হোম পুনর্মুদ্রণ গদ্য গল্পটির নাম নেই, যেমন মৃত্যুটিরও ছিল না

গল্পটির নাম নেই, যেমন মৃত্যুটিরও ছিল না

গল্পটির নাম নেই, যেমন মৃত্যুটিরও ছিল না
532
0

ফোসকা পড়া রাতের অগোছালো কোলে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছে স্মৃতি রহিত আবেগ। সেই কান্নার রেশ মুছিয়ে দেবার জন্য আদরের মিনতি আঙুলে নিয়ে নেমে এসেছিল কতিপয় নরম স্পর্শ। প্রস্তাবিত আলোর মিছিল পৃথিবীর কান্নারত মার্বেল চোখকে মেলে ধরেছিল সূর্য-নামক শক্তিবলয়ের আয়নায়। গ্রহণের অভিবাসনে ততক্ষণে ঝলসে গেছে জীবন-বাক্স এবং ঝোপঝাড়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সঙ্ঘবদ্ধ নীরবতা। কাঙ্ক্ষিত আয়ু-প্রবাহ থেকে বেঁচে থাকার মন্ত্র খসে পড়েছে কিছু সময় পূর্বেই। আবির্ভূত সকাল বর্তমানে শোক-মুখর। স্মৃতির পেয়ালা ভর্তি বিগত যাপনের চিত্রাবলী শোকান্ধ ফটোফ্রেমের মতো দাঁড়িয়ে আছে নিভৃতে। পনের ফিট বাই সাড়ে তের ফিট ঘর। ঘরটার দুই দিকের দেয়ালে বুক খোলা ভ্রান্ত জানালা হতাশ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে আক্রান্ত রোদের হাত ধরে। জানালার ঘাড়ে বসে থাকা সজনে গাছটাও নিথর। শোক-নিথর মানুষগুলোর বসে থাকার বিপরীতে গোমড়া মুখে দাঁড়িয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় কাঠের চৌকাঠ। সাত জন মানুষ—নারী-পুরুষ-কিশোর নির্বিশেষে। প্রত্যেকের মুখ মেঘ-ভর্তি আষাঢ়ের আকাশ। এরা প্রত্যেকেই সম্পর্কের সেলাইয়ে বাঁধা, শিশুরাও প্রতিনিধি, শিশুরা প্রস্তাবিত কষ্ট-সীমানার আওতামুক্ত। ঘরের মধ্যে আরও একজন আছেন। তিনি শুয়ে আছেন।


ঝনঝন করে ভেঙ্গে পড়ছে নীরবতার মোড়কে আড়াল হয়ে থাকা শোক।


পৃথিবীর এই অংশ আজ পাথরাবৃত। সকলের জন্য নয়। কারো কারো জন্য। এর মধ্যে একটি নাম ‘রাফীদ’। এই নামে অন্য কেউ থাকতে পারে। থাকলেও তাদের সম্পর্কে জানার ইচ্ছা রাফীদের নেই। সে শোকাহত সময়ের বুকে মাথা গুঁজে বসে ছিল আহত ঘরটার দক্ষিণ প্রান্তে, বসে ছিল হতোদ্যম হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় বাইশ বছর বয়সী হাতলবিহীন নিম কাঠের চেয়ারে হেলান দিয়ে, যে ইতোমধ্যে বয়সের ভারে বেঁকে গেছে। রাফীদের মাথাটা ঈষৎ হেলানো। হাত দুটি মাথার পেছনের দিকে। খেজুর পাতার পাটির মতো আঙুলগুলো একে অপরের ভেতর গুঁজে দেয়া। রাফীদের দৃষ্টি সীমানা উড্ডয়নবিদ্যা ভুলে যাওয়া দিগভ্রান্ত শালিকের মতো। শোকাক্রান্ত পৃথিবীর ভার রাফীদের মাথার উপর চাপিয়ে দিয়েছে অর্বাচীন বাস্তব। চাপিয়ে দিয়ে নিজেকে হালকা বোধ করছে এই মুহূর্তে। এক বিষণ্ন শূন্যতা উড়তে গিয়েও মুখ থুবড়ে পড়ে যাচ্ছে প্রায় বাতাসশূন্য এই ঘরটায়। কিছু দীর্ঘশ্বাস এর ওর গায়ে ধাক্কা খাচ্ছে। শুধু শ্বাস যাপনের এক ধরনের অস্বস্তিকর শব্দ ঘরের দেয়ালে দেয়ালে ধ্বনিত হচ্ছে।

কারো মুখে কোনো শব্দ নেই। যেন শব্দেরা বোবা মানুষের চেহারা চাপিয়ে নিয়েছে পোশাকের আড়ালে ঝিমুতে থাকা ধাতব শরীরে। মাঝে মাঝে মোবাইল ফোনের রিংটোন বাজছে। ঝনঝন করে ভেঙ্গে পড়ছে নীরবতার মোড়কে আড়াল হয়ে থাকা শোক। নিচু স্বরে কেউ কিছু বলছে। কোনো কোনো ফোন কল বাজতে বাজতে হাঁপিয়ে ওঠছে। কারো কারো চোখ বর্ষা পীড়িত আকাশ, যেন মায়ের হাতে মার খাওয়া অবাধ্য কিশোরের মিহি কান্না, যেন ঘর্ষণে বর্ষণে ঝরে চলেছে একাকী। কে কাকে সান্ত্বনা দেবে আজ? এ ঘরে আরও একজনের থাকার কথা ছিল। আরও একজন আছেন এ ঘরে? হ্যাঁ তিনি তো আছেন। ঐ যে ঘুমিয়ে আছেন তার নিজ বিছানায়। মা, মা? মা!

