হোম পুনর্মুদ্রণ গদ্য টোটেম প্রফেসর ও নীল শব্দপট

টোটেম প্রফেসর ও নীল শব্দপট

টোটেম প্রফেসর ও নীল শব্দপট
343
0

কী আশ্চর্যের কথা, আজকাল তরুণ কবির প্রথম কবিতা-বই প’ড়ে মনে হয় কত কম বয়সেই সে ব্যাখ্যা, সারাংশ, সারমর্ম-উপযোগী স্কুল-কলেজের কবিতা-শিক্ষা পেরিয়ে এসেছে। পূর্বসূরিদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা পরিণতির উদাহরণ লক্ষ করার সুযোগ করায়ত্ত তার। সে জানে কবিতার কোনো যুক্তি হয় না, কিন্তু কবিতাকারির যুক্তি থাকে, যা বিজ্ঞান-যুক্তির মতোই প্রবল যোজক ও তীক্ষ্ণ বিভাজক, এবং তা অস্পষ্ট জটিল ও পলাতক সম্পর্কের কারণে অধিকতর অবাধ্য। মন যখন সরলভাবে একটি কবিতাকে প্রকৃতির সৃষ্টি হিসেবে গ্রহণ করে তখন সাধারণ বোধের যত আনন্দ অনুভূত ততটা পূর্ণ বিচারেও হয় না। পাঠককে তা এক বিশেষ ‘ভাব’- এ উপনীত করে যেটির সে যথাযোগ্য বর্ণনা বা প্রকাশ করতে পারে না। আমার হয়েছে সেই অবস্থা। কবিতার অন্তরঙ্গ ও বহিরঙ্গ বিচার করতে বসে শারীরিক বাস্তবতা, ভঙ্গির মানসিকতা ও অধিবিদ্যা বা সৃষ্টিজ্ঞানের মধ্যে ভঙ্গির মানসিকতাকেই আমি বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলছি। এই ভঙ্গি হলো কবিতার প্রকাশভঙ্গি যা কবিরও বটে। সামজিক স্মৃতি ও অনুষঙ্গ একজন কবিকে তৈরি করে, তাকে ভাষাময় করে ও ভাসায়। তার এই ভাষাময় ভাসান কতদূর নিয়ে যাবে তা সে কি তা জানে? কবি জানে না কোথায় তার পাঠক, কোথায় ভিড়েছিল তার নাও। হালফিল আমলে বাংলাদেশের তরুণ কবিদের খোলশ ছাড়ার কাহিনি বড় অদ্ভুতভাবে অাগ্রহান্বিত করে আমাদের। বিশ্বায়নের যুগে তাদের মাটির টান আলগা হয়ে এসেছে ভারতের মতোই, যা আগে ছিল শিকড়ের অনুশাসনে আবদ্ধ। তৃতীয় বিশ্বের উত্তর ঔপনিবেশিক করণগুলো খতিয়ে দেখবেন অনেকে। আমরা এগোই।

12004154_10153185331473634_4111854145900286739_nতরুণ কবি মুক্তি মণ্ডলের দুটি কবিতার বই ‘ঘড়ির কাঁটায় ম্যাটিনি শো’ এবং ‘পুষ্পপটে ব্রাত্য মিনতি’ পাঠান্তে আমার মনে প্রশ্ন জেগেছিল সে কি আমার লেখা প্রবন্ধ ‘কবিতাধারার মুক্তি’ পড়েছিল? বাংলাদেশের কবি বলেই চিরাচরিত অভ্যাসে সাধারণভাবে মনে হতে পারে—তার বাসার পাশে নকশি কাঁথার মাঠ, যেদিকে চোখ যায় সে দেখে রূপসী বাংলাকে, তার মনের গভীরে স্বাধীনতা যুদ্ধের ক্ষত—যে সব মাইলস্টোন পেরিয়ে এসেছি আর কি—তার কবিতায় সেই সব সামাজিক অভিজ্ঞতার নষ্টালজিয়া এখনো উপদ্রব হয়ে বিরাজ করবে প্রেমে এবং অপ্রেমেও। কিন্তু তার জায়গায় আবিষ্কার করলাম ক্রমশ তরঙ্গ-মণ্ডলাকারে কবিতার অশেষ মুক্তি। সে সম্বন্ধে দু-চার কথা বলতে বসেছি।


