হোম পুনর্মুদ্রণ গদ্য নিতান্ত মাটির মনে হয় তার সোনার মোহর

নিতান্ত মাটির মনে হয় তার সোনার মোহর

নিতান্ত মাটির মনে হয় তার সোনার মোহর
1.50K
0

It’s none of their business that you have to learn to write. Let them think you were born that way.

— Ernest Hemingway

৮০ বছর বয়স শুনলেই রবীন্দ্রনাথের কথা মনে আসে। বাংলা সাহিত্যের কবি-সাহিত্যিকদের বয়সের একটা প্রতীকী মাইলফলক এখন ৮০ বছর। সেই সৌভাগ্য সবার হয় না। কেবল বেঁচে থাকার ভাগ্যে নয়, আদি-অন্ত সৃষ্টিশীল থাকতে পারার তাৎপর্যে। সৈয়দ শামসুল হক সেই স্বল্পপ্রজদের একজন, যিনি রবীন্দ্রনাথের কালিক সেই জীবৎ-ফলক স্পর্শ করেই পা রাখলেন মৃত্যুর অনিবার্য নিঃসীম পথে। সুতরাং তাকে অনায়াসে ভাগ্যবান বলা যায়। কিন্তু এই ভাগ্য, রবীন্দ্রনাথের মতোই, তার নিজের হাতে গড়া। অবশ্যই। কথায় আছে, ফরচুন ফেভারস দ্য ব্রেভ। দুনিয়াজোড়া অ-শৈল্পিক বিনাশযজ্ঞের হুমকিধামকি আর ভয়-আশঙ্কার মাঝখানে তিনি যতি-ছেদহীন অনর্গল লিখে গিয়েছিলেন, এমনকি মৃত্যুর পরোয়ানা মাথায় নিয়েও, অবিশ্বাস্যভাবে, বলা যায় জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লিখেই চলে গেলেন।

এক জীবনে সৈয়দ শামসুল হক বিস্তর লিখেছেন। সমকালীনদের মধ্যে বাংলা ভাষায় বলা যায় তিনি পশিমবঙ্গের সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সহযাত্রী। কবিতা লিখেছেন, গল্প লিখেছেন, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, আত্মজীবনী, শিশুসাহিত্য, গান, চিত্রনাট্য সবকিছুৃই লিখেছেন, আর করেছেন শেক্সপিয়রের কয়েকটি প্রধান ট্র্যাজেডিসহ বিশ্বকবিতার ব্যাপক অনুবাদ। পেয়েছেন জাতীয়-রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মান, স্বীকৃতি, পুরস্কার।


সৈয়দ হকের ভাষা তার নিজের চলতি ঘরানার পৌরুষিক আভিজাত্য নিয়ে সক্রিয়


একজন লেখক তবু শেষ পর্যন্ত টিকে থাকেন তার নিজের একটা জায়গার ওপর দাঁড়িয়ে। সেই জায়গায় দাঁড়াতে না পারলে বাক্সপেটরা নিয়ে তাকে উদ্বাস্তুর মতো সাহিত্যের ইতিহাসে এখানে সেখানে দিন পার করতে হয়। সৈয়দ হক কি নিজের ভিটেমাটি পেয়েছিলেন, হারান নি তো? তার ৮০ বছরের প্রান্তে আজকের তরুণ সাহিত্যকর্মীদের কাতারে দাঁড়িয়ে শঙ্কা বা উৎকণ্ঠা নিয়ে একথা মনে উঁকি দেয়।

