হোম পুনর্মুদ্রণ গদ্য কবি কালীকৃষ্ণ গুহর ‘তর্ক’ কিংবা আমাদের আত্মজিজ্ঞাসা

কবি কালীকৃষ্ণ গুহর ‘তর্ক’ কিংবা আমাদের আত্মজিজ্ঞাসা

কবি কালীকৃষ্ণ গুহর ‘তর্ক’  কিংবা আমাদের আত্মজিজ্ঞাসা
697
0

কবি কালীকৃষ্ণ গুহর লেখা আমি প্রথম পড়ি আশির দশকের শেষ দিকে—‘হে নিদ্রাহীন’। এর আগেও হয়তো পড়েছি তাঁর লেখা বিভিন্ন ছোটকাগজে। আমারই মনোযোগের অভাবেই হয়তো, সেগুলোর কথা আজ আর বিশেষ মনে নেই। ‘হে নিদ্রাহীন’ পড়বার পর আমি কিছুটা চমকেই উঠেছিলাম। কবিতার ভাষা কতটা আটপৌরে হতে পারে, তা কালীকৃষ্ণ গুহর কবিতা পড়বার আগে আমার সত্যিই জানা ছিল না। ঠিক যেভাবে আমরা কথা বলি, নিত্যদিন—সহজ এবং সতেজ তাঁর প্রতিটি শব্দ! কিন্তু তিনি যখন বলছেন, বিস্ময়করভাবেই তা কবিতা হয়ে উঠছে। একেবারেই সাধারণ কথা, কিন্তু পাঠ করতে গিয়ে একের পর এক রহস্যদরজার মুখে দাঁড়িয়ে পড়তে হচ্ছে। সোজা কথারও যে আছে এমন কঠিন জট তা কে জানত!

আমি তাঁর একটি কবিতা নিয়েই আজ কথা বলব। একটি কবিতার মধ্যেই দেখার চেষ্টা করব কালীকৃষ্ণ গুহর কবিতা ও মনোজগতের খানিকটা। আসলে, কেবল একটি কবিতার মধ্য দিয়ে যে কোনো কবিকে, বিশেষ করে তাঁর প্রকরণ ও প্রবণতাকে বুঝতে পারা কঠিন। কিন্তু, কালীকৃষ্ণ গুহ সেইসব বিরল কবিদের একজন যার প্রায় প্রতিটি কবিতাই স্বাক্ষর-কবিতা, যা স্বল্প পরিসরেই বর্ণনা করতে পারে জীবনের এক একটি অধ্যায়কে। সামান্যকে পরিণত করতে পারে অসামান্যতে। বলা দরকার, তাঁর যে কোনো বইয়ের যে কোনো কবিতা নিয়েই আলোচনা চলতে পারে, পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা। যেমন, এ বইটিতে আমরা দেখতে পাই, তাঁর বেশিরভাগ কবিতাই চার থেকে দশ লাইনের। কিন্তু তাতেই আমরা ঘটতে দেখি জীবনের নানা উপলব্ধির বিস্ময়কর ও গভীর বিস্তার।

প্রিয় পাঠক, চলুন, আমরা দেখি, এই কবির একটিমাত্র কবিতায় আলো ফেলে তাঁকে আবিষ্কার করা যায় কিনা। আলোচনার আগে এ বইয়েরই ‘তর্ক’ শিরোনামের কবিতাটি একবার পড়ে নেয়া যাক :

ঘরের ভিতরে খুব তর্ক চলে। অন্ধকার ঘর।
কেন বেঁচে থাকবো যদি বেঁচে থাকা অর্থহীন হবে, এই তর্কের বিষয়।
অনস্তিত্ব থেকে জাত যে শুদ্ধতা তার থেকে এই বিশ্ব ভুলভাবে ছিটকে বেরিয়েছে—
পল ভালেরির এই উক্তিটিকে ঘিরে তর্ক শুরু হয়েছিল দু’দশক আগে।
তখন চায়ের সঙ্গে রেস্তরাঁয় কাটলেট আসতো মাঝে মাঝে।
কিন্তু তর্ক আজ অন্ধকার ঘরে।

