নিরপরাধ ঘুম

নিরপরাধ ঘুম
2.40K
0

‘কমনওয়েলথ ছোটগল্প পুরস্কার ২০১৬’-এর সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি। কমনওয়েলথ-সদস্য ৪৭টি দেশের চার হাজার গল্প থেকে বাছাইকৃত ২৬টি গল্প নিয়ে এই তালিকা। এর মধ্য থেকে চূড়ান্তভাবে একটি গল্প নির্বাচিত হবে মূল পুরস্কারের জন্য। এছাড়াও থাকবে অঞ্চলভিত্তিক পাঁচটি বিশেষ পুরস্কার।

এই সংক্ষিপ্ত তালিকায় প্রথমবারের মতো এবার স্থান পেয়েছে বাংলাদেশের কবি ও কথাসাহিত্যিক সুমন রহমানের ছোটগল্প ‘নিরপরাধ ঘুম’। উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, এটিই একমাত্র গল্প যেটি ইংরেজি ভাষায় লেখা নয়। ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন অরুণাভ সিনহা। মনোনয়ন-কাজে বিচারক প্যানেলে ছিলেন বাংলাদেশের ফেরদৌস আজিম। ইংরেজির অধ্যাপক তিনি, আছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে। 

পরস্পরের পাঠকদের জন্য গল্পটি পুনর্মুদ্রিত হলো, লেখকের ফেসবুক নোট থেকে। ফেসবুকে পাওয়া কিছু মন্তব্যও সংযোজিত হলো গল্পের শেষে।


একটা অদ্ভুত শব্দ।
নদীর জল মচকাফুলের মত লাল।…
সিগারেটের ধোঁয়া; টেরিকাটা কয়েকটা মানুষের মাথা;
এলোমেলো কয়েকটা বন্দুক —হিম—নিস্পন্দ, নিরপরাধ ঘুম।

(জীবনানন্দ দাশ, শিকার)

• • •

“সন্ত্রাসী…কে সঙ্গে নিয়ে RAB অস্ত্র উদ্ধারে যায়। সেখানে আগে-থেকে ওঁৎ পেতে থাকা তার সহযোগীরা RAB-কে উদ্দেশ্য করে গুলি ছোড়ে। আত্মরক্ষার্থে RABও পাল্টা গুলি ছুড়লে বন্দুকযুদ্ধে সন্ত্রাসী…নিহত হয়

(টেলিভিশন-সংবাদে ক্রসফায়ার প্রতিবেদনের একটি স্ট্যান্ডার্ড ফরম্যাট)

• • •

– রাশেদ নাকি রে?
– কেমন আছ, মা?

সন্ধ্যার আবছা আলোয় এসব প্রশ্নের কোনোটাই প্রশ্নকারীদের মাঝে উত্তর না-পাওয়ার যাতনা তৈরি করে না। আমি পিছন ফিরা গেইট বন্ধ করি, আর মা করিডোর বরাবর হাঁটা শুরু করে। লম্বা, চলটা-ওঠা করিডোর। বামপাশের প্রথম ঘরটা আমার, পরেরটা শাহেদের। তারপরে ডানদিকে রান্নাঘর, পরেরটা খাবারঘর। করিডোরের শেষ মাথায় বাবা-মার ঘর। এইরকমই তো আছিল, নাকি? আগে ঘরগুলোতে ঝমাঝম আলো জ্বলত, এখন অন্ধকার। শুধু মা-র ঘরটা খোলা। আমি মা’র পিছন পিছন হাঁটা দিই।

– আজকেই ছাড়ল। র্যাবের অফিসার বলল, রাশেদ সাহেব বাড়ি যান। উই আর স্যরি, আপনি সেই লোক নন। তারপর হাসপাতালে অ্যাডমিশন করাইল। তিনদিন পর আজকে রিলিজ নিয়া আসলাম।

– ঘরে গিয়া ফ্যান ছাইড়া বস। যা গরম পড়ছে। শরবত নিয়া আসি।

মা’র ভাবান্তর হয় না। আমি ঘরে না গিয়া রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়াই।

– তুমি নিশ্চয় ভয় পাইছো আমারে ক্রসফায়ার-টায়ার কৈরা দেয় কিনা!

