হোম গদ্য গল্প গাঙকলা ও জোয়ারের সংহরণ

গাঙকলা ও জোয়ারের সংহরণ

গাঙকলা ও জোয়ারের সংহরণ
510
0

নদীর যে দিকটা কচুরির ঠেকে সবুজ-বেগুনি হয়ে আছে, জলিলের নেশা ওই দিকেই। অথচ খলিল কিনা পারতপক্ষে দামের জঙ্গলে ঢুকতে চায় না। দামের-জঙ্গলে নাও একবার ঢুকে পড়লে তাকে নানান ব্যারাচ্যারা পোহাতে হয়। তুমি যতই জল কেটে, পানা তুলে পথ করো না কেন—ভুলভুলাইয়ার ভিতর তোমাকে পড়তেই হবে। সামান্য ফাঁক পেয়ে নাওয়ের গলুই ঢুকিয়ে দিলেই নিস্তার তেমন মিলবে না। চক্ষের পলকেই কিনা ওই শূন্যস্থান সবুজপাতা আর বেগুনিরঙা ফুলে পূর্ণ হয়ে উঠবে। তখন তিনগুণ পরিশ্রম করলেও জলপথ বের করা মুশকিল। বৈঠার বাড়ি মেরে দুই পার্শ্বের দামের কতটাই-বা সরানো যায়? সরানো গেলেও মুহূর্তে তা পূর্বরূপ ধারণ করে। খলিল এতে প্রচণ্ড বিরক্ত ও ক্লান্তি বোধ করে। কিন্তু জলিলের খেয়াল ওই দামের-জঙ্গল। নদীর জল আড়াল করে রাখা কচুরিপানা। বলা চলে, জলিলের ঘ্যানঘ্যানানির ঠেলায়ই খলিলকে দামরাজ্যে ঢুকতে হয়। জলিলের জন্যই তাকে পথ-বেপথের কহুকে পড়তে হয়। হালকা-বেগুনির ওপর গাঢ়-বেগুনি-রঙা ছোপ। আর তার উপর হলদে রঙের ফুটকি তোলা—এই জলপুষ্পের প্রতি জলিলের দুর্নিবার আকর্ষণ। খলিলেরও যে এই পুষ্পের প্রতি একেবারে আকর্ষণ নাই, এমন নয়। তবে জলিলের মতো ‘টাগইয়ের ফুল তুলুম। ফুল তুলুম। লও যাই’ করে সে মাকে সারাক্ষণ জ্বালাতন করে নাই। খলিলের ধারণা মা রসুমতির আহ্লাদের ঠেলায় জলিল এইরূপ গোঁয়ার-গোবিন্দ হয়ে উঠছে। ছাওয়াল-পিয়াল যা চাইবে তাই কি দিতে হবে নাকি? কানপট্টি বরাবর বিরাশি ওজনের থাপ্পড় কষালে কোথায় হাওয়া হয়ে যাবে এই গোঁয়ার-গোবিন্দগিরি। এই ঘ্যানঘ্যানানিও তখন নিস্তব্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু জলিলের মুখের দিকে তাকালে খলিল ওই বিরাশি ওজনের থাপ্পড় কষাতে পারে না। এগার-বারো বছরের এক দুরন্ত বালক—যার মুখের দিকে তাকালেই বুকের কোথায় যেন মায়া জমে ওঠে। জলিলের চেহারা তেমন ঢকের সেইটাও বলা যায় না। কালোকিষ্টি গায়ের রং। ওই কালোর চাইতেও কালোতর তার চোখের মণি। সজারুর কাঁটার মতো খাড়াখাড়া চুল। অনেকটা আলকাতরা সদৃশ। কালো-রূপে-ঝলকানো থ্যাবড়া চেহারা জলিলের। যেন একটা সিকি রেললাইনের ওপর ফেলে কেউ ততোধিক চ্যাপ্টা করে ফেলেছে। পুরুষ্ট ঠোঁট। হাসলে শাদা দাঁতের দ্যুতি কালো চেহারাকে উজ্জ্বল করে তোলে। ওই থ্যাবড়ানো চেহারার ওপর উপরওয়ালা যেন কিঞ্চিত বাড়তি মায়া ঢেলে দিয়েছেন। ফলে কালো রঙ নিষ্প্রভ করে দিয়ে ওই মায়াটাই জেগে থাকে।


