হোম পুনর্মুদ্রণ গদ্য করুণ কমলালেবু

করুণ কমলালেবু

করুণ কমলালেবু
509
0

ব্যস ওটুকুই। ওতেই ঘটে গেল ভয়াবহ দুর্ঘটনা। ওই মুহূর্তক্ষণের ছোঁয়া এখনো বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেন শাহিনা

আচমকা শাহিনা আক্তার তার গেটে লাগানো পোস্টবক্সে একটি ব্যক্তিগত চিঠি পেলেন। এবং তিনি কিছুটা বিস্মিতও হলেন। পোস্টবক্সে যেসব খাম জমা হয় তাতে বেশিরভাগই থাকে বিদ্যুৎ বিল কিংবা এই ধরনের কাগজপত্র। ব্যক্তিগত চিঠি অনেক দিন পান না। আজকাল মোবাইলের যুগে কে কাকে চিঠি লেখে! মাঝেসাঝে খৎনা কিংবা বিয়ের নিমন্ত্রণ কার্ড অবশ্য আসে। নিমন্ত্রণ কার্ডগুলো বেশি আসে বর্ষাকালে। কিন্তু এখন বর্ষাকাল না; হু হু শীত। তাছাড়া নিমন্ত্রণপত্রের খাম বেশ রঙচঙে হয়, এমন সাদামাটা না। শাহিনা পুলিশ-রঙা খামটা আলতো করে সবুজ শিরাময় দু’ আঙুলে নিলেন।

এবার শীত পড়েছে বেশ। যেমন হয় : আগের বছরের চে’ অনেক বেশি। এক এক সময় হাত-পা আক্ষরিক অর্থেই জমিয়ে দিতে থাকে। এই মুহূর্তে গাঢ় লাল জ্যাকেটে নিজেকে শাহিনার মোমের মূর্তি মনে হতে থাকে। শীতের নিছক চিন্তা বাদ দিয়ে তিনি চিঠিতে মন দিলেন।

হঠাৎ চিঠি আসাটা তার বিস্ময়ের প্রধান কারণ নয়। পোস্টবক্স যেহেতু আছে চিঠি তো আসতেই পারে। কিন্তু খামে লেখা প্রেরকের নামটা তাকে অনেকখানি চমকিত করল। সেই সঙ্গে তিনি কিছুটা আসক্তিও বোধ করতে লাগলেন। গোটা গোটা মেয়েলি হাতের হরফে গাঢ় নীল কালিতে লেখাগুলি তিনি দ্বিতীয়বার পড়লেন।

‘রূপক রহমান, শান্তিবাগ, ঢাকা- ১২১৭।’

রূপক রহমান! নামটা তার ঠিক অপরিচিত নয়। আবার এতটা পরিচিতও নয় যে তার কাছে চিঠি চলে আসবে। শাহিনা তার হাতে কাঁপুনি টের পেতে লাগলেন। গরম জ্যাকেটের মধ্যে তিনি ঘেমে উঠলেন। তার হলদে ফরসা ত্বক লাল হয়ে উঠলো।

বছর খানেক পেছনে যাওয়া যাক। সম্ভবত দুই বছর। কিংবা আড়াই।  তিন কিংবা দেড়ও হতে পারে। শাহিনা গিয়েছিলেন তার অফিসের এক কলিগের বোনের বিয়েতে। কলিগের বোনটিকে তিনি আগে থেকেই চিনতেন। এমনকি পাত্রকেও তিনি আগে থেকেই চেনেন। কিন্তু যেহেতু এ ঘটনার সাথে পাত্রীর বিয়ের ব্যাপারটি ছাড়া আর কোনোই ভূমিকা নেই তাই তাদের ব্যাপারটা উহ্যই থাক।

যথারীতি বিয়ে শেষ হলে পর শাহিনা চলে যাবেন। সানাইয়ের সুরে বুঁদ হয়ে আছে গোটা বাড়ি। অচেনা কোনো একটা রাগ বেজে যাচ্ছে তুষারপাতের মতো মিহিস্বরে। শুনতে বেশ লাগছে, কিন্তু বাড়িতে তাড়াতাড়ি ফেরার জোর তাগিদ ছিল। তার স্বামী আহসান মাহমুদ দু’দিন ধরে বেশ অসুস্থ। কাজের মেয়েটা বাসায় নেই। তিন-চারদিন হলো মেয়েটা ছুটি নিয়ে বাড়ি গেছে। যদিও ভয়াবহ কোনো অসুখ না, স্রেফ সর্দি-জ্বর, কিন্তু এ অবস্থায় একজন রোগীকে রেখে এসে বিয়ের নিমন্ত্রণে সময় কাটানো কিছুটা দৃষ্টিকটু। অন্তত নিজের কাছে। বিশেষ করে শাহিনার মতো একজন মেয়ের জন্য (কিংবা মহিলা) এটা ভাবাই যায় না।

