হোম নির্বাচিত ‘আমি আমার রাস্তাটাতেই নিজের মতন হাঁটতে চেয়েছি’

‘আমি আমার রাস্তাটাতেই নিজের মতন হাঁটতে চেয়েছি’

‘আমি আমার রাস্তাটাতেই নিজের মতন হাঁটতে চেয়েছি’
1.55K
0

হাসান আজিজুল হকের সাক্ষাৎকার

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন

এ সাক্ষাৎকার যখন নেওয়া হয় তখন কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক সদ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বঙ্গবন্ধু চেয়ার’ সম্মাননা পেয়েছেন। সাক্ষাৎকারটি ঢাকার ফুলার রোডে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আবাসিক এলাকার বাসায় নেওয়া হয়। ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে।

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন : ১৯৬০-এ ২১ বছর বয়সে লেখা প্রথম গল্পগ্রন্থ সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য-র শকুন দিয়ে সাহিত্য-অঙ্গন প্রকম্পিত করার মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যে পা রেখেছেন আপনি। আর ২০০৬-এ ৬৫ বছর বয়সে লিখলেন আগুনপাখি যার জন্য পেয়েছেন আনন্দ পুরস্কারও। এই যে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের পরিক্রমায় আপনার লেখকসত্তার বিকাশের ইতিহাস; এ ইতিহাসের সমুদ্রবালুকাবেলায় দাঁড়িয়ে যখন অন্য কেউ হয়ে নিজের দিকে তাকান, কী উপলব্ধি কাজ করে আপনার ভেতরে?

হাসান আজিজুল হক : পঞ্চাশ বছরের উপলব্ধি! বিশাল বিষয়। তো, এটা তোমাকে ক’মিনিটের মধ্যে বলতে বাধ্য আমি!


একজন বিখ্যাত বিদেশি সমালোচক, তিনি বাংলাদেশ নিয়ে, মানে বেঙ্গল নিয়ে অসাধারণ কাজ করেছেন। তিনি আমার কিছু গল্পের ইংরেজি অনুবাদও করেছেন। তিনি বললেন যে, হাসান, তুমি তোমার লেখাতে সব করলে, কিন্তু তুমি তোমার নিজের শ্রেণিটাকে বাদ দিলে


 শিমুল : এইখানে বাধ্যবাধকতার কোনো বিষয়ই নাই, স্যার।

হাসান আজিজুল : যদি বলতে শুরু করি আমি, তাহলে দেখা যাবে তুমি একসময় বাধ্য হয়ে বলবে ‘ক্ষান্ত দেন স্যার, এত কথা আমি শুনতে চাই না’। তুমি একটা প্র উপসর্গ যোগ করে যে প্রকম্পিত বললে, এ বলার সাথে সাথে বুঝলাম যে আমার মাথা আটকে গেল। আমি আর কিছুই বলতে পারছি না মনে হয়। মানুষের জীবন খুব সাদামাটাই তো। যদি দেখতে চাই, সাদামাটাভাবেই দেখা উচিত। আমি লিখতে চেয়েছি, অনেক আগে থেকে, যদি বলো ১৯৬০, এর আগে কি লিখি নি! তা নয় কিন্তু! লিখেছি তো! ১৯৬০-এ শকুন লেখার পরে, পরপর কয়েকটি গল্প আমি লিখি। এবং ৬৪ সালে বোধহয় সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য বের হলো। আর এই ২০১১। বলতে পারো বটে। ঠিকই আছে। পুরো পঞ্চাশ বছর। অর্ধশতক। এরপরে নানানভাবে লেখার ইতিহাস উঠেছে নেমেছে, পাল্টেছে উল্টেছে, দুমড়েছে মুচড়েছে, বাঁক নিয়েছে, ঘুরেছে ফিরেছে, কত রকমভাবে চিন্তা এসেছে, চিন্তা ঘুরেছে, কখনো মনে হয়েছে নিজের লেখা পরস্পর-বিরোধী হয়ে যাচ্ছে নাকি, কখনো মনে হয়েছে এই বিষয়টাই তো আমার এখন লেখার বিষয়। আবার মনে হয়েছে, এই বিষয়টাকেই যে লেখার বিষয় মনে করছি, আমি কি অন্য কোনোভাবে ভাবছি না? আমাকে তো অনেকে অনেক রকমভাবে অভিযোগও করেছে। প্রশংসা যেমন পেয়েছি, তেমনি অনেক অভিযোগও পেয়েছি। একজন বিখ্যাত বিদেশি সমালোচক, তিনি বাংলাদেশ নিয়ে, মানে বেঙ্গল নিয়ে অসাধারণ কাজ করেছেন। তিনি আমার কিছু গল্পের ইংরেজি অনুবাদও করেছেন। তিনি বললেন যে, হাসান, তুমি তোমার লেখাতে সব করলে, কিন্তু তোমার নিজের শ্রেণিটাকে বাদ দিলে! তোমার নিজের শ্রেণি নিয়ে কিচ্ছু লিখলে না। ইউ বিলং টু দি মিডল ক্লাস। তোমার সমস্ত গল্পে সেই শ্রেণির কথাই এসেছে যাকে তুমি বিলং করো না। সর্বসাধারণ মানুষ বলতে চাইছ তোমরা। তুমি কি তোমার সোসাইটিকে খুব ঘনিষ্ঠভাবে জানো না বা চেনো না!? নাকি তুমি আগ্রহী হও নি? কেন তুমি এটা করলে? তাহলে বুঝতেই পারছ, অভিযোগও উঠেছে। কখনো আমারও মনে হয়েছে লেখা কি একঢালা হয়ে যাচ্ছে! ষাটের দশকের মাঝামাঝিতে প্রথম বই বের হলো। অধ্যাপনা করি। তোমাকে গতকাল আত্মজা’র (আত্মজা ও একটি করবী গাছ ) কথা বলেছি, বুঝতে পেরেছ তো! আত্মজা লেখার সঙ্গে সঙ্গে দেখলাম যে এটা একধরনের মোড় ফেরা বটে, দেখার জায়গা থেকেও, ভাবনার জায়গা থেকেও, সবদিক থেকে। পটভূমি বদলে গেল, পশ্চিমবাংলার সাথে এ বাংলা থাকল না। নতুন যেটাকে আমি দেশ করে নিয়েছি । লেখাটার পর আমি বুঝতে পারলাম। মোড় একদিক থেকে ঘুরেছে, বিষয়ান্তরে ঢুকেছি, যে ভাষাটা ছিল সে ভাষাটাও বদলেছে। ভাষা একরকমের ময়দা ঠাঁসার মতো; যেমন করে ঠাঁসবে সেরকম আকার নেবে, হা হা! তুমি পরোটা করলে একভাবে করবে, রুটি করলে একভাবে করবে, তন্দুর করলে একভাবে করবে; তাই না!। সেটা কিন্তু লেখার সাথে সাথেই চলে। আলাদা করে কিছু করতে হয় না। তো যখন আত্মজা ও একটি করবী গাছ লিখলাম, বুঝলাম যে লোকজনের বেশ পছন্দ হয়েছে। তারপরও আমি অনেক জায়গায় বলেছি, সাধারণ যে স্রোত, আধুনিকতার যে স্রোত ষাট সাল থেকে আমাদের এখানকার সাহিত্যে, কবিতায় বটে, গল্পে বটে, উপন্যাসেও বটে, লোকে একটা মাত্রা দেখে এর। বলে যে আমরা আধুনিক সময়ে চলে এসেছি। আমি বারবার এর বিরোধিতা করেছি। আমি বলেছি যে, এ আধুনিকতা আমাকে স্পর্শ করে না। এবং এর মর্মবস্তু তখনো কোনরকমেই আমাকে আকর্ষণ করেনি। প্রায় পঞ্চাশ বছর পর এখনো আমি ঐ মতেই স্থির আছি। যে, এই আধুনিকতা একেবারেই একটা খোলসের মতো আমাদের কাছে এসেছিল, একেবারেই একটা রাঙতার পোশাকের মতো এসেছিল, সেটা আমরা পরেছি, সেটা টেকে নি। আর আমি অনেক দূরে ছিলাম। এ থেকে তাই আমার ভাবনা অনেক আলাদা। সাহিত্য পড়ে সাহিত্যের যে প্রশিক্ষণ অর্থাৎ পড়ে পড়ে, সেটাও কিন্তু আমি অন্তত আমার লেখার ক্ষেত্রে কারো কথা বলতে পারব না। কারণ ষাটের ঐ শুরুর সময় পর্যন্ত এমনকি বাংলাদেশের অধিকাংশ বড় লেখকদের লেখাই আমার পড়া শেষ হয়ে ওঠে নি। সেজন্য আমার সামনে কোন মডেল ছিল না। সুফল বলতে এই বা কুফল বলতে এই যে, আমি যা কিছু করেছি আমি আমার মতন করে করেছি। সেইভাবে অনুসরণযোগ্য কোনো একটা পূর্বসূরি আমার আছে—এরকম আমার হয় নি। এই যে বদল হলো এর সাথে সাথে কিন্তু সামাজিক যে পটটা তাও বদলে গেল। সে পটটা রাজনৈতিকভাবে খুব উত্তাল একটা সময় ছিল। আধুনিকতার সাথে কিন্তু এর একটা বিরোধ এটার মধ্য দিয়েই হয়ে গেল। আধুনিকতার মধ্যে একটা ড্যান্ডিইজম আছে। কলা, সৌন্দর্য এই বিষয়গুলোকে যখন অনেক গুরুত্ব দেয়া হচ্ছিল। সেটাকে একদিক থেকে তুচ্ছ করে দিল যখন বাংলাদেশের আপামর মানুষ, বিরাট জনসাধারণের একটা কণ্ঠ এই প্রথম আকাশভেদী হয়ে উঠলো আর কি! তখন আমার নিজের লেখা আবার বদলাল। খুব আশ্চর্য এটা আমার কাছেই। খুব কাছাকাছি সময় কিন্তু। আত্মজা ও একটি করবী গাছ-এর গল্পগুলো খুব দ্রুত লিখে ফেলেছিলাম বলে তাদের মধ্যে একটা সাযুজ্য, মোটামুটি একটা বৃত্ত খুঁজে মনে হয় পাওয়া যায়। তার পরে তিন তিনটে গল্প খাঁচা, জীবন ঘষে আগুন আর শোণিত সেতু নিয়ে আরেকটা বই হলো। লোকজন খেয়াল করবে কিনা জানি না, এটা কিন্তু ষাটের দশকের ঠিক শেষের দিকে। তার মানে গল্পগুলো পড়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি কেউ সময়টা খেয়াল না করে সেই অর্থে গল্পগুলো থেকে যা পাবার তা পাবে না। এজন্যই গফ সাহেবকেও আমি জবাব দিয়েছিলাম যে আমি মাটিলগ্ন মানুষ, তোমার ওই আধুনিকতা, মধ্যবিত্তের তত্ত্ব আমি মানি না, আমি মনে করি আমি মাটির মানুষের সঙ্গেই আছি, তার বাইরে আমি কোনোদিন থাকব না। এই যে মৌলিক যে জায়গাটা এখান থেকে যে যেদিকেই ডেভিয়েট করেছে তাতে তারা অন্য কিছু পেয়েছে; স্মার্টনেস পেয়েছে, আধুনিক ভাষা পেয়েছে, একধরনের চিন্তাভাবনা পেয়েছে, আমি হয়তো ওগুলো পাই নি। কিন্তু তার জন্য আমার কোনো দুঃখ নেই। আর যারা এগুলো পেয়েছে তার মধ্যে ফাঁকিটা কোথায় সেগুলো আমি এখনো সুস্পষ্ট ধরতে পারি।

শিমুল : ফাঁকিটা কোন জায়গায়?

হাসান আজিজুল : ফাঁকিটা হচ্ছে ধরো, নাগরিকতার চর্চা। আমি মনে করি যে এই নাগরিকতা ঢাকার নাগরিকতা না, তখনকার কলকাতার নাগরিকতা। এখানকার সাহিত্যিকরা যে নাগরিকতাকে সামনে রেখে সাহিত্য করেছেন তাতে নাগরিকতার কোনো ধাঁচ নেই। নাগরিকতা আলাদা বিষয়। তাতে এখানকার কেউ বসবাস করে নি।


তোমার এই বিষয়টা ব্যাখ্যা করতে গেলে আমার তো অনেক অপ্রিয় কথার মধ্যে চলে যেতে হবে


 শিমুল : এখানে স্যার আমার ছোট্ট একটু কথা ছিল। আপনার লেখায় ৬৬/৬৭ সালের ঢাকার যে পরিচয় পাওয়া যায় তাতে এখানকার নগর আসলে নগর ছিল কি? যদি আপনার বর্ণনা সঠিক হয়ে থাকে তবে আমার উত্তরা এলাকায়, গুলশান, বনানীতে শেয়াল ডাকত, মাঠের পর মাঠ, বিলেও। আপনার ‘বৃত্তায়ন’-এ এর একটা নিখুঁত বর্ণনা পাওয়া যায়। এখানে প্রসঙ্গত তিরিশি আধুনিকতার ধারক, কবি শামসুর রাহমানের কথাই কি আপনি আগের প্রশ্নে ইঙ্গিত করলেন? তিরিশি আধুনিকতার যে স্বরূপ, তাকে তাহলে আপনি কিভাবে দেখেন? আপনি বলেন স্যার, প্রয়োজনে আমরা ছাপব না।

হাসান আজিজুল : তোমার এই বিষয়টা ব্যাখ্যা করতে গেলে আমার তো অনেক অপ্রিয় কথার মধ্যে চলে যেতে হবে।

শিমুল : আপনার তো জনপ্রিয়তার মোহ কিংবা লোভ কোনোটাই ছিল না কোনোকালে। অপ্রিয় কথা প্রয়োজনীয় হলে সেটা আপনি বলবেন না? আর অপ্রিয় কথা বলতে তো স্যার কোনোকালেই আপনার কুণ্ঠা ছিল না!

