হোম পুনর্মুদ্রণ গালিবের ক্রমশ বদলে যাওয়া

গালিবের ক্রমশ বদলে যাওয়া

গালিবের ক্রমশ বদলে যাওয়া
438
0

গালিবের সেরা বই আমার কাছে সবসময়ই মনে হয়েছে অনঙ্গ রূপের দেশে। মানুষ হিশেবে আমরা প্রায়ই একটি বিচার নিয়ে বসে থাকি এবং সেখান থেকে নড়তে আরাম পাই না, তাই মনে হয় দেলওয়ার ভাই (কবি, ‌’কবিতাপত্রে’র সম্পাদক)  যখন বললেন তিমিরে তারানা নিয়ে লিখতে হবে, আমি রাজি হয়েছি কথায় আর মনে মনে ভাবছি ঢেঁকি গিলছি।

তারও প্রায় দুইদিন পর বের করলাম বইটা। প্রথম ছয়/সাতটা কবিতা পড়ে মনে হলো, কোথাও ভুল হচ্ছে। কানেক্ট করতে পারছি না যেন। তো বহু খুঁজে অনঙ্গ রূপের দেশে বইটা পাওয়া গেল।

আমি আসলে তিমিরে তারানা নিয়ে কথা বলতে সেখান থেকে শুরু করতে চাই।

কিন্তু তার মানে এটা নয় যে, আমি ইঙ্গিত করছি তিমিরে তারানা আসলে ওর আগের বইটার এক্সটেনশন। কিন্তু কবি হিশেবে গালিবকে আমি মূলত দুটি পর্বে দেখি। অনঙ্গ রূপের দেশে-র আগে ও পরে।

অনঙ্গ রূপের দেশে-র আগে গালিব অনেক সংহত, অনেক বেশি ক্ল্যাসিকাল মেজাজের আর কবি হিশেবে যে ধরনের ঝুঁকি নিতে মানুষ গালিবের ভালো লাগার কথা, তা কম। তখন শুধু কবিতার মতো কবিতা লিখে যাওয়া, যেন নিজের আয়ুধ আরো বাড়িয়ে নিচ্ছেন তিনি, নানানভাবে রূপ তৈরি, নানানভাবে নিজের শৈলী নিয়ে কাজ করছেন বা করতে চাইছেন। তা একটা ফ্রেমওয়ার্কের ভেতর বসে, কোনো ধরনের চতুরতা ছাড়া, যেন ধীরে ধীরে একটা প্রাসাদ গড়ে উঠছে। আমরা যারা পাঠক আছি তারাও প্রশংসা করছি, আমাদের সামনে বিশাল প্রস্তুতি নিয়ে একজন কবি তৈরি হচ্ছেন যেন। গালিব কোনো ধরনের তাড়াহুড়া ছাড়াই সেটি পার করে এসেছেন।

অনঙ্গ রূপের দেশে যখন বের হলো, তখন মনে হলো গালিবের ভেতর এবার একটা বিরাট পরিবর্তন ঘটে গেছে। ভাষা অনেকটাই বাঁক নিয়েছে, অনেক ইমেজ আমরা পেয়েছি যা আগে কখনো তিনি তৈরি করার ইচ্ছা পোষণ করেছেন বলেও মনে হয় নি। আগে থেকেই একদম সম্পূর্ণ কবিতা লিখতে জানতেন গালিব, ততদিনে কবিতা আরো নানান আঙ্গিকে কিভাবে আরো পরিপক্বতার দিকে যাওয়া যায়, সে রকম একটা পর্ব পার করছেন।

কবি হিশাবে ঝুঁকি নেয়ার যে কথাটা তখন বলছিলাম, সেটা হলো চারটা বই যার হয়ে যায়, তার অনেক কিছুই তার নিজের শৈলীর বলে সে কবি মনে করতে পারেন। মানে, টাইপড হয়ে পড়েন।  কিন্তু শ্লাঘার কথা হলো, গালিব এরকম নন। তিনি অনেক কিছু বদলাতে চান, বদলেও ফেলেন।

পাঠক হিশেবে আমি এখান থেকে তিমিরে তারানা পাঠ শুরু করতে চাই।

 

০২

বনের মৌমাছি সব একে একে উড়িয়ে এনেছে
হলুদ রংয়ের হাওয়া…

বইয়ের প্রথম কবিতার প্রথম লাইন এটি। হাওয়া, হলুদ রঙ তার, মৌমাছির ঝাঁক—এই হলুদ রং মনে হয় বেড়ে গেছে, গালিব সেটাই লিখছেন। কিন্তু তার লেখার কল্যাণে হোক আর ইচ্ছাকৃত হোক একটা বহুমাত্রিক চিত্র তৈরি হয়েছে ভাষার মধ্য দিয়ে। সেই কবিতাতেই ফুলের মধ্যে, কোনো ধরনের বিমানবিকীকরণ না করেও, তিনি পাচ্ছেন পেট্রোলিয়ামের সুবাস!