রসুমতি নামটা উচ্চারণ করা মাত্রই খলিলের কানে বেজে চলল—‘শনতারা, শনতারা, শনতারা।’


ছোটভাই বলে জলিলের প্রতি খলিলের স্নেহ সর্বদা উপচানোই। কিন্তু খলিলের কেন জানি মনে হয়—জলিল যদি তার সহোদর না হতো, যদি জলিল রসুমতির পেটে না-জন্মে অন্য কারো পেটে জন্মাত—তবুও খলিলের স্নেহ তার প্রতি উপচে উঠত। তা সে ধপধপা শাদা দাঁতের দ্যুতির জন্যই হোক কিংবা থ্যাবড়ানো চেহারার জন্যই হোক।

জলিলের ঘ্যানঘ্যানে আবদারের জন্যই খলিলকে তুরাগের নিত্যই নাও ভাসাতে হয়। নিত্যই ঢেউ পাড়ি দিয়ে দাম-ভাসা-সীমানায় ঢুকে পড়তে হয়। শুধু কি ওই কচুরির দঙ্গল? তুরাগের নিজের দেহলতাতেও ভুলভুলাইয়া কম কিছু নাই। যে-কোনো আনকোরা মাঝি এর সত্যতা স্বীকার করে নেবে। নবীন কোনো মাঝি তুরাগের লেজ-মাথা-পাছার উদ্দিশ করতে পারবে বলে খলিলের বিশ্বাস হয় না। উইন্যার সময় তাও কিছুটা হলেও ওই মায়াজালে ছিন্ন করার সুযোগ থাকে। বাদলার মরশুম এলে তুরাগের রহস্য যেন পাতালপুরীর কোনো কৌটোর ভিতর লুকানো থাকে। যা উদ্ধার করা কোনো মাঝির পক্ষেই সম্ভবপর হয়ে ওঠে না।

শুধুমাত্র ফুলের জন্যই জলিল দামরাজ্যে ঢুকতে চায় এমন নয়। এন্তার ফুল সে তোলে। ফুলের সঙ্গে-সঙ্গে কিছু টাগইয়ের থোপাও সে নাওয়ে টেনে তোলে। ভাগ্য প্রসন্ন হলে, ওই থোপা থেকেই দুই-পাঁচটা কইমাছ পাওয়া যায়। থোপার নিচের চুলেরগুচ্ছে প্রায়ই কইমাছ লটকে থাকে। যেদিন দুইটা-তিনটা কইমাছ জলিল তুলতে পারে, সেদিন তার আনন্দের সীমানা পাঁচিল ভেঙে পড়ে। থ্যাবড়ানো চেহারায় কালোরং যেন জ্বলজ্বল করে জ্বলতে থাকে। কইমাছের পেট-পিঠের শক্তকাঁটা সে কৌশলে হাতের মুঠোয় বন্দি করে ফেলে। অতঃপর মাছটাকে জুঁইফলের মতো শুভ্র দাঁতের সারির সামনে ধরে বলে—‘আইজকা দাদায় আর আমি তুমারে ভাজাভাজা কইরা খামু।’

জলিলের এমত কাণ্ড দেখে খলিল জোর করে হাসি চেপে রাখে। আর মনে মনে ভাবে—ধুস, বেচারারে শরম দিয়ে কাম কী?

কইমাছ ভেজে খেতে পারলেই তার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়, এমন নয়। চিত্ত-হরণকারী বেগুনিপুষ্প আর পেটমোটা টাগই দিয়েও যদি কোনো সালুন রসুমতি রেঁধে দিত, জলিল তা গোগ্রাসে খেত।

রসুমতি ছেলের এইরকম ইচ্ছা শুনে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়েছে। খলিলের বাপকে ডেকে কৌতূকপূর্ণ স্বরে বলেছে—‘তুমার ছোডু-ছাওয়াল টাগইয়ের সালুন খাইবার চায়’।

রসুমতির কথা শুনে খলিলের বাপও উচ্চ স্বরে হেসে উঠেছে। জলিলের সজারুর মতো খাড়া আর কুচকুচে কালো চুলে হাত বুলিয়ে বলেছে—‘পাগলা মানিক আমার।’