হাসান আজিজুল : না, কুণ্ঠা ছিল না। কিন্তু বিতর্ক হতে পারে এই জন্যে। যেমন আমি একটা খুব পরিষ্কার কথা তোমাদেরকে জিজ্ঞেস করি, এটা আমি অনেককেই জিজ্ঞেস করেছি। আমাদের আধুনিক কবিতার জন্ম, একেবারে জোরেশোরে প্রচার করে, বুদ্ধদেব বসুসহ অনেকে। এটা তো টুয়েন্টিজ-এর শুরুর দিক থেকে থার্টিজ-এর পুরোটা। আধুনিক কবিতার যাত্রাবিন্দু বলা হচ্ছে একে। আধুনিক মানে এটাকে আমরা একধরনের আন্তর্জাতিকায়ন, গোলোকায়ন বা স্ট্রেইটলি আমাদের কবিতার বিশ্বায়ন, বিশ্বের কাতারে দাঁড় করিয়ে তুলনা বলতে পারি, বলা যায়। এবং এই কবিরা যে সমস্ত উপমা দিচ্ছেন, যে সমস্ত পুরাণকথা ব্যবহার করছেন, যে ফর্মে কথা বলছেন তার সমস্তটা একটা ইউরোপিয়ান ফর্ম। এই জগৎ আমাদের কাছে খুব নতুন একটা জগৎ মনে হলো। আহা! আর এই সময়টাকে আমরা বলি যে বাংলা কবিতার আধুনিক কালের শুরু। পঞ্চকবির কথা আমরা বলি। বলি না?

শিমুল : হ্যাঁ। বলি।

হাসান আজিজুল : আমাদের সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের পরেই যদি একটা ভাগ করা যায়, জীবনানন্দকে বাইরে রেখেই, যাঁদের উপর এখন আমাদের কথাসাহিত্য দাঁড়িয়ে আছে, তাদের নাম বলো তো।

শিমুল : মানিক, বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর…

হাসান আজিজুল : আচ্ছা। এটুকুই থাক। আর লাগবে না। এই তিনজন। এই যে আধুনিকতার কথা আমরা আলাপ করছিলাম। সেই আধুনিকতা কথাসাহিত্যে এই তিনজনের উপর কোনো প্রভাব ফেলেছে? কোনো ছাপ আছে? তাঁদের ভাষায় আছে? তাঁদের মনোভাবে?

শিমুল : না স্যার। আমার মনে হয় না। আমি তো তেমন কোনো ছাপ দেখি না। অন্তত এই তিনজনে।

হাসান আজিজুল : সে কি কথা! কবিতায় এই আধুনিকতা জিনিসটা এল আর কথাসাহিত্যকে স্পর্শও করল না! কেন করল না, এই প্রশ্ন তোমরা করো না কেন? করেছ কখনো আধুনিকতাবাদী কাউকে?

শিমুল : হ্যাঁ স্যার। নিজেকে তো করি-ই। এই তো আপনাকেও করলাম। করি বলেই স্যার এইবারে আপনাকে আমি এই প্রশ্নটা করব। যে লোক শোণিত সেতু’র কথা বলছে, যে জীবন ঘষে আগুন-এর কথা বলছে, সে লোকের যে সমসাময়িকতার দায় তার সাথে কি শামসুর রাহমান কিংবা শিকদার আমিনুল হক যায় (খাপ খাওয়া অর্থে)? যায় যে না সেখানকার দায় হাসান আজিজুল হক কিভাবে শোধ করবেন?

হাসান আজিজুল : তুমি বুঝতেই পারছ আমি অপ্রিয় একটা প্রসঙ্গের দিকে চলে যাচ্ছিলাম। আমি এইজন্য দোষারোপ করি না। কিন্তু আমার তো মনে হয় না যে কেউ আমার সাথে এই বিষয়ে একমত এবং চিন্তা করেছে, সে কি কথা! কবিতায় জিনিসটা এল আর কথাসাহিত্যে জিনিসটা (আধুনিকতা) স্পর্শ করল না পর্যন্ত! তাঁদের লেখায় কেবল গ্রাম বাংলাই জড়িয়ে-পেঁচিয়ে জুড়ে-মুড়ে থাকল এবং তিরিশের গ্রামবাংলা। বুঝতে পেরেছ তো! তখন তোমার কৃষক আন্দোলনগুলো হবে, তখন সাধারণ মানুষ উঠে আসছে। আর তখন কিভাবে তোমার শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের রাজনীতি, এই সময়ে সায়েবরা কী করবে, ব্রিটিশরা কী করে ভাগ করবে, মুসলিমকে আলাদা করবে, হিন্দুকে কোথায় রাখবে, কেমন করে বাঁধিয়ে দেবে, এইভাবে ধুঁকে ধুঁকে গ্রামবাংলা চলছে। এইসব দ্বন্দ্ব সংঘর্ষের ভেতরেই কিন্তু। ঠিক যেন মনে হয় কলুর বলদ—চোখে ঠুলি লাগিয়ে, কোঁ কোঁ শব্দ করে দড়ির গোছায় বাঁধা জীবন চলছে। এই যে ঘটনা পরম্পরা, বাস্তবতা এসব কার কাব্যে এসেছে তিরিশের দশকে? বিষ্ণু দে, সুধীন দত্ত, বুদ্ধদেব বসু, এসেছে? আসে নি। কারোর কাব্যেই আসে নি। এখান থেকে যদি একটু ব্যতিক্রম করতে চাও, তারপর যদি পুরোপুরি ব্যতিক্রম করতে চাও সেটাও পারবে। তিনি গ্রাম থেকে এসেছেন। শহুরে হন নি। কেউ কেউ ভুল করে তাঁকে শহুরে বানিয়েছেন বটে। কিন্তু আমার সাহিত্যবোধে তা আঁটে না। তিনিই সেই বাংলার কবি। তিনি জীবনানন্দ দাশ। তাঁকে তুমি ঐ আধুনিকতা, বুদ্ধদেবীয় আধুনিকতায় ফেলতে পারবে না। কোনোভাবেই না। তাঁকে তোমার বাঙালির শ্রেষ্ঠ কবিদের একজন বলতেই হবে। তাঁকে তিরিশের অন্য কবিদের সাথে ইকুইট করা যাচ্ছে না। যাদেরকে যাচ্ছে তাদের সংখ্যাই বেশি ছিল, তোমার কথা মতো আছে এখনও। যাই হোক, এটা একভাবে প্রচারিত হয়ে গেল আধুনিক কবি বলতে তিরিশের কবি, এঁরা নতুন যুগ নিয়ে এসেছেন। বাংলা কবিতা এখন এগুবে এই পথ ধরেই। চল্লিশের শুরুতেই যে বাম আন্দোলন শুরু হয়ে গিয়েছিল সে সময় গণনাট্য ইত্যাদি ইত্যাদি নানান রকমের নতুন নতুন সংস্থা তৈরি হয়েছিল, তখন যারা কবিতা লিখেছে সুভাষ মুখোপাধ্যায়, কিংবা সুকান্ত, তারা কিন্তু প্রাগুক্ত ধারা থেকে একটু সরেছে। তিরিশের মতোই ছিল না। তাহলে তিরিশটা কি সরাসরি শিখে নেওয়া, আয়ত্ত করা, আরোপিত একটা ব্যাপার ছিল? এই প্রশ্ন কেন করে না মানুষ! আধুনিকতাটাকে ব্যাখ্যা করে না কেন? নাগরিকতাটাকে ব্যাখ্যা করে না কেন? কেন মনে করে যে কলকাতাই সবচেয়ে বড় নগরী ছিল? যেমন সন্দীপন চাটুয্যে মনে করতেন। তেমনি অনেকেই মনে করেন যে ঢাকা শহর, নাগরিকতা এসব নিয়ে লিখতে চেয়ে, ঢাকায় থাকতে চেয়ে জুতো পালিশ করতেও রাজি আছে। দেখেছি আমি। কিন্তু আমি এইসব জিনিসের সাথে কখনো নিজেকে এক করি নি। আমি আমার পথ ও রাস্তাটাকে দেখার চেষ্টা করেছি। বুঝতে পেরেছ? আমি কতদূর পেরেছি না পেরেছি সেটা বড় কথা নয়, আমি আমার রাস্তাটাতেই হাঁটতে চেয়েছি। সেই চেষ্টাটাই করেছি। করে যাব আমৃত্যু। তোমার শেষ কথাটুকু বলি। শামসুর রাহমান এইটার লিগ্যাসি একদিক থেকে বহন করেছেন বটে, তাঁদের অর্থাৎ তিরিশের কবিদের সাথে তুমি প্রথমে যেটা বললে, তাঁর সাযুজ্য কোথাও একটা খুঁজে পাওয়া যায় পঞ্চাশের দশকের শুরুর দিকে, কিন্তু পঞ্চাশের দশককে তোমার ভুললে চলবে না, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গাঙ্গুলির আবির্ভাবও কিন্তু ঘটেছে, শামসুর রাহমানও। দুটো দেশ ততদিনে আলাদা হয়ে গেছে। তাঁদের যে একপথে হাঁটা নয়, ততদিনে তাও কিন্তু বলা যাবে না। এবং অনেকটা কাছাকাছি। অবিলম্বে, আমার ধারণা, তাঁরা তিরিশের মূল স্পিরিট যেটা ছিল সেটাকে আত্মীকৃত করেছে। কিন্তু কবিতার যে বাইরের চেহারা, কবিতার যে নতুন ভাষা, কবিতার যে নতুন কলাকৌশল, এইসব কিছু নিয়েই পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে, সেটা হয়তো চলেও গেছে। কিন্তু অবিলম্বে শামসুর রাহমান দেশের কবি হয়ে উঠলেন। এটা অস্বীকার করা যাবে না।

শিমুল : স্যার এটা কি মুক্তিযুদ্ধের ফলেই হলো না?

হাসান আজিজুল : মুক্তিযুদ্ধটা আরেকটু পরে। তার অনেক আগেই এটা বোঝা যায় যে তিনি, ঐ জীবনানন্দ দাশের মতো প্রকৃত কবি, যে একটা ভিশনের অধিকারী। যে একেবারে ভেতর পর্যন্ত দেখতে পায়। শামসুর রাহমানের সেটা পাঁচের দশকেই শুরু হয়েছিল। শামসুর রাহমান অসম্ভব এক্সেপশনাল একজন কবি। তবু আমি একবার, শামসুর রাহমানকে বোধহয় একটা আঘাতই করেছিলাম, যখন আমি বলেছিলাম, একটা প্রশ্নের জবাবে, শামসুর রাহমান যতটা না নাগরিক কবি, সম্ভবত শহীদ কাদরী তার চেয়েও শক্তিশালী! একথা বলার পর আহত হয়েছিলেন আমাদের কবি (স্যারের কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে)। তিনি আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, হাসান, আপনি কি ঠিক তাই মনে করেন? আমি বললাম যে, রাহমান ভাই, তাই মনে করি এইজন্যে যে, শহীদ কাদরীর ব্যাকগ্রাউন্ড আছে কলকাতা শহরের। আর আপনার ব্যাকগ্রাউন্ডে আছে অর্ধনগরী ঢাকা আর নরসিংদীর পাড়াতলি গ্রাম। পাঁচের দশকের ঢাকা শহর, সেই ঢাকা শহর আধুনিক হয়েই তো উঠল সেদিন, এই ব্যাকগ্রাউন্ডের সাথে শহীদ কাদরীর ব্যাকগ্রাউন্ডের কিছু পার্থক্য আছে তো! এইটা আমি বলার চেষ্টা করেছি কবিকে। কবির মতো ভদ্রলোক মানুষ হয় না। তিনি সঙ্গে সঙ্গে একটু হেসে দিলেন। মনে আছে। এই হলো আধুনিকতা নিয়ে আমার বক্তব্য!

শিমুল : আমার মনে হয় আগুনপাখি হাসান আজিজুল হকের একমাত্র উপন্যাস (বৃত্তায়নসহ অন্য উপন্যাসগুলো পড়ে এবং নিজের পাঠসীমাবদ্ধতাকে মাথায় রেখেই) লিখনশৈলীর বিচারে বাংলা কথাসাহিত্যে যার দৃষ্টান্ত প্রচণ্ড অপ্রতুল। একজন শিল্পী হতে হয়, যাঁর রাজনৈতিক সচেতনতা প্রচণ্ড প্রখর। যে কারণেই হয়তো উপন্যাসের নাম হয় আগুনপাখি। এই যে আপনি আগুনের কথা বলছেন, এই দীক্ষা, সেই শৈশব থেকে আজ অবধি মাথায় রেখেই, এই দীক্ষা পেলেন কোথায়?