টোটেম প্রফেসর :

ইন্টারনেটকে ধন্যবাদ, মুক্তির কবিতা সর্বপ্রথম আমি পাই www.kobita.ws ওয়েবসাইটে। কয়েকটি কবিতা পড়ে আমার ভালো লাগা বিষয়ে মন্তব্য করলে সে সাড়া দেয়। সেই থেকে পাঠক হিসেবে আমার সঙ্গে মুক্তির গোপন সখ্য তৈরি হতে থাকে। সে যখন লেখে

অংশগ্রহণমূলক রোদ্দুর বিতরণে
টোটেম প্রফেসর তোমার ঘড়ির কাঁটায় ম্যাটিনি শো—

রিসাইকেল বিনে রাখা সমস্ত রোদ্দুর অ্যাকটিভ করে দেখি’—
(টোটেম প্রফেসর তোমার ঘড়ির কাঁটায়)

তখন রোদ্দুর যেন প্রাণ দেবে বলে নিজেই প্রাণিত হয়ে ওঠে—রুদ্ধশ্বাস চুম্বন দৃশ্য, লুম্পেন শহর, বিষণ্ন দুঃখিত মিলিটারি, কাঁধে মৃতদেহ, গুটানো রিলিফ, নির্দলীয় সরকারের অক্ষমতার বেদনা, মগজের মধ্যে ভাইরাস—এই সমস্ত নেগেটিভ ভাবনাকে সচল প্রাণবন্ত করতে রোদ্দুর জেগে ওঠে—রূপকথারা শস্য সুনামের গন্ধ ছড়ায়—হঠাৎ পজিটিভ হয়ে ওঠে—এটাই কবির মানসভঙ্গি যা বাস্তবতাকে স্বগুণে ফোটাতে চায়, এলিভেট করতে চায়। তখন প্রফেসরের টোটেমটি লক্ষ করতে হবে, ওই ঠুঁটো জগন্নাথের চোখ দিয়ে অতঃপর দৃশ্যগ্রহণ, একের পর এক ড্রামাটিকস্, আমি-তুমি মিশ্রিত সমস্ত উচ্চারণ। কবিপ্রকৃতি এই, এই কবির ধর্ম।

মুক্তি এরকমভাবে সালভাদোর দালি, পিকাসো, ভ্যান ঘগ, আমেরিকান বডি পেইন্টিং—এইসব প্রক্ষেপ করেছে অনবরত

কবিতায় নন্দনতত্ত্বটি পশ্চিমের, ইওরোপের আবিষ্কার। বাংলায় আধুনিক কবিতার চর্চাকালে প্রয়োগ করা হয় নান্দনিকতার। যত না প্রয়োগ, তার চেয়ে বেশি এই অবান্তর বোধটিকে উদ্দেশ্য করে রচনা ও আলোচনা হয়ে ওঠে আবহমান মূলধারা কবিতার বিধেয়। গত শতাব্দীর নব্বই দশক থেকে ব্যাকরণ ও বিষয় বর্জিত বাংলা কবিতার নন্দনতত্ত্বটিকে বর্জন করা শুরু করা হয়। মুক্তি এই সেদিন লেখে—

আমি
সোফিয়া লরেনের হাত থেকে খসে পড়া চাবুক
হোমিও দোকানের শিশি ভর্তি মর্যাদাবোধ
পাঠ্য বইয়ের ময়লা পাতার উপর ফ্যানের ডাইনি বাতাস
হাঁটু জল আমি
তোমার শরীরের গন্ধ আঁকছে পিকাসোর ক্রোধ
অনলাইনের ফ্রি ভিডিও ক্লিপে
ঝুলে গেছে তোমাদের সোফা কাম বেড
(সুশীল সমাজের করিডোরে)

