হোম গদ্য গল্প তোমার মায়ের সঙ্গে আমার যেভাবে দেখা হয়েছিল

তোমার মায়ের সঙ্গে আমার যেভাবে দেখা হয়েছিল

তোমার মায়ের সঙ্গে আমার যেভাবে দেখা হয়েছিল
1.35K
0

টিকেট কেটে দাঁড়িয়ে আছি। একটা পেসেঞ্জার-ট্রেন কিছু লোক নামিয়ে দিয়ে চলে গেল। এতক্ষণ ফাঁকা ছিল স্টেশন, এখন আবার গমগম করছে। কোলাহল তৈরি হয়েছে চারদিকে। দীর্ঘক্ষণ একাকী চুপ করে আছি বলে মনে হয় বোবা হয়ে গেছি। মনের ভেতর এতক্ষণ জড়িয়ে থাকা কল্পিত অর্থগুলো, খণ্ডন, সংঘর্ষ, বিরোধ, কিছু মেনে নিয়েছি, কিছু আলাদা করে রেখেছি পরে ভেবে দেখব বলে। কয়েকজন দিনমজুর প্লাটফর্মের ওপর সারি বেঁধে সারি ভেঙে পাছা লেট্টা মেরে বসে আছে। হোগলার বেত-চেরা ঝুড়ি আর কোদালগুলো তাদের সামনে ক্রমাগত বিনিময়মুখর ক্ষয়িষ্ণু বর্তমান নিয়ে স্থির পড়ে আছে।


সূর্য তখন পিতার মতো, অবাধ্য পুত্রের কান মলে দেয়।


একজন তরমুজঅলা তার ফলগুলো ফালি ফালি করছে। তরমুজঅলার লিকলিকে কোমরে প্যাঁচানো প্রায়-নতুন একটা লাল-নীল গামছা। সে কিছুক্ষণ পর পর গামছার মাথায় হাত মোছে। এই যে তৃষ্ণা জুড়ানো সুঠাম ফলের গভীরে কিছু কৃষ্ণচূড়া আছে, রৌদ্রের অবিরল জগৎ আছে, আমাদের শরীর ভরে ওঠে সূর্যের মর্মরে। হঠাৎ জাগিয়ে দেয়া একটা ঢেউয়ে আমরা ভিজে যাই, টুপটাপ করে তরমুজরস গড়িয়ে পড়ে শিশুর ফ্রকে। সূর্য তখন পিতার মতো, অবাধ্য পুত্রের কান মলে দেয়। একজোড়া সম্ভবত নববিবাহিত দম্পতি প্রণয়ের হাস্যোজ্জ্বল উপভোগের মধ্যে আছে। গতরাতের শরীর ও তাপের উদ্দীপনা, এই অতৃপ্ত বদমাশ কখনও আমাদের ছেড়ে যায় না। আমরা বহুযুগের অযাচার যৌনপ্রক্রিয়ার ফল, আমাদের কষ্ট হয় এই ভাবমূর্তি ধরে রাখতে। ট্রেন এসে গেলে আমরা গ্যাঞ্জাম ঠেলেঠুলে ‘ঝ’বগিতে উঠে যাই। ট্রেন প্লাটফর্ম ছেড়ে এসে এখন বিন্দাস হাওয়ার উপর দিয়ে চলছে। ঝিকঝিক ঝিক। পোঁওওওও।

বগির ভেতর কারও মুঠোফোনে একটা গান বাজে। মনে হয় দূর থেকে আসছে, কাছে এসে টোকা দিয়ে যাচ্ছে। এমন গানের ভেতর কোনো কথা নেই, শুধু সুর আছে। ভেঙে যাচ্ছে আবার বাজছে, ঝিকঝিক ঝিক ধ্বনির ভেতর থেকে সে সুর তুলে আনা গেছে। মনে হলো কোনো দুঃখশীল গিটার বাজতে বাজতে গগনপাখি হয়ে উড়ে গেল। আমাদের হাত থেকে কিছু একটা ছিনিয়ে নিয়ে দৌড়াল, মুহূর্তপলের মাটির প্রতিমা বধির হয়ে জাগে। আমার মুখোমুখি সিটে মেয়েটি একা বসে আছে, আমরা দুজন মিলে একটি জানালা ভাগাভাগি করছি। মেয়েটি নিশ্চয়ই বয়সে আমার চেয়ে বড়। কারও প্রতি, কোনো কিছুর প্রতি আগ্রহ নেই তার। বোঝা যাচ্ছে একা-ই এসেছে।