হাসান আজিজুল : অনেকগুলো কথাই একসঙ্গে বললে তো! তার মধ্যে ঐ কথাটা প্রথমেই আমার মাথায় খট করে লাগল। ঠিক এইভাবে লেখা অপ্রতুল বাংলা ভাষাতে। আগুনপাখির যে ভাষাটা সেরকম কথ্য ভাষা ব্যবহার করা, অপ্রতুল। পুরো উপন্যাসটা একেবারে ঐভাবে লেখাটা, আমার কাছে প্রতুল মনে হয় না। মনে হয় কই! আর কি দেখেছি? এটা একারণেই বলা যে, এটা নিয়ে আমার অনেক দ্বিধা ছিল। এবং এটা সাহিত্যের একটা ফর্ম হিসেবে ইভেন সাহিত্য হিসেবে কেউ অাদৌ এটা গ্রহণ করবেন কি না, অনেকেই কথ্য ভাষা ব্যবহার করেছে, তোমাদের মধ্যেও অনেকেই তরুণরা আগাগোড়া কথ্য ব্যবহার করে লিখছে, কিন্তু ঠিক আমার মতন করে এ ব্যাপারটা কেউ করে নি। আমার কাছে যেটা মনে হয়েছিল, একদিন আমার মা—তার ভাইপো, ভাইঝিরা, তার ভ্রাতুষ্পুত্র, আমার ছেলেমেয়েরা তাঁকে ঘিরে ধরল। আমাদের বাড়িতে একটা পুরনো ধাঁচের টেপরেকর্ডার ছিল, গ্রুন্ডিগ, কিন্তু সে কাজ করে না। তারা সেটা চালু করে দিয়ে কেউ বলল, দাদি তুমি কথা বলো, কেউ বলে ও বুবু তুমি কথা বলো, আমার মা মিনিট দশেক কথা বলেছিল। সেই টেপটা আছে। দশ মিনিটের মধ্যে সারাজীবনের কথাই তিনি বলে ফেললেন। কেবলি বলতে লাগলেন তারপরে মরে গেল! তারপরে মরে গেল। এইভাবে তিনি কথা বলছেন, তার জীবনের মানুষগুলোকে নিয়ে। আর সবাই মরে যাচ্ছে। বলছেন, আমার বয়স আট হলো কি হলো না মা আমার মরে গেল। ঠিক এইভাবে, ঐ ভাইটা হয়েছিল, মরে গেল। কেবলি মরে যাওয়া। আবার মাঝে মাঝে বলছেন, ‘কি র‌্যা, হয়েচে?’ ছেলেমেয়েরা বলছে, ‘হ্যা হ্যা হচ্ছে, তুমি বলো, তুমি বলো, তুমি বলে যাও।’ এই টেপটা মনে হয় এখনো খুঁজে পাওয়া যাবে। আমার মা সাতাশি বছর বয়সে মারা গেলেন। শেষ তিনবছর একেবারে যাকে বলা যায় সব ভুলে একটা বিভ্রান্তির মধ্যে মানসিক ভারসাম্যহীনতার মধ্যে আমার মা, তোমাকে আজ এসব কথা আমি বলছি, (স্যারের গলা ধরে আসে), ভারসাম্যহীনতাটা হচ্ছে সোজাসুজি মায়ের অশীতিপর বৃদ্ধাবস্থা থেকে তাঁর শৈশবে প্রবেশ করা। ৮৫ বছরের একজন বৃদ্ধা নিজের শৈশবের সংসারে প্রবেশ করছেন। নিজেই বলছেন— ‘ও-লো বউ, উই যে ডালটা শুকোতে দেওয়া আচে, তুলে নিয়ে এসো, না-হলে, পাখিতে খেয়ে নেবে যে!’ হ্যা! কিংবা শাশুড়িকে সম্বোধন করে কথা বলছেন, যদিও শাশুড়ি কিন্তু নেই। কখনো কখনো আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসছেন। বলছি, কি মা! চিনতে পারছো না? মা বলছেন— ‘হ্যা, পাচ্ছি, পাচ্ছি বৈ কি!’ আমার তখনি মনে হল, আচ্ছা এই মানুষটা, যাকে আমরা টেনে ছিঁড়ে হিঁচড়ে নিয়ে এসেছি এই দেশে, আজকে সে কেবলি কি এসব কথা বলছে মস্তিষ্কবিকৃতি ঘটেছে বলে, না কি মস্তিষ্কবিকৃতি থেকে সে এস্কেপ করছে তার বাল্যকালের স্মৃতিতে, সংসারজীবনে, স্বামীর সাথে দাম্পত্যে ঢুকে পড়ছে। আমার মনে হলো, আচ্ছা অবিকল এটাই লিখে দেখি না কেন!

12179202_10153696474654581_1528351865_n
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন

শিমুল : এই ডায়ল্যাক্ট, এক্কেবারে এই সবকিছু!

হাসান আজিজুল : এক্কেবারে। এইভাবে। এইভাবেই লিখে দেখি না কেন! আমি তো কোনোদিন সেভাবে দীক্ষা গ্রহণ করি নি। আবিষ্কার করেছি। আমি ছোটগল্প লিখেছি তো কাউকে না পড়েই, আগেই তোমাকে বললাম! আমি পড়েছি, পরবর্তীকালে সবই পড়েছি। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পড়েছি, বিভূতিভূষণ পড়েছি, সবই, আমি পড়ার দিক দিয়ে কাউকেই ছাড়ি নি। এমনকি তোমাদের ইয়াংদের। কিন্তু আমার কোনো অবলম্বন ছিল না, মডেল ছিল না। এখনো নাই। আমি অনুপ্রেরণায় বিশ্বাসীও না। যাই হোক, তখন মনে হলো, করি না! ইনফ্যাক্ট তখন একটা কথা মনে হলো, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, একবার বলেছিলেন, উপন্যাস তাহলে আমরা একটা তৈরি করে নিই, না! তার নিশ্চয়ই একটা গঠনক্রিয়া আছে। সেটাকে তথাকথিত শৈল্পিকতা বলি আর না বলি, একটা স্ট্র্যাকচার থাকে। যদিও আমি বিশ্বাস করি না। ভাবলাম আমি, করি না, ঠিক যা যা ঘটছে তাই লেখার চেষ্টা করে দেখি না! এবং যদ্দুর পারি অ্যাডজেকটিভ ব্যবহার করব না। বিশেষ্যটা ব্যবহার করব না। আন্ডারস্টেটমেন্ট থাকবে সবকিছু। বুঝতে পেরেছ। তুমি খেয়াল করবে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের সব যায়গাতেই, তুঙ্গ ভায়োলেন্সের মুহূর্তেও কিন্তু কথাটা খুব সাধারণভাবে বলা। নিচুগলায় বলা। এটা একটা আশ্চর্য ব্যাপার। এবং এইটাকেই উনি মনে করতেন…

শিমুল : রিয়ালিটি?

হাসান আজিজুল : হ্যাঁ। রিয়ালিটি! এটাকেই তিনি মানব মনের প্রকৃতি মনে করতেন যে, মানুষ ক্যান বি ডেসট্রয়েড বাট নট বি ডিফিটেড। এটা একটা সাংঘাতিক কথা। এবং ওল্ডম্যান অ্যান্ড দ্য সি-র মধ্যে ঠিক তাই আছে।

শিমুল : আপনার খুব প্রিয় ঔপন্যাসিক এবং উপন্যাস…

হাসান আজিজুল : কতবার পড়েছি। এখনো সামনে পেলেই পড়ি। আর সেই সঙ্গে সঙ্গেই মনে পড়ে তোমার সেই স্নোজ অব কিলিমানজারো। মনে পড়ে গ্রেগরি পেক সেই চরিত্রে অভিনয় করছেন, তার দিকে ছুটে আসছে একটা গণ্ডার। তিনি ইচ্ছে করলে গুলি করতেই পারেন, কিন্তু তিনি করছেন না, তিনি মৃত্যুটাকে উপভোগ করছেন, দেখছেন ঠিক তার মুখের দিকে তাকিয়ে, একেই বলে মানুষ।

শিমুল : তার মানে কি দেখতে চাওয়ার তৃষ্ণা? সবটা?

হাসান আজিজুল : দেখতে চাওয়া তো বটেই। ঠিক মুখের উপর আসার পর সর্বশেষ মুহূর্তে তিনি গুলিটা করলেন। গণ্ডারটা যখন পড়ে গেল, তার সামনের যে শিংটা তা ঠিক পায়ের কাছে। অর্থাৎ শেষ মুহূর্তে তিনি গুলিটা করেছেন। গুলিটা করতে আর একটু ওদিক হলেই, তিনি সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়ে যেতেন। কোনো রাস্তা ছিল না।

শিমুল : ওই সমস্তটাকে হেমিংওয়ে যেভাবে বলছেন…

হাসান আজিজুল : তুমি যেমন বলেছ অপ্রতুল, বিশ্বসাহিত্যে মোটেও এমন অপ্রতুল নয়। যা যা ঘটেছে তাই বর্ণনা আছে তাঁর, এমন লেখার নাম হচ্ছে দ্যা গ্রিন হিলস অব আফ্রিকা। লোকে বলেছে এটা তার ভালো উপন্যাস হয় নি। লোকে যাই বলুক, আমি খুব আগ্রহের সঙ্গে পাঠ করেছি। এবং তরুণদেরও অনুরোধ করব পড়ে দেখতে। তা দেখো, লিটারেচার কতভাবে তৈরি হতে পারে আর কি! যুদ্ধ দেখে, যুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা নিয়ে এরিখ মারিয়া রেমার্ক লিখেছেন। কিন্তু কোনোদিন যুদ্ধ দেখেন নি, পড়েছেন এবং কল্পনা করেছেন আর লিখছেন সেরকম উপন্যাস লিখেছেন স্টিফেন ক্রেইন। তাঁর বইয়ের নাম হচ্ছে দ্যা রেড ব্যাজ অফ কারেজ। দুটোই আমাদের পাশাপাশি পড়ে দেখা উচিত, যে যুদ্ধের কোনোরকম অভিজ্ঞতা নেই, অথচ যুদ্ধের দারুণ সফল গল্প উনি পরিষ্কার যুদ্ধ নিয়ে লিখছেন, সাহিত্য কি পারে এটা দেখার জন্য, উল্লেখ করার জন্যই এটা করা দরকার। আমি সেইজন্যেই মনে করলাম যে করি এটা মানে আগুনপাখি আমি লিখতে থাকলাম। আমার বড় বোন হচ্ছেন আমার সর্বক্ষণের সমস্ত কিছুর সঙ্গী আর কি! উনি আছেন এখনো। জাহানারা নওশীন। উনি নিজেও লেখেন। আমার চার বছরের বড়। তো তাঁকে আমি পড়ে শোনালাম। উনি বললেন, হ্যা, বেশ, ওরকম করেই তো হতো সব। তুই লেখ, লেখ। প্রচণ্ড উৎসাহ দিলেন। আর আমি লিখে যাচ্ছি। একটা যায়গায় এসে আবার মনে হলো বড্ড ট্যাক্সিং হয়ে যাবে যারা পড়বে তাদের উপর। এই সময় আবার আরেকজন আমার অসাধারণ অতিশয় পাঠক, বললেন, ভালো লাগছে, কিন্তু একটু চাপতো, মনোটনাস তো লাগছে। এটা নিয়ে আমি ভাবলাম। এবং বন্ধ না করে শেষ পর্যন্ত লিখলাম। এর একটা বড় উৎসাহ ছিল ‘প্রথম আলো’র সাজ্জাদ শরিফ, সে ‘আমার একটি নির্জল কথা’ বলে একটি ছোট্ট গল্প ছেপেছিল। তোমাকে যে একটু আগে টেপ রেকর্ডারের আর মায়ের কথা বললাম, সেই জিনিসটা অবিকল তোলা ছিল। এবং আমি ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘অবিকল লিখলে সাহিত্য হয় গো?’ ও বলল, ‘হাসান ভাই লেখেন না।’ ছেপে বেরুবার পর ও বলল, ‘আমার কাছে খুবই ভালো লেগেছে।’ তখন আমি ভাবলাম ওইটাকেই আমি কেন্দ্র করি না কেন! তো লিখতে শুরু করার পর একটা জায়গায় এসে ওই গল্পটায় দেখলাম যে, প্রথম আলো যদি চায় সেখানে শেষ করে দিতে হচ্ছে। প্রথম আলোর ওটা প্রকাশ করার গল্পও খুব বড় একটা গল্প। কোনোদিন যদি রাশেদকে জিজ্ঞেস করো তাহলে রাশেদ বলতে পারবে। দিনসাতেক ঢাকায় থেকে, রাশেদ ভয়ে আমার সাথে কথা বলছে না, এত বিরক্ত যে করছি ওদের, আর আমি এত খুঁটিনাটি যে দেখছি, সাতদিন পরও দেখা গেল যে শেষ হয় নি। দেয়ার পর রাশেদ বলল যে, ‘হাসান ভাই এ যে শেষ হয় নি, একটু যে বাকি রয়ে গেল।’ আমি বললাম, ঠিক আছে, তুমি একটা ঘর দাও তো আমাকে। তো সাজ্জাদ যে ঘরটায় বসতো সেই ঘরে কাগজ কলম দিয়ে আমাকে বসিয়ে দেয়া হলো, বাইরে থেকে দরোজা টেনে। আমি শেষ তিন-চারটে পৃষ্ঠা সেইখানে বসে শেষ করেছি। রাশেদকে বললাম, এই রাশেদ নাও, শেষ করে দিলাম। উফফ, সে একটা ব্যাপার! শেষ হওয়ার পরে যেই পড়ে সেই বলে, অসমাপ্ত লাগছে তো! আমি বললাম, অসমাপ্তই। অসমাপ্তই তো। কারণ এই মহিলার জীবনের যেখানটা তুলে ধরার জন্য আসা, সেই মহাঘটনা যেটা এই উপমহাদেশে এটা একটা মানবিক বিপর্যয়ের ব্যাপার। এটা কেবল বাংলা ভাগ হওয়া বা ভারত ভাগ হওয়া এরকম সাধারণ বিষয় দিয়ে হয় না। আর আগুনের দীক্ষার কথা বলেছ তুমি—যে কোথায় পেলাম! ওটা তো এমন আগে থেকে স্থির করে হয় না। লিখতে লিখতে একটা দিকে যায়। তুমি যদি তির একবার টান দাও, ছিলায় যদি টান দিয়ে তোমার হাতটা ছেড়ে দাও, এটা কিন্তু যাবেই, তুমি জানো না কোথায় কদ্দুর যাবে, হয়তো, কিন্তু যাবে, যাবেই। কমলকুমার মজুমদার অসাধারণ কথা বলেছেন। কী কথা বলো তো! তির পিছনে হাঁটে সামনে যাবে বলে। আকর্ণ টেনেছি আমি, তিরের ছিলাটা। সেইটাই তো কাজ। তা-ই করো। তো সেই টান দিতে দিতে দিতে আমার মনে হলো, যাবে তো নিশ্চয়ই কিন্তু একটা টার্গেট তো থাকা উচিত। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আমাদের ইতিহাসের যে মহাবিপর্যয় এটাকেই সিগনিফায়েড করব এবং এমন একটা মানুষ তৈরি করব যে ঐ মিসরীয় উপকথার মতন, যে নিজেই নিজেকে পাঁচশো বছর আগুনে পুড়িয়ে মরে যায়, পরে তার ভস্ম থেকে ওই পাখিটাই আবার তৈরি হয়। সে কখনো হারে না। একটা মানুষ, তাকে কোথাও কোনোভাবেই মাথা নত করা চলবে না। বাস্তব জীবনে সে যত যাই করে থাকুক না কেন, তাকে যত অধীনতা স্বীকার করতে হয়ে থাকুক, তাকে যত সংকীর্ণতার ভেতর দিয়ে যেতে হোক, তার ভেতরের যে মানুষ, পৃথিবীর প্রায় সব মানুষের মতোই সে খাড়া থাকুক। মেরুদণ্ড সোজা রাখুক। এবং সেই জিনিসটা করার চেষ্টাই আগুনপাখি। ওর একটা আলাদা নাম ছিল প্রথমে, ‘অপ-রূপকথা’। কিন্তু পরে একজন বললেন যে, এইটা দেবেন! আমি বললাম, তাহলে আরেকটাই দিই। নাম দিলাম, আগুনপাখি।