খলিল জন্মানোর বছর আষ্টেক কি নয়েক পর জলিলের জন্ম। এর পূর্বে রসুমতির আরও তিনটা ছাওয়াল আঁতুড়েই মৃত হয়েছিল। ফলে বাপজানও এই ‘পাগলা মানিক’কেই বেশিই আশকারা দেয়। তখন খলিলের তেমন বুঝের বয়স না-হলেও তিন ভাইয়ের মরণ সে বুঝেছে। রসুমতি আর বাপজানের বিলাপ খলিলের কানে এখনও বেজে ওঠে। মায়ের আছাড়ি-পিছাড়ি করে কান্না। আর বাপজানের কোলে শাদা কাফনে মোড়া শিশুদের লাশ। ওইসব বেদনা উদ্রেককারী দৃশ্য খলিল কিছুতেই ভুলতে পারে না।

জলিল জন্মানোর পর-পরই খলিলের কোলে-পিঠে-কাঁধে। খলিল যদি কায়া হয় তবে জলিল তার ছায়া। সর্বদাই জলিল ছায়ার মতো অনুসরণ করে খলিলকে। ‘দাদা’ বলতে সে অজ্ঞান। জলিলকে ফাঁকি দিয়ে খলিলের কোথাও যাওয়ার উপায় নাই। অবস্থা এতটাই বেগতিক ছিল যে, খলিলের মাদ্রাসাতে জলিলকে সঙ্গে নিতে হতো। অথচ জলিলের তখন একবারেই পড়া শেখার বয়স হয় নাই।

খলিল ভাইকে পাশে বসিয়ে রেখেই তিন-চার ক্লাস পর্যন্ত পড়েছিল। পরবর্তীতেও একই বিড়ম্বনা। খলিল মাদ্রাসায় পাঠ চুকিয়ে দিলে জলিলকে আর পড়াশোনার জন্য পাঠানো যায় নাই।

নৌকা বোঝাই করে কচুরিপানার ফুল তুলে এনে জলিল দাদাকেই দেয়। দাদার খাটের চারপাশে ফুলগুলো ছড়িয়ে রাখে। কখনো-বা বিছানার চাদরের উপর স্তূপ করে রাখে। জলিলের ওইসব কাণ্ড দেখে খলিল রাগারাগিও কম করে না। কোনোদিন গায়ে হাতও তোলে।

‘ওই জলিল, টাগইয়ের ফুল থুইছস ক্যান বিছনার ওপর? হুদাহুদি বিছ্না তল কইরা থুইছস।’

খলির রেগেমেগে সব ফুল ঘরের বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। থেতলে যাওয়া ফুলরাশি জলিল ফের কুড়িয়ে আনে। ঘরের টিনের বেড়ায় ফাঁকফোকরে গুঁজে রাখে। খলিলের তখন হাসি পেয়ে যায়। কিন্তু ছোটভাইয়ের সম্মুখে সে হাসে না! কারণ জলিল এতে লাই পেয়ে যেতে পারে।

রসুমতি জলিলকে মেরেকেটে দেখেছে—ফুল এনে ঘর জঙ্গল বানিয়ে রাখা বন্ধ করতে পারে নাই। এখন হাল ছেড়ে দিয়েছে। রসুমতি তবুও জলিলকে নানাভাবে এখনও বুঝাতে চেষ্টা করে। বলে—‘বাজান—আমারে কওছে ফুলগুলা আইন্যা কেন বাড়িঘর নষ্ট করছস?’

‘মাগো দাদার নিগ্যা আনি।’

‘ওই ছাতুমাতু টাগইয়ের ফুল? আর কিছু আনবার পার না দাদার নাইগ্যা?’