নন্দনতত্ত্ব ইরেজ করার পর একই সঙ্গে বোধ ও বোধহীনতা উৎপন্ন করার প্রয়াসটিকে কবিধর্ম হিসেবে চিনে নিতে হবে এখন। এই ধর্মকে জাতীয় ধর্মাচরণের সঙ্গে গোলালে চলবে না। এই ধর্ম হলো, বিজ্ঞান যাকে বলে প্রকৃতি। এই প্রকৃতিকে আবার নৈসর্গিক প্রকৃতির সঙ্গে মেলানো যাবে না। কবি হিসেবে চিন্তা ও দর্শন গড়ে ওঠে একেক জনের একেক রকম। কবি সৎ ও বিশ্বস্ত থাকেন একমাত্র নিজের দার্শনিক চেতনার ওপর। আমার এরকমই বিশ্বাস। ওই তার ধর্ম। পাঠক হিসেবে মুক্তি মণ্ডলকে আমার এরকমই মনে হয়েছে। বোধ ও বোধহীনতা সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত ধারণাটি বলি। সাধারণত বোধ বলতে সবাই অর্থবোধ, মূল্যবোধ, জাতিবোধ, দেশবোধ, নীতিবোধ ইত্যাদি সম্পর্কিত করেন। কবিতার পাঠক হিসেবে আমার সেসব বোধের রেফারেন্স হারিয়ে গেছে যেদিন বুঝেছি শব্দ, বাক্য, কবিতার কোনো মানে হয় না। জীবনানন্দ কথিত বোধ হলো ‘কবিতার বোধ’—এই বোধটি ছাড়া অন্য সবই বোধহীনতায় পর্যবসিত হয়েছে। মুক্তি মণ্ডলের কবিতা ওই দিকে যাচ্ছে বলে মনে হয় আমার। নয়তো সে লেখে কী করে—

আমার সামাজিকতা কোনো কথা বলে না—
ডেমোক্রেসির তলপেটে
দেখি
তুমি গলিত ঘড়ির কাচ
টিপ টিপ বৃষ্টি
(নৈতিকতার ম্যাচবাক্স)

ডেমোক্রেসির অ্যামালগামেশন, জগাখিচুড়ির কথা উঠতেই নীতিবোধটি লুপ্ত হয়ে হীনাবস্থায় পড়ে। কিন্তু ডেমোক্রসির তলপেট! পোয়াতি নাকি? কিছু কি বর্জ্য? ‌’তুমি’ কে! ‘গলিত ঘড়ির কাচ সালভাদোর দালিকে মনে পড়ায়; তবে সেই গলনে ‘টিপ টিপ’ ঘড়ি-শব্দের বদলে ‘টিপ টিপ বৃষ্টি’ পড়ল। ধ্বনি সম্পর্কে এই উত্তরণ অসাধারণ দক্ষতার সঙ্গে করা হয়েছে। এটাই কবিতাকারি। নিরাকার কবিতাকে ভাষায় অনুবাদ করার শিল্পটাই মুক্তি ভারি সুন্দর আয়ত্ত করেছে। বিশেষ করে প্রথম বইয়ে এইসব নিপুণতার স্বাক্ষর আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমি যেভাবে বলছি সে হয়তো সেভাবে করে নি এসব। কিন্তু আমার হাতে প’ড়ে মুক্তির কবিতাগুলো আবার বদলে যাচ্ছে, আর এখানেই কবির সার্থক কম্যুনিকেশন সম্ভব হচ্ছে। মুক্তি এরকমভাবে সালভাদোর দালি, পিকাসো, ভ্যান ঘগ, আমেরিকান বডি পেইন্টিং (দালি যেভাবে নিজের উন্মুক্ত দেহে রঙিন আঁকাজোকা করে ওপেন একজিবিশন করেছিলেন আমেরিকান স্টেজে, দোকানের উইন্ডো শো-পিস হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন চকম দিয়ে, যা পরে কিছুকাল যাবৎ আমেরিকার চমক-চল দাঁড়ায়)—এইসব প্রক্ষেপ করেছে অনবরত। আমার ভালো লেগেছে। ভালো লেগেছে ‘টুকরো টুকরো বৃষ্টি’।

আগেকার দিনের কাব্যভাবনা কাব্যপ্রতিমা বাকপ্রতিমা—এইসব কাঠামো ভিত্তিক গঠন আজকাল আর দেখা যায় না। নতুন যুগে সেসব বাতিল হয়ে কবিতা ধ্বনিময় ও সংকেতময় সংহত হয়ে উঠছে। তা ছাড়াও আছে কথা-কবিতা-বাক্য-বাক্যানি-ওভারল্যাপিং কথার স্বয়ংক্রিয়তা যা ৯০ বছর আগেকার ইওরোপিয়ান সুররিয়ালিজম থেকে ভিন্ন ওই ক্রসওভার হবার কারণে। একটা পরিবেশে কর্তা কর্ম অর্থহীনভাবে অবস্থান জাক্সটাপোজ করতে করতে সেই কবিতাবোধকে জাগিয়ে তোলে নানা সুরের ঝংকার তুলে—

