হোম পুনর্মুদ্রণ গদ্য ক্ষুধার কোনো মাতৃভাষা নেই

ক্ষুধার কোনো মাতৃভাষা নেই

ক্ষুধার কোনো মাতৃভাষা নেই
278
0

সঞ্জীব পুরোহিত

10269411_10200847872798546_2353002000671583028_n
সঞ্জীব পুরোহিত

বড় হয়ে জানলাম জুলভার্ন খুবই ঘরকুনো ছিলেন, তখন হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। কবিরা ঘরে থাকতে পারে না

নিসর্গ শব্দটা মনে এলেই কোন্ রঙের টিউবটার দিকে হাত বাড়াবো আমি?
সবুজ। বুজবুজে সবুজ।

এটাই অমোঘ। এটাই চূড়ান্ত। এটাই সুনিশ্চিত। অথচ ‘উত্তরাধুনিক’রা বেশ কিছু সুন্দর দর্শনের জন্য এতো এতো সমালোচনার পরও ধসে যাচ্ছে না, তার একটি হলো ‘প্লুরাল ট্রুথ’। সত্য’র রেডিয়ান মান বলে কিছু নেই। নিসর্গ কারো কাছে বুজবুজে না হয়ে টুকটুকে লাল হতে পারে। যে পাগলাটি রাস্তায় সঙ সেজে ট্রাফিক কন্ট্রোল করছে, সে বিশ্বাস করে, তার হাত তোলার কারণেই গাড়িগুলো থেমে যাচ্ছে। তার পক্ষ থেকে এটা অবশ্যই সত্যি। সে সত্য’র প্রতি, তার জগতের প্রতি আমার শ্রদ্ধা মজুদ রয়েছে।

যে পাউরুটির নাগাল পায় নি পিপীলিকা, ক্রমশ তার গায়ে জমে ওঠা ছত্রাক আর সবুজের আচ্ছাদন অসুন্দর। পশ্চিমি কারো কারো চোখে সবুজ সবসময় জীবনের রঙ নয়। পচা কিছুর ব্যঞ্জনা নিয়ে তাই জিম ক্যারি অভিনীত ‘দ্য মাস্ক’ ছায়াছবির মাস্কটি সবুজ।

খুবই সঙ্গত যে, নিসর্গ শব্দটা মাথায় এলে অনেকের চোখেই ফুটে উঠবে নীল সাগর, নীল পাহাড়ের ঘাড়ে ঈষৎ ঝুঁকে থাকা আকাশ…অথচ এই সফেন সাগরই গ্রাস করছে ডাঙার সবুজকে…

রবীন্দ্রনাথ শস্যরিক্ত মাঠে চরা ‘গোরু’ জানালা দিয়ে দেখতে দেখতে কবিতা লিখেছেন, ওদিকে জীবনানন্দ ‘পরিষ্কার ভোরের বেলা/দেশের মটরশুঁটি কড়ায়ের সবুজ ক্ষেতে হাঁটতে হাঁটতে/হঠাৎ অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছি/ লাল সুরকির রাস্তার পাশে/ শালগাছ দুটোর নিচে/ একটা মোটরকার…’

অথচ বুদ্ধদেব বসু জানলার পর্দা টেনে দিয়ে লিখতে বসেছেন। মানুষ বিনির্মিত সৌন্দর্যই তাঁর আরাধ্য বিষয়, প্রকৃতি নয়। প্রিয়ার সুন্দর মুখের ভেতর কুৎসিত কঙ্কালের উপস্থিতিও তিনি দেখে নিচ্ছেন। বুদ্ধির কোমল কেন্দ্রে তিনি মাখছেন মেধার লোশন, দাঁড়িয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে চেতনার লোম। তা মোটেই হৃদয়ের নামে বুকের উপরে পঞ্চাশ বছরের পুরানো ঘি ঘষা নয়। তসলিমা নাসরিন যখন লিখলেন, ‘মানুষে বিশ্বাস নেই/ আজ চুমু খেলে কাল ফেলে দেবে দূরে। কাল দূরে ঠেলে আজ তুলে নেবে কোলে…/বারবার শুধু শিল্পের কাছেই ছুটে আসি। শিল্পের কাঁধেই রাখি বিশ্বাসের ক্লান্ত করতল।’ তখন শামসুর রাহমান এ বালিকার ভুল শুধরে দিলেন। লিখলেন, ‘মানুষ ছাড়া কোনো শিল্প হয় না। কাজেই মানুষের কাঁধে হাত রাখা না গেলে…’। মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ, বলেছেন কবিগুরু। আর বাঙলা কবিতার মহান নির্মাতা শামসুর রাহমান বলেছেন, ‘ঐ ফুল রবে নিরুত্তর/লজ্জায় বলবে না কিছু, মানুষ আমি, যদি তুমি বলো আমাকে, আমি থাকবো না নির্বাক।/ আমি তারায় তারায় (পাড়ায় পাড়ায় অর্থানুপ্রাসে!) রটিয়ে দেবো তুমি আমার।’ একদিন রাহমান ভাই তসলিমা নাসরিন প্রসঙ্গে ‘মেয়েটা একা একা কোথায় পড়ে আছে’ বলে ঝাঁ ঝাঁ দুপুরে শ্যামলির বাড়িতে কেঁদে ফেলেছিলেন। কল্পনার কবিদের মতো থই থই ছিলো তাঁর আবেগ।

