হোম পুনর্মুদ্রণ গদ্য অর্থের বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ

অর্থের বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ

অর্থের বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ
1.25K
0

আশ্চর্যের বিষয়, এত কবিতা-গল্প লিখলেন রবীন্দ্রনাথ, অথচ কবিতা বা গল্প নিয়ে ধ্যানগভীর, ঋষি-জ কোনো প্রবন্ধ ফাঁদেন নি, টুকরো টুকরো মন্তব্য করা ছাড়া। কিন্তু আস্ত দুখানা কবিতা লিখেছেন এই বিষয়ে। গল্প নিয়ে তার ‘বর্ষাযাপন’-এর কথা সবাই জানেন। কবিতা নিয়ে ‘ভাষা ও ছন্দ’-এর কথা জানলেও ভুলে থাকেন। বা অভিনিবেশযোগ্য মনে করেন না। তার এই জন্মদিনে আজ আবার একটু স্মরণ করা যাক।

তিনি লিখছেন :

মানুষের ভাষাটুকু অর্থ দিয়ে বদ্ধ চারিধারে,
ঘুরে মানুষের চতুর্দিকে। অবিরত রাত্রিদিন
মানবের প্রয়োজনে প্রাণ তার হয়ে আসে ক্ষীণ।
পরিস্ফুট তত্ত্ব তার সীমা দেয় ভাবের চরণে;
ধূলি ছাড়ি একেবারে উর্ধ্বমুখে অনন্ত গগনে
উড়িতে সে নাহি পারে সংগীতের মতন স্বাধীন
মেলি দিয়া সপ্তসুর সপ্তপক্ষ অর্থভারহীন।

জানা গেল, কাজ চালাবার যে ভাষা, দেন-দরবারের যে ভাষা, তাতে শুধু প্রয়োজন মিটছে জীবনের, কিন্তু ভাবের সাঁতার বা উড়াল সে ভাষায় সম্ভব নয়। তার মানে, ভাব পৌঁছুতে চায় এই জীবনের বাইরে কোথাও। গণ্ডি পেরুতে চায়। বন্দিদশা থেকে চায় মুক্তি। মুক্তি বললাম এই কারণে যে, সংগীতের মতন স্বাধীন হবার প্রসঙ্গটি এসেছে। অথচ আমাদের যে ভাষা-অভিজ্ঞতা, তার বাইরে যাওয়া অসম্ভব। এই ভাষা-সেতু, চিরপরিচিত সব বাক্যবন্ধ মান্য করেই পার হয়ে যেতে হবে জীবন-বাস্তবতার অন্তরালে। কিন্তু কিভাবে?

মানবের জীর্ণবাক্যে মোর ছন্দ দিবে নব সুর,
অর্থের বন্ধন হতে নিয়ে তারে যাবে কিছুদূর
ভাবের স্বাধীন লোকে, পক্ষবান অশ্বরাজসম
উদ্দাম সুন্দরগতি…

এই যে অর্থের বন্ধন, ভাষার জীর্ণতা আর নানা তত্ত্বের বহ্বাড়ম্বর—এসব থেকে দূরে ভাবের স্বাধীন লোকে যেতে পণ করলেন বটে, কিন্তু দেখা যাচ্ছে এই কবিতাতেই শেষ পর্যন্ত একটা বক্তব্যই হাজির করলেন কবি। তাহলে ‘অর্থের বন্ধন’ জিনিশটা কী? আর ‘ভাবের স্বাধীন লোক’ইবা কোথায়?

1-rabindranath-tagore-granger

আজ নতুন শতকের পেরিয়ে যাওয়া একটি দশকের প্রান্তে দাঁড়িয়ে এই বিষয়টির খানিকটা বোঝাপড়া করতে চাই। এবং তা রবীন্দ্রনাথকে ধরেই। এ তো খুবই সত্য কথা, কবিতা ও প্রযুক্তি এক জিনিশ নয়। বিজ্ঞান এগিয়ে চলে তার একেকটি প্রযুক্তিকে পেছনে ফেলে। সঙ্গে নিয়ে যায় শুধু যুক্তি। কবিতা কাউকেই সঙ্গে নেয় না, কাউকেই ফেলে যায় না। তার ইতিহাস—’নতুনের মাঝে চির-পুরাতন’-এর স্মৃতি ও বিস্মৃতি—এক অচেতন ছদ্মবেশ। এই যে প্রায় একশ বছর হলো, প্রকরণবাদীরা বলে গেলেন স্ট্রেনজমেন্ট বা অপরিচিত-করণের কথা, তার আগে কি এই কৌশল কাহ্নপা বুঝতে পারেন নাই, বিদ্যাপতি টের পান নাই? রবীন্দ্রনাথ কী বলছেন শোনা যাক :

