হোম পুনর্মুদ্রণ গদ্য জীবন আনন্দের ভবলীলা

জীবন আনন্দের ভবলীলা

জীবন আনন্দের ভবলীলা
757
0

জীবনানন্দ দাশের একটি অপ্রকাশিত কবিতা ও কবিতার ভাষ্য


ক্বচিৎ আমিও তৃপ্তি পেয়ে গেছি—পর্বতের পথে ঘুরে একা
.  অথবা দূরের থেকে অন্য এক পাহাড়ের শিঙের নীলিমা
.     সহসা এসেছে দেখে;—যেন সে কোথাও কারু মৃত্যুর পরে
.       লুপ্ত হয়ে গিয়ে তবু—আবার এসেছে দেখা দিতে
.     আমাকে জীবিত দেখে—তবু তাকে সর্বদাই অনেক বিশদ
.        মাইলের পার থেকে দেখা যায়,—সর্বদাই কাছে;
.          সিন্ধুঘোটক’এর মত মুখ তুলে অবহিত হয়ে আছে
.            যদিও সিন্ধুর শব্দ এইখানে নেই কোনও দিকে
.               তবুও মুহূর্ত-আগে লুপ্ত হয়ে গেছে, মনে হয়
.             এক-দুই অনুপল আগে সেই অকৃত্রিম ডাইনোসর’দের
.                পৃথিবী বিলুপ্ত হয়ে আমাদের এক জন দু’ জনার অনুভাবে
.                   রয়ে গেছে; তবুও তাদের সেই বিশৃঙ্খল সময়ের বালুকাঘড়ির
.                     উড়খুড়খুড়ি বালি দু’-চারটে দেবদারু-গাছের কিনারে
.                        উর্ণিল বাতাসে ওড়ে—কবে কোন প্রেম
.                          সংঘটিত হয়েছিল—মৈথুন কেমন ছিল—অথবা মরণ
.                             যখন সকল লুপ্ত ক’রে দেয় সকলের
.                               তখন মৃতেরা কোন জোড় বাঁধে হেমন্তের শটিত বালির
.                      নিচে শুয়ে—তবুও এ-সব প্রশ্নে তাদের অজ্ঞতা
.                কোনও দিন সমীচীন হয় নাই—মানুষের মনের উপরে
.                  নিজেদের ইতিহাস ফেলে রেখে গেছে তারা
.                    ইতিহাস ফেলে রেখে গেছে তারা ভুলে
.                      মানুষেরা চ’লে গেছে পাহাড়ের পিঙ্গল চাঙরে
.                        নিজেদেরও গালগল্প—বিশেষত পলু ঘোষাল’এর
.                            কবিতা-ও লোকে সব আধাআধি তা-দেওয়া ডিমের মত শেষ
.                            ক’রে ফেলে—যদি কেউ তুলে নেয় নিতে পারে
.                            না হলে তা নিজেরই তুলনা শুধু—এমন অন্যায় নিস্তব্ধতা।
.

 সেপ্টেম্বর, ১৯৪০

.

..
সৌজন্য:
অমিতানন্দ দাশ
প্রিয়ব্রত দেব, প্রতিক্ষণ

সভ্যতা রূপ সর্ব্বাঙ্গ সুন্দরী রমণী যেরূপ সতী ও ধীর প্রকৃতি ইহার আচার ব্যবহারও সেইরূপ চমৎকার, কিন্তু ইহার কতকগুলি বদমাইশ সহচর ও সহচরী আছে তাহারা কোনরূপেই ইহার সঙ্গ ছাড়িতে চাহে না।

তৃতীয় কাটি/ আটাকাটি: শ্রীযুক্ত কাটিরাম ঠাকুর

আলোচনার আদিতে আমরা শ্রীযুক্ত কাটিরাম ঠাকুরের পদকে সাক্ষী মানিলাম। ওঁর উপাধি শ্রীযুক্ত টেকচাঁদ ঠাকুরের বন্ধু হিশাবে। কাটিরাম ঠাকুরের কাটি টেকচাঁদের চাহিতে কম সরেস নহে। সমানে সমান। ওঁর কাটি আটাযুক্ত। ইহার বিচারে সমাজ-সংস্কৃতি আটার মতে লেপটাইয়া আছে। সমাজের অন্তর দেখিতে তাঁহার এন্তার জুড়ি। বিশ্লেষণও ফাঁক বরাবর ঢুকিয়া যায়। এমতি, কবি জীবনানন্দ দাশের আনন্দসভায় বসিয়া কাটিরামের সহায় লইলাম। দেখি, জীবনানন্দ লইয়া দুইচারি সহচারী কি কহেন।


