হোম পুনর্মুদ্রণ গদ্য খেয়া : এক রহস্যময় বিপরীতবিহারের ঝটিকালিপি

খেয়া : এক রহস্যময় বিপরীতবিহারের ঝটিকালিপি

খেয়া : এক রহস্যময় বিপরীতবিহারের ঝটিকালিপি
882
0
7704279234_fcdb173fb1_b
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১)

…অনেকসময় সেই লুকানো দরোজাটি খুলিবার জন্য কবি তাঁহার রচনায় আলগোছে একটি বা একাধিক চাবি রাখিয়া দেন


বনচাঁড়ালের নৃত্য

উদ্ভিদের উপর তড়িৎ তরঙ্গ এবং অন্যান্য উদ্দীপকের প্রভাব লইয়া দীর্ঘ গবেষণার পর লন্ডন হইতে বিজ্ঞানাচার্য জগদীশচন্দ্রের Plant Response as a Means of Physiological Investigations  গ্রন্থটি প্রকাশিত হইলে (১৯০৬) পশ্চিমের বিজ্ঞানী মহলে সাড়া পড়িয়া যায়। প্রায় একই সময় এদেশে প্রকাশিত হইল তাঁহার দীর্ঘদিনের সুহৃদ রবীন্দ্রনাথের কবিতাবহি খেয়া  (আষাঢ় ১৩১৩)। হয়তো বন্ধুর হালফিল সাফল্যের অভিজ্ঞানে, জগদীশ চন্দ্রকেই কবি বহিটি উৎসর্গ করিলেন। কিন্তু সেই উৎসর্গের পিছনে কি কোনও কুণ্ঠা রহিয়া গিয়াছিল! না হইলে, উৎসর্গ কবিতাটিতে দেখি, শুরুতেই ঠাকুর ঘোষণা দিতেছেন—বন্ধু, এ যে আমার লজ্জাবতী লতা। ভাবিতে অবাক লাগে, নিজের কবিতার প্রসঙ্গে আচানক এইভাবে ‘লজ্জাবতী লতা’-র অনুষঙ্গ কেন! ইহা কি নিছক কোনও কবিজনোচিত সংকোচের অভিব্যক্তি? নাকি গাছের সংবেদনশীলতা লইয়া প্রিয় বন্ধুর গবেষণাকে স্মরণ ও সম্মান জানানোর এক তরিকা?

গাছের সংবেদনশীলতার কথা উঠিলেই আমাদের সাদামাটা জ্ঞানে লজ্জাবতী লতার কথা খেয়ালে আসে। জগদীশ চন্দ্র অবশ্য গাছকে এইভাবে লাজুক-অলাজুক ভাগ করিতে চাহেন নাই। কারণ, তাঁহার কথায়, ‘সব গাছই যে সাড়া দেয় তাহা বৈদ্যুতিক উপায়ে দেখানো যাইতে পারে’। লজ্জাবতী লতার প্রতিক্রিয়া তো তবু বাহিরের আঘাত সাপেক্ষ। কিন্তু প্রাণীদেহের কিছু পেশীতে যেমন স্বতঃস্পন্দন লক্ষ করা যায়, বনচাঁড়াল গাছের আচরণও সেইরকম। কোনও প্ররোচনা ছাড়াই এই গাছের পাতাগুলি নাচে। স্বাভাবিকভাবেই বনচাঁড়ালের এই ধর্ম জগদীশচন্দ্রকে নিজের তত্ত্ব প্রতিষ্ঠার কাজে যথেষ্ট সাহায্য করিয়াছিল—

বনচাঁড়াল গাছ দিয়া উদ্ভিদের স্পন্দনশীলতা অনায়াসে দেখা যাইতে পারে। ইহার ক্ষুদ্র পাতাগুলি আপনা-আপনি নৃত্য করে। … তরুস্পন্দনের সাড়ালিপি পাঠ করিয়া জন্তু ও উদ্ভিদের স্পন্দন যে একই নিয়মে নিয়মিত তাহা নিশ্চয়রূপে বলিতে পারিতেছি।
– নির্বাক্‌ জীবন, অব্যক্ত
Jagadish_Chandra_Bose_1926
১৯২৬ সালে প্যারিসে উদ্ভিদের স্নায়ুতন্ত্র বিষয়ে বক্তৃতা করছেন জগদীশ চন্দ্র বসু (১৮৫৮-১৯৩৭)

লজ্জাবতী ও বনচাঁড়ালের এইসব ধানাই-পানাই ছাড়িয়া আমরা বরং রবীন্দ্রনাথের খেয়া  কাব্যগ্রন্থের উৎসর্গ কবিতায় ফিরিয়া আসি। বৈজ্ঞানিক নিরিখে উদ্দীপনার তুলনামূলকতায় লজ্জাবতী অপেক্ষা বনচাঁড়াল আগাইয়া রহিলেও, কাব্যিক ব্যঞ্জনায় অবশ্যই তাহা নয়। বিশেষত সেকালীন রাবীন্দ্রিক সৌষম্যবোধ মোতাবেক ইহা কল্পনা করা যায় না যে, ঠাকুর লিখিতেছেন—বন্ধু, এ বনচাঁড়াল নৃত্যরতা! যদিও খোদ জগদীশ চন্দ্র তাঁহার ‌’নির্বাক জীবন’ নিবন্ধের একটি অংশের শীর্ষে বনচাঁড়ালের নৃত্য—এই উপশিরোনামটি ব্যবহার করিয়াছিলেন। তবে বনচাঁড়াল বিজ্ঞানীর উদ্দেশ্য সাধন করিলেও, কবির বলিবার কথাটি লজ্জাবতীকে দিয়া অনেক নান্দনিকভাবে প্রকাশ করা গেল। এই উল্লেখ একদিকে যেমন অন্তরঙ্গ বন্ধুর বিজ্ঞানসাধনার প্রীতিপূর্ণ স্বীকৃতি, অপরদিকে নিজের কবিতার রহস্যময়তার প্রতিও যেন এক তেরছা ইশারা। রহস্য উন্মোচনের আমন্ত্রণও রহিয়াছে সেই উৎসর্গের বয়ানে—বন্ধু, আনো তোমার তড়িৎ-পরশ/ হরষ দিয়ে দাও,/ করুণ চক্ষু মেলে ইহার/ মর্মপানে চাও।

কবিতার কাছে তো পাঠক কোনও না কোনও ধরনের রহস্যই খোঁজেন। তবে কবিতা দুইভাবেই পাঠককে খুশি করে। পহেলা, তাহার রহস্যময়তা দিয়া। ফের রহস্যের মোড়ক খুলিতে পারিলে তখন দ্বিতীয় দফা আনন্দ। অনেকসময় সেই লুকানো দরোজাটি খুলিবার জন্য কবি তাঁহার রচনায় আলগোছে একটি বা একাধিক চাবি রাখিয়া দেন। উৎসর্গ কবিতাটির অন্তিম স্তবকে তেমনই একটি চাবির হদিশও যেন রাখিয়াছেন ঠাকুর—

এই-যে মুদে আছে লাজে
পড়বে তুমি এরই মাঝে—
জীবনমৃত্যু রৌদ্রছায়া
ঝটিকার বারতা।
আমার লজ্জাবতী লতা।

খোদ কবিই যদি নিজের কবিতা প্রসঙ্গে এইভাবে ‘এই-যে মুদে আছে লাজে’ বলিয়া টিপ্পনী করেন, তবে কি মনে হয় না যে, কবির দিক হইতে কিছু না কিছু লাজুকতার অনুষঙ্গ রহিয়া গিয়াছে এই বহিটির অন্দরে। খেয়া  প্রকাশকালে ঠাকুর বাংলাদেশের এক প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যব্যক্তিত্ব। অন্যান্য রচনা ছাড়াও মানসী-সোনার তরী-চিত্রা-নৈবেদ্য‘র মতো কাব্যগ্রন্থ এবং কয়েক শত গানের রচয়িতা তিনি। বন্ধুকে কাব্যগ্রন্থ উৎসর্গ করিতে গিয়া তাঁহার এহেন সংকুচিত অভিব্যক্তির উৎস তাহা হইলে কী?

মনে রাখিতে পারি, খেয়া‘র কবিতাগুলি রচনাকালে বাংলাদেশের ইতিহাস-ভূগোলের উপর দিয়া এমন এক ঝঞ্ঝাপ্রবাহ বহিয়া যাইতেছে, যাহাতে বাংলাভাষী জনসমাজের পরবর্তী ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হইয়া গেল বলা যায়। ঠাকুরের মতো মানুষের পক্ষে সেই বিপুল আলোড়নের ভিতর নির্লিপ্ত বসিয়া থাকা সম্ভব ছিল না। উপলক্ষটি ছিল কার্জনকৃত বঙ্গভঙ্গ এবং হিন্দু বাঙালি ভদ্রজনের বিভাজনবিরোধী আন্দোলন। ঠাকুরের অবিস্মরণীয় স্বদেশী গানগুলি এবং বাংলার সমাজ ও রাজনীতি লইয়া একাধিক এফোঁড়-ওফোঁড় নিবন্ধ এই সময়ের ফসল। ঠাকুর যেমন এই বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে এবং তাহার পিঠাপিঠি জাতীয় শিক্ষা-আন্দোলনে মাতিয়াছেন, তেমনই অনেক সময় ঈষৎ দূরত্বে দাঁড়াইয়া আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি মাপিয়াছেন। নানা সময় নানান সংশয় প্রকাশ করিয়াছেন। সময় সময় নিজেকে বিচ্ছিন্ন করিয়াও লইয়াছেন। আন্দোলনের শুরুর দিকে, সভাপতি হিসাবে নাম ঘোষিত থাকা সত্ত্বেও তিনি ১৮ শ্রাবণ ১৩১২ (৩ আগস্ট ১৯০৫)-এ স্টার থিয়েটারে অনুষ্ঠিত বিপিনচন্দ্র পালের এক বক্তৃতাসভায় হাজির হইতে পারেন নাই। ৭ আগস্ট টাউনহলের ঐতিহাসিক জনসভাতেও তিনি অনুপস্থিত। সেখানে গঠিত আন্দোলন পরিচালন সমিতির সদস্যদের ভিতর তাঁহার নাম নাই। আবার ৯ ভাদ্র ১৩১২ (২৫ আগস্ট ১৯০৫) টাউন হলের অপর এক সভায় আসিয়া তিনি অবস্থা ও ব্যবস্থা নিবন্ধটি পাঠ করিলেন। সভাশেষে তাঁহার সদ্য রচিত আমার সোনার বাংলা এবং অন্য একটি স্বদেশী গান পরিবেশিত হইবার সময় সমবেত জনতা উঠিয়া দাঁড়াইয়া গানের সহিত গলা মিলাইল। ইহার মাসখানেকের ভিতর, ১১ আশ্বিন (২৭ সেপ্টেম্বর), সাবিত্রী লাইব্রেরীতে ঠাকুরেরই সভাপতিত্বে স্বধর্ম সাধন সমিতির এক সভায় সিদ্ধান্ত হইল, ১৬ অক্টোবর প্রস্তাবিত বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হইলে, সেইদিন আপূর্বপশ্চিম সারা বাংলাদেশে অরন্ধন, রাখীবন্ধন ও মিলন দিবস হিসাবে উদ্‌যাপিত হইবে। অথচ দেখিতেছি, সামাজিক তৎপরতার এই পর্যায়কালের ভিতরেই রচিত তাঁহার একটি গানে কীভাবে যেন প্রকাশ পাইতেছে চূড়ান্ত এক নির্লিপ্ততা–আমার নাইবা হল পারে যাওয়া।/ …/ আমার আশার তরী ডুবল যদি/ দেখব তোদের তরী বাওয়া (২৭ ভাদ্র ১৩১২)। আশার তরী ডুবিবার এই গানটি, ‘ঘাটে’ শিরোনামের একটি কবিতা হিসাবে খেয়া  কবিতাবহির অন্তর্গত।

বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হইবার পর রচিত খেয়া‘র এইরকম আরও কিছু কবিতায় দেশের চলিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড লইয়া ঠাকুরের হতাশা, তির্যকতা ও নিজেকে বিচ্ছিন্ন করিয়া লইবার মানসিকতা খুব একটা লুকাছাপা না করিয়াই প্রকাশ পাইয়াছে। যেমন :

১. সারা হল কাজ, মিছে কেন আজ/ ডাক মোরে আর কাজে।
—গোধূলিলগ্ন, ২৯ পৌষ ১৩১২

 

২. যেখানে যা-কিছু পেয়েছি কেবলি/ সকলি করেছি জমা—/ যে দেখে সে আজ মাগে যে হিসাব,/ কেহ নাহি করে ক্ষমা।/ এ বোঝা আমার নামাও বন্ধু,/ নামাও।/ ভারের বেগেতে ঠেলিয়া চলেছে,/ এ যাত্রা মোর থামাও।
—ভার, ২৫ মাঘ [১৩১২]

 

৩. আমার দলের সবাই আমার পানে/ চেয়ে গেল হেসে।/ চলে গেল উচ্চশিরে,/ চাইল না কেউ পিছু ফিরে,/ মিলিয়ে গেল সুদূর ছায়ায়/ পথতরুর শেষে।/ …/ লাজের ঘায়ে উঠিতে চাই,/ মনের মাঝে সাড়া না পাই…
—নিরুদ্যম, ৬ চৈত্র ১৩১২

 

৪. বিদায় দেহো, ক্ষমো আমায় ভাই।/ কাজের পথে আমি তো আর নাই।/…/ তোমরা আজি ছুটেছ যার পাছে/ সে-সব মিছে হয়েছে মোর কাছে—/ রত্ন খোঁজা, রাজ্য ভাঙা-গড়া,/ মতের লাগি দেশ-বিদেশে লড়া,/ আলবালে জলসেচন করা/ উচ্চশাখা স্বর্ণচাঁপার গাছে।/ পারি নে আর চলতে সবার পাছে।
—বিদায়, ১৪ চৈত্র ১৩১২

 

৫. হাটের সাথে ঘাটের সাথে আজি/ ব্যবসা তোর বন্ধ হয়ে গেল।/ এখন ঘরে আয় রে ফিরে মাঝি,/ আঙিনাতে আসনখানি মেলো।/…/ ফিরিয়ে আনো ছড়িয়ে-পড়া মন,/ সফল হোক সকল সমাপন।
—সমাপ্তি, ১০বৈশাখ ১৩১৩

এই যে ছড়াইয়া পড়া মনকে বাহিরের হট্টগোল হইতে গুটাইয়া আনিয়া কবিতার আপন আসনে বসাইবার ডাক, তবে কি এইসব গহন স্বগতোক্তিগুলি আন্দোলিত সমাজের কাছে ধ্বনিময় হইয়া উঠিবার জন্যই কবি ভিতরে ভিতরে কিছুটা সংকুচিত ছিলেন? কিন্তু এইরকম মাত্র ৫-৬টি কবিতার জন্য গোটা বহিটিকে ঠাকুর ‘লজ্জাবতী লতা’ বলিবেন, তাহা মনে হয় না। ইহার আড়ালে আসলেই আরও কী বনচাঁড়ালের নৃত্য আছে, তাহা তালাশ করিয়া দেখা যাক। বিশেষত, কবি নিজেই যেখানে এইভাবে সেই হাতছানি দিয়া রাখিয়াছেন:

যত্নভরে খুঁজে খুঁজে
তোমায় নিতে হবে বুঝে,
ভেঙে দিতে হবে যে তার
নীরব ব্যাকুলতা।
 
11094182_919834898061632_418068596_n
‘খেয়া’ কাব্যের পূর্বে প্রকাশিত কয়েকটি বই
লতার মতো কাঁপব আমি

বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব যে রবীন্দ্রনাথকে কতখানি আলোড়িত করিয়াছিল তাহা বোঝা যায় অল্প কয়দিনের মধ্যেই গিরিডিতে (তখন অবিভক্ত বাংলাদেশের অংশ) বসিয়া এক লপ্তে ২২/২৩টি স্বদেশী গান লিখিয়া ফেলিবার ঘটনায়। অচিরেই সেইসব গান বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী যুবজনতার মুখে মুখে ফিরিতে থাকে। কিন্তু ইহাও ঠিক, ১৯ জুলাই ১৯০৫, বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাবের দাপ্তরিক ঘোষণার সাথে সাথেই যখন কলিকাতা নগরীর বাবুসমাজ গরম হইয়া উঠিলেন, রবীন্দ্রনাথ কিছুদিন কিছুটা নিভৃতে রহিয়া গেলেন। আমরা দেখিয়াছি, সেই সময়কার ২/১টি গুরুত্বপূর্ণ সভায় তিনি গরহাজির। তিনি তখন কই? সেহেন একটি তুঙ্গ সময়ই, বোলপুরে অবস্থানকালে একটি কবিতায় তিনি লিখিতেছেন—

বলে দে আমায় কী করিব সাজ,
কী ছাঁদে কবরী বেঁধে লব আজ,
পরিব অঙ্গে কেমন ভঙ্গে
কোন্‌ বরনের বাস।                —শুভক্ষণ, ১৩ শ্রাবণ ১৩১২

স্পষ্টতই এই কবিতার কথক-আমি, একজন নারী। সেই নারী, অল্প বয়সী এক তরুণীই হইবে, কোনও এক রাজার দুলালের সফর লইয়া যে তাহার মায়ের সাথে কথনরত। দুই অংশে বিভক্ত (শুভক্ষণ ও ত্যাগ) গোটা কবিতাটিই সেই তরুণীর একক সংলাপ। রচয়িতার কোনও বয়ান এখানে নাই। এমন একটি নাট্যীয় কবিতার রচনা, কবির বিচিত্র মনের খেয়াল বলিয়া খুশি থাকিতে বাধা নাই। কিন্তু দেখিতেছি ২ দিনের তফাতেই ঠাকুর আর এক বালিকা বধূকে লইয়া অপর একটি কবিতা লিখিতেছেন। এই কবিতার কথক, কবি নিজেই। আর উদ্দীষ্ট হইল ‘নবীনা বুদ্ধিবিহীনা’ সেই বালিকাটির পরিণতবুদ্ধি বর। বালিকা, বরের গুরুত্ব বোঝে না— তুমি কাছে এলে ভাবে তুমি তার/ খেলিবার ধন শুধু। কিন্তু কবি জানেন যে—একদিন এর খেলা ঘুচে যাবে/ ওই তব শ্রীচরণে। বরও সেই কথা জানে। তাই—

রতন-আসন তুমি এরি তরে
রেখেছ সাজায়ে নির্জন ঘরে।
সোনার পাত্রে ভরিয়া রেখেছ
নন্দনবন-মধু।                   —বালিকা বধূ, ১৫ শ্রাবণ ১৩১২

অল্প কয়দিনের ভিতরেই ‘আধেক-খোলা বাতায়নের ধারে’ চুড়িওয়ালার প্রতীক্ষায় দাঁড়াইয়া থাকা আরও এক ‘নূতন বধূ’ ঠাকুরের দৃষ্টি আকর্ষণ করিল। ‘স্বপন দিয়ে গড়া’ ‘ছায়াময়’ এক দুনিয়ার বাসিন্দা ‘ঘোমটা-ছায়ায় ঢাকা’ সেই নারী। কবির সহসা মনে হয়—

তীব্র তড়িৎহাসি হেসে
বজ্রভেরীর স্বরে
তোমার ঘরে ঢুকি
জগৎ যদি এক নিমেষে
শক্তিমূর্তি ধ’রে
দাঁড়ায় মুখোমুখি—
কোথায় থাকে আধেক-ঢাকা
অলস দিনের ছায়া,
বাতায়নের ছবি,
কোথায় থাকে স্বপনমাখা
আপনগড়া মায়া—
উড়িয়া যায় সবই।           —অনাহত, ২৬ শ্রাবণ ১৩১২

এইসব হুঁশিয়ারি আসলেই কাহার উদ্দেশে? বাস্তবতার বিদ্যুৎগর্ভ ঘটনাপ্রবাহ কাহার সামনে সহসা হাজির হইয়া তাহার মায়াজগৎকে টুটাফুটা করিয়া দিতে উদ্যত? এইসব কথা কবি নিজেকেই নিজে শুনাইতেছেন না তো! যদি নিজেকেই শুনান, তাহার জন্য এমন এক সদ্যতরুণীর প্রতিরূপ নির্মাণ কেন!

প্রিয় পাঠিকা, প্রিয় পাঠক, জিজ্ঞাসা ও বিস্ময়ের প্রকাশ বুঝি কিছু বেশি হইয়া গেল। কিন্তু বিস্ময়ের শেষ এইখানেই নয়। উপরের ৩টি কবিতায় হাজির নারীচরিত্রগুলি তো তবু কল্পিত বা সৃজিত। মাস ৬ বাদে শিলাইদহে রচিত ‘মিলন’ কবিতার কথক জানাইতেছে, সেএক ‘হৃদয়-রাজারে’ বা ‘চিরজনমের রাজারে’ দেখিয়াছে। আধো অস্পষ্ট সেই মোলাকাতের স্মৃতিচারণার অভিব্যক্তিটি ঠাহর করিয়া দেখুন—

আমি জানি না কী হল, শুধু এই জানি
চোখে মোর সুখ মাখালো— কে যেন
সুখ-অঞ্জন মাখালো—

আজ ত্রিভুবন-জোড়া কাহার বক্ষে
দেহ মন মোর ফুরাল—যেন রে
নিঃশেষে আজি ফুরাল।

 

—মিলন, ২৩মাঘ ১৩১২

এই কবিতার ভিতর নাটকের কোনও আয়োজন নাই। অর্থাৎ কবি সরাসরি পাঠককে তাঁহার অভিজ্ঞতা-অনুভবের কথাগুলি জানাইতেছেন। স্বগতোক্তির মতো নিভৃত এই উত্তম পুরুষের প্রস্বরে কি এক নারীসত্তার পেলব বিকিরণ ছড়াইয়া পড়িতেছে বলিয়া মনে হয় না? যে-অভিব্যক্তি কোনও না কোনও ভাবে যেন শুভক্ষণ কবিতার তরুণীটির সাথে একই সুরে বাঁধা, যে কিনা রাজার দুলালকে পলকের জন্য দেখিতে পাওয়ার আবেগে গলা হইতে মণিহার ছুড়িয়া পথের ধুলায় ফেলিয়াছিল।
একইভাবে অপর একটি কবিতাতেও শুনি, আমি’র বয়ানে যেন ভাসিয়া উঠিতেছে এক ব্যাকুল নায়িকার কণ্ঠস্বর। সে যেন তাহার অনাগত নায়কের আগমনের সুখকল্পনায় বিভোর—

সে আসবে মোর চোখের ’পরে/ সকল আলোর আগে,/ তাহারি রূপ মোর প্রভাতের/ প্রথম হয়ে জাগে।/ …/ চিত্ত আমার উঠবে কেঁপে/ তার চেতনায় ভ’রে/ তোরা আমায় জাগাস নে কেউ,/ জাগাবে সেই মোরে।

 

—জাগরণ, ১০ চৈত্র ১৩১২

এই কবিতার কথক যেন দিনের যাবতীয় কর্মতৎপরতা হইতে ছুটি লইয়া আসন্ন রাত্রিতে কোনও এক অজানা দয়িতের সাথে মিলিত হইতে চলিতেছে


আরও একটু নিবিড় পাঠে ধরা পড়ে, খেয়া’র একাধিক কবিতায় কথক-আমি’র হৃদয়ের গহন উচ্চারণগুলিতে প্রায়শই যেন এইভাবে জাগিয়া উঠিতেছে এক নারীসত্তার কোমল আভা। কয়েকটি নমুনা দেখা যাক—

১. তারপরে যেই সন্ধ্যে হবে/ এনে ফুলের ডালা/ গেঁথে তুলব মালা।/ সাজাব তায় যূথীর হারে,/ গন্ধে ভরে দেব তারে,/ করব আমি আরতি তার/ নিয়ে দীপের থালা।   —বাঁশি, ২৯ শ্রাবণ ১৩১২

 

২. কইলে কথা ক্লান্তকণ্ঠে/ করুণ চক্ষু মেলে–/ ‘তৃষাকাতর পান্থ আমি’–/ শুনে চমকে উঠে/ জলের ধারা দিলেম ঢেলে/ তোমার করপুটে।   —কুয়ার ধারে, ৯ চৈত্র ১৩১২

 

৩. চেয়েছি বটে রাখিতে হেথা বাঁধা/ কেবল শুধু চোখের চাহনিতে।/ পথিক ওগো, মোদের নাহি বল, রয়েছে শুধু আকুল আঁখিজল।    —পথিক, ৮বৈশাখ ১৩১৩

 

৪.পাছে দেখি তুমি আস নি, তাই/ আধেক আঁখি মুদিয়ে চাই,/ ভয়ে চাই নে ফিরে।/ আমি দেখি যেন আপন-মনে/ পথের শেষে দূরের বনে/ আসছ তুমি ধীরে।   —অনুমান, ৪ আষাঢ় ১৩১৩

 

৫. নয়নে আজি ঝরিছে জল/ ঝরুক জল নয়নে হে।/ বাজিছে বুকে বাজুক, তব/ কঠিন বাহু-বাঁধনে হে।   —দুঃখমূর্তি

 

৬. হে মোর গোপনবিহারী,/ ঘুমায়ে ছিলেম যখন, তুমি কি/ গিয়েছিলে মোরে নেহারি।   —মুক্তিপাশ

এইসব বয়ানে নারীত্বের আভাস হয়তো ততটা স্পষ্টাক্ষরে প্রকট নয়, কিছুটা বা ব্যঞ্জনাবিজড়িত। কথা উঠিতেই পারে—পুরুষের কি চোখে জল ঝরিতে পারে না, নাকি সে ফুলের ডালা লইয়া মালা গাঁথিতে পারে না? কিন্তু ‘ঘাটের পথ’ কবিতার যে-আমি স্পষ্টই জানাইয়া দিতেছে– ‘আমি ডরি নাই ঝড়জল,/ উড়েছে আকাশে উতলা বাতাসে/ উদ্দাম অঞ্চল’, তাহাকেও নারীর স্বীকৃতি দিতে কি আমাদের বাধিবে? এই নির্মল স্বীকারোক্তিটুকু আমাদের কিছু সাহারা দিতে পারে—

যবে বুকে ভরি উঠে ব্যথা,
ঘরের ভিতরে না দেয় থাকিতে
অকারণ আকুলতা।
আপনার মনে একা পথে চলি,
কাঁখের কলসী বলে ছলছলি
জলভরা কলকথা—
যবে বুকে ভরি উঠে ব্যথা।       —ঘাটের পথ

বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন হইতে আমরা বহু দূরে সরিয়া আসিতেছি। আমরা নাচার। ঠাকুর যেদিকে লইয়া যান আমাদের সেই দিকেই যাইতে হইবে। উল্লেখিত সাবিত্রী লাইব্রেরিতে অনুষ্ঠিত স্বধর্ম সাধন সমিতির অধিবেশনের সপ্তাহ খানেক আগে, কবি তখন গিরিডিতে। সেই ফুরসতে রচিত এক গভীর আত্মোপলব্ধির কবিতায় কথক-আমি জানাইতেছে, তুমি-র যে-মালাটির জন্য সে একান্তভাবে প্রলুব্ধ ছিল, তাহা হাতে আসিবার পর দেখা গেল—এ তো মালা নয় গো, এ যে/ তোমার তরবারি। এই তরবারিধারী-তুমি নিঃসন্দেহে এক পুরুষ, যে কিনা আমি’র ‘হৃদয়রাজ’। আর, আমি? এই কবিতার আমি-কে লইয়া ঠাকুর আর কোনও ধন্দ রাখেন নাই। আমি এখানে সন্দেহাতীতভাবেই একজন নারী। ভোরের পাখির সাক্ষ্য হইতেই তাহা স্পষ্ট— ভোরের পাখি শুধায় গেয়ে/ ‘কী পেলি তুই নারী’। আমিও নিজেকে ‘শক্তিহীনা’ বলিয়া জানান দেয়—

ওগো এ কী তোমার দান।
শক্তিহীনা মরি লাজে,
এ ভূষণ কি আমায় সাজে।
রাখতে গেলে বুকের মাঝে
ব্যথা যে পায় প্রাণ।             —দান, ২৬ভাদ্র ১৩১২

বাহিরের কায়কারবার হইতে কবির নিজেকে প্রত্যাহার করিয়া লইবার মানসিকতার কথা বলিতে গিয়া গোধূলিলগ্ন কবিতার উল্লেখ আগে একদফা করিয়াছি। গোধূলিলগ্ন শব্দের ব্যঞ্জনার দ্ব্যর্থকতায় এই কবিতাটির বিস্তার। একদিকে গোধূলি যেমন বিবাহের প্রশস্ত লগ্ন, তেমনই এই সময়কালের উপর আসিয়া পড়িয়াছে অস্তসূর্যের বিষণ্ণ আভা। এই কবিতার কথক যেন দিনের যাবতীয় কর্মতৎপরতা হইতে ছুটি লইয়া আসন্ন রাত্রিতে কোনও এক অজানা দয়িতের সাথে মিলিত হইতে চলিতেছে। তাহার উৎকণ্ঠা—বেলাশেষে মোরে কে সাজাবে ওরে/ নবমিলনের সাজে। বিবাহের প্রস্তুতি হিসাবে কমবেশি সাজসজ্জা হয়তো পাত্রপাত্রী দুই তরফেই লাগে। তবে ফুলসাজে অবগুণ্ঠন রচনার বন্দোবস্ত নারীরই শোভা বৃদ্ধির জন্য। নিজের জন্য নারীসুলভ সেই মায়া-আবরণখানি বুনিয়া তুলিবার ঘোষণার ভিতর দিয়া, এই কবিতার আমি তাহার নারীত্বটিকেই স্পষ্ট করিয়া তোলে নাকি?

