হোম পুনর্মুদ্রণ দাগ মুছতে গিয়ে যে রঙ ছড়িয়ে গেল

দাগ মুছতে গিয়ে যে রঙ ছড়িয়ে গেল

দাগ মুছতে গিয়ে যে রঙ ছড়িয়ে গেল
649
0

ফরহাদ মজহার যে বইটি লিখেছেন সেটি ক্ষীণস্বাস্থ্য, তাও আবার ‘বিশুদ্ধ অর্থে’ সাহিত্যবর্জিত


২০০৮-এর ফেব্রুয়ারি মাসে ফরহাদ মজহারের রক্তের দাগ মুছে রবীন্দ্রপাঠ  বইটি বেরিয়েছিল। বইয়ের মলাটবন্দি প্রবন্ধগুলির উন্মেষকাল মোটামুটিভাবে ১৯৯২-১৯৯৪ সাল।

ফরহাদ মজহার রবীন্দ্রনাথের ওপর একখানা বই লিখেছেন—এটি একটি ঘটনা বলে মনে হয় এই কারণে যে, আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষক ছাড়া, সৃজনশীল সাহিত্যের কারবারিদের এই জায়গায় চোখে পড়ার মতো গরহাজির দেখতে পাই। তাঁদের পক্ষে আস্ত একটা বই লিখে ফেলা খানিকটা দুর্লভই বলতে হবে। দু-একটি যা আছে তা কতটা মননশীল, সে প্রশ্ন তোলা রইল পাঠকের জন্য।

ফরহাদ মজহার যে বইটি লিখেছেন সেটি ক্ষীণস্বাস্থ্য, তাও আবার ‘বিশুদ্ধ অর্থে’ সাহিত্যবর্জিত। এই বইয়ের আলোচ্য বিষয় রবীন্দ্রনাথের ভাষাচিন্তা এবং ভাষার দক্ষ কারিগর হিশেবে ঠাকুরের আত্মপরিচয় তালাশের সুবাদে কিছুটা অনুচ্চ স্বরে দুতিনটি প্রশ্ন উত্থাপন, যে প্রশ্নগুলি বাঙালি জাতিসত্তার গড়ে ওঠার ইতিহাসের দিকেও নিঃশব্দে অঙ্গুলি নির্দেশ করে। ‘অনুচ্চ স্বরে’ কথাটা বললাম, কারণ, আলোচনাক্রমে আমরা দেখতে পাব, এই প্রশ্ন উত্থাপনের মধ্যে লেখকের কিছু দ্বিধা ও স্ববিরোধিতা রয়েছে। সেটি ঘটেছে সম্ভবত বাঙালির রবীন্দ্র-অধ্যুষিত মনকে অনেকখানি সমীহ করার ফলেই।

মোটের ওপর রক্তের দাগ মুছে রবীন্দ্রপাঠ বইটি শংসামূলক। অভিশংসনের জায়গাটি সংকীর্ণ। কিন্তু সেটিই আমাদের মূল আলোচ্য বা তর্কবস্তু।

কিভাবে আলোচনায় ঢুকব, সেজন্য দুটি পথ বেছে নিয়েছি। প্রথমত, আমরা লেখকের কিছু টুকরো-ছিন্ন মন্তব্য ও সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে করতে এগুব; কখনোবা সংশোধন করতে করতে। দ্বিতীয়ত, মূল তর্কের জায়গা হিশেবে যেটিকে আমরা চিহ্নিত করেছি, তাতে আমাদের কিছু চিন্তা সংযোজন করব পাঠকের বিচারসভার উদ্দেশে। আর একান্তই প্রশংসামূলক জায়গাটি আলগোছে এড়িয়ে যাব, কিন্তু আলোচনাটি শেষ করব সে-সম্পর্কে আমাদের একটি অনুমান ও মন্তব্য হাজির করে।


লেখক রবীন্দ্রনাথের বাপের নাম লিখেছেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর


প্রথমেই একটা লাল ক্রস চিহ্ন দিয়ে আগানো যাক। লেখক রবীন্দ্রনাথের বাপের নাম লিখেছেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর (পৃ ৬০)। আশা করি পরবর্তী সংস্করণে তিনি এটি শুদ্ধ করে নেবেন। তাঁর অন্যান্য লেখার মতো এই গ্রন্থেও সাধারণীকরণের কিছু সমস্যা নজরে এল। ‘ঠাকুরকে টপকে যাওয়া গেল না’ প্রবন্ধে তিনি রবীন্দ্রনাথের গদ্যভাষা নির্মাণে অগ্রসর চিন্তার প্রশংসা করতে গিয়ে তিরিশের কবিদের উপর এক হাত নিতে কসুর করলেন না :

[…] ‘আধুনিক যুগ’ হিসেবে তিরিশের দশকের প্রায় পুরোটাই ছিল মননশীলতার দিক থেকে একটা ফাঁপা বাগাড়ম্বর। তেরছা বাক্যগঠন আর শব্দ বানানোর মিস্তিরিগিরি হয়েছে, সেটা ভালো কাজ। কিন্তু তারা যখন গদ্য লিখতে চেষ্টা করেছেন, সেটা স্রেফ গদ্যই হয়েছে, গদ্যের ভেতর এমন কোনো শাঁস ছিল না যা বুদ্ধিকে নাড়া দেয়, ভাবায়, বুদ্ধদেব বসু আর সুধীন দত্তের গদ্য পড়লেই সেটা টের হবে। কষ্ট করে বিষ্ণু দে-র গদ্যটাও যে কেউ পড়ে দেখতে পারেন।

[পৃ. ২৩]

কিন্তু লেখক জীবনানন্দের ব্যাপারে এখানে কিছু বললেন না, যদিও তাকে আধুনিকতাবাদের পুরোহিতদের কাতারেই ঠেলে দিয়েছেন। আমাদের মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, সত্যি যদি তাদের কথার শাঁস নাই থেকে থাকে, তো পরবর্তী পঞ্চাশ বছরের বাংলা কবিতায় এদের হেজেমনি কিভাবে তৈরি হলো? যদি বলি, কবিতা-ই হেজেমনি তৈরি করেছে, তাহলে কবিতার ইন্টারপ্রিটেশনের ইতিহাসে চোখ বুজে তাকে উপেক্ষার অবলেপন দিয়ে ঢেকে দিতে হয়।


এটা একান্তই সমালোচকের বাসনামূলক দাবি। লেখক কেন রবীন্দ্রনাথকে ডিক্লাসড ভাবছেন


পক্ষান্তরে ‘কথার শাঁস’ রবীন্দ্রনাথের গদ্যে আছে হয়তোবা, কিন্তু থাকলে কী হবে? লেখক বলছেন :

[…] রবীন্দ্রনাথ যখন তাঁর ভাবুকতা ও দার্শনিকতার বিষয়গুলো আলোচনা করতে নামলেন, দেখা গেল তিনি নির্ভর করছেন উপনিষদ, বেদান্ত ও অন্যান্য সংস্কৃত ঐতিহ্যের ওপর। তাঁর দার্শনিক আলোচনা ভারাক্রান্ত হয়েছে গুরুগম্ভীর সংস্কৃত শব্দে; বা এমন সব ধারণা ও প্রতীক তাঁকে ভর করেছে যেগুলো তিনি প্রাচীন হিন্দু ধর্মের ভেতর থেকে সংগ্রহ করেছেন। সাধারণ হিন্দুর জীবনে তার যে অপভ্রংশ প্রাকৃত রূপ আরো হাজারো তদ্ভব ভাবুকতার মধ্যে জড়াজড়ি করে রয়েছে, তিনি সেখান থেকে কুড়িয়ে আনবার আবেগ খুব একটা বোধ করলেন না। ফিরে গেলেন খুব উঁচুতে।… প্রাকৃতজনের প্রাণের ভেতর থেকে উঠে আসা কোনো দর্শনের খেই তিনি ধরতে পারলেন না। টের পেয়েছিলেন লালন খুব বড়ো মাপের মানুষ, কিন্তু কেন বড়ো সেটা বোঝার চেষ্টা করলেন না। সেই কারণে লালন থেকে যখন নিজে নিতে গেলেন তখন লালনের সুরটাই শুধু নকল করতে সক্ষম হলেন, লালনের ভাব থেকে কিছু চুরি করার ক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারলেন না।

[পৃ. ২৯]

এটা একান্তই সমালোচকের বাসনামূলক দাবি। লেখক কেন রবীন্দ্রনাথকে ডিক্লাসড ভাবছেন? মধ্যবিত্ত শ্রেণির বুলিই ছিল তাঁর গদ্যভাবনার ভরকেন্দ্র। কিন্তু ভাবুকতা বা দার্শনিকতার বিষয়গুলিতে প্রাকৃত-জীবনের ধারণা ও প্রতীক নেই বললে, বলতে হবে মন্তব্যকারীর রবীন্দ্রপাঠ শোচনীয়ভাবে খণ্ডিত। অজস্র আছে। এ প্রসঙ্গে দ্রষ্টব্য বিচিত্র প্রবন্ধ-এর ‘পরনিন্দা’, ‘বাজে কথা’, ‘পনের আনা’ শিরোনামীয় লেখাগুলি। এতেও যদি মন না জুয়ায় তাহলে কামার-কুমারের জীবন থেকে উঠে আসা একটা প্রতীক হাজির করা যাক :