গানের ভেতর দিয়ে যখন দেখি ভুবনখানি,
তখন তারে চিনি আমি, তখন তারে জানি।

অর্থাৎ শিল্পের ভেতর দিয়ে বস্তুজগৎ তার চৈতন্যে ধরা দিচ্ছে। এও কিন্তু সেই একই কথা। একই বিন্দু-অভিমুখে যাত্রা, সরলরেখার দুই প্রান্ত থেকে। অর্থাৎ সেই সাকার আর নিরাকারের উপাসনা। যে সাকারবাদী, সে আকারকে সামনে রেখে নিরাকারে পৌঁছায়। আর নিরাকারবাদী, নিরাকার থেকে আকারে পৌঁছায়। ফলে তারা আশলে একই সরলরেখায় আছে। এবং এইখানে এসে পৌত্তলিক হিন্দু আর অপৌত্তলিক মুসলমানের মোলাকাত হয়।


খণ্ড-বিখণ্ডিত এই পৃথিবী, মানুষ ও চরাচরের আঘাতে উত্থিত মৃদুতম সচেতন অনুনয়ও এক এক সময় যেন থেমে যায়…একটি পৃথিবীর অন্ধকার ও স্তব্ধতায় একটি মোমের মতন যেন জ্বলে ওঠে হৃদয়

কবিতা লেখার মুহূর্তটির কথা ভাবি, জীবনানন্দের ভাষায় : ‘খণ্ড-বিখণ্ডিত এই পৃথিবী, মানুষ ও চরাচরের আঘাতে উত্থিত মৃদুতম সচেতন অনুনয়ও এক এক সময় যেন থেমে যায়…একটি পৃথিবীর অন্ধকার ও স্তব্ধতায় একটি মোমের মতন যেন জ্বলে ওঠে হৃদয়…।’ তখনই কবিতা জন্ম নেয় এবং নিজেকে আবিষ্কার করা যায়। লালনও বলছেন : ‘আঁধার ঘরে জ্বলছে বাতি/ দিবারাতি নাই সেখানে…মনের মানুষ যেখানে।’ এই মনের মানুষ তো আর কেউ নয়, ‘অন্য আমি’। অর্থাৎ সৃষ্টি বা আবিষ্কারের মুহূর্তটিতে ‘আমি’ও অপর হয়ে ধরা দেয়, অপরিচিত হয়ে ওঠে।

ফিরে আসি রবির গানটিতে :

রূপের রেখা রসের ধারায়
আপন সীমা কোথায় হারায়
তখন দেখি সবার সাথে
আমার কানাকানি।

রূপের রেখা হলো ফর্মের বিভাজন-রেখা। সে রেখা লুপ্ত হয় রসের ধারায়। কিন্তু এই রসধারার নিঃসরণ কোথা থেকে এবং কিভাবে ঘটে তা ব্যাখ্যা করা মুশকিলই বটে। রবীন্দ্রনাথ বলছেন, ‘শুধু কথা যখন খাড়া দাঁড়িয়ে থাকে তখন কেবলমাত্র অর্থকে প্রকাশ করে। কিন্তু সেই কথাকে যখন তির্যক ভঙ্গি ও বিশেষ গতি দেওয়া যায় তখন সে আপন অর্থের চেয়ে আরো বেশি প্রকাশ করে। সেই বেশিটুকু যে কী তা বলাই শক্ত। কেননা তা কথার অতীত, সুতরাং অনির্বচনীয়। যা আমরা দেখছি শুনছি জানছি তার সঙ্গে যখন অনির্বচনীয়ের যোগ হয় তখন তাকেই আমরা বলি রস। অর্থাৎ সে জিনিসটাকে অনুভব করা যায়, ব্যাখ্যা করা যায় না। সকলেই জানেন এই রসই হচ্ছে কাব্যের বিষয়।’ তো এই রসপ্লাবনে যখন ভেসে যায় ফর্মের বাঁধ, তখন সবার মধ্যে লীন হওয়ার ব্যাপারটা ঘটে। শিল্পের ক্ষেত্রে তখন আর বিবেচ্যই নয়, এটা কবিতা না গল্প, এটা পেইন্টিং না স্কাল্পচার। দেহ-অস্তিত্বও হয়ে পড়ে দেহহীন। লুপ্ত হয় বস্তুভেদ। আরও আরও ভেদের কথাও ভাবা যেতে পারে। শিল্পের ভেতর এই অভেদ ঐক্যে পৌঁছানোর কথাই বলেছিলেন সেলিম আল দীন তার ’দ্বৈতাদ্বৈতবাদী’ শিল্পতত্ত্বে।

