হোম নির্বাচিত চিহ্ন’র সঙ্গে কবির আড্ডা

চিহ্ন’র সঙ্গে কবির আড্ডা

চিহ্ন’র সঙ্গে কবির আড্ডা
926
0
তিন রমণীর ক্বাসিদা দিয়ে শুরু খোন্দকার আশরাফ হোসেনের। প্রেম-প্রণয় ও মিথ একাকার তাঁর চরণবিন্যাসে। অভিজ্ঞতায় ও অনুভূতিতে প্রাত্যহিকতা নয়—চিরন্তনতার শুদ্ধাশুদ্ধ রূপ নির্ধারিত হয় তাঁর কবিতায়।পার্থ তোমার তীব্র তীর, জীবনের সমান চুমুক, সুন্দরী ঘৃণার ঘুঙুর, তোমার নামে বৃষ্টি নামেকাব্যে অনেকটা ফর্মাল এবং অনুরাগ-রঞ্জিত। পলকে ঝলসে ওঠে, দৈবাৎ ঐতিহ্য পুনর্বিন্যস্ত হয় নির্ধারিত উদ্দেশ্য থেকে। তবুও প্রেম ও প্রণয় পরাভূত নয় তাঁর কবিতায়। একালে ক্রমশ অতিক্রান্ত সবকিছুতে সমর্পিত এবং সহিষ্ণু তিনি। গ্লোবালাইজেশনের কালে, তত্ত্বপ্লাবনের যুগে এখনও বঙ্গীয় কবিতার এক হালভাঙা নাবিক তিনি। ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের ২৯ জানুয়ারি তিনি সাহিত্যপত্রিকা ‘চিহ্ন’র আড্ডায় অংশ নেন। আড্ডায় ছিলেন শামীম নওরোজ, তুহিন ওয়াদুদ, কুমার দীপ, সৈকত আরেফিন ও সজল সমুদ্র। প্রয়াত কবির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আড্ডাটি পুনরায় ছাপা হলো পরস্পরের পাঠকের জন্য…

চিহ্ন : আমাদের দশকপূর্তিতে আপনার আগমনকে আমরা স্বাগত জানাই। কিন্তু শুরুর প্রশ্নটা করতে হচ্ছে বিস্ময়ের সঙ্গে। মাত্র কয়েকদিন আগে ‘প্রথম আলো বর্ষসেরা গ্রন্থ ২০০৯’ পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। আমরা জানি সিলেকশন বোর্ডে আপনিও একজন সম্মানিত বিচারক ছিলেন। জানতে পারি কি আলতাফ হোসেনেরপাখি বলে  কবিতাগ্রন্থে কী এমন বিশেষত্ব আপনারা পেলেন?


চূড়ান্তপর্বে গিয়ে দেখি সাজ্জাদ শরিফ আমাদের হাতে এই পাখি বলে বইটি দিয়ে বলেন আমরা আলতাফ হোসেনের জন্য কিছু করতে চাই। আমরা তখন রাগ করে বেরিয়ে আসতে চাইলে অনুষ্ঠানটি করে যাবার জন্য আমাদের অনুরোধ করা হয়। 


 খো. . হো : দেখুন এ বিষয়ে বলতে গেলে একটু ফ্ল্যাশব্যাকে যেতে হবে। মনোনয়নের জন্য আমাদের কাছে সর্বশেষ যে ৩৬টি বই দেওয়া হয়েছিল তার মধ্যে এ বইটির নাম ছিল না। আমরা হরিশংকর জলদাসের একটি বই মনোনয়ন দিয়ছিলাম। কিন্তু চূড়ান্তপর্বে গিয়ে দেখি সাজ্জাদ শরিফ আমাদের হাতে এই পাখি বলে বইটি দিয়ে বলেন আমরা আলতাফ হোসেনের জন্য কিছু করতে চাই। আমরা তখন রাগ করে বেরিয়ে আসতে চাইলে অনুষ্ঠানটি করে যাবার জন্য আমাদের অনুরোধ করা হয়। আসলে এটা আমাদের বিচারকদের মনোনয়ন নয়। প্রথম আলোর মনোনয়ন।

চিহ্ন : ও, এই তাহলে হয় ‘প্রথম আলো’য়! আচ্ছা ঠিক আছে, আমরা বরং আপনার একবিংশ বিষয়ে জানতে চাই। একবিংশ শেষ সংখ্যাটি, যেটি আমাদের হাতে আছে, উত্তর-আধুনিক চাতালে শীর্ষক সংখ্যাটি পর্যন্ত আপনি কি অচেনা মুখ অথচ ভালো লেখা, এরকম কাউকে জায়গা দিয়েছেন?

খো. . হো : বেশিরভাগ লেখকের সঙ্গেই তো আমার পরিচয় হয়েছে লেখা ছাপার পরে। যারা এখন চেনা মুখ। লেখা ছাপার অনেক পরে পরিচয়। অনেক লেখক আছেন যাদের সঙ্গে এখনো আমার পরিচয়ই হয় নি। আপনার এই প্রশ্নের কারণ কী?

চিহ্ন : একবিংশ যখন প্রকাশিত হয় তখন সেটা আমরা সংগ্রহ করার চেষ্টা করি। সেই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত অন্যান্য পত্রিকা যেমন উলুখাগড়া, ওটাও সংগ্রহে রাখতে চাই। ঢাকা থেকে যে ম্যাগাজিনগুলো বের হয় এবং জাতীয় দৈনিকের সাহিত্য সম্পাদকেরা আমাদের মনে হয় সাহিত্য করার চেয়ে ক্ষমতাবান হয়ে ওঠার দিকে তাদের মনোযোগ বেশি। হয়তো এ ধারণা মফস্বল থেকে তাকিয়ে দেখা ধারণা…কিন্তু আপনার ধারণা কী?

খো. আ. হো : মোটেই না। ক্ষমতাবান হয়ে ওঠা বলতে কী বোঝাতে চাইছেন?