যে-কোনো সাহিত্যিকই বেঁচে থাকেন, টিকে থাকেন, এবং সময়ান্তরে ক্রিয়াশীল থাকেন সাধারণত তার ভাষা-শৈলী-দর্শন নিয়ে। সৈয়দ হকের ভাষা তার নিজের চলতি ঘরানার পৌরুষিক আভিজাত্য নিয়ে সক্রিয় থাকতে পেরেছে বলতে হবে। এ-ভাষা কথ্য আর আঞ্চলিককে মাঝেমধ্যে সঙ্গে নিলেও তা গদ্যের সহজ-সাবলীল চলনকে আপ্ত করেছে বেশি মাত্রায়। আরও সহজ করে বললে গদ্যভাষায় তিনি শব্দের ভৌগোলিক যথেচ্ছবিহার ব্যতিরেকে বাংলা গদ্যের সিভিলাইজড বা সুশীল চলনকে ভাষাভঙ্গির মূল ধরন হিশেবে বেছে নিয়েছেন। যেমন সাম্প্রতিক গল্প ‘কানার হাটবাজার’-এ শুরুর লাইনটিই এরকম : ‘কিছুদিন ধরে এক কিশোর আমাদের সাথ লয়েছে। পাছ ছাড়ালেও সে পাছ ছাড়ে না।’ ভাষাকে ‘নগর’ আর ‘অঞ্চল’-এর সাবলীল সিনথেসিসে এভাবে স্বকীয় করে তোলার এই চেষ্টা অবশ্যই গুরুত্ব বহন করেছে পরবর্তী সাহিত্যকর্মীদের মধ্যে। যুদ্ধাপরাধীর বিচার, অন্ত্যজ শ্রেণির সংকট, প্রান্তিক রাজনীতি সবকিছু মিলিয়ে বৃহৎ ক্যানভাসের এই গল্প কণ্ঠস্বরে খানিকটা চড়া হলেও এর বিষয়-উপাদানের বৈচিত্র্য বেশ।

সেই খেলারাম খেলে যা থেকেই শরীর, যৌনতা, সম্পর্কের বহুমাত্রিক বিন্যাস সৈয়দ শামসুল হকের অধিকাংশ লেখার প্রধান বিষয়। কবিতাতেও তাই। রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা-উত্তেজনা-বিশ্বাস থেকে উচ্চারিত পঙ্‌ক্তিমালা, দ্রোহ আর বিপ্লবের কথারাশি ছাড়া বাকি তার কবিতার জগতে প্রেম আর যৌনতা এসেছে ভিন্নভাবে। চলনে বলনে ওয়েস্টার্ন আদল থাকলেও, সৈয়দ হক তার রচনায়, দার্শনিকত সবকিছুকে যুঝতে চাইলেন বাংলার আবেগের জায়গা থেকে। মৃত্যুর শরীর ভেঙেই তিনি রতিপথ ধরে স্বর্গগামী হতে চান। বোদলেয়ারের খানিকটা প্রভাব মনে হলেও যখন লেখেন ‘হর্ষের বদ্বীপমুখে প্রাণপণে চলি দাঁড় বেয়ে’, তখন তা প্রাচ্যের খানিকটা দ্যোতনা তৈরি করে। কঠিন পেশল যুবার নারীশরীরের নৌবিহারে মজে যাওয়া আমাদের লোকায়ত যৌন-চেতনাকেও অনেকটা হাজির করে বৈকি। কবিতাটা হাজির করলাম :

তোমার সম্মত দেহে সারারাত সারারাত আমি
মৃত্যুর শরীর ভেঙে রতিপথ ধরে স্বর্গগামী।
সেই মতো তোমার সমুখে আমি একান্ত বাসরে
নতজানু ক্রমে হই সাক্ষাৎ মৃত্যুর দেখা পেয়ে—
সমুদ্র তখন নয় ভেসে থাকি রতির চাদরে,
হর্ষের বদ্বীপমুখে প্রাণপণে চলি দাঁড় বেয়ে—
তোমার সম্মত দেহে সারারাত সারারাত আমি
মৃত্যুর শরীর ভেঙে রতিপথ ধরে স্বর্গগামী।
(মৃত্যুর শরীর ভেঙে)

শব্দ কেবল উচ্চারণ বা চিন্তার মাধ্যমমাত্র নয়। শব্দকে উপনিষদ বলে ব্র‏হ্ম। ওঙ্কার যেমন অস্তিত্বের আওয়াজ। বাউলতত্ত্বে দেহভাণ্ডে বিশ্বকে খোঁজার আর বোঝার যে তরিকা পেশ করা হয়, তার ভাষাতাত্ত্বিক একটা ব্যঞ্জনা আছে। এই দেহ, এই অস্তি নিজেই শব্দ। দেহ, অস্তি আর শ্রুতিকে ভিন্ন করে দেখার বৌদ্ধিক ভাষা-প্রকল্পকে আধুনিক বয়নেই তিনি ভেঙে দিলেন এভাবে :