মোহাম্মদ রফিকের কবিতা জল কাদা মাখা। অথচ কাব্যচেতনা? বছর দশেক আগের এক শুক্রবার। ভোরে ঘুম ভাঙলো না। বেলা করে ঘুম ভেঙে দেখি, পিঠের নিচে দুমড়ে মুচড়ে আছে পত্রিকা। বালিশের ওপর হাত দিয়ে ডলে ইস্ত্রি করতে করতে পড়ে ফেলি, ‘কামানের মুখ থেকে বেরিয়ে এলো প্রস্রাবের গোলা।’ তখন আমারও তলপেট ভারী। কবিতাটি তিনি হারিয়ে ফেলেছেন। মনেও করতে পারলেন না! দাঁড়কাকে প্রকাশিত তাঁর একটা কবিতার অংশ বলি, ‘…তাহলে চুমু খাওয়াই যে অসম্ভব হয়ে পড়বে।/ আর নিছক অপ্রয়োজনীয় কবিতা রচনাও…’

আমি তখন কিশোর, আমার রিডিং রুম অর্থাৎ বাথরুমে তখন ‘টম সয়্যার’ আর ‘হাকলবেরি ফিন’ পেরিয়ে ঢুকে পড়েছে Around the World in 80 Days. বড় হয়ে জানলাম জুলভার্ন খুবই ঘরকুনো ছিলেন, তখন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। কবিরা ঘরে থাকতে পারে না। ক্ষেতে খামারে বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়, থাকে প্রকৃতির কাছে…তখন নিজেকে খুব অপ্রকৃতস্থ লাগতো। গ্রিনরোডের কূল ঘেঁষে আমার কৈশোর কেটেছে। টু-স্ট্রোক টেম্পু, জ্যাম আর ধূসর ধুলা, অথচ নাম ‘গ্রিনরোড’। গ্রিনরোডের দু’পাশে কর্মব্যস্ত দোকানি, মাস্তান, উপচানো ডাস্টবিনে খাবার তল্লাশি করা শেয়াল রঙা খোঁড়া কুকুর, কতিপয় রিকশাচালক, থেকে থেকে ‘সিলাই-ই-ই’ চিৎকারে চম্কে দেয়া মুচি বা জিঞ্জিরা হোটেলের চায়ের মতো মান্নান সৈয়দের হেঁটে যাবার ভঙ্গি, তখনকার সমুদ্র গুপ্তর আধাপাকা চুল, শৈশব থেকেই আমার খুব চেনা।

মানুষ আধুনিক হয়েছে। শিল্প সাহিত্য’র মেটাফোরে এখনও দেখি ব্যবহার হয় শকুন কুকুর কাক, নেতিবাচক উপমায়। যে শকুন একটা জীবিত ইঁদুর ছানা হত্যা করে না, বোধ করি দীক্ষা নিয়েছেন ভগবান বুদ্ধের কাছে আর কুকুর তার আদিমতম বন্ধু। জ্যাক লন্ডনের ‘কল অব দ্য ওয়াইল্ড’-এর মতো উপন্যাস কই? রবীন্দ্রনাথ আমার মা। কেননা আমার মানসিক পুষ্টিতে তাঁর জলভেজা কেতকী’র হিম সুবাস মাখা জলবায়ু, নদী নালার অবদান রয়েছে। একই গাছ, শুধু জলের পাশে রোপণের জন্য বাড়তি ফলন দিলো, তেমনি জলাধার রবীন্দ্রনাথ। আমার এবং আমাদের। সেলিম আল দীন সমকালীন রবীন্দ্র ব্যাখ্যাদাতাদের মধ্যে ছিলেন অন্যতম। আমরা নানা রাবীন্দ্রিক জিজ্ঞাসায় ওঁর দ্বারস্থ হতাম। তিনি বলতেন, ‘আবার জন্ম নিলে রবীন্দ্রনাথকে বোঝার জন্য জন্মাবো। কিন্তু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি, ঘেউ ঘেউ শব্দ ডিস্টার্ব করছে, তাই, ‘কাজের ছেলে’ পাঠিয়ে ইট মারাচ্ছিলেন তিনি।’ অথচ রবীন্দ্রনাথ শিশুর মুখ দিয়ে মাকে বলছেন, ‘যদি খোকা না হয়ে আমি হতেম কুকুর ছানা…।’ বরং সোহেল অমিতাভ’র কবিতার মাধব হতে চাই। ‘স্টেশনে গিয়ে আরও একটু আড্ডা দেয়া যায়।/ মাধবের টি-স্টলে এখনো খাঁটি দার্জিলিং চা। ও রবীন্দ্র্রভক্ত, ভেজালে বিশ্বাসী নয়।’ স্ট্রিট ডগের ক্যানভাসে ইট-পাটকেলে আঁকা সভ্যতার চিত্র এগুলো কতদূর?

‘বন্দী’ বানান কিছুদিন ‘বন্দি’ লিখেছি। কিন্তু আরাম না পেয়ে আবার দীর্ঘ-ঈ তে ফিরে এলাম। বন্দীত্বর দীর্ঘ ইমেজ হ্রস্ব-ই দিলে হ্যামপারড্ হয়

আড়াই বছরের মেয়ে চর্যা। ওর খেলনা পড়ে গেছে খাট থেকে। সে তার দাদুকে বলছে পা ধরে রাখো। তারপর পেট পর্যন্ত ঝুঁকে খেলনা তুললো মেঝেতে না নেমে! ফিজিক্স আর ফিজিওলজিটা লক্ষ করুন। মানুষের জ্যামিতিতে কী এক অসঙ্গতি! মাথামোটা একটা প্রাণী সে। সে ছাড়া আর কোনো জন্তু’র বালিশ লাগে না!