কোনো এক জটিল মুহূর্তে আমি এই তর্ক থেকে ভীষণ আতঙ্ক নিয়ে
বাইরে বেরিয়ে আসি। দেখি :

শিশুরা পার্কে যাচ্ছে— তাদের দিদিরা ডানা মেলে ভেসে যাচ্ছে এক ছাদ থেকে
অন্য ছাদে।

কালীকৃষ্ণ গুহ স্বভাবে যেমন, কবিতায়ও তেমনি, অত্যন্ত মিতভাষী। বাহুল্যবর্জিত এবং আড়ম্বরহীন। তাঁর উচ্চারণ এতই বিনম্র যে কখনো কখনো মনে হয়, তিনি কথা বলছেন নিজেরই সঙ্গে। এটিও, তাঁর অন্য আরও কবিতারই মতো ছোট একটা কবিতা। কিন্তু তার বিস্তার, যথারীতি অনেক।

কবিতাটির আরম্ভেই তিনি তর্কের একটা প্রসঙ্গ আমাদেরকে জানান দেন। তর্কটি কোথায় হচ্ছে তাও আমাদেরকে জানান। সঙ্গে এও জানান যে ঘরটা অন্ধকার। এরপর তর্কের বিষয় এবং তর্ক-পরবর্তী পরিস্থিতির একটা বর্ণনা আমরা পাই।

12020230_986093391441792_1647374162_o
কবি কালীকৃষ্ণ গুহ

কী নিয়ে তর্ক?
‘কেন বেঁচে থাকবো যদি বেঁচে থাকা অর্থহীন হবে’।
কারা করছে এই তর্ক?
কবি কি নিজেই তর্কটা করছেন নিজের সঙ্গে?

কারণ কবিতাটির শেষ পঙ্‌ক্তি পর্যন্ত আমরা আর কোনো চরিত্রকে হাজির হতে দেখি না। আমরা দেখতে পাই, তিনি তর্কের বিষয়টা এমনভাবে তুলে ধরেন যেন ভারি তুচ্ছ একটা বিষয়। এতই তুচ্ছ যে তা নিয়ে আর যাই হোক তর্ক চলে না। তবু তর্ক চলতে থাকে।

‘অনস্তিত্ব থেকে জাত যে শুদ্ধতা তার থেকে এই বিশ্ব ভুলভাবে ছিটকে বেরিয়েছে’

জীবনটা অর্থহীন জেনেও যে আমরা বেঁচে থাকি, সেটাকে তিনি প্রশ্নের মুখে ফেলে দেন। আসলেই কি বেঁচে থাকাটাকে অর্থপূর্ণ করতে পারা যায়, চাইলেই? এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কত কিছু! আমরা যে জটিল সময়ে বাস করছি, তাতে চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে কতই না অমিল, কতই না সংঘাত! জীবনকে অর্থপূর্ণ করতে চাওয়ার বোধটাই কি জন্মায়, এক জীবনে? কিংবা চাইলেই কি অর্থপূর্ণ করে তোলা যায় বেঁচে থাকাটাকে? হয় তো যায় না। জীবন তাই অনিবার্যভাবেই যেন অর্থহীন। তাহলে কী লাভ বেঁচে থেকে! কেন তাহলে বেঁচে থাকব? প্রশ্ন মৌলিক, কিন্তু জবাব তার তত সরল নয়।

পুরো কবিতায় তিনি কোনো প্রশ্নবোধক চিহ্ন ব্যবহার করেন না, যদিও তিনি আমাদেরকে ঠেলে দেন অনেক প্রশ্নের মাঝখানে। কিন্তু, নিজে এসব প্রশ্নের কোনো মীমাংসায় তিনি যান না। বরং আচম্বিত আমাদের সামনে আসে পল ভালেরির এই উক্তিটি— ‘অনস্তিত্ব থেকে জাত যে শুদ্ধতা তার থেকে এই বিশ্ব ভুলভাবে ছিটকে বেরিয়েছে’।