আমার ঠোঁটের থেকে একটি যে শব্দ একদিন
ফুটেছিল এই ঠোঁটে তোমারই যে দেহস্পর্শ তাপে,
আজ সেই শব্দ দ্যাখো পৃথিবীর বুকে অন্তরীণ
তবু তারই উচ্চারণে বৃক্ষপাতা বারবার কাঁপে।
(কিছু শব্দ উড়ে যায়)


সময়ের সব একককেই তিনি ভরিয়েছেন বহুলবিন্যস্ত রচনামালায়।


আঞ্চলিক ভাষার সমতল ও গীতল ব্যবহারের জন্য সৈয়দ হক পথ-প্রদর্শক হয়ে থাকবেন। বিশেষত রংপুরের ভাষাকে নাটকে কবিতায় গল্পে তিনি সুগীতল করে ব্যবহার করেছেন। বাংলা কবিতার রোমান্টিকতায়, আবেগপ্রবণতায় একটা নতুন ধরন তিনি নিয়ে এলেন পরানের গহীন ভিতর-এ। গভীরভাবে দেখলে এ-কবিতার নেই-ময়তা, ব্যক্তির শূন্যতাবোধ, পরাজয়ের গহিন ভার সবকিছু বৈষ্ণব পদাবলী থেকে অবশ্যই অনুপ্রেরণা নিয়েছে, সুফীবাদের প্রভাব সেখানে নেই তাও বলা যায় না। কিন্তু তার বয়ানভঙ্গিতে বাংলা কাব্যের বিহ্বলতা, উদ্বেলতা, মেয়েলিপনার সব লক্ষণকে ইমেজ বা দৃশ্যের মুহুর্মুহু যোজনে অনেকটা আড়াল এবং খানিকটা নির্লিপ্তও করে ফেললেন।

যেমন :

তোমার দ্যাশের দিকে ইস্টিশানে গেলেই তো গাড়ি
সকাল বিকাল আসে, এক দণ্ড খাড়ায়া চম্পট,
কত লোক কত কামে দূরে যায়, ফিরা আসে বাড়ি—
আমার আসন নাই, যাওনেরও দারুণ সংকট।
আসুম? আসার মতো আমি কোনো ঘর দেখি নাই।
যামু যে? কোথায় যামু, বদলায়া গ্যাছে যে বেবাক।
কেমন তাজ্জব সব পাল্টায়া যায়, আমি তাই
দেইখাছি চিরকাল। পরানের ভিতরে সুরাখ—
সেখানে কেবল এক ফরফর শব্দ শোনা যায়,
পাখিরা উড়াল দিয়া গ্যাছে গিয়া, এখন বিরান,
এখন যতই আমি ছড়া দেই কালিজিরা ধান,
সে কি আর আঙিনায় ফিরা আসে? আর কি সে খায়?
সকাল বিকাল গাড়ি, চক্ষু আছে তাই চক্ষে পড়ে;
পলকে পলকে গাড়ি সারাদিন মনের ভিতরে।।
(পরানের গহীন ভিতর)

