হোম পুনর্মুদ্রণ গদ্য দর্জিঘরে সেলাই হতে হতে

দর্জিঘরে সেলাই হতে হতে

দর্জিঘরে সেলাই হতে হতে
231
0

কবিতা হয়ে ওঠার বিষয়। কিন্তু এই হয়ে ওঠাটা আসলে কেমন? এটা কি অলৌকিক? না। তবে কবিতা একটা স্বতঃস্ফূর্ততা বা গতিশীলতা দাবি করে । এটা না থাকলে কবিতাকে আরোপিত মনে হয়। এই রকম কিছু কবিতার দেখা মেলে দর্জিঘরে এক রাত বইটিতে

 

শূন্যতা বল্লম এক গেঁথে আছে দর্জিমহলে

দশবস্ত্রে দিগম্বর বেশ্যার ইশারা আজ মেঘেতে ধাবমান
তাই লক্ষ শিশ্ন হাতে দর্জিদল মেঘে ধাবমান
————————————
সবুজ প্রিজমে আমি চোখ রেখে সবকিছু দেখি

Call me, feeling lucky, wild—ভ্যালেনসিয়াস সিক্রেটের কয়েকটি পণ্যের নাম, যাদের টার্গেট কাস্টমার ১২-১৫ বছরের টিনেজ গার্ল। এভাবেই যৌন সুড়সুড়ির মাধ্যমে নারীকে ক্রমশ পণ্যের কাতারে ফেলে দেয়া হচ্ছে। কবির সংবেদনশীলতা এই সমাজ-বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলে দর্জিঘরে এক রাত কবিতায়।

অগ্রজ কবি জুয়েল মাজহারের প্রথম কাব্যগ্রন্থ দর্জিঘরে এক রাত। বস্তুবাদী জীবনযাত্রার প্রতি এক ধরনের অনীহার প্রকাশ মেলে তার কবিতায় ।

পাতারা অকারণেই ঝরছে আর দিনভর কেশে চলেছে ভূতগ্রস্ত আশ্চর্য মেশিন

এই বস্তুবাদী উপকরণের মধ্যেই আবার প্রাণময়তার সন্ধান মেলে, যেমনভাবে আমরা মিশে থাকি এই গতিশীল বাস্তবতায় স্রেফ নিয়তির মতো।

এঞ্জিনের শব্দ আর রোবটের কাশি শোনা যায়

বিষয়কে বহুমাত্রিকভাবে দেখা এবং এর সুসংহত প্রকাশের একটা উৎকৃষ্ট নিদর্শন ‘কার্পাস তুলোর মধ্যে’ কবিতাটি। যেখানে কার্পাস তুলোকে উড়ে যেতে দেখি সমুদ্রের পাড়ে, ঝাউয়ের বনে। কখনো সে শত হাসি, কখনো শাদা পেখম, কখনো মৃত্যুদিনের শুভ্র কাফন, শিশুর শিয়রে শাদা শাদা বেলুন।

‘দেখার জন্য দূরত্ব দরকার । প্রতিটি শিল্পকলা ব্যবহার করে একটি যাদুবাতি, যা তার বিষয়বস্তুকে দূরে সরিয়ে নেয় ও রূপান্তরিত করে’—‘মেগাস্থিনিসের হাসি’ কবিতাটি পড়তে পড়তে হুমায়ূন আজাদের এই উপলব্ধিটাই নতুন করে হলো ।

নিঃশব্দ কামানে তুমি একা বসে ভরছো বারুদ
শীতকাল গেল;
নিঃশব্দ কামানে তুমি একা কেন
ভরছো বারুদ?

আমি ভাবছি;
মেগাস্থিনিসের হাসিও কি মেগাস্থিনিস?