মানুষ এমন একটা প্রাণী যে আগুন জ্বালানোর ভেতর দিয়ে অসভ্যতার সূচনা করেছে। সে এমন একটি সাপ হয়ে উঠেছে, নিজেই নিজেকে গেলা শুরু করেছে লেজ থেকে। ‘মানুষ তা-ই, যা সে খায়’ বলেছেন লুডভিগ ফয়েরবাখ নামের একজন জার্মান দার্শনিক। মানুষ কী খায় না? আমার কাছে এমনসব ইমেজ রয়েছে যা দেখে আমি বাধ্য হয়েছিলাম সাইক্রিয়াটিস্ট দেখাতে। একটি চিনা রেস্তোরাঁয় খাওয়া হচ্ছে মানুষের ঘিলু! মানুষ সিগারেট খাওয়া শুরু করে এর ধোঁয়ার জন্য। যে কারণে অন্ধকারে সে সিগারেট টেনে মজা পায় না। নিকোটিন ডিপেন্ডেন্ডসি ঘটে পরে। আগুনের ওপর তার দখলদারিত্বতে সে আত্মশ্লাঘা বোধ করে। ইশপের গল্পের শৃগাল সে, যার লেজ গিয়েছে খ’সে। এখন গ্রিন হাউজ এফেক্টে সে ডুবতে বসেছে। ডুবে গেছে যেমন মহেশখালির অনেকটা অংশ। ‘বুদ্ধ সিদ্ধার্থ ও অন্ধ উঁই-রানীর কথা’ কবিতায় ফেলে আসা সময়ে ফিরে যেতে চেয়েছি এভাবে, সেই সময় দু’চার হাজার বছর আগের নয়…

সেলিম আল দীন বেশ পছন্দ করেছিলেন এ কবিতাটি। কবিতাটি লিখি ঘনঘোরের ভেতর। এটাকে কীভাবে মঞ্চায়ন করা যায়, তা নিয়ে কথা হয়েছিলো তাঁর সাথে। আমি শিওর, এই হাইপেথিসিস…। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ঘিলু-অলা প্রাণী তিমি। অথচ ডাঙার মানুষের কাছে সে কেমন অসহায়। কী অসাধারণ তাঁর গায়কী! বাজারে সিডি পাওয়া যায়। এক প্রেমিক-প্রেমিকা বিজ্ঞানী-যুগল তা রেকর্ড করেন প্রথম। আর নটিলাস থেকে তিমির দুধ খাবার গল্পটিতো সবারই জানা…

অ্যাপেনডিক্স নামক প্রত্যঙ্গটি মানুষ হত্যা করেছে, খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে। আছে। কিন্তু কাজ করে না। এরপর শেষ হবে অগ্ন্যাশয়। জীবনানন্দকে ধরেছিলো। আমাকেও ধরেছে।  প্রাথমিক শ্রেণীর মানুষ ছিলো তৃণভোজী, অন্তত আমার মনে হয়। আইনস্টাইন বলেছেন, ‘মানব-স্বাস্থ্যের জন্য এবং পৃথিবীতে মানব প্রজাতির অস্তিত্ব রক্ষা করতে গেলে নিরামিষাশী হবার বিকল্প নেই’। সনাতন সিদ্ধার্থ এসব বলেছেন অনেক আগেই। তাই লিখেছি হিপোক্রেটের আর্তনাদ কাব্যগ্রন্থে, ‘আইনস্টাইনের কপালের ভাঁজগুলো ঢেকে রাখছি, বুদ্ধের শান্ত কপালে।’ বলা হয় ধ্যানস্থ বুদ্ধকে সর্বভূক উইপোকা খেয়ে ফেলেছিলো।

আমার ১৯ বছরে মিমুকে নিয়ে লেখা একটি কবিতা মুদ্রিত হয়েছিলো ‘জারজ কবিতারা কাঁদে’ পুস্তিকার উৎসর্গপত্রে । সে সময় আমার মনে হয়েছিলো মিমু নামের কুকুরটিই আসলে আমাকে ভালোবাসে।

মনসামঙ্গলের কারণেই হয়তো এদেশে এখনো সাপ বিলুপ্ত হয় নি। শিল্প সাহিত্য এটা পারে, যেটা তথাকথিত রাজনীতির লোকরা পারে না। আমার প্রিয় নবী কার্ল মার্কস প্রথম যে চারটি গ্রন্থ রচনা করেন, সেগুলো কাব্যগ্রন্থ। অন্যকে ছোটো হিসেবে মেনে নিলে হত্যা করতে, নির্যাতন করতে বাধে না। কালোদের যেভাবে জন্তুজ্ঞান করতো। করতো কিন্তু পুঁজির জন্য, দাস ব্যবসার জন্য। যে মুরগি ভীতুপ্রাণী, তার ছানাকে ছুঁতে গেলে ঠোকরাতে  আসে তেড়ে, ওর বাৎসল্য নেই? ওঁর প্রেমকে কেন খাটো করছেন মশাই? ‘মাছের মায়ের পুত্রশোক’, যেনো মাছের মায়ের বুকে প্রেম নেই! কতটা আছে, আমার ‘বেজে চলে লোহার লকেট’ পড়লে বোঝা যাবে। প্রবচনটি নিষিদ্ধ হোক…একবিংশের দীন শব্দমিস্ত্রী আমি, দাবী করছি।