মা শরবত বানায়। কিছু বলে না।

– আরে বোকা বেটি, অ্যাত্ত সহজ! দেশে আইনকানুন আছে, মিডিয়া আছে। খামাখাই ধৈরা নিয়া মাইরা ফালাইব? র্য্যাবের অফিসার তো বলল ওরা অন্য এক রাশেদরে খুঁজতে গিয়া ভুল কৈরা আমারে ধরছিল। ঐ ব্যাটা হৈল অস্ত্রের চোরাচালানী! কও দেখি কী সাংঘাতিক! নামে নামে যমে টানে।

আমি খামাখাই হাসি।

– নে। শরবত খা।

গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে ঘরবাড়ি দেখি। এই কয়দিনেই ঝুলকালি জমছে অনেক, চলটা চলটা আস্তর নাই ছাদের এইখানে ওইখানে। নাকি আগেই এমন ছিল, হয়তো খেয়াল করি নাই। বাড়ি যখন বানানো হৈল, সবাই বাবারে বলল, কী মিয়ার বেটা হাসপাতালের মতো সিস্টেম কৈরা বাড়ি বানাইলেন? বাবা হাইসা ক’ন, এবার দেখমু কোন পোলায় কয়টায় বাড়ি আসে? সেসময় আমি সারাদিন ঘুমায়া সন্ধ্যাবেলা বাইর হৈতাম আর মাঝরাত পর্যন্ত ক্লাবে তাস খেলতাম। শাহেদ আরো এক দান উপরে। ক্লাশ নাইন থিকাই ওরে পাড়ার লোকে ‘ডাইলখোর’ শাহেদ ডাকত। পাড়ার মাস্তান রাজুর বগলদাবা হৈয়া ঘুরত, বাড়ি ফিরত দুই-তিনদিন পরপর। ফিরা সারাদিন ঘুমাইত। দরজা ঝাঁকাইলেও খুলত না।

– কারেন্ট গেল কতক্ষণ?

– লাইন কাইটা দিছে গত মাসে। বিল জমছে অনেকগুলা।

– দেখি কাল সকালবেলা বিলটিল দিয়া লাইন লাগায়া আনব।

মা হারিক্যান জ্বালায়। আমি দাঁড়ায়া দাঁড়ায়া দেখি। এখান থিকা বাবার চেয়ারটা আবছা দেখা যায়। নতুন বাড়িতে ওঠার পর থিকা বাবার নতুন রুটিন। এই চেয়ারে সন্ধ্যা থেকে রাত দশটা। কিন্তু তার রাত দশটায় তার পোলাপাইনের তো খালি সন্ধ্যা! তখন গজগজ করতে করতে দরজায় তালা দিতেন। বাইরে কলাপসিবল গেইটেও।

বছরখানেক এইরকম হালুয়াটাইট অবস্থা ছিল। ছাদের এক জায়গা দিয়া গ্রিল ভাইঙ্গা নিছিল শাহেদ। সেইপথ দিয়া দুই ভাই বাড়িতে ঢুকতাম কখনো মাঝরাতে, কখনো ভোরবেলা। তারপর একদিন তো বাবা নিজেই কলাপস করলেন। একখান হার্ট অ্যাটাক, তাতেই পগার পার। তখন আমাদের পায় কে? আমি যদি ফিরি রাত তিনটায়, শাহেদ ফিরবে পাঁচটায়। শেষরাতে মা’র আর ঘুমই হৈত না। কলবেলের শব্দ পাইয়া ঘর থিকাই গলা চড়ায়া ডাকত, রাশেদ নাকি রে? আমি বলতাম, খোলো। শাহেদ তাও বলত না। ফ্লোরে জুতা ঘষত জোরে জোরে। আর মা বলত, আইছে বোবা ডাকাইত। সেই ভোররাতে আবার খাবার গরম করত মা। যতক্ষণ খাইতাম, টেবিলে বৈসা থাকত। আর বলত, এত রাইত  পর্যন্ত বাইরে কী করিস? আরো লোক থাকে? আমি হু হা করতাম।

বয়াম ঝাইড়া মা চিনি বাইর করার চেষ্টা করে। আমার দিকে তাকায় না একবারও। আমি মা’র মুখটা দেখি ভালো কৈরা।

– চিনি ফুরায়া গেছে। আনা হয় নাই।

– বাজারসদাই কে করে? কাটাকুটি?