ঢাকা থেকে দেওয়ানগঞ্জগামী ভাওয়াল এক্সপ্রেস ট্রেনের একটি বগি। ট্রেন চলছে, রোদ আর ছায়া কেটে আমরা ছুটছি। এই রোদ, এই আবার কোনো গাছের পাতা বা ডালের ছায়া এসে মেয়েটির মুখে পড়ছে, আবার সরে যাচ্ছে মুহূর্তে। বগির মাঝখানে যাত্রী হাঁটার জায়গায় কিছু নারী-পুরুষ বসে আছে পত্রিকা বিছিয়ে। একজনের পেছনে বের হয়ে থাকা পত্রিকার আধছেঁড়া টুকরায় দেখলাম স্কুলে আগুন লাগার সংবাদ, লাইব্রেরি পুড়ে গেছে, বইগুলো ছাই হয়ে গেছে। বগিটা দুলছে, আমরাও দুই দিকে তাল রেখে ঢেউয়ের মতো দুলছি আর এগুচ্ছি। ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগে আমার। এই জন্ম ও মৃত্যুর মাঝখানে এইসব চেয়েছি। এই যে আমরা প্রকৃত জীব, নিজেদের দাবি করি আমরা জন্ম নিয়েছি। হৃদয়ে মৃত্যু জাগে, মৃত্যু লাগে, একটা মৃত্যু লাগে। চিৎকার দিলে চিৎকার ফিরে আসে। শুধু দার্শনিক তত্ত্ব দিয়ে ট্রেন ভ্রমণ করা যায় না। আমার মুখোমুখি মেয়েটি—একদিনের ট্রেনযাত্রার প্রেমিকা, আমার রক্তে দেখি তার মুখ। স্মৃতি ও স্বপ্নের মাঝখানে অমন করে দেখি। তোমার আর আমার মাঝখানে একটা ভেদ জাগে, একটা নুলো শ্বাস ফেলে, একটা বিনাশ। সে জীবনে তুমি কই! এই যে ভারতবর্ষ, এই বাংলাদেশ, বেতো ঘোড়ার একাকী শরীর, এই দূরত্ব ফুরায় আবার বাড়ে। এক অন্ধ এক লুলা মিলনাকাঙ্ক্ষা নিয়ে উভয়ে ভেসে বেড়ায়। সঙ্গম ভঙ্গিমায় সাড়া দিয়ে ওঠে, মানুষ জননমুখর হলে, কার পরে যে কে জন্মেছে, কার কী নাম জেনে বসে থাকে।

মেয়েটি কারও দিকে তাকাচ্ছে না। এক পলকে জানালার ওপারে তাকিয়ে আছে। কাঁধ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত ওড়নার ভাঁজ তাকে আরও আড়াল করে রেখেছে। আমি দেখতে পাচ্ছি তার মনের ভেতর থেকে থেকে কিছু একটা ভেসে উঠার টান থেকে যাচ্ছে। অনেকটা যখন একাকী লিফটে উঠে দেখি একা একজন সুন্দরী মেয়ে। সে আমার দিকে তাকিয়েও তাকায় না। লিফটের লাল বোতামের দিকে তাকায়, উপরে তাকায়। তবু আমাকে দেখে না। হেডফোনের তার দুইটা কান থেকে নেমে এসে বুকের ভেতর কোথায় কালো ঝরনার মতো নেমে গেছে। লিফটের লাল বোতাম নিভে গেলে সে নেমে যায়। সে আমার কথা ভুলে যায় আর আমি তার কথা। ট্রেনের এই মেয়েটি এমন নয়। এই জগতের প্রত্যেকটি অস্তিত্বের মতো তাৎক্ষণিকতা অতিক্রম করে সে ব্যাপিত হয়ে আছে সভ্যতার ইতিহাসে। সে যেন সূর্যের চেয়ে গভীর গহ্বর। যে স্টেশন ছেড়ে সে এসেছে, তার ঘর, তার পরিচিত মানুষগুলো তার বুকের গভীরে থেকে থেকে মোচড় দিয়ে উঠছে। সে কথা বলে না। সে একটিও কথা বলে না।