প্রাণ আছে সে প্রাণী। জান আছে তবু কিন্তু জন্তু নই! নইলে পোষা প্রাণীর হাড় চিবাতে বাধবে না কেন। ঈশ্বরচন্দ্রের তো বাছুরের দুধে ভাগ বসাতে বাধতো। তাই ছেড়ে দিয়েছিলেন মায়ের হাতের পায়েস। প্রয়োজনীয় প্রোটিন আহরণ করতেন ছোলা থেকে। সেদিন একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের আলোচনা শুনলাম টিভিতে। দুধ খেতে নিষেধ করছে! উপস্থাপককে বলছেন, ‘কোনো প্রাণী বড় হয়ে দুধ খায়?’ আহা! কী কবিতা কবিতা কথা। মাইকেল পেট্টি’র স্বাস্থ্যবটিকায় পড়লাম, ‘গরুর দুধ আর্থ্রাইটিসের ব্যথা ফিরিয়ে নিয়ে আসার অন্যতম আসামি।’ মোহাম্মদ রফিক খুব ভোগেন এ রোগে। এ দেশ থেকে অ্যামেরিকায় গিয়ে হাভাতের মতো দুধ ডিম গিলে অনেকেই যে দ্রুত হৃদরোগ বাধিয়ে ফেলেন, তা জানলাম জনপ্রিয় লেখক ড. জাফর ইকবালের লেখা পড়ে। ক্যামেলিয়ার ‘মীমাংসিত জনম’ গ্রন্থটি বেরোয় দাঁড়কাক থেকে ১৪১৩ বঙ্গাব্দের ফাল্গুনে। উৎসর্গপত্রে তিনি লেখেন, ‘আমার বাল্যকালে নিত্যসহচর ছাগলছানা কিটির স্মরণে আমার প্রথম কবিতার বইটি নিবেদন করলাম। যাকে […] কোরবানি দেয়া হয়। […] আমার লেখা কবিতাগুলি, প্রিয় কিটির স্মরণে পৃথিবীর তাবৎ সন্ত্রাসমূলক কাজ ও হিংসার বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদ। কারো ধর্মের পরাকাষ্ঠা ও মাংসভক্ষণের সুখানুভূতির উপর আঘাত দেয়া আমার উদ্দেশ্য নয় মোটেই।’

কিন্তু আমার উদ্দেশ্য আঘাত দেয়া। ফুলের চেয়ে মাংস’র গন্ধ মানুষের প্রিয়, বিনয় মজুমদার বলেছেন। সেদিন এক সুন্দরী সবুজ গোলাপ দেখতে আসতে চাইলো না, কিন্তু তার দিদি ফোনে যখন বললো মাংস রাঁধা হয়েছে কষিয়ে, তারপর বেশ দ্রুতই চলে এলো ফুল দেখতে! ইংরেজরা প্রকাশ্যে পাঁঠাবলি নিষিদ্ধ করেছিলো। কিন্তু কোরবানি? সন্তান কোলে করে বাবার উল্লাস, ‘আমাদের গরু…আমাদের গরু’। শিশুর চোখের সামনে তখন রক্তাক্ত প্রাণটি ছটফট করছে। ওর ভেতর ঢুকে যাচ্ছে নির্দয়-বীজ। মীর মশাররফ হোসেন ‘গো-জীবন’ রচনায় এর বিরোধিতা করেছেন। কবি দীপ মুখোপাধ্যায়, পৈত্রিকসূত্রে ব্রাহ্ম, একান্ত আড্ডায় বলছিলেন, গরুকে বাঁচাবার জন্য একে খাওয়া নিষিদ্ধ হয়…। ‘সবার উপর মানুষ সত্য’ বলতে কবি কিন্তু আমজনতা নয় ‘মনের মানুষ’কে মিন করেছেন। পূর্বের চরণগুলো পড়লেই বোঝা যাবে।

‘বন্দী’ বানান কিছুদিন ‘বন্দি’ লিখেছি। কিন্তু আরাম না পেয়ে আবার দীর্ঘ-ঈ তে ফিরে এলাম। বন্দীত্বর দীর্ঘ ইমেজ হ্রস্ব-ই দিলে হ্যামপারড্ হয়। বন্দি তুলে রাখলাম সিঁকায়। যদি কোনোদিন ছেঁড়ে, ‘বন্দি’বো ঈশ্বরকে। তবে সিঁকার গুড়ে বালি। বন্ধুরা যখন ফ্যাশান করে নাস্তিক হচ্ছে, তখন চাইছি নানা আচারে বিশ্বাস আনতে। পারি নি। মুত্যুর পর যদি কোনো জগৎ থাকতো, তবে নরকে পুড়ে পুড়েও অস্তিত্বকে ভোগ করা যেতো। ওফ্! একজন ঈশ্বর যদি থাকতো। খুব ভালোবাসতাম, খুব। অথচ নেই। মৃত্যুকে আমি ঘৃণা করি। মৃত্যু মানে ফুলস্টপ।

‘কাচ’ বানান যতোই চন্দ্রবিন্দুহীন করি, বন্ধুরা কেটে ‘কাঁচ’ করে দেয়। ফার্সি শব্দে নাসিক্য উচ্চারণ নেই বলে জানি। শেষ পর্যন্ত কী যে হবে! ‘নিশ্চয়ই’ বানান ‘নিশ্চই’ লেখায় প্রুফ রিডার বার বার ঠিক করছে। আর পৌনঃপুনিক হেরে যাচ্ছি। আমার প্রথম জন্মদিনের একটি ফটোগ্রাফ আছে। কেকের পেছনে রফিক আজাদের কোলে। কবি রফিক আজাদ ‘নিশ্চই’ এ বানানে ইদানীং লিখছেন দেখে প্রীত হলাম।