ঘরটিতে অনেকগুলো শোকার্ত বসে থাকা, অনেকগুলো নিথর দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের সঙ্গে একজন শুয়ে আছেন। সেই ঘরটির সঙ্গে সহোদরার মতো আরও দুটি ঘর। ঘর দুটি পরস্পরের হাতে হাত রেখে দাঁড়িয়ে। তারা পরস্পরের কাছে সদা উন্মুক্ত। পুরনো ঐতিহ্যে ঠাসা দুই পাল্লার কাঁঠাল কাঠের দরজা দিয়ে তারা এভাবেই নিজেদের সম্পর্ক বজায় রেখেছে প্রায় সুদীর্ঘ সাড়ে তিন যুগেরও বেশি সময় ব্যাপী। তাদের শরীরের পরতে পরতে লেগে আছে এই বাড়ির অতীত আনন্দ-বেদনা-কষ্ট-উচ্ছ্বাসের কথা। কাউকে কিছু না বলেই পাশের স্মৃতি-ক্লান্ত ঘরে উঠে গেল রাফীদ, এই ঘরেই পোঁতা আছে তার জন্ম নাড়ি। কেউ একজন এসেছেন এই ঘরে, খুব জরুরি কথা আছে তার সঙ্গে, কই, কেউ তো নেই। না, অবশ্যই আছেন, কিন্তু কোথায়? তাহলে পাশের ঘরে যিনি শুয়ে আছেন তিনি কে? মা, মা? মা!

রাফীদ হাতলবিহীন যে চেয়ারটায় বসেছিল সেটা আঁকড়ে দাঁড়িয়ে ছিল মিলা। যেন সে রাফীদের ভার কিছুটা হলেও হালকা করে দিতে চাচ্ছে। কেউ খেয়াল না করলেও সে ঠিকই খেয়াল করেছে রাফীদের উঠে যাবার মলিন দৃশ্য। স্বামীর পেছন পেছন বেড়াল পায়ে চলে এসেছে মিলাও। এই শোকান্ধ সময়ে রাফীদের চোখে জমে আছে কষ্টের বালিয়াড়ি। সেটাই স্বাভাবিক। বাড়িতে আত্মীয়স্বজনের ভিড় বেড়েই চলেছে, বেড়ে চলেছে বহুবিধ কান্নার আওয়াজ এবং শোক উদ্‌যাপনের নানান প্রথা। মোবাইলের এই যুগে খুব দ্রুত গতিতে ছড়ায় সংবাদ। খারাপ সংবাদ হলে তো কথাই নেই। কখনও কখনও আলোর গতিবেগকেও হার মানায় তা।

এই ঘরেই প্রায় আটত্রিশ বছর পূর্বে রাফীদ জন্মেছিল। মার খুব জ্বর করেছিল সেদিন। সে দিনটি নাকি খুব চঞ্চল ছিল, হলুদ আগুনের ফণা তুলে দিগ্বিদিক ছুটে যাচ্ছিল রোদ, হয়তো সূর্যটারও জ্বর করেছিল সেদিন। প্রসব যন্ত্রণায় প্রায় সাত ঘণ্টা কাতর ছিলেন মা, কিন্তু মা নাকি কোনো শব্দ করেন নি সেদিন। অবশ্য মাকে কোনোদিনই প্রকাশ্যে কাঁদতে দেখে নি কেউ। রাফীদকে এসব বলেছিলেন ছোট দাদি, সেই ছোট দাদি এখনও যিনি স্মৃতি পুঁজি করে শ্বাস-কাতরতায় ভুগছেন। রাফীদ নিঃশব্দে এসে দাঁড়াল একাকিত্বে ভোগা মরচে পড়া লোহার রডে নিজেকে আটকে রাখা জানালার শিক ধরে। আজও জানালার বিপরীতে আটত্রিশ বছর বয়সী আগুন-রোদ—তবে অস্থিরতা ঝিমিয়ে পড়েছে কিছুটা। পড়ন্ত সূর্যের কাছে রাফীদ নিজের চোখ দুটোকে গুঁজে দিলো, সঙ্গে জমা দিয়ে দিলো স্মৃতি-আচ্ছন্ন আবেগ। শোক-অশ্রু শুকিয়ে নিলো সকলের অগোচরে। সেদিনের সেই তরুণীর মা হবার স্মৃতি জাপটে এখনও লজ্জাকাতর হয়ে চোখ বুজে আছে এ ঘরের আসবাবপত্র। কেউ একজন ছিলেন এ ঘরে, খুব জরুরি কথা আছে তার সঙ্গে, কিন্তু কই, তিনি কি শুয়ে আছেন? তাহলে পাশের ঘরে কে? মা, মা? মা!