আরেকটা কবিতায়—

কেবল তোমার নামটিকে
আলতোভাবে ছুয়ে রাষ্ট্র ও ধর্মের ভেদ আমি
কিছুটা বুঝেছি…

আরেকটা কবিতায়—

স্বীকার করা ভালো, লেন্সের ভেতর দিয়ে
যাকে অনুসরণ করে এতদুর এসেছি
সে তোমার নিয়তি নয়,
তার নাম বিস্মৃতি।

এবং আমার সর্বশেষ উদাহরণ—

সবুজ কামিজ আর ঐ টিয়ে পাখি
ভোর হলে দেখা যায়—পৃথিবী এমন;
তোমরা যে রঙেরই অনুপ্রাস, জানো নাকি!

অথচ দুপুর—আস্ত একটা যবন।
সন্ধ্যা মালাউন। রাত্রি—সে পুরাই জঙ্গি।
ফুলেরে ঘায়েল করে পুলিশ-পবন।

কথা হচ্ছে, এই পঙ্‌ক্তিগুলো কেন উদাহরণ হিশেবে আসলো। ঐ যে গালিব বলছেন রংয়ের অনুপ্রাস বা ফুলেরে ঘায়েল করে পুলিশ-পবন, বা এক জায়গায় নিয়তি থেকে বিস্মৃতি আর বিস্মৃতি  থেকে নিয়তি তাদের অবস্থান পালটে ফেলছে; ধর্ম ও রাষ্ট্রের মধ্যে যে এলাইনমেন্ট ভেঙে যাচ্ছে সেই ইঙ্গিত, ভাষা ঠিক রেখেই, এমনকি রস ঠিক রেখেই, গালিব কিন্তু ঠিকই দিয়ে গেলেন। ফলে কবি হিশাবে তার যে উত্তরণ, তা কিন্তু তার নিত্যনতুন শৈলীকে নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে এক পূর্ণ অবয়বের দিকে।

আর একটা দেখার মতো বিষয় হলো, তাঁর ভাষার স্থিতিস্থাপকতা।

নিজেরই ডানার ছায়া দেখে
উড়ে এসে যেই বসে পাখি
অমনি সে ছায়া উড়ে যায়
আকাশেই ফিরে যায় নাকি?

(ব্যালেরিনা)

ছন্দ, অন্ত্যমিল বাদ রেখে কিভাবে ভাষা জেগে ওঠে ভাব প্রকাশের সময়ে? আমরা আগে দেখতাম গালিবের অনুপ্রাসের দিকে যে রকম ঝোঁক ছিল, অন্ত্যমিলকেও তিনি পছন্দ করতেন খুব। আনন্দের বিষয় হলো সেই ছন্দ বা অন্ত্যমিল এখনো আছে, কিন্তু অনেকটাই লুকিয়ে, প্রধান হয়ে উঠছে ভাষা ও শৈলী। রাজনীতি থাকছে, কিন্তু কবিতা তার জায়গায় পুরোটাই প্রাধান্য পাচ্ছে (উল্লেখ্য, ‘পুলিশ-পবন’)। এত বন্ধুত্ব থাকা সত্ত্বেও যে কথা বলতে পারি নি তাকে, অনঙ্গ রূপের দেশে থেকে যে গালিব লিখছেন, সেই গালিবই আমার বেশি প্রিয়। আর তিমিরে তারানা-য় এসে তিনি অনেকটা মীমাংসায় এসেছেন তার কবিতা নিয়ে। আমার আনন্দের কারণ এটাই।

.
৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮
মোহাম্মদপুর

উত্তরের হাওয়া এবং দৈনিক ‌যুগান্তরে প্রকাশিত

তারিক টুকু

জন্ম ২০ জানুয়ারি, ১৯৮২; চাঁদপুর। কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতক। ব্যবসায়ী।

প্রকাশিত বই :
বিস্মৃতি ও বিষাদটিলা [কবিতা; সংবেদ, ২০১২]

ই-মেইল : tariquetuku@gmail.com

Latest posts by তারিক টুকু (see all)