কলিগকে বললেন। পাত্র-পাত্রীর কাছে ঘটা করে বিদেয়পর্ব শেষ করলেন। দরজা খুলে বের হবেন এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে মুখ ভর্তি দাড়ি, একমাথা ঝাঁকড়া চুল, গায়ে কালো পাঞ্জাবি—একটা ছেলে ঘরে ঢুকল। ঢোকার সময় ঘটনাবশত শাহিনার সাথে তার সামান্য একটু ছোঁয়া লাগল। কলাপাতায় বাতাস লাগলে সে নিচু হয়ে যেভাবে ছুঁয়ে দেয় কলার লাল মোচা তারপরই আবার সরে যায় ঠিক তেমন এ স্পর্শ। এই অল্পতেই তার সারা গায়ে একটা শিহরণ বয়ে গেল। ভেজা খালি পায়ে কেউ বুঝি শক খেল। শাহিনা একবার ঘুরে তাকালেন। ছেলেটাও স্যরি বলে একবার ঘুরল। আবার দৌড় দিল ভিতরে। ভিতর থেকে তখন কেউ সজোরে ডাক দিল, আরে রূপক। মিস্টার নাইস গাই! আয় আয়। কণ্ঠটা খুব সম্ভবত পাত্রীর। ব্যস ওটুকুই। ওতেই ঘটে গেল ভয়াবহ দুর্ঘটনা। ওই মুহূর্তক্ষণের ছোঁয়া এখনো বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেন শাহিনা।

অদ্ভুত ব্যাপার। তারচেও বেশি অন্যায়। ছেলেটার বয়স বড়জোর ছাব্বিশ-সাতাশ হবে। শাহিনার চল্লিশে পড়লো। এখনো মেনোপজ শুরু হয় নি তার, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তিনি ভীষণ কামুক প্রকৃতির মহিলা। ঠিক মতো ধর্ম-কর্ম করেন না, কিন্তু মাঝে মধ্যে দু’এক ওয়াক্ত নামাজ পড়ে ফেলেন। এবং তারচেও বড় ব্যাপার তিনি আহসান সাহেবকে ভালবাসেন। তারও চেয়ে বড় যে ব্যাপার তা হলো তিনি তুষ্ট। পনের বছরের বিবাহিত জীবনে তিনি কখনো অতৃপ্তি অনুভব করেন নি। কিন্তু সবকিছু ওলট পালট করে দিল হঠাৎ যুবক রূপক।

নাকি স্রেফ শরীরের টান? শুধু শরীরের পক্ষে কি টান দেয়া সম্ভব? এভাবে!

একটি মুহূর্তের ছোঁয়া। বড় অস্বস্তিকর। উহুঁ, তিনি ঘেন্না অনুভব করেন নি কোনোদিন। বরং এক ধরনের যন্ত্রণা অনুভব করতে থাকলেন। ক্রমশ অস্বস্তি বাড়তে লাগল। গাড়িতে আসার সময় আধ ঘণ্টা সময় শাড়ি দিয়ে হাত ঘষতে লাগলেন। তার সাদা শঙ্খের হাত লাল টকটকে হয়ে উঠলো। এক বার ড্রাইভার পেছনে তাকিয়ে বলল, ‘আপা, কিছু হইছে?’

তিনি ধমকে উঠলেন, ‘কিচ্ছু না। তুমি সামনে তাকিয়ে গাড়ি চালাও।’

‘বিয়াবাড়িতে কিছু হইছে? কেউ কিছু কইছে আপনেরে? কোনো প্রোব্লেম হইলে আমারে কইতে পারেন। আপনের জন্যে আমি জান দিয়া দিমু।’

শাহিনা বিরক্ত হয়ে ধমকে উঠলেন, ‘অ্যাই, তুমি চুপচাপ গাড়ি চালাও। বেশি কথা বল!’