জীবনানন্দ মূলত রোমান্টিক। তো বুদ্ধদেবের কথায় জীবনানন্দ দাশ খানিকটা খণ্ডিত হইয়া পড়িয়াছেন।


‘এক হিশেবে তিনি (জীবনানন্দ দাশ) পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত আগাগোড়া রোমান্টিক’—কথাখানি তিরিশ দশকের কবি শ্রীযুক্ত বুদ্ধদেব বসুর। তাঁহার এহেন সমালোচনার পোয়াতি অনুকারকের অন্ত নাই। কি বুঝিয়া কি না বুঝিয়া! ধারণ হিশাবে টানিতে হয়—কবি হুমায়ুন কবিরও বুদ্ধদেবের ভাষায় তোতাপাখির মতো বলিলেন, জীবনানন্দ মূলত রোমান্টিক। তো বুদ্ধদেবের কথায় জীবনানন্দ দাশ খানিকটা খণ্ডিত হইয়া পড়িয়াছেন। কারণ জীবনানন্দ দাশ শুদ্ধ আবেগের বশবর্তী কবি নহেন। প্রশ্ন জাগিতেছে, কবিতা বিচারে এরকম খেয়ালিপনা চলে কিনা? খেয়ালিপনার বড় মুশকিল, কবিতার ভেতরের চিন্তাকে ভবলীলা সাঙ্গ করা। এরকম কায়দায় কবিতার ভিতর হাটের হাঁড়ি ভাঙা খানিক অমূলক বটে। খানিক কবিতার বহিরাবরণে ঘুরপাক খাইবার সামিল। কবিতার ভিতরের কথা ভিতরেই ঘুমাইয়া পড়ে। আমাদের বিচারে জীবনানন্দ দাশ কবিতায় অন্তত সেই ঘূর্ণির ভিতরে ঘুরপাক খান নাই। কেন? সকলে জানিবেন, ইউরোপখণ্ডে রোমান্টিকতার জন্ম আঠার শতকে। শিল্পবিপ্লবই ইউরোপে রোমান্টিকতাকে ত্বরা করিয়া রাস্তা ধরাইয়াছে। আজিকালির পশ্চিমা দুনিয়া যাহাকে বলিতেছে সুবহে সাদেকের আলো (Age of Enlightenment)। যেই কালিকার বিস্তার ঘটিয়াছে উনিশ শতক নাগাদ। ইন্দ্রিয়ানুভূতির আবেগ ’পর খাড়া হইয়া যে চিন্তা আলো ছড়াইছে তাহাতে যোহর কই? মাগরিবও তো তাহাতে বেমালুম গায়েব! তো কাজী নজরুল ইসলামের সুবহে সাদেকের আভায় জীবনানন্দ দাশের উন্মেষ। অন্তত যাহারা তাঁহার পহেলা দিককার কবিতার নিবিষ্ট পাঠক সেই সত্য টের পাইয়াছেন। প্রশ্ন উঠিতেছে, তিনি কেমন করিয়া নয়া জীবন-আনন্দ পাইলেন? নজরুল যে ‘আমি’কে বিশ্বরূপ রূপে সৃষ্টি করিলেন আর ‘রূপসী বাংলা’ বহিতে তাহাকে অন্যরূপে হাজির করিলেন। অন্যরূপ কি? নজরুল ‘আমি’কে বিশ্ব চরাচরে ঘুরাইলেন আর জীবনানন্দ ইহাকে বিশ্বচরাচর ঘুরাইয়া অপূর্ব বাংলার জাতীয় রূপ দিলেন। চৈতন্যের সামান্য আর বিশেষের খেলায় দুই কবিই সিদ্ধহস্ত। একজন বিশেষকে সামান্য রূপে সৃষ্টি করিয়াছেন আর অপরজন সামান্যকে বিশেষ আকারে জারি রাখিয়াছেন। মানে এক কেন্দ্রের দুই দিকের দুই রূপ প্রকাশ।