[…] কুম্ভকার মূর্তি গড়িবার আরম্ভে কাদা লইয়া যে তালটা পাকায় সেটাকে দেখিয়া মাথায় হাত দিয়া বসিলে চলিবে না। একেবারেই এক মুহূর্তেই আমাদের মতের মতো কিছুই হইবে না।

[‘হিন্দু-বিশ্ববিদ্যালয়’, রবীন্দ্র রচনাবলী ৯, পৌষ ১৪১৫, পৃ ৬১২]

এখন আসা যাক লালন প্রসঙ্গে। এটি ফরহাদ মজহারের খুব প্রিয় প্রসঙ্গ। মানে রবীন্দ্রনাথ আর লালনের মধ্যে ঝগড়া বাঁধিয়ে বাঙালির মধ্যবিত্ত মনকে উচাটনে ফেলে দেয়া। কিন্তু সতর্কভাবে খেয়াল করলে দেখা যাবে এখানে কিছু আবেগ খামাখাই ফুলে-ফেঁপে উঠছে। লেখক বলছেন, “লালন থেকে যখন নিজে নিতে গেলেন তখন লালনের সুরটাই শুধু নকল করতে সক্ষম হলেন, লালনের ভাব থেকে কিছু চুরি করার ক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারলেন না।” তাহলে নিশ্চয়ই তিনি বা অন্যরা পেরেছেন। কেমন সেই পারা? উদাহরণ নেয়া যাক—লালনের দুটি গানের অংশ :

[…] আত্ম ( বা আত্মা) রূপে কর্তা হরি
মনে নিষ্ঠা হলে মিলবে তারি ঠেকনা (ঠিকানা)
বেদবেদান্ত পড়বে যত
বেড়বে (ঘিরবে) তত লকনা (লক্ষণা)।

এই হরি গুরুরূপেও আসেন বটে, ভবনদী পার করবেন বলে।

[…] গুরু যারে হয়ে কাণ্ডারি
চালায় সে অচালা (অচল) তরী
তুফান বলে ভয় কি তারি
নেচে গেয়ে ভবপারে যাবে।
গুরুপদে নিষ্ঠা যেমন যার হবে।


লালনের ভাব চুরি করতে কোন বাঙালি কবি বেশি সামর্থ্য দেখালেন সেটি আমাদের আলোচ্য নয়


ফরহাদ মজহার ঘেঁটে যা পেলাম তা এমন :

[…] গুরুকে ভজনা করি। এই বঙ্গে গুরুই ঈশ্বর
জীবে যদি ব্যক্ত হও তবে গুরু তোমারই প্রতিমা।
জ্ঞানে বা প্রজ্ঞায়, কিম্বা কর্মে বা করণে নশ্বর
মনুষ্যই নিজ গুণে রাষ্ট্র করে আল্লার মহিমা। 

                                                         [‘গুরু’, এবাদতনামা, কবিতাসংগ্র, পৃ. ৩১২]

এটাকে আমরা বলতে পারি ডিথিয়োলাইজেশন; অর্থাৎ দেবত্বলোপ বা মানবে দেবত্বের উদ্ভাসন। কবিতা হিশেবে এটি ঊনসৃষ্টি নিঃসন্দেহে। ‘গুরু’ ‘জ্ঞান’ ‘প্রজ্ঞা’ ‘কর্ম’ ‘করণ’ইত্যাদি লালনীয় রকমারি শব্দের ঝকমারি ব্যবহার। ঝনঝন করে ওঠে, বিবৃতিদানে উচ্ছ্বসিত এ লেখা।

এবার আসা যাক রবীন্দ্রনাথের কাছে। শঙ্খ ঘোষের জবানিতে জানা যাচ্ছে, রবীন্দ্রনাথ মৈত্রেয়ী দেবীকে বলেছিলেন :

[…] আমি কোনো দেবতা সৃষ্টি করে প্রার্থনা করতে পারি নে, নিজের কাছ থেকে নিজের যে মুক্তি সেই দুর্লভ মুক্তির জন্য চেষ্টা করি। সে চেষ্টা প্রত্যহ করতে হয়, না হলে আবিল হয়ে ওঠে দিন।

[এ আমির আবরণ, পৃ ৩৭]

অজিতকুমারকে লিখেছিলেন :

[…] আমার মধ্যে এমন আমি আছে যে আমার চেয়ে ঢের বড়ো, আমার মধ্যে তাকে কুলাবে কী করে?

[এ আমির আবরণ, পৃ ৩৭]

সেই ‘বড়ো আমি’র ইমেজকে সামনে রেখে ‘ছোট আমি’কে বিকাশের পথে জীবনভর সাধনা করে যেতে হয়—এমনটাই তাঁর অভিমত। রবীন্দ্রনাথ কাণ্ডারিকে কিভাবে ধরছেন দেখা যাক :

[…] তুমি   এ-পার ও-পার কর কে গো ওগো খেয়ার নেয়ে?
… … …

দেখি   সন্ধ্যাবেলা ও পার-পানে তরণী যাও বেয়ে।
দেখে   মন আমার কেমন করে,   ওঠে যে গান গেয়ে
ওগো খেয়ার নেয়ে॥
কালো জলের কলকলে   আঁখি আমার ছলছলে,
ও পার হতে সোনার আভা পরান ফেলে ছেয়ে।
দেখি   তোমার মুখে কথাটি নাই ওগো খেয়ার নেয়ে
কী যে তোমার চোখে লেখা আছে দেখি যে সব চেয়ে
ওগো খেয়ার নেয়ে॥
আমার মুখে ক্ষণতরে   যদি তোমার আঁখি পড়ে
আমি তখন মনে ভাবি আমিও যাই ধেয়ে
ওগো খেয়ার নেয়ে॥

                                                                  [গীতবিতান]

তাঁর রচনায় অন্তত ঐসব শব্দের কচকচানি থেকে রেহাই পাওয়া গেল। এবং বোঝা গেল, খেয়ালী মাঝি অন্তত যদি একবার আমাদের দিকে নজর দেয়, তবেই আমরা উত্তরণ পাব। কারণ তখন চোখে চোখে দেখা হবে, নিজের সঙ্গে নিজের।

10850845_856944404350682_492548622_nলালনের ভাব চুরি করতে কোন বাঙালি কবি বেশি সামর্থ্য দেখালেন সেটি আমাদের আলোচ্য নয়, কেননা অপরের ভাব চুরি করতে গেলে সবসময়ই ইনফেরিয়র হয়ে পড়ার সম্ভাবনা। অপরের অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতার ফিউশনের মধ্য দিয়ে একটা রেপ্লিকা তৈরি করাই সম্ভব বড়জোর। নিজে রিক্সাঅলা না হয়ে তার জীবন চিত্রিত করতে গেলে যেটা দাঁড়ায় সেটা রিক্সাঅলার বাস্তবতা নয়, সেটা আমাদের নির্মাণ মাত্র। সেই নির্মাণের কারখানায় যতদিন রিক্সাঅলা প্রবেশ করতে না পারে ততদিন তা নিয়ে বাহবা পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু সে প্রবেশাধিকার পেলে সব চুরমার হয়ে যেতে বাধ্য। অর্থাৎ বাউলিআনা নিয়ে কি রবীন্দ্রনাথ কি ফরহাদ কারুরই পাত্তা থাকে না যদি বাউলের ভয়েস ক্ষমতাকেন্দ্রে জারি থাকে। ফলে এইসব নাগরিক কবিদের জারিজুরি নির্ভর করে লালনদের অনুপস্থিতির ওপর।


তাহলে রবীন্দ্রনাথের এই উক্তির সঙ্গে বঙ্গচ্ছেদের কী সম্পর্ক? আর কেনই-বা সেটা ‘কলকাতাইয়া মাস্তানের হুংকার’ হবে


কিন্তু, নিজের বৃত্তের বাইরে বেরুবার জন্য যে আঁকুপাকু ভাব তার একটা মূল্য নিশ্চয়ই আছে। সেটি রবীন্দ্রনাথের ছিল না বললে সত্যের অপলাপ হয়।

প্রাকৃতজনের প্রতি রবীন্দ্রনাথের উন্নাসিকতার দোহাই পেড়ে ফরহাদ মজহার জাতীয় ভাষার প্রস্তাবনায় তাঁর আরও সংকীর্ণতা আবিষ্কার করেছেন :