সময়ের পট বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বভাবে আবেগে পিছিয়ে যাওয়ার তথাকথিত পরাজিত একজনের জবানবন্দির মতো করে কথাগুলো বলা। তার ‘আসন নাই, যাওনেরও দারুণ সংকট’, যাওয়ার মতো তেমন কোনো ঘর তার নাই। অস্তিত্ব-সংকটের এই কাব্যিক আকাঙ্ক্ষা আশ্রয় নিল একদমই বাঙলার নিম্নশ্রেণির দীন ভিখারি লোকের মতো কণ্ঠস্বরে। কালিজিরা ধান হার মানে পলকে পলকে গাড়ির দৃশ্য-উপনিবেশের কাছে। এই টানাপড়েনের বয়ান গ্রন্থের প্রায় প্রতিটি কবিতায়। নাগরিক আর লোকায়তের দ্বন্দ্বের, প্রেমের, বিচ্ছেদের কথা ব্যক্তির বিবমিষার মধ্য দিয়ে জন্ম দিল কবিতার নতুন ভাষা আর বিষয়ের। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো ভাষিক সিনথেসিসের সেই বাংলা-কবিতায়ন সৈয়দ হকে পরবর্তীকালে সেই শক্তিতে আর দেখা গেল না। তাই কবিতায় সৈয়দ হক—হয়তোবা—একটি বইয়ের চমক আর সম্ভাবনার মধ্যে শেষ হয়ে গেলেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাঁধে বর্তেছিল বাংলাভাষার আধুনিকায়নের দায়। সৃষ্টিশীল মনের ঘোড়দৌড়ের আনন্দের সঙ্গে সে-দায়ের আত্মভার বয়ে নেওয়াটাও একটা ব্যাপার ছিল। সংস্কৃত আর তৎসম-বিপর্যস্ত বাংলাকে ভাষিক ভঙ্গিমার ক্ষেত্রে মুক্ত করে তোলার একটা প্রয়াস, বিষয়ের দিক দিয়ে জমিদারির কায়কারবারের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা প্রজাসাধারণের বা গণমানুষের জীবনের অনুষঙ্গকে ধরা এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্তের নতুন ভাবনা-আবেগ-সংক্ষোভের নড়াচড়াগুলোকে বোঝার প্রয়াস। এ দুই ধরনের দায় নিয়েে উনিশ আর বিশ শতকের রবীন্দ্রনাথকে মগ্ন ও তৎপর থাকতে হয়েছে বঙ্গসাহিত্যভূমে। এ-বাংলার বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের সৈয়দ শামসুল হককেও আপন সৃষ্টিশীলতার পাগলাঘোড়ার দৌড়ের পাশাপাশি মনে রাখতে হয়েছে একটি ভুখণ্ডের রাজনৈতিক ভাষাতান্ত্রিক নতুন জীবনের অভিঘাতকে নতুন নতুন সাহিত্যিক প্রকরণে ধরে রাখবার দায়। নিজের সাহিত্যিক প্রতিভার ওপর ভরসা রেখে তাই তিনি অনবরত লিখে গিয়েছেন নানা ধরনের লেখাই। তার সাহিত্যিক বায়োগ্রাফি পড়লে বোঝা যায় এমন কোনো বছর যায় নি, তিনি সাহিত্যের কেবল একটি শাখা নিয়ে কাজ করেছেন। সময়ের সব একককেই তিনি ভরিয়েছেন বহুলবিন্যস্ত রচনামালায়।


আল মাহমুদ লৌকিক মিথের ভেতর থেকে যৌনতাকে বোঝার চেষ্টা করেছিলেন, মোহাম্মদ রফিকে তা জলঝড়ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ জীবনের সঙ্গে জোয়ারে-ভাটার রূপকে উপমেয়, আর সৈয়দ হক তাকে করে তুললেন একেবারেই এলিট ও নাগরিক-ইন্টেলেকচুৃয়াল।


এরই মধ্য দিয়ে অনেক সাময়িক প্রয়োজন/আবেগ/আগ্রহ/উদ্দীপনা/অভ্যাস-প্রসূত ফল হিশেবে নানান রচনা বাদ দেয়ার পরও তার এমন সব লেখা টিকে থাকে, যা সংখ্যায় হিশাব করলে যে-কোনো শ্রেয় এবং গুরুত্বপূর্ণ লেখকের জীবনের উত্তম সৃষ্টিকর্মের তুলনীয় হতে পারে শক্তিতে ও বৈশিষ্ট্যে। খেলারাম খেলে যা, নিষিদ্ধ লোবান, পরানের গহীন ভিতর, জলেশ্বরীর গল্পগুলো, অগ্নি ও জলের কবিতা, বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ, বনবালা কিছু টাকা ধার নিয়েছিল, সীমানা ছাড়িয়ে, মেঘ ও মেশিন, নূরলদীনের সারাজীবন প্রভৃতি সাহিত্যকর্ম তার সৃষ্টিকর্মের সেই স্বাক্ষর রেখে যায়।