– একটা ছুটা বুয়া আছে। ওর পোলাটা বাজার কৈরা দেয়।

– ওদের বাড়িতে থাকতে কৈতে পার নাই? একা একা থাকছ!

ছাদের ভাঙা গ্রিলের দিকে তাকায়া বলি। কাল এইটার জন্য মিস্ত্রি আনা লাগবে। মা কিছু বলে না। চশমার ভিতরে মা’র কুয়ার মতো গহিন একজোড়া চোখ। অচেনা লাগে।

মুন্না মার্ডারের চার্জশিটে যখন শাহেদের নাম ঢুকাইল, ওরে রাতারাতি মালয়েশিয়া পাঠায়া দেওয়া-ছাড়া উপায় কী ছিল? বাবা নাই, সংসারে চরম বিশৃঙ্খলা। চাচারাও বিট্রে করছে জমিজমার হিশাব লৈয়া। ভাগে যতটুকু পাইছি, বেইচা দিয়া শাহেদরে বিদেশ পাঠাইলাম। কিন্তু পোড়া কপাল, শাহেদের কোম্পানি পড়ল দুই-নম্বর। যাওয়ার পরপরই মালিক পাসপোর্ট সিজ করল, আর ওরে-সহ আরো তিরিশজনারে এক গুদামঘরে আটকায়া রাখল দিনের পর দিন। কাম নাই, বেতন নাই, দুতিনদিন পরপর কিছু বাসি রুটি আর বিস্কুট দিয়া যাইত। একদিন শাহেদ-সহ আরো পাঁচজন পালায় সেই ঘর থিকা, জানালা ভাইঙ্গা। পাসপোর্ট নাই, দিনের বেলায় থাকত জঙ্গলে, পালায়া পালায়া ছুটা কাম করত আর মসজিদে ঘুমাইত রাতের বেলায়।

মাঝে মাঝে ফোন করত। আমারে বলত, ভাইজান তুমি একটু থানায় গিয়া দেখো না ফাইনাল রিপোর্টে আমার নামটা কাটায়া দেওয়া যায় কিনা। মুন্নারে তো আমি মারি নাই। রাজু ভাই নিজে ওর মাথার মধ্যে গুলি করছে। আমি খাড়ায়া ছিলাম, মুন্না আমার পায়ে ধৈরা কী কান্দনটাই না কানছে! শেষে রাজুভাইরে আমি না-মারার জন্য রিকোয়েস্ট কৈরা চটকানাও খাইছি। এইজন্যই পরে হালায় আমারে হুদাহুদি ফাঁসাইছে। রাজুর নাম তো পয়সা খাইয়া চার্জশিট থিকা কবে কাইটা দিছে সাব-ইন্সপেক্টর! তুমি একটু দেখ না ভাইজান!

আমি বলতাম, দেখুম নে। বিদেশ পাঠাইছি, থাক কিছুদিন।

শাহেদ কাঁদো কাঁদো গলায় বলত, ভাইজান খুব খারাপ জায়গা। পাসপোর্ট নাই, পুলিশ ধরলে সোজা ডিটেনশন সেন্টারে নিয়া পিটায়া মাইরা ফালাইব। আর পকেটে দুইচাইর টাকা যদি জমে, তামিল বদমাইশরা আইসা মাইরা-পিট্যা নিয়া যায়। খুব মারে ভাইজান, টাকা দিলেও মারে। দেশে আইসা ব্যবসা করুম, অনেক শাইন করুম দেইখো তুমি! তুমি আমার মায়ের পেটের ভাই, কিছু করবা না?

ওর বলার ভঙ্গিতে হাসি লাগত। বলতাম, ঠিক আছে, এত ঘন ঘন ফোন করনের দরকার নাই। দেখি কী করা যায়।