আজ মিনিং নিয়ে এত কথা হচ্ছে, সেকেন্ডারি, টারশিয়ারি ইত্যাদি, কিন্তু আশলে মিনিং বলতে কী মিন করা হচ্ছে? শব্দার্থ? বাগর্থ? নাকি অন্যকিছু? দেখি রবীন্দ্রনাথ কী বলেন :

বহ্নি ঊর্ধ্বে মেলিয়া অঙ্গুলি
ইঙ্গিতে করিছে স্তব ; সমুদ্র তরঙ্গবাহু তুলি
কী কহিছে স্বর্গ জানে ; অরণ্য উঠায়ে লক্ষ শাখা
মর্মরিছে মহামন্ত্র ; ঝটিকা উড়ায়ে রুদ্র পাখা
গাহিছে গর্জনগান ; নক্ষত্রের অক্ষৌহিণী হতে
অরণ্যের পতঙ্গ অবধি মিলাইছে এক স্রোতে
সংগীতের তরঙ্গিণী বৈকুণ্ঠের শান্তিসিন্ধুপারে।

অর্থাৎ প্রকৃতির যে অব্যক্ত উপস্থিতি এবং স্বগতোক্তির মতো যার আত্মপ্রকাশ, কবিতার অ্যাপ্রোচ হবে তার সমান্তরাল। কারো কাছে বিশেষভাবে যাচা নয়, আবার আত্মগোপনও নয়। ক্রমাগত সংকেত প্রেরণ, শূন্যের দিকে। তাতে চক্ষুষ্মানের দৃষ্টিগোচর হবেই। এখন কথা হলো, সংকেতগুলো কিভাবে প্রেরিত হবে, কোন ভাষায়?

প্রভাতের শুভ্রভাষা বাক্যহীন প্রত্যক্ষ কিরণ
জগতের মর্মদ্বার মুহূর্তেকে করি উদ্ঘাটন
নির্বারিত করি দেয় ত্রিলোকের গীতের ভাণ্ডার ;
যামিনীর শান্তিবাণী ক্ষণমাত্রে অনন্ত সংসার
আচ্ছন্ন করিয়া ফেলে, বাক্যহীন পরম নিষেধ
বিশ্বকর্ম-কোলাহল মন্ত্রবলে করি দিয়া ভেদ
নিমেষে নিবায়ে দেয় সর্ব খেদ সকল প্রয়াস,
জীবলোক মাঝে আনে মরণের বিপুল আভাস ;
নক্ষত্রের ধ্রুব ভাষা অনির্বাণ অনলের কণা
জ্যোতিষ্কের সূচীপত্রে আপনার করিছে সূচনা
নিত্যকাল মহাকাশে; দক্ষিণের সমীরের ভাষা
কেবল নিশ্বাসমাত্রে নিকুঞ্জে জাগায় নব আশা,
দুর্গম পল্লবদুর্গে অরণ্যের ঘন অন্তঃপুরে
নিমেষে প্রবেশ করে, নিয়ে যায় দূর হতে দূরে
যৌবনের জয়গান;—সেইমতো প্রত্যক্ষ প্রকাশ
কোথা মানবের বাক্যে, কোথা সেই অনন্ত আভাস,
কোথা সেই অর্থভেদী অভ্রভেদী সংগীত-উচ্ছ্বাস,
আত্মবিদারণকারী মর্মান্তিক মহান নিশ্বাস?