একখানা কবিতা দিয়া একজন কবিকে বিচার করা খানিক বিপজ্জনক। তাহাতে কবি বা কবিতার সুলুক মেলানো ভার। তবে আপদও আছে ঢের। আপদ হইতেছে, আদ্যোপান্তের কুঠুরিতে প্রবেশ করিবার সুযোগ। কেননা কবিতার পাঠ কখনো একরৈখিক নহে, বহু তল-উপরিতল রেখা-উপরেখা আর পরিধি তাহাতে জারি থাকে। থাকে পাঠের সহিত পাঠক আর কবিতার মিহির সম্পর্ক। এহেন সম্পর্ককে কেহ কেহ বলেন মিথস্ক্রিয়া। আমরা বলিতেছি পাঠের এহেন ক্রিয়া পাঠকের ভিতর এক ধরনের মিথ সৃষ্টি করে। মিথ মানে মিথ্যা নয়, ভাষা বা জবানি। মানে কবিতার সত্য বা কবিতায় চিন্তার ফয়সালা। এক অর্থে সত্তার আবির্ভাব খুঁটিয়া দেখা। তবে কবি কি অবস্থায় কবিতা ফরমাইছেন তাহা ধরিতে যাওয়া খানিক বেআক্কেলে ঠেকে। পাঠকের দিক হইতে যে জিনিস জরুরি কবি কি ফরমাইয়াছেন তাহার তত্ত্ব তালাশ। তাহা কেমন? জীবনানন্দ দাশের একখানা কবিতা আমরা পাঠে তুলিয়াছি। কবিতাখানি কবি ইহকালে প্রকাশ করেন নাই। কেন করেন নাই সেই অনুসন্ধান আমাদের আলোচ্য বিচার নহে। আমাদের বিচার পরকালে প্রকাশিত হইয়া কবিতা কি ক্রিয়া করিতেছে। কবিতার আদিতে কবি কহেন, ‘ক্বচিৎ আমিও তৃপ্তি পেয়ে গেছি—পর্বতের পথে ঘুরে একা/ অথবা দূরের থেকে অন্য এক পাহাড়ের শিঙের নীলিমা/ সহসা এসেছে দেখে;।’


ভাবের ভাষায় ব্যক্তির অশরীরী উপস্থিতি। জীবনানন্দ দাশ ভাষার এহেন খেলায় অহরহ মত্ত।


প্রশ্ন জাগিতেছে, হঠাৎ তৃপ্তি পাওয়া এই ‘আমি’ কে? খোদ কবি? সত্তা, নাকি মন? ভাবের কথা বলিলে ‘আমি’ আদতে বিশেষ পদ। সামান্য হইতে বিশেষের দরজা। ইহাতে তৃপ্তি হঠাৎই আসে। টোকা মারে আর দরজা খোলে। আমরা ঢেকুর শুনিতে পাই মনের তৃপ্তি। একি অপার ভাবের আদল। এহেন ভাবের গোড়া ‘ভব’। ভব সংস্কৃত ভাষারই রূপ। এই রূপ ক্রিয়ায় বসবাস। যেন আনন্দ আনন্দ ভাব। বাংলায় ভব ভাবের অর্থ হওয়া। আর দর্শনশাস্ত্রে এই ভাবের বাসনাকে বলিতেছে ‘হয়ে ওঠা’। কবির ‘হয়ে ওঠা’ একা বিশেষের। একা এই বিশেষের ভিতরে আমরা পাই নতুন চিত্রকল্প ‘অন্য এক পাহাড়ের শিঙের নীলিমা’। পাহাড়ের এপাড় হইতে ওপাড়ের আকাশের নীলিমা শিঙের চিত্রকল্পই মনে পড়ে। কিন্তু কবি যখন বলিতেছেন ‘অন্য এক’ তখন ঠিক তাহা একা নয়, বিশেষের একক ভাব। কেননা ‘এক’ বলিয়া কবি যাহা বলিতেছেন তাহা ‘অন্য’। ভাবার্থে অপর। মানে একের ভেতর অনুপস্থিতির অন্য একের উপস্থিতি। তাহা কেমন?