এতক্ষণ অস্তিত্ব নিয়ে যে ধারণার সূত্রপাত ঘটছিলো আমাদের মনে, সেটাও আরেক প্রশ্নের মুখে উপস্থিত হয়। আমরা জানতে পারি, শুদ্ধতা অনস্তিত্ব থেকে জাত। তিনি এও জানাতে ভোলেন না যে ‘তার থেকে এই বিশ্ব ভুলভাবে ছিটকে বেরিয়েছে’। আমাদের সামনে অস্তিত্ব আর অনস্তিত্বের ধারণা এ পর্যায়ে এসে একাকার হয়ে যায়। আমাদের ঘোর কাটে না। আমরা দেখি, ঘনিয়ে আসছে অন্ধকার।

কবিতার শুরুতে কবি আমাদেরকে একটা তর্কের মধ্যেই শামিল করেছিলেন। কিন্তু কোন ফাঁকে যে এই তর্ক আত্মজিজ্ঞাসায় রূপান্তরিত হয়ে যায় আমরা টের পাই না। কবিতার ৭ম পঙ্‌ক্তিতে তিনি বলেন, ‘কোনো এক জটিল মুহূর্তে আমি এই তর্ক থেকে ভীষণ আতঙ্ক নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসি’। এই পর্যায়ে আমরা দেখতে পাই, ‘তর্ক’ কেবল আর তর্ক থাকে না, সবকিছু ছাপিয়ে সেটা পরিণত হয় আত্মজিজ্ঞাসায়। এবং এও আমাদের মনে হয়, ঘরের ভেতরে যে তর্ক কিংবা আত্মজিজ্ঞাসা চলছিল তা শেষ হয়েছে কোনো রকম পরিণতি ছাড়াই। কিংবা, সেই তর্ক জন্ম দিয়েছে এক জটিল মুহূর্তের, আতঙ্কের। আর তখন আমরাও যেন মুখোমুখি হই এক জটিল মুহূর্তের, কবির আতঙ্ক স্পর্শ করে আমাদেরকেও।

আমাদের সামনেও অস্তিত্ব আর অনস্তিত্ব, বাস্তব আর পরাবাস্তব মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়, আমরাও ঘর থেকে বাইরে এসে এই দৃশ্য একইভাবে, হুবহু দেখতে পাই—

‘শিশুরা পার্কে যাচ্ছে— তাদের দিদিরা ডানা মেলে ভেসে যাচ্ছে এক ছাদ থেকে
অন্য ছাদে’।

কবিতার শেষে এই যে দৃশ্যকল্প তিনি সৃষ্টি করেন তাতে আমাদের ভেতরেও সেই আত্মজিজ্ঞাসা সঞ্চারিত হয়, এতটাই যে আমরাও তাতে লিপ্ত হয়ে পড়ি এবং তা মীমাংসাহীন চলতে থাকে। আমরা পৌঁছতে থাকি এক স্তর থেকে অন্য স্তরে, এক দরজা থেকে আরেক মায়াবী দরজায়।

কালীকৃষ্ণ গুহর কবিতা পাঠের পর তাঁর কবিতা, কোনো কবিতাই, মন থেকে মুছে যায় না, তার অনুরণন চলতেই থাকে, জন্ম দিতে থাকে একের পর এক ভাবনাবীজের, যেগুলি এক সময় মেলতে শুরু করে তার ডালপালা, আমাদের অজান্তেই।

ফরিদ কবির

ফরিদ কবির

জন্ম ২২ জানুয়ারি ১৯৫৯, ঢাকা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক। পেশা: চাকরি।

উল্লেখযোগ্য বই:
ওড়ে ঘুম ওড়ে গাঙচিল (কবিতা)
অনন্ত দরোজাগুচ্ছ (কবিতা)
মন্ত্র, ওঁ প্রকৃতি ওঁ প্রেম (কবিতা)
আমার গদ্য (গদ্য)

ই-মেইল: faridkabir1962@gmail.com
ফরিদ কবির