এই অংশে ভাষার তিনটি রূপ খুঁজে পাওয়া গেল : প্রভাতের শুভ্রভাষা, নক্ষত্রের ধ্রুব ভাষা, দক্ষিণের সমীরের ভাষা। প্রথমটির ভেতর পাই বর্ণবিভাস, দ্বিতীয়টির মধ্যে কনস্ট্যান্সি (স্থির-নিশ্চয়তা), শেষটিতে প্রবহমানতা। এখন এই তিনটি ভাষাকে ব্যাখ্যা করা যাক।

বর্ণ—যার কোনো অর্থ নাই, তবে চৈতন্যে সাড়া জাগাবার দ্যোতনা আছে। ধ্রুব—এ জগতে ধ্রুব বলে কিছু নাই, সে ঐ নক্ষত্রের মতোই সুদূর; যার নিশ্বাস গায়ে লাগে বলে মনে হয় কখনোবা, মনে হয় এই তো পেয়েছি, আর তখনই এ জীবনে চকিত প্রণোদনা আসে, মনে হয়, পার আছে গো পার আছে, কিন্তু পার আছে কোন দেশে? অর্থাৎ একমুহূর্তের নিশ্চয়তা পরমুহূর্তেই নস্যাৎ। এই মরীচিকা-অন্বেষণে আমরা নিশ্চিতই টের পেয়ে যাই, ‘তৃষ্ণার শেষ নেই’। থেমে নেই আমাদের অভিজ্ঞতাও। আর এই কারণে ভাষাও প্রবহমান—ভাবনার প্রাঙ্গণে দখিন হাওয়ার মতো। ভাষা তো আর কিছুই নয়, প্রকাশের প্রয়োগরীতি ছাড়া। কিন্তু সে রীতিটি এমন, যে মন্ত্রবলে ‘জীবলোক মাঝে আনে মরণের বিপুল আভাস’, যাতে সর্ব খেদ সকল প্রয়াস নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, বাস্তবতা লুপ্ত হয় অন্যতর বিপুল বাস্তবতার উন্মেষে।

কিন্তু তার প্রত্যক্ষ প্রকাশ, সেই অনন্তের আভাস আমাদের প্রতিদিনের ব্যবহার্য ভাষায় নেই। নেই অর্থভেদী অভ্রভেদী সংগীত-উচ্ছ্বাস। ‘সংগীত-উচ্ছ্বাস’ কথাটাকে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। বিশুদ্ধ রাগসংগীতের কথা ভাবতে পারি আমরা, যাতে কোনো বাণী নেই। কিন্তু তাই বলে ভাষাও কি নেই? কোনোভাবেই কি কমিউনিকেট করে না আমাদের সঙ্গে? আমাদের বুকে জাগায় না কি আত্মবিদারণকারী মর্মান্তিক মহান নিশ্বাস? তাহলে তো এ কথা বলাই যায়, কবিতার ভাষা সেই বাক্য নয়, যে বাক্য মূক হয়ে যায় এই কথা বলতে, ‘গানের দেশে যাব উড়ে সুরের দেহ ধরতে’।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসবের মধ্য দিয়ে যে কাব্যতত্ত্ব হাজির হলো আমাদের সামনে, তাকে প্রশ্ন করা চলে, এ আমাদের কী কাজে আসবে? অর্থাৎ প্রশ্নটা ইউটিলিটির। এ কাব্যতত্ত্ব বরং জীবনের ফিউটিলিটিকেই চূড়ান্তভাবে নির্দেশ করছে বলে মনে হয়। একভাবে অনর্থকতা। এই অনর্থকতা বা ‘আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ’—কিছুকাল আগে পর্যন্তও একে পুতুপুতু রাবীন্দ্রিকতা, মধ্যবিত্তের ভাব-বিলাসিতা, বাউলিয়ানার আর্বান বিকার ইত্যাদি বলা হয়েছে। কিন্তু ‘অনর্থকতা’ বিষয়টাকে আমাদের সময়ে এসে গভীরভাবে অনুধাবন করা জরুরি বলে মনে করি। এর ব্যাখ্যা হিশেবে ক্যামুর অ্যাবসার্ড হিরো সিসিফাসের কাছে যাওয়া ঠিক হবে না। কারণ অভিশপ্ত সিসিফাস কোনো ফল হবে না জেনেও ফলের প্রত্যাশা করছে। ভয়াবহ এই ফলশূন্যতা এবং শোকাবহ তার প্রত্যাশা—একখণ্ড পাথরের পিছনে ব্যয়িত জীবন, সময়ের গড়াগড়ি। পক্ষান্তরে রবীন্দ্রনাথের অনর্থকতা আসলে অর্থমুক্তি, কোনোভাবেই ফলশূন্যতা নয়। ফলবন্ত পরিণামের ধারণাকেই তিনি আঘাত করেছেন ‘পনের আনা’ প্রবন্ধে। বলছেন, আমের সকল মুকুল ফল হবার জন্যে নয়। নদীর সকল জল পানে ও স্নানে কাজে লাগে না। অধিকাংশ জল কোনো কাজে ব্যবহৃত না হয়ে কেবল প্রবাহ রক্ষা করছে। জগতে কোনো কাজ না করে কেবল জীবন অতিবাহিত করাও গুরুতর কাজ।