তুমি যদি প্রমিত কথ্যভাষা গড়তে চাও আমাদেরটা নাও। কোনো জায়গার প্রমিত কথ্যরূপ যদি না থাকে তবে এই অধিকারটা কে দিল যে আমি যেমন তেমন করে ভাষাটা বলব


শিমুল : অনেকের মতে উপন্যাস আপনি লিখেছেন, সত্যি করে বললে, একটি; এবং তাতেও প্রমাণ করেছেন যে শুধু প্রমিত লেখ্য বাংলা নয়, আঞ্চলিক মুখের বাংলায়ও জীবন, সমাজ, রাজনীতি, ভূগোল বেশ ভালোভাবেই উপস্থাপন করতে পারে। গদ্যে ভাষার ব্যবহার নিয়ে অনেক তরুণকেই দেখা যাচ্ছে বিশদ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে। এ বিষয়ে আপনার অনুধ্যান জানতে চাচ্ছি।

হাসান আজিজুল : এ নিয়ে আমি বিশদ লিখেছি। প্রচুর। আমি আমার কথা গোপন রাখি নি। এবং সম্ভবত আমিই সবচেয়ে বেশি আর সবার আগেই বলেছি। প্রচুর তর্ক হয়েছে অনেকের সাথে এ নিয়ে। আমার বিশ্বাস আমি বলেছি। প্রয়োজনে আবারও বলব। আমার বেলায় মনে হয়েছে যে সকলের সঙ্গে সকলের যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটা ভাষা দরকার যা সবাই বুঝবে, তা নইলে হবে না। একটা কিছু থাকবে যা দিয়ে বলা যাবে যে এটা হচ্ছে অমুক ভাষা। অর্থাৎ যদি কেউ বিদেশ থেকে আসে, বলে বাংলা শিখবো তাহলে সে যেন একটা কিছু শিখতে পারে। স্কুলে ছেলেমেয়েকে যদি তুমি বাংলা শিখাও তাহলে ঐ ভাষাটা শেখাতে হবে। এইটা হচ্ছে একটা জাতির একমাত্র এবং সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশমাধ্যম। জাতি—তার প্রতিভা, তার চিন্তা, সাহিত্য, কবিতা, গদ্য, মননশীলতা—সব কিছুই ভাষানির্মিত। সব ক্ষেত্রেই ভাষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখন যে সমস্ত কথাগুলো ওঠে, যে প্রমিত ভাষা হচ্ছে ক্ষমতার ভাষা, কেন্দ্রিকতার ভাষা, শোষণের ভাষা, এ কথাগুলো ওঠে। আমি মনে করি যে এসব ও শিখানো, আরোপিত বুলি। পশ্চিমের শিখানো। তাদের দিকে তাকিয়ে বলা। তাদের দিকে তাকানো যাবে না এই জন্যে যে, তাদের সমাজে মৌলিকভাবে অনেক সমস্যা নেই। তারা সেই সমস্যাগুলো থেকে ঊর্ধ্বে উঠে গেছে। এখন তারা ব্যক্তি, স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তা। এই সমস্ত বিষয় নিয়ে স্বতন্ত্রভাবে ভাবতে পারে। আমাদের পক্ষে সামষ্টিকতার বিপরীতে এইভাবে ভাবাটা মারাত্মকভাবে এখনো পর্যন্ত নিষ্ঠুরতম বিলাসিতার শামিল। তুমি যদি বলো, বাংলাদেশে পনেরো কোটি মানুষের দিকে যদি তাকাই, আর তুমি যদি বলো তাকানোর কোনো দরকার নাই, তাদের থাকার দরকার নাই, আমি আমার মতন ক্যারিয়ার তৈরি করব, এই করব সেই করব, আমি আধুনিক হব, এই ব্র্যান্ডের পোশাক পরব ওই ব্র্যান্ডের পোশাক পরব, নিজে একা একা ভোগ করব তাহলে তোমার সঙ্গে আমার কোনো কথা নাই। কারণ আমি সারা জীবনে এটা করি নি। এবং এই কথাটা আমি প্রত্যেককে বলেছি যে, মানুষ আমার স্বজন, বিশ্ব আমার স্বদেশ। এই কথাটা আমি বলি। এবং বিশ্ব আর দেশ নিয়ে, ভাষা নিয়ে এটাই আমার বক্তব্য। তো সেই কারণে আমি মনে করি একজন মানুষ নিজের ভাষাকে পরিশোধিত করবে, তাতে তার অবশ্যই স্বাতন্ত্র্য থাকবে, তদুপরি তাতে এমন একটা চেহারা থাকবে যেন আমি বলতে পারি এইটা অমুক জাতির ভাষা। এটা হলো বাঙালির ভাষা, বাংলা ভাষা। এটাকে যদি কেউ মনে করে যে পাথরের মতো স্থির, আমাদের অনেকে তাই মনে করেন যে, প্রমিত বাংলা দিলাম, অমুকের অধীনতা করছি, ওই পশ্চিম বাংলা, ওই নদীয়ার ভাষা, ওই শান্তিপুরী ভাষা, ভাগীরথী তীরস্থ ভাষাটা, ওইটা আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছে, আমরা ওটা মানব কেন, এরকম যারা বলছে তারা ভুল জানে। কিছুই কেউ কারো উপর চাপিয়ে দেয় নি। এটা দাঁড়িয়ে গেছে। এবং এই ভাষাও প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। তাহলে প্রমিত ভাষা বা মানভাষা বলতে একেবারে পরিবর্তনহীন, মানুষের সাথে সংস্পর্শহীন একটা ভাষা থাকবে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। এবং সেই কারণেই এখন আমি ইচ্ছে করে আমার প্রমিত ভাষা থেকে বহু রকমের শব্দ, আমি ইচ্ছে করে বাদ দিয়ে দিয়েছি। আমিও এখন বিশ্বাস করি বাংলা ব্যাকরণ নাই। ব্যাকরণ তো কেউ আপনার উপর তোমার উপর চাপিয়ে দিচ্ছে না। একটা কথা এখানে বলতে হবে, ধরো যদি তুমি বিজ্ঞান চর্চা করতে চাও, দর্শন চর্চা করতে চাও, তুমি কোন ভাষায় করবে? প্রমিত ছাড়া যদি নোয়াখালির ভাষায় লেখো রাজশাহীর লোকে পড়বে, বুঝবে কী করে? নদীয়ার ভাষায় যদি করো তো চাটগাঁর লোক বলবে, তোমাদেরটা কেন,  আমাদেরটা নাও! তুমি যদি প্রমিত কথ্যভাষা গড়তে চাও, আমাদেরটা নাও। কোনো জায়গার প্রমিত কথ্যরূপ যদি না থাকে তবে এই অধিকারটা কে দিল যে, আমি যেমন তেমন করে ভাষাটা বলব! ‘মানুষ এভাবে বলে’ এটা অনেকের একটা যুক্তি। কিন্তু তুমি কি এভাবে বলো? এটা একটা বাজে কথা যে, মানুষ এভাবে বলে। কই! আমি তো বলি না! আমি তো এক্ষুণি বলব, কই আমি তো বলি না! তাহলে এই অধিকারটা কে দিল যে, যেমন তেমন করে আমি ভাষাটা বলব। কাজেই এই ঝঞ্ঝাটটা, ভাষা যেখানে আপনাআপনিই চলে, অথচ এটা অসম্ভব রকমের প্রাতিস্বিক বা ব্যক্তিগত, আর সেই সঙ্গে সঙ্গে অসম্ভব রকমের সামাজিক, তোমার ব্যক্তিগত হলেও সামাজিক একটা বিষয় ভাষা, এটা নিয়ে তছনছ করার কোনো অধিকার কারোর নেই। আর কথ্য’র ক্ষেত্রে আমি বলছি আমার চাইতে কথ্য আর কে ভালোবাসে তাকে আমার সামনে নিয়ে এসো। কেবল আগুনপাখি বলেই বলছি না, যেকোনো জায়গায়, যেখানে যেখানে এই দীর্ঘ ৭১/৭২ বছরে গিয়েছি সেখানকার ভাষা আমি খুবই দ্রুত আয়ত্ত করেছি। এবং আমি বলতেও পারি। সেসব দেশের লোকের চাইতে ভালো বলতে পারি। আমি খুলনার কথ্য বলতে পারি, বরিশালের, রাজশাহীর। যেসব যায়গায় আমার যাওয়া হয় নি সেসব যায়গার কথ্য আমার অসম্ভব ভালো লাগে। যেমন কুমিল্লার। চট্রগ্রামের। অতিসম্প্রতি আমার একটা লেখার ক্যারেক্টার কুমিল্লার মানুষ। আমি সেখানে কুমিল্লার টানসহ যে কথ্য তা বলতে চেষ্টা করেছি। তাই যেটা তোমার পারস্পর্যমূলক ব্যাপার, যেখানে মানুষকে সামনে হাজির করতে হয়, সেখানে কথ্য আমি কেন ব্যবহার করব না! কাজেই আমার আগুনপাখিতে কথ্য ব্যবহার করার একশোটা কারণ আছে। এবং সেই কারণেই যে কেউ কথ্য ব্যবহার করে। তার প্রতি আমার একশো ভাগ সমর্থন আছে। কিন্তু তার বিপরীতে, সেই জায়গাটি আমি পূরণ করতে চাই একটা আলাদা মানভাষা দিয়ে, মানভাষা মানে সম্মানিত ভাষা নয়, মান ভাষা মানে সক্কলের কাছে যাওয়ার জন্য যে ভাষা। এই কারণেই আমি ভাষা নিয়ে পাথর কোনো জায়গায় নেই। কেউ যেন মনে না করে আমি কথ্য ভাষার বিরুদ্ধে। কথ্য ভাষার বিরুদ্ধে হলে আমি আমার মায়ের ডায়েলেক্টে আগুনপাখি লিখতাম না।

শিমুল : কিন্তু স্যার প্রবন্ধের ক্ষেত্রেও অনেকে ব্যবহার করছেন সাধু ভাষা। আমি আপনাকে অনেকের নামও বলতে পারি।