দেওয়ানগঞ্জগামী ভাওয়াল এক্সপ্রেস ট্রেন হুইসেল দিয়ে ছুটে যাচ্ছে। থেমে থেমে যাচ্ছে। বগির ভেতর এতক্ষণ যে ভিড় ছিল তা যাত্রীদের সহ্য হয়ে গেছে, আর চেঁচামেচি নেই। নড়াচড়া কমেছে। বেড়ালের চোখের মতো মানুষগুলোর চোখে জানালার ওপারের ও ভেতরের দৃশ্যের গতি দেখা যাচ্ছে। সমস্ত বগি, সারা পৃথিবী, পৃথিবীর সব লোকজন এক স্থির জালে ঢাকা পড়ে আছে। আমাদের ট্রেন লেবু রঙখোয়ার ওপর দিয়ে চলে। হাতের কব্জিকাটা এক লোক চটের গাঁটরি মেঝেতে রেখে তার উপর বসে আছে। একটা শিশু মায়ের কোলে হাত পা ছড়িয়ে ঘুমিয়ে গেছে। কিন্তু নীল চকচকা চিপসের প্যাকেটটা এখনও তার হাতে ধরা। রূপকথার জগতের মতো এই পথ। ঝিকঝিক ঝিক। চাকার ওপর আমরা দুলি। দুলে দুলে এগোই। হুঁশ হারিয়ে কথাগুলো ঝরে যায়। এই মুহূর্তে একটা অনুভূতি থেকে আরেকটা অনুভূতি আলাদা করা যায় না। এইসব আগে কখনও আমি কাউকে বলি নি। যাত্রীর ইশারাকে কত ড্রাইভার কতভাবে অবহেলা করে গেছে। কতটা ঢেউ আর সেঁটে রাখা যায় আমার নোটবুকে। যারা মুহূর্তকে বন্দি করতে জানে, যারা অন্ধকারে হঠাৎ জ্বলে উঠা শলাকার কাজ করে, সে মই বেয়ে আমরা উপরে উঠে যাই।


আমার বিপরীতে বসা রাজধানীর অভিনেত্রীর মতো মেয়েটির সদ্যস্তন উঁচু হয়ে আছে।


মনে হয় ট্রেনই থেমে আছে, আর সবকিছু আমাকে ফেলে জানালার ওপার দিয়ে চলে যাচ্ছে। মাছের আকৃতির মতো সবুজ পাতাগুলোর ছাটে আঘাতে জানালাগুলো ঢেকে যায়। এই দুপুর, দুপুরের খোসার ভেতর দুপুর, বাচ্চাশিশুর কঙ্কালের মতো কোমল রোদ, রোদের হলুদ জিভ, ওপার ও এপারের বিষাদের স্বাদ নিতে আসে। চৈতন্যের উদ্যানে সব নীরব ফুল ফোটে, জীবনের আদিসূত্রে এসে আমরা কতিপয় ভাষাজীব নিজ নিজ অক্ষরগুলো চিনে নিয়ে জিইয়ে থাকি বাতাসে। ডালা খুললেই উপচে পড়ে আমাদের ক্ষীণতম আর্তনাদ। ঝিকঝিক ঝিক। বগি দুলে। আমরাও দুলে দুলে এগোই। দূরে, অনেক দূরে একটা শিশু কাঁদছে। কেউ তাকে কোলে তুলে নিচ্ছে না। কারা যেন জানালাগুলো খুলে রেখে দরজা বন্ধ করে রেখেছে। আমি জানালার ওপারে ফুলভরা মাঠের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি পাতার ফাঁকে দুই ডালের মাঝখানে একটি জ্বলজ্বলে সূর্য নেমে যাচ্ছে। সূর্য একটাই। আরেকটি সূর্য কোথাও নেই। ট্রেন এসেছে বলে রাস্তার দুধারে লোকগুলো জায়গা ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেছে। পোঁওওওও। শসা, আমড়া আর চানাচুরওয়ালারা পাল্লা দিয়ে লাফিয়ে গড়িয়ে বগির ভেতর ঢোকে। আমি তাদের কারও মুখ মনে রাখতে পারব না। তারাও জানে যা হবার কথা ছিল তা কখনও হয় না।