যূথীদল আনি গুণ্ঠনখানি
করিব বয়ন যে।
সাজাতে হবে রে নিবিড় রাতের
বাসকশয়ন যে।                         —গোধূলিলগ্ন, ২৯ পৌষ ১৩১২

অতঃপর ‘প্রচ্ছন্ন’ শিরোনামের একটি কবিতা আমাদের জন্য অপেক্ষা করে। যেখানে আমি-কে দেখা যায়—বসে আছি বসনখানি টেনে মুখের ’পরে/ যেন ভিখারিনীর মতো। তুমি-র জন্য ফুলের ডালি সাজাইয়া সারা দিনমান গাছতলায় কাটাইয়া দেয় সেই ভিখারিনী-আমি। তুমি-র ‘রাজৈশ্বর্যে’ ‘বিসর্জন’ দেবে বলিয়া নিজের ‘দৈন্যখানি’ সযত্নে বাঁচাইয়া রাখে সে। কিন্তু এই প্রগাঢ় আত্মসমর্পণের কথা তো জনসমক্ষে ফাঁস করা যায় না—ওগো অভাগিনীর এই অভিমান কাহার কাছে কব,/ তাহা রইল সংগোপন। তবে, সেই মিলনের মুহূর্তটি নিভৃতে কল্পনা করিতে অবশ্য বাধা নাই। আমি তাই খোয়াব রচনা করিতে থাকে—

হেসে দু হাত ধরে ধুলা হতে আমায় তুলে লবে—
তুমি লবে তোমার রথে।
আমার ভূষণবিহীন মলিন বেশে ভিখারিনীর সাজে
তোমার দাঁড়াব বাম পাশে,
তখন লতার মতো কাঁপব আমি গর্বে সুখে লাজে
সকল বিশ্বের সকাশে।                                    —প্রচ্ছন্ন, ২ আষাঢ় ১৩১৩

প্রিয় পাঠিকা প্রিয় পাঠক, সুদূর পারের নক্ষত্র মাঝে মাঝে যেইভাবে পৃথিবীর মানুষের দৃষ্টিসীমার আওতায় চলিয়া আসে, অতঃপর আমরা কবিতার যাবতীয় উপমা-চিত্রকল্প-ঠারঠোর ভেদ করিয়া, খেয়া-র আমি-র ভিতর তেমনই ‘গর্বে সুখে লাজে’ ‘লতার মতো’ কাঁপিতে থাকা এক নারীকে সাদা চোখে দেখিতে পাইলাম। এখন ইহাকে লজ্জাবতীর কাঁপনই বলুন বা বনচাঁড়ালের নৃত্য, ঘটনা আসিয়া দাঁড়াইয়াছে ‘সকল বিশ্বের সকাশে’। আচার্য জগদীশচন্দ্রের মতো আমরাও টের পাইতেছি প্রাণের সেই আদিম স্পন্দন।


কবি জানেন, এখনও দেখা না পাইলেও, ঈশ্বর আছেন। কাছেই কোথাও আছেন। শুধু নিজেকে প্রকাশ করিতেছেন না, এই যাহা


ঝটিকার বারতা

অতঃপর এই প্রচ্ছন্ন কবিতাটিতে আসিয়া আমাদের কি মনে হইতে পারে না, খেয়া  কবিতা-বহির আমি নিজের ভিতরে নারীসত্তার এই অদম্য প্রকাশগুলি আর প্রচ্ছন্ন রাখিতে চাহিতেছে না! বরং আমি-র অপর প্রান্তে অবস্থানরত তুমি-র স্বরূপটিই যেন ধীরে ধীরে প্রচ্ছন্ন হইয়া উঠিতেছে। আমি-র এত এন্তেজারি সত্ত্বেও কিন্তু এই কবিতায় শেষতক সেই তুমি-র দেখা মেলে না—ওগো সময় বয়ে যাচ্ছে চলে রয়েছি কান পেতে/ কোথা কই গো চাকার ধ্বনি। এই অবস্থায়, এই কবিতায় আমি-র চাওয়াটিই যদি মূল নিদর্শন হইত, তবে ইহার শিরোনাম অনায়াসে ব্যর্থ ঈপ্সা/ নিষ্ফল আকাঙ্ক্ষা/ মিথ্যাবাসনা ইত্যাদি হইতে পারিত। যদি তুমি-কে না-পাওয়াটিই বড় করিয়া তুলিয়া ধরিবার বিষয় হইত, তবে শিরোনাম অপ্রাপ্তি/ ভিখারিনী বা অভাগিনী হইতে পারিত। আমি-র বেদনাবোধের দিক হইতে ভাবিলে, নামটি হইতে পারিত লজ্জা বা নয়নজল (হেথা ভিখারিনীর লজ্জা কি গো ঝরবে নয়নজলে)। কিন্তু কবিতার নাম ‘প্রচ্ছন্ন’ রাখিয়া তুমি-র অবস্থানটিকেই কবি সবার উপরে গুরুত্ব দিলেন, যে-অবস্থানের উপর একটি সচেতন গোপনীয়তার আবরণ বিছানো। প্রসঙ্গত, অভিধান মোতাবেক প্রচ্ছন্ন অর্থ আচ্ছাদিত, আবৃত, গুপ্ত বা ঢাকা।

উৎসাহী কেহ কেহ বলিতেই পারেন, এই কবিতার নামকরণ লইয়া এত মাথা খোঁড়াখুঁড়ির কী আছে! সকল সওয়ালের জবাব তো দেওয়া আছে মূল কবিতা-বহির নামে। খেয়া শব্দটি শুনিয়াই বোঝা যায়, তাহা হইল দুনিয়াদারি হইতে আসমানদারির দিকে পাড়ি জমাইবার এক অলৌকিক জলযান। চিত্রা চৈতালী কল্পনা ক্ষণিকা-র লৌকিক পৃথিবী হইতে, নৈবেদ্য-র তপস্যার ছোট দরিয়ায় সাঁতরাইয়া, গীতাঞ্জলি-গীতিমাল্য-গীতালি-র আধ্যাত্মিকতার নয়া চরে নোঙর বাঁধিবার রোমাঞ্চকর অভিযাত্রাটিই হইল এই খেয়া। ঈশ্বর-অনুধ্যানে একান্তভাবে নিজেকে মগ্ন করিলেও, খেয়া-র কবি তখনও মর্মলোকের গহনে ঈশ্বরের স্পর্শ পান নাই। অপ্রাপ্তির সেই অন্তর্বেদনাই আকুল হইয়া ঝরিয়া পড়িতেছে উপরের ‘প্রচ্ছন্ন’ কবিতায়। কবি জানেন, এখনও দেখা না পাইলেও, ঈশ্বর আছেন। কাছেই কোথাও আছেন। শুধু নিজেকে প্রকাশ করিতেছেন না, এই যাহা। সেই জন্যই এই কবিতার নাম প্রচ্ছন্ন।

উত্তম প্রস্তাব। কিন্তু কিছু খটকা রহিয়া গেল। সেগুলি একে একে পেশ করা যাক।

১. সবার বড় খটকা, ঈশ্বরের প্রচ্ছন্ন উপস্থিতি অনুভব করিবার জন্য কবিকে এইভাবে খামোখা নারীরূপ ধারণ করিতে হইল কেন? পুরুষ সত্তা লইয়া ঈশ্বরের মোকাবিলা করিবার অসুবিধা কী হইতেছিল?

 

২. গীতাঞ্জলি  পর্বের কাব্যভূখণ্ডটি আবিষ্কার করিয়া লইবার সুনিশ্চিত প্রত্যয় লইয়া কি ঠাকুর খেয়া  রচনায় হাত দিয়াছিলেন যে, এই বহির নামের ভিতর দিয়া আগামী অধ্যাত্মলোকের কিছু আগাম ইঙ্গিত দিবেন? গীতাঞ্জলি  পর্বের স্থির প্রতীতির বিপরীতে খেয়া-র আত্ম-অনুসন্ধানের তীব্রতাগুলি (আমার যে এই নূতন-গড়া/ নূতন-বাঁধা তার/ নূতন সুরে করতে সে যায়/ সৃষ্টি আপনার) ও অনিশ্চয়তার ঘনঘোরগুলি (ঘটিয়ে তুলি কত কী যে/ বুঝি না এক তিল, তোমার সঙ্গে অনায়াসে/ হয় না সুরের মিল) কি এড়াইয়া যাওয়া যায়?

 

৩. গীতাঞ্জলি  পর্বে তুমি-র অবস্থান সুনির্ণীত। খেয়া-তেও কি তাহাই? মাত্র ১দিনের ব্যবধানে রচিত খেয়া-র ২টি কবিতায় কবির চিত্তবিক্ষেপের সামান্য নমুনা যদি এইসূত্রে আমরা খেয়ালে রাখিতে পারি—

 

দুলুক তরী ঢেউয়ের ’পরে/ ওরে আমার জাগ্রত প্রাণ/…/ দোসর-ছাড়া একার দেশে/ একেবারে এক নিমেষে/ লও রে বুকে দু হাত মেলি/ অন্তবিহীন অজানাকে।    —সমুদ্রে, ৭বৈশাখ ১৩১৩

 

আমার দিনের যাত্রাশেষে/ কার অতিথি হলেম এসে!/ হায় রে বিজন দীর্ঘ রাত্রি,/ হায় রে ক্লান্ত কায়া!     —দিনশেষ, ৮বৈশাখ ১৩১৩

 

দেখিতেছি, নিজের ‘জাগ্রত প্রাণ’ই হইল পহেলা কবিতার তুমি, বন্ধুহীন একাকিত্বের ভিতর এক অনিঃশেষ অজানার দিকে যাহার পাড়ি দিবার প্রত্যয়। দোসরা কবিতায় আবার কোনও তুমিই নাই। দিনের সমস্ত পথশ্রমের শেষে সেখানে ছড়াইয়া আছে শুধু এক রিক্ততার প্রলম্বিত ক্লান্তি। এহেন বিবিধ নাজুক পরিস্থিতিতে তুমি-র অবস্থানের গুরুত্ব খাটো করিয়া দেখিবার অবকাশ কই?

 

৪. গীতাঞ্জলি  পর্বের শেষ কাব্যগ্রন্থ গীতালি, কবির আধ্যাত্মিক ভাবনালোকের এক চূড়ান্ত অভিব্যক্তি। সেই বহির উৎসর্গ কবিতাটির উপস্থাপনা একবার দেখিয়া লইতে পারি—
সারথি চালান যিনি জীবনের রথ
তিনিই জানেন শুধু কার কোথা পথ
আমি ভাবি আমি বুঝি পথের প্রহরী,
পথ দেখাইতে গিয়ে পথ রোধ করি।

 

আমার প্রদীপখানি অতি ক্ষীণকায়া,
যতটুকু আলো দেয় তার বেশি ছায়া।
এ প্রদীপ আজ আমি ভেঙে দিনু ফেলে,
তাঁর আলো তোমাদের নিক বাহু মেলে।       —আশীর্বাদ, গীতালি, ১৬ আশ্বিন ১৩২১

বোঝা যায়, এইখানে আসিয়া মানবিক বুদ্ধির যাবতীয় কারসাজিসমূহ প্রত্যাহার করিয়া লইয়া এক নিরঙ্কুশ সমর্পণের পথে নিজেকে সঁপিয়া দিয়াছেন কবি। রসাস্বাদনে বা ভক্তিতে অভিভূত হওয়া ছাড়া, এইখানে পাঠকের তরফেও খুঁজিয়া লইবার, বুঝিয়া লইবার বিশেষ কিছু নাই। পাশাপাশি খেয়া-র উৎসর্গ কবিতার সেই অংশটি মনে করুন, যেখানে পাঠকের প্রতি কবির পরামর্শ—যত্নভরে খুঁজে খুঁজে/ তোমায় নিতে হবে বুঝে। সেই অংশটি মনে করুন, যেখানে পাঠকের প্রতি কবির ইঙ্গিত—পড়বে তুমি এরই মাঝে—/ জীবনমৃত্যু রৌদ্রছায়া/ ঝটিকার বারতা। কাজেই খেয়া-র কবিতা পড়িতে বসিয়া, কবিনির্দেশিত সেই আলো-অন্ধকারময় ঝঞ্ঝালিপিগুলি উপেক্ষা করিব কীরূপে? সেই গহন লিপিগুলির পাঠোদ্ধার না করিলে, সেই ঝটিকার বার্তাগুলির পুনঃসম্প্রচার না করিলে এই কবিতার মর্মলোকে যে আমরা ঠিকঠাক পৌঁছাইতে পারিব না, জগদীশচন্দ্রের অছিলায় পুরা পাঠকসমাজকেই কি ঠাকুর সেই বার্তা দিতেছেন না?

এইসব খটকার প্রেক্ষিতে, আমরা বিজ্ঞানাচার্যকে দেওয়া ঠাকুরের ইশারাগুলির দিকেই আর একবার তাকাই। খেয়া-র সেই উৎসর্গ কবিতায় সাঁটে মোদ্দা ২টি কথা বলা হইয়াছে— ১. এইসব কবিতা একদিকে ‘লজ্জাবতী লতা’, ২. অন্যদিকে, ইহাদের ভিতরে রহিয়াছে ‘জীবনমৃত্যু রৌদ্রছায়া ঝটিকার বারতা’। আমাদের এ-যাবৎ আলাপে, কবিতার আমি-র ভিতর নারীসত্তার যে ব্যাপক প্রকাশ খেয়া-তে লক্ষ করিলাম, কবির পহেলা ইশারাটি যে সেইদিকেই, তাহা বোধ করি টের পাওয়া গেল। সেই নব উন্মেষিত নারীকণ্ঠের ব্রীড়ার সহিত হয়তো বা ফোড়নের মতো মিশিয়াছে বঙ্গভঙ্গজনিত সমাজবাস্তবতার প্রতি তাঁহার ঈষৎ টানাপোড়েনজাত সংকোচ। এখন, কবির দোসরা ইশারাটি কী, তাহা আমাদের বুঝিবার কোশেশ করিতে হইবে। কী সেই ঝটিকার বারতা যাহা জীবনমৃত্যুর রৌদ্রছায়া ভেদ করিয়া ছুটিয়া আসিতেছে? উত্তরটি খুঁজিয়া পাইতে কবির দেওয়া এই এজাহার হয়তো আমাদের কিছু সাহারা দিতে পারে—সারা দিনের গন্ধগীতি/ সারা দিনের আলোর স্মৃতি/ নিয়ে এ যে হৃদয়ভারে ধরায় অবনতা—/ আমার লজ্জাবতী লতা। অর্থাৎ বর্তমানের এই অভিব্যক্তির পিছনে কবির পূর্বজীবনের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার অনিবার্য কিছু ভূমিকা রহিয়া গিয়াছে। তাহা হইলে গীতাঞ্জলি  পর্বে গিয়া খেয়া-র কবিতার ব্যাখ্যা না খুঁজিয়া আমাদের পিছনের দিকে হাঁটিতে হইবে। আমি-র এই সত্তা পরিবর্তনে তুমি-র ভূমিকা কিছু আছে কিনা, তুমি-র এই ‘প্রচ্ছন্ন’তার পিছনে আমি-র কোন সংকট ক্রিয়াশীল, ঠাকুরের পুরানো গান ও কবিতার ভিতর তাহার কোনো ইঙ্গিত আছে কিনা, খুঁজিয়া দেখিতে হইবে।


যদি মরণ লভিতে চাও, এসো তবে ঝাঁপ দাও/ সলিল-মাঝে। এই ‘মরণ’ বলা বাহুল্য মিলন প্রস্তাব