হাসান আজিজুল : তোমার কাছে শুনে তো আমি সে সম্পর্কে কথা বলব না। ব্যক্তিপ্রসঙ্গে সরাসরি লিখিত বক্তব্য ছাড়া, শুনে কথা বলতে আমি রাজি না। তবে এ প্রসঙ্গে আমার নিজের কথাটা হচ্ছে এই, আমি বলতে চাই, সাধু ভাষায় লিখছি কারণ অন্যরা অসাধু ভাষায় লিখছে বিষয়টা এমন নয়। প্রমিত ভাষাও কিন্তু এক অর্থে ব্যক্তিগত ভাষা। কারণ তুমি দেখবে, প্রমিত ভাষাতে লেখা সব একরকম নয়। রাজশেখর বসুর প্রমিত গদ্য পড়লে একরকম মনে হবে, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা পড়লে একরকম মনে হবে, আমি আরো টিপিক্যালি বলি, এমনকি যিনি কথ্যবাংলার প্রায় রাজা, যাকে অনুসরণ করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সেই প্রমথ চৌধুরী আদৌ কথ্য ভাষা লেখেন নি। তাঁর ভাষা অত্যন্ত পরিশীলিত, অত্যন্ত রুচিশীল, আমি বলব রুচিবায়ুগ্রস্ত। তাঁর প্রবন্ধ পড়লে তা মর্মে নেয়া কঠিন। এমনভাবে ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের কথা বলা যায়। তিনিও প্রমিত ভাষায়ই লিখেছেন। সাংঘাতিক ভাবে সেটা ধূর্জটীয়, সেটা কিন্তু কথ্য ভাষার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা যায় না। আবার যে সাধু ভাষার কথা বললে সেই সাধু ভাষা তো চিরকাল লিখে গেছে নীরদ সি চৌধুরী। কিন্তু এত নীরদীয় সেটা, যে সাধু ভাষা লিখলেই ওর ভাষাটা হবে না। কাজেই এইভাবে কথা বলা ঠিক নয়। কিন্তু আমি বলছি ওই ভাষার একটা কঙ্কালসংস্থান আছে। যেটা সবাই অনুসরণ করবে। আমি যদি বলি যে, তুমি খাবে, তবে আমি কি বলতে পারব, তুমি খাবি! তা অসম্ভব। এখানেই স্ট্র্যাকচার। স্ট্র্যাকচার অন্তহীন। বুঝতে পেরেছ তো! স্ট্র্যাকচারটা ভাঙলে তা অন্য একটা কিছু হবে, ঐ ভাষাটা হবে না। আমার ভাষার ক্ষেত্রে এই সমস্ত স্ট্র্যাকচার তৈরি করা আছে, আছে আমার। আমার কোনো অসুবিধে হচ্ছে না। আমি যদি কান্টের তত্ত্ব আলোচনা করি, তখন আমি যে মানভাষায় বলি তাতে আমার বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ছাত্রেরও কোনো অসুবিধা হয় না, আমারও হয় না। আমি যখন প্রবন্ধ লিখি, আমি দেখেছি যে প্রমিত বাংলার যে তৎসম শব্দের ব্যবহার সেটাকে কমাতে কমাতে, আমরা তো তৎসব শব্দ প্রায় সত্তর ভাগ ব্যবহার করি, কথ্য বাংলাতেও করি, বহু জায়গা আছে এই দেশে, যেখানে বই বলে না পুস্তক বলে। গাই বলে না গাভী বলে। দুধ বলে না দধি বলে। কথ্য, মহাকথ্য সেগুলো। কিন্তু এখানে যাই থাক না কেন একটা কঙ্কালসংস্থান কিন্তু আছে। তেমনি করে শিমুল খাবেন-এর জায়গায় তুমি খাবি যেমন হয় না, এভাবেই সেখানে আমি একটা বেসিক জিনিস রাখব। কাজেই, সর্বনাম এবং ক্রিয়ার যে রূপটা এত বেশি সবকিছুতে ঢুকে পড়েছে ইচ্ছা করে, সেখানে আমি সর্বনামের এই রূপটা নষ্ট করব কেন? সাধুতে এবং চলিততে এই পার্থক্যটা আমরা স্বীকার করে নিয়েছি। আমরা সেটা মানব। তার মধ্যেও কেউ যদি ব্যক্তিগত বিশেষত্ব হিসেবে তার নিজস্ব প্রমিত ভাষাতেও যদি অল্পবিস্তর পরিবর্তন নিয়ে আসে আমি তো তাতে কোনো আপত্তি দেখি না। যদি কেউ এখনো সাধুতে লেখে, আমি মনে করি এটা আরেক ধরনের ফ্লেবার। এটা দেওয়া যায়। কিন্তু সাধুতে অন্য একজনের মোহর বা পাঞ্জা পড়ে গেলে চলবে না। যে ব্যবহার করছে তাঁর নিজের মোহর বা পাঞ্জাই পড়ে। এখানে অভিনন্দনের যেমন কিছু নেই তেমনি নিন্দারও কিছু নেই। যারা এই কথাটা তোলেন, আমি বলব যে তারা বিটিং এবাউট দ্যা বুশশ। মূল কথাটাতে তারা যেতে চাইছেন না। যাই হোক, আমি আশা করি ভাষা বিষয়ে কেউ আর আমাকে প্রশ্ন করবে না। এ ব্যাপারে আমি রাতদিন বলেছি। আচ্ছা যাও, তোমার এ বিষয়গুলো নিয়ে আমি দীর্ঘ একটা প্রবন্ধ লিখব। এই শেষ।


আমি বলেছিলাম, রাজা রামমোহন রায়ের ব্যাকরণ হচ্ছে বাংলা ব্যাকরণ, সেখান থেকে ‘যদ্যপি না ক্রিয়াপদ পাইবেন, তদ্যপি আপনি ইহার অর্থ না পাইবার চেষ্টা করিবেন’। এটা তো পরিষ্কার বোঝা যায় যে এটা ইংরেজি ভাষার রিপ্লেসমেন্টের চেষ্টা


শিমুল : অনেকেই মনে করেন, হুতোমি ভাষা বা আলালি ভাষার মধ্যে যে সম্ভাবনা ছিল, বঙ্কিমচন্দ্রে এসে সেটা খর্ব হয়েছে। কিন্তু আজ অবধি আমাদের সাহিত্য বঙ্কিমের পথেই এগুচ্ছে। সাহিত্যের প্রি-কলোনিয়াল ভাষা বা কাঠামোর সঙ্গে কলোনিয়াল ভাষার পার্থক্যও অনেকে টানতে চান। এই পার্থক্যে চোখ রেখে সাহিত্যের পথ নির্বাচন করার চেষ্টা করা কি আপনি দরকারি মনে করেন?

হাসান আজিজুল : এই যে আবার তোমাদের পোস্টমডার্ন একটা প্রশ্নে চলে গেলে। হা হা হা। কিন্তু যেহেতু এই তর্ক চলছে তাহলে তো বলতেই হয়। জানো তো, আমি ছাড়বার পাত্র নই (স্যার উচ্চস্বরে হেসে ওঠেন)। আমি একবার বাংলা ভাষায় দর্শনচর্চা নামে একখানা প্রবন্ধ লিখেছিলাম। ও কোথায় আছে জানি না। সেখানে আমি বলেছিলাম, রাজা রামমোহন রায়ের ব্যাকরণ হচ্ছে বাংলা ব্যাকরণ, সেখান থেকে ‘যদ্যপি না ক্রিয়াপদ পাইবেন, তদ্যপি আপনি ইহার অর্থ না পাইবার চেষ্টা করিবেন’। এটা তো পরিষ্কার বোঝা যায় যে এটা ইংরেজি ভাষার রিপ্লেসমেন্টের চেষ্টা। যে ইংরেজি ভাষায় অনেক ফ্রেজ থাকবে অনেক ক্লজ থাকবে। ইংরেজির গঠনটাই ওরকম। কিন্তু তোমাকে দেখতে হবে, হয়তো সাব্জেক্টটার সঙ্গে পঞ্চাশহাত দূরে ভার্বটা আছে। ওই লিংকটা না পাওয়া পর্যন্ত জিনিসটা ক্লিয়ার হবে না। তার কোনো কারণও নেই। দেখা যায় যে, প্রথম বাংলা ব্যকরণ লেখার একটা চেষ্টা রাজা রামমোহন রায় করেছিলেন। আমি সে ব্যাকরণটা পড়ি নি। আমার মনে হয় যে কোনো না কোনো একভাবে ইংরেজী ব্যাকরণের একটা আছড় উনার উপর পড়েছিল আর কি! তারপর বলা যায় যে ভাষাটা একটু শৃঙ্খলার দিকে নিয়ে আসলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তিনি অনেকগুলো কাজ করলেন যেগুলো খুব স্পষ্টভাবে বলা যায়। যেমন ধরো পুরো বর্ণমালাটা তিনি আলাদা করে কিছু বর্ণ বাদ দিয়ে দিলেন, কিছু বর্ণের চেহারা বদলে দিলেন, পেটকাটা ষ-র মাঝখানে পেট কাটার ব্যবস্থা করলেন, মানে তিনি এগুলো করলেন, ডবল ৯ তুলে দিলেন, ইত্যাদি আর কি! আমার মনে হয় যে খুব বৈজ্ঞানিকভাবে তিনি এগুলো করেছেন। আর বাংলা ভাষা অসম্ভব রকমের ধ্বনিভিত্তিক এবং বৈজ্ঞানিক। বাংলাভাষার মতো এরকম অর্ডারলি সাজানো, আমি তো বেশি ভাষা জানি না, তবে ইংরেজি টিংরেজি যে নয় সে আমি বুঝি। কোনো শব্দ ধর তালু থেকে আসবে, কোনো শব্দ কণ্ঠ থেকে আসবে, কোনো শব্দ নাসা থেকে আসবে, এক ফোটা এদিক ওদিক করার জো নেই। এবং ঠিক জায়গায় বাক্‌যন্ত্র না লাগলে তা উচ্চারণই হয় না। বিদ্যাসাগর ঘোষ বর্ণ, অঘোষ বর্ণ যে ক্যাটাগরাইজেশন করেছেন এগুলোও অসাধারণ। কত সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম। এবং ক এর সাথে খ এর পার্থক্য। জানোতো! ক আর খ একই জিনিস। ক-টাকে জোরে বললেই খ হয়ে যায়। অর্থাৎ দ্বিত্ব। ক এর দ্বিত্ব হচ্ছে খ, গ এর দ্বিত্ব ঘ। আর শব্দভাণ্ডার তো তোমার লাগবে, যখন তুমি লিখতে চাইবে, তোমার একটা লেখার ভাষা দরকার। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তো ঈশ্বর নয়, তিনি এ নিয়মগুলো করেছেন আর এগুলো আমরা এতোকাল পরও মানছি মানে তো এগুলোর এক ধরনের স্বীকৃতি আছে। ঈশ্বরচন্দ্রের সাহিত্যের ভাষা যদি তুমি পড়ো, দেখবে যে প্রায় সংস্কৃতের মতো মনে হবে। বিশেষ করে আমার এখন মনে পড়ছে সীতার বনবাসের কথা। কিংবা শকুন্তলা যদি পড়ো। অসম্ভব তৎসম শব্দ। তোমার মনে হতেই পারে যে এ ব্যাটা আমাদের সংস্কৃত শেখাচ্ছে নাকি! ওরে দাদা, বলিসনে বলিসনে, মাস্টার অংক শেখাচ্ছে’র মতোন। হা হা হা। ঐ বিদ্যাসাগরই যখন আত্মজীবনী লিখছেন তখন এটা স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ একটা ভাষা। ঐ ভাষাটাতেই কিন্তু এখনো লেখা হচ্ছে, আমরা লিখছি। এটাকে হুট করে তোমার পোস্টমডার্ন এপ্রোচ বা কলোনিউত্তর বা কলোনিপূর্ব বলার তো কোনো কারণ দেখি না। তুমি কলোনি পূর্বের গদ্যভাষা আমাকে দেখাও। কি ছিল সেখানে? এক আধটা চিঠি, কিছু দলিলদস্তাবেজ। সেই থেকে একটা নিয়মের মধ্যে একটা বন্ধনের ভেতর দিয়ে যদি বাংলা গদ্যকে আনার চেষ্টা করা হতো তাহলে কি ফল হতো জানি না, খারাপ হতেও পারতো ভালোও হতে পারতো। কিন্তু বিদ্যাসাগরের আগে সেটা হয়নি। তো হয়নি এখন কি করবে!? মারামারি করবে? তো ভাষাটা যখন তৈরী হতে লাগল পুরুতরা প্রচুর তৎসম শব্দ ঢোকাতে লাগল। মুন্সীরা সুযোগ পায় নি, ফরাসীরা সুযোগ পেলে ওরাও হয়তো প্রচুর ফার্সি ঢোকাত। ইংরেজরাও কিন্তু ভয়ের মধ্যে ছিল যে প্রথম অন্তত পঞ্চাশটা বছর ভাষা নিয়ে ওদের ঘাটানো যাবে না। ধর্ম নিয়ে, ভাষা নিয়ে ঘাঁটান যাবে না। জানো তো ওরা এখানে এসে নিজেরাই ওরিয়েন্টালিস্ট হয়ে গেল। ১৮৩৫’র আগে ওরা রাষ্ট্রভাষার গায়ে হাতও দেয়নি। সরকারী ভাষা করেছে উর্দু। নিজেরা উর্দু শিখে নিয়েছে। আর ফার্সি কোর্টকাচারির ভাষা ছিল। মুন্সীরা সেখানে কিছু করেছে। ভালো কথা করেছে। এর পরে যে প্রশ্নটা আসতে পারে, আমারও প্রশ্ন, কেমন ছিল সেই ভাষাটা? আমি মোটামুটি পড়াশুনা করে দেখেছি পৃথিবীর নানান ভাষা, প্রচুর ভাষা শুরু হয়েছে কবিতা দিয়ে কিন্তু অতিপ্রাচীন গদ্যও আমরা পাই। দুর্ভাগ্যবশত আমরা বাংলাভাষার আদি নিদর্শন বলে যাকে মেনে নিয়েছি, চর্যাপদ এটা লেখা হয়েছে পদ্যে। সঠিক কি না জানি না। অর্থাৎ তখন মানুষ যে ভাষায় কথা বলছে, তার যে স্ট্র্যাকচারটা ছিল সেটাতো তুমি পাচ্ছো না। তুমি জান না কি ভাষায় তোমার আদিপুরুষ কথা বলেছে। কারণ চর্যাপদের পরের দুশো বছরের তো তুমি কোনো ইতিহাস পাচ্ছো না। সেই দুইশো বছর কি তাহলে কিছু লেখা হয় নি? অবশ্যই লেখা হয়েছে। আমরা পাই নি। এরপরতো অনেক পরে ইংরেজরা এল। আমি এখানে ইংরেজরা আসার আগের সময়ের যা কিছু পাওয়া যায় তার সাথে মানিক, বিভূতি, তারাশঙ্করদের মিলিয়ে দেখতে বলব। তুমি তোমার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবে।? পোস্টকলোনিয়াল, প্রি-কলোনিয়াল এইসব বুলি ছাড়ার কি দরকার বলো! তারপর বঙ্কিমচন্দ্র। তাঁর ভাষাটাকে আলাদাভাবে ডিল করতে হবে। হুতুমে বাংলা আমি পড়েছি বেশ ভালো করে তোমার ভাষায় আলালি বাংলাও। সম্প্রতি অ্যাডর্ন বেশ সুন্দর করে বার করেছে। এগুলো খুব মজার, খুব কাছের মনে হয় আমার। আমি এখনো মজা করে পড়ি। কিন্তু আমার মনে হয় যে আচ্ছা, এ দিয়ে কি আমি বিজ্ঞান বা দর্শন আলোচনাটা করতে পারতাম? তোমার সাথে কথা যদি ওই ভাষায় বলতাম, তুমি কি বুঝতে? আগে তো সংস্কৃত বলত না, বৈদিক ভাষা বলত, ওটাকে গুছিয়ে গাছিয়ে নিয়ে যারা কথা বলত তারাই সংস্কৃত তৈরি করেছে। লিখিত ভাষা হিসেবেই। হুতুমে ভাষায় যদি অনুপস্থিত থাকতো, ঈশ্বরচন্দ্র, বঙ্কিম যদি বাংলা ভাষায় না আসতেন তাহলে ঐ ভাষাটা ঘুরতে ঘুরতে কোথায় যে যেত এটা আমিও ঠিক আন্দাজ করতে পারি না। এ তো একটা দুঃস্বপ্নের মতন। কেন এটা দেখাচ্ছ বলো তো! (হাসি) কাজেই এর পক্ষে-বিপক্ষে কথা বলার কিছু নাই। তুমি যদি বলো কেন বিদ্যাসাগর থেকে শুরু করব, হুতুমি ভাষা থেকেই শুরু করতে হবে। তবে সেটা হবে অবিমৃষ্যকারিতা। একেবারে ইডিয়সির চূড়ান্ত। আমার এখনো পড়তে গিয়ে মনে হয় যে এ ভাষা অনেক কাজের জন্য যথেষ্ট ছিল না। এ ভাষার মধ্যেও নানান রকমের কলকাত্তাই ঢং ছিল আর কি! এর পর বঙ্কিমচন্দ্র একটা নির্মাণ করেছেন ভাষার। পূনর্নিমাণও বলতে পারো। এবং সুচিন্তিত ভাবে। বঙ্কিমচন্দ্র যারা ভালো করে না পড়েছে তারা বলতে পারবে না যে বঙ্কিম কি করেছেন! কত নিষ্ঠুর খেলা করেছেন ভাষা নিয়ে। কপালকুণ্ডলার ভাষা আর দুর্গেশনন্দিনীর ভাষা আর বিষবৃক্ষের ভাষার মধ্যে হয়তো তোমার চোখে পড়েনি বদলটা, একটা দুর্দান্ত বদল আছে। এটা ভালো করে দেখলে বোঝা যাবে। আর বঙ্কিমচন্দ্রই নির্ঘাৎ আমাদের কথা বলতে শিখিয়েছেন। যে কথার চেয়ে জোরালোভাবে আর কেউ কথা বলতে পারবে না। বঙ্কিমের প্রবন্ধের মধ্যে পাবে, বাবু কে? যিনি নিজের ভাষাকে ঘৃণা করেন, তিনিই বাবু। যিনি আহারকালে নিজের অঙুলিকে ঘৃণা করেন তিনিই বাবু। কি ভাষা! এই যে ভাষার ব্যবহার, আমরা কেউই বঙ্কিমকে ছাড়িয়ে যেতে পারিনি। বঙ্কিমের ভাষা যে কিরকম নির্ঘাৎ ও চূড়ান্ত সেটা বঙ্কিমের উপন্যাস না পড়ে কমলাকান্তের দপ্তর পড়লেও বোঝা যায়। তার ধর্মতত্ত্ব, তার নানারকমের তর্কবিতর্ক পড়তে বলি আমি এক্ষেত্রে তরুণদের। তাহলেই বুঝতে পারবে তার পরে লিখতে যে তুমি এসেছো কি করতে হবে তোমাকে! বঙ্কিম এসে তৎসমশব্দবহুল বাংলা শিখিয়ে দিয়ে গিয়ে আমাদের সর্বনাশ করলো তোমার প্রশ্ন অনুযায়ী যদি এটা বলে তরুণরা তবে আমার বলতেই হবে যে তরুণদের গ্যাপ আছে। একজন তরুণ যে কোনো চেষ্টা করতে পারে, সে চেষ্টা করেই শিখবে। কিন্তু সে যেন এইটা না করে, সে যেন না বলে যে, এই দেখো এইটা আমি করলাম এইটা তোমরা সবাই কোরো। লেখক ডাক্তার না। তার হাতে কোনো চিকিৎসার জন্য প্রেসক্রিপশন নাই। সে নিজের চিকিৎসা নিজে করুক। আমার ব্যাধির চিকিৎসা আমি করি। আমার স্বাস্থ্যের জন্য আমি দুধ খাই বা ঘি খাই, বা সবজি খাই, আমি খাই। তুমি যখন নিজের ভাষা ব্যবহার করবে তখন তোমার সমস্যা তোমার। কিন্তু তুমি খবরদার অন্যের জন্য প্রেসক্রাইব করতে যেও না। ওটা হচ্ছে বুড়ো মানুষের লক্ষণ। ওটা তারুণ্যের লক্ষণ নয়। অনেকের মধ্যে ইদানিং এই মনোভাব দেখে আমি ব্যথিত। লেখকদের বুড়ো হতে নেই।