এর মাত্র মাসখানেক পরই শাহেদের লাশ আসে। এয়ারপোর্ট থিকা যেদিন ওর লাশ নিয়া আসি, বেদম বৃষ্টি! পুবাইল রেলক্রসিং-এ লরি উল্টায়া যাওয়ায় লম্বা জ্যাম, পাঁচ ঘণ্টা বৈসা থাকলাম লাশের গাড়িতে। চিনার উপায় ছিল না ওরে। মাইরা জঙ্গলে ফালাইয়া রাখছিল, চেহারাছবি পুরা ভচকায়া গেছে। শুধু কাপড়চোপড় দেইখা চিনছে সাথের লোকেরা। কে মারছে কেন মারছে কেউ বলতে পারে না। রেলা পুলিশ হৈতে পারে, এজেন্টের লোকেরা হৈতে পারে, তামিল হাইজ্যাকারও হৈতে পারে। শাহেদের সঙ্গীসাথিরা ফোনে বলল, ভাই লাশ পাঠাইয়া দিতেছি চান্দা তুইলা। ইল্লিগ্যাল শ্রমিকের ডেথ বেনিফিট নাই। তাও কপাল ভালো যে লাশটা পাইছেন। আমাগো লাশ দেশে ফেরত যাইব কিনা খোদাতালা জানে।

– চিনি কম হৈয়া গেছে বাপ। খাইয়া ফালা।

এই প্রথম আমার দিকে তাকায় মা। হাসে একটু যেন। মা’র দুই চোখের জায়গায় দুইটা কুয়া। আমার চোখ যেন কোথায় অতলে চলে যায়! আমি দৃষ্টি ফিরাই। লেবুর গন্ধ নাকে লাগে।

– দেখি, কাল সকালে একবার কবরস্থানে যামু। এখন একটু ঘুমাই, যা ধকল গেছে।

– থানায় নিয়া তোরে খুব মারছে নাকি রে?

মা’র নিষ্করুণ গলা।

– হ। পরে যখন র্যাবের ক্যাম্পে নিল, আর বেশি মারে নাই।

– ঠিকাছে, ঘুমা বাপ। আমি রান্না বসাই গিয়া।

ঘরের দরজা ঠেলা দিতেই ভ্যাপসা গন্ধ নাকে লাগে। জানলা খুইলা দিই, সন্ধ্যার লালিমা তখনো মিলায় নাই। ঠান্ডা বিছানা, আলগোছে শুই। আলোআঁধারির মাঝে আমার নিজ ঘরে আমি চোখ বন্ধ কৈরা ঘুমাই। আমি ঘুমাই, আবার আমি যে ঘুমাইতেছি সেইটা আবছা-আবছা টের পাই ঘুমের মধ্যে। দূরে, বাবা-মা’র ঘরে, দেয়াল ঘড়িতে ঢং ঢং কৈরা সাতটা বাজে। একটা ধাড়ি ইঁদুর ঘরের মেঝেতে, টেবিলের কাগজপত্রের মাঝ দিয়া সড়সড় কৈরা দৌড়ায়, শুনি ঠিক ঠিক। আমার সিঁথানে বৈসা আমার এই নিরপরাধ ঘুমটারে যেন আমিই পাহারা দিই।

এইরকমই ঘুমাইতেছিলাম, শাদা পোশাকে পুলিশের লোক যখন আমারে ধরতে আসে। সেইটা শাহেদের মৃত্যুর কয়েকমাস পর। প্রথমে তো বুঝিই নাই, ভাবছিলাম ডাকাইত। ধৈরাই চোখ বাইন্ধা ফেলে আর পিছমোড়া দিয়া হ্যান্ডকাফ লাগায়। মা’র গলা শুনি, ফিসফিস কৈরা জিগাইতেছিল, আপনারা কারা, কী করছে আমার পোলায়, ওরে কৈ নিয়া যান? কেউ জবাব দেয় না। সারা বাসায় ওলটপালটের শব্দ, এইটা সেইটা ভাঙার শব্দ। ট্রাংক-ড্রয়ার সব ভাইঙ্গা সাফা কৈরা ফেলে। আমার চোখ বান্ধা, কিছুই দেখি না।

– লেখেন, হ্যান্ড-গ্রেনেড চাইরটা, অটোম্যাটিক একটা, বিচি দুই ডজন।

– জেহাদি বই?

– ফাইজলামি করেন? এইটা কি জেহাদি বইয়ের কেইস নাকি?

এরা নিজেরা নিজেরা নানান কথাবার্তা বলে। তারপর গাড়িতে তোলে আমারে, গাড়ি স্টার্ট দেয়। থানায় যাওয়ার পর চোখ খুইলা দিলে দেখি, সেকেন্ড অফিসারের হাতে কাগজ-কলম।

– নাম?