মা রাফীদকে শিখিয়েছেন কিভাবে জীবনের ভারি এবং জটিল কাজগুলো সমাধান করে সামনে এগিয়ে যেতে হয়।


শীতল মমতায় ভরা একটা শান্ত নরম স্পর্শ ছুঁয়ে দিলো রাফীদের বাম হাত, কোনো কথাবার্তা ছাড়া স্পর্শটা স্থির থাকল কিছু সময়। রাফীদ জানে স্পর্শটা কার।

—‘এই সময়ে তুমি এভাবে ভেঙে পড়লে চলবে?’ শোক এবং নীরবতার দলাটাকে জানালার বাইরে ছুঁড়ে মেরে কথা কয়েকটা উচ্চারণ করল মিলা।

—‘জানি কিন্তু?’

—‘কিন্তু? অনেক কাজ, বাকিরা ছোট।’

—‘হ্যাঁ’ অনেকটা আত্মসমর্পণের স্বরে স্বীকার করে নিলো রাফীদ।

অনেক কাজ, খুব ভারি কাজ। মা রাফীদকে শিখিয়েছেন কিভাবে জীবনের ভারি এবং জটিল কাজগুলো সমাধান করে সামনে এগিয়ে যেতে হয়। মা মানে হোসনে আরা খানম, যাকে লাকি নামে ডাকে এই পৃথিবী। যিনি জীবনের প্রতিটি শ্বাস টেনেছেন জেনে বুঝে, হিশেব করে, সুজনি কাঁথা সেলাইয়ের মতো করে। যিনি নিজে কান্না-বিদ্যা ভুলে গেছিলেন, যিনি অনেক অনেক মানুষকে কান্না ভুলে যেতে সাহায্য করেছিলেন। যিনি শিখিয়েছিলেন কিভাবে জীবনের আয়ুষ্কালকে টেনে নিয়ে যেতে হয় মহাকাল পর্যন্ত, যিনি অল্প আয়কে সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়েছিলেন কিভাবে সম্ভাব্য সচ্ছলতা আনা যায়, কিভাবে অল্পে ভালো থাকা যায়। যিনি নিজে খুব বেশি পড়াশোনা না জেনেও ছেলে-মেয়েদের সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত পড়াশোনা করিয়েছেন। যিনি খুব অল্প বয়সে স্বামীকে হারিয়েছেন, যিনি খুব অল্প বয়সে স্বামীকে হারিয়েও নিজেকে সামলেছেন, সামলেছেন সংসার। মা শিখিয়েছিলেন কিভাবে বিপদের সময় নিজেকে স্থির থেকে তাকে টপকে যাওয়া যায়। কিন্তু এবারের এই কাজ নিজের কাছে খুব ভারি এবং সমাধান অযোগ্য মনে হচ্ছে রাফীদের। মা’র সঙ্গে একটু আলাপ করে নিতে পারলে ভালো হতো। মা কোথায়? মা, মা? মা!

মিলা এবং রাফীদ বসেছিল পরস্পরের সঙ্গে কোনো কথাবার্তা ছাড়া। দু’জনের চোখ হতেই গ্রীষ্মের ক্ষীণ স্রোতা নদীর মতো কান্নার ঢেউ বয়ে চলছে নিভৃতে, কেউ কাউকে সান্ত্বনা দিচ্ছে না। কেউ কাউকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টাও করছে না। মিলা কিছু একটা বলতে যাবার আগেই শান্ত ঘরে ঢুকল, বলল, ‘ভাইয়া, ইমাম সাহেব এসেছেন।’

অশ্রু-ঢেউয়ে সাময়িক বাঁধ তুলে দু’হাতের ভারাক্রান্ত তালু দিয়ে ক্লান্ত-অবিশ্রান্ত চোখ দুটো মুছে রাফীদ পা বাড়াল বারান্দার দিকে, ইমাম সাহেবের সঙ্গে জরুরি আলাপ আছে তার। এই মুহূর্তে কারুরই গ্রামের বাড়িতে থাকার কথা ছিল না। গ্রামে আসার জন্য এটা মোক্ষম সময় নয়, বাচ্চাদের স্কুল, দুইজনের ছুটি, তবু আসতে হয়েছে। সবকিছু তো আর ইচ্ছার দখলে থাকে না—সময় তো নয়ই, সময়ের পানি কোন দিকে কখন গড়ায় সেটা কেউ জানে না, কখনও কখনও পরিকল্পনার হাত কিছুতেই ধরতে চায় না সময়-ঘড়ি, মাঝেমাঝে ঠিক উল্টা পথে হাঁটে সে।

কয়েকদিনের রুটিনবিহীন ছুটি নিয়ে রাফীদকেও আসতে হয়েছে তার পৈত্রিক ভিটাতে। মিলাও এসেছে। যদিও কলেজ থেকে ছাড়তে চায় নি ওকে, তবু আসতে হয়েছে। অন্য কারুর আসারও কথা ছিল না, রাফীদ আসছে শুনে পেছনে পেছনে বাবলা গাছের কষলা আঠার মতো চলে এসেছে ছোট বোন হাসি এবং তার সদ্য বিবাহিত জামাই। সানজিদার আসার কোনো কথা ছিলই না, সবাই আসছে শুনে সেও হুড়মুড় করে চলে এসেছে একদিন পরেই। সানজিদা মানে বড় আপা। আসার কথা ছিল না, কিন্তু আসতে হয়েছে, আসতে বাধ্য হয়েছে, আসতে হয়েছে হোসনে আরা খানমের জেদের কারণে। হোসনে আরা খানম, হ্যাঁ হোসনে আরা খানম, রাফীদের মা, রাফীদদের মা,  মায়ের এ ধরনের জেদ কোনো দিন দেখে নি রাফীদ। এই জন্যই কিছু না ভেবেই চলে এসেছে সে।