রসুমতির পরোক্ষ কটাক্ষে জলিল লজ্জা পেয়ে নিম্নস্বরে বলেছে—‘আইচ্ছা যাও, আর আনমু না।’ সত্য-সত্যই এর কয়দিন বাদেই জলিল কচুরির দঙ্গলে যাওয়া কমিয়ে দিল। কিন্তু নতুন এক অভ্যাস তাকে গ্রাস করল—গাঙকলা তোলা।

জলের ভিতর মাথা-ডুবু-ডুবু-গাঙকলা।

লম্বা-সরু-ডাঁটার ওপর হরিতকী সদৃশ ফল। নরম আর বিজলা। ওই ফল খেলে নোনতা আর আঠালো স্বাদে মুখ পূর্ণ হয়ে ওঠে।

০২.
খলিলের তাগড়া শরীরের দিকে তাকিয়ে রসুমতির চিন্তা বাড়ে। এক কুড়ি চারমাস বয়স হয়েছে ছেলের। এই বয়সে বিয়া-শাদি না দিলে পুরুষ মানুষের মগজ বিগড়ে যেতে পারে। খলিলের বাপজানেরও একই কথা। বিয়া-শাদি তাগড়া-জোয়ান বয়সেই দিতে হয়। নইলে পুরুষেরা মতিভ্রমতায় পতিত হয়। ফলে রসুমতি ঘটক লাগাল চারদিকে। ঘটকেরা জান-মান লাগিয়ে মাস কাবারেই বিয়ের পাত্রী জুটিয়ে ফেলল। বিরুলিয়ার আসলাম প্রামাণিকের মেয়ে—শনতারা। পাত্রীর গায়ের রং সামান্য চাপা। কিন্তু চোখমুখের ঢক মায়াকাড়া। খাড়া নাক আর মাথায় মেঘের মতো একঢাল চুল। দীর্ঘ বিনুনি পাছার নিচে সাপের লেজের মতো দোল খায়। ফলে চাপা-রঙা পাত্রীকেই রসুমতির বেজায় পছন্দ হয়ে গেল। খলিলের বাপজানেরও আপত্তি কিছু নাই। তবে খলিলের মতামত জানতে রসুমতি সময় নিল। একে, তাকে দিয়ে জিজ্ঞাসা করাল। ফাঁক বুঝে নিজেই একদিন ছেলের মুখোমুখি হলো। রসুমতির প্রশ্নের মুখে খলিল মাথা নিচু করে রইল। খলিলকে ওইরকম থাকতে দেখে জলিলও মাথা নিচু করল। জলিলের অবস্থা দেখে রসুমতি হেসে বলল—‘বাজান, বিয়া তো তুমার না, বিয়া অইব তুমার দাদার।’

মায়ের কথা শুনে জলিল চমকে তাকাল। আর তার কানে অবিরাম বেজে চলল—‘দাদার বিয়া, দাদার বিয়া।’

লজ্জায় বেগুনি হয়ে যাওয়া খলিলের মুখের দিকে তাকিয়ে রসুমতি বলল—‘আপত্তি থাকলে এখুনি কইয়া ফেলাও বাজান। তয় শনতারারে কিন্তুক আমাগো পছন্দ হইছে।’

রসুমতি নামটা উচ্চারণ করা মাত্রই খলিলের কানে বেজে চলল—‘শনতারা, শনতারা, শনতারা।’

দাদার বিয়া হবে—ভাবতে ভাবতেই জলিলের থ্যাবড়ানো নাকের ওপর বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠল। দাদার বিয়া মানেই তো ফুর্তি। আনন্দ। হলদি, মেন্দি আর রঙখেলা। আর বয়সী নারীদের গীত। জলিল দুই-একটা বিয়েতে অমন দেখছে। হলদি, মেন্দিতে তুরাগের জল ঘোলা হয়ে উঠেছে। ঘোলাজলের ওপর কিছু বাড়তি রং ছলকে পড়ে তুরাগকে বর্ণিল করে তুলেছে।


তুরাগনদী সমুদ্দুরের মতো উত্তাল হয়ে আছে—খলিল কোথায় খুঁজবে শনতারাকে? তার মনের ভেতর ঝড় বয়ে যায়, কাইজ্যা-ফ্যাসাদ কিছু হইল না—বউডা তাইলে কই গেল?