– আমার নাম রাশেদ, স্যার। স্যার, আমারে ধৈরা আনছে কেন?

– মুসলমানি করাইতে। হুমম…রাশেদুর রহমান ওরফে কাটা রাশেদ ওরফে মুনীর। সেকেন্ড অফিসার খসখস কৈরা লেখে।

– কী কৈতেছেন এইসব?

– আপনিও কৈবেন একটু পরে র্যাবের দাওয়াতে গিয়া। ভুল কৈতেছি নাকি, খানকির পোলা? তোর ছোট ভাইয়ের নাম কী?

কোমর-বরাবর একটা রুলের বাড়ি পড়ে। আমি প্রথমে ভ্যাবাচ্যাকা খায়া জোরে চিৎকার দিই, তারপর ফোঁপাইতে থাকি।

– শাহেদ।

– মরহুম টেরর ডাইলখোর শাহেদুর রহমান। শুদ্ধ কৈরা বল? বল?

– মরহুম টেরর ডাইলখোর শাহেদুর রহমান।

– মানিকরতন! ভাই আছিল টেরর আর তুই আর্মস ডিলার! তোর বাপে কী করত রে?

– কাঠের ব্যবসা।

– বাপে করত কাঠের ব্যবসা আর পোলায় করে লোহার ব্যবসা! বাপকা বেটা!

ননস্টপ চলতে থাকে রুল।

– ভাই আপনাগো ভুল হৈতেছে। আমি লেখাপড়া করি, সামনের বার ডিগ্রি পরীক্ষা দিমু। সবাইরে জিগায়া দেখেন।

– এমন ভদ্রলোকের বাসায় এক হালি গ্রেনেড আইল কেমনে রে, শুওরের বাচ্চা! তুই কি মুরগি, ডিম পাড়ছস?

– আমি জানি না। জীবনেও গ্রেনেড দেখি নাই। খোদার কসম ভাই, আমি কিচ্ছু জানি না।

– ডিম পাড়ে হাঁসে, খায় বাগডাশে। ধরলাম আমরা, ওয়ান সিক্সটি-ফোর দিবি না। তারপর র্য্যাব আইসা যখন থানা থিকা নিয়া যাইব, তখন সুড় সুড় কৈরা দিবি। তারপর সংবাদ সম্মেলনে যাবি, তাগো মাঝখানে খাড়ায়া কাটা-হাতে পোজ দিবি, রাতের বেলায় তোরে নিয়া অস্ত্র উদ্ধার করতে যাবে। তখন কী হবে, বল তো হারাধন! এখনো বলি, ওয়ান সিক্সটি-ফোর দিয়া হাজতে ঢুক বাঁচতে চাইলে।

ততক্ষণে, মাত্র দশমিনিটের মাইরে আমার ঠোঁট আলু, এক চোখ বুইজা গেছে পুরাপুরি। সারা শরীরে পিটাইছে ইঞ্চি ইঞ্চি মাইপা। প্যান্ট ভিজা গেছে পেশাবে। ঘড়ঘড় কৈরা তবু বলার চেষ্টা করি।

– ভাই ভুল হৈতেছে আপনাদের। আল্লা আমারে বাঁচাও!

মুখ দিয়া কোনো শব্দ বাইর হয় না। স্বপ্নে যেমন মানুষের জবান আটকায়া যায়।

দিন যে কিভাবে কাটে! রাতের পর রাত নির্ঘুম হাজত, রিমান্ড, মশা, ঘিনঘিনা গরম, গুয়ের গন্ধ, বমি, তারপর একদিন সকালবেলার শান্ত নদীর পাড়। র্য্যাবের সার্জেন্টরে মিনতি কৈরা বললাম, ভাই হ্যান্ডকাফটা খুইলা দিবেন, একটু হাঁটব! আমার হ্যান্ডকাফ খুইলা দিল সে। কী যে আরাম লাগতেছিল! মনে হৈতেছিল দোযখ থিকা মুক্তি পাইছি। সার্জেন্ট বলল, সিগারেট খাইবা একটা? কী একটা স্বপ্নের মধ্যে যেন হাঁটতেছিলাম, আর আমি স্বপ্নের মধ্যেই যেন জানতাম যে এইটা স্বপ্ন, তাই ভয়ডর লাগতেছিল না একদম।