রা নাহি দেয় রাধা

খেয়া-র কবিতা প্রসঙ্গে কিছু পূর্বে আমরা বলিলাম বটে ‘নব উন্মেষিত নারীকণ্ঠের’ কথা, কিন্তু বাচ্যার্থে সেকথা সহি না। সেই প্রথম তারুণ্যের ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী-তেই তো ঠাকুর রাধার বয়ানে একাধিক কবিতা লিখিয়াছেন, যাহার ভিতর অনেকগুলি গান হিসাবে আজও বিপুল জনপ্রিয়। পরিণত বয়সে অবশ্য এইগুলি লইয়া তাঁহার মন্তব্য ছিল, ‘ভানুসিংহের সঙ্গে বৈষ্ণবচিত্তের অন্তরঙ্গ আত্মীয়তা নেই’। তবু, কড়ি ও কোমল (প্র. ১২৯৩) কবিতাবহির কিছু কবিতাতেও শ্রীরাধার তরুণী হৃদয়ের আকুলতা আসিয়া ধরা দিয়াছে। যেমন :

১. ওগো, শোনো কে বাজায়!/ বনফুলের মালার গন্ধ বাঁশির তানে মিশে যায়। (বাঁশি)

 

২. ওই বাঁশিস্বর তার আসে বারে বার,/ সেই শুধু কেন আসে না!/ এই হৃদয়-আসন শূন্য যে থাকে,/ কেঁদে মরে শুধু বাসনা। (বিরহ)

 

৩. আর নিয়ে যা রাধার বিরহের ভার,/ কত আর ঢেকে রাখি বল্‌।/ আর পারিস যদি তো আনিস হরিয়ে/ এক ফোঁটা তার আঁখিজল। (বিলাপ)

 

৪. ওগো কে যায় বাঁশরি বাজায়ে!/ আমার ঘরে কেহ নাই যে!/…/ সারা বিভাবরী কার পূজা করি/ যৌবনডালা সাজায়ে! (গান)

 

কবিতা ৪টিই প্রেম-পর্যায়ের গান হিসাবেও বহুশ্রুত। ঠাকুরের প্রথমজীবনের আরও কয়েকটি গানেও আমি-র বাচনে এইভাবে রাধার মতো কোনও বিরহী নারীর কণ্ঠই যেন বাজিয়া উঠে—
১. সখী, ওই বুঝি বাঁশি বাজে— বনমাঝে কি মনমাঝে।/…/ যাব কি যাব না মিছে এ ভাবনা,/ সখী মিছে মরি লোকলাজে। (প্রেম : প্রেম বৈচিত্র্য, ১২৯১) [নলিনী]

 

২. মরি লো মরি, আমায় বাঁশিতে ডেকেছে কে।/…/ শুনেছি কোন্‌ কুঞ্জবনে যমুনাতীরে/ সাঁঝের বেলায় বাজে বাঁশি ধীর সমীরে— (প্রেম : প্রেম বৈচিত্র্য, প্র. বৈশাখ ১২৯১) [প্রকৃতির প্রতিশোধ]

 

৩. সখী, আমারি দুয়ারে কেন আসিল/ নিশিভোরে যোগী ভিখারী।/ …/ তারে ডাকিব কি ফিরাইব তাই ভাবি লো। (প্রেম : প্রেম বৈচিত্র্য, প্র. বৈশাখ ১৩০০)

 

৪. এখনো তারে চোখে দেখি নি, শুধু বাঁশি শুনেছি—/ মন প্রাণ যাহা ছিল দিয়ে ফেলেছি।/ শুনেছি মুরিতি কালো তারে না দেখাই ভালো। (প্রেম : প্রেম বৈচিত্র্য, প্র. বৈশাখ ১৩০০)

 

৫. হিয়া কাঁপিছে সুখে কি দুখে সখী,/ কেন নয়নে আসে বারি।/…/ দেখা হলে সখী সেই প্রাণবঁধূরে কী বলিব নাহি জানি। (প্রেম : প্রেম বৈচিত্র্য, প্র. বৈশাখ ১৩০০)

এই রাধাভাবটিই খেয়া-পূর্ব প্রায় সকল কবিতাবহিতে কিছু কিছু কবিতার আমি-র বয়ানে আরও অনুশীলিতভাবে ইতস্তত ধরা দিয়াছে। এই প্রসঙ্গে মানসী-র ‘ব্যক্ত প্রেম’, ‘গুপ্তপ্রেম’ ও ‘ভালো করে বলে যাও’, সোনার তরী-র ‘ব্যর্থ যৌবন’, ‘প্রত্যাখ্যান’ ও ‘লজ্জা’, চিত্রা-র ‘সান্ত্বনা’, ‘গৃহশত্রু’ ও ‘উৎসব’, কল্পনা-র ‘মার্জনা’, ‘স্পর্ধা’, ‘ভ্রষ্ট লগ্ন’, ‘প্রণয় প্রশ্ন’, ‘ভিখারী’, ‘লজ্জিতা’ ও ‘সকরুণা’, ক্ষণিকা-র ‘বিরহ’ ইত্যাদি কবিতার উল্লেখ করা যায়। প্রচ্ছন্ন বা শনাক্তযোগ্যভাবে নারীসত্তাই এইসব কবিতার প্রথম পুরুষে কথা বলিয়াছে। অবশ্য শত শত কবিতার ভিতর মাত্রই এই কয়েকটি কবিতাকে কবির দিক হইতে প্রস্বরের এক ধরনের বৈচিত্র্য সৃষ্টির প্রয়াস বলিয়া নন্দিত করিয়া ছাড়িয়া দেওয়া যায়। শিল্পনৈপুণ্যের নমুনা ছাড়াও, কবিমনের স্থিতিস্থাপকতার নজির হিসাবেও কবিতাগুলিকে আমরা গণ্য করিতে পারি। যে-স্থিতিস্থাপকতার বশে, মন তাহার নিভৃতে বিভিন্ন সত্তার জন্য প্রয়োজন মাফিক কামরা তৈয়ার করিয়া লইতে পারে। যেকোনও কামরার দরোজা খুশিমতো খোলা-বন্ধ করিতে পারে। দরকারে মাঝের দরোজা খুলিয়া এঘর-ওঘরও করিতে পারে।

উপরের ওই সামান্য কয়টি কবিতা বাদ দিলে, বহিগুলির অপর সব কবিতায় এক পুরুষসত্তাই প্রথম পুরুষে কথা বলিবে, ইহাই তো প্রত্যাশিত। ঠিক তাহা অবশ্য ঘটে নাই। একটি নিরপেক্ষ সত্তা, যাহাকে কবিসত্তা বলা যায়, তাহার উপস্থিতি রসনিষ্পত্তির একটি ভারসাম্যে পৌঁছাইতে আমাদের বিলকুল সাহায্য করিয়াছে। এখন এই পুরুষসত্তা ও কবিসত্তার বিভিন্ন বয়ানের ভিতর দিয়া একটি সংক্ষিপ্ত সফর আমাদের সারিয়া লইতে হইবে, যাহাতে তাহাদের সংকট ও সংকল্পগুলি আমরা কিছুদূর স্পর্শ করিতে পারি। আমি ও তুমি-র কোন টানাপোড়েন অতিক্রম করিয়া কবি খেয়া-তে আসিয়া পঁহুছিলেন, তাহা কিছুদূর টের পাইতে পারি।

এযাবৎ উল্লেখিত গান-কবিতাগুলিতে একতরফাভাবে রাধারই অন্তর্বেদনার প্রকাশ ঘটিতে দেখি। কড়ি ও কোমল-এর মথুরায় কবিতায় পাই কৃষ্ণ-র বয়ান— একবার রাধে রাধে ডাক্‌ বাঁশি মনোসাধে। কিন্তু অকুস্থল তো বৃন্দাবন নয়, মথুরা। তাই বাঁশি আর বাজে না। কৃষ্ণকে তাই আক্ষেপ করিতে হয়— বাঁশরি বাজাতে চাহি, বাঁশরি বাজিল কই? অন্যদিকে ‘গীতোচ্ছ্বাস’ কবিতার কথক, বহুদিনের নীরবতা ভাঙিয়া বাজিয়া ওঠা বাঁশির সুরে তাহার প্রিয়ার বার্তা শুনিতে পায়। এই কবিতাবহির বেশ কিছু কবিতায় তীব্র শরীরী প্রেমের প্রকাশ লক্ষ করা যায়। স্তন, চুম্বন, বিবসনা, বাহু, দেহের মিলন, তনু ইত্যাদি সেই শারীরিক কবিতাবলি স্বাভাবিকভাবেই পুরুষের দৃষ্টিতে বিবৃত। জনশ্রুতি, দেহিপদপল্লবমুদারম্‌ শব্দবন্ধ ব্যবহারে নাকি কবি জয়দেব প্রাথমিকভাবে কিছু দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। ঠাকুর কিন্তু এই তরঙ্গেরই একটি কবিতায় অকুণ্ঠিতভাবে প্রস্তাব দিয়াছেন— দুখানি চরণ পড়ে ধরণীর গায়—/দুখানি অলস রাঙা কোমল চরণ।/ …/ হোথা যে নিঠুর মাটি, শুষ্ক ধরাতল—/এসো গো হৃদয়ে এসো, ঝুরিছে হেথায়/ লাজরক্ত লালসার রাঙা শতদল (চরণ)। অপর এক কবিতার পুরুষসত্তা কোনও রাখঢাক না করিয়াই যে তীব্রতার সাথে তাহার শরীরী আর্তি প্রকাশ করিয়াছে, তাহা হয়তো চমকপ্রদ। কিন্তু আরও লক্ষণীয় হইল,তাহার তরফে নায়িকার কাছে অতিরিক্ত সক্রিয়তার দাবি পেশ করিবার উচ্চারণের মনস্তত্ত্বটি—

নিশিদিন কাঁদি সখী মিলনের তরে
যে মিলন ক্ষুধাতুর মৃত্যুর মতন।
লও লও বেঁধে লও কেড়ে লও মোরে—
লও লজ্জা, লও বস্ত্র, লও আবরণ।           —পূর্ণ মিলন

মানসী-তে (১২৯৭) আসিয়া কবি স্বাভাবিকভাবেই অনেক পরিণত। পুরুষসত্তার পাশাপাশি এখানে কায়েম হইয়াছে এক নিরপেক্ষ কবিসত্তাও। কবির সেই নৈর্ব্যক্তিক ভাষ্যে বিবৃত হইতে শুনি প্রেমের পরিণতি লইয়া নারী ও পুরুষের বিভিন্ন বয়ান। প্রণয়পর্বের প্রথম ধাক্কা সামলাইবার পর পুরুষের তত্ত্বায়িত উপলব্ধি— মৃৎপিণ্ড পড়িয়া আছে,/ দেবতারে ভেঙে ভেঙে করেছি খেলনা, বা, কেন তুমি মূর্তি হয়ে এলে,/ রহিলে না ধ্যান-ধারণার! কাণ্ডজ্ঞানের প্ররোচনায় সে এইবার প্রেম হইতে পূজাকে আলাহিদা করিয়া লইতে চায়—

প্রাণ দিয়ে সেই দেবীপূজা
চেয়ো না চেয়ো না তবে আর।
এসো থাকি দুইজনে সুখে দুঃখে গৃহকোণে,
দেবতার তরে থাক্‌ পুষ্প-অর্ঘ্যভার

 

—পুরুষের উক্তি, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৮৮৭

নারী কিন্তু পুরুষের এই প্রতারণার তত্ত্বকে তাহার সহজ ভাষায় তর্জমা করিয়া লয়— এখন হয়েছে বহু কাজ,/ সতত রয়েছ অন্যমনে।/ সর্বত্র ছিলাম আমি—/ এখন এসেছি নামি/ হৃদয়ের প্রান্তদেশে ক্ষুদ্র গৃহকোণে (নারীর উক্তি, ২১ অগ্রহায়ণ ১৮৮৭)।

11008902_919834884728300_1479851929_n
রবীন্দ্রনাথের আঁকা নারী প্রতিকৃতি-১

কবিসত্তার এইসব নৈর্ব্যক্তিক অবলোকনের বাহিরে মাটি-পৃথিবীর পুরুষটি অবশ্য নারীপূজার বিষয়ে অমন নির্লিপ্ত থাকিতে পারে না। স্বভাবধর্ম অনুযায়ী নারীর কাছে হার মানিয়াই তাহার স্বস্তি— আমি মনে করি যাই দূরে,/ তুমি রয়েছ বিশ্ব জুড়ে।/ যত দূরে যাই ততই তোমার/ কাছাকাছি ফিরি ঘুরে (আত্মসমর্পণ, ১১ ভাদ্র ১৮৮৯)। তবে, একদা ‘ক্ষুধাতুর মৃত্যুর মতন’ যে মিলনের জন্য মন ছিল সতত উদ্‌গ্রীব, আজ সেই শরীরী অভিজ্ঞতার বিবরণে লাগিয়াছে শিল্পীর টান— মরণ যেন অকালে আসি/ দিয়েছে সব বাঁধন নাশি,/ ত্বরিতে যেন গিয়েছি দোঁহে/ জগৎ-পরপার (অপেক্ষা, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৮৮৮)। সেই শিল্পীই স্থানকালের বহুদূর হইতে আজিকার বর্ষাদিনের ভিতর দিয়া ‘পাগলিনী রাধিকা’র উন্মত্ত অভিসার ও চিরন্তন বিরহবেদনার ছবিটি মনে মনে অনুভব করে। অনুভব করে— আজও আছে বৃন্দাবন মানবের মনে/ …/ এখনো কাঁদিছে রাধা হৃদয়কুটীরে (একাল ও সেকাল, ২১ বৈশাখ ১৮৮৮)।

রাধার এই ‘চিত্তদীর্ণ তীব্র ব্যাকুলতা’র ভিতরদিয়া যে এক চিরকালীন মর্ত্যমানবীর অন্তর্বেদনাই ঠিকরাইয়া পড়িতেছে, বৈষ্ণবকবিতা যে নিছক দেবলীলা নয়, তাহার উপজীব্য যে নিতান্ত লৌকিক ‘প্রতিরজনীর আর প্রতিদিবসের তপ্ত প্রেমতৃষা’, এই প্রস্তাবটি সোনার তরী-তে (১২৯৮-১৩০০) পঁহুছিয়া যেন আরও বিশদভাবে উঠিয়া আসিল। ঠাকুর বলিয়া লইলেন—

দেবতারে যাহা দিতে পারি, দিই তাই
প্রিয়জনে—প্রিয়জনে যাহা দিতে পাই,
তাই দিই দেবতারে; আর পাব কোথা!
দেবতারে প্রিয় করি, প্রিয়েরে দেবতা।

 

—বৈষ্ণবকবিতা, ১৮আষাঢ়১২৯৯

ভাটিয়ালি গানের লোকায়ত রাধা গাহিয়াছিল— আমি কী হেরিলাম জলে গো নবীন কালিয়া রূপ। আর দ্বিজ কানাইয়ের বাইদ্যা কইন্যা মহুয়া পালায় নায়িকার উদ্দেশে নায়ক বলিয়াছিল— তুমি হও গহিন গাঙ আমি ডুইব্যা মরি। সেই অভিমুখকে উল্টাইয়া ধরিয়া, ঠাকুরের এক কবিতার নায়ক নিজের ‘হৃদয়-যমুনা’টি নায়িকার সামনে মেলিয়া ধরিল, আর উস্কানি দিল— যদি মরণ লভিতে চাও, এসো তবে ঝাঁপ দাও/ সলিল-মাঝে। এই ‘মরণ’ বলা বাহুল্য মিলন প্রস্তাব, তাই— নীলাম্বরে কিবা কাজ, তীরে ফেলে এসো আজ,/ ঢেকে দিবে সব লাজ সুনীল জলে (হৃদয়-যমুনা, ১২ আষাঢ় ১৩০০)। ইহাও একভাবে নায়িকার কাছে কিছু বাড়তি সক্রিয়তার-সপ্রতিভতার প্রত্যাশা।