লেখার জন্য প্রতীক্ষা আর করি না। বরং নিরস্ত করি নিজেকে। কচকচানি ভাল্লাগে না। ফলে অতিরিক্ত লেখা আর তৈরি হয়ে ওঠে না।

কবির গোবেচারা দশার মুখোমুখি দাঁড়াতে হয় নি। বেদনা আছে। অন্যরকম। এই যে ঘরে, মাঝরাতে, শাহবাগ থেকে কী নিয়ে ফিরি? অনেক সুন্দর নিয়ে, সোডিয়াম বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে, কিন্তু পথে উপচানো ডাস্টবিন, ফুঁসে ওঠা স্যানিটারি ন্যাপকিন, মৃত বিড়ালের গলায় নীল নাইলনের ফাঁস। অই ফাঁসটুকু গলায় নেকটাই করে ঝুলাতে ঝুলাতে ঘরে ফিরি। বাথরুমে ন্যাংটো হয়ে লম্বা স্নান করি। দলাইমলাই সেই টাই নট্ পারে না খসাতে। খুনিদের প্রজাতি মানুষ বলে নিজেকে মনে হতে থাকে। আমি যে আসলে মানুষ নই, ভুলে যাই। ঘুমুতে যাই ফাঁস এঁটে। দমবন্ধ হয়ে আসে। ঘৃণার কফ জমে গলায়। মাঝরাতে শাহবাগ থেকে কী নিয়ে ঘরে ফিরি? অনেক সুন্দর বুকে নিয়ে, সোডিয়াম বাতির হলুদ আলোর বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে ভাষার ভেতরে এক ধরনের সন্ত্রাস চালাই, প্রটোকল-প্রাচীর-ফ্রেম ভেঙে ফেলি, মুক্তি দেই আভিধানিক দাসত্বের, ব্যাকরণ তাতে বাধ সাধে, প্রমিতিকাররা গাল দেন। তবু এ সন্ত্রাসের পক্ষে রায় দেন এলিয়টগণ…

এক রাজনর্তকী প্রতিদিন দুপুরে স্নান করে প্রাসাদের ছাদে চুল শুকাতো। আর বহুদূর থেকে ভেসে আসা বাঁশির সুরের সাথে আপন মনে নেচে চলতো, শুধু নিজের জন্য

ghughu logo final
ঘুঘু; সম্পাদক : রাসেল আহমেদ, সারাজাত সৌম; প্রচ্ছদ : সঞ্জীব পুরোহিত

আজকেই আলাপ হচ্ছিলো বন্ধুদের সাথে কবিতায় মিথের ভাঙাগড়া নিয়ে। কথা হচ্ছিলো ওল্ড টেস্টামেন্ট আর ন্যু টেস্টামেন্ট নিয়ে। গড >স্পিচ >প্রফেট; না, গড > প্রফেট >স্পিচ কোনটা আমাদের চিন্তাকে বেশি বৈধতা দেয়। serpent’র প্ররোচনায় জ্ঞানবৃক্ষের ফল এবং এর ফলাফল এখন আর ধোপে টেকে না। যুগল মোরগ মুরগি কিনে এনেছি আর তাতে হয়েছে এই ছানারা, সহজে মানলেও আদিতে মুরগি যে দু’টি থেকে সৃষ্টি হয় নি তা এ হাইব্রিড বিবর্তনের ভেতর তাকালেই লক্ষ করা যায়। কাজেই ডিম আগে না মুরগি আগে জাতীয় ধাঁধাগুলো মেধাশূন্য ঠেকে।

স্মৃতি হাতড়ে এক লোককাহিনি শোনাই। সম্ভবত মেক্সিকোর। খুবি জনপ্রিয় গাঁথা—

এক রাজনর্তকী প্রতিদিন দুপুরে স্নান করে প্রাসাদের ছাদে চুল শুকাতো। আর বহুদূর থেকে ভেসে আসা বাঁশির সুরের সাথে আপন মনে নেচে চলতো, শুধু নিজের জন্য। ওদিকে এক রাখাল বালক বাজাতো সে বাঁশি। বিশ্বাস করতো, কোনো এক রাজনর্তকী ওর সুরের সাথে নাচছে। কল্পনায় দেখতো ওর মনের মানুষের নাচের মুদ্রা। এদিকে রাজনর্তকীরো যেনো কী করে বিশ্বাস জন্মেছে, কোনো এক রাখাল বালক শুধু তার জন্যই বাজাচ্ছে এ বাঁশি। দিন যায়। মাস যায়। একদিন কী যে হলো! রাখাল বালকটিও বাঁশিতে তুলেছে পাগলা সুর। প্রতীক্ষার বাঁধ ভেঙে বাঁশিতে আকুল হয়ে ডাকছে প্রিয়াকে। সুরে সুরে বলছে, আজ আসতেই হবে। রাজনর্তকীরো অবস্থা বেহাল। নাচের তুফান তুলে তুলে সে উদভ্রান্ত। অজানা আহ্বানে সে উন্মাদ। একসময় ঝড় বেগে নেমে এলো মিনারের সিঁড়ি বেয়ে। দেখা আজ হতেই হবে। আমরা কল্পনায় দেখতে পারি শিল্পীর স্বর্ণকেশ বাতাসে উড়ছে। পরনে সেকালের মেঝে ছুঁয়ে যাওয়া দীর্ঘ ঘাগড়া। ঘোড়ার গাড়িতে গারোয়ানের আসনে ওর চড়ে বসা। অস্থির। বিমগ্ন। হ্রেষা তুলে ঘোড়ার ছুটে চলা। ক্ষুরের শব্দ। ধুলোর মেঘ। ফুলে ওঠা নাকের পাটা।

