হোম পুনর্মুদ্রণ গদ্য কেন পড়ব কাজীর কবিতা

কেন পড়ব কাজীর কবিতা

কেন পড়ব কাজীর কবিতা
1.72K
0

এ কথা আজ স্পষ্টভাবেই বলা যায়, বাংলা কবিতার মূলধারা নজরুলের কাব্যপ্রয়াস থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত অভিমুখে সরে এসেছে। আজকের তরুণ কবির অভিনিবেশের প্রান্তিক বিন্দুতেও আর খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয় তাঁকে। কবিদের এই অভিজ্ঞতা শেষ পর্যন্ত কবিতার নতুন সম্ভাবনা কোথায় কিভাবে জাগিয়ে তুলছে, সেই প্রশ্ন এখানে তুলছি না। আমরা শুধু দেখতে পাচ্ছি, জনপ্রিয়তার বিপরীতে এল জনবিচ্ছিন্নতা, অধিগম্যতার পাল্টা পথে গহন নির্জনতা। সহজ কথায়, এটা বাংলা কবিতার একটি দশামাত্র, বৈশিষ্ট্যসূচক কোনো নির্দেশনা নয়। তবু যদি একে সংকট হিসেবে মেনে নিতে পারি, তবে অনুসন্ধানী মন নিয়ে আমাদের একবার পেছন ফিরে তাকাতেই হবে। অর্থাৎ, যা ফেলে এসেছি, তাকে আবার যাচাই করে দেখা।

নজরুলপ্রতিভার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন অগ্নিবীণা হাতে নিয়ে আমরা বরং একটা চিহ্নসূত্র খুঁজে বের করতে পারি, যা থেকে হয়তো আজকের কবিতার বিচ্যুতি নিয়ে খানিকটা আলোচনার দিকে এগোনো যাবে। এ কাব্যের কিছুদূর মাত্র অগ্রসর হলেই আমরা বুঝতে পারি, আগুন ও বীণা উভয়ই আমাদের সামনে উপস্থিত। সহসা মর্মে জাগে উদ্দীপনা, শ্রবণে ঝংকার। বাংলা কবিতায় এটা কি সত্যিই অভিনব ছিল? মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর মেঘনাদবধ কাব্যের প্রথম সর্গে ভণিতায় বলেছিলেন: ‘গাইব, মা, বীররসে ভাসি,/ মহাগীত।’ কিন্তু তিনি তাঁর এই প্রতিশ্রুতি ঠিক পর মহূর্তেই বিস্মৃত হয়েছেন। একরকম শোকগাথার রূপ লাভ করেছে কাব্যটি। এতে মহাকাব্যের শর্তভঙ্গ হয়েছে কি হয় নি, তা আমাদের আলোচ্য নয়। আমরা বলতে চাইছি, বাঙালির নিজস্ব কাব্যে, আখ্যানে, গীতিকা-পালায় বীরগাথার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। বীরত্বব্যঞ্জক চরিত্রও প্রায় অনুপস্থিত। মধুসূদন শেষ পর্যন্ত এরই ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছেন। যে কারণে তিনি রাবণের পক্ষাবলম্বন করেন, সেই একই কারণে রবীন্দ্রনাথও গিয়ে দাঁড়ান কর্ণের পাশে; বলেন: ‘যে পক্ষের পরাজয়/ সে পক্ষ ত্যজিতে মোরে করো না আহ্বান।/ রাজা হোক, জয়ী হোক পাণ্ডবসন্তান।/ আমি রব নিষ্ফলের হতাশের দলে।’

এই যে মানবিক কাতরতা নিয়ে পরাজিতের পক্ষে দাঁড়ানো, তার কারণ কি জাতীয় জীবনের ঐতিহাসিক পরাজয়? বারবার বহিঃশত্রুর দ্বারা আক্রান্ত হওয়া? ঔপনিবেশিক বাস্তবতা? নিগূঢ় হিন্দু-মনস্তত্ত্ব? সে যা-ই হোক, বাংলা সাহিত্যে নজরুলই প্রথম ব্যতিক্রম, আদিম উন্মাদ, যিনি এসেছিলেন বীরগাথা রচনার জন্য। শিল্প সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল খুবই স্বচ্ছ:

`আজ আর এই পোড়া দেশে মড়ার শ্মশানভূমিতে “শুধু হাসি খেলা, প্রমোদের মেলা” কাব্যকুঞ্জের মধু গুঞ্জন শোভা পায় না, সে নির্লজ্জ অভিনয় নিদারুণ উপহাসের মতো প্রাণে এসে বেঁধে। আজ চাই মহারুদ্রের ভৈরব গর্জন, প্রলয় ঝঞ্ঝার দুর্বার তর্জন, দুর্দম দুর্মদ উচ্চৈঃশ্রবা ঐরাবতের প্রমত্ত বিপুল রণ-উন্মাদ আর তাদের হ্রেষা বৃংহণের গগনবিদারী প্রচণ্ড নাদ। আজ অলক-তিলকের সুচারু বিন্যাস মুছে ফেলে ধক্ ধক্ জ্বলন্ত বহ্নিশিখার মতো ললাটে ভস্ম ত্রিপুণ্ড্রক পরতে হবে।’  [আজ চাই কি]

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, মহারুদ্রের ভৈরব গর্জনে শুধু নয়, নজরুল নিজেও যখন কবিতায় হাসি-খেলা, প্রমোদের মেলা বসিয়েছেন, তখনো একটা বড় সম্বল ছিল ঝংকার—ধ্বনিব্যঞ্জনা তৈরির নিজস্ব এক শব্দগাণ্ডিব। স্মরণ করুন: ‘কুহেলীর দোলায় চড়ে/ এল ওই কে এল রে…।’ অর্থাৎ, ধ্বনি ও স্বরাঘাত তাঁর কবিতায় শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো জড়িয়ে আছে। কেবল এই শক্তিতে ভর করে দুটি ভিন্ন ভাষার বাগভঙ্গিকে একসঙ্গে জুড়ে দিতে পেরেছেন কত অনায়াসে, তার একটি উদাহরণ: ‘কাণ্ডারী এ তরীর পাকা মাঝিমাল্লা/ দাঁড়ি-মুখে সারিগান লা শরীক আল্লা।’ প্রায় ১০০ বছর আগে বাংলা কবিতায় যে ধ্বনির উল্লাস জেগে উঠেছিল, আজ তা প্রায় অবসিত। আধুনিকতাবাদ একে অনিবার্য করে তুলেছিল, সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ধ্বনিবিসর্জনের মধ্য দিয়ে আমরা কবিতার বিশেষ কোনো সম্ভাবনাকে ত্যাগ করে এসেছি কি?

 

২.

শব্দ কেবল তার অর্থ দিয়েই যদি আমাদের সংবেদনকে নাড়া দিত, তবে ‘টকটকে লাল’ কথাটা লাল রঙের বাইরে বিশেষ কোনো অভিঘাতই ফেলতে পারত না। কারণ, ‘টকটকে’ শব্দটার সুনির্দিষ্ট কোনো অর্থ নেই। অতিপরিচিত এই উদাহরণ থেকে শুধু এ কথাই বলতে চাইছি, অর্থের বাইরেও ধ্বনি একটি বিশেষ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টিকারী মাধ্যম। গদ্যে বিন্যস্ত শব্দগুলো বাক্যে যে অর্থ উৎপন্ন করে, কবিতায় তা বিশেষ স্বর-অভিক্ষেপে তার অতিরিক্ত ব্যঞ্জনা নিয়ে আসতে পারে।


আমাদের আলোচনার প্রতিপাদ্য এটা নয় যে, সব বন্ধ দরজা খোলার একমাত্র চাবি ‘ধ্বনি’। কেবল এটুকু স্বীকার করা, আমরা একটি সম্ভাবনাকে হত্যা করেছি।


কিন্তু ধ্বনিকে কেবলই উপরিতলের বিষয় আর বহুজনের মিলিত উদযাপনের প্রসাদ ভাবার ফলে আধুনিকতাবাদী মন এক ঝটকায় কবিতাকে সেখান থেকে সরিয়ে এনেছে। কবিতা হইচই বা কোলাহলের বিষয় নয়, তা একাকী নির্জনে নিঃশব্দে অনুভবের চকিত উদ্ভাসমাত্র—এমন আড়ম্বরপূর্ণ উচ্চারণ আমরা অনেক শুনেছি। ফলে, আজকের কবিতার দুর্বোধ্যতা আকস্মিক বা অপ্রত্যাশিত কোনো ঘটনা নয়, বরং এ-ই চেয়েছিলাম আমরা। এখন আফসোস হচ্ছে, যখন দেখছি, কবিতা তার প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির সব ক্ষমতাই হারাতে বসেছে।