ইহা তো গেল পুরুষসত্তার প্রতিক্রিয়া। সোনার তরী-র কবিসত্তার কতগুলি মৌল উপলব্ধি ঠাকুরের পরবর্তী কবিতাজীবনের হদিশ পাওয়ার জন্য খুবই জরুরি আলোথামের মতো জাগিয়া আছে। সেগুলিকে খুব সাঁটে চিহ্নিত করিতে চাহিলে এইভাবে বলা যায়—

১. ছিলে খেলার সঙ্গিনী,/ এখন হয়েছ মোর মর্মের গেহিনী,/ জীবনের অধিষ্ঠাত্রী দেবী।
—মানসসুন্দরী, ৪ পৌষ ১২৯৯

 

২. স্বপ্ন টুটিয়া বাহিরেছে আজ,/ দুটো পাগল।/ দে দোল্‌ দোল্‌।
—ঝুলন, ১৫ চৈত্র ১২৯৯

 

৩. আর কতদূরে নিয়ে যাবে মোরে/ হে সুন্দরী?/ বলো কোন্‌ পারে ভিড়িবে তোমার/ সোনার তরী।
—নিরুদ্দেশ যাত্রা, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৩০০

তুমি এই পৃথিবীর প্রতিবেশিনীর মেয়ে—কবিতাকে তবে এইভাবেও কল্পনা করা যায়! স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ এবং ‘ভঙ্গবঙ্গীয়’ তাঁহাদের উত্তরসাধকেরা বাংলা কবিতাকে আজ ইস্তক যে-অবধি টানিয়া আনিয়াছেন, তাহার পর্যবেক্ষণ মিনারের টঙে দাঁড়াইলেও ইহাকে এক অপরিসীম চিত্রকল্প বলিয়া মনে হয়। সেই ‘কবিতা, কল্পনালতা’ই হইল কবির বুনিয়াদি মানসসুন্দরী। পরে, জন্মান্তরের কল্পনায়, কবিতার সাথে রক্তমাংসের মানবী একাকার হইয়া গিয়াছে— মিলনে আছিলে বাধা শুধু এক ঠাঁই, বিরহে টুটিয়া বাধা আজি বিশ্বময় ব্যপ্ত হয়ে গেছ। ‘ঝুলন’ কবিতায় কবি নিজেরই এক অপর সত্তার উন্মোচনে ‘ভাবে বিভোল’। সেই অপর সত্তাই আমি-র কাছে তাহার বধূ এবং প্রিয়া। অন্যদিকে ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’র ‘সুন্দরী’, বিমূর্ততার এক চূড়ান্ত নান্দনিক নির্মাণ। একজন সৃজনশীল মানুষের সামনে তাহার শিল্পজীবনের রোমাঞ্চকর অনিশ্চয়তায় ভরা সফরের দিগ্‌দর্শনধারী কেউ কি থাকে? মানবীমূর্তির আভাসে বুঝি কবিই তাহাকে বানাইয়া তুলেন। সেই ‘মধুরহাসিনী’ই তখন সমগ্র যাত্রাপথের নির্বাক নিয়ন্ত্রী হইয়া উঠে। তাহাকে যতই পুছা যাক—চলেছি কিসের অন্বেষণে, সে শুধু নীরবে হাসিতেই থাকে। কোনো রা কাড়ে না।


বারবার নতুনতর সৃজনশীলতার উন্মাদনায় জড়াইয়া পড়ার অদম্য আকাঙ্ক্ষার যে নাট্য ঠাকুরের শিল্পীসত্তার একটি মৌল উপাদান, তাহার উদ্দীপন হইয়া অতঃপর এই বহিতে নাজেল হইল ‘জীবনদেবতা’।


রে মোহিনী, রে নিষ্ঠুরা

১৩০৬ সাল অবধি রবীন্দ্রনাথের পূজার গান বলিতে ব্রহ্মসংগীত, আর ব্রহ্মসংগীত বলিতে ব্রাহ্মসমাজের ধর্মীয় নানান অনুষ্ঠান-উৎসব (মুখ্যত মাঘোৎসব) উপলক্ষে রচিত গান। অর্থাৎ তখনও অবধি এগুলি মুখ্যত এক ধরনের সামাজিক সংগীত। তখনও পর্যন্ত কবির ব্যক্তিগত রচনার ক্ষেত্র কবিতা, আর কবিতার সহিত এইসব ব্রহ্মগান কোনও সাংঘর্ষিক বা লেনদেনিক জায়গায় খাড়া হয় নাই। এই সময়কালে রচিত কিছু কম-৫০০ গানের ভিতর ব্রহ্মসংগীতের সংখ্যা প্রায় ২০০। কড়ি ও কোমল হইতে ক্ষণিকা  পর্যন্ত কবিতাবহিগুলির কবিতায় সুর-লাগানো প্রায় আধা শতেক গানের ভিতর মাত্র ৩টি বাদে কোনওটিই ব্রহ্মসংগীত হইয়া ওঠে নাই। সেগুলিও কল্পনা-র শেষ ৩টি কবিতা, যাহারা ১৩০৬-এর মাঘোৎসবে গীত হইয়াছিল। দিগন্তে তখন নৈবেদ্য  আসন্ন হইয়া উঠিয়াছে।

তৎকালীন ব্রহ্মসংগীতগুলিকে সামাজিক গান বলিবার অর্থ এই নয় যে, তাহাদের কথকের ভিতর ব্যক্তির মুখচ্ছবি কখনও ভাসিয়া ওঠে না বা ব্যক্তির আত্মিক সংকট সেখানে কখনই ভাষা পায় না। জীবনের আদিতম বিপর্যয়ের অন্তর্বেদনা যেমন অদ্ভুতভাবে মিশিয়া গিয়াছিল জোড়াসাঁকোর বাড়িতে অনুষ্ঠিত ৩ ব্রাহ্মসমাজের সম্মিলনে (৯ মাঘ ১২৯১) গাওয়া ঠাকুরের এই গানে— মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না। বা, পরবর্তী মাঘোৎসবের এই গানগুলিতে– কেন, জাগে না জাগে না অবশ পরান–/ নিশিদিন অচেতন ধূলিশয়ান (১২৯২), বা, আমার যা আছে আমি সকল দিতে পারি নি তোমারে নাথ (১২৯৩) ইত্যাদি। তবু, উল্লেখিত সময়কালের ব্রহ্মসংগীতে আমি-র স্বরপ্রক্ষেপ সময়মাফিক সামাজিক। সেখানে তুমি-র স্বরূপেও কোনও জটিলতা নাই। যে-জটিলতা আমরা ‘মানসসুন্দরী’ বা ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’য় দেখিলাম।

চিত্রা  কবিতাবহিতে (১৩০০-১৩০২) আসিয়া এই তুমি আরও বহুমাত্রিক হইয়া উঠিয়াছে— জগতের মাঝে কত বিচিত্র তুমি হে/ তুমি বিচিত্ররূপিনী/…/ অন্তর-মাঝে তুমি শুধু একা একাকী/ তুমি অন্তরবাসিনী (চিত্রা, ১৮ অগ্রহায়ণ ১৩০২)। এই তুমি একদিকে কৌতুকময়ী ও মায়াবিনী, অন্যদিকে ‘আমার প্রেয়সী, আমার দেবতা, আমার বিশ্বরূপী’(অন্তর্যামী, ভাদ্র ১৩০১)। এই তুমিই সেই দেবী যাহার কাছে নিজের সার্থকতা-ব্যর্থতা উজাড় করিয়া দেওয়া যায়—

তবু ওগো, দেবী, নিশিদিন করি পরানপণ,

যা কিছু আমার আছে আপনার শ্রেষ্ঠ ধন
দিতেছি চরণে আসি—
অকৃত কার্য, অকথিত বাণী, অগীত গান,
বিফল বাসনারাশি।                            —সাধনা, ৪ কার্তিক ১৩০১

সকল তৎপরতা লইয়া চির-অতৃপ্তির এই বোধ এবং বারবার নতুনতর সৃজনশীলতার উন্মাদনায় জড়াইয়া পড়ার অদম্য আকাঙ্ক্ষার যে নাট্য ঠাকুরের শিল্পীসত্তার একটি মৌল উপাদান, তাহার উদ্দীপন হইয়া অতঃপর এই বহিতে নাজেল হইল ‘জীবনদেবতা’। গত শতাধিক বছর ধরিয়া যাহাকে লইয়া এলেমদারদের ভিতর তর্ক-বাহাসের পরিসীমা নাই। আমাদের নতুন করিয়া সেই কাজিয়ায় ঢুকিয়া কাম নাই। ২/১টি কথা শুধু লক্ষ করিব। ‘চিত্রা’ কবিতার অন্তরবাসিনী, অন্তর্যামী কবিতার প্রেয়সী ও দেবতা, ‘সাধনা’র দেবী—ইহারা সকলেই নারীমূর্তিধারী। আর, তাহাদের সহিত কথনরত আমি-ও একজন ব্যত্যয়হীন পুরুষ। কিন্তু জীবনদেবতা কবিতার অন্তরতম, জীবননাথ বা প্রাণেশ, যাহার উদ্দেশে আমি-র এই নয়া বিবাহপ্রস্তাব, তাহার স্বরূপ কী?

নূতন করিয়া লহো আরবার
চিরপুরাতন মোরে।
নূতন বিবাহে বাঁধিবে আমায়
নবীন জীবন-ডোরে।           —জীবনদেবতা, ২৯ মাঘ ১৩০২

সেই জীবনদেবতা, পুরুষ নাকি নারী! অপরূপ এক জাদুবাস্তবের কবিতা ‘সিন্ধুপারে’-তে আসিয়া আমাদের এই ধন্দ মেটে। কালো ঘোড়ায় চড়িয়া অবগুণ্ঠিতা এক নারী সেই কবিতায়, রাত্রির অন্ধকারে কবিকে গ্রেফতার করিয়া লইয়া যায় অজানা সমুদ্রতীরের অজানা পাহাড়ি গুহায়। চেরাগি আলোকে উজ্জ্বল সেই গুহার ভিতরে সাজানো গোছানো কামরা। পুরোহিত আসিয়া সেখানে কবির সহিত সেই নারীর বিবাহ দিল । কিন্তু নারীর পরিচয় তো এখনও অজানা। কবি যখন নিরুপায়ভাবে বলিলেন— ‘সব দেখিলাম তোমারে দেখি নি শুধু’, তখনই ঘটিল সেই আশ্চর্য কাণ্ড—

সুধীরে রমণী দু-বাহু তুলিয়া, অবগুণ্ঠনখানি
উঠায়ে ধরিয়া মধুর হাসিল মুখে না কহিয়া বাণী।
চকিত নয়ানে হেরি মুখপানে পড়িনু চরণতলে,
‘এখানেও তুমি জীবনদেবতা!’ কহিনু নয়নজলে।
সেই মধুমুখ, সেই মৃদুহাসি, সেই সুধাভরা আঁখি—
চিরদিন মোরে হাসাল কাঁদাল, চিরদিন দিল ফাঁকি।

 

—সিন্ধুপারে, ২০ ফাল্গুন ১৩০২

বোঝা যায়, গুহার ভিতরের এই বিবাহটি, ‘জীবনদেবতা’ কবিতায় প্রস্তাবিত সেই নয়া-বিবাহ। যাহা শুধু জাদুবাস্তবেই সম্ভব। কাজেই, জীবনদেবতা যে ব্রহ্মসংগীতের তুমি নয়, একথা বোধ হয় ঝুঁকি না লইয়াই বলা যায়। খেয়াল করিতে পারি, এই বহির ‘নীরবতন্ত্রী’ কবিতার ‘ভবনদীতীরে হৃদিমন্দিরে’র দেবতাও এক দেবী, যাহাকে বীণকার তাহার বীণার একটি মাত্র সোনার তার অর্ঘ্য দিয়া আসিয়াছে।

এইভাবে, অন্তরবাসিনী, অন্তর্যামী, প্রেয়সী, দেবী, জীবনদেবতা বা অবগুণ্ঠনে ঢাকা ‘অজানিত বধূ’—সব মিলাইয়া নানা কিসিমের তুমি-র এক অপূর্ব আরক হইয়া উঠিয়াছে চিত্রা-র তুমি। ঠাকুরের আপন সাক্ষ্য হইল এই তুমি, আমি-র’ই ‘একটি যুগ্মসত্তা’, ‘এ যেন অর্ধনারীশ্বরের মতো ভাবখানা’। এই ব্যাখ্যা, অবশ্য কবিতারচনার প্রায় সাড়ে চার দশক পরবর্তী। চৈতালি-তে (১৩০২-০৩) আবার নারীকে ‘অর্ধেক মানবী তুমি অর্ধেক কল্পনা’ (মানসী, ২৮ চৈত্র ১৩০২) বলা হইয়াছে। একই দিনের অপর কবিতাতেও বলা হইয়াছে ‘তুমি এ মনের সৃষ্টি’। সেই সূত্রে প্রেম ও পূজার একটি সমীকরণও ফাঁস করা হইয়াছে—

মনের অনন্ত তৃষ্ণা মরে বিশ্ব ঘুরি
মিশায় তোমার সাথে নিখিল মাধুরী।
তার পরে মনগড়া দেবতারে, মন
ইহকাল পরকাল করে সমর্পণ।         —নারী, ২৮ চৈত্র ১৩০২

অর্থাৎ, নারীই সেই আরাধ্য দেবতা। প্রেম ও পূজার ভিতর আসলেই তখনও কোনও দ্বন্দ্ব নাই। কারণ— যারে বলে ভালোবাসা, তারে বলে পূজা। সেই হৃদয়ানুভূতির আলোতেই সারা পৃথিবী আলোকিত হইয়া ওঠে— তুমি এলে আগে আগে দীপ লয়ে করে,/ তব পাছে পাছে বিশ্ব পশিল অন্তরে (প্রিয়া, ২৮ চৈত্র ১৩০২)। প্রিয়নারীই হইয়া ওঠে বিশ্বসৃষ্টির আধার— নিত্যকাল মহাপ্রেমে বসি বিশ্বভূপ/ তোমা-মাঝে হেরিছেন আত্মপ্রতিরূপ (ধ্যান, ২৮ চৈত্র ১৩০২)। আদিপ্রণয়ের অনুধ্যান তাই বিরহবেদনায় বড় অনায়াসে কবিকে ছাইয়া থাকে— চলে গেছে মোর বীণাপাণি/ কতদিন হল সে না জানি (গীতহীন, ১৩ চৈত্র ১৩০২)। স্বপ্নের ভিতর আজও সে ফিরিয়া ফিরিয়া আসে— সে শুধু আকুল চোখে নীরবে গভীর শোকে/ শুধাইল, “কী হয়েছে তোর?”/ কী বলিতে গিয়ে প্রাণ ফেটে হল শতখান/ তখনি ভাঙিল ঘুমঘোর (স্বপ্ন, ১৪ চৈত্র ১৩০২)। একদিন মানুষটি সর্বস্ব ছাইয়া ছিল। আজ চারিদিকে শুধু তাহার না-থাকার চারণ— আজি সে অনন্ত বিশ্বে আছে কোন্‌খানে/ তাই ভাবিতেছি বসি সজল নয়ানে (স্মৃতি, ৭ শ্রাবণ ১৩০৩)। আজ তাহার না-থাকাটাই সর্বব্যাপ্ত—