রসুমতি বেশ ঘটা করেই শনতারাকে ঘরে তুলে আনল। ছেলের বউকে সে সখ করে কিনে দিল নাকের বেসর, পায়ের খাড়ুআর একছড়া কোমরের বিছা। শনতারাকে পলাশ-রঙা-শাড়ি পরিয়ে বিরুলিয়া থেকে নাওয়ে তুলল। কমলা রঙের ঔজ্জ্বল্যে শনতারার মাজারং ঢাকা পড়ে গেল।

শনতারাও বাপের বাড়ি থেকে কম বেভার আনল না। অর্থাৎ আসলাম প্রামাণিক মেয়েকে নানান কিছুই উপঢৌকন দিল। প্রামাণিক মেয়েকে দিল তোষক, ফুলছাপ-দেয়া লেপ, ময়ূর আঁকা তোরঙ্গ। তাঁতের গোটা পাঁচেক শাড়ি। জামাইকে দিল হাতঘড়ি আর সাইকেল।

বউ তুলে বাড়ি আনার পর-পরই শুরু হলো বিপত্তি। খলিল বাসরঘরে খিল দেয়া মাত্রই জলিল ঝাঁপিয়ে পড়ল। দরজায় দড়াম-দড়াম শব্দে লাথি মারল সে। যেন তক্ষুণি দরজা ভেঙে ফেলবে।

খলিল দরজা খুলে দিল। জলিলকে দাঁড়ানো দেখে খানিক অবাক হলো। খলিল কিছু বলার পূর্বেই রসুমতি এসে জলিলের ঘাড় ধরল। জলিল হাত-পা ছুঁড়ল, কিন্তু রসুমতির শক্তির সঙ্গে পেরে উঠল না। রসুমতি তার ঘাড় ধরে অন্য ঘরে নিয়ে এল। জলিল ওই রাতে তেমন কোনো উৎপাত করল না। পরদিন খলিলের সাথে যাওয়ার জন্যও পীড়াপীড়ি করল না। খলিল মনে খটকা নিয়েই কাজে গেল। বিকেলে কাজ থেকে ফিরে দেখল তার দেয়া সাইকেল চূর্ণবিচূণ হয়ে উঠানে শুয়ে আছে। খলিল প্রচণ্ড রেগে জলিলকে ডাকতে লাগল। কিন্তু জলিলের কোনো সাড়া-শব্দ নাই। সারাবাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজেও সে জলিলের দেখা পেল না।

পরদিন সকাল-সকাল বেরুবে বলে খলিল ঘাটে এল। নাও ঠেলে পানিতে ভাসিয়ে বৈঠা হাতে নিল। বেশ কয়েক গজ এগিয়েই ফের পিছিয়ে গেল। তুরাগের ঘোলা জলের ওপর উজ্জ্বল রঙের কিছু একটা ভাসতে দেখল। দ্রুত বৈঠা টেনে কাছে পৌঁছাতেই খলিল একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেল। শনতারাকে বাপের বাড়ি থেকে বেভার পাওয়া ফুল-ফুল-লেপটা ঢেউয়ের তালে ভেসে চলেছে। এটা যে জলিলের কাণ্ড তা না-বুঝার মতো আহাম্মক খলিল নয়। প্রচণ্ড রাগে তার মাথায় চুলগুলো পর্যন্ত খাঁড়া হয়ে গেল। বৈঠা ফেলেই ছুটল বাড়ির দিকে। জলিলকে সে আজ আচ্ছামত ধোলাই দেবে। সাত আসমানে গলা চড়িয়ে সে ডাকতে লাগল— ‘জলিল—জলিল—জলিল্যা।’

জলিলকে কোথাও দেখা গেল না। রসুমতি আর বাপজান হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এল। এমনকি নতুন বউ শনতারাও। খলিল সবাইকে ঘটনা খুলে বলল। সব শুনে রসুমতি মনে মনে কঠিন প্রতিজ্ঞা করল—‘হারামজাদা আইজকা বাড়িত ঢুইক্যা নেউক, পিডাইয়া চামড়া উডাইয়া ফেলামু।’

ওইদিন রাতে জলিল বাড়ি ফিরল না। এমনকি তার পরদিনও না। এইবার সকলেই উদ্বিগ্ন হলো। কারণ জলিল কাউকে না-বলে এইভাবে বাড়ির বাইরে রাত কাটায় নাই। কই গেল ছাওয়ালডা?