এক চোখে বর্তমান অন্য চোখে বিলীয়মান অতীত।


সাড়ে বাইশ কাঠা জায়গার ভেতরে উষ্কখুষ্ক বাড়িটা মৃতপ্রায় ধর্মশালার মতো অতীত স্মৃতির খিলানে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পুরো জায়গাটা আধপাকা ইটের দেয়াল দিয়ে ঘেরা। ইটগুলো একে অপরের বুকের ভেতর ঢুকে পরস্পরের প্রতি অগাধ বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং বিশ্বাসের একটা বলয় গড়ে তুলেছে নিজেদের ভেতর, অথচ কী অদ্ভুত, ইটগুলো গাঁথা আছে মাটি দিয়ে, আন্তরিকতা থাকলে আসলে সিমেন্ট-বালি কিছুই লাগে না। দক্ষিণপূর্ব দিকে কয়েকটা নিম গাছের ছায়ায় ভর দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটা, সরাসরি রাস্তার দিকে মুখ করে নয়, ঈষৎ বাঁকানো, হঠাৎ দেখলে যে কেউ মনে করতে পারে এর এক চোখে বর্তমান অন্য চোখে বিলীয়মান অতীত। সব মিলিয়ে চারটা ঘর, একটা রান্না ঘর, বৈঠকখানাও আছে একটা। ঘরগুলোর পাশাপাশি আরও একটি ছোট ঘর আছে, সেটি বিভিন্ন আকারের ছোট বড় কুঠি দিয়ে ভরা, কুঠি অর্থ গোলা যার সবগুলোই মাটি দিয়ে তৈরি। এগুলো ধান-চাল-গম রাখার জন্য ব্যবহৃত হতো একসময়—এখন খালি। এগুলো এখনও ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে থেকে গেছে। ছোট্ট আঙিনা, আঙিনা ইটের সোলিং দিয়ে মোড়ানো। আঙিনার দক্ষিণ প্রান্তে একটা ডালিম গাছ।

ডালিম গাছটি সময়ের সাক্ষী হয়ে ঘোষণা করছে নিজের অস্তিত্ব, আঙিনায় ডালিম গাছ কেন এই প্রশ্নটা মাকে জিজ্ঞেস করবে করবে করেও জিজ্ঞেস করার সময় হয় নি রাফীদের? এমন একটা গাছ নানি-বাড়ির আঙিনাতেও দেখেছিল রাফীদ। বাড়ির পেছনের দিকে যাবার জন্য একটা দরজা, দরজা সংলগ্ন একটা গোসলখানা সঙ্গে পায়খানা। বাড়িটিতে চিনের চালা যারা এ বাড়ির ইতিহাসের প্রতি আজ্ঞাবহ থেকে ঝুঁকে আছে আঙিনার দিকে। বাড়ির প্রধান দরজাটি কিছুদিন পূর্বে বানানো, তার ঠোঁটে অ-ব্যবহারের জং স্পষ্ট, দরজাটি বন্ধই থাকে, কেউ তো থাকে না এ বাড়িতে, মা তো থাকেন রাফীদের সঙ্গেই।

কী একটা কাজ মাথায় নিয়ে মা এসেছিলেন এখানে, কী মনে করে সবাইকে ডেকে পাঠিয়েছেন। বছরে এক বা বড় জোর দুইবার আসা হয়। ঈদ কিংবা বিশেষ কোনো আয়োজনে, বাবার মৃত্যুবার্ষিকীতে মাঝে মাঝে আসা হয়। ভিটে বাড়ির ঘেরা জায়গাটার উত্তর দিকে কয়েকজন অতীত মানুষের বিগত কালের ইতিহাস হয়ে শুয়ে আছে নিস্তব্ধ, নিস্তরঙ্গ। জীবনের আনাগোনা খুব কম ঐ অংশে। বাড়ি আসলে রাফীদ নিয়মিত যায় ঐ দিকটায়। যেন পূর্বপুরুষদের সঙ্গে না বলা আলাপ সেরে নিতে যায় ওখানটায়। একদম বাঁয়ের দিকটায় শুয়ে আছেন বাবা, বাবার পাশে তাঁর বাবা, মানে রাফীদের দাদু, তার পাশে দাদুর বাবা, কোনো নাম ফলক নেই, ছোট দাদি বলেছিল। হঠাৎ এই অংশের ব্যস্ততা বেড়ে গেছে আজ ভোর থেকে। সিদ্ধান্তটা রাফীদের। কয়েকজন মানুষ কোদাল নিয়ে কাজে নেমে পড়েছে, এই সময়টায় এতটা মনোযোগী হয়ে উঠে কিভাবে মানুষগুলো।