ছিঁড়া ছিঁড়া ঘুম, কই থিকা কৈ লৈয়া যায়! একবার দেখি ক্লাবে তাস খেলতেছি, একবার দেখি মাঠে ফুটবল খেলতেছি, একবার দেখি জেলখানায় পিটাইতেছে, একবার দেখি শাহেদের লাশ কবরে নামাইতেছি। আবার মা’র ঘরে দেয়ালঘড়ি ঢং ঢং করতে শুরু করে, ঘুমের মধ্যেও পরিষ্কার গুনি, আটটা বাজে। বাইরে এখন পুরাপুরিই অন্ধকার।  সারা শরীরে ব্যথা, ঘরের মধ্যে ইঁদুরের বোঁটকা গন্ধ। আহা, কতদিন পর নিজের ঘরে ঘুমাইলাম! স্কুলে পড়ার সময় মাঝে মাঝে সন্ধ্যায় ঘুমায়া পড়তাম। আব্বা আইসা জাগাইত। বলত, সন্ধ্যাবেলা ঘুমাইতে নাই, উঠ বাবা। উঠ। আর আমি ঘুমের ঘোরে বলতাম, ধুর কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান কৈরেন না তো! এখন তো বাবা নাই, অন্ধকারে কানের কাছে মশা ভন ভন করে। দরজায় কলবেল বাজে।

– কে যেন আসছে, মা।

ঘুমলাগা গলায় মা’রে ডাকি। গেইটের ফ্লোরে জুতার ঘষটানি। পরিচিত ভঙ্গি।

– শাহেদ আসছে রে বাপ। তোর ঘুম হৈয়া গেল?

দরজা খুলতে খুলতে মা বলে।

– শাহেদ?

এবার আমি ধড়ফড় কৈরা উঠি। দেখি, সত্যি-সত্যিই বাসায় ঢুকতেছে আমার ছোট ভাই শাহেদ। আমার পিঠাপিঠি ভাই, একসাথে ইস্কুল-পালানো নদী-সাঁতরানো ভাই। পাড়ার উঠতি টেরর রাজু-র অ্যাসিস্টেন্ট, মুন্না মার্ডারের আসামি, মালয়েশিয়ায় খুন হয়ে-যাওয়া শাহেদ।  মা’র হাতে ধরা হারিক্যানের আলোয় ওর চেহারা আবছা আবছা দেখি। আব্বা মারা যাওয়ার পরে জমিজমা বেইচা ওরে আমি বিদেশ পাঠাইছিলাম। সাথে সাথে বিদ্যুচ্চমকের মতো মনে হয়, তাইলে শাহেদ নিশ্চয়ই মরে নাই! নিশ্চয়ই ভুল হৈয়া গেছিল! হয়তো আরেকজনরে শাহেদ সাব্যস্ত কৈরা আমাদের ঠিকানায় পাঠাইছিল। চেহারা দেইখা হয়তো চিনার উপায় ছিল না। হয়তো লাশের গায়ে একটা পোলো গেঞ্জি ছিল, শাহেদও সেইরকম একটা গেঞ্জি পরতো। এই ঘটনার কিছুদিন পর শাহেদ কি ফোন করছিল? শাহেদ কি বলে নাই যে, ভালো চাকরি পাইছে? অভারটাইম আছে? বেতন ভালো? ভালো আছে? আস্তে আস্তে আমার স্মৃতি থিকা শাহেদের কবর ঝাপসা হৈয়া যায়। শান্তি লাগে।

আমি আবার বিছানায় শুই। মা আইসা মাথার কাছে দাঁড়ায়।

– টেবিলে খাবার দিছি। ওঠ। হাতমুখ ধুইয়া খাইতে আয়।

– আসি, মা।

– কী যে ধান্দার মধ্যে থাকস তুই!

নিষ্করুণ, শান্ত গলায় বলে মা। শাহেদ আইসা হেলান দিয়া দাঁড়ায় দরজায়। পরিচিত ভঙ্গি। দুই হাত আড়াআড়ি বুকে ভাঁজ করা।

– কী যে চক্করে পড়ছ ভাইজান! সন্ধ্যাবেলা না-ঘুমাইলে পারো না?

