচে মাছের চনমনে ভাব, পাতার শব্দে বেজির চমকে তাকানো—পাঠকের মধ্যে আমরা কল্পনা করে নিতে পারি।

কবি শামসুর রাহমানের দেখাটা সত্যিই নির্বিশেষ এবং সবার মতো দেখা। ফলে তার কারুবাসনা যাই হোক না কেন, পাঠকের সামনে কারূদ্ভাবনার দায় মেটানোই কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়, যতই না তিনি আরাগঁকে বলে পাঠান—‘তোমার কাছে কোনোদিন পরিণামহীন এই পঙ্‌ক্তিমালা জানি না পৌঁছবে কিনা’, যতই আর্তনাদ উঠুক তার—‘খনি-শ্রমিকের বাতির মতন স্বপ্ন আমাদের’।

দেখা প্রসঙ্গে এত কথা বলার কারণ, নাগরিক মধ্যবিত্ত, যাদের দেখা ভিন্ন কাজ নাই এবং যারা যেতে যেতে যায় না কোথাও, তাদেরই  গোষ্ঠগানের কবি শামসুর রাহমান।

ঘরে-বাইরের একটা টানাপড়েনের মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছিল রাহমানের কবিতার তাঁত বোনা। ঘর ও বাইরেকে বিচ্ছিন্ন ভাবার ফলে জীবনই শুধু বিঘ্নিত হয় না, খণ্ডিত হয় মনের সহজ বিকাশও। ঘরকে বড় করে তোলার নিষ্ফল চেষ্টা চলতে থাকে ততদিন পর্যন্ত, বাইরেকে ঠেকিয়ে রাখার ভুলমন্ত্র জপা শেষ না হয় যতদিন। এই মন্ত্রের উচ্চারণই ছিল ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’—

যদিও আমার দরজার কোণে অনেক বেনামি
প্রেত ঠোঁট চাটে সন্ধ্যায়, তবু শান্ত রুপালি স্বর্গ-শিশিরে স্নান করি আমি।

কিংবা,

উঁচু মিনারের নির্জনতায় ম’জে
ভেবেছি সহজে বিশ্বের মহাগান
আমার প্রভাতে সন্ধ্যায় আর রাতে
ঝর্না-ধারায় আনবেই বরাভয়।

বা,

নির্জনতার কারাগারে সঁপে প্রাণ
আত্মদানের মহৎ দুর্গ গড়ি।

নির্জন দুর্গের ভেতরে থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। কেমন সেই প্রস্তুতি? তারই ভাষায় শোনা যাক :

এ ঘরে কত রাত ভালেরি এসেছেন,
কখনো কালিদাস, বোদলেয়ার, রুমি।
পেরিয়ে স্বপ্নের সুনীল সেতু আর
টানেল কুহকের কখনো আসো তুমি।

একথা সত্য, সেদিনের তরুণ কবিমাত্রেরই ফরাসি বা ইঙ্গ-মার্কিন কবিতা ছিল হাতেখড়ি, অনুশীলনের। বোদলেয়ার তার ভুল ইন্টারপ্রিটেশনসহ কেবলই অন্ধকার আত্মার আরাধনা, কুৎসিতের কামনা, পাপের উপাসনা নিয়ে বাংলার কবিকূলে এসে ভিড়েছিলেন বলে মনে করা হলেও, এলিয়ট তার শূন্য খাঁ-খাঁ জমিজমা নিয়ে এলেও, তার ব্যাপকতা তেমন দেখি না রাহমানের কবিতায়।

যদিও দুর্গের ভেতর থেকেই টের পাচ্ছিলেন :

সম্মুখে কাঁপে অমোঘ সর্বনাশ।
দিনের ভস্ম পশ্চিমে হয় জড়ো,
অনেক দূরের আকাশের গাঢ় চোখে
রাত্রি পরায় অতল কাজল তার।

কিন্তু ‘বিধ্বস্ত নীলিমা’র নিচে দাঁড়িয়ে বলছেন :

আমি অভ্যাসবশতঃ
কেবলি আলোর কথা বলে ফেলি।…
… তোমরা কি অন্ধকার-প্রিয়?
চলি আমি, এই লন্ঠনের আলো যে চায় তাকেই পৌঁছে দিও।