এই স্টেশনে কুকুর ডাকে। খালের ধারে জলাপানিতে আধডোবা কাদামাখা ফুটো নৌকাটা কাত হয়ে আছে। আমার বিপরীতে বসা রাজধানীর অভিনেত্রীর মতো মেয়েটির সদ্যস্তন উঁচু হয়ে আছে। এই ঘন পাটক্ষেতে যে মেয়েটি পেয়েছে সঙ্গমস্বাদ, ফিরিয়ে দিয়েছে সে-ও আত্মহননের গহন লজ্জা। এইসব তার একার নয়। অস্থির অনন্ত হয়ে ফুটে আছে শুধু কচি স্বপ্নস্তন দুটি। সব পুরুষ তার কাছে আজ মৃত গোলাপ। নির্মাণাধীন বাড়ি দিনদিন উঁচু হচ্ছে। পাকা বাঁশ দিয়ে ঠেকে রাখা আছে ঢালাই করা কাঁচা ছাদ। সারাদিন ভাঙা ইট সিমেন্ট মিক্সচার মেশিনের ঘটরমটর শব্দে রাস্তা ধুলা আর কাদায় ভরে আছে। শ্রমিকরা লুঙ্গিকাছা দিয়ে মাথায় ঝুড়ি নিয়ে সারি বেঁধে যাওয়া আসা করছে কংক্রিটস্তূপের চারতলায়। একজনকে দেখি অকটেন স্টেশনের প্রস্রাব-খানায় প্যান্টের চেইন খুলে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছে।

এই দেশে স্পর্শমাত্র প্রজনন ঘটে। আমাদের বহুকালের রোগ আছে, ঊরুর কাছে খালি ওষুধের কাচশিশি পড়ে থাকে। কোনো জন্মান্ধ কবি, তার মতো নদীবাহিত অসুখ, চর্মরোগ আছে। ঝিকঝিক ঝিক। পোঁওওওও। আমাদের ট্রেন একটা হুলুস্থূল স্টেশনে এসে মাটি ছুঁয়েছে। চোখ খুলে দেখি, বারবার দেখি, ওই একা বিকেলের অন্ধকার, ধুলোর কতটা বিস্তার, খুঁড়ে দেখে যাই এই জলন্ত দেহগুলোর অভাবী বিস্ময় রয়ে যাবে অনন্তকাল। আমড়াঅলা, চানাচুরঅলা আর ভিক্ষুকগুলো বগিতে উঠছে। এইমাত্র এক দুপুর গুটিয়ে এসে জীবন পাওনা বুঝিয়ে দেয় সব যাত্রীদের। মানুষগুলো গান গেয়ে নেচে নেচে সোনা কুড়োয়। কারা যেন কমলালেবু চুষে তার খোসা আর দানাগুলো ছিটিয়ে ফেলেছে বগির মেঝেতে। আহ-তু-তু করে কুকুরটিকে ডেকে এনে এক ছেলে অর্জন করেছে ক্লান্ত বিকেলের কাছে বাতাসের ক্ষমা। বড় ধীর হয়ে এল। ধীর। ধীর। ধীর শান্ত হয়ে যাও। ঝিকঝিক ঝিক। বগি দুলে। আমরা এই স্তব্ধবিকেল ভেঙে কান্না হয়ে নেমেছি, এই বত্রিশ বসন্তের শুকনো পাতা কুড়িয়ে খড়ের কুঞ্জ গুছিয়ে নিয়েছি। এই হেমন্তের হুল্লোড়, ধানভানুনি গীত কণ্ঠে নিয়ে, সোনাধানের নির্জনে টুনটুনির ভাঙা বাসা পড়ে আছে। উড়ে গেছে সব পাখি বৈকালি গায়ত্রীর দিকে। আমাদের ট্রেন ধীর থেকে গতি বেড়ে স্লিপার কাঁপিয়ে চলা শুরু করেছে। ঝিকঝিক ঝিক। একে কি স্পন্দন বলে? এর নাম কী?