সমাহিত সুখী চেহারা শাহেদের। আমি উইঠা বসি। অপ্রস্তুত লাগে। দরজায় আবার বেল বাজে। এবার অবশ্য ভড়কাই না। কে আসছে, বুঝতেই পারি।

– তোর আব্বায় আসছে। তাড়াতাড়ি উঠ, হাতমুখ ধুইয়া খাবার টেবিলে আয়।

হ্যারিকেন-হাতে গেইট খুলতে যায় মা।

◙  ◙  ◙


কিছু প্রতিক্রিয়া


মাসুদ খান

দারুণ একটা গল্প, সুমন।
.

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর

ভাষার স্বতঃস্ফূর্ত ধরনটিই অধিক ভালো লাগল। চুতিয়া দেশের চুতিয়া বাহিনীর জলজ্যান্ত বর্ণনা পড়ে একেবারে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিলাম। একেবারে শেষের স্বপ্নবাস্তবতা বেশ তাৎপর্যময়।
চমৎকার গল্প। অশেষ ধন্যবাদ সুমন রহমান।

বাংলাদেশি গল্প নামের কিছু থাকলে এটাকে তা বলা যায়। দুর্দান্ত গল্প। গল্প পড়ছি, রাত আন্দাজ করছি; ফের পড়ছি। তামাম দুনিয়ার অচেনা ভয় আমায় জড়িয়ে ধরতে চাইছে। সন্ত্রস্ত বাংলাদেশের ছবি এতে ঝকঝক করছে। ধন্যবাদ সুমন রহমান।
.

আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ

অন্যরকম, মনে রাখার মতো একটি অভিজ্ঞতার সামনে পড়লাম। সবচেয়ে যে বিষয়টি ভালো লাগল সেটি হলো—এখানে ভাষা গল্প বানায় না। গল্প ভাষা বানায়। তাই ভাষার সাথে কোনো জোর-জবরদস্তি নাই। উপভোগ্য ও চমৎকারভাবে সহনীয়।
.

ফারুক ওয়াসিফ

প্রথম পড়ে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। এখনো মনে পড়লে সেরকমটা হয়। অসাধারণ।
.

ইমরুল হাসান

গল্পটা ছাপা হওয়ার আগে পড়ার সৌভাগ্য আমার হইছিল; তখনই বোঝার চেষ্টা করতেছিলাম, ব্যাপারটা আসলে কী… এইখানের সামাজিক, রাজনৈতিক বিষয়গুলার চাইতেও এই যে ক্রাফটসম্যানশিপ, এইটাই মনে হইছিল অনন্য একটা ব্যাপার… তারপর প্রথম আলোর ঈদসংখ্যায় ছাপা হওয়ায় অনান্য গল্পগুলাও পড়লাম ঈদের সময়… ওইখানে তো একজন রীতিমতো মহাকাব্য লিখে ফেলছেন বর্তমান সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়া… আরো অনান্য বিষয়ের ছোটগল্পও পড়ছি, মনে হইছে যে, সাম্প্রতিকতারে যেমন ফেলে দিবার কিছু নাই আবার মহিমান্বিত করারও আসলে দরকার পড়ে না… কিন্তু বিষয়গুলারে আপনি কিভাবে অ্যাকোমোডেড করলেন গল্পের ভিতর, এইটা দেখার একটা জায়গা…

আপনার গল্প যাঁরা প্রথম পড়বে, তারাও মনে হয় এই জায়গাটা খেয়াল করতে বাধ্য হবে…

আপনার গল্পের টপটেন হিসাব করলে এই গল্পটারে কয় নাম্বারে ফেলব এইটা নিয়া কথা হইতেছিল শুভ্র’র সাথে… শেষে মনে হইলো, সাহিত্যের ক্ষেত্রে এইরকম একটা চিন্তা খুবই অস্বস্তিকর একটা জিনিস…
.