আমাদের আলোচনার প্রতিপাদ্য এটা নয় যে, সব বন্ধ দরজা খোলার একমাত্র চাবি ‘ধ্বনি’। কেবল এটুকু স্বীকার করা, আমরা একটি সম্ভাবনাকে হত্যা করেছি। পাশাপাশি পুনরায় তদন্ত করে দেখা, কোলাহলকে চাপা দিতে গিয়ে আমরা কি প্রকারান্তরে বহুজনের স্বরকে থামিয়ে দিই নি শ্বাসরোধী কবিতার মন্ত্রে? বহুজনের বহু স্বর কিভাবে একটি কণ্ঠে সংহত হয়ে ম্যাস-ন্যারেটিভ তৈরি করে, তার উদাহরণ আমরা পাব মুখ্যত পুথিসাহিত্যে। নজরুলকে তার বিশ-শতকী উত্তরাধিকার সরাসরি হয়তো বলা যাবে না, তবে কয়েকটি লক্ষণ টুকে রাখা যেতে পারে।

পুথিসাহিত্যের ভাষা প্রধানত গণমুখী। গণমুখিতার দায় অনুভব করেছেন কবি নজরুলও, একটু ভিন্নভাবে। তাঁর স্বীকারোক্তিমূলক জবানে আমরা জানতে পারছি, কবিতায় আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার কিংবা দেবদেবীর নাম উচ্চারণ করেছেন তিনি মূলত হিন্দু-মুসলমানের ভেদমূলক অভ্যাসের নিগড় ভাঙতে, অর্থাৎ ভাষার ভেতর গুম মেরে থাকা সাম্প্রদায়িকতাকে আঘাত করতে। এতে যে কাব্যের সৌন্দর্য কিছুটা আহত হয়, সে সম্পর্কেও নজরুল ওয়াকিবহাল ছিলেন। একটি চিঠিতে তিনি লিখছেন:

বাংলাসাহিত্য হিন্দু-মুসলমান উভয়েরই সাহিত্য। এতে হিন্দু দেবদেবীর নাম দেখলে রাগ করা যেমন অন্যায়, হিন্দুরও তেমনি মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের মধ্যে নিত্য-প্রচলিত মুসলমানি শব্দ তাদের লিখিত সাহিত্যে দেখে ভুরু কোঁচকানো অন্যায়। আমি হিন্দু-মুসলমানের মিলনে পরিপূর্ণ বিশ্বাসী। তাই তাদের এ-সংস্কারে আঘাত হানার জন্যই মুসলমানি শব্দ ব্যবহার করি, বা হিন্দু-দেবদেবীর নাম নিই। অবশ্য এর জন্যে অনেক জায়গায় আমার কাব্যের সৌন্দর্য হানি হয়েছে। তবু আমি জেনেশুনেই তা করেছি।

এ ক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্য, সাহিত্যের ভাষার একটা স্থাপত্য-সৌন্দর্য আছে। এই সৌন্দর্যের সাথে সাবলীলতাকে যদি শর্ত হিসেবে জুড়ে দিই, তবে বলতে হয়, সাবলীলতাও একটা সংস্কার, অভ্যাসের ব্যাপার। আর যেকোনো সংস্কার রাজনৈতিক তৎপরতার মনস্তাত্ত্বিক ফলাফল। কিন্তু সাহিত্য যখন সংস্কার ভাঙতে চায়, তখন সে সাবলীলতাকেও কিছু মাত্রায় আঘাত করে। তাই আপাত সৌন্দর্যহানিও ঘটে। আর এককালের সৌন্দর্যহানি কালান্তরে সম্মানীও পায়। সে বিবেচনায় নজরুল যে ঝুঁকিটি নিয়েছিলেন, তার সামাজিক তাৎপর্য অনুধাবন করাও জরুরি। নইলে আজকের নন্দনতাত্ত্বিক সংকটের মূল আঙিনায় আমরা প্রবেশ করতে পারব না।

 

৩.