ঠিক চারদিন পর জলিল ফিরে এল। রসুমতি ছেলের থ্যাবড়া চেহারার দিকে তাকিয়ে যেন চমকে উঠল।

‘ওরে আল্লারে—এই পোলাডাও দেহি সেয়ান হইয়া উঠছে।’

জলিলের বড়-হতে-থাকা শরীরের দিকে তাকিয়ে রসুমতির গলায় কোনো স্বর ফুটতে চাইল না।যত্ন করে বাসনে ভাত বেড়ে দিয়ে ফিকে ছেলেকে ডাক দিল—‘বাজান, আহো! দুগা খাইয়া লও আগে।’

০৩.
আষাঢ়ের ঝাঁপানো-বৃষ্টি নামার পূর্বেই তুরাগ নদীতে এইবার জোয়ার এল। জলরাশি প্রচণ্ড বেগে ফুলে উঠল। আর বড়-বড়-ঢেউ উঠল। ঢেউ তো নয় যেন আজদাহা সাপের ফণা। ফণা তুলে ঢেউয়েরা দুরন্ত বেগে ছুটে এল পারে। আর ডাঙায় বিষ ঢেলে ফের ছুটে গেল মধ্যনদীতে। ততক্ষণে দ্ইু-চারটা মাটির-চাঙর জলের সঙ্গে মিশে গেছে। ওই আজদাহা-সাপ পারের মাটি ধ্বসিয়ে দিয়ে ফিরে গেছে।

নৌকা ভাসালে খলিলের বুক অকারণেই ঢিপঢিপ করে। কিন্তু সে বুঝতে পারে না কেন তার এইরকম ভয় করে। অতিচেনা এক নদী—খলিলের কাছে কেন যেন ক্রমে অচেনা হয়ে উঠছে। অথচ জন্মের পর থেকেই এ নদীতে সে সাঁতার কেটেছে। মাছ ধরেছে, নাও বেয়েছে—কিন্তু এইবারের মতো ঢেউ সে ইতঃপূর্বে দেখে নাই। তুরাগ যেন হঠাৎ সমুদ্দুর হয়ে উঠেছে। তেমনই তার রোষ আর আদিগন্ত জলের চাদর বিছানো। এই নদীর কোথাও যেন কুল নাই, কিনার না। বিশাল বিশাল জলঘূর্ণি পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে সমুদ্দুরের গহিনে পৌঁছে গেছে। ওই জলঘূর্ণির দিকে তাকিয়ে খলিল বারংবার শিউরে ওঠে। সাঁতারপটু হওয়া সত্ত্বেও তার অন্তরাত্মা কেন যেন কেঁপে ওঠে।

জলিলের কচুরির ঠেকে যাওয়ার নেশায় ইতি ঘটেছে। আজকাল সে চুপচাপ বাড়িতেই বসে থাকে। রসুমতি খেতে ডাকলে চুপচাপ খেয়ে নেয়।

নতুন বউ শনতারার সঙ্গে কদাচিৎ দুই-একটা কথা বলে। শনতারা এখনও শ্বশুরবাড়ির আওভাও বুঝে উঠতে পারে নাই। তবে খলিলের সঙ্গে তার ভাব হয়েছে। অবশ্য খলিলের সঙ্গে ভাব করতে তার ভালোও লাগে। খলিলের অবর্তমানে জলিলের সঙ্গেও সে ভাব করার চেষ্টা চালায়। কিন্তু জলিলের উদাসীনতা দেখে শনতারার ভাব-করার-ইচ্ছা মরে যায়। শনতারা সুযোগ পেলেই জলিলকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। থ্যাবড়ানো চেহারার উপর শক্ত রেখার আঁচড় পড়েছে। ফলে জলিলকে সঠিক বয়সের চাইতে বয়সী দেখায়। ইদানীং সে আর কচুরির ফুল তোলে না। দামের বদলে গাঙকলা তোলে। গোসলের সময় জলের নিচে ভাসমান গাঙকলা শেকড়-বাকড়সহ উপড়িয়ে আনে। ভেজা-লুঙ্গি পরে নদীর পারে কয়েক ঘণ্টা বসে থাকে। আর গাঙকলার নোনতা স্বাদে মুখ ভরিয়ে ফেলে। জলিলের সঙ্গে শনতারাও এই গাঙকলা খায়। ছোটবেলার ভুলে যাওয়া স্মৃতি ফের সে ফেরত পেয়েছে। জলজ-জংলা-ফল খেতে পেরে শনতারা খুশি হয়ে ওঠে। জলিল নিত্যই কিছু গাঙকলা শনতারার কোচরে তুলে দেয়। সবুজ-নরম ফলটি শনতারার ঝকঝকে দাঁতের নিচে পড়লে চমৎকার দৃশ্যের অবতারণা হয়। রসুমতি সুবজ শাড়ি-পরা শ্যামলা বউয়ের লাবণ্য মুগ্ধ দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকে।