সৈয়দ হকের বহুধাবিস্তৃত সাহিত্যিক তৎপরতার মধ্যে কাব্যনাট্য একটা স্বতন্ত্র আসন পায় আশা করি। কাব্যনাট্য নামের প্রকরণে তিনি হাত দেন নিজের জীবন মধ্যাহ্নে‎‎ ততদিনে কবিতা, গল্প, উপন্যাস এবং আরও নানা ধরনের প্রকরণে এক পর্যায়ের সিদ্ধি ঘটে গেছে তার। সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক পরিচয় স্পষ্ট করে তোলার একটা তাড়না। মুক্তিযুদ্ধ তখন সাহিত্যের প্রধান বৈষয়িক আশ্রয়; আকাঙ্ক্ষা উদ্দীপনার সংবেদনভূমিও। লিখলেন পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়

মানুষ আসতে আছে যমুনার বানের লাহান
মানুষ আসতে আছে মহররমে ধুলার সমান…

লোকায়ত জীবনের নানান অনুষঙ্গের জোরে উপমা তৈরি করলেন অনর্গল, মুক্তিযুদ্ধের বয়ান করলেন মুক্ত ভাষাতেই। সেখানে প্রগলভতা থাকতেও পারে খানিকটা, পরিমিতির ঈষৎ অভাব দেখা যেতেও পারে, তবু সদ্যস্বাধীন এক দেশের যন্ত্রণা, শ্লাঘা আর সংক্ষুব্ধ সময়ের ইতিহাস হাজির করতে গিয়ে তিনি বাংলার কবিতার অক্ষরবৃত্তীয় প্রবাহকে লোকায়ত ভাষ্যের বেগে ও সঙ্গীতে দুর্দমনীয় করে তুললেন।

নূরলদীনের সারাজীবনএ নাটকের ভাষাকে কাব্যের ঝনঝনানিতে বাজিয়ে তুললেন। লিখলেন—

আগুনপাটের শাড়ি কাড়ি নেয় কোম্পানি কুঠিতে
আগুনপাটের শাড়ি জ্বলি ওঠে তাঁতীর প্যাটোতে।
আগুনপাটের শাড়ি দাউ দাউ করি জ্বলে সারা বাংলাদেশে।

বাংলার রঙ্গমঞ্চ অঙ্গরঙ্গশৈলীর থিয়েটার ছেড়ে ভাষিক আর শাব্দিক দ্যোতনার নতুন নাট্যভাষা পেল। আঞ্চলিক ভাষার যূথবদ্ধ ব্যবহারের সহজতা ব্যক্তির জটিল কল্পবিন্যাসে সিনথেসিস ঘটিয়ে ফেলল। বাংলা সাহিত্যে সৈয়দ হকের বড় চিহ্ন এই জায়গায়। যার পরবর্তী ব্যাপ্ত, বিচিত্র, গভীর আখ্যানকল্প সৃজনে জাদুকরের মতো আবির্ভূত হলেন সেলিম আল দীন। সে আর-এক ইতিহাস। তার বাখান হবে অন্য কোনোখানে।

অতঃপর সৈয়দ হক নব্বইয়ের দশকে এসে লিখলেন ‘ঈর্ষা’। এক প্রৌঢ় শিল্পী, এক যুবক, তাদের দুজনকার দ্বন্দ্বময় প্রেমাষ্পদ এক নারী, যে নিজেও একজন শিল্পী; এই তিনজনকে নিয়ে লেখা কাব্যনাট্যটি মাত্র সাতটি দীর্ঘ কাব্যিক সংলাপের মধ্য দিয়ে বিন্যস্ত। প্রেম, শরীর, শিল্প, যৌন-মনস্তত্ত্ব এ-নাটকের ভাবকল্প। বাংলা ভাষার কাব্যনাট্য, যা রবীন্দ্রনাথের আত্মমুক্তির দার্শনিক ইশারায় ভ’রে ছিল, পরবর্তীকালে বুদ্ধদেব বসুর মিথ-বিনির্মাণের আধুনিক জিজ্ঞাসাসূত্রে খচিত, সেখানে সৈয়দ হক নিয়ে এলেন শিল্প আর শিল্পীর সম্পর্কের রসায়নের মধ্য দিয়ে আবিষ্কৃত হতে থাকা শরীরী জীবনের অবাধ-উদার বিশ্লেষণ। সেখানে এক্সপ্রেশনিস্টিক শিল্পের ভাষার প্রভাব খানিকটা ছিল। অস্তিত্ববাদের আঁচও আছে। আছে চেখভের দ্য সীগাল-এর অন্তর্গত ছাপ। কিন্তু বাংলার নাগরিক হয়ে উঠতে থাকা পাঠকের সামনে তিনি যৌন অবদমন কিংবা যৌন অভিমানকে নিয়ে ব্যক্তির হিপোক্রেসির উপচার করে তুললেন। তাই বাংলা ভাষায়, নাটকের মঞ্চে উপস্থাপনের জন্য লিখিত রচনায় আমরা পেলাম (!) :