দিঘির ওপরকার একটি ঢেউ যেমন জলের নিচের সব রহস্য ব্যক্ত করে না, শহরবাসীর মানববন্ধন তেমনি সমগ্র দেশের আত্মার বন্ধন কিসে, তার মীমাংসা দেয় না



‘শামসুর রাহমানের রাজনৈতিক কবিতা’ বইটির ভূমিকায় কবি লিখেছেন : ‘প্রথম যখন কবিতা লিখতে শুরু করি, তখন চতুর্দিকে পাহারা বসিয়ে দিয়েছিলাম যাতে আমার কাব্যক্ষেত্রে রাজনীতির অনুপ্রবেশ না ঘটে। সেকালে, বলা যায় আমার ধারণা ছিলো যে, কবিতা ও রাজনীতির মধ্যে অহিনকুলের সম্পর্ক বিদ্যমান। কলাকৈবল্যবাদের প্ররোচনায় আমি সেই ধারণায় বশীভূত হয়েছিলাম এবং এ কথা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই। অনেকটা বুদ্ধদেব বসুর প্রভাবে রাজনীতিকে অস্পৃশ্য-জ্ঞান করতাম।’

আমাদের বিবেচনায় কবিতার এই শ্রেণি-বিভাজনেই রয়ে গেছে এক গভীর সমস্যা। কেননা প্রকৃত বিচারে একটি কবিতা যেমন রাজনীতি-মুক্ত হতে পারে না, তেমনি রাজনীতি-সর্বস্ব হবারও কথা নয়, যদি কবিচৈতন্যের গভীর থেকে অবলোকন করা যায়। আধুনিকতার বিভাজন ও বিয়োজনমূলক রীতিপদ্ধতিতে এসবের উদ্ভব। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্রন্থবিপণনের নানা কৃৎকৌশল।

লক্ষণীয় বিষয়, শামসুর রাহমান গোড়া থেকেই ভেতর-বাহির, রাজনীতি-বিরাজনীতি এমন একটা বাইনারি চিন্তাপ্রক্রিয়ার অধীন। তাই তার কাব্যসাধনাকে আমরা শনাক্ত করতে চেয়েছি নির্জন দুর্গ থেকে বেরিয়ে আসার বাসনাবিবর্তনে। এবং শেষ পর্যন্ত দেখতে পাই, বহিঃস্থিত কবিরূপেই নিজের বারামখানাটি খুঁজে নিয়েছেন তিনি। ফলে ব্যক্তিমানসের উপর সমাজমানসের যে ছাপচিত্র, তার রূপোন্মচনের বদলে সমাজমানসের খণ্ড খণ্ড ভাবোন্মচনের দিকে তার আগ্রহ।

তার এই বহিঃস্থিত ভাবটি সর্বত্রই বিরাজমান। মিছিলে ধ্বনিত শ্লোগান থেকে জনচিত্তের খবর পাওয়া কতটুকু সম্ভব—এই প্রশ্ন তাড়িয়ে ফেরে আমাদের। নাগারিক কবির গণসংযোগ মানে মিছিল আর সভা-সমাবেশ। দিঘির ওপরকার একটি ঢেউ যেমন জলের নিচের সব রহস্য ব্যক্ত করে না, শহরবাসীর মানববন্ধন তেমনি সমগ্র দেশের আত্মার বন্ধন কিসে, তার মীমাংসা দেয় না। ধর্মানুষঙ্গে জনমানসের যে সংযোগ তাকে নতুন ভাষায় বাঙ্ময় করে তোলার পথটিও শামসুর রাহমানের নয়। এইখানে সন্দেহ জন্মে, একজন সেকুলার কি মর্মগতভাবেই জনবিচ্ছিন্ন, ভাষাবিচ্ছিন্ন, প্রকারান্তরে আনুষ্ঠানিক? প্রকৃতপক্ষে বাংলা ভাষাটি নানা ভাব ও চিন্তার সমন্বিত বাহন হিশেবে গড়ে উঠেছে দীর্ঘ ইতিহাসের ভেতর দিয়ে। পৌত্তলিক-অপৌত্তলিক, আচারনিষ্ঠ-আচারহীন, সিদ্ধ-ব্রাত্য—পরস্পরবিরোধী এমন সব তরঙ্গ-অভিঘাত বাংলাভাষায় তীরে এসে আছড়ে পড়েছে, নতুন তটভূমি রচনা করেছে। সেই ইতিহাস ও অভিজ্ঞতাকে ভাষা থেকে খারিজ করে কোনো আধুনিক যখন অগ্রসর হবেন, বীণার তার খুলে বীণাবাদনের অসম্ভবতাকে মোকাবেলা করতেই হবে তাকে। শামসুর রাহমান সেই অসম্ভবের দিকে এগিয়েছেন শুরু থেকেই। বাঙালি মুসলমানের প্রাগাধুনিক চেতনা স্পষ্টত অবসিত হয়েছে প্রথম তারই রচনায়।