চিহ্ন : না, আপনি অন্য অর্থে নেবেন না—আমরা দীর্ঘদিন ধরে দেখছি, বলা ভালো ‘প্রথম আলো’র গোড়া থেকে। প্রথম আলো আলতাফ হোসেনকে সামনে নিয়ে এসেছে। তিনি ষাটের দশকে লিখতেন। প্রথম আলো তাঁকে আবার সামনে এনে পুরস্কার দিয়ে দিল। আবার সাজ্জাদ শরিফের কথা যদি বলেন, আপনি নিজেই তো তার ক্ষমতা দেখেছেন বিচার করতে যেয়ে…

খো. আ. হো : একবিংশ সম্পাদক হিশেবে যদি বলি—সে কখন ক্ষমতাবান ছিল আর তার ক্ষমতার কী হলো? আমার মনে হয় না যে আমার কোনো ক্ষমতা আছে বা আমি কাউকে কবি বানিয়েছি বা আমাকে দেওয়া ক্ষমতা ব্যবহার করে আমি কবি হয়েছি বা পুরস্কার পেয়েছি।

চিহ্ন : আপনি তো কাছ থেকে বিষয়গুলো দেখেন। আপনার ধারণা কী?

খো. . হো : যাদের কথা বললেন ঠিক আছে। কিন্তু যখন বলেন আপনারা তখন তো আমিও জড়িয়ে যাই। আমি এসবে নাই। আমার তো কোনো ক্ষমতার বলয় নাই। বরং এখানে চিহ্ন সম্পাদক শহীদ ইকবালের একটা বলয় আছে। তার সঙ্গে অন্তত দশজন ছাত্র বা সাহিত্যকর্মী আছে। আমার কোনো গ্রুপই নাই। ক্ষমতার বলয় নাই। আমি কাউকে কবি বানাই নি, আমি নিজেও কবি হই নি। যদি আমি কবি হয়ে থাকি তবে কবি হওয়ার অনেক পরে আমি পত্রিকা বের করেছি। আমার কথা আমি এটাই বলতে পারি। উলুখাগড়ার কথা উলুখাগড়ার সম্পাদক থাকলে বলতে পারতেন। উলুখাগড়ার সম্পাদক সৈয়দ আকরম হোসেন। তিনি আমার থেকে অনেক সিনিয়র। তাঁর চাকরিজীবনের শেষপর্যায়ে এসে তিনি এ পত্রিকাটি বের করছেন। সুতরাং ওটার দ্বারা তিনি ক্ষমতাবান হবেন বা তার প্রয়োজন পড়বে বলে মনে হয় না।

চিহ্ন : উলুখাগড়ার কথা এসেছে এজন্য যে, এসব সাহিত্য পত্রিকায়—প্রথম আলোতে, সংবাদে বা অন্যান্য দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীতে—কিছু মুখস্থ নাম ছাপা হয়…

খো. . হো : দেখুন, একটা পত্রিকার একটা লেখক-বলয় থাকতেই পারে। আপনার কবিতাটা বা একজন নামী কবির কবিতা সব পত্রিকাই ছাপতে চাইবে। কিন্তু আমরা যারা দূর থেকে দেখি বা দূর থেকে পাঠাই বা একেবারেই পরিচিত নয়, এরকম মানুষের কবিতা কিন্তু ছাপা নাও হতে পারে। ঢাকায় যেসব ছোটকাগজ আছে, ধরুন একদম ছোটকাগজ, তারাও কিন্তু আপনার লেখা ছাপবে না। তাহলে কেবল বড় কাগজের দোষ দিয়ে লাভ কী? যারা লিটল ম্যাগাজিন করে তারা চার-পাঁচজন মিলে একই মন্ত্রপাঠ করেন। এই চার-পাঁচজন ছাড়া অন্য কারো লেখা সেখানে ছাপা হতে পারে না। লেখা যত ভালোই হোক খোন্দকার আশরাফ হোসেনের লেখাও কিন্তু ছাপা হবে না। যদিও খোন্দকার আশরাফ হোসেন সেখানে লেখা দেবে না। আবার দেখা যাবে ঢাকা থেকে চিহ্ন-তে লেখা পাঠালে চিহ্নও ছাপছে না। ব্যাপারটা এরকম হতে পারে।

চিহ্ন : আচ্ছা কবিতা সম্পের্কে বলুন, বলা হয় কবিতা দুর্বোধ্য হয়ে গেছে। এখনকার কবিতা অহেতু শব্দের খেলা…আপনার কী মনে হয়…

খো. . হো. : আপনি কি মনে করেন, কবিতা বিরল হলে বা দুষ্প্রাপ্য হলে সেটাই ভালো হতো? বেশি চয়েস আছে বা বাজারে বেশি জিনিস আছে তার মধ্যে থেকে ভালোটা বেছে নেবেন। তাতে আপনার নির্বাচনক্ষমতা যাচাই হবে। আগে একটা সময় সাপ্তাহিক পত্রিকা ছিল ‘বিচিত্রা’। বিচিত্রা-তে কবিতা ছাপার জন্য আমরা বসে থাকতাম। শামসুর রাহমানকে কবিতা দিয়ে আসলাম, ছাপা হবে। আর কোনো পত্রিকা ছিল না তো! বিচিত্রা-তে কোনো লিখা বা খবর বের হলে সবাই জানত যে অমুকের লিখা বের হয়েছে। আগে শুধু বিটিভি ছিল। বিটিভিতে কোনো অনুষ্ঠান হলে সবার মুখে মুখে ফিরত, ঐ গানটা হয়েছে। এখন আপনি বিটিভিতে নাটক করছেন বা আপনার অভিনীত নাটক হয়েছে, তা ৯৯% লোকে দেখে না। এখন অন্য চ্যানেল দেখে। এটা কী করবেন আপনি?

চিহ্ন : এই কারণেই তো আমরা যারা ভালো কিছু করতে চাই, তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বঞ্চিত হচ্ছি।

খো. . হো. : এই যে ৪৪টা পত্রিকা বেরুলো, তার মধ্যে ভালো যেটা সেটা আপনার চোখে পড়বে নিশ্চয়ই।


আধুনিকতা এক জিনিস, আধুনিকবাদ আরেক জিনিস। মডার্নিটি এক জিনিস, মডার্নিজম আরেক জিনিস। মডার্নিজম এক ধরনের ইজম, মডার্নিটিকে মডার্ন থেকে দেখার একটা দিক হচ্ছে মডার্নিস্ট দিক। রবীন্দ্রনাথ মডার্ন পোয়েট কিন্তু হি ইজ নট মডার্নিস্ট পোয়েট।


চিহ্ন : একটা পত্রিকার একটা সংখ্যা ভালো করার পরে দেখা যাচ্ছে পরের সংখ্যা একেবারেই খুব সস্তা হয়ে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে পরের বারে আশা নিয়ে পুরোটাই আশাহত হতে হয়।

খো. . হো. : তারপর আশাহত যখন হলেন তখন ওটা পড়া বাদ দিলেন। তখন আরেকটা খুঁজবেন। ওটা পড়লেন খুঁজে। ওটা হয়তো ভালো হচ্ছে। আপনি কি মনে করেন এই যে তরুণরা বিভিন্ন জায়গায় লিটল ম্যাগাজিন বের করছে, তাদের উৎসাহে আপনি কি ঠান্ডা জল ঢেলে দেবেন? তাদের বলবেন যে তারা পত্রিকা বের করবে না?