লেখক মাত্রই মনে করেন যে তাকে কিছু বলতে হবে

সেক্ষেত্রে জীবনের গুরুগম্ভীর দায় ও দায়িত্ব, ইচ্ছাপূরণের নানা কিচ্ছা—সবই কি নির্মমভাবে পরিত্যাজ্য হবে? এর উত্তরে কবিকে যেন বলতে শুনি, ‘আমার সেইখানেতেই কল্পলতা যেখানে মোর দাবি-দাওয়া।’ সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের একটা কথা মনে পড়লো এই প্রসঙ্গে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘লেখকদের দায়দায়িত্ব অনেক। লেখক মাত্রই মনে করেন যে তাকে কিছু বলতে হবে। তিনি মনে করেন যে তিনি কিছু জানেন। আর সেটাই তিনি লিখছেন। কিন্তু তিনি যা বলেন একটাও তার নিজের কথা তো নয়। একটা কম্পিউটারে ডাটা পুরে দিলে যা আসে একজন লেখকের লেখাও তাই, কিন্তু না-লেখক সবরকম দায়দায়িত্ব থেকে মুক্ত। লেখকের অসামাজিক হবার কোনো উপায় নেই। কেবল না-লেখকই অতটা যেতে পারে।’ তাই সন্দীপন সারাজীবন একজন না-লেখকই হতে চেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ বলছেন, জগতের মহৎ সাহিত্যে বলার কথা বিশেষ কিছু নেই। উদাহরণস্বরূপ তিনি ‘মেঘদূত’-এর প্রসঙ্গ টেনেছেন। বলেছেন কুহু ও কেকার অর্থহীন ধ্বনি-সৌন্দর্যের কথা। একদিকে যা বাহুল্য, অন্যদিকে তাই সৌন্দর্য। হরিণের শিং বা ময়ূরপুচ্ছের কথা আমরা ভাবতে পারি। ভাবনাটা ‘বাজে কথা’ প্রবন্ধে আছে। কবিতা কী কাজে আসে—এই গুরুতর প্রশ্নের মোকাবেলায় হালকা রসিকতাও করেছেন তিনি। একটা গল্পের অবতারণা করেছেন, গল্পটা এমন : এক ভীল রমণী বনের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে দূরে চকচকে একটা গোল বস্তু পড়ে থাকতে দেখল। যেহেতু সে ক্ষুধার্ত, অতএব তার কাছে মনে হলো ওটা বদরী বা বরই হবে নিশ্চয়ই। সে দৌড়ে কাছে গেল এবং কুড়িয়ে নিয়ে নিশ্চিতমনে ওতে কামড় বসালো। দুর্ভাগ্যবশত ওটা ছিলো মুক্তোদানা। যেহেতু দাঁত বসানো গেল না—এ কী আবর্জনা—বলে ছুড়ে ফেলে দিল সে।

samuel-beckett555
স্যামুয়েল বেকেট (১৯০৬-১৯৮৯)