চেতনার বাইরেও কবিতা বা শিল্পের কাছে ভোক্তা সম্ভবত আরও কিছু দাবি করে



দীর্ঘদিন ধরে অবিরল কবিতা লিখে যাবার সুবিধা ও বিপদ দুইই আছে। সুবিধা হলো নিজেকে বদলে ফেলার সুযোগ, সেই সঙ্গে চিন্তার ধারাবাহিক ইতিহাসটাকেও সংকেতায়িত করে রাখা। ব্যাপারটা বনের ভেতর অবিরাম হাঁটার মতো—যত দৈর্ঘ্য বাড়ে ততদূর ছড়ায় সমাধিফলক। বিপদের দিকটা আর কিছুই নয়, সমস্ত কিছুকে কাব্য করে তোলার অসফল প্রচেষ্টা কখনোবা কবিত্বকেই টিটকারি করতে থাকে।

স্বীকার করতেই হবে, রাহমানের কবিতায় এই ভূখণ্ডের মানুষের রাজনৈতিক জীবনের একটা রেখাচিত্র উঠে এসেছে। বিশেষত ৪৭-পরবর্তী প্রায় সব ধরনের জাতীয় আন্দোলনের প্রতিধ্বনি, প্রগতিশীল জাতীয় ব্যক্তিত্বের প্রতিচ্ছায়া নির্মাণ করেছে তার কবিতা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রতিধ্বনি আর প্রতিচ্ছায়া সৃষ্টিতেই তা পর্যবসিত কি না। অন্যভাবে বলা যায়, সংবাদপত্রের কলাম বা নির্বাচিত পেপার-কাটিং রাজনৈতিক বয়ান তৈরিতে যেমন প্রামাণ্য ভূমিকা নেবে, কেবল সেই ভূমিকা পালনের জন্যই কবিতা সংবর্ধিত হবে কি?

কিন্তু হয়েছে, একটা বিশেষ শ্রেণির কাছে। প্রায় দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে আমরা তাই দেখে এসেছি। পক্ষান্তরে, নব্বইয়ের দশকে এসে তার কবিতার আবেদন শোচনীয়ভাবে কমে গিয়েছে তরুণ কবি ও পাঠকদের কাছে। এর দুটি কারণ হতে পারে। এক, যে বিশেষ চেতনা তার কবিতা সরবরাহ করতে চেয়েছে—বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও ধর্মনিরপেক্ষতা—নব্বইয়ের দশকে এসে এসবের আবেদন নতুন আবেগ সঞ্চার করতে ব্যর্থ হয়েছে। দুই, চেতনার বাইরেও কবিতা বা শিল্পের কাছে ভোক্তা সম্ভবত আরও কিছু দাবি করে। দাবিটা কলাবৃত্তিক বা নান্দনিক।