চিহ্ন : যেটা মনে হয় যে, ঠিকভাবে সাহিত্যের যে জায়গাটা, যে জায়গায় কেউই পৌঁছায় না…

খো. . হো. : কিভাবে করা উচিত বলেন দেখি? রাজশাহী শহরে যেখানে দশটা পত্রিকা বের হয়, তা না করে যদি সবাই মিলে বসে আমরা একটা পত্রিকা বের করি। ভালো ভালো লেখা নির্বাচন ক’রে—এরকম করা কি উচিত? সেই দৃষ্টিভঙ্গি যদি দেখানো যায় তাহলে কেমন হয়? রাজশাহীর সব প্রকাশকরা এক জায়গায় হয়ে ঠিক করল যে দশটা পত্রিকা বের না করে একটা পত্রিকা বের করবে। তাতে বিভিন্ন পত্রিকার তরুণ লিখিয়েরা তারা কি রাজি হবে? আর সবার কি জায়গা হবে? আবার একটু ভিন্ন বিষয়ে বলি। আমার জানা ছিল আশলে—আমাদের যে আধুনিকতা, সে আধুনিকতার দু’টি পার্ট। একটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আর একটা মাইকেল মধুসূদন দত্তের। আবার দেখা যাচ্ছে যে অন্নদাশংকরও আধুনিক। একবিংশ’র যে ‘বুদ্ধদেব বসু সংখ্যা’… যাই হোক সেখানে তো আমি আলোচনা লিখেছি। আধুনিকতা এক জিনিস, আধুনিকবাদ আরেক জিনিস। মডার্নিটি এক জিনিস, মডার্নিজম আরেক জিনিস। মডার্নিজম এক ধরনের ইজম, মডার্নিটিকে মডার্ন থেকে দেখার একটা দিক হচ্ছে মডার্নিস্ট দিক। রবীন্দ্রনাথ মডার্ন পোয়েট কিন্তু হি ইজ নট মডার্নিস্ট পোয়েট। মডার্নিটি শুরু হয়েছে রেনেসাঁ থেকে। মুক্তিযুদ্ধের পর যখন রেনেসাঁ তখন থেকে ইতিহাসের আধুনিক যুগ। ইতিহাসের আধুনিক যুগ আর সাহিত্যের আধুনিক যুগ সমস্থানীয় নয়। ইতিহাসের আধুনিক যুগ শুরু হয়েছে যেটা বলা হয়ে থাকে নাইনটিন সেঞ্চুরির শেষ কোয়ার্টার থেকে। আর আধুনিক সাহিত্যের লক্ষণের মধ্যে যেটা আপনারা সবাই জানেন—একটা হচ্ছে যে, নিশ্চিত বোধের বিপরীতে অনিশ্চয়তা বোধ। এটা প্রধান ব্যাপার। নিশ্চিত বোধের সাপ্লাইয়ে অনেকগুলো জিনিস ছিল। মানুষের পায়ের নিচে অনেকগুলো শক্ত মাটি ছিল। তার মধ্যে একটা ছিল ধর্ম। একটা ছিল সমাজব্যবস্থা। আরেকটা ছিল দার্শনিক প্রেক্ষাপট। এগুলো সবাই নাইনটিন সেঞ্চুরির মাঝামাঝি সময়ে ভেঙে যেতে থাকে বিভিন্ন কারণে। শিল্পবিপ্লবের কারণে, সায়েন্টিফিক অ্যাডভান্টেজের কারণে। এগুলোর কারণে যেটা আসছে সেটা হলো অনিশ্চয়তা বোধ। আগে মানুষ জমি চাষ করত। সুখে-দুখে, বিপদে-আপদে জমিদার ছিল মাথার উপরে। সমাজের একটা স্তর-বিন্যাস ছিল, যেটা স্থির। অনেক বছর, অনেক শতাব্দী ধরে এ রকম ছিল। কিন্তু যখন শিল্পবিপ্লব হলো, ফ্যাক্টরির সৃষ্টি হলো, মানুষ গ্রাম থেকে শহরে আসতে লাগল, কারখানায় শ্রমিক হতে থাকল, কৃষকেরা যারা আগে গ্রামের ভূমি ব্যবস্থার মধ্যে ছিল তারা বাইরে চলে আসল, এসে শিল্পব্যবস্থার অঙ্গীভূত হলো এবং শহরে যখন আসল, বস্তিতে বাস করতে থাকল, তখন আর তাদের মাথার উপরে কোনো গার্জিয়ান নাই। আগে জমিদার বাবু ছিল। কম দিক, বেশি দিক, মারুক-কাটুক সে কিন্তু পিতার মতো ছিল। পিতৃহীন হলো মানুষ সামাজিকভাবে। আর অন্যদিকে ডারউইনইজম এসে বলল যে, এতদিন যা ভেবেছেন—‘তোমার আপন হাতের দোলে দোলাও’—কেউ এরকম আকাশে বসে আমাদের জীবনকে দোলাচ্ছে না মোটেই। এটা একটা অন্ধ প্রতিযোগিতা—হয় বাঁচবে না হয় মরবে। সারভাইবাল অব দ্য ফিটেস্ট, শক্তি থাকলে বাঁচো, না থাকলে মরে যাও। এরকম অনেক প্রাণী লুপ্ত হয়ে গেছে। মানুষ যাবে। সুতরাং এখানে কোনো ডিভাইন প্যাটার্ন চলছে না। আসমানে ঈশ্বর পিতার মতো বসে তোমার জীবন নিয়ন্ত্রণ বা সুখ বা দুখ দিচ্ছে না। সুতরাং ভুলে যাও সব কথা—এই যে এখান থেকে চলে এল অনিশ্চয়তার বোধ। আমি যেখানে আছি আমার পায়ের নিচে তো মাটি নাই। অর্থনৈতিক, দার্শনিক, সামাজিক এই অনিশ্চয়তা থেকে অশান্তি, অশান্তি থেকে দুঃখবোধ, দুঃখবোধ থেকে বিরক্তিবোধ—এগুলো এভাবে সৃষ্টি হয়েছে।