ক্ষুধা মেটাবার খাদ্য কবিতা তো নয়। তাহলে প্রশ্ন, কবিতার দায় কোন প্রয়োজন মেটানো এবং সেটা কে ঠিক করে দেবে? পাঠকের সঙ্গে কবির বোঝাপড়াটাই-বা কেমন হবে? ফাউস্ট-এর প্রস্তাবনায় গ্যেটে এমন একটা টেনশন ও টানাপড়েন হাজির করেছেন। রবীন্দ্রনাথ বলছেন, ‘অলৌকিক আনন্দের ভার বিধাতা যাহারে দেয়, তার বক্ষে বেদনা অপার’। এ আনন্দ সৃষ্টির, এ বেদনা প্রকাশের—এর বাইরে কোনো দায় নেই কবির। এখানে স্যামুয়েল বেকেটের সেই উক্তিটিও টুকে রাখতে পারি আমরা : ‘সেই এক অভিব্যক্তি, যাতে প্রকাশ করবার কিছু নেই, কিছু নেই প্রকাশের সহায়ক, প্রকাশের কারণ ও করণশক্তি শূন্য, রিক্ত প্রকাশের ইচ্ছা, আছে শুধু প্রকাশের দায়’। এই দায়টুকু অনুসরণ করলেই সভ্য মায় সভ্যতার একটা আর্তনাদ টের পাওয়া যাবে নিশ্চিতই। ‘যখন তুমি বাঁধছিলে তার সে যে বিষম ব্যথা’—বীণায় তার বাঁধবার সময় বাদকের যে বেদনা, যে বিষম ব্যথা, তাই তো ছড়িয়ে পড়বে সুরে। অতল অগাধ শান্তি বা সেরেনিটি নিয়ে সে জেগে উঠতে পারে, হতে পারে শ্রাবণের বুকের ভেতর আগুন, অশান্তি।

শান্তি কোথায় মোর তরে হায় বিশ্বভুবন-মাঝে,
অশান্তি যে আঘাত করে তাই তো বীণা বাজে।

প্রকৃত অর্থেই, যে প্ররোচনা কবিকে প্রবৃত্ত করেছে রচনায়, সেই উৎসমূল থেকে উৎসাদিত হবার কোনো সুযোগই নেই। অন্তরতম সেই সৃজনসত্তাকে তাই স্পষ্টতই বলে দেয়া হলো :

এতদিন যা সঙ্গোপনে
ছিল তোমার মনে মনে
আজকে আমার তারে তারে
শুনাও সে বারতা।

আর এই যে সামান্য সুর বা কাব্যসৃষ্টি, এও সেই মহাবিশ্ব বা জগৎসৃষ্টি থেকে কম নয়। কারণ সেও আরেক জগদ্ব্যাপার। মানুষ তো ঈশ্বরেরই প্রতিদ্বন্দ্বী, প্রতিবিম্ব, প্রতিধ্বনি। তাই শেষ কথাটি এমন:

বাঁধলে সে সুর তারায় তারায়
অন্তবিহীন অগ্নিধারায়
সেই সুরে মোর বাজাও প্রাণে
তোমার ব্যাকুলতা।

এরপর আর কিছু বলবার নেই, করবার নেই আমাদের, চুপ করে থাকা ছাড়া—ইশারার অপেক্ষায়। সেজন্য ক্রমেই নৈঃশব্দ্যের দিকে যাত্রা, যেখান থেকে শব্দসৃজন হয়; যাত্রা সেই অন্ধকার উৎসের দিকে, যেখান থেকে উৎসারিত হয় আলো।

সোহেল হাসান গালিব
গালিব

সোহেল হাসান গালিব

জন্ম : ১৫ নভেম্বর ১৯৭৮, টাঙ্গাইল। বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর।
সহযোগী অধ্যাপক, সরকারি ফজলুল হক কলেজ, বরিশাল।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
চৌষট্টি ডানার উড্ডয়ন ● সমুত্থান, ২০০৭
দ্বৈপায়ন বেদনার থেকে ● শুদ্ধস্বর, ২০০৯
রক্তমেমোরেন্ডাম ● ভাষাচিত্র, ২০১১
অনঙ্গ রূপের দেশে ● আড়িয়াল, ২০১৪

সম্পাদিত গ্রন্থ—
শূন্যের কবিতা (প্রথম দশকের নির্বাচিত কবিতা) ● বাঙলায়ন, ২০০৮
কহনকথা (সেলিম আল দীনের নির্বাচিত সাক্ষাৎকার) ● শুদ্ধস্বর, ২০০৮।

সম্পাদনা [সাহিত্যপত্রিকা] : ক্রান্তিক, বনপাংশুল।

ই-মেইল : galib.uttara@gmail.com
সোহেল হাসান গালিব
গালিব

Latest posts by সোহেল হাসান গালিব (see all)