—‘এদিকে আয়’ ঘর থেকে রাফীদ বেরিয়ে যেতেই শান্তকে কাছে ডাকল মিলা।

—‘ভাবী’ বলেই একটা অস্ফুট কান্না মিশ্রিত শোক-ঢেউ মিলার চোখের দিকে ছুঁড়ে দিলো শান্ত। পুকুরের শান্ত জলে টুপ করে ঝরে পড়া মাটির ঢিলা যেভাবে ঢেউয়ের বলয় তৈরি করে ক্রমশ এগিয়ে যেতে থাকে পুকুর পাড়ের দিক, ঠিক তেমনই কান্নার দলাটাও ছড়িয়ে পড়ল ঘরের বাকি অংশে, কান্নার ঢেউ ধীরে ধীরে ছুঁয়ে দিলো ঘরের পুরনো আসবাবপত্র, দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা ক্যালেন্ডারের ছুটির তারিখে নিম কাঠের অতীত আলমারির হাতল, দুই পাল্লার আবছা গ্লাসে ঘেরা বুক শেলফে শুয়ে থাকা কিছু মানুষের ইতিহাস-ঋদ্ধ বইগুলোর স্পষ্ট-অস্পষ্ট অক্ষরের বুক-পিঠ-পেটকে।

—‘এমন সময়ে কাঁদতে নেই ভাই।’

—‘ভাবী, তুই তো জানিস……’


ব্যথা কি সারাতে পারে নতুন কোনো ব্যথাকে?


পূর্বনির্ধারিত চাপা কান্না তীব্র একটা কাঁপুনি হয়ে গড়িয়ে পড়ল শান্তর চোখে-মুখে-হৃদয়ে। শান্ত মিলার অনেক ছোট। মিলা এ বাড়ির বড় বউ। শান্ত মিলাকে তুই করেই বলে। হয়তো মিলার ভেতর সে খুঁজে পেয়েছে বন্ধু-সমর্থক। মিলাও খুব আদর করে এ বাড়ির প্রত্যেককে। সম্মান করে। ভালোবাসে প্রাণ খুলে। শাশুড়িকে তুমি বলেই ডাকে মিলা, ডাকে মা বলে। মিলা অনেক পেয়েছে এদের থেকে। মিলা এ বাড়িতে এসেই প্রথম দেখেছে মা কেমন হয়, এর আগে তো সে মা-কে দেখে নি কোনোদিন। আপন মা মারা গেছিল তার জন্মের সময়। এ বাড়িতে এসে তার পুনর্জন্ম হয়েছে, সে পেয়েছে মা, তাই সে কিছুতেই হারাতে চায় না মা-কে। কিন্তু মা-কে কি আজীবন বাঁচিয়ে রাখা যায়? মিলা’র জন্মের সময়, যে মা তাকে জন্ম দিয়েছিল সেই মাকেই তো বাঁচাতে পারে নি। মা, মা কোথায়?

এই ঘরে আরেক জনের থাকার কথা ছিল। কই এখানে তো তিনি নেই, তাহলে কোথায় তিনি? পাশের ঘরে? পাশের ঘরে যিনি শুয়ে আছেন তিনিই কি মা? কিন্তু মিলার মা তো মারা গেছেন তার জন্মের সময়ই, এই বাড়িতে বিয়ে হয়ে আসার পর সে নতুন মা পেয়েছে। মা কোথায়? মা! মিলার নিজের ভেতরেই কষ্টের তীব্রতা ছড়িয়ে পড়ছে। ক্যান্সার পেইন কি এ রকম? মনে হয় না। এই ব্যথা আরও জীবন সংহারক। রাফীদ হাসি-সানজিদা-শান্তর কথা ভাবতে গিয়েও হঠাৎ গলায় আটকে যাওয়া ভাতের লোকমার মতো অবস্থা হয় মিলার। আচ্ছা কষ্ট কি পেইন কিলারের মতো গিলে নেয়া যায়? মিলার ভাবনারা বাতাস পায় না, মুখ থুবড়ে পড়ে, গড়িয়ে গড়িয়ে মস্তিষ্কের কোষ থেকে নিচে নেমে আসতে থাকে, চোখ থেকে নেমে আসে মুখে, সেখান থেকে থুতনি পেরিয়ে তারা নেমে আসে গলায়, সেখানে কিছুক্ষণ আটকে থাকে, তারপর ধীরে ধীরে নেমে আসে বুকে। সেখান থেকে কিছুতেই আর নড়তে চায় না সে, চেপে ধরে শ্বাস-প্রশ্বাসকে, এই অবস্থা থেকে মুক্তির উপায় খুঁজে পাওয়া সত্যিই খুব কঠিন।