… স্তন, পিঠ, নিতম্ব, বা যোনিদেশ—
মানুষের উচ্চারণে রূপ তার যাই হোক, শিল্পীর কাছে, শিল্পের কাছে,
তুলিতে, ক্যানভাসে, রঙে দেহহীন, শরীর-বিযুক্ত বটে এইসব—কেবল
আকৃতি মাত্র, ব্যাস-বেধ-তল নিয়ে এইসবই জীবিতের প্রেমের আকার

আল মাহমুদ লৌকিক মিথের ভেতর থেকে যৌনতাকে বোঝার চেষ্টা করেছিলেন, মোহাম্মদ রফিকে তা জলঝড়ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ জীবনের সঙ্গে জোয়ারে-ভাটার রূপকে উপমেয়, আর সৈয়দ হক তাকে করে তুললেন একেবারেই এলিট ও নাগরিক-ইন্টেলেকচুৃয়াল। সৈয়দ হকের সকল কাব্যনাট্য থেকে ‘ঈর্ষা’ সে-অর্থে ব্যতিক্রম। এটি স্পষ্টত তার সাহিত্যিক পঠন-ভাবনার পরীক্ষামূলক স্বাধীন প্রয়োগ, যদিও তার অনেক-অংশ বাকবাহুল্য, অনর্থস্ফীত অবয়বে হারিয়েছে ‘মহৎ’ রচনার গরিমা।


গান ও কবিতার ভেদ তিনি করতে পেরেছিলেন অসামান্য দক্ষতায়।


লেখকই যে সবসময় আঙ্গিকের ওপর চড়ে বসবে, তা নয়, লেখককে আঙ্গিকের নিজস্ব হেরিটেজ বা জেনার বুঝে তার সাথে নিজের ভাষাকেও অভিযোজন করে নিতে হয়, তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ সৈয়দ শামসুল হক। কবিতায় তিনি লিরিক্যাল, কাব্যনাট্যে সেই লিরিকধর্মে যোগ হলো একটা চড়া মেজাজ, কখনো যা মেলোড্রামাটিক, দর্শকদের সঙ্গে ভাষিক সংযোগের জন্য এই আবেদন-আর্তিমূলক লিরিক্যালিটির দরকার ছিল অবশ্যই, গল্প উপন্যাস যখন লিখতে গেছেন সেখানে স্পষ্টরূপেই বর্জিত হয়েছে কবির কাব্যিকতা বা ভাবালুতার সকলপ্রকার ছাপ, প্রবন্ধধর্মী লেখায় যখন কথা বলতে গেছেন নানান ভাবনায়, তখন তার ভাষা ডায়ালগের সহজ আকর্ষক ধরনে প্রকাশ পেয়েছে। আঙ্গিকের সাথে সাথে তিনি নিজেকে কতটা বদলাতে পেরেছিলেন তার সবচেয়ে প্রধান উদাহরণ, তার লেখা বাংলা সিনেমার গান। ‘নদীর সাথে আমি দেবো না তোমার তুলনা’ কিংবা ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস দম ফুরাইলেই ঠুস’ কিংবা ‘তুমি আসবে বলে কাছে ডাকবে বলে ভালোবাসবে ওগো শুধু মোরে’ এই তুমুল জনপ্রিয় গানগুলো শুনলে মনে হয় তা একজন গীতিকারেরই লেখা, কবির নয়। গান ও কবিতার ভেদ তিনি করতে পেরেছিলেন অসামান্য দক্ষতায়। নগর ও গ্রামের গীতরুচির যে এক ধরনের সহজ রসায়ন তিনি গানের লিরিকে করেছিলেন, তা সম-জামানায় বিরল ঘটনাই।