বাঁশির শব্দ ধরে এই ছুটে চলা। এক সময় কাছে এসেও উৎসকে ছাড়িয়ে যায়। পরশ পাথর সন্ধানীর উন্মত্ততায়। কিন্তু রাখাল বালক ঠিক ঠিক খেয়াল করে। সে বাঁশি হাতে পেছন পেছন ছুটতে থাকে অনেকটা পথ। হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে পায় নর্তকী। কান পেতে বাঁশির সুর খোঁজার চেষ্টা করে। গ্রীবা ঘুরিয়ে পেছনে তাকায়। দেখতে পায় রাখাল বালককে। রাশ টেনে ধরে। নেমে আসে। সেই নেমে আসার ভঙ্গি, পা ফেলা, বসন সামলানো সব কিছুই একেকটি নাচের মুদ্রা। শিল্পিত প্রকাশ। তারপর বাড়িয়ে দেয় দু’হাত। কিন্তু ওর বাড়িয়ে দেয়া আলিঙ্গনে ধরা দেবার আগেই বালকটি পড়ে যায়। এবং মারা যায়। শ্রান্তিতে। মহৎ শিল্প-প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবার নয়। হাত বাড়িয়ে দেয়ার মুদ্রাটি তখনি সার্থকতা পেতো যখন তার ভেতর শিল্পের সেই নিষ্ঠাটি মিশে থাকতো যাতে বালকটি বেঁচে ওঠে। সেই নাচের মুদ্রায়, তার বাড়িয়ে দেয়া হাতের মধ্যে এমন এক মায়া জুড়ে দেয়া, এমন বস্তুনিষ্ঠার প্রাসঙ্গিক রদবদল, এমন এক শিল্পদৃষ্টি, যা বাঁচাতে পারে। সারাতে পারে। তবেই আমরা বাঁচবো—স্নব পারমাণবিক বোমার হাত থেকে।

কবিতা নিয়ে প্রথমত ও প্রধানত ভাবি, কবিতা ও জীবন আলাদা কিছু না। কাজেই কবিতা-ভাবনা ও জীবন-ভাবনা বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। জীবনানন্দ যেমন বলেছেন: ‘কবিতা ও জীবন একই জিনিসের দুই রকম উৎসারণ।’ কাজেই কবিতা ভাবনা থেকে পাঠকের প্রধান প্রত্যাশা নিশ্চই কবিতার নানা টেকনিক সম্পর্কিত আলোচনা নয়। কবিতাকে, বিশেষত কারো কবিতাকে বুঝতে গেলে, তার জীবনবোধই প্রধান। কারণ এর বিম্বিত রূপটিই ওঁর কবিতা। সরাসরি মুখ দেখার বদলে আয়নায় প্রতিবিম্বিত মুখ দেখলে বাম গালের তিলকে ডান গালের মনে হতে পারে বৈকি।

এ-কথাটিই অন্যত্র বলেছি এভাবে—মেঘের দেবতা মিখাইলের কাছে মেইল করি। অলিখিতরা আকাশে ভাসে

তলস্তয়ের ফাদার সিয়ের্গি পড়ে যতোই ভালো লাগুক না কেন, ওঁর জীবনী ও জীবনবোধ সম্পর্কিত ধারণা থাকলে, প্রিন্স কাসাৎস্কির ফাদার হয়ে ওঠাটি পাঠক-মনের দুয়ারে এমনভাবে নক্ করে, যা তাকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। ব্যক্তি জীবনে তলস্তয়ের তের বছরের বালিকাকে ধর্ষণ বা গৃহপরিচারিকার সাথে সঙ্গম—এসব কিছুই নভেলেটটিতে বিম্বিত হয়েছে। কাজেই উত্তরাধুনিক সাহিত্য সমালোচকরা রচয়িতার ব্যক্তি জীবনকে যে প্রধান্য দেন, আমি এর ঘোর সমর্থক। সেলিম আল দীন সমকালীন রবীন্দ্রনাথ ব্যাখ্যাদাতাদের মধ্যে অন্যতম। আমরা নানা রাবীন্দ্রিক জিজ্ঞাসায় ওঁর দ্বারস্থ হই। কিন্তু শান্তিনিকেতন থেকে রবীন্দ্রনাথ একজন শিক্ষককে বহিষ্কার করেছিলেন ছাত্রকে দিয়ে তেল মাখানোর অপরাধে! এর কাউন্টারে বলা যেতে পারে বাদশা আলমগীরের কথা। ছেলে শুধু জল ঢালছে, শিক্ষকের পা কেনো হাত দিয়ে ধুয়ে দিচ্ছে না, এ প্রশ্ন করেছেন। কিন্তু বিনয়ের অবতার এই বাদশা আলমগীর হচ্ছে আওরঙ্গজেব। যে ক্ষমতার জন্য ভাই হত্যা করেছে। বাবাকে করেছে বন্দী। কাজেই রবীন্দ্রনাথ জানতেন, ছাত্র শিক্ষকের সঠিক সম্পর্কটি কী হতে পারে।