গাঙকলা খাওয়ার জন্যই হোক কিংবা ঢেউয়ের নাচন দেখার স্পৃহাতে হোক—নদীর ঘাটে বসে থাকা শনতারার অভ্যাসের অংশ হয়ে দাঁড়াল।

গোসল সেরে সে কিছুক্ষণের জন্য হলেও তীর ঘেঁষে বসে থাকে। বসে বসে নদীতে ঢেউয়ের ভাঙাগড়া দেখে। জল কিভাবে ফুলে উঠে ঢেউ হয়। ঢেউ কিভাবে ভেঙে পড়ে। ফের ঢেউ ওঠে। আর ছুটে যায় কোন অদৃশ্যে—কে জানে! ওইভাবে শনতারাও একদিন অদৃশ্য হয়ে গেল। তুরাগের ঘাটে গোসল করতে গিয়ে আর বাড়ি ফিরে এল না।

কই গেল শনতারা?

রসুমতি বাড়ি-বাড়ি খুঁজল—কিন্তু দেখা পেল না। খলিলও জল-তোলপাড় করে খুঁজল—কিন্তু শনতারার চিহ্ন কোথাও নাই। কাউকে কিছুই না-বলে কোথায় নিরুদ্দেশ হলো শনতারা। মেয়ের অন্তর্ধান সংবাদ শুনে আসলাম প্রামাণিক কাঁদতে কাঁদতে এল। কিন্তু শনতারার হদিস মিলল না। বিরুলিয়া ফিরে যাওয়ার প্রাক্কালে রসুমতিকে শাসিয়ে গেল প্রামাণিক।

‘সাতদিনের ভিতর মাইয়া না পাইলে সব কয়টারে জেলে পাঠামু।’

প্রামাণিকের শাসানি শুনে খলিল কাঁদতে শুরু করল। তার কান্না যেন আর থামতেই চায় না। রসুমতি ছেলের অবস্থা দেখে বেকায়দায়। খলিল এতদিন পর কাঁদছে কেন? খলিলের কান্নার জন্যই যেন রসুমতির ঘর-দোরে শোক ঝাঁপিয়ে পড়ল। এতদিনে বুঝা গেল—নতুন বউটা নিখোঁজ হয়েছে।

তুরাগনদী সমুদ্দুরের মতো উত্তাল হয়ে আছে—খলিল কোথায় খুঁজবে শনতারাকে? তার মনের ভেতর ঝড় বয়ে যায়, কাইজ্যা-ফ্যাসাদ কিছু হইল না—বউডা তাইলে কই গেল? কয়েক মাসের দাম্পত্য—শনতারার মধুর ব্যবহার সেখানে পলিমাটির মতো বিছিয়ে আছে—খলিল কিছুতেই তা বিস্মৃত হতে পারে না। কতই না খায়-খাতির ছিল দুইজনের। যেন-বা জোড় বাধা শালিক পাখি। সেই শনতারার নিখোঁজ—খলিলকে একেবারে জীবস্মৃত করে গেছে। রসুমতি ছেলের মুখের দিকে তাকাতে পারে না। খলিলের সঙ্গে সেও বিলাপ করে কাঁদে—‘আমার ছাওয়ালডার এমুন দশা কইরে তুই কই গেছিস মরারশুকি?’