শিমুল : আপনার গল্পে মৃত্যুর পাশাপাশি ক্ষুধার বিষয়টিও উঠে আসে। মৃত্যু আর ক্ষুধাটাকেই কি আপনি সমাজ হিসেবে দেখেন? এই বিষয়ে আপনার দার্শনিক অবস্থান কোথায়?

হাসান আজিজুল : শোনো শিমুল, এ বিষয়ে দার্শনিক অবস্থান বলার চাইতে চোখের সামনে যা প্রকট, যা বাস্তব, সেইটাই তোমাকে যথেষ্ট পরিমাণে আলোড়িত করে। আর আমাকে যা কিছু আলোড়িত করেছে, আমার সংবেদন তা-ই হয়তো আমি লিখেছি। ক্ষুধিত মানুষ দেখেছো?

শিমুল : জি স্যার।

হাসান আজিজুল : নিজে ক্ষুধিত থেকেছ?

শিমুল : হ্যা স্যার, থেকেছি।

হাসান আজিজুল হক : এবং তখন যদি মনে হয় আর খাদ্য জুটবে না, সেই অবস্থাটার সম্মুখীন হয়েছো? আমি তোমার মতোন ঐ অর্থে হই নি কিন্তু অল্প একটু হয়েছে সেটা। আমি দেখেছি  না খেতে পেয়ে মানুষের মৃত্যু। এখন যদি তুমি যা কিছুর সাহায্য নাও, পরিসংখ্যানের সাহায্য নাও, নিজে ঘুরে ঘুরে হেঁটে হেঁটে দেখো, যত রকমভাবে পারো তুমি যদি জানতে চেষ্টা করো, তুমি যদি সারাটা দেশ ঘুরে ঘুরে দেখো তাহলে মনে হবে ক্ষুধাই, সেই ক্ষুধাই আমাদের প্রথম সংবাদ হয়ে যাচ্ছে। আর এর সাথেই যুক্ত রয়েছে মানুষ হিসেবে তার অন্যান্য অভাব। কারণ শুধু ক্ষুধা লিখলেই তো আর মানুষ লেখা হয় না। বাংলাদেশের মানুষ এখন উপোস করে না বলে শুনতে পাওয়া যায়। আমি একটা জিনিস কি মনে করি জানো, তুমি যদি কোনো খারাপ কাজ কোরো, যদি বিশাল স্কেলে কোরো, অনেক টাকা উপার্জন কোরো, তাহলে তার কিছু কিছু আলটিমেট ভালো ফল দেখতে পাওয়া যায়। তুমি যদি মনে কোরো যে কোটি কোটি টাকায় ট্রান্সপোর্টের ব্যাবসা করবে, এবং কোটি কোটি টাকার মালিক হবে, তাহলে দেখো তোমাকে সবচেয়ে ভালো গাড়ির ব্যবস্থা করতে হবে, সবচেয়ে ভালো ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম করতে হলে তোমাকে দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত ভালো সড়ক তৈরি করতে হবে। আর ঐ রাস্তা দিয়ে গরীব মানুষ যে খেতে পায় না তুমি বলতে পারবে না যে তুই হাঁটতে পারবি না। তার মানে তোমার যে মহাকুকর্ম তোমার যে লোভ—এর একটা প্রান্তিক সুবিধা সাধারণ মানুষ নিচ্ছে হয়তো।