মানুষ গ্রাম থেকে শহরে চলে এসেছে এবং তার যে অবলম্বনগুলো ছিল, যেমন—হসপিটালের রোগীর যেমন অক্সিজেনের নল থাকে, রক্তের নল থাকে, লাইনের নল থাকে, তাঁকে বাঁচিয়ে রাখে। মানুষকে যা যা বাঁচিয়ে রেখেছিল সবগুলো নল কেটে দেওয়া হলো। মানুষের সাথে মানুষের, সমাজের যে যোগ ছিল একজনের সাথে আরেকজনের, যে যোগ কেটে গেল। তারপরে মানুষের অন্যান্য যত সম্পর্ক ছিল সবগুলোই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। মানুষ তখন একা। শহরে এবং একা। আধুনিক সাহিত্যের মূল লক্ষণ এটা। একাকিত্ব। এই যে সে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে—ঈশ্বর থেকে বিচ্ছিন্ন, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন, এমনকি নিজের ভিতরেও বিচ্ছিন্ন—নিজের শুভবুদ্ধি থেকে সে বিচ্ছিন্ন।


মার্কসবাদের বাইরেও কিন্তু সমাজতন্ত্র আছে। সমাজতান্ত্রিক চিন্তা যে শুধু কার্ল মার্কসই করেছেন তা নয়।


চিহ্ন : সবার মাঝে থেকেও সে একা?

খো. . হো. : সব কথা এখান থেকেই এসেছে। বিষণ্নতা বলেন, ক্লান্তি বলেন, আগে মানুষের তো ক্লান্তি ছিল না। একজন শিল্পী, একজন কুমোর সে মাটির পাতিল বানাতো, বিক্রি করত। তার একটা আনন্দ ছিল, সৃষ্টির আনন্দ। এখন সে কারখানায় বসে বোতলের ক্যাপটাও হয়তো বানায় না। সে হয়তো ক্যাপটা শুধু লাগায়। মডার্ন টাইম বলে একটা সিনেমা আছে—কাজি ক্যাপ্টেনের। এ রকম একজন আছে, একটা করে বোতলে ও শুধু টাইট দেয়। হাতে একটা প্যান আছে। ও শুধু টাইট দেয়। সারাদিন শুধু এরকম করে। রাত্রে বাসায় এসে ঘুমের মধ্যে সে এরকম করে। এটুকু তার কাজ। এটুকুর বাইরে সে বোঝে না। এই যে, একটা জিনিস, অর্থহীন একটা কাজ সে করছে সারাদিন, এর ফলে সে কী হবে? তার কাজে তো আনন্দ নাই। ফলে তার সেই দুঃখবোধগুলো (এলিয়েনেশন) সৃষ্টি হবে।

আধুনিক সাহিত্য মানে এটারই একটা ফলাফল। একটা বিষফল। আধুনিক জীবনের বিষফল। যেটা যুগের পর যুগ ধরে প্রায় ১০০ বা ১৫০ বছর ধরে সৃষ্টি হয়েছে। তার ফলাফলই হচ্ছে আধুনিক সাহিত্য। এখন এই আধুনিকতার বোধটি আবার বিচ্ছিন্নভাবে সাহিত্যে প্রকাশিত হয়েছে। এটার একটা ক্রিস্টালাইজ মডার্নিজম, আধুনিকবাদ। সমাজকে পাল্টাতে চেয়েছে অনেক মানুষই। অনেক সংস্কারকে পাল্টাতে চেয়েছে। কিন্তু মার্কসবাদ, কার্ল মার্কস তার একটা বিশেষ ফর্মুলা দিয়ে সেটা পাল্টাতে চেয়েছে। ওটা মার্কসবাদ। মার্কসবাদের বাইরেও কিন্তু সমাজতন্ত্র আছে। সমাজতান্ত্রিক চিন্তা যে শুধু কার্ল মার্কসই করেছেন তা নয়। আরো অনেক চিন্তাবিদই এই চিন্তা করেছেন। সোস্যালিজম ছিল তারও আগে। কিন্তু মার্কসবাদ হচ্ছে এটারই সমাজতান্ত্রিক চিন্তার একটা স্ফটিককৃত, ক্রিস্টালজিক একটা বিষয় শুধু। এরকম আধুনিকবাদ হচ্ছে আধুনিকতার একটা বিশেষ ক্রিস্টালাইজ রূপ। যেটা ইউরোপের সাহিত্যে উনিশ শতকের শেষের দশকে শুরু হয়েছে। কবিতায় বোদলেয়ারের পরে যেমন ফরাসি সিম্বলিস্টরা; ইংরেজি কবিতায় দিয়েছে ইলিয়ট, পাউন্ড—এরা। আর এদেরই দেখাদেখি বুদ্ধদেব বসু শিখেছিলেন। সবকিছু তো দেখে শেখে। আমাদের দেশে সবকিছু পশ্চিম থেকে এসেছে।

চিহ্ন: শুধু আইডিয়াটা এসেছে।

খো. . হো. : আইডিয়া তো আমদানি হতেই পারে। অসুবিধা কী? আমদানি হলে খারাপ কিছু নাই। কোনটা আমদানি হয় নি? ধর্ম এখানে আমদানি হয় নি? আমাদের দেশে শুধু কুংফু-কারাতে ছাড়া বাকি সব পশ্চিম থেকে এসেছে। তবে জন মিলের—জীবনানন্দ দাশ বা বুদ্ধদেব বসু বা বিষ্ণুদের কবিতায় যে ধরনের যন্ত্রণা বা নাগরিক যন্ত্রণার কথা বলা হয়—ততটা তীব্র যন্ত্রণা কলকাতার জীবনে ছিল কিনা এটাই প্রশ্ন।

চিহ্ন : বিপরীতধর্মী এ প্রশ্নও তো করা যেতে পারে যে, আমরা যে সময়টা নির্ধারণ করে দিয়েছি আধুনিকতার বা তারও আগে কি আধুনিকতা বা আধুনিক মানুষ ছিলেন না আমাদের সমাজে?