আমার মুখোমুখি যে মেয়েটি বসে আছে, এবার সে হাতব্যাগ থেকে আয়না খুলেছে। মনে হলো নির্জন ময়ূরী ডানা ছড়িয়েছে। হেমন্তের ঘ্রাণ তার লেগে আছে রক্তের পেখমে। তার গোপনাঙ্গ ছুঁয়ে যায় আমার ঠোঁট আর সময়কে ছুঁড়ে ফেলে বিছানার নিচে। ট্রেন চলছে কিন্তু সে নিখুঁতভাবে চোখে কাজল টেনে চলেছে। জানালা দিয়ে ছিটকে আসা রোদের ফালি আয়নাতে বাড়ি খেয়ে মেয়েটির মুখে গিয়ে পড়ে, কাঁপে। আমরা একটা বনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। কাছে জঙ্গল, দূরে জঙ্গল, আদি থেকে আজ এই ভরা ভাদর। শুধু অইটুকু গান, বাকি সমস্ত সৌন্দর্য এখনও দুই ঘণ্টা দূরে। মেয়েটি তার রূপ নিয়ে আমার উল্টোদিকে বসে আছে। তাকে প্রেমিকা ভেবে যদি কাছে টেনে নিয়ে আসি, আমার পাখনায় নীলিমা নিশীথ, আমার রক্তে একজনা অন্ধবাউল একতারে গান করে। ঝুড়িভর্তি ফল কুড়িয়ে পাহাড়ের মেয়ে পথ ভুলে খুঁজেছে বাড়ির উঠোন। আমার রক্ত জাগে। এই বনের সবুজ আকাশের নীল শুষে রপ্ত করেছে অবিরল ঝিঁঝিঁ। সেই সুর জেনে নিয়ে গেছে আমাদের ট্রেন ঝিকঝিক ঝিক হাওয়ার হাসিতে। পোঁওওও।

তাড়ি খাওয়া বুঁদ কুলির মতো, কেউ কি ভুলে থাকতে পেরেছে ঘাড়ের ব্যথা! তারে কে ক্ষমা করে, ক্ষমা করে শুধু সুন্দরেরে। মেয়েটি একবার জানালার দিকে, আরেকবার উঁকি দিয়ে দরজার দিকে দেখছে। মনে হচ্ছে এইখানে নেমে যাবে, ঠিক এইখানে। আমাদের বগির ভেতর এতক্ষণ যে লোকটা পাশের জনের সাথে ঢাকায় যানজট নিরসনে করণীয় সম্পর্কে আলোচনা করছিল সে এখন চুপচাপ আছে। ঢাকায় বৃক্ষ রোপণের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও তার কিছু বক্তব্য ছিল। এখন এই সংশয় প্রকাশ করে এই বিভাস সন্দেহে নদী আর মানুষের ব্যবধান রেখে গেলে, একদিন ডাঙা থেকে জলে নেমে মাছের জীবন চেয়েছিল প্রাণ। মেয়েটির সঙ্গে আমার একটিও কথা হলো না, তবু আলাপের ভারে দুজন ক্লান্ত, তার কী একটা কথায় আমি যেন না হেসে পারি না!