পুরনো মার্ক্সিস্টদের যে পরিভাষাগুলো আমরা ব্যবহার করি তার একটাও এখন আর লাগসই না


শিমুল : স্যার ডেভেলপমেন্টে একে ড্রপিং ব্যাক পুওর বলে।

হাসান আজিজুল : আজকে তো লোক উপুস করে না বলে বলা হচ্ছে। কথা তো তা নয়। আমার দেশের মানুষ তো উপুস অন্যভাবে করছে। ঐ যে তোমাকে বললাম, ডেভেলপমেন্ট যখন হচ্ছে প্রযুক্তি এগুচ্ছে, কাজেই প্রযুক্তি ওয়ালাদের যে কীর্তিকাণ্ড, তারা যে আমাদের ধান বাড়িয়ে দিয়ে, ধানের ফলন বাড়িয়ে দিয়েছে এত মিথ্যা কথা না। বাংলাদেশের অনেক মানুষ খেতে পাচ্ছে এ তো সত্যি কথা। এই যে উৎপাদন বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে তাতে যদি তুমি স্তরগুলি খেয়াল করো দেখবে যে উৎপাদনটা কাদের কাজে লাগছে। আমার খুব নিকট ভবিষ্যতটাকে অন্ধকার করে দেয়ার জন্য আমাকে এই মুহূর্তে যা যা করতে বাধ্য করা হচ্ছে, আমার পুরনো ভ্যারাইটিগুলোকে যে নষ্ট করে দেয়া হচ্ছে, ধানের, আমার ফসলের, যে বিশেষ ধরনের হাইব্রিড উৎপাদন করতে বাধ্য করা হচ্ছে, যে খরচে আমি যা করতে পারতাম তা যে করতে পারছি না, আমার বীজটা সাপ্লাই না করা হলে আমি সে বীজটা পাচ্ছি না, আমার চিরন্তন উপবাসের বন্দোবস্ত করা হচ্ছে, সব ঠিক, আবার কিছুই যে ঠিক নেই এটাও তো টের পাচ্ছি। তাই দেখতে হবে উন্নয়ন তার সঙ্গে সঙ্গে সুবিধা, তার ভাগ গুলো কি কি এও যে দেখতে হবে, সেই জায়গাটা খেয়াল করলে আমি বুঝতে পারি যা হচ্ছে তা একেবারেই একটা লুটেরাদের কাজ। এটা একদম ঠিক হচ্ছে না। আর যদি আরো ভালো করে জানতে চাও তবে তো বলবো, উপোস করে না বটে, একবার খায় তিনবার খায় না। একবার খেলে লোকজন কিন্তু মরে না। বেঁচে থাকে আর কি! বাড়ি নাই তো ঘরে থাকে। এই যে শহরে থাকে ওটাকে ঘর বলতে পারা যাবে। আশি ভাগ ছেলে পাঠশালায় যায়, তারা বের হয়ে কি করে? কি অবস্থায় যায়? তাদের যেতেই বা কিছুদিন পর আর দেয় কি দেয় না! এত মেয়েরা পড়াশুনা করছে, আর কিছু না হোক উপবৃত্তি নিয়ে তারা স্কুলে যাচ্ছে, উপবৃত্তিটা সংসারের একধরনের উপার্জন, তাহলে মেয়েটাকে দিই আমি! কী ভয়ংকর ব্যাপার, মেয়েটাকে স্কুলে দিই তাহলে মেয়েটার কর্মক্ষেত্র কি আছে? পথে ঘাটে এক দঙ্গল মেয়ে স্কুলে যাচ্ছে একথা যেমন সত্য তেমনি তারা তিনবেলা খেতে পাচ্ছে না একথাও সত্য। কাজেই ঊর্ধ্বগতি অধঃগতি একসাথে হচ্ছে। উন্নয়ন এবং অনুন্নয়ন একসাথে হচ্ছে। এই যে এক একটা বাঁধা অপসারিত হয়ে যাচ্ছে, আমার মনে হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গুছিয়ে নিচ্ছে ফরটিফাইভের পর থেকেই। অনেকগুলো যুদ্ধ তারা করেছে। এবং বিভিন্ন দেশে। যেগুলো করার কোনো অধিকার তাদের নেই। কোরিয়া নিয়ে তাদের, জাপানে ৫২ সাল পর্যন্ত তারা করেছে, সেখানে তারা ঘাটি তৈরি করে নিয়েছে, কী নৃশংস কি ভয়ানক এইসব ম্যাকার্থে, আইজেনহাওয়ার ছিল, অধুনা বুশ গেল, কি করছে আর কি! অধুনা ভিয়েতনাম আফগানিস্থান পর্যন্ত। একগাদা যুদ্ধ তারা করেছে। ইতোমধ্যে ষাটের দশকে করেছে, সত্তরের দশকে করেছে, এর মধ্যে পাশ্চাত্যে সমাজতন্ত্রের একধরনের বিলুপ্তি ঘটেছে। আর এইবার প্রযুক্তি আর পুঁজিবাদী অর্থনীতি একসঙ্গে যোগ হয়ে ভয়ানক দৈত্যের আকার ধারণ করেছে। উপনিবেশবাদ শেষ কে বলছে? এখন আর উপস্থিত থেকে শোষণ করতে হয় না। অনুপস্থিত থেকেই শোষণ করা যাচ্ছে। তার জন্যে তোমার লোক, দারোয়ান সবই তৈরী। এমন একটা ব্যবস্থা হয়েছে তুমি আর বাইরে যেতে পারবে না। এমন একটা ব্যবস্থা করেছে যে তুমি আর সবকিছুর তীব্র সমালোচনাও করতে পারবে না। করলে তুমি মার খাবে। তুমি যদি এনজিও টেনজিওর বেশি সমালোচনা করো তাহলেও তুমি মার খাবে। একদম মাথা টাল হয়ে গেছে, ভার হয়ে গেছে একদিকে। এমন একটা অবস্থা তুমি কোনো মিডিয়ায় এ নিয়ে লিখতে পারবে না, একটা মিডিয়া চলবে না তাহলে, একটা খবরের কাগজ চলবে না এইসমস্ত জিনিসগুলি যদি থাকে। কিভাবে দেখো ডিপেনডেন্ট করে দিয়েছে। এইখানে আরেক প্রহসনের নাম মুক্তবাজার। প্রতিযোগিতা হবে পুঁজিবাদী বিশ্ববাজারের সঙ্গে। পুঁজিবাদ-ই সিদ্ধান্ত দিচ্ছে চীন বেশি বড় মার্কেট পাবে না আমেরিকা বেশি বড় মার্কেট পাবে। আর তোমার প্রতিযোগিতার কোনো ব্যাপার নাই, তুমি বগল বাজাবে যে ইয়াহু আমি বিশ্বায়নের যুগে ঢুকেছি, আমি বিশ্বের সাথে এক কাতারে দাঁড়িয়েছি। এটা ঠিক সেই তিরিশি আধুনিকতার মতোন একটা ব্যাপার আর কি! কিসের যুগে ঢুকেছো তুমি দেখতে পাচ্ছো, তোমার সর্বস্ব যাচ্ছে, তোমার সর্বস্ব গেছে। সর্বস্ব গেছে মানে তোমার শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি নিজস্বতা বৈশিষ্ট্য সঙ্গীত এবং বেঁচে থাকার সঙ্গীত সব গেছে। ভাষা, সমস্তই গেছে। এখন তোমার নড়বার কোনো উপায় নেই। আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা হয়ে গেছো তুমি। তাহলে এই দেশটা এখন কিভাবে চলছে? এটা পুঁজিবাদী দেশ এটা বলা যাবে? তাহলে তো আমার দেশের লোকেরা পুঁজি বিনিয়োগ করত। এখানে পুঁজির নিয়োগ আছে? হাতে পায়ে ধরি তোমরা এই পুঁজি এখানে নিয়োগ কোরো। কী আশ্চর্য! এক একটা গর্ভমেন্ট তার সফলতার প্রমাণ দেয় যে আমরা এত পুঁজি বাইরে থেকে নিয়ে এসেছি। কেউ তাদের জিজ্ঞেস করে না যে তারা যে বাইরে থেকে পুঁজি নিয়ে এসেছে এগুলো কিসে লাগিয়েছে? কি সৃষ্টিকরার জন্য? তারা আমাদের যে পুঁজি দিয়েছে বিশ্বব্যাংক আইএমএফ সেটাকে আমরা কোনো কাজে লাগিয়েছি? আমরা বড়জোড় হারিকেন তৈরি করি, দেশলাই তৈরি করি, পাট ছিল একসময়, বাঁশ আমাদের বাড়ির পেছনে হয়, আর অন্যান্য দেশ কি করে! অন্যান্য দেশ এমন ভাগ করে নিয়েছে আচ্ছা ঠিক আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর কাপড় বানাবে না তোমরা চীনারাই কাপড় বানাও, বাংলাদেশকে একটু দিও। আর আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কি বানাব? আমি বানাব যুদ্ধাস্ত্র, গোটা পৃথিবীতে কে আমার অধীনতা স্বীকার করবে, এই নাও ইসরায়েল মিসাইল, বুঝতে পারছো কিভাবে স্তরায়নটা ঘটছে? আর কেমন করে তোমার শরীরে বীজানু ঢুকছে? বাসাতে বীজানু থাকলে তুমি নিঃশ্বাস নিতে বাধ্য আর জীবানু নিতেও বাধ্য। সর্দিজ্বরের মতোন। যেমন তোমার থাকলে আমার হবে। আমার থাকলে তোমারও হবে। আজকে এটা হয়ে গেছে কাজের স্বভাব। পুরনো মার্ক্সিস্টদের যে পরিভাষাগুলো আমরা ব্যবহার করি তার একটাও এখন আর লাগসই না। আমাদের দেশে কোনোকালেই সেই অর্থে সামন্ততান্ত্রিক যুগ ছিল না। পুঁজিবাদী যুগ হল না। উপনিবেশবাদ লুপ্ত হবার পরও আমাদের দেশ পুঁজিবাদী হল না। এখন তাহলে আমরা কিভাবে চলছি? এদেশের ইনকাম কোথা থেকে আসছে? আমাকে বলার কোনো দরকার নেই। এটা আমরা সব্বাই জানি। তবে তো তুমি বলতে পারো আপনি তাও এখানে আছেন কেন? হ্যা, আমার দেশকে আমি ভালোবাসি। এটা আমার দেশপ্রেম।

12178310_10153696474659581_1857470513_n
(বাঁ থেকে) পেছনের সারিতে, আলতাফ শাহনেওয়াজ, শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন, হাসান আজিজুল হক; সামনের সারিতে পাভেল রায়হান ও তৈমুর রেজা

শিমুল : কিন্তু স্যার আপনার নিশানাথ তো এখনো মরে নাই! আপনিও না? এখান থেকে উত্তরণের উপায়টা কি?

হাসান আজিজুল হক : আগে তো তুমি এই প্রক্রিয়ায় কিভাবে এলে তা নির্দিষ্ট করতে হবে। তোমার স্ট্যান্ডটা কি সেটা জানতে হবে। ধাতস্থ হতে হবে। এবং এটাকে ঘৃণা এবং প্রত্যাখ্যান করেও তুমি কিভাবে বেঁচে থাকবে সেটা বের করতে হবে। এটা ছেলেখেলা না। তোমরা তরুণরা এটা বের করবে।

শিমুল : চাকরিসূত্রে আপনি দর্শনের অধ্যাপক। এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ারে আসিন। আপনার কি এমন কোনো স্মৃতি মনে পড়ে যা না থাকলে আপনার শিক্ষকতা জীবন সাহিত্যিক জীবন অসম্পূর্ণ থেকে যেত?

হাসান আজিজুল : নাহ, তেমন তো কিছু মনে হয় না। প্রত্যক্ষভাবে তেমন কিছু নাই। অপ্রত্যক্ষভাবে বলতে পারি পড়ানো, ছেলেমেয়েদের সংস্পর্শে আসা, এতগুলো ছেলেমেয়েদের সাথে যোগাযোগ যদি না ঘটতো তাহলে নিজের মনে সজীবতাটাকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হতো কিনা এটা একটা সন্দেহ!


কই আমরা তো কোনো ফ্রেঞ্চ স্টুডেন্ট আন্দোলনের দিকে তাকাচ্ছি না। কেন তাকাচ্ছি না? কারণ উই আর লেট


শিমুল : আপনি যেহেতু আমাদের দেশের অগ্রজ লেখক, দার্শনিকও বটে, আপনার যে কল্পনার রাষ্ট্র, যেখানে মানুষ লড়াই করে প্রতিমূহূর্তে, আর বাস্তবিক এ রাষ্ট্রব্যবস্থায় এই মানুষগুলো দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, আপনার কথায়ও স্পষ্ট যে ঘর থেকেও বাড়ি নেই, এসময়ে আপনার রাষ্ট্রভাবনা কী? আপনি কী রকম রাষ্ট্র দেখতে চান?