খো. . হো. : আধুনিক মানুষ বলতে কী বোঝায় বললাম তো। আধুনিক মানুষ বলতে যদি বোঝেন আলোকিত মানুষ তাহলে সেটা আছে অনেক আগে থেকে। আলোকিত মানুষ হচ্ছে বিমর্ষ, বিষণ্ন, নির্জন, একাকী, স্বার্থপর, কৃপণ, এলিয়টের প্রুফ্রক। এটা হচ্ছে আধুনিক মানুষ। আপনি কোন আধুনিকটা খুঁজছেন সেটা আমাকে বলেন। আমরা যখন বলি লোকটা খুব আধুনিক, সেটা কিভাবে? সে খুব উদার, মুক্তমনা আধুনিক মানুষ। সাধারণ অর্থে এটা। আর সাহিত্যে একটা বিশেষ অর্থ আছে। সে অর্থ কিন্তু উল্টোটা একদম। আধুনিক মানুষ হচ্ছে করুণাযোগ্য। যাকে করুণা করা যায়। কাপুরুষ। যে আত্মমুখী, যে স্বার্থপর, সে হচ্ছে আধুনিক মানুষ।

চিহ্ন : আপনি একটু আগে বলেছেন মানুষ তার শুভবুদ্ধি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এই যে বিচ্ছিন্নতাবোধ, সেখানে তো নিশ্চয়ই এলিয়টের যে উপলব্ধি বা জীবনানন্দ দাশের যে উপলব্ধি, কবিতার ক্ষেত্রে দু’জনার প্রকাশভঙ্গি তো একরকম নয়। আমি আশলে জানতে চাচ্ছি দু’জনার কবিতার মধ্যে মৌলিক যে পার্থক্য আছে স্থান কালগত, ভৌগোলিক বা ভাষাগত, সে পার্থক্যগুলো আপনার দৃষ্টিতে কেমন, সেটা যদি একটু আমাদের সংক্ষেপে বলেন।

খো. . হো. : ব্যাপারটা হলো কি, ইউরোপের আধুনিকতা বা আধুনিকতাবাদীর যুগযন্ত্রণা যত তীব্র, ত্রিশের দশকে কলকাতায় অতটা তীব্র না হলেও তার যে সূচনা হয় নি সেটা বলা যাবে না। তখন কলকাতা নগর হয়ে উঠছে। কলকাতার চারপাশের যে শিল্প, শিল্প-এলাকা, শ্রমিক, শ্রমিক-অসন্তোষ, বস্তিজীবন, নাগরিক দারিদ্র্য—এসব লক্ষণ সবকিছু তো ছিলই। অত তীব্র না হতে পারে। সেটা হয়তো বোদলেয়ারের প্যারিস নয়। এলিয়টের লন্ডনও সে হয়তো নয়। এখন কথা হচ্ছে যে নয় কেন? সেনসেটিভ মাইন্ডের কাছে তখনই হয়তো সে যন্ত্রণাটা তীব্র। আর যে ইনসেনসেটিভ তার কাছে মনে হবে আরে কলকাতা তো ভালোই স্বর্গ! সেখানে নাইট ক্লাব আছে, নাচ-গান হয়, সেখানে গঙ্গার ধারে হাওয়া খাওয়া যায়, সবই ভালো। টু দ্য সেনসেটিভ পিপল। তাদের কাছে মনে হচ্ছে যে বাইরে সবকিছু ঠিকঠাক চলছে স্বর্গের মতো, সবকিছু আনন্দময়, কিন্তু ভেতরে কোথাও একটা কান্না আছে। কোথাও একটা শিশিরের শব্দ, সুপারসনিক সাউন্ডের মতো। শব্দটা একটু রোমান্টিক হয়ে গেল। সে সাউন্ডটা অতি সংবেদনশীল মন শুধু ধরতে পারে।

চিহ্ন : সুপারি গাছটা যে কবির চোখে মুখে পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে—এ অনুভূতিটা তো আশলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আসার প্রশ্নই উঠে না।

খো. . হো. : কবি, এজন্যই তো কবি। কবি আর সাধারণ মানুষের মধ্যে পার্থক্য কী? কবিরও দুটো চোখ, দুটো কান, একটা নাক সবই তো আর সব মানুষের মতোই। আমি যেটা সব সময় বলি, কবির রিসিভার আপনার রিসিভারের মতোই। পার্থক্য হলো, আপনার রিসিভারে চ্যানেল ধরে ৫টা আর কবির ধরে ১০০টা চ্যানেল। তার ফ্লেবারটার স্বাদ একটু বেশি। চ্যানেলও বেশি ধরে। পার্থক্য এই, তাই না? এটা ওয়ার্ডসওয়ার্থ অনেক আগেই বলেছেন। মানে কবি সাধারণ মানুষের মতোই। শুধু তার এক্সট্রা সেনসিটিভনেস। এজন্যই আমি বলছি যে, ব্লেক তো সেই কবে—নাইনটিন সেঞ্চুরির প্রথমদিকে যখন কেউ কখনো ভাবে নাই যে—লন্ডন শহর পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শহর, বৃটিশ সাম্রাজ্যের কেন্দ্র—সেখানে পথে পথে, তিনি বলছেন যে ‘আই ওয়ান্ডার থ্রো ইচ চার্টার্ড স্ট্রিট।’ আমার কানে আসে শুধু শিশুর আর্ত চিৎকার এবং বেশ্যাদের ঘৃণার আওয়াজ। পথে পথে শুধু মানুষের শেকলের ঝনঝনানি শুনতে পাই। এটা শুনে লোকে তো তাকে পাগল ভাবছে। এরকম প্রসপারাস একটা শহর, সমৃদ্ধিশালী নগর, সারা পৃথিবী থেকে মানুষ এখানে আসে। ধন-সম্পদের কেন্দ্র সেখানে। কিন্তু কবি বলছেন, পথে পথে হাঁটি, আমার কানে শুধু আসে মানুষের বন্দিশালার ঝনঝনানি। আমি শুধু ক্ষুধার্ত শিশুর চিৎকার শুনি। কেন শুনছি। কথাটা কি মিথ্যা! কবি কি বানিয়ে বলছেন! এটাও তো একটা চিত্র, যেটা সাধারণ মানুষের চোখে পড়ছে না, কিন্তু অতি সংবেদনশীল কবির মনে তিনি ঐ বোবা কান্নাটার শব্দ শুনতে পাচ্ছেন। জীবনানন্দ দাশ যে রাস্তায় হাঁটছেন, তিনি নিজে বলছেন, ‘আমি দেখি আদিম সর্পিণী সহোদরার মতো কলকাতার ট্রাম লাইনগুলো আমার পায়ের নিচে ছড়িয়ে আছে। তাদের বিষাক্ত স্পর্শ শরীরে নিয়ে হাঁটছি’—এটাকে আমি মিথ্যা কেন বলব! তিনি বানিয়ে বলছেন। আমি হেঁটে যাচ্ছি। আমার কাছে হয়তো খারাপ লাগছে না। আমি গোলাপ বাগানে হেঁটে গেলে পায়ের নিচে গোলাপ কয়টা পিষ্ট হলো সেটাও তো দেখি না। আরেকজন হয়তো একটা ঘাসফুল ঝরে পড়লে সেটার দিকে তাকিয়ে থাকে বা তার কান্না আসে। পার্থক্য তো মানুষের মধ্যে থাকেই। সুতরাং আমি বলব না যে ত্রিশের দশকে জীবনানন্দ দাশ কলকাতার নগরের যন্ত্রণার কথা বানিয়ে লিখেছেন বা এটা অসৎ বা মেকি বা অনুকরণ পশ্চিমের, সেটা কেন বলব? আমি ঢাকা শহরে থাকি। ঢাকা শহরে হাজার হাজার মানুষ। ঢাকা শহরকে তো আমার স্বর্গ মনে হয়। কী চমৎকার শহর! চারদিকে কত আনন্দ-ফূর্তি চলছে। আবার শহীদ কাদরী যখন দেখছেন বৃষ্টির শহর, তখন বৃষ্টির পানিতে উঠে আসছে। তিনি বলছেন যে, ইলেকট্রিকের লাইনগুলোতে বাদুড় ঝুলে আছে, ‘মনে হচ্ছে যে মরা মানুষের মতো ঝুলে আছে।’ কবির তৃতীয় নয়ন থাকে, যে তৃতীয় নয়নে ভৌতিক দৃশ্যগুলো চোখে পড়ে। যেটা আমার সাদা চোখে আমি দেখছি না। কারণ আমার সেই অতি সংবেদনশীল মন নেই হয়তো। আপনি কি মনে করেন ঢাকা শহরে সবাই খুব শান্তিতে আছে? কারো মনে কোনো হাহাকার, ক্রন্দন নাই? সেখানেও তো মানুষ কষ্টে আছে। সেখানে কর্মহীনতা আছে, সেখানে দৈনন্দিন নানা বঞ্চনা আছে। এগুলোর একটা কান্না আছে না? এ কান্না এধারে ওধারে কোথাও আছে না? কারো এন্টিনায় ধরা পড়ছে, কবির এন্টিনায় ধরা পড়ছে। সে যে কবিতাটি লিখতে পারে। লিখলেই বলব এটা বোদলেয়ারের অনুকরণ করে লিখেছেন। একথা বলা ঠিক না। এটাই বলতে চাচ্ছি।