জীবনানন্দের প্রভাববলয়ে থেকেও চমকপ্রদ মাত্রাবৃত্ত চালে সুন্দর সূচনা হয়েছিল তার—শামসুর রাহমানের। কিন্তু গলদটাও রয়ে গেছে শুরুতেই। জীবন দাশের কবিতায় রাজনীতির যে মর্মগত অবস্থিতি, হৈচৈ-হীন, তার পাঠোদ্ধার সম্ভব হয় নি সেকালের অনেক কবির পক্ষেই। সুভাষ মুখোপাধ্যায় বা নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কথা ভাবা যেতে পারে। রাজনীতিকে শোরগোলের বিষয় এবং তাকে শরীরী-কাঠামোয় উপলব্ধি করার বস্তু বানিয়েছে বাংলা কবিতা। রাহমান সেভাবেই দীক্ষিত হয়েছেন। বিবরণধর্মিতাই হয়েছে তার প্রধান আশ্রয়। অনর্গল বক্তৃতার মতো। পুনরাবৃত্তিই যেন একটা কৌশল। রাজনৈতিক কোনো প্রকল্পের মতো, জনতার কাছে ঘুরে ফিরে একই কথা বারবার বলা। তৎকালীন রাজনৈতিক প্রচার-প্রপাগান্ডার সমান্তরালে বিচার করা যেতে পারে বিষয়টাকে। ষাটের দশকের উতরোল বাগ্মিতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বহিঃস্থিত কবির পক্ষে মৃদুভাষী হওয়া প্রায় অসম্ভব, আবার মধ্যবিত্তের পক্ষে উঁচু স্বরগ্রামে কথা বলাও স্বভাববিরুদ্ধ। ফলে দৈনন্দিন জীবনের রূপকার হয়েও কথা বলেন তিনি অনুচ্চ স্বরে। এমনকি যুদ্ধের সময়ে লিখিত কবিতাতেও (স্মরণযোগ্য ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতা)।

ক্লান্তিহীন ক্যাটালগিং এবং সঙ্কোচবিহীন বিবরণী—বাংলা কবিতায় শামসুর রাহমানের বিশেষ অবদান।


অসামান্য দীপ্তিমান পঙ্‌ক্তি তিনি লিখেছেন ঠিকই, কিন্তু সেসব অনাবশ্যক বাগবল্লরিতে ঢেকে দিয়েছেন নিজেই


কবিতায় পুনরুক্তি আসতে পারে দুভাবে। একই বিষয় বা ভাবের বিস্তার—আরও আরও বস্তুচৈতন্যের উদ্ভাস ঘটিয়ে—যেমন, ‘যেতে নাহি দিব’। দ্বিতীয়ত, একটি বাক্য বা বাক্যাংশকে আলাদা আলাদা প্রসঙ্গে প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে। টেকনিক হিশেবে কোনোটিই এখন আর আদর পাচ্ছে না কবির কাছে। পাবে যে সে সম্ভবনাও কম। রাহমান বেশ সমাদর করেছেন দ্বিতীয় পদ্ধতিটির—স্বাধীনতা তুমি, তোমাকে পাওয়ার জন্যে, তুমি আসবে বলে হে স্বাধীনতা, জীবন মানেই ইত্যাদি গানের ধুয়ার মতো ব্যবহার করেছেন। যদিও বাংলার চারণকবিরা তার রাহবার নন, তাকে পথ দেখিয়েছে সমকালীন বিদেশি কবিতা।

মূলত সমকালীনতাই আরাধ্য তার। ক্ষণদর্শনের কবি তিনি—এখানেই তার বিশিষ্টতা। দিনপঞ্জিকে অবলীলায় মহাকালের পঞ্জিকাস্তূপের দিকে ছুড়ে দেবার দুঃসাহস দেখিয়েছেন। দাঁড় করিয়েছেন অনবদ্য কিছু পঙ্‌ক্তি, অভিনব উপমা ও রূপক—আমদানি ও উদ্ভাবনে মাখামাখি :