ড্রাইভার হতচকিত হয়ে গেল। আপা এমন ভাষায় কখনো কথা বলেন না। তার চেহারায় আহত হবার ব্যাপারটা ফুটে উঠলো প্রকটভাবে। শাহিনার তা চোখেও পড়লো না। তার তখন সমস্ত শরীরের তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে বেজে যাচ্ছে এক ধরনের শিহরন, অথচ হৃদয়ভর্তি গ্লানিময় এক বেদনা। কোনো অদ্ভুত জায়গা থেকে খুলে যাচ্ছিল অজস্র তালা, উপচে আসছিল এক ধরনের অপরাধবোধ। এই বয়সে তিনি কি প্রেমে-ট্রেমে পড়লেন নাকি? তেমন হবার কথা তো নয়। নাকি স্রেফ শরীরের টান? শুধু শরীরের পক্ষে কি টান দেয়া সম্ভব? এভাবে! ফ্রয়েডিয়ান কোনো ব্যাখ্যা হয়তো আছে।

বাসায় গিয়ে সবার আগেই তিনি বাথরুমে ঢুকলেন। মোজাইক লাগানো বাথরুমে প্রথমে একটা ছোটখাট আছাড় খেতে খেতে সামলে নিলেন। ঘণ্টা খানেক ডুবে থাকলেন ঠান্ডা পানিভর্তি বাথটাবে। সময় নিয়ে গোসল করলেন। হাতে সাবান ঘষলেন। এমন কি একটা সানশাইন শ্যাম্পু ছিল, সেটাও ঘষলেন খুব করে। কাজ হলো না। ক্রমশ বাড়তে লাগলো অস্বস্তি। রুমে এসে শুয়ে পড়লেন। ঘুমাতে পারলেই হয়ত সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে এমন ভেবেই তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন।

এক ধরনের পাপবোধ তখন তাকে ছেঁয়ে ধরেছে। আহসানের প্রতি তিনি কোনো অন্যায় করছেন তেমন নয়। চল্লিশ বছরের এক মহিলা সাতাশ বছরের যুবকের প্রেমে পড়েছে সে জন্যেও নয়। কিন্তু তিনি এত অল্পতে ভালবেসে ফেললেন একটা ছোকড়া ধরনের যুবককে। সামান্য ছোঁয়ায়! কেউ বিশ্বাস করবে? একী অদ্ভুত ব্যাপার! তার নিজেরই সন্দেহ হতে লাগলো, এটা কি আদৌ প্রেম? এভাবে কি সম্ভব প্রেম হওয়া?

এরপর তিনি চেষ্টা করেছেন নানাভাবে রূপকের ঠিকানা বের করার। কিন্তু সে তো অসম্ভব ছিল। কার কাছে জানতে চাইবেন? একবার কলিগের কাছে বুদ্ধি করে জিজ্ঞেস করতে পেরেছিলেন রূপক তার কে হয়?

কলিগ অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, ‘কোন রূপক বলুন তো?’

‘কেন, ঐ দিন যে আসলো! আপনার বোনের বিয়েতে?’

কলিগ টেনে টেনে বললেন, ‘রূপওওওওক !… নাহ্, ঐ নামে তো কাউকে চিনি না। আপনি কার কথা বলছেন, বলুন তো? সুমন নয় তো?’

শাহিনা ধন্দে পড়ে গেলেন। তিনি কি ভুল শুনেছেন? সুমনকে রূপক শোনা অস্বাভাবিক কিছু নয় অবশ্য। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হতে লাগলো যে, নাহ্ তিনি রূপকই শুনেছেন। তার ভুল হয় নি।

কলিগ জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিন্তু সেই রূপকের সাথেই বা কী? কোনো ঝামেলা হয় নি তো?’

শাহিনা হেসে উড়িয়ে দেবার ভান করলেন, ‘আরে নাহ্। আমার মেয়ে রেনু একটা ছেলের কথা বলত, রূপক নাম। ভাবলাম হলেও হতে পারে। বাদ দিন। জেবা (কলিগের বোন) এখন কেমন আছে? ওকে দেখি না অনেক দিন।’ শাহিনা প্রসঙ্গ বাদ দিতে চাইলেন, কিন্তু কলিগও ছাড়ার পাত্র নন। তিনি ফিসফিস করে বললেন, ‘রূপকের ব্যাপারটা ক্লিয়ার করুন তো। প্রেমঘটিত কোনো ব্যাপার নয় তো? আপনার মেয়ের সাথে কোনো ঝামেলা হচ্ছে?’