চিহ্ন : আপনার একবিংশ’র যে শেষ সংখ্যাটা ‘উত্তর-আধুনিক চাতালে’—এখানে উত্তর-আধুনিকতার বিষয়ে আমি যেটা বলব যে, পশ্চিম থেকে আসুক। পশ্চিম থেকে প্রথমে পশ্চিম বাংলাতে আসে। মনে হয় পশ্চিম বাংলায় পৌঁছার অনেক পরে আমরা এখানে পাই। আপনি কিন্তু আপনার প্রবন্ধে বলেছেন, আপনি একটা চিঠি পেয়েছেন। আমার ব্যক্তিগত ধারণা এবং আরো আরো যাদের প্রবন্ধ পড়েছি সেসব জায়গা থেকে নিয়ে যেটা মনে হয়েছে—উত্তর-আধুনিকতার নামে আমাদের এখানে যে সাহিত্যের ছোটকাগজগুলো আছে, বিশেষ করে আশির শেষ এবং পুরো নব্বইটাই উত্তর-আধুনিকতার নামে এক ধরনের আলোকিত দুর্বোধ্যতা। প্রশ্ন হলো, এই সময়ের কবিতায়, এই সময়ে পশ্চিম বাংলায় এবং আমাদের এই স্বাধীন বাংলাদেশের কবিতায় এই উত্তর-আধুনিকতার চেতনা কতটা প্রভাব ফেলেছে বলে আপনার মনে হয়?


আধুনিক সাহিত্য মানে অনেকটা বিমানবিকতা। কিন্তু ব্যাপারটা এ আধুনিক মানুষের মতোই। সে দুর্বল হোক, কাপুরুষ হোক, ভীরু হোক, এই মানুষটা কিন্তু আছে। কিন্তু তাকে একেবারে বিদায় দেওয়া হয়েছে উত্তর-আধুনিক কবিতায়। এটা হলো সবচেয়ে বড় ফ্যাক্ট।