প্রায় মিনিট দশেক পরে আবার এই ঘরেই ফিরে এলো রাফীদ, অন্যমনস্ক, ইমাম সাহেবের সঙ্গে কথা বলে ফিরে এলো সে। ঘরে ঢোকার সময় দরজার চৌকাঠের সঙ্গে তার ভারি মাথাটা ধাক্কা খেলো, খুব ব্যথা পেয়েছে নিশ্চয়, অন্য সময় হলে হয়তো ছুটে যেত মিলা, হয়তো ব্যথা নাশক কোনো ওষুধ নিয়ে দৌড়ে যেত। আজ কিছু বলল না মিলা। আজ রাফীদ যে ব্যথা পেয়েছে তার তুলনায় এই ব্যথা কিছুই নয়। আজ যে ব্যথায় কাতরাচ্ছে সে-নিজেও এই ব্যথার ওষুধ মিলার নিজের কাছেও নেই, তার কী সাধ্য সে রাফীদকে সারিয়ে তুলবে। আজ যে ব্যথা পেয়েছে শান্ত তার তুলনায় এই ব্যথা কিছুই নয়, মিলার কী সাধ্য সে শান্তকে সারিয়ে তুলবে। আজ যে ব্যথা পেয়েছে হাসি তার তুলনায় এই ব্যথা কিছুই নয়, মিলার কী সাধ্য যে হাসিকে সারিয়ে তুলবে। আজ যে ব্যথা পেয়েছে বড় আপা তার তুলনায় এই ব্যথা কিছুই নয়, মিলার কী সাধ্য সে বড় আপা সানজিদার ব্যথা সারিয়ে তুলবে। মিলা ভাবতে থাকে, ব্যথা কি সারাতে পারে নতুন কোনো ব্যথাকে?

বারান্দায় তিনটা মাদুর পাতা হয়েছে। সেখানে উপুড় হয়ে বসে আছে ছয় সাত জন অল্প বয়সী ছেলে, পরস্পরের দিকে মুখ করে, একটা কুণ্ডলী পাকিয়েছে নিজেদের ভেতর। ছেলেগুলো এতিমখানা থেকে এসেছে। প্রত্যেকের বয়স দশ বছরের নিচে। এতিমখানাটি রাফীদের দাদু প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেটাকে আগলে রাখার দায়িত্ব নিয়েছিলেন বাবা। বাবা মারা যাবার পর প্রায় অবশ্যপালনীয় কর্তব্যের মতো সেটার দেখভাল করেন মা নিজেই। ছেলেগুলোর পরনে শাদা রঙের পাজামা পাঞ্জাবি। মনে হচ্ছে প্রত্যেকেই এইমাত্র বেহেশত থেকে নেমে আসা দূত। প্রত্যেকের সামনে একটা করে রেহেল, তাতে একটা করে কোরআন শরীফ রাখা। সবাই খুব মনোযোগ দিয়ে সুর তুলে কোরআন তেলাওয়াত করছে। তাদের কণ্ঠের সম্মিলিত আওয়াজ একটা অদ্ভুত ঘোর তৈরি করেছে, এই সুমধুর সুর যেন বর্তমান শোক স্তব্ধ সময়কে পাশ কাটিয়ে এক অন্যধারার দুনিয়ার দিকে সবাইকে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে।


বাড়িটার কান্না, ডালিম গাছটার কান্না এবং কোরআন তেলাওয়াতের সুর মিলিয়ে এক অদ্ভুত মূর্ছনা তৈরি হয়েছে পুরো বাড়ি জুড়ে।


পাশের বারান্দায় একটা মোড়া, মোড়ায় বসে ছোট দাদি বিলাপ করছেন, তাকে ঘিরে কান্নার একটা বৃত্ত তৈরি হয়েছে। আত্মীয়স্বজনদের ভিড়ে ভরে উঠছে আঙিনা। আঙিনার ডালিম গাছটাও কাঁদছে নীরবে। কাঁদছে বারান্দার টবে রাখা বিভিন্ন ফুল গাছগুলো, বিশেষ করে ক্যাকটাসগুলো। মাথার উপরের জাম গাছ, বাড়ি ঘিরে থাকা নারকেল ঝাড়, সকলে, সকলেই কাঁদছে আজ। গাছ পালাদের না হয় জীবন আছে, আছে কান্না শোক আনন্দ উল্লাস কিন্তু এই বাড়ির আসবাবপত্র, ডাইনিং টেবিলটা, চেয়ারগুলো, কাপড় শুকানোর জন্য ঝুলানো দড়িটা, দেয়ালে গেঁথে রাখা পেরেকগুলো, অনেক পুরনো হয়ে যাওয়া পর্দাগুলো, ঘরের দেয়ালের ছবিগুলো? এদের তো জীবন নেই কিন্তু এরাও তো কাঁদছে আজ। অল্প বয়সী ছেলেগুলো কোরআন তেলাওয়াত করছে, অল্প বয়সী ছেলেগুলো কোরআন তেলাওয়াত করছে আর কাঁদছে, অল্প বয়সী এতিম ছেলেগুলো কোরআন তেলাওয়াত করছে কাঁদছে আর ওদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করছে, অল্প বয়সী এতিম ছেলেগুলো কোরআন তেলাওয়াত করছে, কাঁদছে আর ওদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করছে আর ভাবছে আল্লাহ আছেন। ছোট দাদির কান্না, অল্প বয়সী ছেলেগুলোর কান্না, এই বাড়িটার কান্না, ডালিম গাছটার কান্না এবং কোরআন তেলাওয়াতের সুর মিলিয়ে এক অদ্ভুত মূর্ছনা তৈরি হয়েছে পুরো বাড়ি জুড়ে।

নিজেকে সামলে নেয়া শিখেছে মিলা, তাকে এসব শিখতে সাহায্য করেছে রাফীদও। রাফীদকে সাহায্য করেছেন মা। মা তাদের সকলকে শিখিয়েছেন কিভাবে বিপদের সময় শান্ত থাকা যায়, কিভাবে প্রতিকূল পরিবেশে নিজেকে টিকিয়ে রাখা যায়। কিন্তু রাফীদ নিজেই ভেঙে পড়েছে। সব সময় নিজের নিয়ন্ত্রণে সব কিছু থাকে না। পাশে রাখা মোড়ায় নিজেকে ছেড়ে দিল রাফীদ।

—‘জানাজার সময় কয়টায় ঠিক করলে?’ কান্না লুকিয়ে বলল মিলা।

—‘বাদ জোহর, আত্মীয়স্বজন সবাইকে তো জানানো হয়ে গেছে, সকলে চলেও এসেছেন প্রায়।’

মা এভাবে আমাদের ছেড়ে চলে যেতে পারলেন? আমাদের একা করে মা চলে যেতে পারলেন? মা কি জানেন না তিনি ছাড়া আমাদের আর কেউ নেই। আচ্ছা, মা কি কিছু আঁচ করতে পেরেছিলেন, বুঝতে বুঝতে পেরেছিলেন বলেই কি আমাদের সবাইকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন? এই তো কদিন আগেই মা গ্রামের বাড়িতে এলেন। মার অসুখ বলতে ব্লাডপ্রেসার, সেটাও নিয়ন্ত্রণে ছিল। রাফীদ তার কার্ডিওলজিস্ট বন্ধুর কাছে নিয়ে গিয়ে চেকআপে করিয়ে নিয়ে এসেছিল। কোনো সমস্যার কথাও বলেন নি মা। শেষের কয়েকদিন খুব আমোদে কাটিয়েছিলেন। কী হয়ে গেল হঠাৎ করে। রাফীদ নিজকে আর সামলে রাখতে পারে না, মিলাও না। এই সময়ে কি নিজেকে সামলানো যায়? রাফীদ কাঁদছে, কিন্তু সে যদি এভাবে ভেঙে পড়ে তাহলে ছোটদের সামলাবে কে? কিছুতেই রাফীদের হিশাব মিলছে না।

ধীর পায়ে পাশের ঘরে উঠে গেল রাফীদ, যেখানে মা শুয়ে আছেন, যেখানে মা শুয়ে ছিলেন গত রাতেও, যেখানে মা শুয়ে থেকেছেন তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে, কিন্তু এই শোয়া আর সেই শোয়া কি এক? মা নেই, এই চিরন্তন সত্যটাকে কিছুতেই মানতে পারছে না ওরা। গতরাতেও অনেক গল্প হলো, অনেক হাসি ঠাট্টা হলো, অনেক স্মৃতিচারণ হলো। তারপর যার যার ঘরে সবাই শুতে গেল। মা নিজেও শুয়ে পড়েছিলেন, এই ঘরটা মা-র নিজের। ঘুমাবার আগেও রাফীদ নিজেই মায়ের ব্লাডপ্রেসারের ওষুধ খাইয়ে দিয়েছিল। সকলে যার যার ঘরে চলে যাবার পরও রাফীদ অনেকক্ষণ শুয়ে ছিল মার পাশে। অনেক সময় ধরে নানির গল্প করলেন মা। তারপর রাফীদকে বললেন, ‘যা অনেক রাত হলো, এবার ঘুমাবো আমি।’

কিন্তু রাফীদ শুয়ে থাকল মার পাশেই। ঘুমিয়েই থাকল মা। ফজরের নামাজ পড়তে উঠে রাফীদকেও ডেকে তুলল, বলল, ‘যা তোর ঘরে গিয়ে ঘুমা, নামাজ পড়ে নিস বাবা।’

ভোরে অনেক ডাকাডাকির পরও উঠল না মা। কী হলো মার, এত গভীর ঘুমে কেন মা? মা কি অজ্ঞান হয়ে গেছে? হাসপাতালে নিতে হবে মাকে এক্ষুণি। মা উঠছে না কেন? অনেক ডাকাডাকি পরও উঠলেন না মা। ভয় পেয়ে রাফীদ চিৎকার করে মিলাকে ডাকল। তার আর্তচিৎকারে ততক্ষণে প্রায় সকলেই চলে এসেছে মার ঘরে। সবার চিৎকার আর কান্না শুনে ছোট দাদি এলেন মা ঘরে, পাশে গিয়ে মুখ ছুঁয়ে দিলেন মার, শান্ত স্বরে বললেন, ‘তোদের মা নেই।’ মা নেই মানে, কী বলছে ছোট দাদি, মা নেই মানে? ছোট দাদি আরও দৃঢ় স্বরে বললেন, ‘হোসনে আরা খানম আর নেই, সে তার মায়ের কাছে ফিরে গেছে।’ বলেই ছোট দাদি বেরিয়ে পড়লেন বারান্দার দিকে, হন হন করে বাড়ির পেছন দিকের দরজা খুলে হেঁটে চললেন যেখানে চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন বাবা, দাদা এবং দাদার বাবা। ছোট দাদি কি তাদেরকেও মা’র বেঁচে না থাকার খবরটা দিতে গেছেন। নির্মম ঘোষণাটা দেবার জন্যই কি ছোট দাদি এতদিন ধরে বেঁচে আছেন? মা কোনোদিন উঠবেন না, মা আর কোনোদিন বলবেন না নানির গল্প। মা তার নিজ বিছানাতেই শুয়ে ছিলেন, সেখানেই শুয়ে আছেন এখনও। কেউ কাউকে কিছুতেই মায়ের মুখটা ঢাকতে দিচ্ছে না ।


‘আমি মারা গেলে এই শাড়ি দিয়ে তোরা আমার কাফন বানাবি’—লেখা ছিল চিরকুটে।


ছোট দাদি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আবার মার ঘরে ঢুকলেন, মায়ের মুখটা ঢেকে দিলেন। ক্লান্ত ভঙ্গিমায় এগিয়ে গেলেন কাঠের আলমারিটার দিকে। আলমারিটা খুলে তৃতীয় তাকে গুছিয়ে রাখা মায়ের কাপড়গুলোর পেছনে হাত ঢুকালেন, ছোট একটা প্যাকেট বের করে আনলেন। সেটা রাফীদের হাতে দিয়ে বললেন, ‘তোর মা তোকে এটা দিতে বলেছিল।’ প্যাকেটটা দিয়েই আবার বেরিয়ে পড়লেন, হন হন করে বাড়ির পেছনের দিকের দরজা খুলে হেঁটে চললেন যেখানে চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন রাফীদের বাবা, দাদা এবং দাদার বাবা—যেখানে কয়েকজন মানুষ খুব মনোযোগ সহকারে খুঁড়ে চলেছে একটা কবর।

মা নেই, এর চেয়ে বড় সত্য, এর চেয়ে নির্মম সত্য আর একটিও নেই। কিন্তু কিসের প্যাকেট দিয়ে গেল ছোট দাদি? এই ঘরে পরিবারের অন্য সবাই ছিল। প্যাকেটটা হাতে নিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল রাফীদ, তার মাথায় কিছুই ঢুকছে না। কিসের প্যাকেট এটা? কী আছে এতে? ছোট দাদিকেই বা এটি কেন দিয়ে গেছিল মা? মাটি রঙা কাগজের কয়েকটি স্তর দিয়ে মোড়ানো প্যাকেটটা, সেটি আবার কালো সুতো দিয়ে কয়েকবার প্যাঁচানো। বোঝা যাচ্ছে অনেক, অনেকদিন আগেই করা হয়েছিল প্যাকেটটি, খুব যত্নসহকারে তৈরি করা। কিন্তু কী আছে এর মধ্যে? কী থাকতে পারে? মা, মা? মা!

আস্তে আস্তে সুতার বাঁধন খুলতে থাকল রাফীদ। কাগজের ভাঁজ খুলতে থাকল ধীরে ধীরে। ভেবে ভেবে কোনো উত্তর পাচ্ছে না সে। এমন কোনো কিছু তো নেই এই পরিবারে যা রাফীদ কিম্বা তার ভাই বোনদের কাছে অজানা। কিন্তু এই প্যাকেটটির ভেতর কী এমন আছে? আস্তে আস্তে সুতার বাঁধন খুলতে থাকল রাফীদ। কাগজের ভাঁজ খুলতে থাকল ধীরে ধীরে।

একটা কলা পাতা রঙের সুতি শাড়ি বেরিয়ে এলো প্যাকেটটির ভেতর থেকে, খুব পরিষ্কার পরিছন্ন, যত্ন করে ভাঁজ করে রাখা শাড়িটি এটা বোঝা যায়। কিন্তু শাড়ি কেন? সকলেই বিস্মিত। এই শোক স্তব্ধ সময়েও সবাই একবার করে ছুঁয়ে দেখল কলা পাতা রঙের ভাঁজ করা শাড়িটি। কিন্তু শাড়ি কেন? নাড়তে চাড়তে গিয়ে শাড়ির ভাঁজের ভেতর থেকে একটা ছোট্ট চিরকুট উড়তে উড়তে গিয়ে মিলার সামনে পড়ল। মিলা চিরকুটটা তুলে রাফীদের হাতে দিলো, রাফীদের চিনতে দেরি হলো না, এগুলো মায়ের হাতের লেখা।

‘এটা আমার মায়ের শাড়ি, এই শাড়িতে আমার মায়ের শরীরের গন্ধ লেগে আছে। আমি মারা গেলে এই শাড়ি দিয়ে তোরা আমার কাফন বানাবি’—লেখা ছিল চিরকুটে।

Ashraf Jewel

আশরাফ জুয়েল

জন্ম ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮, চাঁপাইনবাবগঞ্জ। কবি, কথাসাহিত্যিক।

এম বি বি এস, ডিপ্লোমা ইন এনেসথেসিয়া (ঢাকা ইউনিভার্সিটি)।
পেশা : চিকিৎসক, স্পেশালিস্ট, ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট, ইউনাটেড হসপিটাল।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
যুদ্ধ ছাড়া শুদ্ধতা অসম্ভব [অনুপ্রাণন, ২০১৩]
অতীতা দুঃখরা পাখি হয়ে গেল [প্রিয়মুখ প্রকাশন, ২০১৪]
অনুজ্জ্বল চোখের রাত [নন্দিতা, ২০১৬]

ই-মেইল : ashrafjewel78@gmail.com
Ashraf Jewel