জগৎ সংসারে মৃত্যুর মতো নৈঃশব্দ আর কিছু নাই। ব্যক্তির পতনের ভিতর দিয়া এহেন নৈঃশব্দ প্রকাশ পায়। কেননা ব্যক্তির স্থিতি মাত্রই ব্যক্তির উপরি স্থিতির জন্ম দেয়। কারণ আকারের ‘উপ’ সর্গ তাহাতে মুখ্য। ঠিক তেমনি ব্যক্তির পতনে দুই উপসর্গ বলবৎ থাকিতেছে। ‘অন’ আর ‘উপ’র স্থিতি। ব্যক্তির শারীরিক উপস্থিতি যাহাতে ‘অন’ বা ‘নাই’ থাকিতেছে। যাহাকে চলতি বাংলায় বলিতেছে ‘অনুপস্থিতি’। মানে ব্যক্তি আকারে নাই, নিরাকারে হাজির। ভাবের ভাষায় ব্যক্তির অশরীরী উপস্থিতি। জীবনানন্দ দাশ ভাষার এহেন খেলায় অহরহ মত্ত। ফলে তাহার ভাব এক স্তর ভেদ করিয়া অপর স্তরের রাস্তা ধরিতেছে। ইহকাল যাইতেছে পরকালে আর পরকাল ভাবরূপে হাজির হইতেছে ইহকালে। ভাবের এত দোলাচলে জীবনানন্দকে সংশয়-আকীর্ণ কবি মনে হইতে পারে। কবির হাজিরায় সেই সত্য—‘যেন সে কোথায় কারু মৃত্যুর পরে/ লুপ্ত হয়ে গিয়ে তবু—আবার এসেছে দেখা দিতে/ আমাকে জীবিত দেখে—তবু তাকে সর্বদাই অনেক বিশদ/ মাইলের পার থেকে দেখা যায়,—সর্বদাই কাছে;’।  তবে কি জীবন মানে মৃত্যু? নিকট অতীতে যায় আর অতীত নিকটে আসে হরদম। জীবন মানেই এমন এক সিন্ধুঘোটক যে কালের ঘটকালি করিতেছে। মৃত্যুর পর সিন্দুর ইতিহাসে নাই সে। আছে কোথায়? চিন্তার বিন্দুতে। ভাবের ভাষায়।

একবার কবি বলিতেছেন—‘সিন্ধুঘোটক’ এর মতো মুখ তুলে অবহিত হয়ে আছে’, আবার ‘সিন্ধুর শব্দ এই খানে নেই’। তাহা হইলে কি আছে? আছে ‘তবু’র পরিণতি। ভাষাবিজ্ঞান মানিলে ‘তবু’ অব্যয়বাচক পদ। প্রখ্যাত অভিধান ব্যবসায়ী শ্রী হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বয়ানে তবুও শব্দের অর্থ ‘তথাপি’/ ‘সেই প্রকার’/ ‘তাহা হইলে’। দেখা যাইতেছে, কবি ভাবের দোলাচলে দোল খাইতেছেন। পাঠকও দোল খাইতেছে সংশয় বচনে। কেন এহেন সংশয়? কবি করিতেছেন অকৃত্রিম ভাবের আশায় ইঙ্গিতময় ভাষার কোশেশ। ভাষা কোনো স্থির পদার্থ নহে। চলমান পদার্থ। আজ যাহা যেই অর্থ ধরিতেছে, কাল তাহা অন্য অর্থ লইতেছে। ভাষার এই ভেতরের প্রক্রিয়ায় কোনো ব্যয় নাই। আছে আয়, মানে ব্যয়ের উপরি। যাহাকে আমরা বলিতেছি ভাষার অব্যয়। তবে জীবনানন্দ কিঞ্চিত ব্যয়ী কবি। কেননা একই বাক্যে ‘যেন’ আর ‘তবু’র ব্যবহারে তাহাকে ব্যয়ী করিয়া তুলিয়াছে।


প্রাণের জ্ঞানগত ধারণা হইতে সেই ইতিহাস মানুষের কাছে ধরা দেয়। কবির মনে প্রশ্ন হয়—‘কবে কোন প্রেম সংঘটিত হয়েছিল—মৈথুন কেমন ছিল?’