আঁখি তার কহে যেন মোর মুখে চাহি,
‘আজ প্রাতে সব পাখি উঠিয়াছে গাহি—
শুধু মোর কণ্ঠস্বর এ প্রভাতবায়ে
অনন্ত জগৎ-মাঝে গিয়েছে হারায়ে।’       —বিলয়, ৭ শ্রাবণ ১৩০৩

কিন্তু ঠাকুর কি এই ‘জীবনের জ্বর’ হইতে নিষ্কৃতি চান? বাংলার একটি শতক শেষ হইয়া নতুন শতক শুরু হইয়া গিয়াছে। ৪০-এর দরজার কাছাকাছি পঁহুছিয়া তিনিও যেন জীবনের এক নতুন পর্যায়ের আসন্নতাটিকে আলতো অনুভব করিতেছেন। যদিও ক্লান্তি আসিছে অঙ্গে নামিয়া, তবু, কল্পনা (১৩০৪-০৮) কবিতাবহির প্রথম কবিতাতেইকবি— আছে শুধু পাখা, আছে মহা নভ-অঙ্গন (দুঃসময়, ১৫ বৈশাখ ১৩০৪), বলিয়া, ভিতরে ভিতরে সেই নতুন সময়ের জন্য তৈয়ার হইয়া উঠিতেছেন। বিরতিহীনভাবে নানারকম গান ও কবিতাও লিখিয়া চলিতেছেন। কখনও চলনবিলে ঝড়ের ভিতর টলমল বোটে বসিয়া গান বাঁধিতেছেন— যদি বারণ কর, তবে গাহিব না (সংকোচ, ৯ আশ্বিন ১৩০৪)। কখনও আবার জোড়াসাঁকোর বাড়িতে আমন্ত্রিত কংগ্রেস নেতাদের সামনে গাহিতেছেন সদ্যরচা— অয়ি ভুবনমনমোহিনী (ভারতলক্ষ্মী,পৌষ ১৩০৪)। প্রসঙ্গত, উপস্থিত নেতাদের ভিতর সদ্য দক্ষিণ আফ্রিকা-ফিরত ব্যারিস্টার গান্ধিও রহিয়াছেন। এহেন সময় সেই পুরাতন কণ্ঠে– আবার আহ্বান? সেই ডাক শুনিয়া কবির প্রাথমিক প্রতিক্রিয়াটি কি একটু বেশি তীব্র হইয়া গেল?

রে মোহিনী, রে নিষ্ঠুরা   ওরে রক্তলোভাতুরা
কঠোর স্বামিনী,
দিন মোর দিনু তোরে     শেষে নিতে চাস হ’রে
আমার যামিনী?

 

—অশেষ, ২৫ বৈশাখ ১৩০৬

শেষ পর্যন্ত অবশ্য কবিকেই হার মানিতে হইল— আবার চলিনু ফিরে বহি ক্লান্ত নতশিরে/ তোমার আহ্বান। এবং সেটি কোনও নিমরাজি প্রত্যাবর্তনও থাকে না শেষ পর্যন্ত, যেন বাংলা কবিতারই এক জয়যাত্রায় পরিণত হয় সেই চলা। তুমি-ও জটিলতর হইয়া ওঠে কেবলই।

কিন্তু কাহিনিতে ইতোমধ্যে কিছু অন্য মোচড়ও আসিয়া হাজির। ১৩০৫ সালের ৩০ চৈত্র ঝড়ের দিন রচিত ‘বর্ষশেষ’ কবিতায় ‘আনন্দে আতঙ্কে মিশি, ক্রন্দনে উল্লাসে গরজিয়া/ মত্ত হাহারবে’ যেন সেই ‘নূতন’ সহসা এক ঝলক মুখ বাড়াইল। ‘শুধু দিনযাপনের শুধু প্রাণধারণের গ্লানি’র ধারাবাহিক অসহতা হইতে সে কি কোনও অভাবিত মুক্তি আনিয়া দিবে? কবির ইচ্ছা, সে একবার ‘বজ্রের আলোতে’ কবিকে ‘মহান মৃত্যুর সাথে মুখোমুখি’ করিয়া দিক। ‘তার পরে ফেলে দাও, চূর্ণ করো, যাহা ইচ্ছা তব’। এই আর এক নতুন তুমি-র সাক্ষাৎ পাইলাম আমরা। যেটি খেয়াল করিবার, এই অন্য-তুমির কাছে আরও বহু কিছুর সাথে ঠাকুর তাঁহার ‘হৃদয়ের মুখে’ এমন একটি ‘ফুৎকার’ চাহিয়াছেন, যাহাতে তাহা শঙ্খের মতো ‘মঙ্গলনির্ঘোষ’ করিয়া উঠে। যাহাতে ‘জাগ্রত চিত্তে মুনিসম উলঙ্গ নির্মল কঠিন সন্তোষ’ জাগিয়া উঠে। সেই শঙ্খের ‘পূর্ণ উদাত্ত ধ্বনি বেদগাথা সামমন্ত্র-সম/ সরল গম্ভীর’। এমন ফুৎকার তো মানসসুন্দরী, অন্তরবাসিনী, অন্তর্যামী বা জীবনদেবতার কাছে কখনও চাওয়া হয় নাই! তবে কি ব্রহ্মসংগীতের তুমি এতদিনে কবিতার পৃষ্ঠায় তাহার গ্রীবা বাড়াইতেছে? কবিতা হইতে রূপান্তরিত গানের মধ্যে এই প্রথম কল্পনা-র ৩টি কবিতাকে তাই কি ব্রহ্মসংগীত হিসাবে পাইলাম?


সামাজিক অনুশাসক এবং ত্রাতা একজন ঈশ্বর, কাঠামোবন্দি ও অনুপার্জিত একজন ঈশ্বর, ইহার বদলে, ঠাকুরের কবিতাজীবনে এইবার যেই একজন ব্যক্তিগত ঈশ্বরের প্রয়োজন দেখা দিল, সংগীতের অনিবারিত ঊর্মিমালা আসিয়া সেই অস্পর্শিত ভূখণ্ডের উপর লাফাইয়া পড়িল


একলা থাকার সার্থকতা

নৈবেদ্য-র ১০০টি কবিতার ভিতর ৯০টিই ১৩০৭ সালের পৌষের মাঝামাঝি হইতে ফাল্গুনের মাঝামাঝি, এই ২ মাসে রচিত। ইত্যবসরে ঠাকুর ভারতী পত্রিকায় চিরকুমার-সভা  উপন্যাস আকারে লিখিয়া চলিয়াছেন (বৈশাখ ১৩০৭-জ্যৈষ্ঠ ১৩০৮)। পাশাপাশি রচিত হইয়াছে ক্ষণিকা-র কবিতাগুলি। নৈবেদ্য-র দৃঢ় স্তবকবন্ধে ধ্যানস্থ হইবার আগে, ক্ষণিকা-র স্বাদু চাঞ্চল্য যেন শীতঘুমে যাইবার আগে মহানাগের আনন্দনৃত্য। কিন্তু বাচনের সেই চপলতা অনেক জায়গায় যেন গভীরতর কোনও বোঝাপড়ার ছদ্ম-আবরণ মাত্র।

বুকভাঙা বোঝা নেব না রে আর তুলিয়া,
ভুলিবার যাহা একেবারে যাব ভুলিয়া,
যাঁর বেড়ি তাঁরে ভাঙা বেড়িগুলি ফিরায়ে
বহুদিন পরে মাথা তুলে আজ
উঠেছি।
এতদিন পরে ছুটি আজ ছুটি
মন ফেলে তাই ছুটেছি।

 

—উদাসীন

কোন্‌ বুকভাঙা বোঝা বহন না করিবার খুশিতে এমন ছুটির নেশা জাগিতেছে কবির মনে? কাহার বেড়ি ভাঙিয়া কাহাকে ফিরাইয়া দিতেছেন আজ? এই বেড়ি নিশ্চয় ঈশ্বরের নয়। তবে কাহার! পুরানো সব বন্ধনগুলি হইতে এইভাবে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করিয়া লইবার অভিমান হইতেই হয়তো এমন এক স্বগতোক্তির জন্ম— তোমার থাকুক পরিপূর্ণ/ একলা থাকার সার্থকতা (শেষ হিসাব)। কিন্তু সেই স্বেচ্ছা-একাকীত্বের ভিতরেও সহসা একদিন এক দুর্যোগের বাদল সকালে তুমি আসিয়া হাজির— এতদিন পরে তুমি যে এসেছ/ কী জানি কী ভাবি মনে (দুর্দিন, ১ আষাঢ় ১৩০৭)। তুমি-র ফুলের সাজি আজ শূন্য। গাছের ফুলগুলিও সব ঝরিয়া পড়িয়া আছে ভিজা মাটিতে। আমি-কে বলিতেই হয়— তবু ক্ষণকাল রহো ত্বরাহীন,/ ছিন্ন কুসুম পঙ্কে মলিন/ ভূতল হইতে যতনে তুলিয়া/ ধুয়ে ধুয়ে দিব তাই। এই সাক্ষাৎকারের অভিঘাত অবশ্য মাত্র একদিনে থামিয়া থাকে না। যেন বহুদিনের প্রতীক্ষার অবসানে আমি-র আবেগের বাঁধ ভাঙিয়া যায়— বহুদিন হল কোন্‌ ফাল্গুনে/ ছিনু আমি তব ভরসায়;/ এলে তুমি ঘন বরষায়।/…/ আমার পরানে যে গান বাজাবে/ সে গান তোমার করো সায় (আবির্ভাব, ১০ আষাঢ় ১৩০৭)। কিন্তু আগে-দেখা তুমি-র ‘সেই ক্ষণিকা মূরতি’ আজ আর নাই। সেই বিগত ফাল্গুনে আমি-র গাঁথা ‘যত ফুলহার’, সবই আজ তুমি-র উপহার হিসাবে তুচ্ছ বোধ হইতেছে। তুমি-র চলার পথে আপনা হইতেই যে-স্তবগান বাজিয়া উঠে, আমি বুঝিতে পারে তাহার ‘ছোটো বীণার ক্ষীণ তার’ আজও সেই সুর বাজাইতে শিখে নাই। তাই আমি-র এই মর্মান্তিক উপলব্ধি—

কে জানিত মোরে এত দিবে লাজ?
তোমার যোগ্য করি নাই সাজ,
বাসর-ঘরের দুয়ারে করালে
পূজার অর্ঘ্য বিরচন—
এ কী রূপে দিলে দরশন।

যথাযোগ্য আয়োজনের অভাবের জন্য ক্ষমা চাহিয়াও তুমি-র চোখের আলোয় ‘বেতসের বাঁশি’-র মতো বাজিয়া উঠিতে চায় আবির্ভাব কবিতার এই আমি। ‘ক্ষণিকের পাতার কুটীরে/ প্রদীপ-আলোকে’ তুমি-কে ডাকিয়া লইয়া পূজার ভিতর দিয়া এইভাবে আমি প্রেমের অনুভবেই পৌঁছাইতে চায়। হয়তো তাই এই কবিতাবহির পরিসমাপ্তিটি ঘটে বিপরীত এক পটভূমিতে। সেখানে সারা দিনের সকল পথের শেষে আমি দেখে ‘তোমার নীরব নিভৃত ভবনে/ জানি না কখন পশিনু কেমনে’। অবাক আমি আরও লক্ষ করে যে, তাহার প্রাণ ‘নূতন গানের রবে’ বাজিয়া উঠিয়াছে। সেখানে তুমি-র তৎপরতাও আমি-কে বিহ্বল করিবার পক্ষে যথেষ্ট—

রুধিয়া দিয়েছ তব বাতায়ন,
বিছানো রয়েছে শীতল শয়ন,
তোমার সন্ধ্যাপ্রদীপ-আলোকে
তুমি আর আমি একা।              —সমাপ্তি

কামরার জানালাটিও বন্ধ। বিছানো রহিয়াছে শীতল শয্যা। জ্বলিতেছে শুধু একটি নিভৃত প্রদীপ। তুমি আর আমি সম্পূর্ণ একাকী। কিন্তু নানা সামাজিকতার চাপে, তুমি-র সাথে আমি-র এই অন্তরতম গোপন বিজন সম্পর্কটি প্রকাশ্যে বহন করা কবির দিক হইতে ক্রমেই অসুবিধাজনক হইয়া উঠিতেছে– মোর মুখে পেলে তোমার আভাস/ কত জনে করে কত পরিহাস (অন্তরতম, ৩ আষাঢ় ১৩০৭)। হৃদয়ের একান্তে তুমি-কে বহন করিয়া চলিবার জন্য তাই এখন নানা কৌশল এস্তেমাল করিতে হইল—

১. নানা ছলে তাই ডাকি যে তোমায়,/ কেহ কিছু নারে কহিতে।

 

২. জানে না তো কেহ কত নাম দিয়ে/ এক নামখানি ঢেকেছি।

 

৩. নানা রাগিণীতে দিয়ে নানা তান,/ এক গান রাখি গোপনে।

 

৪. নানা মুখপানে আঁখি মেলে চাই,/ তোমা-পানে চাই স্বপনে।

এবং, এই পর্যায়ের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কৌশলটি হইল, ছদ্মবেশধারণ—

বলি নে তো কারে, সকালে বিকালে
তোমার পথের মাঝেতে,
বাঁশি বুকে লয়ে বিনা কাজে আসি
বেড়াই ছদ্ম-সাজেতে।

প্রিয় পাঠিকা প্রিয় পাঠক, ১৩০৭ সালের বাংলাদেশের পরিস্থিতি তো কিছু রুশ বিপ্লব পরবর্তী সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো ছিল না যে, প্রকাশ্যে ঈশ্বরের নামগান করিলে পথে-ঘাটে কেহ দুয়ো দেবে বা গোয়েন্দা পুলিশ এমন পিছনে লাগিবে যে, ছদ্মবেশ ধরিতে হইবে। বিশেষ আমাদের কবি প্রভাবশালী জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির সদস্য। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের পুত্র। বিখ্যাত কবি। তখন ইস্তক প্রায় ২০০ ব্রহ্মসংগীতের রচয়িতা। ঈশ্বর অনুরক্তির প্রকাশ তাঁহার ৪০ বছরের অস্তিত্বের সহিত এমন ওতপ্রোতভাবে যুক্ত যে, তাহা লইয়া যে কোনও রকম লুকাছাপার কথা উঠিতে পারে, তাহাই আশ্চর্যের।

কাজেই, সম্পর্ক বহাল রাখিবার জন্য যখন ছদ্মবেশ ধরিবার কথা উঠিতেছে, ক্ষণিকা-র এই তুমি আর যাহাই হউক ঈশ্বর হইতে পারে না। এই ‘অন্তরতম’ হইল সেই তুমি, যাহাকে ঠাকুর এত বছর ধরিয়া নানা ছলে নানা নাম দিয়া নানা রাগিণীতে ডাকিয়াছেন। কখনও মানসসুন্দরী, কখনও জীবনের অধিষ্ঠাত্রী দেবী, কখনও অন্তরবাসিনী, কখনও অন্তর্যামী, কখনও জীবনদেবতা, কখনও আবার কঠোর স্বামিনী। আমাদের বর্তমান আলাপে আমরা দেখিয়াছি ইহা একটি জটিল ও বহুস্তর মুখচ্ছবি। ইহার পরতে পরতে মিশিয়া আছে ১. ‘কবিতা, কল্পনালতা’, ২. আমি-রই ‘একটি যুগ্মসত্তা’ এবং ৩. জীবনের আদি ও অনপনেয় প্রণয়।