শাহিনা মৃদু একটা হাসি দিলেন যার অর্থ এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে আগ্রহী নন তিনি। কলিগও আর ঘাঁটান নি।

মেয়ের উপর দিয়েই বেঁচে গেলেন সে যাত্রায়।

দুই বছর! সম্ভবত দুই বছরই হয়ে গেল। এই দুই বছরে স্পর্শের সেই ছোট্ট বীজ সারা গায়ে বটের মতো ছড়িয়ে গেছে। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই কিন্তু ভিতরে তোলপাড়। তুমুল এক জলোচ্ছ্বাস। রূপককে দেখতেই হবে, কাছে পেতেই হবে—এমন সব ষোড়শী মেয়েদের মতো চিন্তা আচ্ছন্ন করল তাকে। কাছে পেলে কি করবেন তা তিনি জানেন না। হয়ত চরম কোনো অন্যায় করে ফেলবেন। কিন্তু শরীরের এই বিষ কাটানোর আর কোনো উপায় তার জানা নেই। হঠাৎ পোস্ট বক্সে চেনা সেই যুবকের চিঠি এলো। কিন্তু কেন? তার সাথে তো যুবকের তেমন কোনো সম্পর্ক গড়ে ওঠে নি যে হুট করে চিঠি চলে আসবে। একটি বার কথা বলতে পারেন নি। এমনকি একাধিক মুহূর্তও তাকাতে পারেন নি তার দিকে। তবু কেন চলে আসলো এই চিঠি।

গণিতের ভাষায় কোনো কিছুর প্রবাবলিটিই জিরো হতে পারে না, হয়ত শুধুমাত্র এ কারণে অপেক্ষায় থাকব

দুই.
কাঁপা কাঁপা হাতে চিঠি খুললেন। হুবহু চিঠিটিই পড়ে ফেলা যাক—

প্রিয় শাহিনা আপা, আমি আসলে বাধ্য হয়ে এই চিঠিটি আপনাকে লিখছি। আমি নিশ্চিত যে আপনি আমায় চেনেন না। চেনার কোনো যুক্তিও নেই। কিন্তু আমি আপনাকে চিনি। আমাদের কিন্তু একবার দেখা হয়েছিল। এক বিয়েতে। আমার এক বান্ধবীর বিয়ে ছিল। যাই হোক আসল ব্যাপার বলি—

আমি চারুকলায় পড়তাম। পড়াশুনা শেষ করতে পারি নি। সামনেও আর সম্ভাবনা নেই। আপনাকে আমি কেন চিঠি লিখেছি তা সরাসরি বলতে সমস্যা দেখে চিঠি পাঠালাম। বহু কষ্টে, বহু ঝামেলা করে আপনার ঠিকানা পেয়েছি।

খুব পেঁচাচ্ছি। বিরক্ত হবেন না প্লিজ। আসলে আমার জরুরীভাবে পঞ্চাশ হাজার টাকা দরকার। কবে শোধ করব বলতে পারছি না। কথা দিয়ে হয়ত রাখতে পারব না, তবে বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই ফেরত দেব।

যাক, বলে ফেললাম! বাঁচা গেল। কিন্তু, আপনি টাকা দেবেন কেন—এর উত্তর আমার কাছে নেই। কিংবা আমার কেন টাকা দরকার তাও বলা সম্ভব না। শুধু জেনে রাখবেন, সব অসহায়ত্বই করুণ এবং এর পেছনেও করুণ কিছু গল্প থাকে যা না শোনাই উত্তম।

যাই হোক, যদি টাকাটা দেবার ইচ্ছে হয়, ফোন নম্বর দিলাম, ফোন করবেন। গণিতের ভাষায় কোনো কিছুর প্রবাবলিটিই জিরো হতে পারে না, হয়ত শুধুমাত্র এ কারণে অপেক্ষায় থাকব।

ইতি… 

শাহিনা এসিটা বন্ধ করে দিলেন। প্রচণ্ড শীত করছে। রীতিমতো সারা গা থরথর করে কাঁপছে। কিন্তু তবু আজ তিনি খুশি। নিজেকে শিমুল তুলোর মতো মনে হচ্ছে। হাওয়ায় উড়ছেন। অসম্ভব উৎফুল্লতা বোধ করছেন। শিশুদের মতো আচরণ করতে চাইছে মন। কাঁপা কাঁপা হাতেই তিনি মোবাইল তুলে নিলেন। তার অসুস্থতা কমানো দরকার। এতদিনে ডাকল তাকে আরোগ্যর হাত!

কেমন যেন শঙ্কামিশ্রিত আনন্দ নিয়ে দরজা খুললেন। দরজায় উঁকি দিল সম্পূর্ণ অপরিচিত নিষ্কলুষ একটি মুখ। ফর্সা, পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের ভিন্ন এক যুবক। এ যুবককে তিনি চেনেন না