খো. . হো.: আমি আপনার সাথে ১০০% একমত। উত্তর-আধুনিকতা এই কথাটি নিয়ে নানা রকম ব্যাখ্যা আছে। বিশেষ করে পশ্চিম বাংলাতে দু’টি ক্যাম্প আছে। একদল নিজেদেরকে বলে উত্তর-আধুনিক আর একদল নিজেদেরকে বলে Postmodern, ওরা ওটাকে অনুবাদ করে না। এখন দুটো কিন্তু আকাশ-পাতাল। উত্তর মানে উত্তরণ। আধুনিকতারই একটা উত্তীর্ণ পর্যায় আধুনিকতা থেকে উত্তীর্ণ হয়ে, বিকশিত হয়ে, অগ্রসর হয়ে আরো উন্নত আধুনিকতা। উন্নততর একটা আধুনিকতার স্তরে আমরা এসেছি। আর তার ফলে আধুনিক কবিতা, বাংলা কবিতা অনেকগুলো জিনিসকে পাশ কাটিয়ে গেছে। অনেকগুলো জিনিসকে, থিমকে, বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র থেকে প্রান্তে নিয়ে গেছে। যেমন লোকজীবন। নগরজীবনে শুধু ক্লান্তি, হতাশা, বিমর্ষ এসব। যেটা এতক্ষণ আলোচনা করলাম। সাইড লাইন ছিল কোনটা? মানুষের জীবনসংগ্রাম, ইতিবাচক, আশা, সংগ্রাম, লোকজীবন, অন্ন, ভাত, মাংস এসব। শুধু শহরের কষ্ট নয়, শুধু ড্রেনের জল নয়। আরো কিছু আছে মানুষের। কৃষক যে খাদ্য ফলাচ্ছে তারও একটা জীবন আছে। তারও একটা প্রকাশ আছে। এই চিত্রগুলোকে আধুনিক কবিতায়, আধুনিক বাংলা কবিতায়, নগরভিত্তিক কবিতায় দূরে সরিয়ে রেখেছিল। এখন আবার সেটাকে ফ্রন্টে এবং সেন্টারে আনতে চাই। এর ফলে আমরা ঐতিহ্যবিচ্ছিন্ন হচ্ছি না। কারণ ঐতিহ্যবাহী সেই চর্যাপদ-এর কাল থেকেই এই ধারাটা সাহিত্যে চলে আসছে। তবে আধুনিককালে এটা চাপা পড়ে গিয়েছিল বা প্রান্তে চলে গিয়েছিল। এটাকে আবার কেন্দ্রে আনতে চাই। এক্সপোজ করে নিতে চাই। এটাকে তারা উত্তর-আধুনিক বলছে। এর সাথে তো আমাদের মারামারি নাই। আমার ভালোই মনে হচ্ছে এটাকে। কিন্তু আমি বলছি, এটা হলো উত্তর-আধুনিক। আর পোস্ট-মডার্ন যারা তারা এসব না। তারা বলছে ঠিক একদম পশ্চিম থেকে অনুবাদ করে। পশ্চিমে পোস্ট-মডার্নটা কী জিনিস? মূল আইডিয়াটা হচ্ছে মানুষকেন্দ্রিক—সেটা সেই রেনেসাঁ থেকে সাহিত্য, শিল্প সবকিছু হয়েছে মানবকেন্দ্রিক। মানবতাকেন্দ্রিক। এখন যথেষ্ট হয়েছে মানবতা। কারণ মানবতার নামে অনেক অমানবিক কাজকর্মও করা হয়েছে। দুটো বিশ্বযুদ্ধ হয়েছে। সুতরাং ওসব মানবতা-টানবতা হলো গালভরা কিছু বুলি। মানুষকে মানুষের জন্য সংগ্রাম করতে হবে, বিপ্লব করতে হবে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেছে। দুটো বিশ্বযুদ্ধ হয়েছে। এগুলো দিয়ে কী হলো? চরম একটা হতাশা। কোনো কিছু দিয়েই কোনো কিছু হবে না। ফলে এগুলো করে লাভ নাই। তাহলে আমরা কী করব? যেহেতু দেশ, সমাজতন্ত্র দিয়ে বিপ্লব করা যাবে না ফলে পাড়ায় পাড়ায় পানীয়জলের সমস্যা, আর্সেনিক সমস্যা—এগুলো নিয়ে আন্দোলন হতে পারে। ইস্যুভিত্তিক না হলে সমাজ, দেশ পাল্টে দেবে এসব স্বপ্ন দিয়ে কাজ নাই। এটা শুরু হয়েছে ৬৮ সাল থেকে। সে সময় ফ্রান্সে ছাত্রদের যে বিপ্লব হয়েছিল তার ব্যর্থতার পর থেকে এই মার্কসবাদীরাই সব এন্টি-মার্কসিস্ট হয়ে গেছে। অর্থাৎ সেরকমই এখন শুরু হয়েছে—মানুষের জয়গান তো অনেক হলো, এখন এসট্রে নিয়ে, টেবিল নিয়ে, ইঁদুরছানা নিয়ে কবিতা লিখি না কেন? একজন কবি ত্রিদিব দস্তিদার—আধুনিক কবি, উত্তর-আধুনিক না—তার একটি কবিতাকে কোট করি। সে মঞ্চে উঠে বলত—মানুষের গল্প তো অনেক হলো এবার একটি পিঁপড়ার গল্প হোক। এই উত্তর-আধুনিক কবিতা হচ্ছে পিঁপড়ার কবিতা। এই পিঁপড়া, ফ্যান, আলমারি, যেমন—একটি বাড়ির দিকে হেঁটে গেল আরেকটি বাড়ি। শার্ট, পা দুটো গেল কোথায়? এ ধরনের আর কি। তারপর আলনার এখানে আছে শাড়ি, শাড়িগুলো কথা বলছে ইত্যাদি। আধুনিক সাহিত্য মানে অনেকটা বিমানবিকতা। কিন্তু ব্যাপারটা এ আধুনিক মানুষের মতোই। সে দুর্বল হোক, কাপুরুষ হোক, ভীরু হোক, এই মানুষটা কিন্তু আছে। কিন্তু তাকে একেবারে বিদায় দেওয়া হয়েছে উত্তর-আধুনিক কবিতায়। এটা হলো সবচেয়ে বড় ফ্যাক্ট। মানুষ যখন না থাকে তখন আর যাই নিয়েই কবিতা লিখা হোক, সেটা শুধু বায়বীয় শব্দচর্চা ছাড়া আর কিছু হওয়ার উপায় নাই। আমার ঐ ‘উত্তর-আধুনিকতা চাতালে’ সংখ্যাতে অনেকগুলো উদাহরণ দেওয়া ছিল পশ্চিমবাংলার পোস্ট-মডার্ন কবিতা থেকে। ওগুলো পড়লে বুঝবেন যে কী রকম ভাষায় এবং কী ধরনের উদ্ভট চিন্তা কবিতায় প্রকাশ পায়। মানুষ নিয়ে যদি না লেখা হয় তাহলে কবিতা পণ্ডশ্রম না? আবার আমাদের দেশে ৯০ দশকের কবিদের মধ্যে একজন আছেন পোস্ট-মডার্ন। আবার এখন ব্রাত্য রাইসু, এবাদুর রহমান, জহির আহসান, আহমেদ নকীব, কামরুজ্জামান কামু, পাবলো শাহি—এরকম ৮/১০ জনের নাম করতে পারি।

চিহ্ন : আপনি তো কবিতা লিখেন। কবিতার বাইরে একটা কথা বলি। আশির দশক থেকে আমাদের বাংলাদেশে কিন্তু গল্পের ফর্ম চেঞ্জ হয়ে গেছে। যেমন— শহীদুল জহির, মামুন হুসাইন, ইমতিয়ার শামীম, শাহাদুজ্জামান, হুমায়ুন মালিক, নাসরিন জাহান, সুশান্ত মজুমদার, কাজল শাহনেওয়াজ এরকম অনেকের গল্পের মধ্যে তা বেশ লক্ষণীয়।

খো. . হো. : আমি ছোটগল্প বেশি ফলো করি না। কারণ, কবিতা নিয়ে আমার কারবার। আবার কিছু কিছু ফলো করি।

চিহ্ন : আপনি পড়েন কিনা, যাদের নাম বলা হলো?

খো. আ. হো. : পড়ি। মাঝে মাঝে পড়ি। আপনি নাম বাদ দিয়েছেন অনেক। যেমন— সেলিম মোরশেদ, রোকন রহমান, সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ, রাজা সহিদুল আসলাম, জাকির তালকুদার এরকম অনেক। আমি এদের গল্প পড়ি। খুব রেগুলার পড়ি তা না। পড়ি, মন যদি চায়। সময় থাকলে অনেক কিছুই তো পড়ি।


জয় গোস্বামী হচ্ছে জনপ্রিয় ধারার কবি। তিনি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের আরও জনপ্রিয় সংস্করণ।


চিহ্ন : কার কার গল্প আপনার ভালো লাগে?