[…] ‘কলিকাতা সমস্ত বঙ্গভূমির সংক্ষিপ্তসার’—এটা মনে হয় রবীন্দ্রনাথের নয়, কোনো রগচটা কলকাতাইয়া মাস্তানের হুংকার।… এই মাস্তানি ও গায়ের জোরের আতঙ্কে ‘বঙ্গভূমি’র যে অংশটা এখন বাংলাদেশ নামে পরিচিত, সেটা এক সময় আলাদা হয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।

[রক্তের দাগ মুছে রবীন্দ্রপাঠ, পৃ ৩০]

লেখকের এই সিদ্ধান্তগ্রহণ-পদ্ধতি মারাত্মকভাবে কথা ও কথার পরিপ্রেক্ষিতের নির্লজ্জ টেম্পারিং। রবীন্দ্রনাথের উক্তিটি ছিল মানভাষা বা সাধারণ ভাষা নির্বাচন বিষয়ক প্রস্তাব। যেখানে ছিল আসলে একধরনের লিঙ্গুয়াফ্রাঙ্কার দিকেই অঙ্গুলিনির্দেশ। ভাষার মান-রূপ নির্ধারণের ক্ষেত্রে দেশে দেশে এমন ঘটনাই ঘটেছে। অর্থাৎ নানা ডায়ালেক্টের মধ্যে রাজধানী বা প্রভাবশালী নগরীর ভাষারূপটিই গৃহীত হয়েছে। তাকে সংক্ষিপ্তসার বলবার উদ্দেশ্য, দেশের নানা স্থান থেকে মানুষ এসে রাজধানীতে বসত গাড়ে, ব্যবসা ফাঁদে, ফলে সমস্ত দেশের একটা স্পন্দন টের পাওয়া যায় ঐ একটা নগরীতে। তাহলে রবীন্দ্রনাথের এই উক্তির সঙ্গে বঙ্গচ্ছেদের কী সম্পর্ক? আর কেনই-বা সেটা ‘কলকাতাইয়া মাস্তানের হুংকার’ হবে?


রবীন্দ্রনাথের গানকে জাতীয় সংগীত রূপে গ্রহণ করা মানে প্রকারান্তরে তাকে হিন্দু হিশেবে ঘোষণা করা


[…] ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’নামক গানটি এমন কোনো অসাধারণ গান নয় যে কেবলমাত্র গানের গুণে এইটি আমাদের জাতীয় সংগীত হয়েছে।

[রক্তের দাগ মুছে রবীন্দ্রপাঠ, পৃ ৩৭]

লেখক অবশ্য বলেন নাই রবীন্দ্রনাথের কোনো একটি গানও অসাধারণ কি না। তার মতে রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের অভ্যন্তর থেকে নতুন কোনো গান জাতীয় সংগীত হয়ে উঠলে ভালো হতো। এটিও লেখকের একটি বাসনামূলক আবদার। যুক্তিসংগত দাবি নয়। সেরকম হলে আমরা হয়তো তার কাছ থেকে একটা গানের লিস্ট পেতাম। এ বিষয়ে তার সন্দেহ, যদি পাকিস্তানি শাসক রবীন্দ্রচর্চায় বাধা না দিত, তাহলে আদৌ বাঙালির ‘সোনার বাংলা’কে জাতীয় সংগীত রূপে গাইবার সাধ হতো কি না।

কিন্তু আমার তো মনে হয়, যুদ্ধের শর্ত যুদ্ধের মধ্যে তৈরি হয় না, যুদ্ধের আগেই তৈরি হয়। ঐ গানের মধ্যে যে ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন’—এই শ্লোগান হয়ে উঠবার বারুদ লুকিয়ে ছিল সেটি লেখকের নজর এড়িয়ে গেছে। ‘বন্দে মাতরম’যেমন ব্রিটিশ খেদাবার অনেক আগেই জাতীয় জাগরণের মন্ত্র হয়ে উঠেছিল, সেই মাত্রায় না হলেও ব্যাপারখানা তাই। তারপরও ভারতের জাতীয় সংগীত কেন রবীন্দ্রনাথের গানই হলো—এটিও আমাদের বিবেচনায় রাখা দরকার। বিমূর্ত জাতীয়তাবাদ সব সময়ই জাতীয় সম্পদের অন্বেষণ করে, তাকে মহিমান্বিতরূপে গ্রহণ করে, না হলে তার ভিত্তিমূল শক্ত হবে কিসের জোরে? কেবল মিছিল আর শ্লোগানের উন্মাদনায়? রবীন্দ্রনাথের অধিকতর বিরাটত্বই বঙ্কিমের অসাধারণ গানটিকে টপকে গেল। বাংলা নামের দেশ, ভাষাভিত্তিক জাতীয়তা কী করে রবীন্দ্রনাথকে এড়াবে? বড়কে দলে এনে নিজে জাতে ওঠার প্রবণতাই এখানে কার্যকর হয়েছে। জাতীয় কবি নজরুলের ক্ষেত্রেও। উপরন্তু মানুষের ভালোলাগা, ব্যক্তিবিশেষের জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করাও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির একটা লক্ষণ। কাজেই ফরহাদ মজহার কথিত যে অসাম্প্রদায়িক চেহারা দেশবিদেশে জানান দেবার উদ্দেশ্যে রবীন্দ্রনাথের গানকে গ্রহণ করা হয়েছিল, তা ব্যাখ্যা হিশেবে চিত্তমোদী, বস্তুত অসার। তবে লেখকের এই মন্তব্যে যে কথাটি প্রচ্ছন্ন হয়ে আছে তা গুরুত্বসহ বিবেচনা করা দরকার।

বাংলাদেশ মুসলিম জনগোষ্ঠীপ্রধান একটি রাষ্ট্র হিশেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে, যদি তাকে অসাম্প্রদায়িক চরিত্রে হাজির হতে হয় তবে অবশ্যই সংখ্যালঘুদের দিকে তাকাতে হবে। সেই সূত্রে রবীন্দ্রনাথের গানকে জাতীয় সংগীত রূপে গ্রহণ করা মানে প্রকারান্তরে তাকে হিন্দু হিশেবে ঘোষণা করা। এখন তিনি ব্রাহ্মই হন আর হিন্দুই হন, অথবা কোনোটিই না হন, অন্তত তিনি যে মুসলমান নন, তার আইডি কার্ডে বাংলাদেশ সেই চিহ্ন এঁকে দিল। ফরহাদ মজহারের বক্তব্যের এটাও একটা অর্থ। এখন আমাদের তর্ক হলো, রবীন্দ্রনাথ কি হিন্দু? কেমন হিন্দু? মুসলিম বিদ্বেষী কি? ব্যাপারটা ফয়সালা করা যাক।


বোঝা গেল ধর্ম বিষয়ে কাঁচা বয়সের চিন্তা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের অস্বস্তি আছে


[…] কয়েক বৎসর পূর্বে অন্য একটি কাগজে অন্য একজন লেখক আমার রচিত ধর্মসংগীতের একটি সমালোচনা বের করেছিলেন। তাতে বেছে বেছে আমার কাঁচাবয়সের কয়েকটি গান দৃষ্টান্তস্বরূপ চেপে ধরে তিনি তার ইচ্ছামত সিদ্ধান্ত গড়ে তুলেছিলেন। যেখানে আমি থামি নি সেখানে আমি থেমেছি এমন ভাবের একটা ফটোগ্রাফ তুললে মানুষকে অপদস্থ করা হয়। চলতি ঘোড়ার আকাশে-পা-তোলা ছবির থেকে প্রমাণ হয় না যে, বরাবর তার পা আকাশেই তোলা ছিল এবং আকাশেই তোলা আছে।

[আত্মপরিচয়, রবীন্দ্র রচনাবলী ১৪, পৌষ ১৪১৫, পৃ. ১৫৩ ]

বোঝা গেল ধর্ম বিষয়ে কাঁচা বয়সের চিন্তা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের অস্বস্তি আছে। রবীন্দ্রনাথের দাবি অনুযায়ী তাকে দেখতে হবে কালানুক্রমিকভাবে। সেটি আমরা দেখব। তার আগে দেখা যাক ফরহাদ মজহার তাকে কিভাবে দেখেছেন। তিনি কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে অসাম্প্রদায়িকই মনে করেন। বলছেন :

[…] তিনি একটি বিশেষ সম্প্রদায়ে নিজের অন্তর্ভুক্তিকে কখনোই অস্বীকার করেন নি। করেন নি বলেই মুসলমান লেখককেও তার সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য করেছেন, বাংলা ভাষা ও গদ্যের বিকাশ সাধনে তাদের নিজস্ব অধিকারকে মেনে নিয়েছেন। নইলে মুসলমান লেখকদের মুসলমানি জীবনযাত্রার বর্ণনা করতে বলতেন না, নিজেই অন্য সম্প্রদায়ের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে মুসলমান জীবনযাত্রার বর্ণনায় লেগে যেতেন। নিজের সম্প্রদায়, ধর্ম এবং সংস্কৃতিকে অস্বীকার কিম্বা বিসর্জন দেওয়াটাকে অসাম্প্রদায়িকতা বলে না, এই বুদ্ধিটুকু রবীন্দ্রনাথের ছিল।

[রক্তের দাগ মুছে রবীন্দ্রপাঠ, পৃ ২৫]

এ কথার সমর্থন রবীন্দ্রনাথের জবানেও মিলবে :

[…] আমি নিজের গৃহ নির্মাণ করিতেছি বলিয়া কি সকলে বলিবে, আমি হৃদয়ের সংকীর্ণতাবশত পরের সহিত স্বতন্ত্র হইতেছি। স্বগৃহ না থাকিলে আমি পরকে আশ্রয় দিব কী করিয়া?