ঘুমানোর আগে জানালায় তোমার হাত চু’য়ে পড়া শিশির
আমি ঝরে যেতে দেখি
খুব সবুজ পালকের উপর রাত নেমেছিল তুমি দাঁড়িয়েছিলে গভীর নিস্তব্ধ হয়ে আমার
পাঁজরের কম্পনের উপর ফুল
ঝরেছিল আমি নৈসঙ্গের পালে
(ঘুমানোর আগে)

নদী ছিল মনে হয় নারীর ভিতর ডুবে যাওয়া জাহাজের ছায়ায় ড্রিমলাইট জ্বেলে দিয়ে গিয়েছিলে… এখন তো শুকনো নালার পাশে জেগে থাকো টর্চের আলো চলো তবে নীলের ড্রেসআপ সেরে নাও ভোজে গেলে তো সব অন্ধকার মূর্তিচুম্বন দিবে
(গানম্যান হবো)

ইত্যাদি। এই বইয়ের শ্রেষ্ঠ কবিতাটি আমি কোনো উদাহরণের জন্য বাছি নি কেন, সেটা হয়তো মুক্তির জিজ্ঞাসা হতে পারে। আমার উত্তর হলো কবিতা কখনো শ্রেষ্ঠ হয় না। কবিতা তো ধরা ছোঁয়া যায় না। কবি এবং তার পাঠকের কাছে সাধারণত নির্মাণ আর গ্রহণের বিচারে শ্রেষ্ঠত্বের গুণমান পৃথক হয়ে যায়। আমি মুক্তির কবিতাকারি, কবিতানির্মাণ শিল্পটাই দেখতে চেয়েছি। সমাজ সচেতনতার জন্য কবিরাই বিশিষ্ট প্রাণী—এ কথা আমি মানি না। মূল্যবোধের কৃত্রিমতা আমি অস্বীকার করি। কবিকে দেখব কেন সেভাবে?

আজকের নতুন কবিতার দিনে মুক্তি অন্য আবিষ্কারে মন দিচ্ছে না, বরং ঢুকে পড়ছে একটা আবিষ্কৃত জগতে পুরানো দিনের স্বাদ নিতে

নীল শব্দপট :

11998057_10153185360408634_505523680_n২০০৮ সালের জানুয়ারি মাসে ভারতের ‘কৌরব প্রকাশনী’ থেকে কবি মুক্তি মণ্ডলের কবিতার প্রথম বই প্রকাশের এক বছর পরেই ২০০৯ সালে ঢাকায় একুশের বইমেলায় তার দ্বিতীয় সংকলন ‘পুষ্পপটে ব্রাত্য মিনতি’ বই হয়ে বেরোয় বাংলাদেশের ‘জোনাকরোড’ প্রকাশনী থেকে। দুটি বইয়ের মধ্যে বিস্তর ফারাক। অর্থাৎ সংকলিত কবিতাগুলিতে আগের চেয়ে অনেক তফাৎ হয়েছে টেক্সচারে, রং-এ, ভাষায়। আগের কবিতার সংকেতময়তা সরে হাজির হয়েছে অতিকথন। মন্তব্য দিয়ে শুরুয়াৎ। বোধহীনতা সরে গিয়ে জায়গা দিয়েছে মূল্যবোধকে। ভাষা হয়েছে সিনক্রোনিক থেকে ডায়াক্রোনিক, স্বভাবকবির ভালো লাগা বৃষ্টি সামনে এসেছে, সব রং ডুবেছে নীলের গভীরতায়। টু স্টেপ ফরোয়ার্ড, ওয়ান স্টেপ ব্যাকোয়ার্ড পদ্ধতিতে পিছিয়েছে মুক্তি মণ্ডলের কবিতার পরীক্ষা। আজকের নতুন কবিতার দিনে মুক্তি অন্য আবিষ্কারে মন দিচ্ছে না, বরং ঢুকে পড়ছে একটা আবিষ্কৃত জগতে পুরানো দিনের স্বাদ নিতে। বইদুটির নামকরণেই বোঝা যাচ্ছে এই সরণ। এই অদ্ভুত পিছপা কী কী সংগ্রহ করল তার চেতনায় তা নিশ্চয়ই জানা যাবে ভবিষ্যতে। আপাতত তার সুগতি আর দুর্গতির চিহ্নগুলো লক্ষ করা যাক।