একদিকে ব্রহ্মসংগীতের সরল তুমি, অপর দিকে কবিতায় অন্তরতম এই জটিল তুমি, বিরোধিতাহীন এই ২ কামরা লইয়া দিব্য চলিতেছিল ঠাকুরের ভাবের জগৎ। কিন্তু কোনও সরলরৈখিক গতির সূত্র মানিয়া তো মানুষের জীবন রচিত হয় না, আমরা যতই তাহা হইতে আপরুচি ইতিবৃত্ত বানাই। মানুষের ভাবনাচিন্তাও মনোবিদের সুবিধার্থে, চৌখুপি কামরার মতো দরোজা জানালা আঁটিয়া, নিজেদের সারে সারে সাজাইয়া, হাজির হয় না। কবিদের মনোজগৎ তো আরও রহস্যময়, তাহার হদিশ কবিরা নিজেরাও টের পান কিনা সন্দেহ– গভীর নিভৃতে মোর মাঝখানে/ কী যে আছে কী যে নাই কে বা জানে (উৎসর্গ ৩৩নং)। একটি সময়কালের প্রত্যাশিত ও অভাবিত ঘটনাতরঙ্গ, সেইসব ঘটনা সাপেক্ষ এবং নিরপেক্ষ ভাবনাতরঙ্গ,অন্তর্লোকে বিভিন্ন তরঙ্গের পারস্পরিক ঐক্য ও অন্তর্ঘাত, মিলন ও বিরহ, সব মিলাইয়া এক বিচিত্র শঙ্খিল বিন্যাস তৈয়ার হয় মনোজগতে। কঠোর সাধনার ভিতর দিয়া কবি হয়তো সেই পরস্পর-দূরান্বয়ী অবস্থানকে কিছুটা নিয়ন্ত্রিত করিবার, একমুখী করিবার, প্রয়াস লন। শঙ্খের ভিতর দিয়া একটি নির্দিষ্ট সুর বাহির করেন। কখনও উৎসারিত হয় বিচিত্র রাগমালা।

যেকোনও কারণেই হউক, ঠাকুর নিজের ৪০বছর পূর্তিটিকে জীবনের একটি জরুরি পর্বচ্ছেদ বলিয়া ধরিয়া লইয়াছিলেন। ক্ষণিকা-য় নিজের পুরানো জীবনকে তিনি এইভাবে বিদায় জানাইলেন— অনেক খেলা অনেক মেলা,/ সকলই শেষ ক’রে/ চল্লিশেরই ঘাটের থেকে/ বিদায় দিনু তোরে (যৌবন-বিদায়)। এবং নিজেকে বুঝাইলেন— এখন এল অন্য সুরে/ অন্য গানের পালা,/ এখন গাঁথো অন্য ফুলে অন্য ছাঁদের মালা (বিলম্বিত, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৭)। কয়েক মাসের ভিতরেই সেই ‘অন্য সুর’ ‘অন্য ছাঁদের’ কবিতা উৎসারিত হইতে থাকিল। সৃষ্টি হইল নৈবেদ্য। ব্রহ্মসঙ্গীতের জগৎ আসিয়া ডানা বিস্তার করিল কবিতায়। ক্ষণিকা-য় সেই যে কবি নিজেকে বুঝাইয়াছিলেন— তোমার থাকুক পরিপূর্ণ/ একলা থাকার সার্থকতা, নৈবেদ্য-তে আসিয়া এক অর্থে একাই হইয়া গেলেন তিনি। কারণ অংশত নতুন প্রকর্ষের উচাটনে, অংশত লোকলজ্জার ভয়ে, এতদিনকার তুমি-কে তিনি ‘চল্লিশেরই ঘাটের থেকে বিদায় দিয়া’ আসিলেন। এখন অবশ্য নতুন করিয়া এক নতুন তুমি-কে নির্মাণ করিয়া লইবার সংগ্রাম শুরু হইবে। এইবার সেইদিকেই নজর দিই আমরা।


কোন বিরহিণী নারী

কিছু আগে যে মন্তব্য করিয়াছি, নৈবেদ্য-র কবিতায় ব্রহ্মসংগীতের জগৎ আসিয়া ডানা মেলিল, বলা ভালো, ইহা বয়ানের আধখানা মাত্র। কাজেই ইহা অর্ধসত্য, যাহা নাকি মিথ্যা হইতেও ভয়ঙ্কর! চৈতালি  সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ একবার বলিয়াছিলেন, সেই বহির অনেক কবিতায় ‘গানের বেদনা আছে, কিন্তু গানের রূপ নেই’। এই কথা হইতে সাঁট লইয়া বলা যায় যে, ঠাকুরের প্রাক্‌-নৈবেদ্য  ব্রহ্মসংগীতগুলিতে প্রায়শই কবিতার রূপ ছিল কিন্তু কবিতার বেদনা ছিল না। ব্যক্তিগত উচ্চারণের পরিসর কম থাকাতেই এমনটি ঘটিয়াছিল। সামাজিক অনুশাসক এবং ত্রাতা একজন ঈশ্বর, কাঠামোবন্দি ও অনুপার্জিত একজন ঈশ্বর, ইহার বদলে, ঠাকুরের কবিতাজীবনে এইবার যেই একজন ব্যক্তিগত ঈশ্বরের প্রয়োজন দেখা দিল, সংগীতের অনিবারিত ঊর্মিমালা আসিয়া সেই অস্পর্শিত ভূখণ্ডের উপর লাফাইয়া পড়িল। কল্পনা-র শেষ ৩টি কবিতা হইতেই এই প্রক্রিয়া শুরু। নৈবেদ্য-তে গানের সংখ্যা দাঁড়াইল ১৭। খেয়া হইয়া আরও কিছু পরে গীতাঞ্জলি  পর্বে গিয়া গান আর কবিতা প্রায় একাকার হইয়া যাইবে।

কিন্তু সেই গানের পথে নৈবেদ্য  শেষতক চলিতে পারিল কই! প্রথম কিছু কবিতার পরই রূপ ও মননের দিক দিয়া তাহা এক গানহীন সাধনার পথে পা বাড়াইয়াছে। প্রতিদিন তব গাথা/ গাব আমি সুমধুর (১৮নং), এই শুভেচ্ছা হইতে তাহা পৌঁছাইয়াছে বিপরীত সংকল্পে— শুধু মাধুর্য-মাঝারে/ চাহি না নিমগ্ন করে রাখিতে হৃদয় (৮২নং)। কবিতার ভালোমন্দ বা খ্যাতি-অখ্যাতি নয়, নৈবেদ্য-তে যে এই কঠোর সাধনার দিকটিই ঠাকুরের কাছে নিরঙ্কুশ হইয়া উঠিয়াছিল, তাহা তাঁহার সমসাময়িক ভাবনার ভিতরেও প্রতিফলিত। নৈবেদ্য  প্রকাশের পর প্রিয় বন্ধু জগদীশচন্দ্রকে একটি চিঠিতে তিনি লিখেন (শ্রাবণ ১৩০৮)–

নৈবেদ্যকে আমি আমার অন্যান্য বইয়ের মতো দেখি না। লোকে যদি বলে কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না বা ভাল হয় নাই তবে তাহাতে আমার হৃদয় স্পর্শ করে না। নৈবেদ্য  যাঁহাকে দিয়াছি তিনি যদি উহা সার্থক করেন তো করিবেন— আমি উহা হইতে লোকস্তুতি বা লোকনিন্দার কোন দাবীই রাখি না।

কিন্তু নৈবেদ্য-র এই সাধনার ধারাবাহিকতাতেই কি ঠাকুর ক্রমে গীতাঞ্জলি  অবধি পৌঁছাইলেন? নৈবেদ্য-তে কবির ‘শেষ নিবেদন’ ছিল— বীর্য দেহো তোমার চরণে পাতি শির/ অহর্নিশ আপনারে রাখিবারে স্থির (৯৯নং)। দেখা যাউক, এই কবিতা লেখার এক বছরের ভিতর সেই বীর্য-স্থৈর্য কোথায় গিয়া পৌঁছাইল। কবির মনের সেকালীন অবস্থাটি ধরা আছে ভৈরবী-একতারায় বাঁধা একটি গানে। গানটির কোনও স্বরিলিপি নাই। কোনও গানের বহিতেও কবির জীবৎকালে এটি প্রকাশ পায় নাই। তৎকালীন ‘সমালোচনী’ পত্রিকার মাঘ-ফাল্গুন ১৩০৮ সংখ্যায় প্রকাশিত এই গানটি বর্তমানে গীতবিতান ৩য় খণ্ডে পূজা ও প্রার্থনা পর্যায়ে সংকলিত—

ওগো দেবতা আমার, পাষাণদেবতা, হৃদিমন্দিরবাসী,
তোমারি চরণে উজাড় করেছি সকল কুসুমরাশি।
প্রভাত আমার সন্ধ্যা হইল, অন্ধ হইল আঁখি।
এ পূজা কি তবে সবই বৃথা হবে। কেঁদে কি ফিরিবে দাসী।
এবার প্রাণের সকল বাসনা সাজায়ে এনেছি থালি।
আঁধার দেখিয়া আরতির তরে প্রদীপ এনেছি জ্বালি।
এ দীপ যখন নিবিবে তখন কী রবে পূজার তরে।
দুয়ার ধরিয়া দাঁড়ায়ে রহিব নয়নের জলে ভাসি।

দেবতা এখন পাষাণদেবতা। আমি-র সত্তা জুড়িয়া স্থৈর্যের বদলে এখন সংশয়, বীর্যের বদলে অশ্রু। এবং সমস্ত পুরুষকার বিসর্জন দিয়া এই আকুল আকুতি— কেঁদে কি ফিরিবে দাসী। দাসী! প্রিয় পাঠিকা প্রিয় পাঠক, সহসা কি খেয়া-র সেইসব নারীসত্তাধারী কবিতাগুলির কথা মনে পড়িয়া যায় না? কিন্তু সময় বুঝি তখনও পুরা পাকে নাই। তাই হয়তো এই গানটিকে সুর-বাণী সমেত লোপাট করিয়া দিতে হইল। অপর দিকে নৈবেদ্য-র সাধনাও এক দ্বৈপায়ন চর্চা হইয়াই থাকিয়া গেল।


এই মতানুসারীদের বিশ্বাস, কৃষ্ণ স্বয়ং তাঁহার প্রতি রাধিকার আকুলতার স্বরূপ অনুধাবন করিবার জন্য চৈতন্যের রূপ পরিগ্রহণ করিয়াছেন। চৈতন্যলীলা তাই কৃষ্ণপ্রেমে মাতোয়ারা রাধার ভাবোন্মাদনার লীলা


ঘটনাক্রমে অল্প কিছুদিনের ভিতরেই ঠাকুরের ব্যক্তিজীবনে সর্বগ্রাসী কৃষ্ণগহ্বরের মতো পরপর কতগুলি মহাবিপর্যয়ের হানাদারি। প্রথমে স্ত্রীর মৃত্যু, ৭ অগ্রহায়ণ ১৩০৯। ইহার অভিঘাতে স্মরণ  কাব্যগ্রন্থের ২৭টি কবিতা ছাড়াও, রচিত হইয়াছে কয়েকটি অবিস্মরণীয় শোকগান। যেমন–১. আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে, ২. দুঃখরাতে হে নাথ, কে ডাকিলে, ৩. শূন্য হাতে ফিরি হে নাথ, পথে পথে, ৪. নিবিড় ঘন আঁধারে জ্বলিছে ধ্রুবতারা, ৫. গভীর রজনী নামিল হৃদয়ে ইত্যাদি। এই গানগুলি ১৩০৯ সালের মাঘোৎসবে গীত হয়। পরবর্তী ২ বছরে রচিত গানের সংখ্যা খুবই কম। কিন্তু শোকের প্রাথমিক ধাক্কাগুলি কাটিয়া যাইবার কিছু পরে, একই দিনে (২৩ আষাঢ় ১৩১১) রচিত এই গান ২টি লক্ষ করিবার—

১. কী সুর বাজে আমার প্রাণে আমিই জানি, মনই জানে।/…/ সকাল-সাঁঝে বংশী বাজে, বিকল করে সকল কাজে –/ বাজায় কে যে কিসের তানে। (প্রেম : প্রেম বৈচিত্র্য)

 

২. তুমি যে আমারে চাও আমি সে জানি।/ কেন যে মোরে কাঁদাও আমি সে জানি।/…/ সারা হলে দেয়া-নেয়া দিনান্তের শেষ খেয়া/ কোন্‌ দিক পানে বাও আমি সে জানি। (পূজা : নিঃসংশয়)

কবির প্রাণে আবার বাঁশি বাজিয়া উঠিয়াছে। ‘সারা দিন নানা কাজে’র ভিতর তুমি আবার আমি-কে ‘নানা সাজে/ কত সুরে’ ডাক দিতেছে। কেন যে ডাকিতেছে, তাহা লইয়া তো কোনও সংশয় নাই— তুমি যে আমারে চাও আমি সে জানি। গান ২টির একটি প্রেম ও অপরটি পূজা পর্যায়ে বিন্যস্ত হইলেও, তুমি-আমি-র আন্তঃসম্পর্কের বুনন, ২টি গানেই সমান মাধুর্যমণ্ডিত।

স্মরণে রাখিতে হয়, ইতোমধ্যে কবির অসুস্থ কন্যা রেণুকারও জীবনাবসান ঘটিয়াছে, ২৮ভাদ্র ১৩১০। অল্প কিছুদিনের ভিতর আবার পিতৃবিয়োগ, ৬ মাঘ ১৩১১। এইসব দুর্ঘটনার পরম্পরা যে কবিকে খানিক সংসারবিমুখ করিয়া তুলিবে, তাহাতে আশ্চর্যের কিছু নাই। আধ্যাত্মিকতা তো তাঁহার ভিতর ছিলই। কিন্তু তাহার ভিতর আশ্রয় খুঁজিতে গিয়া নৈবেদ্য-র অভিজ্ঞতা এখন বড় একটা কাজে লাগিল না। তাহার প্রথম ও প্রধান কারণ, সেই স্বল্পকালীন আশ্রমিকতার কঠোরতার অনুশাসন (শুধু মাধুর্য-মাঝারে/ চাহি না নিমগ্ন করে রাখিতে হৃদয়) সত্ত্বেও কবির হৃদয়ের অন্তঃসলিল মাধুর্যরসের তো কোনও মৃত্যু হইল না। নহিলে, মাতৃহারা শিশুপুত্রের মনোজগৎটিকে স্পর্শ করিবার তাগিদে শিশু-র (১৩১০) কবিতাগুলি তিনি লিখিতে পারিতেন না। একটু আগে উল্লেখিত ২৩ আষাঢ় ১৩১১ রচিত গান ২টিও সেই মাধুর্যরসের নমুনা।