কোনোমতে খলিল একটি শব্দ উচ্চারণ করে। হয়তো তখন তার চোখের সম্মুখে শনতারার শ্যামলা অথচ কোমল মুখ ভেসে ওঠে।


বিলাপ করতে করতেই রসুমতি ঘর-সংসার ছাড়া হয়ে গেল। কোনো কাজেই সে মন বসাতে পারল না। শনতারা বউ হয়ে আসার পর মেয়ে-না-থাকার দুঃখ ঘুচেছিল। কিন্তু এক্ষণে রসুমতি যেন দ্বিগুণ দুঃখী হয়ে উঠল। রসুমতিও ভেবে পায় না—এক কাপড়ে কই গেল মেয়েটা? তুরাগ কি তারে ভাসাইয়া নিয়া গেল?

ভাসাইয়া কি ওই দূর সমুদ্দুরে নিয়া ফেলল?

সংসারে আর আগের শ্রী নাই। চারপাশের সবকিছুই যেন নিষ্প্রাণ হয়ে গেছে। তবুও জীবন ধারণ করতে হয়। রসুমতি রান্না করে। খায়। গোসল-আছল সারে। খলিলকে সাধ্য-সাধনা করে খাওয়ায়। খলিলের চোখের তলায় ঘন হয়ে কালি জমেছে। গালে-চিবুকে ঘাসের মতো খোঁচা-খোঁচা দাড়ি।

আনমনা হয়েই সে ভাত-পানি খায়। একদিন রাতের ভাত খেতে-খেতে চমকে ওঠে। রসুমতি তার পাতে একটা কই মাছ ভাজা তুলে দিয়েছে। মরিচ-হলুদে কড়কড়ে ভাজা হয়ে আছে মাছটা। খলিল যেন বহু দূর থেকে কথা কয়—‘মা, কইমাছ আইলো কইথন?’

‘অ-ভাজামাছ? জলিলে নাও নিয়া গেছিল। তুইল্যা আনছে মনে লয়।’

‘অ।’

কোনোমতে খলিল একটি শব্দ উচ্চারণ করে। হয়তো তখন তার চোখের সম্মুখে শনতারার শ্যামলা অথচ কোমল মুখ ভেসে ওঠে। খলিল ফের উদাসীন। ফেলিয়ে-ছড়িয়ে ভাত খায়। কই মাছ পাতের কোণে পড়ে থাকে। একাকী। মৃত। নিজের ঘরে দোর দিয়ে ঘুমুবার উদ্যোগ করে সে। কিন্তু খাটের দিকে এগোতেই ফের চমকে ওঠে। স্বল্পালোকেও সে চিনতে পারে—হালকা-ঘন বেগুনি আর হলদে ফোঁটা। কচুরিপানার ফুলের স্তূপ বিছানার চাদর প্রায় আড়াল করে ফেলেছে। ওই বেগুনি-হলদে কোমলতার উপর খলিলের দৃষ্টি ঘুরপাক খেতে থাকে।

papree.rahman@gmail.com'

পাপড়ি রহমান

জন্ম ১৯৬৫, ঢাকা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর।
লেখক, সম্পাদক, গবেষক এবং অনুবাদক।

গল্পের বই:
লখিন্দরের অদৃষ্টযাত্রা (২০০০)
হলুদ মেয়ের সীমান্ত (২০০১)
অষ্টরম্ভা (২০০৭)
ধূলিচিত্রিত দৃশ্যাবলি (২০১০)
মৃদু মানুষের মোশন পিকচার (২০১২)
মামুলি জীবনের জলতরঙ্গ (২০১৪)
Lilies, Lanterns, Lullabies (২০১৪) Edited By Niaz Zaman
শহর কিংবা ঊনশহরের গল্প (২০১৬)

উপন্যাস:
পোড়া নদীর স্বপ্নপুরাণ (২০০৪)
মহুয়া পাখির পালক (২০০৪)
বয়ন (২০০৮)
পালাটিয়া (২০১১)

সম্পাদনা:
ধূলিচিত্র (সাহিত্যপত্রিকা)
বাংলাদেশের ছোটগল্প : নব্বইয়ের দশক
গাঁথাগল্প (যৌথ), লেখকের কথা (যৌথ)
অ্যালিস মানরোর নির্বাচিত গল্প (যৌথ)
Women Writing from Bengal (Joint)

গবেষণা : ভাষা শহীদ আবুল বরকত
আত্মজীবনী : মায়াপারাবার (২০১৬)

ই-মেইল : papree.rahman@gmail.com
papree.rahman@gmail.com'