লিপস্টিক ঘ’ষে মুছে ফেলা ঠোঁটের মতন আত্মা নিয়ে

আত্মার পিছল বয়া চেপে

নীলের ফরাশে দ্যাখো বসেছে তারার মাইফেল

জকির শার্টের মতো ছিল দিন একদা আমারও

জ্বলে দূরে তারার সেনেট

মেঘের গোযোর নেই একটু আকাশে

তসবী-দানা চোখে নিয়ে চেয়ে আছো রোদের ভেতরে

গলিত কাচের মতো জলে

কেমন সবুজ হয়ে আছে ক্রিয়াপদগুলি

তেজপাতা-রঙ বুড়িটার ঘরে

স্বাভাবিকতার ভাস্বর রেহেল থেকে

হাড়ের ভেতরে সে ঘুমায় নিরিবিলি

চৈতন্যের প্রতিটি মোর্চায়

এ তালিকা অনায়াসে আরও দীর্ঘ করা যেত নিশ্চয়ই। এখানে আমাদের বলবার কথা এই, অসামান্য দীপ্তিমান পঙ্‌ক্তি তিনি লিখেছেন ঠিকই, কিন্তু সেসব অনাবশ্যক বাগবল্লরিতে ঢেকে দিয়েছেন নিজেই। কবির ক্ষণদর্শনের মজ্জাগত বিষয় নিয়ে একটি কথা না বললে আলোচনা থেকে যাবে অসম্পূর্ণ। রাহমানের প্রথম দিককার এবং মধ্যজীবনের রচনায় প্রতীচ্য পুরাণ বা মিথের ব্যবহার দেখি। লক্ষ করা যেতে পারে, সমকালীন চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পুরাণ ব্যাখ্যা বা বিনির্মাণের আগ্রহ তার ছিল না। তিনি মিথকে টেনেছেন স্বদেশ ও স্বকালের কোনো ঘটনার সমান্তরালে, খানিকটা রূপকাভাস তৈরির কৌশলে। যেমন ‘টেলেমেকাস’, ‘স্যামসন’। ফলে তার এই কাব্য-অভিযানে কবির অভিনিবেশ ঘটেছে ঘটনার উপরিকাঠামোয়, অন্তর্গত গরমিলে কোনো আপসরফা হয় নি।

কেবল ঘটনা নয়, চেতনার নানারূপ সংঘাতের পূর্বাভাস ধরা পড়ে কবিতায়। রাহমানের কবিতা শোকাবহভাবে সংঘটিত বিষয়ের প্রতিক্রিয়ামাত্র, পূর্বাভাসশূন্য। যে ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় শিক্ষিত সাধারণের ভেতরেও। ফলে কবির প্রতিক্রিয়া সহজপাঠ্য হয়ে ওঠে, এমনকি তাকে বলা যেতে পারে ঐ সাধারণেরই আবেগভাষ্য। কবির ভাষাটি তাই প্রতিদিনকার, বিবৃতি ও বিবরণধর্মী, এক ধরনের রিপোর্টাস গদ্য, কিন্তু নয় তা সাধারণের (বিশেষ ব্যতিক্রম : ‘এই মাতোয়ালা রাইত’)। সাধারণের হবার দরকারও নেই। কিন্তু ভাষার উৎকর্ষ যেখানে ঘটে, যেখানে শব্দ লুপ্ত হয়ে গিয়ে কেবলই ইশারা, অব্যক্তি আর নৈঃশব্দ্যে ছড়িয়ে পড়ে, ফুলের পাপড়ি খশে গিয়ে যেখানে জাগে শুধুই গন্ধ-বেদন, সেই অবস্তুবিশ্বের থেকে অনেক দূরে শেষ পর্যন্ত এক মনুমেন্ট তৈরি করে শামসুর রাহমানের কবিতা। মনোলিথিক। যেন নিজের ভারে নিজেই অবসন্ন।

 

 বাংলা একাডেমি প্রকাশিত শামসুর রাহমান স্মারকসংখ্যা থেকে
সোহেল হাসান গালিব
গালিব

সোহেল হাসান গালিব

জন্ম : ১৫ নভেম্বর ১৯৭৮, টাঙ্গাইল। বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর।
সহকারী অধ্যাপক, ঢাকা কলেজ, ঢাকা।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
চৌষট্টি ডানার উড্ডয়ন ● সমুত্থান, ২০০৭
দ্বৈপায়ন বেদনার থেকে ● শুদ্ধস্বর, ২০০৯
রক্তমেমোরেন্ডাম ● ভাষাচিত্র, ২০১১
অনঙ্গ রূপের দেশে ● আড়িয়াল, ২০১৪

সম্পাদিত গ্রন্থ—
শূন্যের কবিতা (প্রথম দশকের নির্বাচিত কবিতা) ● বাঙলায়ন, ২০০৮
কহনকথা (সেলিম আল দীনের নির্বাচিত সাক্ষাৎকার) ● শুদ্ধস্বর, ২০০৮।

সম্পাদনা [সাহিত্যপত্রিকা] : ক্রান্তিক, বনপাংশুল।

ই-মেইল : galib.uttara@gmail.com
সোহেল হাসান গালিব
গালিব