আলবার্তো মোরাভিয়া বলেছিলেন, প্রকৃত লেখক সেই পাখির মতো, যে তার সমস্ত জীবনে একটি গানই গায় (নানান সুরে)। সে-কথা খাটবে রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ কিংবা নজরুলের ক্ষেত্রেও, কিন্তু সৈয়দ হকে তা ভুল প্রমাণিত হয়। সমস্ত সৈয়দ শামসুল হক মিলিয়ে একজন সৈয়দ শামসুল হককে খুঁজে পাওয়া বা চিনে নেয়া যেন দুরূহ হয়ে ওঠে।

আশি বছরের জীবনে সৈয়দ শামসুল হক একজন শিল্পকার হিশেবে বিষয়ের শাখান্তরে দ্রুতবেগে স্বচ্ছন্দে গমনাগমন করেছিলেন ঠিক, কিন্তু যে ভাববৃক্ষের রস তাকে শক্তি যোগায়, সেই বৃক্ষটির একটি একক পরিচয়চিহ্ন তার সকল শাখাপত্রের বিকাশ বা প্রকাশের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে কিনা শঙ্কা জাগে, যে শঙ্কা তার শেষ অন্তত এক-দেড় দশকের সাহিত্যকর্মের পাঠ-পর্যবেক্ষণ থেকে অধিক রোমকম্পিত হয়। ‎

তবু, সৈয়দ শামসুল হক আমাদের তরুণদের কাছে ছিলেন স্টাইলিশ বা শৈলীময় এক শিল্পপুরুষ। শিল্পের সব শাখায় তিনি বিচরণ করেছেন, ইচ্ছেমতো ফুল-ফল ফলিয়েছেন, এবং অন্তত জীবনের অনেকটা সময় সিনা টান টান করে ভাষাকেও কিভাবে শক্ত মেরুদাঁড়ে খাড়া করা যায়, তার শিক্ষা দিয়ে গেছেন। স্বেচ্ছাধীন শিল্পযাত্রার এই অদম্য গতিই সৈয়দীয়, এবং অবশ্যই আমাদের আগামী পাথেয়। অধিকাংশ রচনার মধ্যেই সহজ কথায় ‘দ্যাশ’ ‘দ্যাশের মানুষ’ ছিল তার একটা উপজীব্য, আর তিনি জানতেনও, মনের ভিতর আপন মানুষগুলো আপন জায়গাগুলো আপন আবহাওয়াটি একটা ফুরফুরে প্রশান্তি ও পিনপিনে বেদনা তৈরি করে রাখলে বাইরে থেকে আনা সব আভরণ অঙ্গসজ্জা কখনো নিজেকে সঙ বানিয়ে ফেলতে পারে না। সেই সঙ্গত স্মার্টনেসই ছিল তার বেশভূষায়, সাহিত্যিক প্রকরণে। ‘বিশ্বমায়ের আঁচল-পাতা’ আপন মাতৃভূমির ব্যাপ্ত অন্তরকে চেনার চেষ্টা করাটা কম কথা নয়। সৈয়দ হক তা করেছিলেন। এজন্যই বলেছিলেন :

মানুষ এমন তয়, একবার পাইবার পর
নিতান্ত মাটির মনে হয় তার  সোনার মোহর।

শুভাশিস সিনহা

জন্ম ২৯ জানুয়ারি ১৯৭৮, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার ঘোড়ামারা গ্রামে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। বর্তমানে মণিপুরি ললিতকলা একাডেমিতে নাট্যপ্রশিক্ষক।

প্রকাশিত বই :
ডেকেছিলাম জল (কবিতা)
অক্ষর নতুন করে চিনি (কবিতা)
বেলা দ্বিপ্রহর (কবিতা)
হওয়া না-হওয়ার গান (কবিতা)
দ্বিমনদিশা (কবিতা)
আবছায়াদের রূপকথা (গল্প)
প্রতিরূপকথা (নাটক)
কুলিমানুর ঘুম (উপন্যাস)
ইঞ্জিন (উপন্যাস)
ভাষা, কবিতা ও রবীন্দ্রনাথ (প্রবন্ধ)
রবীন্দ্রনাথ : গ্রামের ছবি (গবেষণা)
মণিপুরি সাহিত্য সংগ্রহ ২খণ্ড (অনুবাদ ও সম্পাদনা)

ই-মেইল : shuvashissinha@yahoo.com