কবিতায় কবি লুপ্ত ধারণাকে হালের ধারণায় বশীকরণ করিতেছেন। কারণ ধারণা মাত্রই ধার না করিয়া আনা। যাহা ধরা বা স্থিত না। কল্পনার অকৃত্রিম প্রকাশ। কেননা কল্পনা লুপ্ত পদার্থকে অলুপ্ত করিয়া ছাড়ে। সেই ‘অকৃত্রিম ডাইনোসর’দের কথা বলিয়াছেন তিনি। ডাইনোসর লুপ্ত, কিন্তু বিলুপ্ত সেই প্রাণী অনুভাবে থাকিয়া যাইতেছে। এই খানে শুদ্ধ কবির অনুভাব নহে, মানুষের মনের উপর ফেলে যাওয়া ইতিহাসের অনুভাব। সেই ইতিহাস প্রাণ-জগতের অস্তিত্বের ইতিহাস। কেমন? প্রাণের জ্ঞানগত ধারণা হইতে সেই ইতিহাস মানুষের কাছে ধরা দেয়। কবির মনে প্রশ্ন হয়—‘কবে কোন প্রেম সংঘটিত হয়েছিল—মৈথুন কেমন ছিল?’। যাহা ধারণায় আছে তাহা অপর ধারণার প্রেমে পড়িবার নামই কি সংশয়? এইসব জিজ্ঞাসার উত্তর নাই কবির কাছে। কিন্তু প্রশ্নটাই যেমতি উত্তর হইয়া খাড়ায় সেই জিজ্ঞাসার মানে কি? কবি জানাইতেছেন—উত্তর মাত্রই গালগল্প হইয়া থাকে। তাহা কেমন? কেননা কবিতার ইতিহাস মানুষের ভাষার ইতিহাসের সমান। ভাষাই মানুষকে মানুষ রূপে রূপ করিয়াছে। তাহাতেই মানুষ লভিয়াছে আকার সাকার আর নিরাকারের সন্ধান।

এমতি, জীবনানন্দ দাশের কবিতায় মস্ত বড় উল্লম্ফন চাড়া দিয়া উঠিতেছে। মানব জীবনের এত গালগল্প ফাঁদিবার পর একি রাম! তিনি পাড়িলেন নিস্তব্ধতার গল্প। সেই এমনি এক নিস্তব্ধতা যাহাকে বলিলেন অন্যায়। অন্যায় নিস্তব্ধতাকে কবিতার সহিত সমালোচনার নৈতিকতার সম্পর্ক জুড়িয়া বসিলেন। ইহাতে আমরা এমন এক বিশেষ চরিত্রকে পাই তাহার নাম পলু ঘোষাল। পলু ঘোষালের নামের বদলে ‘জীবনানন্দ দাশ’ও বসাইতে পারিতেন তিনি। তাহাতে যাহা বলা হইয়াছে তাহার অর্থের হেরফের হইত না। পলু ঘোষাল পদ বিশেষ। ইতিহাস লৌক বা না লৌক, পদের বিশিষ্টে তিনি কবি। কবিতা তাহার আণ্ডা। শ্লেষাক্ত ভঙ্গিতে কবি বলিতেছেন— ‘বিশেষত পলু ঘোষাল’এর/ কবিতাও লোকে সব আধাআধি তা-দেওয়া ডিমের মতো শেষ/ক’রে ফেলে—যদি কেউ তুলে নেয় নিতে পারে/ না হলে তা নিজেরই তুলনা শুধু—এমন অন্যায় নিস্তব্ধতা।’

মানব জন্ম নৈতিক সত্যের হাতে ধরা। ধরাকে সরাইলে মানব জন্ম অপর হইয়া খাড়ায়। আর নতুন প্রাণ রূপে আবির্ভাব হয় তাহার। না হইলে মানব জন্ম কুসুমেই মারা পড়ে। আর প্রাণজন্মের বিকাশ ঘটে ওমে। কবিতাও কি সেই আণ্ডা যাহা পূর্ণতা না পাইলে বাচ্চা ফোটাইতে ব্যর্থ হইয়া যায়? কবির ভাব মতে ধরিয়া লইলাম—তা মানে ভাব। ভাব ধরা যদি অধরাই থাকে ভাবটাই তো নিস্তব্ধতায় পর্যবসিত হয়। পরের জানা দূরে থাক, এহেন নিস্তব্ধতা তো নিজের অজানা নিজেই। অথবা ‘নিজেরই তুলনা শুধু’। কবি বলিলেন—এই অজানা অন্যায়। আর অজানাকে জানায়া দিবার পান্থ হইতে ন্যায় প্রতিষ্ঠা পায়। ন্যায় মালটা নাযেল হয় কোথা হইতে? খোদ কবিতার দায় হইতে। কবিতা বিচারের দায় হইতে ন্যায় নামক নৈতিকতা ধরা পড়ে। লেখকের দায় লেখা। এটা সহজ নৈতিকতা। তবে কি পাঠক কি সমালোচক এহেন দায় বহন করিতে বাধ্য। তাহা নয় কি?