জানালা থেকে মুখ ফিরিয়ে সামনে তাকাতেই দেখি মেয়েটি নেই।


এখন সেই পুরানো হারমোনিয়াম আর গান গায় না। মেয়েটি বারবার নড়েচড়ে বসছে, কাপড়চোপড়ের খসখস শব্দ হচ্ছে। সিটের নিচে মেঝেতে খাকি-রঙ প্যাকেটটা এদিক-ওদিক করে আবার আগের জায়গাতেই রাখছে। উল্টোদিক থেকে আরেকটা ট্রেন আসবে বলে আমাদের ট্রেন স্টেশন ছাড়াই একটু থেমেছে। দুই পাশে পরিত্যক্ত রেলের স্লিপার, ঘাস উঠে আছে। কতগুলো মালবাহী লাল বগি অকেজো পড়ে আছে, লতাপাতা গজাচ্ছে সেগুলোর চারদিকে। ফোম তুলা বের করা কতগুলো ছেঁড়াফাঁড়া ট্রেনের চেয়ার পড়ে আছে ডাম্পিং করে। চেয়ালের পাগুলো আকাশের দিকে, দাগ আর মরিচা পড়া। বহু বছরের যাত্রীবহন আর পেশীর অত্যাচারের স্বাক্ষর নিয়ে মুখ থুবড়ে আছে চেয়ারগুলো। একজন কুঁজো বুড়ি লাঠিতে ভর দিয়ে আমাদের জানালার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার মনে হলো এই সেই রূপকথার বুড়ি যে নবজাত শিশুর রক্ত প্রার্থনা করে। সেই কবি যে এখন শিশু, যে অমরতা নেমে এসেছে এই মরদেশে। যার রক্ত চারিয়ে গেলে পুনরুত্থান হবে। জানালার পাশ দিয়ে বারুদের বেগে বিপরীত দিক থেকে আসা ট্রেনটি চলে গেছে। ট্রেনের শেষ বগিটি চলে যাবার পর আমি দেখলাম বুড়ি সেই আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমাদের ট্রেনের চাকা চলতে শুরু করল।

জানালা থেকে মুখ ফিরিয়ে সামনে তাকাতেই দেখি মেয়েটি নেই। সিট ফাঁকা। এখানে কোথায় নেমে গেল? এইখানে এই নির্জন বিরানে তো কারও গন্তব্য হওয়ার কথা নয়। সবুজ সিটের নিচে খাকি রঙ প্যাকেটটা ভুল করে ফেলে গেছে সে। পুরো প্যাকেটটা আনাড়ি হাতে মিষ্টির প্যাকেট বাঁধাইয়ের সুতা দিয়ে এলোমেলো গিঁট দেয়া। কী থাকতে পারে এর ভেতর? বিকেল গড়িয়ে সময় সন্ধ্যার দিকে এগুচ্ছে। জানালার বাইরে ডালপালার ফাঁক দিয়ে আমি ঘনায়মান অন্ধকারের দিকে তাকালাম। আকাশের কোনো রঙ নেই। শুধু এরোপ্লেনের ছেড়ে দেয়া কালো গোল গোল ধোঁয়ার মতো, অযুত মৃত্যু এসে আমার অঙ্গপ্রতঙ্গের নড়াচড়া স্তব্ধ করে দিয়েছে। বিচ্ছেদের গভীরতায় এই যুগের ক্ষয়ে আমি নতুন ও আকর্ষণীয় জীব হয়ে যাচ্ছি। হঠাৎ চমকে গিয়ে এতক্ষণ এতকাল যা অর্থহীন ছিল তার একটা অর্থ খুঁজে পেয়েছি। আমি একটা সদ্য শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। কান্না ক্রমাগত গাঢ় হচ্ছে। কোত্থেকে? আমার হাত পা হিম হয়ে এল। এক ঝটকায় সামনে ঝুঁকে গিয়ে আমার উল্টোদিকের চেয়ারের নিচ থেকে প্যাকেটটা হাতে নিলাম। এখন কান্নার আওয়াজ স্পষ্ট। আমি এক এক করে গিঁটগুলো খুলছি আর পুরো বাক্স খুলতেই ওঁয়া ওঁয়া শব্দে চারদিক ভরে গেল। সব যাত্রী এগিয়ে এল। একজন মহিলা বাক্স থেকে শিশুটাকে নিয়েই ব্লাউজ খুলে একটি স্তন শিশুটির মুখে পুরে দিয়েছে।