কবিতা হয়ে ওঠার বিষয়। কিন্তু এই হয়ে ওঠাটা আসলে কেমন? এটা কি অলৌকিক? না। তবে কবিতা একটা স্বতঃস্ফূর্ততা বা গতিশীলতা দাবি করে । এটা না থাকলে কবিতাকে আরোপিত মনে হয়। এই রকম কিছু কবিতার দেখা মেলে দর্জিঘরে এক রাত বইটিতে । যেমন ‘পাতাল পুরাণ’, ‘ব্রায়ান লারা’।

প্রত্যেক কবির মধ্যেই সপ্নময়তা বিরাজ করে। কবির আকাঙ্ক্ষা বদলাতে চায় অনেক কিছু। এক্ষেত্রে জুয়েল মাজহারও ব্যতিক্রম নন ।

সূর্যদিন ডুবে গেলে নদীতীরে একা বসে ভাবি :
রক্ত, যুদ্ধ, ভয়াবহ মেশিন, দামামা
খুনির কাহিনি দিয়ে গড়া
………………………
কেবলি মেশিন বাজে
সকাতরে আজ তাই বলি
মেশিনের চেয়ে ঢের খাঁটি এই পাতাটিকে মানুষ দেখুক

mega2
◊◊শুদ্ধস্বর, একুশে বইমেলা ২০১৫; মূল্য : ১৪০ টাকা

 

আধুনিক কবিতার প্রধান একটি অনুষঙ্গ রূপক। বাস্তবের মাঝেই এটা সৃষ্টি করতে পারে অনুপম পরিবেশ। যেখানে কবিতাকে মনে হয় অনেক বেশি স্বাধীন, মুক্ত-বিহঙ্গ। বস্তুর মূল্য-বিন্যাস বদলে দিয়ে এটা বাস্তবের শৃঙ্খল থেকে কবিতার উত্তরণ ঘটায় , সৃষ্টি করে শিল্প ।

ট্রটোস্ফিয়ার ছেড়ে উড়ে যাচ্ছে ধ্রুপদ বেলুন

কবি দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান উভয় জগতকে ধারণ করতে চান। কিন্তু এটা দৃশ্যমান জগতের অনুকরণ নয় বা অদৃশ্যমান জগতের প্রথাগত রূপ নয় ।

আলস্যে উবুড় হয়ে মদালস ঘড়ি শুয়েছিল
সেই ফাঁকে ঘড়ির তিনটি কাঁটা
চুপিচুপি উড়াল দিয়েছে

শিল্পের পূর্ণতা অভ্যন্তরীণ বা অন্তঃপ্রকাশে। এক্ষেত্রে শুদ্ধ অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাই চালিকা শক্তি এবং এই প্রকাশের রূপ হয় শুদ্ধ এবং মুক্ত ।

হেরাক্লিতাসের নদীতে দ্যাখো ভেসে চলেছে
অটোহানের লৌহ-ময়ূরেরা

সকালের রেস্তোরাঁয়, দ্যাখো, টনকে টন গমদানা
ফুলে উঠছে সূর্য-তন্দুরের আঁচে।

……………………………………………
আগুন নিভল কিনা দেখো,

দ্যাখো, দিনের আশ্চর্য রুটি কার দিকে প্রথমে দৌড়ায়

কবিতার ব্যাখা কোন সরলরৈখিক ব্যাপার নয়। তন্দুরের পাশে বসে কবিতাটি পড়তে পড়তে এই ধারণাটি আরো পোক্ত হলো। বিনয়ের ভুট্টা থেকে জন্ম নিচ্ছে ঝাউবন। সিলভিয়া প্লাথের নির্মম পরিণতি আমাদেরকে ছুঁয়ে যায়।

কতোরকম তাস উড়ছে বাতাসে
চাষধরাকলে ক্রমশ ভরে উঠছে আমাদের রক্তপলিটন
আর কবি দাঁড়িয়ে আছেন জ্বলন্ত গ্যাস বার্নারের সামনে
অহো সিলভিয়া প্লাথ! নিজেকে পোড়ালে তুমি কাচের মতো
—নড়ে উঠলো ভ্রম দুর্বিপাক!

 

———
রাসেল আহমেদ ও সারাজাত সৌম সম্পাদিত ছোট কাগজ

ঘুঘু , ফেব্রুয়ারি ২০১৫ সংখ্যা থেকে