বাংলা আধুনিক কবিতার সমাধিসৌধ জীবনানন্দের হাতে সৃষ্টি হইয়াছিল।


তাহার কবিতার বড় গুণ সহজ সুন্দর (Natural Beauty)। পূর্ব বাংলায় তাহার কবিতার অপূর্ব সৌন্দর্য লইয়া পহেলা বিচার করিয়াছেন প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী শ্রী রণেশ দাশগুপ্ত। তাহার তিন প্রকারের সৌন্দর্য বিচার এখন মিথ আকারে হাজির। আমরা আর নবীনবিশেষ বলিব না। সাক্ষী মানিব খোদ জীবনানন্দ দাশকে। ‘কেন লিখি’ রচনায়ও সেই সাক্ষ্য বহিতেছে। তাহার ভাষায় তাহা— ‘আমি বলিতে চাই না যে, কবিতা সমাজ বা জাতি বা মানুষের সমস্যাখচিত অভিব্যক্তি হবে না। তা হতে বাধা নেই। অনেক শ্রেষ্ঠ কাব্যে তা হয়েছে। কিন্তু সে সমস্ত চিন্তা, ধারণা, মতবাদ, মীমাংসা কবির মনে প্রাগ্‌কল্পিত হয়ে কবিতার কঙ্কালকে যদি দেহ দিতে চায় কিংবা সেই দেহকে যদি দিতে চায় আভা, তাহলে কবিতার সৃষ্টি হয় না। পদ্য লিখিত হয় মাত্র, ঠিক বলতে গেলে পদ্যের আকারে সিদ্ধান্ত, মতবাদ ও চিন্তার প্রক্রিয়া পাওয়া যায় শুধু। কাজেই চিন্তা ও সিদ্ধান্ত, প্রশ্ন ও মতবাদ প্রকৃত কবিতার ভিতর সুন্দরী কটাক্ষের পিছনে শিরা-উপশিরা ও রক্তের কণিকার মতো লুকিয়ে থাকে যেন।’

শেষাবধি বলিতে হইতেছে জীবনানন্দ দাশের কবিতা পাঠ আর বিচার সভায় আমরা এক নির্মম বাসনার ভিতর দিয়া গড়াইয়াছি। বারেবারে একখানা তর্ক সামনে হাজির হইতেছিল। তাহা কি? বাংলা আধুনিক কবিতার সমাধিসৌধ জীবনানন্দের হাতে সৃষ্টি হইয়াছিল। তাহার কবরও তিনি রচনা করিয়াছেন আপন হাতে। বাকি আধুনিক কবিতা কোশেশ করনেঅলারা তাহার কবিতার ঘাসবিচালি মাত্র। আর তেমন বিশেষ কিছু নহে। ভবিষ্যতে ঘাসবিচালি অতীতের নিরাপত্তা লইবে, লইতেছে নিশ্চয়ই?

 

লেখাটি অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক ‘নতুন ধারা’ পত্রিকায়
২০১১ সালে প্রকাশিত
সাখাওয়াত টিপু

সাখাওয়াত টিপু

জন্ম ১৯৭১, সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম। লেখক ও চিন্তাবিদ।


প্রকাশিত বই :
কাব্যগ্রন্থ—
১. এলা হি বরষা
২. যাহ বে এই বাক্য পরকালে হবে
৩. শ্রী চরণে সু
৪. বুদ্ধিজীবী দেখ সবে
৫. কার্ল মার্কসের ধর্ম


সম্পাদনা ও গবেষণা—
১. জাতীয় সাহিত্য (ভাষা ও দর্শনের কাগজ)
১. চাড়ালনামা (নাসির আলী মামুনসহ যৌথ)


ই-মেইল : shakhawat.tipu@gmail.com
সাখাওয়াত টিপু