সোহেল হাসান গালিব

এই গল্পের ক্রাফটম্যানশিপে আবারও মুগ্ধ হলাম। বেশ একটা ধাঁধার মধ্যে পড়া গেল। রাশেদ কি সত্যিই ফিরে আসতে পেরেছিল জীবিত অবস্থায়? গল্পের নাম তা বলছে না। উপরন্তু মৃতেরাই বারবার কলবেল বাজাচ্ছে বলে তার মনে হয়।

“র্য্যাবের অফিসার তো বলল ওরা অন্য এক রাশেদরে খুঁজতে গিয়া ভুল কৈরা আমারে ধরছিল।”

এই বাক্যটা গল্পের মধ্যে দ্বিধাটা তৈরি করছে পাঠকের সামনে। মানে, ফিরে সে আসতেও পারে, নাও পারে। রিয়েলিটি এমনই। সেই অনিশ্চয়তা একভাবে শেষ পর্যন্ত ধরে রেখেছে গল্পটা।

“ফাইজলামি করেন? এইটা কি জেহাদি বইয়ের কেইস নাকি?”—এই গল্পের সবচেয়ে মজার, সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সংলাপ মনে হয়েছে।

আরেকটা বিষয় লক্ষ করলাম, সুমন রহমানে গল্প পড়ে, তার ভাষা ও বয়ান থেকে স্পষ্টভাবেই আঁচ করা যায়, এটা সুমন রহমানেরই গল্প, অন্য কারো নয়।
.

মুনশি বিশ্বজিৎ

স্বপ্নময় বাস্তবতা কিংবা বাস্তবিক স্বপ্নালু গল্প… সুমনের গল্পটা পড়ে আমার সেই সুখস্বপ্নটাই দেখতে ইচ্ছা করল… যে স্বপ্নে খাওয়ার টেবিলে একসাথে উপস্থিত বাবা, শাহেদ, রাশেদ… মা ব্যস্ত খাবার পরিবেশনে।

উপর থেকে নাজিল হওয়া রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের যুগে শুধুমাত্র এক নিরাপরাধ ঘুমই বুঝি এই স্বপ্নকল্প সৃষ্টি করতে পারে…!!!
.

মুস্তাইন জহির

ফিরে আসার এই চক্রাকার বৃত্তটা, স্বপ্নে বা মায়ের বাসনায় যে কোনো দিক থেকেই হতে পারে…। কিন্তু সেটা যে হয়ে উঠছে, সন্তর্পণে, শহরের বিজলিহীন হারিকেনের আবছা আলোতে—এটাই এই গল্পে তৈরি প্রধান বাস্তবতা। লাশগুলো ফিরে আসছে, পারিবারিক যূথবদ্ধতায় একত্রিত হচ্ছে… কিন্তু তার পর? ফিরে তাকানো, ফিরে দাঁড়ানো… হতে পারে নাও হতে পারে।

গল্পটা পড়ার পর ফরহাদ মজহারের একটা কবিতার কথা মনে পড়ে গেল হঠাৎ—’লাশ সকল প্রতিশোধ নিবে’।
.

কন্থৌজম সুরঞ্জিত

যে কথা বলা যায়; না বললেও কিছু যায় আসেনা… :
প্রথম পুরুষের কনসেন্ট নাই… এমন একটা ব্যবস্থার মধ্যেই তাকে থাকতে হচ্ছে।… শেষমেষ একটা মানসিক বস্তু উৎপাদিত হয়। যার মধ্য দিয়ে স্বপ্ন এবং বাস্তবের দ্বৈত তৎপরতার মধ্যবর্তী বৌদ্ধিক দেয়ালটা টপকানো যায় সহজেই।…
এবং এভাবে “আমি স্বপ্নের মধ্যেই যেন জানতাম যে এইটা স্বপ্ন, তাই ভয়ডর লাগতেছিল না একদম।”!!
যেন এক সহিংস ইতিবাচকতা!

সুমন রহমান

সুমন রহমান

সহযোগী অধ্যাপক at University of Liberal Arts Bangladesh
জন্ম ৩০ মার্চ ১৯৭০, ভৈরব। দর্শনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পিএইচডি সাংস্কৃতিক অধ্যয়ন-এ।

প্রকাশিত বই :
ঝিঁঝিট (কাব্যগ্রন্থ), ১৯৯৪, নিউম্যান বুকস
সিরামিকের নিজস্ব ঝগড়া (কাব্যগ্রন্থ), ২০০৮, পাঠসূত্র
গরিবি অমরতা (গল্পগ্রন্থ), ২০০৮, মাওলা ব্রাদার্স
কানার হাটবাজার (প্রবন্ধ), ২০১১, দুয়েন্দে

ই-মেইল : sumon.rahman@ulab.edu.bd
সুমন রহমান

Latest posts by সুমন রহমান (see all)