নতুনতর আধ্যাত্মিকতার তালাশে নৈবেদ্য-র পথটি অবান্তর হইয়া পড়িবার দ্বিতীয় কারণটি হইল, জীবনদেবতার অনুভাবটিকে শমিত করিতে না-পারা। ক্ষণিকা-য় ‘চল্লিশেরই ঘাটের থেকে’ যাহাকে বিদায় দেওয়া গিয়াছে বলিয়া ভাবা হইয়াছিল, ঠাকুর টের পাইয়াছেন, তাহার সাহচর্য ছাড়া বিশ্বদেবতার নাগাল মিলিবে না। অনুজ বন্ধু মোহিতচন্দ্র সেনকে লেখা সমসাময়িক একটি চিঠিতে (৫ ফাল্গুন ১৩০৯) জীবনদেবতা বিষয়ে কবির অনুভূতিটি ধরা পড়িয়াছে। সেখানে বলা হইয়াছে— ‘সে আছে, সে আমাকে ভালোবাসে, তাহার ভালোবাসার দ্বারাই ঈশ্বরের ভালোবাসা আমি লাভ করিতেছি।’ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে, জীবনদেবতার স্বরূপটিও সেই চিঠিতে পুনর্নির্ণীত হইয়াছে। সে ‘আমার অতিজগতের সহচর’। তাহার সহিত আমি-র ‘একটি অপূর্ব নিত্যপ্রেমের’ সম্পর্ক। এবং তাহার সেই ‘নিত্যপ্রেমের সূত্রে’ই ‘ঈশ্বরের সহিত আমার একটি পরম রহস্যময় আধ্যাত্মিক মিলনের সেতু’ সে ‘রচনা করিতেছে’।

তাহা হইলে এখন কী করণীয়? কবি ভাবিতেছেন। বা হয়তো ভাবিতেছেন না। স্রেফ সময় লইতেছেন। ২৩ আষাঢ় ১৩১১ রচিত ২য় গানটির শেষ পঙ্‌ক্তিটি ছিল— সারা হলে দেয়া-নেয়া দিনান্তের শেষ খেয়া/ কোন্‌ দিক পানে বাও আমি সে জানি। এই বছর আর মাত্র ২টি গান রচা হইয়াছে। ১৫ শ্রাবণ ১৩১২তে গিয়া আবার একটি গান— তুমি এ-পার ও-পার কর কে গো ওগো খেয়ার নেয়ে। সেই এক যুগ আগের নদী পারাপারের ছবিকল্পটি আবার ভাসিয়া উঠিতেছে। ভাসিয়া উঠিতেছে পারাপারকারীর ছবি— আর কতদূরে নিয়ে যাবে মোরে/ হে সুন্দরী?/ বলো কোন্‌ পারে ভিড়িবে তোমার/ সোনার তরী (নিরুদ্দেশ যাত্রা, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৩০০)। সেদিনের সোনার তরীর সুন্দরী বা আজিকার খেয়ার নেয়ে, সে-ই তো কবির জীবনদেবতা। তথাপি, ঈশ্বরের সাথে সেতুরচনার জন্য যতই এই জীবনদেবতার ‘নিত্যপ্রেম’ তাঁহার কাছে জরুরি হউক, তাহার সহিত সংলাপগুলি পুরানো তরিকায় প্রকাশ করেন কীভাবে! সেই যে ক্ষণিকায়, এই ‘নিত্যপ্রেম’-এর প্রকাশ ঘটাইবার সামাজিক অসুবিধাগুলির কথা ফাঁস করিয়াছিলেন— মোর মুখে পেলে তোমার আভাস/ কত জনে করে কত পরিহাস (অন্তরতম, ৩ আষাঢ় ১৩০৭)।

তাহা হইলে এখন কী করণীয়? কবি ভাবিতেছেন। বা হয়তো ভাবিতেছেন না। তখন ক্ষণিকারই অর্জনগুলি, আত্মপরামর্শগুলি, তাঁহার বড় কাজে আসিল। নৈবেদ্য-র অনুশাসন পর্বে যে-পরামর্শগুলি ধামাচাপা পড়িয়া গিয়াছিল, কাজে লাগাইবার মতো পরিস্থিতি পাওয়া যায় নাই। সেগুলি আশা করি আমাদের সকলেরই স্মরণে আছে। সেই যে ‘নানাছলে’ তুমি-কে ডাকিবার কৌশল। ‘নানা নাম’ দিয়া তুমি-র নামখানি ঢাকিয়া দিবার কৌশল। ‘নানা রাগিণীতে’ ‘নানা তান’ দিয়া তুমি-র উদ্দেশ্যে গাওয়া গানটি গোপন রাখিবার কৌশল। ‘নানা মুখপানে’ প্রকাশ্যে তাকাইলেও তুমি-কে স্বপ্নের ভিতর দেখিবার কৌশল। এবং সর্বোপরি ‘ছদ্ম-সাজ’ ধারণ করিবার কৌশল।

11087042_919834948061627_1388922290_o
রবীন্দ্রনাথের আঁকা নারী প্রতিকৃতি-২

কেমন হইতে পারে সেই ছদ্মসাজ? এইখানে নৈবেদ্য-র একটি ইশারা আমাদের সহায় হইতে পারে। পূর্বজীবন লইয়া আত্মসমালোচনা করিতে গিয়া, সেখানে একটি পদে ঠাকুর বয়ান দিয়াছেন—

তোমার ইঙ্গিতখানি দেখি নি যখন
ধূলিমুষ্টি ছিল তারে করিয়া গোপন।

বিপরীত মুখে তারে পড়েছিনু, তাই
বিশ্বজোড়া সে লিপির অর্থ বুঝি নাই।

 

—নৈবেদ্য ৪০

আসমানের দিকে তাকাইয়া যাহা পাঠ করার কথা, তাহা পড়া হইতেছিল জমিনের দিকে চোখ ফেলিয়া। এই ভঙ্গিমাই যত অনর্থের মূল। অন্তত নৈবেদ্য-র আমি-র কাছে। অ-নৈবেদ্য-আমি যে-তুমি-র ভিতর দিয়া বিশ্বলোকের সহিত সম্পর্ক গড়িয়াছে, নৈবেদ্য-র আমি-কে সেই তুমি-র প্রতি কোনও গুরুত্বই দেখাইতে নাই। অতীত লইয়া আফসোস করিতে গিয়া ওই একই পদে তাই সে বলিয়াছে— তখন তোমার পানে/ বিমুখ হইয়া ছিনু কী লয়ে কে জানে। বলা বাহুল্য, নৈবেদ্য-র আমি-র তুমি হইল ঈশ্বর। এখন সে যে এইভাবে অ-নৈবেদ্য আমি-র দেখনভঙ্গিমাকে দায়ী করিল, এইখানে সে ২টি বিষয় উপেক্ষা করিল। ১. অ-নৈবেদ্য আমি তো আর ঝুটমুট দৃষ্টি নত করিয়া নাই। তাহার তুমি-র দিকেই সে তাকাইয়া আছে। তাহার কাছে সেই তুমি ‘ধূলিমুষ্টি’ নয়, তাহার জীবনদেবতা। ২. জীবনদেবতা-র দৃষ্টির ভিতর দিয়াই অ-নৈবেদ্য আমি ‘বিশ্বজোড়া সে লিপির অর্থ বুঝি’য়া লইতেছে। ইহা লইয়া তাই তাহার কোনও অপরিপূর্ণতার আফসোসও নাই।

তো, এখন কী করা যায়! নৈবেদ্য-র আমি-র ব্যাখ্যাই তো সমাজমনের কাছে গ্রহণযোগ্য। উল্টাভাবে, সমাজমনের চোখে ধুলা দিতে গেলে, নৈবেদ্য-র আমি-র বিশ্লেষণ হইতে অনায়াসে কিছু ইশারা নেওয়া যায়। তাহার সমালোচনা হইল অ-নৈবেদ্য আমি-র দেখনভঙ্গিমা লইয়া। আসমানের দিকে না-ফিরিয়া, সে পড়িতেছিল জমিনের দিকে চোখ ফেলিয়া। এখন তো এই তর্ক জুড়িয়া লাভ নাই যে সে জমিনের ভিতর দিয়াই আসমান পড়িতেছিল। বরং সমাজকে খুশি করিবার জন্য সেই ভৌমদৃষ্টি ত্যাগ করিলেই হয়। কিন্তু নৈবেদ্য-র সাধনা কোনও শৃঙ্গলীলায় না পৌঁছাইবার ফলে, আপাতত আমি-র মননে ইহাই ফয়সালা হইয়াছে যে, আকাশের সাথে সেতুরচনাতেও ভূমির নিত্যসাহচর্য নিতান্ত জরুরি। তাহা হইলে ভঙ্গিমাটিকে উল্টাইয়া লইলে কেমন হয়! ভূমি অর্থাৎ তুমি-কেই যদি আকাশের দিকে স্থাপন করা যায়, আর আমি নামিয়া আসে ভূমির অবস্থানে? তাহা হইলে তো তুমি (=জীবনদেবতা)-র সাথে আমি-র নিত্যপ্রেমও বহাল থাকে, আর লোকচক্ষে এই ধুলাও দেওয়া যায় যে, আমি-র দৃষ্টি আর নিম্নগত নয়, তাহা আকাশমুখী।

বাউলসাধনায় এই ভঙ্গিমাটিই হইল বিপরীতবিহার— ভক্তিভাবে নিম্নতলে সাধক ধরাসনে।/ দেবি আস্যে ঊর্ধ্বদৃষ্টে থাকি স্থির নয়নে।। আবার, গৌড়ীয় বৈষ্ণবদর্শন অনুযায়ী, চৈতন্যদেব ছিলেন রাধাভাবে ভাবিত কৃষ্ণ। এই মতানুসারীদের বিশ্বাস, কৃষ্ণ স্বয়ং তাঁহার প্রতি রাধিকার আকুলতার স্বরূপ অনুধাবন করিবার জন্য চৈতন্যের রূপ পরিগ্রহণ করিয়াছেন। চৈতন্যলীলা তাই কৃষ্ণপ্রেমে মাতোয়ারা রাধার ভাবোন্মাদনার লীলা। লীলার জগতে ইহাও একরকম বিপরীতবিহার। রবীন্দ্রনাথও আপনার মতো করিয়া ছদ্মসাজ ধরিলেন। তিনি তাঁহার নাছোড় জীবনদেবতাকে পুরুষ বানাইলেন, নিজে হইলেন নারী। ভাবের জগতে ইহাও একপ্রকার বিপরীতবিহার বই কি! এই নারীসত্তার বিস্তার অবশ্য তাঁহার কাব্যে-গানে আগাগোড়াই ছিল। তাহার নমুনা আমরা আগেই পেশ করিয়াছি। তবে আগে যাহা ছিল বৈচিত্র্যসৃষ্টির তরিকা, খেয়া-তে আসিয়া সেই নারীসত্তাই তাঁহার ভাবনাবিস্তারের জব্বর উপায় হইয়া দাঁড়াইল। খেয়া-র কিছু আগে রচিত উৎসর্গ  কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতায় আত্মগত সেই ‘বিরহিণী নারী’র কথা বেশ ফলাও করিয়াই বলিয়াছেন তিনি—

আমার মাঝারে যে আছে কে গো সে,
কোন্‌ বিরহিণী নারী।
আপন করিতে চাহিনু তাহারে,
কিছুতেই নাহি পারি। (কবিতা ১০, উৎসর্গ )

খেয়া-তে পৌঁছাইয়া সেই ‘বিরহিণী নারী’-কে আপন করিয়া লওয়া ছাড়া, নিজের কথা তাহার মুখে বসানো ছাড়া, আর কোনও পথ খোলা রহিল না ঠাকুরের সামনে। বা, সেই পথটিই তিনি আবিষ্কার করিয়া লইলেন।

জীবনের কোন্‌ সুদীর্ঘ-গভীর আলো-অন্ধকার আবর্ত-প্রতিবর্তের পাল্লায় পড়িয়া, খেয়া-র আমি, নিজের বিরহ-মিলনের আকুতিটি প্রকাশ করিবার জন্য, এইভাবে সত্তা পরিবর্তন করিয়া বহুলাংশে নারীরূপ ধারণ করিল, সেই টানাপোড়েনের কিছুটা আভাস হয়তো এইবার আমরা পাইলাম। এই জটিল ভাবনা-পরম্পরাকেই হয়তো রবীন্দ্রনাথ খেয়া-র উৎসর্গ কবিতায় ‘জীবনমৃত্যু রৌদ্রছায়া ঝটিকার বারতা’ বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। কাব্যরসিক অথচ কুশাগ্রধী বৈজ্ঞানিক মননের অধিকারী অনুকম্পায়ী বন্ধু জগদীশচন্দ্রকে খেয়া-র এই বিপরীতবিহারের রহস্য ভেদ করিবার আমন্ত্রণও জানাইয়াছেন। আমরা আমাদের মতো করিয়া ঠাকুরের সেই ‘ঝটিকার বারতা’-র সাঁটগুলি উদ্ধারের কোশেশ করিলাম। এতক্ষণ ধৈর্য রাখিবার জন্য, প্রিয় পাঠিকা প্রিয় পাঠককে আমাদের সালাম ও প্রণাম।¤


উৎপল ত্রিবেদী সম্পাদিত  
কবিতার দেশে ছোটকাগজ থেকে
গৌতম চৌধুরী

গৌতম চৌধুরী

জন্ম ১৮ ফাল্গুন ১৩৫৮, ২ মার্চ ১৯৫২, কানপুর, উত্তর প্রদেশ, ভারত। শিক্ষা : উচ্চ মাধ্যমিক। পেশা : লেখালেখি।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
কলম্বাসের জাহাজ [১৯৭৭, উলুখড়, হাওড়া]
হননমেরু [১৯৮০, উলুখড়, হাওড়া]
পৌত্তলিক [১৯৮৩, উলুখড়, হাওড়া]
অমর সার্কাস [১৯৮৯, আপেক্ষিক, হাওড়া]
চক্রব্যূহ [১৯৯১, আপেক্ষিক, হাওড়া]
নদীকথা [১৯৯৭, যুক্তাক্ষর, হাওড়া]
আমি আলো অন্ধকার [১৯৯৯, অফবিট, কলকাতা]
সাঁঝের আটচালা [২০০২, কীর্তিনাশা, কলকাতা]
আধপোড়া ইতিহাস [২০০৪, কীর্তিনাশা, পুরুলিয়া]
অক্ষর শরীরে মহামাত্রা পাব বলে [২০০৬, কীর্তিনাশা, পুরুলিয়া]
নির্বাচিত কবিতা [২০১০, সংবেদ, ঢাকা]
আখেরি তামাশা [২০১৩, ছোঁয়া, কলকাতা]
ঐতরেয় [২০১৩, রূপকথা, ক্যানিং]
উজানি কবিতা [২০১৪, মনফকিরা, কলকাতা]
ধ্যানী ও রঙ্গিলা [২০১৫, চৈতন্য, সিলেট]
কলম্বাসের জাহাজ (২য় সং) [২০১৬, রাবণ, কলকাতা]
বনপর্ব [২০১৬, সংবেদ, ঢাকা]

গদ্য—
গরুররচনা (বৈ-বই বা ই-বুক) [২০১২, www.boierdokan.com]

যৌথ সম্পাদনা—
অভিমান (১৯৭৪-৯০), যুক্তাক্ষর (১৯৯২-৯৬), কীর্তিনাশা (২০০২-০৫)

ই-মেইল : gc16332@gmail.com
গৌতম চৌধুরী