হাসান আজিজুল : এই যে বর্তমান রাষ্ট্র, আমার কাছে, দেশ হিসেবে বলছি না, রাষ্ট্র বেশ বড় ব্যাপার। রাষ্ট্র ছাড়া কোনো মানুষের অস্তিত্বের কোনো অর্থ নেই। আর রাষ্ট্র যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে তা গ্রামগুলোর স্বয়ংসম্পূর্ণতার ফল শুধু। গ্রামগুলো উৎপাদন, কেনাবেচাসহ সব করত একটা ছোট্ট জায়গায়। একটা ছোট্ট স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যবস্থার মাধ্যমে বহুবছর ধরে গ্রামকেন্দ্রিক একটি ব্যবস্থাই সমাজে চলছে। আমার সময়কার রাষ্ট্র যে বাস্তবে ঘাটতিপূর্ণ ছিল তা নিঃসন্দেহেই বুঝতে পারো। এই যেমন যোগাযোগ-ব্যবস্থা, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ছিলই। জমিদার রাজা—তাদের নিষ্পেষণের ব্যাপার ছিল। কাজেই সেটা যে আদর্শ কোনো সমাজ বা দেশ ছিল, এটা বলার কোনো কারণ নেই। অসুখে বিসুখে সু-ব্যবস্থা ছিল না। তবুও প্রায় প্রতিটি গ্রামেই সংগঠন ছিল। এবং ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণতা। ওখানে ভালো বা মন্দ যাই বলো, পেশাও নানারকম ছিল। তারা ব্যবসা করত কিংবা তারা হস্ত ও কুটিরশিল্পে ছিল সিদ্ধহস্ত। তাদের মেধার যে অভাব ছিল না, তা পুরনো দিনের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। এই নৃগোষ্ঠী যাদের নিয়ে বিশাল বাংলাদেশ পরিপূর্ণ, তাদের মধ্যে অনেক রকমের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ছিল। এসব বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে জীবনযাপনের একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, একধরনের স্থিরতা, নিস্তরঙ্গতা সেখানে ছিল বলেই মানুষ অনেক ভাবতে পেরেছে, গল্পসার পেয়েছে, বিষয়বস্তু তৈরি হয়েছে। হারিয়েছে কী? কর্ম; মানুষ এগিয়ে যাওয়ার। প্রকৃতির সামনে দুর্ধর্ষভাবে লড়াই করা, প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই, শীতের বিরুদ্ধে লড়াই—এসব বাংলাদেশে কম থাকার ফলে জীবনযাত্রা অনেক সহজ ছিল। পুরো পরিবেশটা ভেঙে গেল এদেশে ব্রিটিশরা আসার পর। তাই প্রাচ্যের রাষ্ট্রব্যবস্থার কিছু বিষয় মিশেটিশে যাই থাকুক না কেন, রাষ্ট্রকাঠামোয় আমাদের ইউরোপীয় ব্যবস্থাই প্রচলিত। যদিও তাদের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ভিন্নরকম। তারা কী প্রক্রিয়ায় রাজতন্ত্র এবং পার্লামেন্টারি প্রক্রিয়া এক করল কে বলতে পারে! তাদেরও বিশাল ইতিহাস রয়েছে। আমরা পেয়েছি যেমন আঠারো শতকের পরে ব্রিটিশরা আসে। আমাদের সঙ্গে পরিচয়টা হতে থাকে। পরিচয়টা শুধু বাইরের নয়, পরিচয়টা চিন্তাভাবনা সবকিছু নিয়ে, সবকিছুর। তখন আমাদের ছাঁচ হয়ে যায় ইউয়োপীয় ধাঁচের। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, শিক্ষায়তনগুলো স্থাপিত হয়, স্কুলগুলো প্রচলিত হয়, আইনগুলো প্রচলিত হয়, তখন অর্থের প্রচলন ছিল না বলে ছিল বিনিময় ব্যবস্থা। তুমি চাল দাও, আমি তোমাকে গুড় দিয়ে দিচ্ছি। মার্ক্স বলেন , ১৮১৩ পর্যন্ত একটা মেশানো অবস্থা ছিল। ১৮১৩’র পরই ঔপনিবেশিকতা চালু হয়। আমাদের দেশের নিজস্ব উৎপাদনব্যবস্থা চালু হয়। সেই সঙ্গে সঙ্গে আমরা বুঝতে পারি ১৯ শতকের মাঝামাঝি বিদ্রোহ কোথায় এবং কেন শুরু হয়। মধ্যবিত্তরা বিদ্রোহ করে না, এর কারণটা কী? কাঠামোটা কোথায় গিয়ে কাকে হিট করছে সেটা বুঝতে হবে। ওদের একটা চাতুর্য ওটা। আর সেটা বুঝতে গিয়ে বেনথাম পড়তে হয়েছে, মিল পড়তে হয়েছে। তখন মানুষ কাকে স্বাধীনতা বলে, কাকে মুক্তিচিন্তা বলে—এইগুলো শিখেছে। নানারকম ব্যাপার হয়েছে। কিন্তু কাঠামোটা বদলে গেছে। এখন আমরা তার বলি হচ্ছি সব জায়গায়। এখন আমার অপছন্দের কারণটা কী! উপনিবেশী যে বন্দোবস্ত সেটা পৃথিবীতে কিন্তু ভেঙে গেল। ভেঙে গেল কখন? বিশ শতকের গোড়া থেকে শুরু হলো। প্রথম প্রকাশ হলো জাতিরাষ্ট্রের ভীষণভাবে উদ্ভব ও জাতিরাষ্ট্রের অধিকারবোধ। যার কারণে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ যখন শুরু হয় তখন বোঝা যায় আরেকটা কাঠামো এবার ভাঙছে। নতুন কাঠামো উঠে আসছে। ইতোমধ্যে শিল্পবিপ্লব হয়ে গেছে। ফলে কলকারখানা থেকে শুরু করে মানুষের হাতের জিনিস তৈরি হওয়া কমেছে। এবার পণ্য তৈরি হতে শুরু করল। ভীষণ পণ্য তৈরি হওয়াতে বাজার দরকার হচ্ছে। এখন আর নিজের দেশের মধ্যে বসে থাকলে চলবে না। বাজার হবে। যে উপনিবেশ ভারতবর্ষে ছিল এখান থেকে রপ্তানি করার বিষয়, পরবর্তীকালে আমদানি করার বিষয়ে আসল—খুবই কৌতুহল উদ্দীপক এগুলো। কিন্তু চলমান অবস্থাকে এভাবে রাখাও সম্ভব হলো না। কারণ পুঁজিবাদ তখন দেশে দেশে তৈরি হচ্ছে। শুধুমাত্র ইংল্যান্ডেই তো পুঁজিবাদ হচ্ছে না। অন্যান্য দেশগুলোও পুঁজিবাদী হয়ে যাচ্ছে। ফলে এক ধরনের জাতিরাষ্ট্রের নাম করে স্বার্থান্বেষিতা শুরু হয়। আর তাই, ঔপনিবেশিকতার ভারে যুদ্ধ শুরু হয়। আসলে দুটো যুদ্ধ নয়, একটা যুদ্ধই হয়েছে। সেটা টানতে টানতে দুটোতে পরিণত হয়েছে। একটা হতে হতেই আরেকটা যুদ্ধের জন্য পৃথিবী তৈরি হয়ে গেছে। সেটা খুব পরিষ্কার বোঝা গেছে। কাজেই ১৯৪৫-এর পরে পৃথিবীটাকে নতুন করে তৈরি করে দেবার ব্যবস্থা ভিতর থেকে উচ্চারিত হয়। উপরে তেমন বলবে না, কিন্তু শোষণ চালাতে হবে। পুঁজিবাদের মূল কাজটাই হচ্ছে শোষণ চালাতে হবে। শুধু উপনিবেশের কারণে তার ধারণাটা বদলাতে হবে আর কি! তাই উপনিবেশ স্বেচ্ছায় মুক্ত করে দিল, কারণ তাকে চালানো ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। সেনাবাহিনী বানাতে হবে, এটা করতে হবে, ওটা করতে হবে, কী দরকার! কাজেই ব্যাক টু দ্যা প্যাভিলিয়ন, উপনিবেশ চলে গেল, সত্তর-বাহাত্তরের মাঝামাঝি উপনিবেশ বিলুপ্ত হয়ে গেল। পোস্টমর্ডানিস্টরা, আমরা বাহাদুরি করি যে আধুনিকতা শেষ হয়ে এবার উত্তর-আধুনিকতার যুগ শুরু হয়ে গেল। এসব ইউরোপীয় কন্টেক্সটে কি আমাদের যাওয়া উচিত? আমার কি আমাদের কন্টেক্সট দেখতে পাই না? আমাদের ষাটের দশকের কবিরা কিউবিজম নিয়ে ভাবছে, পোস্টমর্ডানিজম করার চিন্তায়। হাতকে পর্যন্ত খারিজ করে দেওয়ার চিন্তা করছে। এগুলো হলো কালানুচিত। কালে যেটা অনুচিত। সেই যেটা পাস্ট সেটা চলে গেলে গেল, অর্থাৎ আমাদের সবকিছু শুরু হয়ে গেল। অর্থাৎ ভাঙচুর শুরু হয়ে গেল। দুনিয়ার সবকিছু নতুন করে সাজানো শুরু হয়ে গেল। যে অবস্থাটা দাঁড়িয়ে গেল তা থেকেই কিন্তু পোস্ট মর্ডানিজমটার সৃষ্টি। তখন আর কিউবিউজিম-ফিউবিজমের কোনো প্রশ্নই নেই। আমরাও তখন উত্তর-আধুনিকতা, সুররিয়ালিজম ইত্যাদি সালভাদর দালি থেকে… তাদের দিকে তাকাচ্ছি। কই আমরা তো কোনো ফ্রেঞ্চ স্টুডেন্ট আন্দোলনের দিকে তাকাচ্ছি না। কেন তাকাচ্ছি না? কারণ উই আর লেট। আমরা যার কথা বলছি, তারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালের। তখনকার লেখকদের লেখা পড়ে দেখ। এর সাথে আরেকটা ব্যাপার যোগ হয়েছে যে, তারা কোনোভাবেই সমাজতান্ত্রিক পৃথিবীটাকে ধূলিসাৎ করে দিতে চাইছে। তারপর থেকে একেকটা বাঁধা অপসারিত হয়ে যাচ্ছে। মোটামুটিভাবে গুছিয়ে নিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অনেকগুলো যুদ্ধ তারা করেছিল যা করবার তাদের কোনো অধিকার নেই। যেভাবে পেরেছে করে নিয়েছে, এসমস্ত লোকগুলো যে কী নৃশংশতা দেখিয়েছে—এই নেকার্তা ছিল, ডালিস ছিল। দুনিয়াটাকে নিজের করে নিয়ে ভিয়েতনাম পর্যন্ত একগাদা যুদ্ধ তারা বাধিয়েছে। এগুলো করে তারা গুছিয়ে নিয়েছে নিজেদের। ইতোমধ্যে ষাটের দশক এসেছে। সত্তর এসেছে। আস্তে আস্তে সমাজতন্ত্রে একধরনের বিলুপ্তি চলে এসেছে। আর এবারে প্রযুক্তি আর অর্থনীতি একসাথে যুক্ত হয়ে উপরদিক থেকে শোষণের রাস্তা তৈরি হয়েছে। এখন অনুপস্থিতভাবেই সমগ্র বিশ্ব শোষণ করা যাচ্ছে। তার জন্য লোক, লগি, দাড়োয়ান সবই তৈরি। আর এ অবস্থা তৈরির জন্য লগি বলো আর দাড়োয়ান বলো আমেরিকা আমাদেরই ব্যবহার করছে। তারা এমন ব্যবস্থা করেছে যার বাইরে তুমি যেতে পারবে না। যার তীব্র সমালোচনাও করতে পারবে না। করলে তুমি মার খাবে। দেখবে যে একদম মাথা টাল হয়ে গেছে। টাল হয়ে গেছে বহু দিক থেকে। একটা মিডিয়া চলবে না, একটা খবর কাগজ চলবে না। কী রকমের ডিভিডেন্ড করে দিয়েছে আমাদের। আর সেই সাথে মুক্তবাজার হয়েছে। তাই প্রতিযোগিতা হবে পুঁজীবাদী দেশগুলোর মধ্যে। তখন আসবে চীন বেশি বড় মার্কেট পাবে না অ্যামেরিকা বেশি বড় মার্কেট পাবে, তোমার আমার কোনো ব্যাপার নেই সেখনে। তুমি শুধু বগল বাজাবে বসে বসে যে আমি বিশ্বায়নের যুগে বাস করি। আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা হয়ে গেছ তুমি। পুঁজিপতি দেশগুলো নির্ধারণ করবে তারা কী করবে। বিশ্বব্যাংক আমাদের যে ঋণ দিচ্ছে সেটা দিয়ে আমরা কী করছি? সর্বোচ্চ হারিকেন বা দেশলাই তৈরি করছি। আর অন্যান্য দেশ এমনভাগ করে নিয়েছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কাপড় বানাবে না তারা কী করবে? তারা বলবে, চীনকে সুযোগ দিই আর আমরা কী বানবো? যুদ্ধাস্ত্র কিভাবে মানুষ অধীনস্থ হবে, সেটা। বুঝতে পারছো কিভাবে স্তরায়নটা হচ্ছে? সেই অর্থে আমাদের দেশের কখনোই পুঁজি ছিল না । এদেশের ইনকাম কোথা থেকে হচ্ছে সেটা আমাকে জানানোর দরকার নেই। তাই তুমি আমাকে কেন বলবে, স্যার আমার দেশ আপনি কেন পছন্দ করছেন না? আমাদের দেশকে আমি ভালোবাসি, কিন্তু এটাকে যেভাবে চালান হচ্ছে সেটাকে অবশ্যই আমাদের ঘৃণা এবং প্রত্যাখ্যান করা উচিত। এটা ছেলেখেলা না। এটা শুধু প্রচারে আর সুশীলদের চিৎকারে এটা হবে না। হবার কোনো কারণ নেই। আমি বারবার ঐ অক্ষয় কুমার দত্তের একটা কথা বলব যে, ‘মন্ত্র পড়ে ধরা পড়া যায় একবার? হ্যাঁ যায়। তাহলে মন্ত্রের সাথে কিছু সেঁকোবিষও লাগবে।’ বক্তৃতা দিয়ে কি আর দেশ পরিবর্তন করা যায়? সেঁকোবিষ না হোক, কর্ম তো করা লাগবে।

শিমুল : কিভাবে বদলাতে হবে?

হাসান আজিজুল : আজকে বাংলাদেশের যে চেহারা, শিক্ষা, সংস্কৃতি সমস্ত কিছুই একটা ধার করা জিনিস। আমাদের তারুণ্য মজেছে একধরনের অনুকরণবৃত্তিতে। আমাদের আমার মতো চিন্তা করতে হবে। আর জানি না, ইউরোপ এতটা এগিয়েছে, আমরা পারব কি না!

শিমুল : সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে আপনি বলেছেন, সাহিত্যের বিভাজনে বিশ্বাস করেন না। প্রাচ্যের অদ্বৈত সত্তায় আপনার বিশ্বাস।

হাসান আজিজুল : জজ সাহেব যখন একটা মামলা বিচার করেন তখন তিনি ব্যক্তিগতভাবে কি ভাবেন না ভাবেন সেটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়, তার দেখতে হয় আইন কী বলে। এইরকম কোনো জিনিস নেই যে এটা হলো ছোটগল্পের ফরম্যাট, এটা হলো উপন্যাসের ফরম্যাট। এইভাবে লিখতে হবে। শুধু সাহিত্য কেন, কোনো জিনিসেরই সংজ্ঞা নাই। ডেফিনিশন নাই, কেবল ডেসক্রিপশন আছে।

শিমুল : পূর্ববঙ্গ এবং পশ্চিমবঙ্গের উপন্যাস সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটো স্রোতে বইছে—দেবেশ রায়ের এরকম মত। হয়ত বইপত্র খুলে এমনটা দেখিয়ে দেয়াও সম্ভব হতে পারে। কিন্তু ঐতিহাসিক ভাবেই কি পূর্ববঙ্গ আর পশ্চিমবঙ্গের ভূগোল আলাদা?

হাসান আজিজুল : ইতিহাস যদি ধরো, ভূগোল যদি ধরো, বাংলাদেশের মতো বৃহৎ একটা অঞ্চল এবং পশ্চিমবঙ্গের মতো বৃহৎ একটা সাহিত্য-অঞ্চলের মধ্যে তো পার্থক্য আছেই। ১৯৪৭ সালের পর যখন আমরা একটা আলাদা দেশ পেলাম, পশ্চিমবঙ্গের ভূমিসংস্কার, পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক কাঠামো—এসব বাংলাদেশের সমান্তরালে যায় নি। ফলে সেখানে অর্থনৈতিক কাঠামো বিন্যাস সম্পূর্ণভাবে আলাদা হয়ে গেছে। এত আলাদা জিনিসটি, আরো অনেক আগে থেকেই তো ভাষার পার্থক্য রয়েছে। দেশি কথ্য ভাষা রয়েছে, জীবিকা এবং ভূগোল আলাদা হবার কারণে মানুষের চরিত্রের মধ্যেও পার্থক্য হয়েছে। এমনকি এই বাংলাদেশে দিনাজপুর অঞ্চলের মানুষ যত শান্ত দেখবে, বরিশাল বা অন্যান্য এলাকার লোকজন তেমন নয়। আর এর কারণ তারা আলাদা আলাদা জীবন-কাঠামোয় বাস করে। আর সকলের জীবনধারণের সাথে সাথে সাহিত্যের বিষয়বস্তুরও পরিবর্তন ঘটে স্বাভাবিকভাবেই।

শিমুল : ধন্যবাদ আপনাকে স্যার, অনেক বিরক্ত করলাম।

হাসান আজিজুল : এমন বিরক্তিতে সবাই অখুশি হয় না। ভালো থেকো। তোমাকেও ধন্যবাদ।

_________
.

সাক্ষাৎকারটির অংশবিশেষ দৈনিক কালের কণ্ঠের উদ্বোধনী সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। এখানে পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি ছাপা হলো।
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন

কবি। শিল্প, সংস্কৃতি ও বিনোদন বিভাগের প্রধান হিসেবে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনে কর্মরত। জন্ম ১৭ অক্টোবর, ১৯৮৭, তুরাগ, ঢাকা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যায়ন বিভাগ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণ করেছেন। শিক্ষাজীবনে পালন করেছেন জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোট ও আবৃত্তি সংগঠন 'ধ্বনি'র সভাপতির দায়িত্ব।

কবিতার বই চারটি : শিরস্ত্রাণগুলি (২০১০, ঐতিহ্য), সতীনের মোচড় (২০১২, শুদ্ধস্বর) ও কথাচুপকথা…(২০১৪, অ্যাডর্ন বুকস) ও সংশয়সুর (২০১৬, চৈতন্য)।

সাক্ষাৎকারগ্রন্থ: আলাপে, বিস্তারে (২০১৬, চৈতন্য)।

‘কবির কবিতা পাঠ’ অনুষ্ঠানের আয়োজক সংগঠন ‘গালুমগিরি সংঘ’র সমন্বয়ক। বিবাহিত; স্ত্রী ও ছোটভাইকে নিয়ে থাকেন বাংলামোটরে।

ই-মেইল : shimulsalahuddin17@gmail.com
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন