হোম পুনর্মুদ্রণ গদ্য লেরির মা কিংবা ভুসিডঙের আখ্যান

লেরির মা কিংবা ভুসিডঙের আখ্যান

লেরির মা কিংবা ভুসিডঙের আখ্যান
289
0

লেরির ‍মাকে দেখতাম নানাবাড়িতে, ছেলেবেলায়, মস্ত এক পুঁটলি নিয়ে রান্নাঘরের একধারে পড়ে আছে ঝুটকাপড়ের মতো। নানির সঙ্গে সারাক্ষণ কী সব বলেই চলেছে তার সান্ধ্য ভাষায় আর গুড়ুকগুড়ুক করে হুঁকো টানছে। দীর্ঘাঙ্গিনী এই বৃদ্ধার গায়ের রং হয়তো শ্যামলা ছিল এককালে, রোদ ও বিষাদের তাপে পুড়ে পুড়ে কাঠকয়লা হয়ে গেছে। শুনেছি সুদূর বার্মার ভুসিডং ছিল তার আদিনিবাস, মখলছ নামের রেঙ্গুনবাসী এক যুবকের হাত ধরে সে সাগর পাড়ি দিয়ে চলে আসে ফটিকছড়ির সুন্দরপুরে। বর্মি বউ নিয়ে মখলছ ঘর বাঁধে কাডালির কূলে। আগের ঘরের একটি মেয়ে ছিল লেরির মা-র যাকে মখলছের মেয়ে বলেই মনে করত সবাই। কিন্তু তার নাম তো ছরা বা সায়রা খাতুন, তাহলে ‘লেরির মা’ কথাটি এল কোত্থেকে?


লেরির মা-র চোখে বিস্ময়ভরা আনন্দ। যথাসময়ে শুরু হলো যাত্রা। খালবিল পেরিয়ে স্বামীর সঙ্গে হাঁটছে লেরির মা। সুন্দরপুর থেকে পশ্চিমে হাজারিখিলের প্রান্তে বারইয়ারঢালার উঁচুনিচু পাহাড়ি পথ, কত মাইল হেঁটেছে জানে না লেরির মা। 


মেজ মামা ছিলেন মজার মানুষ। নানাবাড়িতে দেখেছি, শিশুদের উদ্ভট সব নামে সম্বোধন করে খেপিয়ে দিয়ে তিনি আনন্দ পেতেন; যেমন, পাড়ার এক মুখরা ভাইঝিকে দেখলেই হাঁক দিতেন টানা সুরে, ‘কন্ডে যর অ মন্টেস্কুর মা?’ কেবল মন্টেস্কু নন, বহু ভুবনবিখ্যাত মনীষীর নামে চলত তার এই বপ্রক্রীড়া। মায়ের ‍কাছে শুনেছি, লেরির মা-র আসল নাম ছিল আলেয়া, ভুসিডঙের গল্প শোনাতে গিয়ে সে একদিন না কি বলেছিল যে ‍তার শাশুড়িকে সবাই ডাকত ‘লেরির মা’। ব্যস,  মেজ মামা ললিপপের মতো লুফে নিলেন সুস্বাদু নামটি।

মখলছের মৃত্যুর পর লেরির মাকে বিয়ে করে পুবপাড়ার নজির। ধুরুং খালের বাঁধের কাছে তার কুঁড়েঘর। একটি মেয়ে হলো তাদের, বাঁচল না বেশিদিন। চাষাভুষো নজিরের অভাবের সংসার। গেরস্তবাড়িতে ‘বারা বাঁধা’ বা ধান ভানার কাজ করে তিলে-তিলে পাঁচশো টাকার মতো জমিয়েছিল লেরির মা; কোনও এক উপলক্ষে বা নানা খেপে নজির সেই টাকা চেয়ে নিয়েছিল লেরির মা-র কাছ থেকে, ফেরত দেয় না আর। বারকয়েক টাকা চাইলেও নজির নির্বিকার।

লেরির মা বলে, ‘শোনো, মাইয়ার বাপ,
বারবার টাকা চাই—এ বড় খারাপ।
পাড়ায় পারি না আমি দেখাইতে মুখ,
দোকানদারের কথা দিলে দেয় দুখ।
কর্জের ঠেকায় আছি, না দিলে টাকাটা
তোমার সংসারে, বলি, মারিলাম ঝাঁটা!’

নজির বউভুলানো গান গেয়ে শান্ত করে লেরির মাকে। দিন যায়। একদিন লেরির মাকে ডেকে নজির চুপিচুপি বলে কি না সে স্বপ্নে দেখেছে মোহরের ঘড়া যা আছে দূরের এক গোপন জায়গায়। মাইজভাণ্ডারের দরগায় মানত করে মঙ্গলবার ভোরবেলা রওনা হতে হবে সেখানে। লেরির মা-র চোখে বিস্ময়ভরা আনন্দ। যথাসময়ে শুরু হলো যাত্রা। খালবিল পেরিয়ে স্বামীর সঙ্গে হাঁটছে লেরির মা। সুন্দরপুর থেকে পশ্চিমে হাজারিখিলের প্রান্তে বারইয়ারঢালার উঁচুনিচু পাহাড়ি পথ, কত মাইল হেঁটেছে জানে না লেরির মা। বেলা বাড়তে থাকে, পা-জোড়া যেন যায় অবশ হয়ে। ছায়াঘেরা নির্জন এক বনপথে এসে থামল নজির।

দেখিল লেরির মা—গা ছমছম করে—
ভাল্লুকের মতো মেঘ টিলার উপরে!
নজিরা থামিয়া বলে—মুখে মৃদু হাসি—
‘তুই বসি থাক, আমি ফুল নিয়া আসি।’

দূর্বাঘাসে চুপচাপ বসে রইল লেরির মা। আজ ধোয়া লালশাড়ি পরে একটু সেজেগুজে বেরিয়েছে। নজিরই বলেছিল সাজতে। ঘরে মেয়েটিকে রেখে এসেছে, ভাবছে তার কথা। এত ধনরত্ন দেখে হঠাৎ কী না খুশি হবে সে! কিছুক্ষণ পরে একমুঠো বনফুল নিয়ে ফিরে এল নজির। মাটিতে ফুললতাপাতা ‍সাজিয়ে, মোমবাতি জ্বেলে কী যেন পড়ল বিড়বিড় করে। ওধারে কাঁটাঝোপটায় মাকড়শার জালে লেগে আছে রোদের কণা।

যজ্ঞডুমুরের তলে নুয়াইয়া মাথা
নজিরা বলে, ‘এটা সুন্দর শা-র গাথা।
গাথায় ফেলবি ফুল চোখ বন্ধ করি,
বিসমিল্লা বলি ঘড়া উঠাইবি ধরি।’
লেরির মা গেল ধীরে গর্তের কিনারে।
বন্ধ দুই চোখ, বুকে মাছে ঘাই মারে!
সোনার মোহরে তার ফিরিবে কি হাল?
না আছে সিন্দুক ঘরে, না আছে আড়াল!
আচমকা ধাক্কা দিল কে যেন পশ্চাতে,
গড়িয়া পড়িল নিচে গোঙাতে গোঙাতে।
ছিঁড়িল বসন তার—খোদার কী কৃপা—
গাছের শিকড়ে শেষে ঠেকিল বুঝি পা!
স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার নিচে কি উপরে;
কূপেতে পড়িয়া কন্যা হাউমাউ করে।


দূরাগত এক কান্নার অস্পষ্ট ধ্বনি যা কোনো কুহর থেকে গুমরে গুমরে উঠে ছড়িয়ে পড়ছিল নিঝুম বনপথে। ওরা থামল। কেউ বলল, ‘সল, যাই সাই।’ কেউ বলল, ‘না, দরকার নাই।


ভয়ার্ত চিৎকারে গলা শুকিয়ে আসে লেরির মা-র; তখন দুপুর না রাত জানে না সে, আঁকুপাঁকু করে একটা শিকড় আঁকড়ে ধরে শুধু কেঁদেছে অবিরাম। ঢুলিরা যাচ্ছিল সে-পথে, গল্পগুজব করতে করতে। তাদের কানে বাজল যেন দূরাগত এক কান্নার অস্পষ্ট ধ্বনি যা কোনো কুহর থেকে গুমরে গুমরে উঠে ছড়িয়ে পড়ছিল নিঝুম বনপথে। ওরা থামল। কেউ বলল, ‘সল, যাই সাই।’ কেউ বলল, ‘না, দরকার নাই। ভুতপেত্নির ডাক অইত ফারে!’ শেষপর্যন্ত শব্দের উৎস খুঁজতে খুঁজতে ওরা এগিয়ে এল যজ্ঞডুমুরের তলায়। গভীর এক কুয়ো থেকেই ভেসে আসছে ক্ষীণ অথচ মর্মভেদী সেই আর্তনাদ। সর্দারের পরামর্শে ওরা লম্বা রশি পাকিয়ে ফেলে দিল কুয়োয়।

লেরির মা লতা ভাবি ধরিল সে-রশি
ঢুলিদের কেউ-কেউ বলিল, ‘রাক্ষসী!’
সর্দার বলিল, ‘তোরা পুরুষ, না নারী?
ঘোমটা টানিয়া ঘরে কাটিস সুপারি!’

সর্দারের ধমক খেয়ে ঢুলিরা রশি টানতে লাগল শঙ্কামিশ্রিত কৌতূহলে। ডাঙায় উঠে এল এক বিবস্ত্র দুঃখিনী পাতালকন্যা।

গায়ের গামছা দিয়া বলিল সর্দার,
‘কী হইল বোন, কও, কী বা সমাচার?
কোথায় তোমার দেশ, কী তোমার নাম?
পাতালে ফেলিয়া দিল কোথাকার রাম?’

লেরির মা-র মুখে সব বৃত্তান্ত শুনে ঢুলিরা হতবাক হয়ে যায়। তারা তাকে নিয়ে গেল সুন্দরপুরে। শালিস-বিচার হয় নজিরের। নাকে খত দিয়ে সে আবার ঘরে তোলে লেরির ‍মাকে। কিন্তু ভাগ্যবিড়ম্বনা ছায়ার মতো ঘোরে লেরির মা-র পিছু-পিছু। নজিরের কী হয়েছিল জানি না, কূলহারা লেরির মা গেরস্তবাড়ির দোরে-দোরে কাজ খুঁজে বেড়াত। মেয়ে ছরাকে নিয়ে অবশেষে একদিন ঠাঁই পেল আমার নানাবাড়িতে। সে-সময় নানাবাড়ির অবস্থা পড়তির দিকে। নানা মারা গিয়েছিলেন অকালে যক্ষ্মায় ভুগে ১৯৫৬ সালে। নয়টি ছেলেমেয়ের মধ্যে শুধু বড় খালার বিয়ে হয়েছিল। শুনেছি, মায়ের বিয়েতে সওয়ারি হয়ে আমাদের বাড়িতে এসেছিল লেরির মা। আমার বড় ফুফা তাকে দেখে তো অবাক। সুয়াবিলে তাদের বাড়িতেও না কি একসময় ভাত রেঁধে খাইয়েছিল লেরির মা। বিয়ে বাড়িতে সওয়ারির আদর-আপ্যায়নের খামতি নেই, কিন্তু কী আশ্চর্য, অন্দরের চমৎকার বিছানায় শুতে কিছুতেই রাজি নয় লেরির মা—পশ্চিমের বেড়ার বারান্দার এক কোনায় জড়োসড়ো হয়ে থাকতেই যেন তার সুখ!

নানির সর্বক্ষণের সহচরী ছিল লেরির মা। উটকে বলা হয় মরুভূমির জাহাজ আর লেরির মা ছিল নানির জাহাজ। মেয়েদের শ্বশুরবাড়িতে নানা সময়ে লেরির মাকে পাঠাতেন নানি; লম্বা-লম্বা ধুলোমাখা পথ পায়ে হেঁটে পাড়ি দিত লেরির মা—কখনও বড়বিলে, কখনও-বা ধর্মপুরে। দিনশেষে চেরাগ জ্বেলে, হুঁকোর মালশায় লালটুকটুকে কয়লা নিয়ে, বসে থাকত রান্নাঘরের সেই আবছা কোনায়। কাঁথাবালিশ, চটি, থালা, বদনা ও বঞ্চনার পুঁটলিবাঁধা মস্ত এক পৃথিবীকে নিয়ে সে যেন ছোট করে সাজিয়ে নিতে চেয়েছিল নিজের সংসার।

 

মুয়িন পারভেজ

জন্ম ২৬ আগস্ট, ১৯৭৬; পশ্চিম আঁধারমানিক, ভুজপুর, চট্টগ্রাম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর।পেশায় আইনজীবী, চট্টগ্রাম জেলা জজ আদালত।

প্রকাশিত বই—
'মর্গে ও নিসর্গে' [কবিতা, ঐতিহ্য, ফেব্রুয়ারি ২০১১]

ই-মেইল : muyinparvez@gmail.com

Latest posts by মুয়িন পারভেজ (see all)