কাঙাল বালকেরা চিরদিনই অন্যের দুয়ারে
হাত পেতে বড় হয়, ঘাসের ভেতর, ঝোপের ভেতর,
যেদিকে ইচ্ছে সেদিকে
ছুটে চলে, মনের জংলাকাদায় বেড়ে ওঠে
আশা-নিরাশার বুনোফুল
(গুপ্তচর)

বা,

ভাষার বাইরে কিছু নাই? তাকালেই বুঝি বৃষ্টির দিন
মেঘপুঞ্জ চোখের পাতায় সাজিয়ে তোলে হলুদ ফুল
(ধূপ)

এইসব আপ্তবাক্য বা মন্তব্যের উল্লেখ দিয়ে কবিতা শুরু করার ঝুঁকি হচ্ছে স্বভাবকবিত্বে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বন্দি থেকে যাবার। সমস্ত সত্তায় শরীরজোড়া মানুষী ক্ষত নিয়ে প্রকৃতির ভিতর ‘অরণ্যপ্রবেশ’ ঘটেছিল জীবনানন্দের। মুক্তি সে কারণেই পট পরিবর্তন করেছে তা বলছি না। তবে বিশ্বনাগরিকের দূরবিন ছেড়ে হাতে অণুবীক্ষণ আর ক্যালাইডোস্কোপের যুগ্ম হরতাল হয়ে উঠছে তার শব্দযাপন বলা চলে—

 দৃশ্যবাদী কাঠুরে ও তার গোপন রান্নাঘরের
পাশে আমি দেখি জানালায় ভালুকের ছবি, অর্ধেক নারী
অর্ধেক পুরুষেরা বৃক্ষের ছালের মধ্যে
চোখ ডুবিয়ে দেখছে পোকাদের
সুচুম্বন।
(দৃশ্যবাদী কাঠুরে)

এভাবে প্রকৃতির সূক্ষ্মতা ও স্থূলতার বৈচিত্র্য ফুটে উঠেছে পরতে পরতে, পড়তে ভালো লাগে। কিন্তু এ পর্যায়ের কবিতাগুলি মৌলিক নয়, আবহমানের ধ্বনি তাতে, যতিচিহ্নময়, পূর্বেকার মুক্তি খোয়ানো মনে হয়।

একটা দরোজার অর্ধেক অন্ধকার।
অর্ধেকে কাঠের আকাশ মেরুন রঙের তারার মধ্যে ছয়খানা ফুল
পাতা

ক্যালেন্ডারে তারিখ উড়ছে, কাঠের আকাশে একটা বিমান
(ক্যালেন্ডার)

কাঠের আকাশ থেকে বেরোতে পারে না বিমানটা, যে কাঠের আকাশ বেরোবার দরজাতেই ছিল। নিয়তির কাছে এই হ্যান্ডস্ আপ যে মূল্যবোধ জর্জরিত, রিপিট-জর্জরিত, সেসব দিন কবেই ছাড়িয়ে এসেছে বাংলা কবিতার ইতিহাস। পোস্টমডার্ন কবিতার চলও এখন অস্তমিত। তার মানে এই নয় যে ফুল নয়, শব্দপটে সাজানো কবিতায় বিদ্যুৎচমক নেই, মুক্তো নেই, শব্দবন্ধ-বাক্যমালা দিয়ে গড়া হয় নি, শিল্পিত হয় নি কবিতা—তা যথেষ্ট হয়েছে। কিন্তু সেই মুক্তোমালা—শোভিত মিথনারী কি এখন চাইব আমরা? সহর্ষে লক্ষ করি পুরনো প্রমাণিত পথগুলো ঠিকই অতিক্রম করেছে মুক্তি মণ্ডল। তার অভিজ্ঞতাগুলো কবে সে সাজিয়ে দেবে সেজন্য সাগ্রহে অপেক্ষা করে থাকব আমরা।