তিন.
অনেক সময় নিয়ে তিনি সাজলেন। নতুন শাড়ি পড়লেন। বেলী ফুলের মালা আনিয়েছেন সকালে, বড় খোঁপা বেঁধে জড়ালেন। টিপ পরলেন। সময় নিয়ে লিপস্টিক লাগালেন। নেইল পলিশ। দুই হাতে অজস্র কাচের চুড়ি। আই-লাইনার বের করবেন এমন সময় কলিং বেল বাজলো। আহসান সকালেই বেরিয়ে গেছে। কাজের মেয়েটাকে তিনি দু’হাজার টাকা দিয়ে কোথাও বেড়িয়ে আসতে বলেছেন। সমস্ত বাড়ি ফাঁকা।
দরজা খুলতে যাবেন, আবার ফিরে এলো কাঁপুনি। কেমন যেন শঙ্কামিশ্রিত আনন্দ নিয়ে দরজা খুললেন। দরজায় উঁকি দিল সম্পূর্ণ অপরিচিত নিষ্কলুষ একটি মুখ। ফর্সা, পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের ভিন্ন এক যুবক। এ যুবককে তিনি চেনেন না। আগে দেখেন নি কোনোদিন। থতমত খেয়ে শাহিনা প্রশ্ন করলেন, ‘কে আপনি? কাকে চান?’
কাঁচুমাচু স্বরে যুবক বলল, ‘আমার নাম রূপক রহমান। আমি আপনাকে একটি চিঠি লিখেছিলাম। আপনি আমায় ফোন করে আজ আসতে বলেছেন।’
শাহিনা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। তবু, ‘এসো, ভিতরে এসো’—বলে দরজা ছেড়ে দাঁড়ালেন। যুবক ভিতরে আসলো। বলল, ‘আপনি জেবার বিয়েতে এসেছিলেন। তখন আপনাকে এতটা সুন্দর লাগে নি।
শাহিনা হাসলেন। বললেন, ‘তুমি একটু অপেক্ষা কর। আমি আসছি।’
রূপক মুগ্ধ হয়ে বসার ঘর দেখতে লাগল। ঘরভর্তি  দামি দামি পেইন্টিং। সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো পেইন্টিংগুলো। রূপক নিজেই চারুকলার শিক্ষার্থী। স্বভাবতই পেইন্টিংগুলো তাকে আকৃষ্ট করবে।

শাহিনা পঞ্চাশ হাজার টাকার একটা ছোট প্যাকেট তুলে দিলেন রূপকের হাতে। এক হাজার টাকার পঞ্চাশটি নোট। বললেন, ‘তুমি কি চা খাবে? চা দেবো?’
ছেলেটি প্যাকেট হাতে নিয়েই উঠলো, ‘জ্বি না।’ তারপর নিচের দিকে তাকিয়ে পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে কার্পেটে আঁচড় কাটতে কাটতে বলল, ‘আপনার টাকা আমি অবশ্যই ফেরত দেব।’
শাহিনা আবার হাসলেন। বললেন, ‘দিও।’ স্রেফ কিছু বলতে হবে বলে বলা।

কী দরকার করুণ সব গল্প মনে রাখার

চার.
টেবিলে রাখা স্ফটিকের বাঘের দিকে একভাবে চেয়ে আছেন শাহিনা। রূপক যাবার পর এতক্ষণ তিনি ঝিম মেরে বসে ছিলেন। কোথাও একটা ভুল হয়েছিল। কিন্তু ভুলটা কার। নিশ্চয়ই তার। বিয়েতে কে কাকে রূপক বলে ডেকেছে, সে কেন সেই দাড়িঅলা ছেলেটিই হবে? তিনি তো দেখেন নি কে কাকে রূপক বলে ডাকল। অবশ্য এত ভাবার দরকার তো নেই। সব করুণ গল্প না জানাই তো ভালো।
দীর্ঘদিন পর শাহিনা অনুভব করলেন তার সেই অস্বস্তিদায়ক বেদনা আর নেই। নিজেকে তার বাইশ বছরের ফুরফুরে পরি মনে হতে লাগলো। তিনি তার একমাত্র মেয়ে যে ছ’বছর ধরে ভার্জিনিয়ায় পড়াশুনা করছে তাকে ফোন করার জন্য মোবাইলটি হতে তুললেন। এখন তাকে তার মেয়ের সঙ্গে প্রাণ খুলে কথা বলতে হবে। কী দরকার করুণ সব গল্প মনে রাখার !

রাসেল রায়হান

রাসেল রায়হান

জন্ম ৬ ডিসেম্বর, ১৯৮৮; বাগেরহাট। ঢাকা কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে মাস্টার্স। বর্তমানে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে কর্মরত।

প্রকাশিত বই:
সুখী ধনুর্বিদ [কবিতা; প্লাটফর্ম, ২০১৬]
বিব্রত ময়ূর [কবিতা; প্রথমা, ২০১৬]

ই-মেইল : rasahmed09@gmail.com
রাসেল রায়হান