কবিদের মধ্যে পক্ষ-বিপক্ষ আছে। আমার সমস্যা হচ্ছে কাকসমস্যা। যে ছোট কাগজটি সম্পাদনা করি, তার নামো ‘দাঁড়কাক’। কবিদের মধ্যে এক ধরনের কাকসাম্য আমার অভিপ্রেত। সামষ্টিক উন্নয়নে আমার আস্থা। ‘নিউইয়র্কে রবীন্দ্রনাথ’ কবিতায় কবি অমিয় চক্রবর্তী আকাশচুম্বি স্কাইক্রেপার্স এবং রবীন্দ্রনাথের তুলনা করে অনেকবার বলছেন, কে বড়? আধুনিক স্থাপত্যকলার সাফল্যের বিপরীতে রবি ঠাকুরের জীবনবোধের নিঃসংশয়তার তুলনা করেছেন। সুতরাং তিনি অনেক বড়। টুইন টাওয়ার ট্রাজেডি তিনি দেখে যেতে পারেন নি। তথাকথিত রবীন্দ্রবিরোধী বিষ্ণু দে’র মতো আধুনিকতার পক্ষে আমি নই। বিষ্ণু দে’র রবীন্দ্রনাথের পঙক্তি সামান্য পরিবর্তন করে উদ্ধৃতিচিহ্নহীন ব্যবহার চোখে লাগে। “আমি চঞ্চল তাই, তাই সুদূরের পিয়াসী/আমি তাইতো আকাশে কান/পেতে শুনেছি তোমার গান, হে মোনালিসা, হে সাইনারা।” ‘সুচিত্রা মিত্রের গান শুনে’ শীর্ষক কবিতায় “আমরাও জানি তা, ভাবিও তাই যে,/তাই মনে রং ধরে সুগন্ধে ঘনায় রবীন্দ্রসঙ্গীতে/নন্দিত জীবনে নির্ভীক অজস্র রঙে ফুল ফোটে।” আমি রবীন্দ্রনাথের পক্ষের মানুষ।

লিখতে চাই না। বাধ্য হই। এ আমার গোপন মন্ত্র। এক ধরনের অবদমন। বিষ! তবু ফুল ফোটায়। মাথায় থিম এলো। পাত্তা দিলাম না। সামান্য জ্বরকে যেমন জ্বর বলে না। বলে গা গরম। অমন। কিন্তু সে জ্বর প্রায়ই আসে, থেকে থেকে। বছর গড়ায় বছরে, তা কবিতা-জীবাণু সংক্রমণ বলে ধরে নেই। সবচেয়ে ভালো এন্টিবায়োটিক হলো লিখে ফেলা। এ-কথাটিই অন্যত্র বলেছি এভাবে—মেঘের দেবতা মিখাইলের কাছে মেইল করি। অলিখিতরা আকাশে ভাসে। বেশির ভাগ চলে যায় এন্টার্কটিকায়। ধরা ছোঁয়ার বাইরে। কেউ কেউ গোঁ ধরে। এক সময় ভারী হয়। ঘন হয়। বাতাস হাঁপ ছেড়ে বাঁচতে চায়। চারদিক গুমোট হয়ে ওঠে। আর্দ্রতা যায় বেড়ে। ঘামা ঘামা শরীর। লেপ্টে থাকে গায়ের সাথে জামা। দোয়াত কালো মেঘ করে। বাতাসের ঝাপ্টায় জান্লা দিয়ে ঝরে কবিতার খাতায়। কালো কালো দাগ পড়ে। আধো অজান্তেই বরণ করি কালিদাসত্ব। আমার ভাষা হয়ে ওঠে আমার। বাংলা ইংরেজি আরবি পেন্সিল পাইলট পার্কার কম্প্যুটার কারো নয়। আমার।

কবির বিপরীত লিঙ্গ ‘মহিলা কবি’ বয়কট করেছি স্কুলেই। আবার প্রত্যাখ্যান করেছি তথাকথিত নারীবাদীদের

ক্ষুধার কোনো মাতৃভাষা নেই। তাই মাতৃভাষা প্রীতি আমার নেই। বন্ধুরা বন্ধুর হয়। হাত মুঠো করে। দাঁত দেখায়। বাংলায় লিখতে মানা করে। মধ্যযুগের কবি শেখ আব্দুল হাকিমকে বোঝানো যায়। ওদের না। আঠারো শতকের জোহান গটফ্রায়েড হারডার হেসে ওঠেন। কারো কাছে একুশ মানে ‘ওরা আমার মায়ের ভাষা কাইড়্যা নিতে চায়’। কারো অসম্ভব বিশ্বাস, একুশ মানে মাথানত না করা। আবার ’৫২ এলে ফাগুন পেরিয়ে আসন্ন গ্রীষ্মের কৃষ্ণচূড়ায় সালাম রফিক জব্বার হয়ে ফুটবো। কারণ যুদ্ধটা শাসক বনাম শোষিতের।

…খুব সহজ করে লিখি। ভাদ্রের দুপুরে নৌযান বিঘ্নিত করা অভদ্র কুয়াশা ডাকি না। ভোলা যাবার পথ ভুলিয়ে যে নিয়ে যাবে জীবনানন্দ’র বাড়ি। চোখে দেখি, কানে দেখি, ত্বকে দেখি, নাকে দেখি। সব মিলিয়ে মিশিয়ে প্রপিতামহের চোখ ধার করেও দেখি। আর তুলি ছবি। গরু রচনার বদলে জমা দিই ফটোগ্রাফ। মুশকিল হলো, যখন সাধের কালো বাছুরের ওপর চড়ে বসে ঐশ্বর্য রাইরূপী ফিঙে, তখন অনেকখানি সন্ধ্যা। ওদিকে ফ্লাশ নেই। কাজেই জুটে যায় অদ্ভুত সিল্যুট। চিত্রের বদলে চিত্রকল্প।