ঢাকা থেকে দেওয়ানগঞ্জগামী ভাওয়াল এক্সপ্রেস ট্রেনের একটি বগি এই মায়াবী সন্ধ্যায়, আমাদের মানুষী অহঙ্কার আর ঔজ্জ্বল্যের সমস্ত পরিতৃপ্তি নিয়ে ধসে পড়ল। আমার চোখে সেই এক প্রথম বিস্ময়, প্রথম শিশুর নাম রাখা গেল, একদিন স্বপ্নালু আকাশ সন্ধ্যার অন্ধকারে শেষ হলো আমাদের যাত্রা। ট্রেন এসে থামল দেওয়ানগঞ্জ স্টেশনে। ঝিকঝিক ঝিক। পোঁওওও। মানব-ইতিহাসের এই জৈব-প্রকল্প, এই কান্না ছাড়া অন্য কোনো অগ্রসর ইশারা নেই। মন জানে সূর্যের পুত্র নেই কেউ, শুধু ঢেউ ভাঙে আর ঢেউ গড়ে। জীবনের সব তাপ আজ অন্য আগুনে। কোনো লুপ্ত জগতের আলো আমি এই শতাব্দীর অপরাহ্ণে অরূপ সন্ধ্যার স্মৃতি নিয়ে জাগে। অর্থাৎ একা, উতলরাত্রির মাতৃনীড়। তবুও কান্না, কেবলই জলতাস নদীমনস্ক মানুষের কাছে এসে শিস দিয়ে চলে যায়। ভেতরে সাড়া দেয়, গভীরে সেঁধোয়, সমস্ত ধারা যৌথতার অন্তর্গত দহনে কাঁদে। দুধের বাঁট ছেড়ে শিশুটি এলিয়ে পড়ে। তার নিশ্বাসের তোড়ে মোমবাতি নিভে যায়। ওই মেয়েটি আমার বিপরীত চেয়ারে বসে ছিল, তার বিয়োবার কোঁত, তার আশ্চর্য ঘোড়ার মতো যোনি, এই জন্ম-উদগ্রীব মূর্ছনা, প্রসবের অনুভূতি দেশ রেখে যায় শুক্রস্খলিত এই যুদ্ধের সময় আরোহ মহাপৃথিবী।

জামালপুর রেলওয়ে পুলিশ আসে। বলা হয় এক অজ্ঞাতপরিচয় নবজাতকের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা ৫৬ নং ভাওয়াল এক্সপ্রেস ট্রেনের বগিতে সিটের নিচে একটি ওষুধের বাক্স থেকে গতকাল মঙ্গলবার পলিথিন মোড়ানো শিশুটি উদ্ধার করা হয়। স্টেশন মাস্টার রফিকুল ইসলাম শিশুর লাশটি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করলে পুলিশ ময়না তদন্তের জন্য লাশ জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে মর্গে পাঠায়। এই ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে।

মাজহার সরকার

মাজহার সরকার

জন্ম ৮ ডিসেম্বর ১৯৮৬, কুমিল্লা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশা : লেখালেখি।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
সোনেলা রোদের সাঁকো [পার্ল ২০১২]
শরতের বাস টার্মিনাল [বিদ্যাপ্রকাশ ২০১৩]
শূন্য সত্য একমাত্র [বিদ্যাপ্রকাশ ২০১৩]
গণপ্রজাতন্ত্রী নিঃসঙ্গতা [দিব্য প্রকাশ ২০১৫]
প্রেরিত পুরুষ [প্লাটফর্ম ২০১৬]

গল্প—
আগ্নেয় আশ্বিনের তামুক [দিব্য প্রকাশ ২০১৫]

উপন্যাস—
রাজনীতি [প্লাটফর্ম ২০১৬]

ই-মেইল : mazhar54968@rocketmail.com
মাজহার সরকার