খো. . হো. : গল্পের নাম বলতে বললে পারব না। তবে শহীদুল জহির তো বটেই, তার বড় গল্প, উপন্যাস জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বহু আগে পড়েছি, যখন প্রথম বের হয়। অবশ্য শহীদুল জহির আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ভাষা অনুকরণ করেছেন। তারপর জাকির তালুকদারের গল্প আমার ভালো লাগে।

চিহ্ন : আমরা আবার কবিতায় ফিরে যাই। জয় গোস্বামী সম্পর্কে আপনার মূল্যায়নটা বলেন।

খো. . হো. : জয় গোস্বামী হচ্ছে জনপ্রিয় ধারার কবি। তিনি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের আরও জনপ্রিয় সংস্করণ।

চিহ্ন : পোস্ট-মডার্ন?

খো. . হো. : ঐরকম তাত্ত্বিক কিছুই না। জনপ্রিয় হওয়ার জন্য যা যা দরকার সেগুলো ইচ্ছামতো ব্যবহার করেছেন। যেমন বেণীমাধব, বেণীমাধব; আবার যখন ইচ্ছা গল্পের মতো বলতে পারেন।

চিহ্ন : তার ভূতুম ভগবান বা উন্মাদের পাঠ্ক্রম—এই বইগুলোর ভেতরে যদি আসি। কী বলবেন?

খো. . হো. : আমি তো তাকে জনপ্রিয় ধারার কবি বলেছি। খারাপ কবি তো বলি নি। তার কবিতায় experimentation নাই। যা আছে তা হলো কবিতার মধ্যে দিয়ে গল্প বলার আশ্চর্য দক্ষতা। গল্প বলার কারণ—গল্পে তো মানুষের চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা, গল্প শুনলে মানুষ দাঁড়িয়ে যায় যেকোনো জায়গায়। আবার গল্প যদি বলে কবিতার মাধ্যমে এবং কবি যদি খুব হৃদয়গ্রাহী করে এই জিনিসটা উপস্থাপন করেন… কিন্তু কবিতায় আমি যে মননশীলতা বা দৃঢ় ব্যাখ্যাবাণ খুঁজি তা পাওয়া যায় না। অর্থাৎ আমার মনে হয় তার কবিতা হলো—কাব্যে লিখা গল্পসাহিত্য।

চিহ্ন : আপনার কাছে সুনীলের কবিতা কেমন লাগে?

খো. . হো. : সুনীলও একই লাইনেরই।

চিহ্ন : পঞ্চাশ শতকের অথবা নির্মলেন্দু গুণের কবিতা যদি আমরা পড়ি সেখানেও গল্প বলার ব্যাপার আছে। যেমন- ‘হুলিয়া’। আবার ‘কেউ কথা রাখে নি’—এতেও গল্প আছে।

খো. . হো. : এই তো জনপ্রিয় কবিতা। ওগুলোকে মহৎ কবিতা আমার মনে হয় না।

চিহ্ন : পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকে কিন্তু গল্পের মতো করে কবিতা বেশি লেখা হয়েছে। আবার জয় গোস্বামীর উন্মাদের পাঠ্ক্রম, ঘুমিয়েছো ঝাউপাতা পর্যন্ত কবিতাগুলোতে আপনি যে পরীক্ষা নিরীক্ষার কথা বললেন, তা আছে।

খো. . হো. : প্রথমদিকে ছিল। প্রথমদিকে বেশ ভালো কবিতা ছিল। আবার দেখেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার—তাদের কবিতা হলো জীবনানন্দ দাশের কবিতার এক ধরনের বিস্তার।

চিহ্ন : উৎপলকুমার বসু এর বাইরে না ভিতরে?

খো. . হো. : উৎপলকুমার বসু তো আলাদা।

চিহ্ন : জীবনানন্দ দাশকে বাদ দিতে পারছেন না?

খো. . হো. : হ্যাঁ। পারছি না।

চিহ্ন : জীবনানন্দ দাশ যে শব্দ ব্যবহার করেছেন, আমরা জীবন-যাপন করতে গিয়ে তার বাইরে তো যেতে পারছি না। আর যদি প্রভাবের কথা বলেন তো বলতে পারি, আপনার কবিতাতেও এই প্রভাবগুলো আছে।

খো. . হো. : শুধু শব্দের ব্যাপার না এটা। যেমন—অনেকটা স্পর্ধার মতো শোনাবে যে, জীবননান্দ দাশের পর বিনয় মজুমদারের কবিতা না লিখলেও চলত। বিনয় মজুমদারের কবিতা না পড়লে আমার খুব একটা ক্ষতি হবে না। হয়তো তার আলাদা শব্দ আছে, আলাদা ভাব আছে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে নতুন কিছু তিনি সৃষ্টি করতে পারেন নি। এই অভিযোগ শক্তি সম্পর্কেও করা যায়। আবার জীবনানন্দের মধ্যে কি বিদেশি কবিতা, এমনকি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রভাব নাই? আশলে প্রভাব মানুষের পরিমণ্ডল।

চিহ্ন : এই যে প্রভাবের কথা বললেন। এই যে শালিক, ঠ্যাং ইত্যাদি শব্দ জীবনানন্দ লিখেছেন, এখন আমরা কি এই শব্দগুলো লিখতে পারব না?

খো. . হো. : কেন পারব না। এই শব্দগুলোতে বাংলা অভিধানেও আছে। আবার রবীন্দ্রনাথ কোন শব্দটা ব্যবহার করেছেন যা বাংলা অভিধানে নাই। আর রবীন্দ্রনাথ ব্যবহার করেছেন বলে আমরা ব্যবহার করব না। শালিক, ঠ্যাং আপনিও ব্যবহার করেন, কিন্তু আবহ ও টোন যেন একই না হয়। এখন আপনি যদি তার বাকভঙ্গি নেন, শব্দ নেন, টোন নেন তাহলে তাকে আর নতুন বলি কী করে?

চিহ্ন : আমাদের পারস্পরিক আলোচনায় অংশ নেওয়ার আপনাকে চিহ্ন-র দশকপূর্তিকে বিশেষ ধন্যবাদ।

খো. আ. হো. : চিহ্ন-কেও ধন্যবাদ।