নারী পুরুষ আমার কাছে লিঙ্গ নির্দেশক বিশেষ্য নয়। বিশেষণ। একজন নির্যাতক, সে অবয়বে নারী হলেও আসলে পুরুষ। ‘পুরুষ’ আমার কাছে নেতিবাচক অভিধা। আবার ‘বাঙালি’ ইতিবাচক অভিধা। কাজেই গিন্সবার্গ আমার কাছে বাঙালি। কবির বিপরীত লিঙ্গ ‘মহিলা কবি’ বয়কট করেছি স্কুলেই। আবার প্রত্যাখ্যান করেছি তথাকথিত নারীবাদীদের। PONDS নারী দিবসে র‌্যালি করছে। ভার্জিন কোলা গিলে টিকিয়ে রাখছে সতীত্ব’র কনসেপ্ট। ভ্রুণহত্যা সাপোর্ট করি না বলে বোভোয়ারকেই করেছিলাম বয়কট। যখন জানলাম চিত্রতারকা ক্যাথেরিন ডেনিউফ এবং ডেলফিন সেরিংসহ ৩৪০ জন নারীর সাথে বোভোয়ার এক বিবৃতি দেন—গর্ভপাত করেছেন। পরে অবশ্য স্বীকার করেন, তিনি তা করেন নি, আন্দোলনের স্বার্থে মিথ্যাচার করেছেন, কেবল তখনি আমার প্রিয়া হয়ে ওঠেন। রবীন্দ্রনাথ আমার মা। কেনোনা আমার মানসিক পুষ্টিতে ওঁর ভূগোলের জল ভেজা কেতকীর হিম সুবাস মাখা জলবায়ু, নদীনালার অবদান রয়েছে। একই গাছ, শুধু জলের পাশে রোপণের জন্য বাড়তি ফলন দিলো, তেমনি জলাধার রবীন্দ্রনাথ। আমার এবং আমাদের ।

বুকের অতিরিক্ত দুধ তিনি বাটিতে করে কুকুর শাবককে খেতে দিতেন

আজীবন একটি প্রেমের কবিতা লিখতে চেয়েছি অথচ হয়েছে এমন:
লেখা হলো। ফেলা হলো পোস্টবক্সে, গোলাপি খামে পুরে। সে কবিতা ভুল করে ডমেস্টিক সার্ভিস ছেড়ে ইন্টারন্যশনাল মেইলে ঢুকে পড়লো। পৌঁছে গেলো নাইজারে। একটি শিশু সেটি খুলে পেলো এক টুকরো পাউরুটি। এভাবে কবিতা কনভার্ট হচ্ছে অন্য কিছুতে। প্রতিদিন।

যে অনুভব পাঠাই পাঠককে, বিমূর্ততা তাকে ব্যাহত করে কখনো। সন্দেশ পাঠালে এক টুকরো গুড়, নিদেনপক্ষে এক চামচ চিনি হলেও মানা গেলো। কিন্তু তাই বলে নুন! পুরো রিভার্স! তাই পছন্দ করি সৃজনশীল টেকনিক। হতে পারে উত্তরাধুনিক কবিতার ব্রিকোলাইজেশান। বৈসদৃশ খণ্ডচিত্রের সমাহারে দেয়াল গড়ে তোলা। আপাত দুরূহ মনে হতে পারে। কিন্তু ভেতরে এক অব্যক্ত বোধ জন্মায়। তাকে দুর্বোধ্য বলা চলে না। মিষ্টির কথা না বলে, আমলকি খাইয়ে দেয়া। তারপর জল। এভাবে রসনায় নিয়ে আসি তাকে, মিঠা অনুভবে, আমার কবিতা পড়া প্রাণেদের।

এই রচনাটি শুরু করেছিলাম বাংলাদেশের মানচিত্রের সর্বদক্ষিণে যে লেজটা রয়েছে তার শেষ বিন্দুতে দাঁড়িয়ে। ডানে সেন্ট মার্টিনের ঈষৎ আভা। বাঁয়ে প্রকট হয়ে আছে নীল পাহাড়ের দেয়াল। ওপারে তখন বন্দী সু চি। আমার সঙ্গীটি একসময় কয়েকটি অতিরিক্ত রুটি বানাতেন একটা পুরুষ হনুমানের জন্য। সাত সকালে ডাল থেকে নেমে আসতো নাস্তা করতে। বুকের অতিরিক্ত দুধ তিনি বাটিতে করে কুকুর শাবককে খেতে দিতেন! ভালোবাসি সেই সুন্দর সহকর্মীকে।

চমৎকার একটা রাখাইন পল্লী। সুরভিত ওদের হোমমেড ড্রিংকস। গোলপাতার ঝাড়ঘেঁষে ছোটো ছোটো ক্ষেতে ধানের ডগারা, নাফ নদীর উপর দিয়ে উড়ে আসা হাওয়ায় খলবল করে হাসছে। চোখ বুজে নিজেকে বলেছি, ঢাকায় ফিরে প্রতি বেলার শাদা শাদা ভাতেরা যেন এ সবুজকে মনে করিয়ে দেয়।⌊⌉

ছোটকাগজ ঘুঘু’র বইমেলা সংখ্যায় প্রকাশিত
Sanjib Puroh

সঞ্জীব পুরোহিত

জন্ম ২৭ আগস্ট ১৯৭৮, ঢাকা।

ই-মেইল : darkak1978@gmail.com
Sanjib Puroh