বাংলা কবিতার উদ্ভব ঐতিহাসিক দিক থেকে বিচার করলে আমরা দেখতে পাব, বিভাষী ধর্মতত্ত্বকে পর্যালোচনা করেই এর বুনিয়াদ রচিত হয়েছে। অর্থাৎ, মূলধারার সব মহাপুরাণকে সেদিন লৌকিক পুরাণে রূপান্তর করার কাজই ছিল তার প্রধান দায়। ফলে, কাব্যের অভিমুখ ছিল জনচিত্ত। জনচিত্ত বলে একটি অখণ্ড রূপের ধারণায় উপনীত হওয়া আজকের প্রেক্ষাপটে প্রায় অসম্ভব। হয়তো তেমন অখণ্ড ছিলও না। ঔপনিবেশিক কালপর্বে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে এই জনচিত্ত বহুখণ্ডিত, বহু ধারায় বিভক্ত হয়েছে এবং ঔপনিবেশিকতারই হাত ধরে ব্যক্তি-আমি উঠে দাঁড়িয়েছে জনচিত্তের বিপরীত মেরুতে।

নজরুল এই দুই মেরুতে একটা সংযোগ রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন। অন্যভাবে বলতে গেলে, অন্তর্বাস্তবতা-বহির্বাস্তবতা, ব্যক্তি-সমষ্টি, আধুনিক-রোমান্টিক, হিন্দু-মুসলিম, স্বদেশি-বিলাতি, প্রাচ্য-প্রতীচ্য, ধর্ম-প্রগতি, সম্ভ্রান্ত-সর্বহারা—এমনতর বিচিত্র বাইনারি বিচারের এজলাসে বসে তাঁকে দুকূল রক্ষায় প্রাণান্ত হতে হয়েছে। টাল খেয়ে পড়েছেন কখনো-বা। কিন্তু ত্রিশের দশকের কবিদের মতো চৈতন্যে প্রবাসী হতে পারেন নি পুরোপুরি। আর তাই তাঁর কবিতায় এলিয়েনেশন কম, জাতীয়তাবাদী তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে, শেষাবধি গণসংযোগ একভাবে রক্ষিত হয়েছে বলে।

ভিড়ের মধ্যে নিজেকে ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু অস্তিত্বকে লীন করে দেওয়া যায় না। হয়তো সবাই তা পারে না। শুধু যে কোলাহল জাগে, সে ধ্বনিতরঙ্গে ডুবিয়ে দেওয়া যায় আপন কণ্ঠস্বর। এই উত্তাল ধ্বনিরাশির সন্ধানই আমরা পেয়েছি কাজীর কবিতায়। আর তাকে একদিন অবজ্ঞায় ফেলে এসেছি সন্ধ্যানদীর পারে। এই ভাদ্রে সেই নদী ফের ডাক পাঠাল বুঝি।

 

দৈনিক প্রথম আলো, ২৯ আগস্ট ২০১৪
সোহেল হাসান গালিব
গালিব

সোহেল হাসান গালিব

জন্ম : ১৫ নভেম্বর ১৯৭৮, টাঙ্গাইল। বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর।
সহকারী অধ্যাপক, ঢাকা কলেজ, ঢাকা।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
চৌষট্টি ডানার উড্ডয়ন ● সমুত্থান, ২০০৭
দ্বৈপায়ন বেদনার থেকে ● শুদ্ধস্বর, ২০০৯
রক্তমেমোরেন্ডাম ● ভাষাচিত্র, ২০১১
অনঙ্গ রূপের দেশে ● আড়িয়াল, ২০১৪

সম্পাদিত গ্রন্থ—
শূন্যের কবিতা (প্রথম দশকের নির্বাচিত কবিতা) ● বাঙলায়ন, ২০০৮
কহনকথা (সেলিম আল দীনের নির্বাচিত সাক্ষাৎকার) ● শুদ্ধস্বর, ২০০৮।

সম্পাদনা [সাহিত্যপত্রিকা] : ক্রান্তিক, বনপাংশুল।

ই-মেইল : galib.uttara@gmail.com
সোহেল হাসান গালিব
গালিব