[চারিত্রপূজা :‘রামমোহন’, রবীন্দ্র রচনাবলী ২, আশ্বিন ১৪১৫, পৃ.৭৯৫ ]

আরও আছে :

[…] তেমনি হিন্দুর সঙ্গে মুসলমানের যদি বিরোধ থাকে, তবে আমি হিন্দু নই বলিয়া সে বিরোধ মিটাইবার ইচ্ছা করাটা অত্যন্ত সহজ পরামর্শ বলিয়া শোনায় কিন্তু তাহা সত্য পরামর্শ নহে। এইজন্যই সে পরামর্শে সত্য ফল পাওয়া যায় না। কারণ, আমি হিন্দু নই বলিলে হিন্দু-মুসলমানের বিরোধটা যেমন তেমনই থাকিয়া যায়, কেবল আমিই একলা তাহা হইতে পাশ কাটাইয়া আসি।

[আত্মপরিচয়, রবীন্দ্র রচনাবলী ৯, পৌষ ১৪১৫, পৃ ৫৯৪]

কিন্তু ফরহাদ মজহার এ বক্তব্যকে একবার কবুল করে নিয়ে পরক্ষণেই প্রশ্ন তুললেন :

[…] বাংলার এত বড়ো একজন কবি ও মনীষী তিনি, কিন্তু একবারও কেন তাঁর মনে বাংলার অপর একটি বিশাল সম্প্রদায়ের জীবনযাপন, চলাফেরা, আচার-ব্যবহার, ধর্ম সংস্কৃতি, বিয়ে-উৎসব সম্পর্কে কোনো ঔৎসুক্য জাগল না? কেন তিনি কোনো আগ্রহই দেখালেন না মুসলমান সম্প্রদায়কে জানবার বা বুঝবার জন্যে?

[রক্তের দাগ মুছে রবীন্দ্রপাঠ, পৃ ৪১]

তাহলে এর আগে রবীন্দ্রনাথের পক্ষে তাঁর সাফাই গাইবার কী দরকার ছিল? আমরা দেখেছি এই প্রশ্ন আহমদ ছফাও তুলেছিলেন। চল্লিশের দশকেও এই প্রশ্ন বাঙালি মুসলমানের মনে ছিল, তার উল্লেখ পাই কাজী আবদুল ওদুদের প্রবন্ধে :

[…] এই দিনে কোনো কোনো শিক্ষিত মুসলমান বাঙালীর মুখেও শুনতে পাওয়া গেছে এই প্রশ্ন : রবীন্দ্রনাথ একজন অতি বড় কবি, মহামানব, বিশ্বপ্রেমিক, কিন্তু তাঁর বাড়ীর কাছের মুসলমানদের জন্য তিনি কী করেছেন?

[রবীন্দ্রনাথ ও মুসলমান সমাজ]

আবদুল ওদুদ অবশ্য এই প্রশ্নের অসারতা প্রমাণ করতে চেয়েছেন। কিন্তু ফরহাদ মজহার তুলনামূলক যুদ্ধে টেনে এনেছেন নজরুলকে :

[…] বাংলাদেশের জনগণের জাতি হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা ও ইঙ্গিত নজরুলের মধ্যে যে তাৎপর্যে ধরা পড়ে, রবীন্দ্রনাথে সেটা নেই। থাকার কথা নয়। এই আকুতি ও অস্থিরতা রবীন্দ্রনাথে নেই কারণ রবীন্দ্রনাথ সম্প্রদায় ও ঐতিহ্যগত পরিচয়ের দ্বন্দ্বে ভোগেন নি।

[রক্তের দাগ মুছে রবীন্দ্রপাঠ, পৃ ৪০]


কবি হিশেবে নজরুলের বড় ধরনের স্বীকৃতি এসেছে হিন্দুসমাজ থেকেই, কথাটা ফরহাদ মজহারও মেনেছেন


এখানে দুটো কথা বলবার আছে। এক, নজরুলের বাংলার সারস্বত সমাজে গৃহীত হবার দায় ছিল, যে সারস্বত সমাজ মুখ্যত হিন্দু। ফলে অপরের সংস্কৃতিতে অবগাহন তার একটি সাহিত্যিক কৌশল হিসেবেও ধর্তব্য। নিজের ‘মৌলানা’হয়ে পড়ার ভয় যে তার গভীরে আড়াল হয়ে ছিল তার স্বীকারোক্তি মেলে ‘বড়র পীরিতি বালির বাঁধ’ প্রবন্ধে।

[…] সম্ভ্রান্ত হিন্দু-বংশের অনেকেই পায়জামা-শেরওয়ানি-টুপি ব্যবহার করেন, এমনকি লুঙ্গিও বাদ যায় না। তাতে তাঁদের কেউ বিদ্রূপ করে না, তাঁদের ড্রেসের নাম হয়ে যায় তখন ‘ওরিয়েন্টাল’। কিন্তু ওইগুলোই মুসলমানেরা পরলে তারা হয়ে যায় ‘মিয়া সাহেব’। মৌলানা সাহেব আর নারদ মুনির দাড়ির প্রতিযোগিতা হলে কে যে হারবেন বলা মুশকিল; তবু ও নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপের আর অন্ত নেই।

আমি ত টুপি-পায়জামা-শেরওয়ানি-দাড়িকে বর্জন করে চলেছি শুধু ঐ ‘মিয়া সাহেব’ বিদ্রূপের ভয়েই—তবুও নিস্তার নেই।

[নজরুল রচনাবলী, চতুর্থ খণ্ড, বাংলা একাডেমি, ২৫ মে ১৯৯৩, পৃ ২৬-২৭]

Nazrul-Islam-300x336
কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬)

কবি হিশেবে নজরুলের বড় ধরনের স্বীকৃতি এসেছে হিন্দুসমাজ থেকেই, কথাটা ফরহাদ মজহারও মেনেছেন। কারণ, বাঙালি মুসলমান তখনো সাহিত্যের পাঠক হয়ে ওঠে নি পুরোদস্তুর। দুই, আত্মপরিচয়ের সংকট রবীন্দ্রনাথেরও ছিল মনে হয়; তাকে দীর্ঘ সময় কেবল এই তর্কই করতে হয়েছে যে তিনি হিন্দু, ব্রাহ্মধর্ম হিন্দুত্বেরই একটি বিশেষ দশা। হিন্দুসমাজে জাতিচ্যুত বা সংখ্যালঘু হয়ে থাকবার বেদনা তো তাদেরও সইতে হয়েছে।

এখন, রবীন্দ্রসাহিত্যে মুসলিম অনুষঙ্গ বা মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি নেই কেন—প্রশ্নটাকে সাহিত্যিকভাবে মোকাবেলা করাটা সহজ। কারণ একজন লেখকের রচনায় কী নেই তা নিয়ে বিবাদ হতে পারে না, কোনো দাবিও উত্থাপন করা চলে না; কারণ সাহিত্য সংসদীয় গণতন্ত্র নয়। কী আছে, কেমন করে আছে, কতটুকু আছে তাই বিবেচ্য। না থাকাটা অসীম, থাকাটা সসীম। অসীমের দাবি পূরণ কোনো মানবীয় কাজ নয়। দৈব দেন-দরবার সেটা। কিন্তু প্রশ্নটাকে যদি রাজনৈতিকভাবে দেখি তাহলে মুশকিল।

সেক্ষেত্রে আমাদের শুরু করতে হবে রাজা রামমোহন রায় থেকে। কারণ তিনিই ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠাতা। বাংলার রেনেসাঁস আর অন্ত্যজ শূদ্র বইতে কংকর সিংহ মন্তব্য করেছেন :

[…] ইসলাম ধর্মের ওপর গভীরভাবে অনুরক্ত হয়েও তিনি ‘অসহায় হিন্দু’র ওপর মুসলমান অত্যাচারের ইতিহাস প্রচার করেন ১৮২৩ সালে। রেনেসাঁসের তখন ঊষালগ্ন, বলা যায় রামমোহনই প্রথম এদেশে সাম্প্রদায়িক ইতিহাস চর্চার গোড়াপত্তন করেন। যার বিষময় ফল ঊনবিংশ থেকে বিংশ শতকে বিস্তৃতি লাভ করে। এদেশের উচ্চবর্ণের ঐতিহাসিকেরা সেই উত্তরাধিকার বহন করে সাম্প্রদায়িকতার দর্শন থেকে মুক্ত হতে পারেন নি।

[পৃ ২৮]


রবীন্দ্রনাথ যখন হিন্দুত্বের পরিশোধনে অনিত্য আর নিত্যলক্ষণ সন্ধান করতে নামেন, তখনই ফাঁস হয়ে যায় সব আঁতের খবর


প্রেস রেগুলেশনের বিরুদ্ধে ১৮২৩ সালে রামমোহন সুপ্রিম কোর্টের কাছে যে আবেদন লিখেছিলেন তার পরিপ্রেক্ষিতে ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার বলছেন :

[…]So far as India was concerned Rammohan had an unbounded faith in the sense of Justice and goodness of the British Government, and accepted the British rule as an act of Divine providence to deliver India from the tyranny of its Muslim rules. But, curiously enough, he was enamoured of the colonisation of India by the British and glorified the role played by them for civilising the Indians.

[রামমোহন রচনাবলী, সম্পাদনা : প্রসাদরঞ্জন রায়, ডিসেম্বর ২০০৮, পৃ ৭৫১]

ram
রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩)

নীলকরদের পক্ষাবলম্বী যে রামমোহন মুসলিম শাসনের অপঘাত থেকে হিন্দুকে বাঁচানোর দৈব আশীর্বাদরূপে ব্রিটিশকে দেখেছেন ত্রাতা হিসেবে, তাঁকে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন ‘ভারতপথিক’। কোন পথের পথিক?—যে পথ গেছে ঐক্যের দিকে—হিন্দু মুসলিম খ্রিস্টান মিলনের দিকে। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে একটি জাতিকে লুণ্ঠনকারী ঠাউরে তাকে মিলনের জন্য ডাক দেয়ার মধ্যে যে নিষ্ঠুর প্রতারণা, তাকেও তো চিহ্নিত করা দরকার। রবীন্দ্রনাথ বলছেন :

[…] আমরা অগ্রে ভারতবর্ষের মন্দিরে সনাতন ব্রহ্মের প্রতিষ্ঠা করিব; অবশেষে এমন হইবে যে পৃথিবীর চারিদিক হইতে ধর্মার্থীরা ভারতবর্ষের তীর্থক্ষেত্রে ব্রহ্মদর্শন-লালসায় দলে দলে আগমন করিতে থাকিবে। তখনই রাজা রামমোহন রায়ের জয়। তিনি যে সত্যের পতাকা ধরিয়া ভারতভূমে দাঁড়াইয়াছিলেন সেই পুরাতন সত্যের জয়। তখন সেই রামমোহন রায়ের জয়ে, ঋষিদের জয়ে, ব্রহ্মের জয়ে আমাদের ভারতবর্ষেরই জয়।

[চারিত্রপূজা :‘রামমোহন’, রবীন্দ্র রচনাবলী ২, আশ্বিন ১৪১৫, পৃ. ৮০০]

এই উক্তির ভিতরে আলতোভাবে শুয়ে আছে সেই প্রেরণাবাক্য : ‘একধর্মরাজ্যপাশে খণ্ড ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ভারত/ বেঁধে দিব আমি।’

পরবর্তীকালে কালিদাস নাগকে লেখা একটি চিঠিতে তিনি বলেই ফেলেছেন :

[…] পৃথিবীতে দুটি ধর্ম সম্প্রদায় আছে অন্য সমস্ত ধর্মমতের সঙ্গে যাদের বিরুদ্ধতা অত্যুগ্র—সে হচ্ছে খৃস্টান আর মুসলমান ধর্ম। তারা নিজের ধর্মকে পালন করেই সন্তুষ্ট নয়, অন্য ধর্মকে সংহার করতে উদ্যত। এইজন্যে তাদের ধর্ম গ্রহণ করা ছাড়া তাদের সঙ্গে মেলবার অন্য কোনো উপায় নেই। খৃস্টানধর্মাবলম্বীদের সম্বন্ধে একটি সুবিধার কথা এই যে, তারা আধুনিক যুগের বাহন; তাদের মন মধ্যযুগের গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ নয়। … য়ুরোপীয় আর খৃস্টান এই দুটো শব্দ একার্থক নয়। ‘য়ুরোপীয় বৌদ্ধ’ বা ‘য়ুরোপীয় মুসলমান’শব্দের মধ্যে স্বতোবিরুদ্ধতা নেই। কিন্তু ধর্মের নামে যে জাতির নামকরণ ধর্মমতেই তাদের মুখ্য পরিচয়। ‘মুসলমান বৌদ্ধ’ বা ‘মুসলমান খৃস্টান’ শব্দ স্বতই অসম্ভব।

[হিন্দুমুসলমান, রবীন্দ্র রচনাবলী ১২, পৌষ ১৪১৫, পৃ ৬২০]

এই কথাগুলি তিনি বলছেন বাংলা ১৩২৯ মানে ইংরেজি ১৯২২ সালে, যখন তার বয়স ষাট পেরিয়েছে। আশা করা যায় সকল প্রকার পরিপক্বতা তিনি অর্জন করে মানসিক স্থিতাবস্থার দিকে তখন এগিয়ে চলেছিলেন। কিন্তু তিনি যা বললেন তার অর্থ দাঁড়ায় এই যে, মধ্যযুগীয় ভাবনায় আচ্ছন্ন মুসলমানের সঙ্গে আর যাই হোক মিলন সম্ভব নয়। আত্মরক্ষার তাগিদেই তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। এখানে ধর্মীয় আইডেন্টিটির সঙ্গে এথনিক আইডেন্টিটিকে যেভাবে গোলমাল পাকিয়ে তুললেন তা শিশুতোষ বলতে পারলে ভালো হতো, কিন্তু শিশুর ভাবনার মতো নিরীহ তা নয়। একটু খোলাশা করা যাক।


মুসলমানকে আমরা দেখি সংখ্যারূপে—তারা সম্প্রতি আমাদের রাষ্ট্রিক ব্যাপারে ঘটিয়েছে যোগ-বিয়োগের সমস্যা


হিন্দু-জাতীয়তাবাদের উত্থানকালে যে জাতীয় ঐক্যসূত্রের, চরিত্রলক্ষণের সন্ধান চলছিল, তাতে স্বাভাবিকভাবেই এথনিক আইডেন্টিটির সঙ্গে রিলিজিয়াস আইডেন্টিটি একাকার হয়ে গিয়েছিল। হিন্দুত্বের নানা সংজ্ঞা দিতে দিতেই কেটে গেছে উনিশ শতক। ধর্মমতের সংস্কার ও পুনরুজ্জীবনে উতলা এ সময়। কিন্তু হিন্দুত্বের সর্বজনীন ধারণা প্রতিষ্ঠার ব্যর্থতা থেকেই ধর্মচেতনা স্থানান্তরিত হয়েছে ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক চেতনায়। বহুকাল থেকে এই ভূখণ্ডে আবাসনকারী জনগোষ্ঠীই হিন্দু, অর্থাৎ ভারতীয়মাত্রেই হিন্দু—এই ধারণার স্ফুরণ অপেক্ষাকৃত অর্বাচীন, বিশশতকী। তারই প্রচারকরূপে পাচ্ছি রবীন্দ্রনাথকে। এটা অনেক বেশি নমনীয়, যার ফলে হিন্দুত্বের মধ্যে মুসলমান এবং ইংরেজ (খ্রিস্টান)-কেও আঁটানো গেল।

কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যখন হিন্দুত্বের পরিশোধনে অনিত্য আর নিত্যলক্ষণ সন্ধান করতে নামেন, তখনই ফাঁস হয়ে যায় সব আঁতের খবর। ফোঁস করে বের হয়ে আসে মুখোশের আড়ালে মুখ।

[…] ব্রাহ্মসমাজের কেহ কেহ এ সম্বন্ধে এইরূপ তর্ক করেন যে, হিন্দু বলিয়া নিজের পরিচয় দিলে মুসলমানের সঙ্গে আমার যোগ অস্বীকার করা হয়, তাহাতে ঔদার্যের ব্যাঘাত ঘটিয়া থাকে।

বস্তুত পরিচয়মাত্রেরই এই অসুবিধা আছে। এমন-কি, যদি আমি বলি আমি কিছুই না, তবে যে বলে আমি কিছুই, তাহার সঙ্গে পার্থক্য ঘটে; হয়তো সেই সূত্রেই তাহার সঙ্গে আমার মারামারি লাঠালাঠি বাধিয়া যাইতে পারে। আমি যাহা এবং আমি যাহা নই এই দুইয়ের মধ্যে একটা বিচ্ছেদ আছে—পরিচয়মাত্রই সেই বিচ্ছেদেরই পরিচয়।

[আত্মপরিচয়, রবীন্দ্র রচনাবলী ৯, পৌষ ১৪১৫, পৃ ৫৯৩]

এর আগে তিনি বলেছিলেন :

[…] যেটা বাইরে থেকে দেখা যায় সেটা আমার সাম্প্রদায়িক ধর্ম। সেই সাধারণ পরিচয়েই লোকসমাজে আমার ধর্মগত পরিচয়। সেটা আমার মাথার উপরকার পাগড়ি।

[আত্মপরিচয়, রবীন্দ্র রচনাবলী ১৪, পৌষ ১৪১৫, পৃ. ১৫২ ]

এতসব কথা খরচ করেও যে জিনিশটা লুকানো গেল না, তা হলো এই যে, হিন্দুত্ব একটি জাতিগত পরিণাম ঠিকই কিন্তু তা ধর্মীয়। ভারতীয় কথাটি সেই অর্থের সমান্তরাল নয়। পক্ষান্তরে মুসলমান শব্দটি ধর্মপরিচয়কেই নির্দেশ করে। তা আরব সংস্কৃতির উৎসারণ হলেও, আরব জাতীয়তাবাদকে প্রতিনিধিত্ব করে না।

এখন, ভারত-আক্রমণকারী কিংবা সেখানে অভিবাসনকারী অন্য কোনো জাতিকে ধর্মপরিচয়ে সম্বোধন না করে কেবল তুর্কি-মোগল-পাঠানদের মুসলমান নাম ধরে ডাকার মধ্যে সুপ্ত রয়ে গেছে একটি ক্ষোভ বা বেদনা। এর নাম সাম্প্রদায়িক বেদনা—

[…] বাহির থেকে মুসলমান হিন্দুস্থানে এসে স্থায়ী বাসা বেঁধেছে কিন্তু আমাদের দৃষ্টিকে বাহিরের দিকে প্রসারিত করে নি। তারা ঘরে এসে ঘর দখল করে বসল, বদ্ধ করে দিলে বাহিরের দিকে দরজা। মাঝে মাঝে সেই দরজা-ভাঙাভাঙি চলেছিল কিন্তু এমন কিছু ঘটে নি যাতে বাহিরের বিশ্বে আমাদের পরিচয় বিস্তারিত হতে পারে। সেইজন্য পল্লীর চণ্ডীমণ্ডপেই রয়ে গেল আমাদের প্রধান আসর।

তার পরে এল ইংরেজ কেবল মানুষরূপে নয়, নব্য য়ুরোপের চিত্তপ্রতীকরূপে। মানুষ জোড়ে স্থান, চিত্ত জোড়ে মনকে। আজ মুসলমানকে আমরা দেখি সংখ্যারূপে—তারা সম্প্রতি আমাদের রাষ্ট্রিক ব্যাপারে ঘটিয়েছে যোগ-বিয়োগের সমস্যা। অর্থাৎ এই সংখ্যা আমাদের পক্ষে গুণের অঙ্কফল না কষে ভাগেরই অঙ্কফল কষছে। দেশে এরা আছে অথচ রাষ্ট্রজাতিগত ঐক্যের হিসাবে এরা না থাকার চেয়েও দারুণতর, তাই ভারতবর্ষের লোকসংখ্যাতালিকাই তার অতিবহুলত্ব নিয়ে সব চেয়ে শোকাবহ হয়ে উঠল।

ইংরেজের আগমন ভারতবর্ষের ইতিহাসে এক বিচিত্র ব্যাপার। মানুষ হিসাবে তারা রইল মুসলমানদের চেয়েও আমাদের কাছ থেকে অনেক দূরে—কিন্তু য়ুরোপের চিত্তদূতরূপে ইংরেজ এত ব্যাপক ও গভীর ভাবে আমাদের কাছে এসেছে যে আর কোনো বিদেশী জাত কোনোদিন এমন করে আসতে পারে নি। য়ুরোপীয় চিত্তের জঙ্গমশক্তি আমাদের স্থাবর মনের উপর আঘাত করল, যেমন দূর আকাশ থেকে আঘাত করে বৃষ্টিধারা মাটির ’পরে; ভূমিতলের নিশ্চেষ্ট অন্তরের মধ্যে প্রবেশ করে প্রাণের চেষ্টা সঞ্চার করে দেয়, সেই চেষ্টা বিচিত্ররূপে অঙ্কুরিত বিকশিত হতে থাকে।

[কালান্তর, রবীন্দ্র রচনাবলী ১২, পৌষ ১৪১৫, পৃ ৫৩৮]


এই রবীন্দ্রনাথ পরবর্তীকালে পিতার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে শান্তিনিকেতনে যে ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন, সেটিও মর্মগতভাবে আসলে বর্ণাশ্রম


তুলনামূলক আলোচনা খ্রিস্টান বনাম মুসলমান হলে ভালো হতো, অথবা ইংরেজ বনাম মোগল। রবীন্দ্রনাথ কিন্তু তা বলছেন না। ভাবতে অবাক লাগে প্রায় পাঁচশ বছর আগের দখলদার রাজশক্তির সঙ্গে তিনি তুলনা করতে বসেছেন সেদিনের নবীন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির। সে তুলনাও কি নির্মোহ?

[…] বাইরে থেকে প্রথম বিরুদ্ধ আঘাত লাগল মুসলমানের। কিন্তু সে-মুসলমানও প্রাচীন প্রাচ্য, সেও আধুনিক নয়। সেও আপন অতীত শতাব্দীর মধ্যে বদ্ধ। বাহুবলে সে রাজ্যসংঘটন করেছে কিন্তু তার চিত্তের সৃষ্টিবৈচিত্র্য ছিল না। এইজন্যে সে যখন আমাদের দিগন্তের মধ্যে স্থায়ী বাসস্থান বাঁধলে, তখন তার সঙ্গে আমাদের সংঘর্ষ ঘটতে লাগল—কিন্তু সে সংঘর্ষ বাহ্য, এক চিরপ্রথার সঙ্গে আর-এক চিরপ্রথার, এক বাঁধা মতের সঙ্গে আর-এক বাঁধা মতের। রাষ্ট্রপ্রণালীতে মুসলমানের প্রভাব প্রবেশ করেছে, চিত্তের মধ্যে তার ক্রিয়া সর্বতোভাবে প্রবল হয় নি, তারই প্রমাণ দেখি সাহিত্যে।

[কালান্তর, রবীন্দ্র রচনাবলী ১২, পৌষ ১৪১৫, পৃ ৫৩৭]

তাই নাকি? বঙ্গদেশে মুসলিম ভাব-তরঙ্গের অভিঘাত ছাড়া বৈষ্ণবসাহিত্যের, প্রণয়োপাখ্যানের, ময়মনসিংহ গীতিকার, বাউল গানের, সর্বোপরি ভারতের সর্বপ্রান্তের বর্ণবিনাশী সাধনসংগীতের এক্সপ্লোর হতো কি না সে-বিষয়ে আজ তর্ক করাই অনাবশ্যক। অথচ এ কথাগুলি সত্তরোর্ধ্ব রবীন্দ্রনাথের। দেখা যাচ্ছে জীবনের শেষ পর্যায়ে এসেও দৃষ্টিভঙ্গির খুব বেশি বদল হয় নি তাঁর। কিন্তু কেন? আবারও পিছনফিরে দেখা যাক।

দৃশ্যত পৈতাত্যাগী, বস্তুত ব্রাহ্মণহৃদয় দেবেন্দ্রনাথ তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র রবীন্দ্রনাথের উপনয়নের সময় সে-অনুষ্ঠানে আগত রাজনারায়ণ বসুকে শূদ্রজ্ঞানে বিতাড়ন করেন, যে বসু ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের সভাপতি। এই রবীন্দ্রনাথ পরবর্তীকালে পিতার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে শান্তিনিকেতনে যে ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন, সেটিও মর্মগতভাবে আসলে বর্ণাশ্রম। ১৯০২ সালে ব্রজেন্দ্রকুমার দেবমাণিক্যকে লেখা চিঠিতে তারই সাক্ষ্য :

[…] ভারতবর্ষে যথার্থ ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় সমাজের অভাব হইয়াছে, দুর্গতিতে আক্রান্ত হইয়া আমরা সকলে মিলিয়া শূদ্র হইয়া পড়িয়াছি।… আমি ব্রাহ্মণ-আদর্শকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করিবার সংকল্প হৃদয়ে লইয়া যথাসাধ্য চেষ্টায় প্রবৃত্ত হইয়াছি।

[কংকর সিংহ, বাংলার রেনেসাঁস আর অন্ত্যজ শূদ্র, পৃ ৫৫]

একই ব্যক্তিকে লেখা অপর চিঠিতে তিনি জানাচ্ছেন :

[…] আমি ভারতবর্ষীয় ব্রহ্মচর্যের প্রাচীন আদর্শে আমার ছাত্রছাত্রীদিগকে নির্জনে নিরুদ্বেগে পবিত্র ও নির্মলভাবে মানুষ করিয়া তুলিতে চাই।… বিদেশী ম্লেচ্ছতাকে বরণ করা অপেক্ষা মৃত্যু শ্রেয়।

[প্রাগুক্ত]

রবীন্দ্রনাথের এই আশ্রমে একেবারে শুরুর দিকে বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিশেবে যোগ দেন কুঞ্জলাল ঘোষ। জাতিতে তিনি অব্রাহ্মণ। গোল বাধে তখনই। প্রশ্ন ওঠে ব্রাহ্মণ ছাত্র অব্রাহ্মণ গুরুকে প্রণাম করতে পারে কি না। রবীন্দ্রনাথ সাফ জানিয়ে দেন :

[…] যাহা হিন্দুসমাজ বিরোধী তাহাকে এ বিদ্যালয়ে স্থান দেওয়া চলিবে না। সংহিতায় যেরূপ উপদেশ আছে ছাত্ররা তদনুসারে ব্রাহ্মণ অধ্যাপকদিগকে পাদস্পর্শ পূর্বক প্রণাম ও অন্যান্য অধ্যাপকদিগকে নমস্কার করিবে এই নিয়ম প্রচলিত করাই শ্রেয়।

[প্রাগুক্ত, পৃ ৫৬]


এত দীর্ঘ উদ্ধৃতি উপস্থাপন করে আমরা দেখাতে চাইলাম, রবীন্দ্রনাথ তার জীবনের প্রায় গোটাটাই পার করেছেন সনাতন হিন্দু মনস্তত্ত্বকে উদযাপন করতে করতে


স্পষ্টতই সেদিনের রবীন্দ্রনাথকে, এমনকি পঞ্চাশোর্ধ প্রৌঢ়কে, দেখতে পাচ্ছি বর্ণবাদ ও জাতিভেদের সলজ্জ সমর্থক হিসেবে নয়, নিষ্করুণ যোদ্ধারূপে :

[…] পৃথিবীতে অবস্থার অসাম্য থাকিবেই, উচ্চ অবস্থা অতি অল্প লোকেরই ভাগ্যে ঘটে; বাকি সকলেই যদি অবস্থাপন্ন লোকের সহিত ভাগ্য তুলনা করিয়া মনে মনে অমর্যাদা অনুভব করে, তবে তাহারা আপন দীনতায় যথার্থই ক্ষুদ্র হইয়া পড়ে।… য়ুরোপীয় ভ্রমণকারী, নিজেদের দরিদ্র ও নিম্নশ্রেণীয়দের হিসাবে আমাদের দরিদ্র ও নিম্নশ্রেণীয়দের বিচার করে—ভাবে, তাহাদের দুঃখ ও অপমান ইহাদের মধ্যেও আছে। কিন্তু তাহা একেবারেই নাই। ভারতবর্ষে কর্মবিভেদ শ্রেণীবিভেদ সুনির্দিষ্ট বলিয়াই, উচ্চশ্রেণীয়েরা নিজের স্বাতন্ত্র্যরক্ষার জন্য নিম্নশ্রেণীকে লাঞ্ছিত করিয়া বহিষ্কৃত করে না। ব্রাহ্মণের ছেলেরও বাগদিদাদা আছে। গণ্ডিটুকু অবিতর্কে রক্ষিত হয় বলিয়াই পরস্পরের মধ্যে যাতায়াত, মানুষে মানুষে হৃদয়ের সম্বন্ধ বাধাহীন হইয়া উঠে—বড়োদের আত্মীয়তার ভার ছোটোদের হাড়গোড় একেবারে পিষিয়া ফেলে না। পৃথিবীতে যদি ছোটোবড়োর অসাম্য অবশ্যম্ভাবীই হয়, যদি স্বভাবতই সর্বত্র সকলপ্রকার ছোটোর সংখ্যাই অধিক ও বড়োর সংখ্যাই স্বল্প হয়, তবে সমাজের এই অধিকাংশকেই অমর্যাদার লজ্জা হইতে রক্ষা করিবার জন্য ভারতবর্ষ যে উপায় বাহির করিয়াছে তাহারই শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করিতে হইবে।

… য়ুরোপ এই কথা বলেন যে, সকল মানুষেরই সব হইবার অধিকার আছে—এই ধারণাতেই মানুষের গৌরব। কিন্তু বস্তুতই সকলের সব হইবার অধিকার নাই, এই অতি সত্য কথাটি সবিনয়ে গোড়াতেই মানিয়া লওয়া ভালো। বিনয়ের সহিত মানিয়া লইলে তাহার পরে আর কেনো অগৌরব নাই।

[নববর্ষ, রবীন্দ্র রচনাবলী ২, আশ্বিন ১৪১৫, পৃ ৭০১; বাক্যের নিচে রেখাঙ্কন এই লেখকের]

অর্থাৎ গণ্ডিটুকু অবিতর্কে রক্ষা করতেই হবে।

[…] হিন্দুসভ্যতা এত বিচিত্র লোককে আশ্রয় দিতে গিয়া নিজেকে নানাপ্রকারে বঞ্চিত করিয়াছে, কিন্তু তবু কাহাকেও পরিত্যাগ করে নাই—উচ্চ-নীচ, সবর্ণ-অসবর্ণ সকলকেই ঘনিষ্ঠ করিয়া বাঁধিয়াছে, সকলকে ধর্মের আশ্রয় দিয়াছে, সকলকে কর্তব্যপথে সংযত করিয়া শৈথিল্য ও অধঃপতন হইতে টানিয়া রাখিয়াছে।

[ভারতবর্ষীয় সমাজ, রবীন্দ্র রচনাবলী ২, আশ্বিন ১৪১৫, পৃ ৬২৩ ]

বর্ণপ্রথাকে বৌদ্ধতন্ত্র আঘাত করেছিল বলেই তিনি কিন্তু বুদ্ধের সাম্যমন্ত্রের উপর খানিকটা বেজার :

[…] এই ধর্মনীতি যে মানুষের সহিত মানুষের কোনো ভেদকে চিরন্তন সত্য বলিয়া গণ্য করিতে পারে না ক্ষত্রিয় তাপস বুদ্ধ ও মহাবীর সেই মুক্তির বার্তাই ভারতবর্ষে প্রচার করিয়াছিলেন। আশ্চর্য এই যে তাহা দেখিতে দেখিতে জাতির চিরন্তন সংস্কার ও বাধা অতিক্রম করিয়া সমস্ত দেশকে অধিকার করিয়া লইল। এইবার অতি দীর্ঘকাল পর্যন্ত ভারতবর্ষ ক্ষত্রিয়গুরুর প্রভাব ব্রাহ্মণের শক্তিকে একেবারে অভিভূত করিয়া রাখিয়াছিল।

সেটা সম্পূর্ণ ভালো হইয়াছিল এমন কথা কোনোমতেই বলিতে পারি না। এইরূপ একপক্ষের ঐকান্তিকতায় জাতি প্রকৃতস্থ থাকিতে পারে না, তাহার স্বাস্থ্য নষ্ট হয়। এই কারণেই বৌদ্ধযুগ ভারতবর্ষকে তাহার সমস্ত সংস্কারজাল হইতে মুক্ত করিতে গিয়া যেরূপ সংস্কারজালে বদ্ধ করিয়া দিয়াছে এমন আর কোনোকালেই করে নাই। এতদিন ভারতবর্ষে আর্য-অনার্যের যে মিলন ঘটিতেছিল তাহার মধ্যে পদে পদে একটা সংযম ছিল—মাঝে মাঝে বাঁধ বাঁধিয়া প্রলয়স্রোতকে ঠেকাইয়া রাখা হইতেছিল।… অবশেষে একদিন এই বৌদ্ধপ্রভাবের বন্যা যখন সরিয়া গেল তখন দেখা গেল সমাজের সমস্ত বেড়াগুলা ভাঙিয়া গিয়াছে। যে একটি ব্যবস্থার ভিতর দিয়া ভারতবর্ষের জাতিবৈচিত্র্য ঐক্যলাভের চেষ্টা করিতেছিল সেই ব্যবস্থাটা ভূমিসাৎ হইয়াছে। বৌদ্ধধর্ম ঐক্যের চেষ্টাতেই ঐক্য নষ্ট করিয়াছে।

[ভারতবর্ষে ইতিহাসের ধারা, রবীন্দ্র রচনাবলী ৯, পৌষ ১৪১৫, পৃ ৫৮৪]

এত দীর্ঘ উদ্ধৃতি উপস্থাপন করে আমরা দেখাতে চাইলাম, রবীন্দ্রনাথ তার জীবনের প্রায় গোটাটাই পার করেছেন সনাতন হিন্দু মনস্তত্ত্বকে উদযাপন করতে করতে। সেখানে মুসলমান ‘যবন’আধুনিক ভাষায় ‘অপর’হয়েই বিরাজ করে। কিন্তু বিশ শতকের শুরুতে বিশেষত বঙ্গভঙ্গের পর থেকে দ্বিতীয় দশক—এই সময়ের মধ্যে মুসলমানদের রাজনৈতিক উত্থান যখন অতি দ্রুত হিন্দু-হেজেমনিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে থাকল, তখন থেকেই ‘মুসলমান’বিষয়কে রবীন্দ্রনাথ এনকাউন্টার করতে লাগলেন। কিন্তু কখনোই মুসলিম জনগোষ্ঠী ও জনসংস্কৃতি তার বিবেচনায় ঢুঁ মারতে পারে নি। এ ব্যাপারে তার পর্যালোচনা, এমনকি গল্পগুলি, বিশেষত ‘দালিয়া’বা ‘মুসলমানীর গল্প’র ক্ষেত্রেও দেখি, এসবের পটভূমি বা পাটাতন সেই পাঠানমোগল আমল। সাধারণ গড়পড়তা মানুষ বা তার দৈনন্দিন জীবন নয় যেন। রবীন্দ্রনাথ যেভাবে ধীরে ধীরে নিজেকে পাল্টে নিচ্ছিলেন, পাশাপাশি মুসলিম জনগোষ্ঠী যেমন সরব হয়ে উঠছিল, তাতে অনুমান করা যায় তার লেখায় এদের প্রবেশ ঘটত। কিন্তু আয়ুষ্কালের মধ্যে যে লেখককে আমরা পাই, তার মনস্তত্ত্বের যে গড়ন দেখতে পাই, তাতে করে ঐ সময়ে এটি ঘটা সম্ভব ছিল না। তাই রবীন্দ্রসাহিত্যে বাঙালির সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী গরহাজিরই থেকে গেল।

যদিও তার আত্মপরিচয় প্রবন্ধে কিছু ফ্যান্টাসির সাক্ষাৎ মেলে :

[…] কোনো হিন্দু পরিবারে এক ভাই খ্রীস্টান এক ভাই মুসলমান ও এক ভাই বৈষ্ণব এক পিতামাতার স্নেহে একত্র বাস করিতেছে, এই কথা কল্পনা করা কখনোই দুঃসাধ্য নহে বরঞ্চ ইহাই কল্পনা করা সহজ—কারণ ইহাই যথার্থ সত্য, সুতরাং মঙ্গল এবং সুন্দর।

[ আত্মপরিচয়, রবীন্দ্র রচনাবলী ৯, পৌষ ১৪১৫, পৃ ৫৯৯]

মনে হয় অমিতাভ বচ্চন অভিনীত ‘অমর আকবর এন্টনি’ ছবির কাহিনিনির্মাতার বক্তব্য শুনছি।


আমরা কি চাইছি তাকে আসামি বানিয়ে কোনো নিষ্ঠুর রায় দিতে? আজকের জাতিগত মনস্তত্ত্বের সাংস্কৃতিক কাঠামোয় তাকে খারিজ করে রাখতে


তাহলে শেষ কথা কী দাঁড়ালো? রবীন্দ্রনাথ হিন্দু, মডারেট হিন্দু এবং হিন্দু-হেজেমনির প্রবলপ্রাণ সৈনিক। কিন্তু তার হিন্দুত্ব সংকোচনশীল নয় বরং সম্প্রসারণশীল। অর্থাৎ ধর্মসংস্কৃতির প্রশ্ন রবীন্দ্রনাথ সবসময়ই ইনক্লুডিং পদ্ধতিতে মোকাবেলা করেছেন, কোনো কিছু এক্সক্লুড করতে চান নি। তাঁর দৃষ্টিতে ব্যাসদেব যেমন, আমাদের দৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথ তেমন। অর্থাৎ বহুকিছুকে মিলিয়ে একটা আধুনিক মহাভারত রচনার স্পিরিট ছিল তাঁর মধ্যে। কিন্তু সেই মেলানোটা সমতাভিত্তিক নয়। অধিকন্তু, বর্তমানে দাঁড়িয়ে অতীতের দিকে ফিরে তাকানোয় তাঁর যে দরদ, ভবিষ্যতের দিকে হাত বাড়াতে সেটুকু পরিমাণ ব্যাকুলতা ছিল না। তাই রবীন্দ্রনাথকে তাঁর কালের অগ্রসর চিন্তানায়করূপে কখনোই পাওয়া যায় না। হেজেমনির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে দেখি না তাঁকে। বরং সমাজে চালু ভাবচিন্তার বর্ণচ্ছটায় সফল বার্ণিকের দায়িত্বটি পালন করেছেন অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে।

ফরহাদ মজহারের আলোচ্য বিষয় ছিল ভাষা ও ভাষার কারিগরের কিছু তত্ত্বতালাশ। আমরা জানতাম ভাষা কোনো মতেই সুপারস্ট্রাকচার নয়। কাজেই ভাষাব্যবহারকারী তার ভাষিক আচরণেই ধরা দেবে গোপনে। তবু প্রশ্ন থেকে যায়। সাহিত্যে ভাষা ব্যবহারের যেমন একটা স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ রয়েছে, সমাজবিধি পালনে তেমনটা আছে কি? সে-কারণে ভাষিক জঙ্গমতা অর্জনে রবীন্দ্রনাথ যতটা সার্থক, সামাজিক বিপ্লবে ততটা নন। সেখানে কিছুটা মন্থর ও দ্বিধান্বিত পদে পদে, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে সনাতনপন্থী, প্রতিক্রিয়াশীল। বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে ওঠে যখন আমরা দেখতে পাই, তাঁর ভাষা অনেক কিছুকে আবাহন করলেও একটি বড় জনগোষ্ঠীর সামনে দুয়ার এঁটে রেখেছে নিঃশব্দে।

কিন্তু আজ এতদিন পর রবীন্দ্রপ্রসঙ্গে তাঁর ‘আত্মপরিচয়’-এর শুলুক সন্ধান জরুরি হলো কেন? আমরা কি চাইছি তাকে আসামি বানিয়ে কোনো নিষ্ঠুর রায় দিতে? আজকের জাতিগত মনস্তত্ত্বের সাংস্কৃতিক কাঠামোয় তাঁকে খারিজ করে রাখতে? আমরা তা মনে করি না। বরং কাল-পরম্পরায় একটা বড় পর্যায় হিসেবে রবীন্দ্রনাথকে পর্যালোচনা করা দরকার। অভিভূত মনকে পিছে ফেলে জাতির চিত্তবিকাশের অভিমুখ নির্ণয়ে এছাড়া গত্যন্তর নেই। রাজশক্তি কিংবা ক্ষমতাকেন্দ্রে অধিষ্ঠিত সম্প্রদায়-বিশেষের দৃষ্টিকোণ থেকে আত্মপরিচয় তালাশে একটা সীমাবদ্ধতা ও ছেদ বরাবর থাকবে। বরং জনমানসে, জনসংস্কৃতিতে, জনগণের ভাষায় সেই সীমাবদ্ধতা বা ছেদ ঘুচাবার একটা জ্যান্ত প্রয়াস লক্ষণীয়। ব্যক্তির ভেতরে মুক্তির ইশারা ততটাই স্ফূর্তি পায়, যতটা তার খেয়াল থাকে জনমনস্তত্ত্বে। সম্ভবত এমন একটা কথার ইঙ্গিত বা অভিপ্রায় রয়ে গেছে ফরহাদ মজহারের রবীন্দ্র-পর্যালোচনার মধ্যে।


আহমাদ মাযহার সম্পাদিত
বইয়ের জগৎ’ পত্রিকা থেকে
সোহেল হাসান গালিব
গালিব

সোহেল হাসান গালিব

জন্ম : ১৫ নভেম্বর ১৯৭৮, টাঙ্গাইল। বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর।
সহকারী অধ্যাপক, ঢাকা কলেজ, ঢাকা।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
চৌষট্টি ডানার উড্ডয়ন ● সমুত্থান, ২০০৭
দ্বৈপায়ন বেদনার থেকে ● শুদ্ধস্বর, ২০০৯
রক্তমেমোরেন্ডাম ● ভাষাচিত্র, ২০১১
অনঙ্গ রূপের দেশে ● আড়িয়াল, ২০১৪

সম্পাদিত গ্রন্থ—
শূন্যের কবিতা (প্রথম দশকের নির্বাচিত কবিতা) ● বাঙলায়ন, ২০০৮
কহনকথা (সেলিম আল দীনের নির্বাচিত সাক্ষাৎকার) ● শুদ্ধস্বর, ২০০৮।

সম্পাদনা [সাহিত্যপত্রিকা] : ক্রান্তিক, বনপাংশুল।

ই-মেইল : galib.uttara@gmail.com
সোহেল হাসান গালিব
গালিব